বাঁচা ।। ন্যুট হামসুন

অনুবাদঃ রাজিয়া সুলতানা

কোপেনহেগেন বন্দরের অনেক ভেতরে ভেস্টারভোল্ড নামে একটা চওড়া রাস্তা। রাস্তার দু’ধারে সারি সারি গাছ। অন্যান্য রাস্তার তুলনায় এই রাস্তাটা নতুন। কিন্তু লোকজন খুব কম এখানে। রাস্তার ধারে হাতে গোনা কয়েকটা বাড়ি, কয়েকটা গ্যাসের বাতি ছাড়া বাইরে কোনো জনমানবের চিহ্ন পর্যন্ত নেই। এখন যে গ্রীষ্মকাল চলছে তবুও হাওয়া খেতে পর্যন্ত কাউকে আসতে দেখা যাচ্ছে না।
গত সপ্তাহে এখানেই এক অবাক কাণ্ড ঘটে গেছে। এ দিকটায় ফুটপাথ দিয়ে হাঁটছিলাম; দেখি বিপরীত দিক থেকে এক মহিলা আমার দিকে আসছে। ধারে কাছে আর কাউকে দেখতে পেলাম না। গ্যাসের বাতিগুলো জ্বালানো কিন্তু তারপরও জায়গাটা অন্ধকার। এতটাই অন্ধকার যে মহিলাকে চিনতে পারা তো দূরের কথা তাকে দেখে মনে হলো যেন নিশাচর কোনো প্রাণী। তার পাশ দিয়ে হেঁটে গেলাম। রাস্তা শেষ হয়ে গেলে ঘুরে আবার হাঁটতে শুরু করলাম। মহিলাও ঘুরে দাঁড়ালে আবার তার সঙ্গে দেখা। ভাবলাম, রও জন্য অপেক্ষা করছে হয়তও বা। কার জন্য অপেক্ষা করছে তা জানার জন্য আমার কৌতূহল হলো। আমি আবার তার পাশ দিয়ে গেলাম। তৃতীয়বারের মত আবার দেখা হলে এবার আমার মাথায় হ্যাটের প্রান্ত আঙুল দিয়ে হেলিয়ে বললাম, ‘শুভ সন্ধ্যা। আপনি কি কারও জন্য অপেক্ষা করছেন?’ সে হকচকিয়ে গেল।
না, ঠিক, হ্যাঁ -সে কারও জন্য অপেক্ষা করছিল। সেই ব্যক্তি না আসা পর্যন্ত আমি তাকে সঙ্গ দিই, মহিলা কি তাই চাইছিল নাকি বিরক্ত হচ্ছিল। না, সে মোটেও বিরক্ত হয় নি। বরং সেজন্য আমাকে ধন্যবাদ দিল। জানাল, সে আসলে হাওয়া খেতে এসেছে।
অন্ধকারে আমি তার মুখ দেখতে পাচ্ছিলাম না। এভাবে ঘোরার কোনো মানে হয়? সে সময় জানতে চাইল। আমি দেশলাইয়ের একটা কাঠি ঠুকে ঘড়িতে সময় দেখে বললাম, ‘সাড়ে নয়টা।‘ সেই আলোয় তার মুখটাও দেখার চেষ্টা করলাম। দেখলাম সে খুব কাঁপছে। আমি সেই সুযোগটা নিলাম। বললাম, ‘আপনি তো ঠাণ্ডায় জমে যাচ্ছেন একদম। চলুন টিভলি অথবা ন্যাশনালে গিয়ে গরম কিছু পান করা যাক।‘
‘কিন্তু আমি তো এখন কোথাও যেতে পারব না।‘ সে বলল। এই প্রথম খেয়াল করলাম লম্বা একটা কালো পর্দা দিয়ে সে তার মুখ ঢেকে রেখেছে। এতক্ষণে বুঝতে পেরে অন্ধকারের ওপর দোষ চাপিয়ে দিয়ে বললাম কেন তার মুখ আমি দেখতে পারি নি। সেজন্য দুঃখও প্রকাশ করলাম। মুহূর্তেই সে আমার সঙ্গে যেরকম ক্ষমাসুন্দর আচরণ করল তাতে আমি বুঝতে পারলাম সে সাধারণ কোনো কারণে রাতে এভাবে বেড়াতে বের হয় নি। আমি আবার বললাম, ‘আমার কাঁধ ছুঁয়ে হাঁটুন। একটু তো উত্তাপ পাবেন।‘
এবার সে আমার বাহুতে হেলান দিল। আমরা কয়েকবার এমাথা থেকে ওমাথা পর্যন্ত হাঁটলাম। সে আবার আমার কাছে সময় জানতে চাইল। আমি বললাম, ‘দশটা বাজে, আপনি কোথায় থাকেন?’
