বাজুক তাহার আলোর বেণু

তমাল রায়

বেনেরপোল পেরিয়ে গেলে ওই যে আলপথ তারও ওপর দিয়ে হেঁটে চললো অ-পর সত্তা। পৌঁছতে পৌঁছতে সন্ধ্যে। মালতীর খোঁজ করতে বেরিয়ে, যেখানে পৌঁছনো, সেখানে ইতস্তত ঝোপঝাড়, আর আগাছার মধ্যে অস্বস্তি নিয়ে দাঁড়িয়ে একটা ব্যাঁকা টেরা বাঁশ আর টিনের চালের ঘর। সামনে নেড়ি কুত্তা মাটিতে কি যেন শুঁকছে। তাকে টপকাতে গেলে সেও সন্দেহর চোখেই দেখল আপাদমস্তক।

এখানে নিস্তব্ধতা! সন্ধ্যে হয়েছে, আলো জ্বলেনি। একটা ভাঙা চাঁদ ফচকে যুবকের মত কিছুটা ঝুলে ফ্রিজড। ঘরের সামনের দালানে বসে একটা রোগাশোগা বছর দশের মেয়ে। মালতী ঝি- লোকালে চেপে শহরমুখো যখন- তখনও আকাশ ফর্সা হয়নি। এ বাড়ি সে বাড়ি কাজ সেরে ফিরতে, প্রায় সন্ধ্যে। অপেক্ষায় দশ বছর। সেয়ানা বাপটা কার সাথে যেন ভেগেছিলো, কন্যার জন্মদানের পরই। মালতী রোজই ফিরতো। গতকাল রাতে আর ফেরেনি। ফিরবে না। বালিগঞ্জে ট্রেন অবরোধ। ট্রেনে থেকে নেমে নাজিরগঞ্জের রাস্তা দিয়েই ফিরছিলো। শেয়াল কুকুরে খেয়ে নেয় শুনশান রাস্তায়। বেআইনি মদের ভাঁটিখানাগুলো ও পথেই।

দালান তো দালানই। বাড়ির একটু দূরেই পুজোর প্যান্ডেল বাঁধা হচ্ছে। ভাঙা ইঁটের টুকরো দিয়ে টুম্পা দুর্গা নাম লিখছে অন্ধ দালানে। চোখ থেকে খসে পড়ছে জল। দুর্গা এখন ভিজছে...,

কোর্টে দাঁড়িয়ে ঘটনার লিখিত বিবরণ পেশ করলো শম্পা। স্বপনের আমচা চামচারা অবশ্য থ্রেট করে গেছে এর মধ্যেই। পুলিশ দেখেছে,তেমন কিছু বলেনি। শম্পার তাতে অবশ্য হেলদোল নেই। কি আর করবে বড়জোর মেরে ফেলবে! প্রাইমারী ইস্কুল টিচার শম্পার দোষের মধ্যে ছিল বড় বেশি হাসতো। তো প্রেমে পড়তও লোক চটপট। তো নিয়ামতপুরের রাস্তাতেই মুখে এসিড ছুঁড়ে মারে নাটা স্বপন। তেরো বার রিফিউজালের পর। দোষীর শাস্তি ভারতীয় সংবিধান মেনে কত দিনে হবে কেউ জানেনা। এজলাস থেকে বেরুনোর আগে শম্পা একবার কপালে হাত ছোঁয়ালো। ঈশ্বরে আর বিশ্বাস নেই। তবু অভ্যেসবশত মনে মনে দুর্গা নাম জপলো। পুজো আসছে। কোর্ট ও বন্ধ থাকবে। পোড়া মুখের ওপর শরতের মেঘের ছায়া...

ঘোষাল বাড়ির পুজো আসলেই বাড়িতে ভীড় জমায় কত আত্মীয়। সবাইকে তিন্নি চেনেওনা। মার খুড়তুতো দাদা এসেছিল গতবার। সাথে তার স্ত্রী সন্তান। তিন্নি তো সবে পাঁচ কি ছয়। সে বয়সে ক্যাডবেরি আর কার না প্রিয়! তো ওই অলোক মামা, তাকে ডেকেওছিলো একটা বড় ডেয়ারি মিল্কের প্যাকেট নিয়ে। তিন্নি কাছে যেতে, তাকে কোলে বসিয়ে যা যা করে, এই সব মানুষরা, করলেন। তিন্নির খুব ব্যথা লেগেছিলো। পাঁচ কি ছয় বড়জোর! লাগবে না! চুপ ছিলো। মা'কেও বলেনি। মা'তো খুব বকে। তারপর জ্বর এলো, ভুল বকা। সেদিন নবমী। ডাক্তারও নেই। ভর্তি করা হল বাইপাসের বেসরকারি হাসপাতালে। এখন তিন্নি সুস্থ। কিন্তু চুপ মেরে গেছে একেবারে। ঘোষাল বাড়ির পুজোও এবার আর হচ্ছেনা। কিন্তু পুজোতো আসছে। কিন্তু তিন্নি বেরুবে না কোথাও, ঠাকুরও দেখবে না।

মালতীকে যারা শেয়াল কুকুরের মত ধর্ষণ করে মেরে ফেলে গেছিলো তারা ধরা পড়েছে। শম্পাকে বিয়ে করবে বলে কথা দিয়েছে এসিড ভিকটিম বলে কাজ করে যে এন জি ও, তার ছেলেটা। আর তিন্নি ভালো আছে। পুজোর পর স্কুল খুললে সে আবার স্কুল যাবে।

আসলে এগুলো হয়নি। হয়ত হবে। উৎসব এক সর্বজনীনতা। ওই আলোকে যতদূর নিয়ে যাওয়া যায় আর কি!

এবং আর একটি শরৎ এসে পড়ার পর, দল বেঁধে কাছে দূরে বেরিয়ে পড়া? নীল আকাশে ভাসমান সাদা মেঘ দেখা? কাশের সামনে সজ্জিত মুখ ও মুখোশের পর পর খচাং খচাং সেল্ফি?

না'কি তেমন সর্বশক্তিমান কে আহবান করা, যে সর্বজন মঙ্গলের কথা ভাববে! বহুজন হিতায় বহুজন সুখায়...

আপাতত দুর্গার প্রাণ প্রতিষ্ঠার অপেক্ষা, আর ঐহিক অনলাইন উৎসব সংখ্যার আত্মপ্রকাশ...

সকলকে উৎসবের শুভেচ্ছা।

হে পাঠক আলো হয়ে উঠুন, অনেক মন্দের মাঝেও ভালো থাকার অভ্যাসটা ছাড়বেন না প্লিজ। ও ছাড়া এই তৃতীয় বিশ্বে আর কিছুই করার থাকে না আসলেই।