অল্টার ইগো

অনির্বাণ ভট্টাচার্য

একটা থ্রিলার। রঞ্জন বলেছিল। বেশি বড় না। টুইস্ট থাকবে। খুব ডার্ক হলে হবে না। শেষে একটা আলো। - 'আমি? রঞ্জন, তুই লেখ না?' -'ধুর শালা, আমার হাতে গল্প? ক্যামেরা আসে, কলম না'। অথচ ছবিটা বানাতে হবে। ইচ্ছে কতদিনের। এডিট আমার। মিউজিক চেনা একটা গ্রুপ আছে। ওরা করবে। ক্যামেরা রঞ্জনের। শুধু একটাই, গল্প। এদিকে কলম যে আমার চলছে না। এক কামরার ফ্ল্যাট। ছেলেটা লিখতে দেয় না। সবিতাকে বললাম। রাতে শোবার পর ঘন্টাখানেক। বিষাক্তভাবে তাকাল। ওর দোষ না। সারা দিন। ঘাম, অফিস, বস। রাতে ও শরীর চায়। কেন দেব না? শুধু ঐ গল্পটা দাঁড়ালে...। এ অবধি ঠিক ছিল। সমস্যাটা বাঁধল কাল। ছোটমামা আসবে। দার্জিলিং থেকে। কয়েকদিন থাকবেন। আমাদের এখানে? সবিতা বলছে কী? জায়গা কোথায়? কেন, ডাইনিং-এ শোবেন। রাত, শীতকার, প্রাইভেসি সবের মাঝে পাশের ঘরেই এক বৃদ্ধ। ঝগড়াটা বেশিদূর গড়ায়নি। ফোন। সবিতার। চোখে আলো। বলল, মামা এসে গেছে। পাশের পাড়ার ছোটদির বাড়িতে দুদিন উঠেছেন। ওরা বেরোতে ফোন করেছিল। কথা শোনাচ্ছে। দুদিনের জন্য। তবু...। মাথা কাজ করছে না। মামা। বিয়ের সময় এসেছিলেন। আলাপ? হয়েছিল কি? মুখ মনে নেই। নাটকের দল করেন। পাড়ার ছেলেমেয়েদের নিয়ে কখনো স্ট্রিট থিয়েটার। সবিতাকে ছোটবেলা থেকে দেখেছে। আসবেন বলেছিলেন, সময় পাননি। এতদিন আটকাতেন রমলা। গত বছর রাতের দিকের কথা। একদিন ভোরে উঠে ডেকে সারা পাননি। ডাক্তার বলছে, আড়াইটে তিনটের দিকে। সবিতা কাঁদছিল, বলতে বলতে। যাবে বলেছিল। আমি বাধা দিইনি। তারপর...। ইচ্ছে একবার যে মেয়েকে কোলেপিঠে তৈরি করেছেন, শুধু বাবা হতে পারেননি, তার সংসারটা দেখে আসবেন। মজার মানুষ। কিন্তু আমাদের সংসারে? জায়গা কোথায়? অশান্তি। এই নিয়ে রোজ। ছোটদির বাড়িটা কোথায়? বারণ করা যায় না? আকারে ইঙ্গিতে? নাহ। লেখা ফেখা হবে না। রঞ্জনকে বলতে হবে, হল না বস। পার্কে বসলাম। সামনে একটা পুকুর। সাজিয়েছে। ভদ্রলোক দুদিন ধরেই আসছেন। পুকুরের দিকে তাকিয়ে। কয়েকদিন আগে একটা পাগল বসত। আমার সঙ্গী। ভালোই লাগে। প্লট জুটে যায়। আজ ভাললাগছে না। এখানেই কাটিয়ে দেব সন্ধে। সেই ভদ্রলোক। বেঞ্চির একদম কোণায়। জলের দিকে তাকিয়ে। ভয় হয়। কিছু করে বসবেন? হাতে মার্কেজ। নো ওয়ান রাইটস টু কলোনেল। একসময় ফেভারিট ছিল। আমার। একটা মুরগীর গল্প। তাকে রাখা আর মেরে দেওয়া নিয়ে এক মানুষের লড়াই। আলাপ করলাম। ছোট থেকেই পড়েন। বহুবার। খারাপ লাগলে। বললাম, আমিও। এটার একটা ফিল্ম ভার্সন করা যেতেই পারে। রঞ্জনকে বলেছিলাম, পাত্তা দেয়নি। ভদ্রলোক হাসলেন। প্যাকেট রাখা পাশে। বের করলেন। দেখালেন। একটার পর একটা বই। নেরুদা, নবারুণ, নাজিম হিকমত, শক্তি। ভদ্রলোককে দেখলাম। অদ্ভুৎ মিল পাচ্ছি। বললেন আরো আছে। অস্বস্তি হচ্ছে। গলা খুললেন জোরে। 