‘গামলে কনজেভেতে ।‘ সে উত্তর দিল।
আমি তাকে থামিয়ে দিয়ে বললাম, ‘আমি কি দরোজা পর্যন্ত আপনাকে এগিয়ে দিতে পারি?’
‘না, ঠিক হবে না। আমি তা হতে দিতে পারি না। আপনি ব্রেডগেডে থাকেন, তাই না?’
আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আপনি জানেন কী করে?’
সে বলল, ‘আমি আপনাকে চিনি।‘
এরপর কথা থেমে গেল। আলোকিত রাস্তায় আমরা একে অন্যকে পাশে জড়িয়ে ধরে হাঁটছিলাম। সে দ্রুত হাঁটছিল আর তার পেছনে মাথার লম্বা পর্দা বাতাসে উড়ছিল।
‘আরও জোরে পা ফেলুন।‘ সে বলল।
আমরা গামলে কনজেভেতে পৌঁছে গেলাম। দরোজায় দাঁড়িয়ে সে আমার দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে এতক্ষণ সঙ্গে থাকার জন্য ধন্যবাদ জানাল। বলল আমার অনেক দয়া। আমি দরোজা খুলে ধরলে সে ধীরে ধীরে ঘরে ঢুকল। দরোজায় আমার কাঁধে সামান্য ঘষা লাগল। আমি তাকে অনুসরণ করলাম। ভেতরে ঢুকতেই সে আমার হাতটা যেন লুফে নিল। আমাদের মুখে তখন কোনো কথা নেই।
সিঁড়ি দিয়ে তিনতলায় উঠে থামলে সে চাবি দিয়ে অ্যাপার্ট্মেন্টের দরোজা খুলল। তারপর আরেকটা দরোজা পেরিয়ে আমার হাত ধরে সেখানে নিয়ে গেল। সেটা ড্রয়িং রুম বলেই মনে হল আমার। দেয়ালে ঘড়ি টিক টিক শব্দ করে চলেছে। দরোজার ভেতরে ঢোকার পর একটুখানি থেমে ও হঠাৎ আমাকে জড়িয়ে ধরে মুখে গভীরভাবে চুমু খেতে শুরু করল। চুমু খাচ্ছিল আর কেঁপে কেঁপে উঠছিল যেন।
‘তুমি বসবে না? তুমি এখানে সোফায় বোসো আমি বাতি নিয়ে আসছি।‘ বলে সে ল্যাম্প জ্বালাল। আমি নিজেকেই দেখছিলাম যেন। আমার চারপাশটা। বিস্মিত আমি! উৎসুক। এতবড় ড্রয়িংরুম, সুন্দর সব ফার্নিচার দিয়ে সাজানো, অর্ধেক-খোলা দরোজা দিয়ে দেখা যাচ্ছে ভেতরে আরও কয়েকটা রুম। আমি এ কোন জীবনের হাতে এসে পড়লাম! সেই আমি এই আমি তো? এতো সুন্দর বাসা! আমি উল্লসিত হয়ে বললাম, ‘তুমি এখানে থাকো?’
