তাহাদের কণ্ঠডায়েরির একপাতা

আনোয়ারা আল্পনা

শিলা খান
আঠারো সেপ্টেম্বর, দুইহাজার পনেরো, ভোর চারটা, ধানমণ্ডি, ঢাকা


চারটা এএম কে রাত বলবো না ভোর বলবো, বুঝি না। দশটায় ঘুমালে ভোরই। কাল কোথাও যাব না বলে রাত জেগেছি। তিনটায় ঘুমালে চারটাকে কি বলে সে আলাপে না গিয়ে বলা ভালো, ফোন যে বাজলো আর আমিও যে শুনলাম, ফোন কানে দিয়ে সেই বিস্ময় কাটতে না কাটতেই, ফোনটা কেন এসেছে সে খবর পেলাম। ফোনের ওপাশে আমার বড় চা্চা! বলল, ‘মা রে তোর বম্মার তো স্টোক করছে!’ আমার চাচা ডাক্তার রায়হান খান আস্তে কথা বলতে পারে না। ছোট বেলায় গাছ থেকে পড়ে গিয়ে নাকি প্রায় মরে গেছিল। দাদী বলে, সেই থেকে জোরে কথা বলে। সাধারণ একটা কথাও আশ্চর্য চিহ্ন না লাগিয়ে বলতে পারে না। তাহলে বড়মার ব্রেন স্টোক করেছে, এত বড় একটা খবর শান্ত গলায় বলবে, রাত চারটায় হলেও, আশা করি না আমি। আমি ফোন কানে নিয়েই বিছানা থেকে নামলাম, নামার আগে গায়ের ওপর থেকে বরের পা সরালাম। পানি খেলাম, এতক্ষণ চুপ করে থাকল চাচা। ‘কখন?’
এবার আমার গলা শুনে মনেহয় আন্দাজ করলো, পয়লা ধাক্কা সামলেছি। বলল, ‘তিনটার সময় উঠলো, বাথরুমে গেল, বললাম, দরজা না লাগাইতে, খুলেই গেল, পেসাব করল শুনলাম। জানিসই তো বাথরুমে গেলে কত সময় লাগে তোর বম্মার, ঘুমায়ে গেছিলাম মনেহয়, সাড়ে তিনটায় দেখি বিছানায় নাই। ঘুম ভেঙ্গে মনে পড়ল বাথরুমে গেছিল, আর তো আসে নাই। উঠে গিয়ে দেখি পড়ে আছে মেঝেতে।’
এইবার আমি ভয় পেয়ে গেলাম, ‘বম্মা এখনও বাথরুমের মেঝেতে?’
চাচা প্রায় চিৎকার করে বলল, ‘জানিস না, আশি কেজি ওজন তোর বম্মার?’ আমি কাঁদতে কাঁদতে বললাম, ‘তুমি ফোন রেখে বাসার মেইন গেটটা খুলে দাও।’ বড় চাচার ফোন কেটে ছোট চাচাকে ফোন করলাম।

আনিসুর রহমান খান
ভোর সারে চারটা, কাজলা, রাজশাহী


ফোনটা বাজছে শুনতে পাচ্ছি, কিন্তু উঠতে ইচ্ছা করছে না। বালিশের পাশে ফোন নিয়ে ঘুমাই না আমি। ফোনটা আছে খাবার ঘরের টেবিলের উপর। একবার বেজে থেমে গেল, আবার বাজতে শুরু করলো। মানে জরুরী ফোন। পাশে ঘুমাচ্ছে আমার বউ কহিনুর, গুতা দিলাম, দেখনা, কে ফোন করেছে। বউটা লক্ষি আছে, উঠলো। ‘শিলা? কি হইছেরে মা?’ শিলার নাম শুনে বিছানা থেকে তাড়াতাড়ি নামলাম। বৌয়ের হাত থেকে ফোন নিয়ে কানে ধরলাম, শিলা ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলল, ‘তোমার পায়ে ধরি ছোটচা, এখনি হীরা আর মনিরকে নিয়ে বাড়ি যাও, বম্মা অজ্ঞান হয়ে বাথরুমের মেঝেতে পড়ে আছে।’ শিলা ছাড়া আর কেউ বললে, ও বাড়ি যেতাম না আমি। ছেলেদের ঘুম থেকে তুলে বাড়ি গিয়ে ভাবীকে বিছানায় এনে শোয়ালাম। আধাঘন্টার মধ্যে এম্বুলেন্স এলো। রাজশাহী মেডিকেলে ফোন করেছিল শিলা।

