আমাদের আত্মীয়-স্বজন

সুব্রত সরকার ও তমাল রায়



ভূমিকা

যদি বলি খোলা চুলে বই পড়তে এসো না,
তোমাকে একলা পেয়ে আমার মনে কু-ডাকে-
তুমি ঠিক বুঝবে না, লাইব্রেরি-রুমে
কম-পাওয়ারের আলোয় কি হবে আমার মনে?
কোনো কীটনাশকের সাধ্য নেই আমাকে শাসনে রাখে
তোমার হাতের ঘাম যদি লেগে যায়, আমি বই
হয়ে কী করব, শরীরের ডাকে সাড়া দিতে হলে?

আজ আর কিছু বলব না, শুধু রিকশায়
যেতে যেতে হাওয়ায় পাতা উলটে বলতাম: ফিসফাস
তোমার শাড়ির স্পর্শ আমি বুঝেছি যেমন-
এইখানে লেখা আছে, বই হয়ে এসেছি এখন।



অবন্তীপুরের অনিবার্যতার এক ইতিহাস আছে,আজ যাকে ভুগোল বলে চিনছে সবাই,এটাই সত্য নয়। এই যে ছাই ঢাকা পথ ঘাট,কোথাও কোনো শব্দ নেই,এমনটা কিন্তু ছিল না। পথ ঘাট ছিল সুন্দর,মসৃণ। রাস্তার দুধারে কিছু দূর অন্তর আম জাম জারুল। পাশ দিয়ে নদী বয়ে গেছিল। কানা নদী। এটাই প্রথম পাপ। নদী বা নারী যাই বল,সে'তো ঈশ্বর নির্মিত। তাকে এত কুৎসিত নামে ডাকাও যায়! বাপ জ্যেঠারা বলার চেষ্টা করেছিল,এ হল ভ্যালোবাসার ডাক। নদী অবশ্য তা বলে মন বদলায়নি। জল আসতো,যেত। যেমন হয় আর কী!ভালোবাসাও এত পাপ সর্বস্ব কেন,কে জানে! দ্বিতীয় পাপ মুর্তিমানের মত দাঁড়িয়ে ছিল ঘোষবাগানের মোড়ে। ঘড়ি মোড় বলত সবাই। চাটুজ্জেদের জমিদারী ছিল এই অবন্তীপুর। তাদেরই শৌখিন মেজবাবু না'কি ১৪৩ বছর আগে লাগিয়েছিল এই ঘড়ি। অবন্তীপুরের যা কিছু শুভ কাজ,সব ওই ঘড়ি দেখেই… ও ঘড়ি শুভ। এই যেমন বাবার জন্ম রাত ৯টা ৪৩ এ। শ্রাবণ মাসের শুক্ল পক্ষে,বুধবার তিনি জন্মেছিলেন। ওই ঘড়ি দেখেই সময় নির্ধারণ! তো,সে ঘড়ি কোন অজানা কারণে বন্ধ হয়ে পড়ে রইল,১২.০১হয়ে! পাপ নয়? শাস্ত্রে বলে বন্ধ ঘড়ি দৃষ্টি পথে রাখতে নেই! তবু রোদ আসতো,ছায়ার সাথে খেলা করত,মেঘ ঘনাতো, অসময়ে বৃষ্টি এলে ছাদে নেচে উঠতো বাবলি। অবাক চোখে সে দিকে তাকালে চোখে কেমন জল এসে যেত। বাবলিকে সে জল দেখাতে গিয়েই তৃতীয় পাপ,খপাত করে চুমু খেয়ে ফেলি,বাবলির মুখ প্রথমে লাল,পরে কালো...এক দৌড়ে চলে গেছিল নীচে,অনেক ডাকাডাকিতেও সে পাপের স্খালন হয়নি। চতুর্থ পাপের ও সেই শুরু। জেলা লাইব্রেরীর একটা শাখা ছিল অবন্তীপুরে,সেখানেই উলটে পালটে পড়ছিলাম লা নুই বেঙ্গলি । মংপুতে রবীব্দ্রনাথ পড়ার পর ন হন্যতে,শেষে এই বই। মির্চা এলিয়ট মৈত্রেয়ীর শরীরের যে বর্ণনা লিখেছিল,তা পড়তে পড়তে কেবল বাবলির কথা মনে হওয়া...আর তখনই ঘটল চতুর্থটি। আগুন লাগলো লাইব্রেরি ঘরে। পুরুষ মাত্রই পলায়নপর। পালালাম। কিন্তু লাইব্রেরী বাঁচলো না। একটা লাইব্রেরি মানে কত শতাব্দীর জ্ঞানের আখর। পালালাম অবন্তীপুর ছেড়েই। আর যাইনি। পরে বহু পরে,দেশে ফিরে অবন্তীপুর আর খুঁজেই পাইনি। ছাই হয়ে গেছিল আমাদের অবন্তীপুর। নানা ছোট বড় খুচরো ভারী পাপ,আর পাপের ফসল এই ছাই হয়ে যাওয়া,যাকে বড় হওয়ার ভূমিকা বলেই লিখেছিলাম নিজের ডায়েরীতে।