‘হ্যাঁ, এটা আমার বাসা।‘ সে বলল।
‘বাবামার সঙ্গে থাকো নাকি? বিশ্বাস হচ্ছে না।‘
সে হেসে ফেলল। বলল, ‘ না, তা কেন?’ দেখছ না আমি একটা বুড়ি! এইবয়সী কোনো মেয়ে বাবামা’র সঙ্গে থাকে নাকি!’ বলেই সে তার মাথার পর্দাটা খুলে ফেলল। গায়ে যে বাড়তি কাপড় জড়ানো ছিল তাও খুলে রাখল।
‘এবার দেখবে তুমি!’ বলে আকস্মিকভাবে সে আমাকে আবার জড়িয়ে ধরল। নিজেকে সে আর ধরে রাখতে পারছিল না যেন।
হয়ত তখন তার বয়স ছিল বাইশ অথবা তেইশ। ডান হাতে একটা আংটি। সত্যিই তো। বিবাহিত সে। কিন্তু দেখতে কেমন ছিল সে? সুন্দরী? না, তাই বা কেমন করে? সারামুখে ফুটির দাগ। আর ভ্রূ নেই বললেই চলে। কিন্তু ভীষণ প্রাণবন্ত আর উচ্ছল একটা মেয়ে। খাওয়ার মুখটা অসম্ভব সুন্দর দেখতে।
আমার অনেক ইচ্ছে করছিল জানতে সে কে, বিবাহিত কি না, হলে স্বামী কোথায়, বাসাটা কার – এইসব প্রশ্ন মাথায় ঘুরঘুর করছিল। কিন্তু যতবারই জিজ্ঞেস করতে নিচ্ছিলাম, ততবারই সে আমাকে জড়িয়ে ধরে থামিয়ে দিচ্ছিল আর এতটা অনুসন্ধিৎসু হতে বারণ করছিল।
সে বলল। ‘ আমার নাম এলেন। ড্রিংক্স খাবে কোনো? বলব দিতে? বেল টিপলেই চলে আসবে। ততক্ষণে তুমি বেড্রুমে এসে পড়ো।
আমি বেডরুমে ঢুকলাম। ড্রয়িংরুমের আলো বেড্রুমটাকেও কিছুটা আলোকিত করেছে। দেখলাম সেখানে দুটো বিছানা। এলেন বেল টিপে দুটো ওয়্যাইনের অর্ডার দিল। শব্দ পেলাম, একটা মেয়ে ওয়াইন এনে রেখে গেল। এলেন দরোজা বন্ধ করে দিয়ে একটুখানি থেমে আমার কাছে এগিয়ে আসছিল। আমিও ওর দিকে এগিয়ে গেলাম। আমার দিকে এগুতেই সে হঠাৎ কেঁদে উঠল।
এটা ছিল গতরাতের কথা।
ভাবছেন, তারপর? তারপর কী হলো? একটু ধৈর্য ধরুন, প্লিজ। বলছি। অনেক কথা।
যখন আমার ঘুম ভাঙল তখন কেবল সকাল হয়েছে। জানালায় পর্দার দু’পাশেই দিনের আলো এসে পড়েছে। এলেনেরও ঘুম ভেঙেছে। জেগেই সে আমার দিকে তাকিয়ে মিষ্টি একটা হাসি দিল। তাকিয়ে দেখলাম সাদা মখমলের মত ওর বাহু, উঁচু স্তন। এরপর ওর কানে ফিসফিস করে কথা বললাম। ও আমার ঠোঁটে চুমু খেল। কী নরম ঠোঁট! আমি চুপ করে রইলাম। সে আমার মুখ বন্ধ করে চুমোয় চুমোয় ভরিয়ে দিল আমাকে ।