রাসেল মিয়া
সকাল সাতটা, বনশ্রী, ঢাকা


ফোনডা বাজতেছে, চোখ ডলে দেহি ম্যাডামের ফোন। এত সকালে তো আমার সুন্দরী ম্যাডামের ফোন করার কথা না। কালকাই তো ঠিক হইলো, আজ আমার ছুটি। দুই সপ্তাহ পরে ছুটি পাইছি আইজ। আমার প্রেমিকা মিনা খাতুনকে নিয়া সিনেমা দেখতে যামু, কথা দিছি। সক্কাল বেলা ফোন মানে, ছুটি বাতিল। আমার মন খারাপ হওয়ার কথা, কিন্তু উল্টা খুশি লাগতেছে। গাড়িডা একদিন না দেখলেও আনচান লাগে, আর ম্যাডামরেও। এত সুন্দর কেউ হইতে পারে, ম্যাডামরে না দেখলে জানতেও পারতাম না। কি আর বলব আপনাদের, আমার ইচ্ছা করে পাশের সিটে ম্যাডামরে লইয়া লং ডেরাইভে যাই, এক গেলাস চা দুইজনে খাই বিষ্টিতে ভিজতে ভিজতে। না, আপনেরা ভাববেন না আমি বাজে পোলা, একদিন ছাড়া ম্যাডামরে চুমা খাইতে বা বিছানায় পাইতে চাই নাই কুনোদিন। আমিতো তারে ফিটফাট অফিসের পোষাকে ছাড়া কুনোদিন দেখি নাই। ‘হ্যালো রাসেল, রাজশাহী যাব!’ গলার আওয়াজটা ভেজা ভেজা, আমি তড়াক করে উঠে বসলাম, কানতেছে আমার শিলা ম্যাডাম! ‘রাসেল, রাজশাহী যাব।’ আবার বলেন তিনি। আমি ছটফট করে জানতে চাই, ‘কী হইছে ম্যাডাম?’
‘আমার চাচী অসুস্থ, আজই যাব, তুমি কি যেতে পারবে?’ মনে মনে বলি, আপনেরে নিয়ে যাইতে পারবো না, এমন জায়গা আল্লার দুনিয়াত নাই।
জোরে জোরে বলি, কখন রওনা করবেন?
তুমি এলেই!
এখনি আসতেছি!