'হাঁসের দল দোলায় পাখা, তবু তোমার সঙ্গে দেখা, চমৎকার, জুলেখা ডবসন'। শক্তির কবিতা। সবি, আমার সবিতা। তখন কবিতা পড়ত। শক্তি পড়ে পটিয়েছিলাম। জুলেখা ডবসন, অবনী, সেনেট হল। সবিতা গোগ্রাসে গিলত। বৃদ্ধ বলছেন কিছু, শুনলাম। 'অনু চলে গেছিল। অশান্তি নিতে পারল না'। কে অনু? হাসলেন। বুঝলাম। কিসের অশান্তি? অসুবিধে না হলে বলতে পারেন। বৃদ্ধ বলছিলেন। সন্তান হয়নি। সমস্যা। ডিপ্রেশন। একটা ঘরে থাকা। কাজ থেকে আমার ফিরতে দেরি হওয়া। ফিল্ম। 'ফিল্ম'? বৃদ্ধ ছবি বানান? 'করতাম বাবা। টাকা পয়সা নেই। শুরুর দিকে লিখতাম। গল্প। পুরনো এডিট সুটে সাজাতাম। এক বন্ধুর সঙ্গে। আগেকার মানুষ। এত নতুন কিছু পাই কোথায়? বন্ধু চলে গেল হঠাৎ। গড়িয়ার বাড়ি। আমি একা আর পারলাম না। অনু বিরক্ত হত'। আমি ঘামছি। রঞ্জন। ঝকঝকে ফ্ল্যাট। কোথায় যেন। বিদ্যুৎ খেলে গেল। গড়িয়াই তো। বাইপাসের বাসগুলো ওখান থেকে পাস করে। রঞ্জন এগিয়ে দেয় গেলে। সেদিন বলল, বুকে ব্যথা। ঘামছি? রঞ্জন? চলে যাবি? এত তাড়াতাড়ি? সন্তান। বৃদ্ধের মুখের দিকে দেখছিলাম। প্রৌঢ় বলা ভাল। মনে হল বয়সের ছাপ বেশি পড়েছে। সন্তান। ডাক্তার চলছে। সবিতাকে রিপোর্ট দেখাইনি। ও এখনো গায়ে মাখছেনা। আমি জানি। মনীশ। স্কুলের বন্ধু। বলছিল। কাউন্ট কম। সমস্যা আছে। তোর বউএর তো ঠিকঠাক। তুই এরকম হেজে গেলি? বললাম, হবে না? বলল, সমস্যা আছে। দেখি...। বৃদ্ধের সঙ্গে কিভাবে এত মিল। নাকের নিচে একটা আঁচিল। হাত দিলাম। আমারটা এত স্পষ্ট না, তবু, অবস্থানটা একই। গায়ের রঙ ভেবে দেখলাম, ওই বয়সে এরম হবে আমারও। পাঞ্জাবি পরেন। নিজের দিকে তাকালাম। জরির কাজ। দীঘা থেকে সবিতা দিল। জানে, ওর বর এ পোশাকেই সবচেয়ে খুশি। আলাপ গাঢ় হয়। ঘাম। অস্বস্তি। তাকালাম, ভদ্রলোক মান্না দে শুনছেন। আমি...। এবয়সে এযুগে তুই এত ব্যাকডেটেড কেন। স্কুলে খ্যাপাত। কলেজেও। আমি রবীন্দ্রনাথ শুনতাম না। ইংলিশ রক না। ব্যান্ড না। কী দেখলে তুমি আমাতে....। কখনো, জানি তোমার প্রেমের যোগ্য আমি তো নই। এই মানুষটিও। বেছে বেছে ওই গান? আহ। আস্তে। চিৎকার করে বললাম। মানুষটি চমকে গিয়ে বন্ধ করলেন। পরশু এসে স্বীকারোক্তি করছিলেন। মাথার ওপর দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছিল। আমার মাথায় অন্য কথা। এও হয়? কিন্তু আমার সঙ্গে কেন? রাত অবধি থাকি। তিনিও। বেঞ্চ ফাঁকা। এদিকে ফ্ল্যাট খুব একটা নেই। সেফ না, অন্তত মেয়েদের কাছে। গলি। সেদিন ছিনতাই হল। গাছটাছ লাগানো। যে'কটা আছে, পার্ক থেকে নজরে পড়েনা জানলা। আমি এভাবে বাকি জীবনটা কাটাব? একা? ডিপ্রেশন? জলের দিকে তাকিয়ে থাকা? সন্তানহীনতা? ছবি বানানো, লেখা, সব কিছু