এরপর দিনের আলো ক্রমশ বাড়তে থাকল। ঘন্টা দুয়েক পর উঠে পড়লাম। এলেনও তাই করল। সে কাপড়চোপড় পরতে ব্যস্ত হয়ে গেল। দেখলা্ম জুতোও পরে ফেলেছে। আমি ওয়াশরুমে হাত ধুচ্ছিলাম। হঠাৎ ভয়ংকর একটা ব্যাপার দেখে আঁৎকে উঠলাম। স্বপ্ন দেখছিলাম যেন। পাশের রুমে এলেন কিছু করছিল। ও দরোজা খুললে ঘুরে তাকাতেই যেন ভূত দেখলাম আমি! খোলা জানালা দিয়ে ঠাণ্ডা বাতাসের ঝাপটা এসে আমার গায়ে লাগল। দেখলাম রুমের মাঝখানে কফিনে লম্বা করে শোওয়ানো একটা লাশ। সাদা কাপড়ে সাদা দাঁড়িঅলা একটা লাশ। মুখটা ফ্যাকাশে, হাড্ডিসার হাঁটু দুটো উঁচু হয়ে আছে। চাদরের নিচে শক্তভাবে মুঠোপাকানো দুটো হাত। দিনের আলোয় তা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। দেখতে ভয়ংকর লাগছে। আমার মুখ দিয়ে কোনো কথা বেরুলো না, শুধু ঘুরে দাঁড়িয়ে চুপ করে রইলাম। এরপর কাপড়চোপড় পরে বাইরে যাবার জন্য তৈরি হয়েছি, এমন সময় এলেন এসে আমাকে জড়িয়ে ধরল। ওর আলিঙ্গনে আমি সাড়া দিতে পারলাম না।
ও গায়ে আরও কিছু কাপড় চড়ালো। রাস্তার দরোজা পর্যন্ত যতদূর হাঁটা যায় ততদূর এগিয়ে দিতে এল। আমিও আসতে দিলাম। কিন্তু আমার মুখে কোনো কথা নেই। দরোজার গায়ে ও এমনভাবে সেঁটে দাঁড়াল কেউ যেন দেখতে না পায়। বলল, ‘আচ্ছা, এখন বিদায় তাহলে।‘ আমি একটু পরীক্ষা করতে চাইলাম। বললাম, ‘আগামীকাল দেখা হচ্ছে তাহলে।‘
‘না, কাল নয়।‘
‘কেন?’
‘এত প্রশ্ন করতে হয় না, সোনা।‘ কাল এক শেষকৃত্যে যাব। আমার এক আত্মীয় মারা গেছে। তুমি তো জানো।‘
‘তাহলে তার পরদিন?’
‘হ্যাঁ, পরশু, এখানে। এই দরোজায় দেখা হবে আবার। বিদায়।‘
আমি চলে গেলাম।
ভাবছিলাম, মেয়েটা কে? আর লাশটা? কার লাশ ওটা, মুখের কিনার দিয়ে লালা ঝরছে। মুঠোবন্ধ। শক্ত করে চেপে ধরে আছে। কী ভয়াবহ কৌতুক! মেয়েটার সঙ্গে একদিন পরই দেখা করতে আসছি আবার। সে টা জানে। আবার দেখা করাটা কি ঠিক হবে?
আমি সোজা বার্নিনা ক্যাফেতে চলে গেলাম। একটা টেলিফোন নির্দেশিকা চেয়ে নিয়ে গামলে কনজেভেতে তার নামটা পেলাম। সকালের সংবাদপত্র না আসা পর্যন্ত আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলাম। সংবাদপত্র হাতে পেলে দ্রুত শোকসংবাদের পাতায় গিয়ে মৃত্যুসংবাদ্গুলোতে চোখ বুলাতেই তালিকায় সবার ওপরে দেখি এলেনের নাম। বড় বড় অক্ষরে লেখা ‘আমার স্বামী, বয়স তেপ্পান্ন। দীর্ঘদিন রোগভোগের পর মারা গেলেন।‘
মৃত্যুর তারিখে বলা হয়েছে গত পরশুদিন। আমি বসে বসে ভাবলাম অনেকক্ষণ।
একজন বিবাহিত লোক। বয়সে তার স্ত্রী তিরিশবছরের ছোট। দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর সুন্দর এক সকালে তিনি দেহত্যাগ করলেন। তার যুবতী বিধবা স্ত্রী এতে হাঁফ ছেড়ে বাঁচল।