তানিয়া
একুশে সেপ্টেম্বর, রাজশাহী


বাড়িটা অদ্ভুত! ঢুকতেই মনে হলো, এমন একটা বাড়িতে আমি জীবন কাটিয়ে দিতে চাই। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আশেপাশে এমন একটা বাড়ি থাকতে পারে ভাবি নাই। গেট খুলে বিরাট উঠান, গাছে গাছে ঢাকা, অন্ধকার। তারপর দোতলা একটা বাড়ি। এই বাড়ির অসুস্থ গিন্নির দেখাশোনার জন্য একজন নার্স চেয়েছিলেন তারা। আমি কেবল নারসিং পাস করেছি, এখনও জয়েন করি নাই কোথাও। আমার এক আত্মীয় রাজশাহী মেডিকেলের নার্স, তিনিই খবর দিলেন, বললেন, ‘করো, অভিজ্ঞতা হলে চাকরি পাওয়া সহজ হবে। ডাক্তারের বাড়ি, ওনাদের সুপারিশেই ভালো চাকরি হয়ে যাবে।’
আমার ইন্টারভিউ নিতে বসলেন, শিলা আপা, ডাক্তার সাহেবের ভাতিজি। সিভি নেড়ে চেড়ে দেখলেন, ‘পাঁচ বোন আপনারা?’
‘জি। আমি সবার ছোট।’
বোনদের সবার খোঁজ নেওয়া হয়ে গেলে, বললেন, ‘এটাতো আসলে চব্বিশ ঘন্টার চাকরি। সপ্তাহে একটা নাইট ছুটি পাবেন।’
আমি বললাম, ‘ছুটি লাগবে না। আমি এখানেই থাকবো।’
মনে মনে বললাম, পচা একটা বাড়িতে থাকতে ক্লান্ত হয়ে গেছি, এ বাড়িতে ঢুকে শান্তিতে চনমন করছি।
শুনে খুব খুশি হলেন তিনি, বললেন, ‘সিভিতে যা স্যালারি চেয়েছেন তার চেয়ে অনেক বেশি পাবেন। আমার চাচা চাচী খুব ভালো মানুষ, আপনার কোনো অসুবিধা হবে না। শুধু আপনি বম্মার খেয়াল রাখবেন, প্লিজ।’

মুনির খান
একুশে সেপ্টেম্বর, রাজশাহী


শিলা আপা যখন তানিয়ার ইন্টারভিউ নিচ্ছিল, সেখানে ছিলাম আমি। ‘বাবা কী করতেন?’ প্রশ্ন করে টেবিলে রাখা চায়ের দিকে আলগোছে হাত বাড়িয়েছিল, সেই সময় তানিয়া এ বাসার বিশাল বসার ঘরটা মাথা ঘুরিয়ে দেখতে দেখতে বলল, ‘কসাই!’ শুনে শিলা আপার মুখটা কেমন হলো সেটা বলতে হলে আপনাদের আমার দাদীর গল্প বলতে হবে। আমার দাদী জমানো টাকা রাখতো কোরান শরীফের মধ্যে। তার লোহার সিন্দুক ছিল, তবু। যুক্তি ছিল, দোজখের ভয়ে চোর কোরান শরিফে রাখা টাকা চুরি করবে না। ছোটবেলায় আমরা ভাবতাম কোরান শরিফে দাদীর কোটি কোটি টাকা আছে। খুব হজে যাওয়ার শখ ছিল তার, হীরা বলতো দাদী আমি তোমাকে হজে নিয়ে যাব। দাদী খুশি হয়ে বলতো, টাকা কই পাইবা? হীরা বলতো, তোমার কোরান শরিফের মধ্যে আছে! শুনে সবাই হাসতো। একদিন সকালে দেখা গেলো দাদীর কোরান শরিফ চুরি গেছে। দাদী চোরের দোজখের চিন্তায় দিশাহারা হয়ে গেল। দাদীর সেই মুখের মতো মুখ হলো শিলা আপার। কিন্তু আমি তানিয়াকে দেখতে লাগলাম, আমার মাথায় হালকা প্রেমভাব হলো।
আমাদের পরিবারে শিলা আপার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কেউ নয়। তার এক কথায় দুই ভাইয়ের পচিশ বছরের বন্ধ মুখ দেখাদেখি খুলে গেল। এমনভাবে খুলল যে, মনে হলো, একটা বই পড়তে পড়তে পাতা ভাঁজ না করেই বন্ধ করে রাখা হয়েছিল, অনেকদিন পর আবার পড়তে বসে গোড়া থেকে শুরু করতে হলো। আপনাদের বলাই ভালো, আমার মাকে বিয়ে করার জন্য পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছে আব্বা। আমার মা কসাইয়ের মেয়ে।