বিরাটি রেললাইনের প্রকৃতি

বিরাটি রেললাইনের ধারে প্রকৃতি ও কয়েকটি জবাকুসুম মেয়ে হাস্যে, কৌতুকে, নিজেদের জ্যোৎস্নার জলে রান্না খাওয়া, দুঃখের কালি পরিস্কার করে দিন কাটাত। সেখানে ট্রেনের আলো পড়ে মাটি থেকে আধহাত ঘাস ও পোকামাকড়ের জন্ম হয়।

মানুষের মস্তিস্ক অনেক কিছু চিন্তা করে, ভুল করে, ভুল সংশোধন করে নিতে চায়। পৃথিবীরও বহু উদ্ভট কল্পনা, কু-ইচ্ছা, সর্প-দর্শন প্রভৃতি হয়ে থাকে। যেমন -

আমি যশের কুকুর হয়ে তৃণপ্রান্তরে কি যেন খুঁজে বেড়াই।
এপাড়ার সকলে জানে ভোরবেলা আকাশের উত্তর-পশ্চিম কোণে
যে পাঙাশ রঙের তারাটিকে দেখা যায় দৌড়ে পিছিয়ে পড়ছে -
সে আমি, আমার ছন্দ না-হওয়া কবিতা।

ওই মেয়েগুলির স্তন কেন জলাশয়ের মতো দীর্ঘ হয়ে উঠেছিল?
বুদ্‌বুদ রহস্যময়, জগতের কিনার ঘেঁষে ভেসে থাকা এই কুয়াশা
লোকালয়ের কাছে এর কি মুল্য?


ট্রেন এক প্রকৃত ম্যাজিক,যাদু বিন্যস্ত এ পৃথিবীতে ট্রেন,তার লাইন,আর যাত্রাপথের অগণিত দৃশ্যের আসা যাওয়া আর মিলিয়ে যাওয়া সিটি বাজাতে বাজাতে,একে তুমি যাদু বলবে না'তো কি? অবন্তীপুর ছেড়ে এসে যে মফস্বল শহরে বসবাস শুরু করি,তা মূলত এক রেল শহর। যেদিকেই যাই ওই লাইন পেরোতেই হত। লাইনের ধার ঘেঁষে হরেক রকম গাছ,গাছেদের প্রাণ আছে নিশ্চিত,নইলে প্রতিটি ট্রেন যাওয়ার যে কম্পন,তাকে সহ্য করেও তো হাসি মুখেই দাঁড়িয়ে থাকত,ফুল দিতো,ফল। পাখি আসতো। সাথে কবিতা। কবিতার বাড়ি ছিল লাইনের ধারে কাছেই। একে ঘর পালানো,তায় পাপী,রুট খুঁজতে যাইনি। যাওয়া উচিৎ ও না,সব সময়! বাবা চোখে তেমন দেখে না। মা’র স্মৃতিনাশ হতে শুরু হয়েছে,বিপর্যয় যত রকম সম্ভব ঘিরে ধরছিলো ক্রমশ! তার মধ্যে ওই এক স্টেশন,আর দুপুর পেরোলেই আসা কবিতা!