হারিয়ে ক্রমাগত একই বইয়ের ভেতর নিজেকে পড়তে পড়তে জীবন শেষ? নাহ। থামাতে হবে। পুকুরটায় রেলিং নেই। সুইমিং হত। গত বছর, একটি বাচ্চা...। তার মানে জল গভীর। মানুষটা চলে যাবার আগে কিছুক্ষন দাঁড়ান জলের কাছে এসে। একটা ধাক্কা। জলের দিকে। টুপ। কেউ নেই দেখার। আমার ফিউচারকে আটকাতে হবে। কাউকে বলব কিছু? নাহ, আমি নিশ্চিত। জাস্ট কাকতালীয় না। প্ল্যান। তারপর থেকে সময় গুনলাম। সকাল থেকে চুপ। সবিতার সঙ্গে আজ কোনো অশান্তি নেই। কী হল, এত শান্ত? নাহ। এমনি। সন্ধেবেলা গেলাম পার্কে। আসেননি। দেরি হচ্ছে হয়ত। ওয়েট করছি। মিনিট, ঘন্টা...। কী ব্যাপার? শালা আজকেই এল না। এদিকে লোকও নেই। ঝিরঝিরে বৃষ্টি শুরু হবে। হাওয়া। আইডিয়াল প্ল্যান। আর লোকটা কিনা...? কতক্ষণ থাকব? বেঞ্চিটা দেখলাম। কাগজটা। ভদ্রলোকের জায়গায়। ধর শালা। কিছু হয় টয় নি তো? বাঁচা যাবে...। কি যেন ভেবে ওটা তুললাম। বুকটা ধক করে উঠল। একটা চিঠি। পড়ছি। 'প্রিয় শান্তনু, আমায় তুমি আগে দেখনি, আর দেখলেও মনে নেই। সবি মা'র কথা থেকে এটুকু বুঝেছিলাম। তোমার সম্পর্কে সব কিছু বলত। চিঠি লিখত। কী ভালবাস, গান, লেখা, ছবি, বই। সব ...। তোমার সম্পর্কে একটা ছবি দেখলাম। দেখতে ইচ্ছে করছিল তোমাকে। আগ্রহ বাড়ছিল। সবিমাকেও দেখিনি তো কতকাল। কাল দেখা করেছিল ও। প্রণাম করল। বলল, একটা ঘর। তুমি পছন্দ করছ না। কাঁদল। দোষ নেই। সত্যি, বুড়ো বয়সে এসব শখ ছেলেমানুষি। ঠিক করলাম যাব না। তুমি সন্ধে থেকে এখানে বসো। ঘরে আস না। সবি দুঃখ করছিল। ভেবেছিল অন্য কেউ এসছে। আমি না না করেছিলাম। মন থেকে তো জানি না। দেখতে ইচ্ছে করল। তোমার ছবি দেখেছি। চিনলাম। প্ল্যানটা এল। নাটকটা করতাম। সায়েন্সের ছাত্র। পড়িয়েছি। গল্প লিখতে পারি। সাজালাম। অভিনয়টা তো জাত ছিল। তুমি একটু নার্ভাস থাকতে। তাই কিছু ভুলচুক হলেও ধরোনি। ডিপ্রেশড ছিলে। কষ্টের গল্পগুলো বাড়িয়ে আসলে তোমাকে ধাক্কা দিতে চেয়েছিলাম। আমি নিশ্চিত, পেরেছি। আর একটা জিনিস বুঝলাম, এখানে কষ্ট কাটাতে আস। ভাবতে আস। অন্য নারী? ধুর। এ ছেলে অমন না। আশ্বস্ত হলাম। সবির দুশ্চিন্তা ভুল। ওকে আর কিছু বলছি না। কাল এখান থেকে চলে যাব। এরা টিকতে দিচ্ছে না। ভেবো না। আমি ভাল থাকব। তুমি, সবি মা ভাল থেকো। একটা কোল আলো করা ছেলে আসুক। তোমার কলমে লেখা আসুক। ছবি আসুক। চলি'। ঘোর কাটতে সময় লাগল। সবির ছোটদির বাড়ি চিনি। কাছেই। আটকাতে হবে। ছুটলাম। 'কাল চলে যাব'। একটা দিন সময় আছে। কয়েকটা ঘন্টা। রাতটুকু। ঘামে, আর অদ্ভুত এক আনন্দে জামা ভিজছে। বৃদ্ধ আমাকে হারিয়ে দিয়েছেন। রঞ্জনকে বলতে হবে, গল্প পেয়ে গেছি বস। তবে, ক্রেডিট লাইনে নাম অন্য একজনের হবে।
থ্যাঙ্কস মামা। মানুষটার আছে আরো অনেক গল্প শোনা বাকি....