রায়হান খান
বাইশে সেপ্টেম্বর, কাজলা, রাজশাহী

শীলা এসে পড়ার পর অসুস্থ স্ত্রীকে নিয়ে আর চিন্তা করছি না আমি। সেইই এবার সব সামলাবে। তার কাছে তার বম্মা খুব স্পেশাল। আসলে আমি জীবনে কোনোকিছু নিয়েই তেমন দুশ্চিন্তা করি নাই। জীবনের পাঁচ বছর লন্ডনে কাটানো ছাড়া বাকি সময় রাজশাহীর মত শান্ত শহরে কাটিয়েছি। নিঃসন্তান আমিই শিলার বাবা। আমার জীবনে শিলা ছাড়া আর কোনো দুর্বলতা নাই। ওর পাঁচ বছর বয়সে হারিয়ে গেছে আমার ভাই আর ভাইয়ের বউ, শীলার বাবা মা। তারপর থেকে আমি আর আমার স্ত্রী সুলতানা তাকে ঘিরেই বেঁচেছি। তিনভাইয়ের সবার ছোট ভাই আনিস কসাইয়ের মেয়েকে বিয়ে করার পর থেকে যোগাযোগ নেই। প্রায় পঁচিশ বছর পর এ বাড়িতে এসেছে সে। কাছেই থাকে, ছেলেরা আসে অবশ্য।
একটা পেশাকে কেন এত ঘৃণা করি আমি, সে কথা বলা দরকার না? ঘটনা খুব গুরুতর, তা নয় কিন্তু। একবার গলাকাটা একটা লাশ দেখেছিলাম, আরো অনেকে ছিল সেখানে, ভিড়ের মধ্যে থেকে একজন হঠাৎ বলেছিল, ওহ মনেহয় কসাঁই কাইটছে রে, এক্কেবারে এক পোঁচে! লাশটা যখন মানুষ ছিল, আমি তাকে চিনতাম।

হীরা খান
চব্বিশ সেপ্টেম্বর, রাজশাহী


শীলা আপা আ্মাকে আর মুনিরকে ডেকে দোতলায় নিয়ে গেল, বলল, তোরা দুইজনের একজন এখানে চলে আয়, এখানেই থাকবি। তানিয়া বম্মার দেখাশোনা করবে, আরো একটা ছেলে আসবে সকাল বিকাল, এক্সারসাইজ করাতে। এতসব চাচা একলা সামলাতে পারবে না। চাচীকে রাজি করিয়ে আজই চলে আয়। আমি কাল চলে যাব। আর থাকতে পারছি না। বম্মার পায়ে একটু জোর ফিরলেই ঢাকা নিয়ে যাব। কে থাকবি?
মুনির বলল, আমি।
আমি হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। মুনির থাকলে ভালই হবে, ওর অত বাইরে যাবার নেশাও নাই। এখানে বসে বসে বিসিএসের পড়া পড়তে পারবে। আপা যদি আমাকে থাকতে বলত, বিপদে পড়ে যেতাম। হাজারটা কাজ আমার। ক্যাম্পাসে শিবির সামলাইতে আর্মস আসতেছে, রাতে নেতাদের বাসায় অনেক রাত পর্যন্ত মিটিং করতে হয়।
কথা শেষ করে গলা নামিয়ে আপা বলল, কাউকে বলার দরকার নেই, তানিয়ার বাবা কসাই ছিল!