এইবার পঞ্চম পাপের অনুপ্রবেশ ঘটলো,যার দায় নিজে নিলে নেওয়া যায়,আসলে তেমন ঠিক নিজের নয় ও। বয়সের তো ধর্ম আছে। সে চোখ কান সজাগ রেখেই সব দেখে। কেন জানি মনে হত,এই ট্রেন গেলে যে কম্পন,তার সাথে যৌনতার কেমন এক সম্পর্ক আছে। প্যান্টের নীচে চাপ বাড়ত অজান্তেই! তখন একটু আধটু নুন শো'এ মালয়ালাম ছবি দেখছি। লাইন ধরে একটু এগোলেই বোসেদের পুকুর,সেখানে অসামান্য মেয়েরা বুকে সায়া বেঁধে জলে ডুব দেয়,সায়া শালুকের মত ফুলে পাপড়ি ছড়িয়ে থাকে,চোখের দোষ আর কী! দেখার জিনিশ দেখেই,স্তনের আভাস,গায়ে জলের বিন্দু,নুন শো'কেও হার মানায়! তো এমন এক রাতে দেখে ফেললাম,স্টেশনের বাথরুমের পাশে যে গুমটি,সেখানেই চা বিক্রেতা পল্টু পাগলি আরমানির শরীরের ওপর,গায়ে সূতোও নেই! কেন ওর নাম আরমানি,তা জানিনা! ও কী আর্মেনিয়াম বংশোদ্ভূত? কেমন এক শিহরণ! সারা শরীর কাঁপছে,কু চিন্তাগুলো মাথায় ক্রমশ ঢুকে পড়ছে! আর সে রাতেই ঘটলো ঘটনাটা! ওই যে বলছিলাম মা'র স্মৃতিনাশের কথা! মা বাবাকে গুন্ডা ধর্ষক ভেবে,প্রথমে চিৎকার,ঠেলে দিলো দুম করে,বাবার হার্ট এটাক। একদিক পড়ে গেল! উফফ! কেব যে এসব দেখতে গেলাম! চিকিৎসা শুরু হল। বাবার খুব দ্রুত উন্নতিও হচ্ছিলো। ঠিক এ সময়েই ষষ্ঠ পাপের অনুপ্রবেশ! তেমন কিছুই না,আসলে! বয়স বাড়ার সাথে সাথেই আপন বোধ জাগ্রত হয়,বাবা'ই বা কে,মা'ই বা কে! আমি রাতে বাসায় ফিরে পদ্য লেখার শুরু করি,হয় না। পারিনা ঠিক। ছন্দে আমি বরাবরই কাঁচা! তবু চেষ্টা...সারা দিন কবিতার সাথে ঘুরি টই টই। হবে না'ই বা কেন! কবিতাকে নিয়ে গেছিলাম চেতনা হলে নুন শো দেখাতে! সিনেমা হলের নাম চেতনা! চলে মালয়ালাম ব্লো হট সিনেমা। সেখানে যা হয় আর কী! এদিক ওদিক তাকিয়ে হাত ঢুকিয়ে দিলাম কবিতার বুকে। এই প্রথম ছ্যাঁকা লাগলো স্পর্শে। শরীর দুলছে। হল তো আর হল নয় ট্রেন। কবিতার কী হল জানিনা,সে সপাট চড় কষালো গালে। বেরিয়ে গেল হল থেকে,পেছনে আমি দৌড়চ্ছি,অন্ধ আমি,যৌনতা তাড়িত মানুষ! তা বলে কাউকে ব্যথা দেব,ভাবিনি। রাতে যে পদ্য লিখতে চেষ্টা করি,অল্প হলেও তো কবি মন! ষষ্ঠ ঘটনাটা সে রাতেই ঘটে। মা'র কি করে যেন স্মৃতি ফিরে আসে। আর বাবার এই দুর্ঘটনার জন্য নিজেকে অপরাধী ঘোষণা করে সোজা রেল স্টেশন। আমরা তখন ঘুমে কাতর! কর্ড লাইনের কিছু থ্রু ট্রেন বেশি রাতে এদিক দিয়েই যায়! মা'র ট্রেন হবার সাধ ছিলো খুউব। তো লাইনে নেমে মা চলতে শুরু করল সোজা উত্তর দিক বরাবর! উত্তরের আকাশে তখন দু একটা তারা,বড়টা অস্পষ্ট বাবা,আকারে ছোট উজ্জ্বল না'কি আমি। দুজনেই না'কি মা'কে হাত নেড়ে ডাকছিলো। মা খুব দ্রুত অনিশ্চয়তা সঙ্গী করে হেঁটে চলছিলো,চারপাশ শান্ত,দক্ষিণ দিক থেকে আসছিলো থ্রু ট্রেনটা। মা'র খুব পছন্দ ছিলো ট্রেন,আর রেল লাইন,হয়ত গতি আর দুলুনির কথা ভেবেই। দুজনে মুখোমুখি হল। আর তারপর একটা সাডেন জার্ক,মা'ও ট্রেন হয়ে গেল,যেভাবে আত্মস্থ হয় মানুষ আর প্রকৃতি,যেভাবে সাদা কাগজ আর কবি! পরদিন রেলের সাফাই কর্মীরা লাইন পরিস্কারের পর দেখেছিলাম লাইন জুড়ে নীল জারুল পড়ে আছে। আমি বাবাকে নিয়ে আর বিলম্ব না করে বেরিয়ে পড়ি,পরবর্তী গন্তব্যের উদ্দেশ্যে! ধীরে ধীরে পুরো মফস্বল শহরটাই না'কি ট্রেন হয়ে উঠে কোথায় হারিয়ে যায় একদিন...



আমাদের আত্মীয়-স্বজন

বিকালে বাসায় ফেরার পথে বৃত্তাকার পাখিরা দেখতে পায়
মনে প্রচণ্ড ব্যথা- লাল হয়ে ফুলে আছে।
জীবন যত উঁচুই হোক নিরেট সময়খণ্ডে ধাক্কা খেয়ে
ফিরে আসতে হয়।
কিচিরমিচির শব্দে হাতুড়ি ঠোকার মতো জগৎ প্রাচীরের গায়ে
তারা অসংখ্য কারুকার্য করে। স্তব্ধতা
সিল্কের অঙ্গাবরণের ন্যায় শরীর থেকে পিছলে পড়ে গেলে
পৃথিবীর অন্তত একটি স্তন দেখা যেত বলে তাদের বিশ্বাস।
পাখিদের প্রাণ হয়তো ক্ষুদ্র, মন খুব ছোটো নয়,
বিরাট বিরাট মানুষের তুলনায় তারা যা করে
খালি চোখে তার পরিমাপ করা সম্ভব নয়।
তাহলে তারা কী করে?
শীতের উগ্র আবহাওয়ার মধ্যে একটু কম্বুকণ্ঠে ডেকে ওঠা
পোড়া মেঘের নিচ দিয়ে অকুতোভয়ে উড়ে যাওয়া, ব্যাস...
মানুষকে সত্য, সঙ্ঘবদ্ধ, ন্যায়ের পৃথিবী খুঁজে দেওয়ার সাধ্য
তাদের নেই, ছোট্ট মাথায় অত বড়ো বাক্যের মানে ঢুকতে চায় না।
শুধু কম্পন, স্নেহ, ত্রাসের পূর্বমুহূর্তেও তারা
চক্ষুষ্মানের মতো খুঁজে বেড়ায়
একটুকরো আনন্দস্বরূপিনী ফল।
আমাদের এইরকম কিছু আত্মীয়-স্বজন আছে বলে- বলি
তেতে উঠলেও টের পাই না, পৃথিবী কেঁপে উঠলে অপেক্ষা করি,
আগুন তার শক্তিকে দমন করে দেখা দেয়।