কহিনূর আক্তার
পাঁচ ফেব্রুয়ারি, দুইহাজার ষোল, রাজশা
হী


আমার হাত পা কাঁপতেছে, কি করবো বুঝতে পারতেছি না। এই খান পরিবারের খান নামের সাথে না লাগাইয়াও এত বড় বিপদে পড়বো কখনও ভাবি নাই। কসাই বাপের মাইয়া আমি, কোনোদিন জানে একফোটা ডর আছিল না। পলাইয়া বিয়া করছিলাম খান বাড়ির পোলারে। কতো কি কইরা পটাইছিলাম। শ্বশুরবাড়ি পাই নাই, মন খারাপ করি নাই কোনোদিন। আমার খান সাহেব কয়, আমার মতো শক্ত কলিজার মেয়ে মানুষ জগতে নাই। সেই কহিনূর আক্তারের আইজ এই দশা! শীলারে বলা ছাড়া আমার আর পথ নাই, এ কথা খানেরে কিছুতেই বলা যাবে না। মেয়েটার জন্য মায়া হয়, একলা কতদিক আর সামালাবে। নাকি জামাইকে বলব? জামাইটা বড় ভালো, সে যদি শীলাকে আস্তে ধীরে বুঝাইয়া বলে, তাহলেই ভালো হয়? চারদিন আগে ঘটনা শোনার পর থেকে এক ফোঁটা ঘুমাই নাই। একশোবার শীলাকে ফোন করার জন্য মোবাইল হাতে নিছি আর নামাইয়া রাখছি। খালি মনে হইছে আনিসুর রহমান খান যদি কসাইয়ের অশিক্ষিত মাইয়া বিয়া না করত, তাহলে খান পরিবার আজকের এই বিপদে পড়তো না। পোলা তো আমিই পয়দা দিছি। একবার আমি এদের মান সম্মান পয়মাল করছি, এবার আমার পোলা। এক পোলা নেতাগো পা চাটতেছে, আরেক পোলা চাচীর নার্স রে প্যাট বাধাইছে। আর এদেরই বোন শীলা, দেখ কি কইলজা ঠাণ্ডা করা মাইয়া, যেখানেই থাকে আলো করে রাখে।

রাশেদুল আলম খান
সাত ফেব্রুয়ারি, ঢাকা


সারাদিন পরে ক্লান্ত হয়ে বাড়ি ফিরেছে শীলা। চাচী ফোন করার পর দুইদিন কেটে গেছে, আমি ওকে বলতে পারি নাই। আজ বলতেই হবে। হাসপাতালটা দাঁড় করেতে গিয়ে গাধার খাটনি খাটতে হচ্ছে বউটাকে। এই দেশে কিছু কি ঠিকঠাক চলে। পদে পদে ঘুষ, দমে দমে যন্ত্রণা। আমি তাকে এতোই ভালোবাসি যে, বিয়ের পর নামের সঙ্গে খান লাগাতে আমার একটুও খারাপ লাগে নাই। তবু আমি ওর পাশে দাঁড়াতে পারি নাই, নিজের কাজের ব্যস্ততার জন্য। একা একা সে এই জগদ্দল পাথর টানছে। তারপর বাড়ি আর অসুস্থ মা নিয়ে সারাক্ষণ চিন্তায় থাকে।
আমাদের বাচ্চাকাচ্চা হলো না বলে এক সময় মন খারাপ করতো। নিজে ডাক্তার হয়েও যে ও কখনও আমাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেল না, আমার ধারনা, নিজের চেক আপ করিয়েছে ও। যখন দেখেছে ওর কোনো সমস্যা নেই, তখন আমাকে আর কিছু বলে নাই। আমিও দুয়েকবার গেছি ডাক্তারের কাছে ওকে না জানিয়ে, আমার কোনো বড় ঝামেলা আছে তাও জানা যায় নাই।
কিন্তু এসব ভেবে ভেবে সময় কাটাচ্ছি আমি। শীলাকে আমার বলতেই হবে যে, তানিয়া প্রেগন্যান্ট। কিন্তু আমি শেষ পর্যন্ত ফোন করে দুইটা এয়ার টিকিট বুকিং দিয়ে ওকে বলতে পারলাম, ‘চলো কাল রাজশাহী যাই, বম্মাকে নিয়ে আসি'