পরিযায়ী জীবন। কোথা দিয়ে সময় আসে,আর যায় বুঝতে গেলে আকাশের দিকে তাকাই,সময়কে ফ্রিজ করে দিয়ে জীবন কে দ্রুত ধাবমান করে দিলে কেবল সারি সারি পিঁপড়ে চলে যায় দ্রুত,ঠিক তেমনই মেঘ সরে যাচ্ছে। এবারের শহরটা নির্জন। তেমন লোকজন দেখা যায় না! মাথার ওপর এক বিষাদের আস্তরণ। প্রাজ্ঞজন বলে,তা না'কি দূষণ! পাপে ভরে গেছে পৃথিবী! এই নির্জন শহরে আর কিছু না থাক,অনেক পাখির আনাগোনা। কাছেই না'কি অরণ্য ছিল। শিল্প হবার নামে কেটে ফেলার পরই পাখিরা এদিক ওদিক। কাছেই এই শহর,সেখানেই পাখিদের ভীড়। পাখিজন্মের যেমন অকিঞ্চিৎকর মোহ সন্নিবেশ! ঘুম আসা আর জেগে থাকার ফাঁকে আমি পাখি চিনতে শিখেছি। তাদের বসা,একটু একটু করে লাফিয়ে হাঁটা,তারপর উড়ে যাবার আগে একটু সুচিত্রা সেনের মত ঘাড় বেঁকিয়ে দেখে নেওয়া আশপাশ,আর উড়ে যাওয়া। অদ্ভুত হলেও সত্যি! তাদের পায়ের ছাপ তেমন পড়ে না কোথাওই। চাকরি জুটিয়েছি একটা। বস শুধু বস নন। দার্শনিক ও। তিনিই বললেন যার ওজন বেশি তার ছাপ তত বেশি। যেমন রামকৃষ্ণ বা বুদ্ধ। বুঝলাম শরীরের নয় মনের ওজনের কথাই বলেন! মম তো মন। তবু তাকেও না’কি ট্রেন করা যায়! ফলে যেদিকে ইচ্ছে পাঁকাল মাছের মত পালিয়ে যেতে চাইলেও তাকে ধরে রাখা যায়! অভ্যেস শুরু করলাম পাখিদের দেখেই। যে পাখিটা সকালে ঘুম ভাঙায়,জানলার কাঁচে ধাক্কা মেরে,ভেবেছিলাম সে কাঁচে নিজের প্রতিচ্ছবি দেখে ঠোক্কর মারে। বস বললেন না,ওই পাখিটা ঈশ্বর প্রেরিত। তার আমাকে জাগ্রত করাই কাজ! বুঝলাম। পাখির যদি জাগ্রত করাই কাজ হয়,আমার ও তাই! বসের বাড়িতে নেমন্তন্ন খেতে গিয়ে আলাপ হল তার কন্যার সাথে। নাম পাখি। তারপর যা হয় ওড়াউড়ি,কুটো মুখে করে আনা। বুড়ো বাপ,সেও তখন পাখিই। ঠুকরে খায়। জল খায় না। কেবল এদিক ওদিক চায়,উড়েও যায়! সেদিন বললো তিনি তখন ইজিপ্সিয়ান সভ্যতায় পৌঁছেছেন,নীচে নীল নদ। এদিক ওদিক পিরামিড! সেনিলিটি হয়ত। এই এলো সপ্তম পাপ। পাখি জন্ম মানুষের থেকে অনেক আলাদা। অবিশ্বাসের সেখানে কোনো ঠাঁই নেই। সে রাত ভোর হতে দেখলাম বাবা উপুড় হয়ে পড়ে। প্রাণ পাখি উড়ে গেছে কোথায়! যেভাবে পাখি পড়ে থাকে ভবলীলা সাঙ্গ হলে,সেভাবেই পড়ে বাবা। পাখিদের কাঁদতে নেই। আমি কাঁদিনি। বস এসেছিলেন। সাথে কন্যা পাখিও। বস চলে গেলেন। পাখি আমায় ঠোঁটে করে খাবার খাইয়ে দিলো। ঠোঁট থেকে ঠোঁটে তখন তরঙ্গ প্রবাহমান। ডানা ঝাপ্টাচ্ছিলাম। সেও। তারপর যা হয়,বাবার মৃতদেহকে সামনে রেখেই,আমার নীচে পাখি। খুব ডানা ঝাপ্টাচ্ছে। তারপর যা হয় আর কি! ক্লান্ত পাখি শরীর নিয়ে আমরা শেষকৃত্য করলাম বাবার। পাখি আসে যায়,সেভাবেই আমায় জাগিয়ে তোলে,ভোরের সেই পাখিটা যেমন করত। পুরনো মিশরেই আমরা ঘুরি ফিরি। নীলনদে জল বাড়ে। শহর ভাসে। আমরা পিরামিডে আশ্রয় নিই। তুতেনখামেন নীরবতা ভেঙে বলে ওঠে এবার বসের কাছে কথাটা পাড়ো। এইবার এলো অষ্টম পাপ! পাখির পেটে তখন আমার সন্তান! বস প্রথমে প্রস্তাব নাকচ করে দেয়। পরে রাজি হন। পাপ তো আর পিছু ছাড়ে না। পাখির তখন চার মাস প্রায়,পড়ে গেল বাথরুমে। ব্যস! রক্তপাত প্রবল! আর না,কিচ্ছু করা গেল না। কেবল শ্মশানে আমার দিকে সোজা চোখে তাকিয়ে ছিলেন বস। আগুন। দেখছিলাম আমি। আমার চোখে কিন্তু জল। আগুন আর জলের সম্পর্ক খুব অদ্ভুত। মানুষ আরও অদ্ভুত। চাইলেই তো আর পাখি হওয়া যায় না! তাই জলকেও সহ্য করে আগুন,যেমন আগুন কে জল। এ সবই হয় বিস্তৃত সময় খণ্ডের কথা ভেবেই,ওই যে জীবন,নীলনদে তখন ভাসাচ্ছে শহর,আমি দুঃখ বলে উড়তে শুরু করি ভিন দেশ,অন্য সভ্যতার উদ্দেশ্যে...