মিনা খাতুন
আট ফেব্রুয়ারি, রামপুরা, ঢাকা


এইযে ষোল সাল পইরা দুই নম্বর মাসও দৌড়াইয়া যাইবার লাগছে, আমার রাসেল মিয়ার কুনো চ্যাতব্যাত নাই। এই শীলা ম্যাডামের চাকরি লওয়ের আগে রোজ দুইবার কইরা কইতো, ষোল সাল আইলে আর তোমার রেহাই নাই মিনা কুমারী, তিন কবুল কইয়া আমার গলায় মালা তোমার দিতেই হইবো। আমারে মিনা কুমারী বইলা আদর কইরা সে মোবাইলে ইউটিউব দিয়া আমারে মিনা কুমারির সিনেমা দেহাইতো। আইজ সকালে ফোন কইরা কইলাম, ষোল সালের দুইমাস যায়গা! হে গলার মোদে বরফ ঢাইলা কইলো, আমার ম্যাডাম উড়াজাহাজে কইরা রাশশাই গেছেগা, আমারে লয় নাই! আমি খুশি হইয়া কইলাম, তাইলে তো তোমার কয়দিন ছুটি, আমিও আপারে কইয়া কয়দিন ছুটি লই। এহন ছুটি চাইলে দিব, শীত গেছেগা, কোম্বলের দোহানে বেচাকেনা নাই। লও এই সুযুগে বিয়াডা সাইরা লই! হে তার গাড়ির লাহান ফোঁস কইরা বইয়ের ভাষায় কইলো, আমার বিয়াতে আমার ম্যাডাম থা্কিবে না, তাহা তো হইতে পারে না মিনা কুমারি!
আমার কি মনে অয় জানেন? আমার রাসেল মিয়া হের এক জনম এই ম্যাডামের মুহের বিলা চাইয়া কাটাইয়া দিবার পারবো!

সুলতানা খান
আট ফেব্রুয়ারি, রাজশাহী


ঘুম ভেঙ্গে দেখলাম শীলা আমার পাশে বসে আছে। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, কখন এলি রে মা? খাইছিস? হাসপাতালের খবরও জানতে চাইলাম। কিছুই বলল না। অনেকক্ষণ পরে আমার বুকে মুখ রেখে বলল, তুমি আমার সাথে ঢাকা চলো, আমি তোমাকে ছাড়া আর থাকতে পারছি না। চোখের পানিতে ভেসে যেতে লাগল আমার বুক। বললাম, তোর চাচা যাবে না? বলল, না, শুধু তুমি।
আমি এখন অনেকটা ভালো। ওরা যতটা ভাবছে, তার চেয়েও ভালো। তানিয়া যে প্রেগন্যান্ট আমি বুঝতে পেরেছি আগেই। এটা মুনিরের কাজ, তাও জানি। কিন্তু তানিয়া বলেছে, এটা শীলার বড় চাচার। এটা শীলা সহ্য করতে পারছে না। আমি আশ্চর্য হয়ে গেলাম এটা দেখে যে, শীলা এটা বিশ্বাস করেছে। তানিয়ার সঙ্গে কথা বলেছে শীলা, তানিয়া ওর বড় চাচাকে বিয়ে করতে চায়। এটা শুনে শীলা বলেছে, বড় চাচাকে অবশ্যই তানিয়াকে বিয়ে করতে হবে।
রায়হান খানকে চিনি আমি। সে কিছুতেই এটা করতে পারে না। আমি কি শীলাকে এটা বলবো? মেয়েটা কষ্ট পাচ্ছে। তানিয়ার ব্যাপারটাও বুঝতে পারছি না। সে মুনিরের নাম কেন বলছে না? আর মুনিরও কেন চুপ করে আছে? শীলার বড় চাচা কি শোকে পাথর হয়ে গেছে? আমাকে আর শীলাকে কেন সে মুখ দেখাতে পারছে না? দেখেন সারা জীবন মাস্টারি করার কুফল, আমার মাথায় কেবল প্রশ্ন আর প্রশ্ন। শিশ্নের কারবার আমি ভালো বুঝিই না।
শীলাকে জড়িয়ে ধরে বললাম, 'মা রে কাঁদিস না, আমি যাব তোর সাথে।'