মিলনপল্লী প্রাইমারি স্কুল

তুই তো লবঙ্গফুল, হাতে গড়া রুটি, মাংসের
সুরুয়া, ডালমাখা, তোর জামার হাতায় কিছু কলঙ্ক
লেগে থাকল চিরকালের জন্য, এদিকে অর্ধদগ্ধ
বঁধুটিও ফিরে আসে পাড়ায়, ও বউ হরিধ্বনি দে, তবু বলছিস
গ্রীষ্ম-দুপুরের রোদ হল দৃষ্টি-করোজ্জ্বল, কোনো
বিভ্রম হয় নি, যা দেখেছিলি
সত্যিই ভাসুরের সঙ্গে, কেবল এখন ব্যথা করছে
গলায়, শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে খুব, মেঘ-চূর্ণের ভিতর নিমেষে
আত্মধিক্কার, কড়িকাঠ থেকে পা-দুটি শূন্যে
দুলছে, ও ছায়া এবার কৃষ্ণনাম করো, বালির উপর অন্ধকার
পড়ে যেন কঙ্কাল বলে মনে হবে, এ পাড়ায় কি তবে
কুকুরেরাও ডাকে না, এখন রুক্ষ
মুখে একটা পান খাও, আমার আবার হুইস্কি
সেবনের সময় মনে ভাব আসে, কতদিন
অলকানন্দার পাড় ধরে হেঁটে চলে যাই দেবপ্রয়াগ অবধি, বলছি তো
খালি একবার হাত দেব, কবিতা আমার আঙুল থেকে খুলে
গেছে, এরপর রিক্সায় উঠে কেবল বলতে হবে-
মিলনপল্লী প্রাইমারি স্কুল।


পাপ এক অবস্থান। যা আপেক্ষিকতার শর্ত মেনেই পরিবর্তিত। তবু নবম পাপে পৌঁছই নতুন শহরে পৌঁছেই। পাপের প্রকৃতই কোনো দোসর থাকেনা। কেবল আত্মায় দাগ রেখে যায়! তবু সে আসে,অবচেতনের জ্যোৎস্না বেয়েই। তার দুটি ফুটফুটে সন্তান। স্বামীটি সহকর্মী আমার। তবু আমরা প্রথম মিলিত হই নদীর ধারে। দ্বিতীয় মিলন রেলস্টেশনের রেস্টরুমে,তৃতীয় মৃতদেহ পাশে রেখে এক শ্মশানে। এ পৃথিবী পুণ্যি পুকুর কি'না জানিনা,তবু পাপ স্বধর্মেই প্রকাশিত হয়। সেদিন বাইরে সারাদিন বৃষ্টি,ঘুম থেকে উঠেই খবরটা পাই। পা দুটো ভাসছিলো অনন্ত শূন্যে। বাইরে এলোমেলো বাতাস। আশপাশে খই উড়ছে,ছোট বাচ্চাদুটি মা'কে বার বার ঠেলছে,যদি জেগে ওঠে। যে ঠোঁটে চুম্বন এঁকেছিলাম তা এখন নীল,জিভটা বেরিয়ে রয়েছে,মুখে বড় অস্বস্তির চিহ্ন আঁকা। অথচ কেউ বিশ্বাস করবে না,ভালোইবেসেছিলাম তাকে। বল,ভালোবাসা পাপ?

নীল ঠোঁটের ওপর দিয়েই হাঁটতে হাঁটতে,আপাতত দেবপ্রয়াগ। বিষ,বিষাদ থেকে যেভাবে অমৃত... সামনে আরো বিচিত্র পথ,তবু ধুনি জ্বেলে প্রাণ ঈশ্বর নামক জিজ্ঞাসার সমাধানে এই অলকানন্দার পাশেই। গুহার মধ্যে বসে,গুরুজী বলছিলেন এ জীবন আসলে শামুক জন্ম। উত্তর না করেই শুনছিলাম। প্রেম বল বা যৌনতা বা এই সংসার আদতেই খোলসে জীবন,মিমিক্রি। প্রতারণা আর প্রতারণাময় অস্তিত্ব! সামনের কাঠের আগুনে চাল ফুটছে,গুরুজি হাতে তুলে বলছেন সিদ্ধতার কথা,নম্র হবার কথা। রাত অনেক,তবু কি এক অনির্বচনীয় আলো ফুটে আছে।

পাহাড়ে ভোর আসে আগেই। আর সামান্য সময় পরই সুর্যদেব দেখা দেবেন। পরম,অগ্নিতে শুদ্ধ হবে ধরা। আর পাখিরা বেরিয়ে পড়বে। এ জীবন শামুক জীবন,তবু কখনো তো খোলশ মুক্তিও আসে,তখন এই সব বর্হিআবরণ,খেলাধুলা মিথ্যে হয়ে যায়,এ জীবন যা পাখি জন্মই আসলে,তা এক অন্য গন্তব্যে উড়ে চলে।

গুহার বাইরে যে পাহাড়ের খাঁজ,আসলে স্তন,তা কি অপরূপ। স্তনের ওপর পা রাখলাম। হাত পাশে মেললাম। খোলশ ছেড়ে ডানা মেললাম অনন্তে,পাখি জন্ম,আহ! শান্তি! মনের আরাম। আত্মার শুদ্ধি। অনন্ত থেকেই হয়ত আবার অবন্তীপুরের পথে এ যাত্রা আদতে এক অসমাপ্ত খোলশমুক্তি পুরাণ...