আর দেখা হবে না

ঈশানী বসাক অভিষেক চক্রবর্তী

কাগজ
বহুবছর আগে দেখেছিলাম তোমাকে। আজ আবার যখন দেখা হলো তখন মনে হচ্ছিল পুরনো ভারতবর্ষ পত্রিকা। পুরনো বইয়ের গন্ধও ভেসে আসছিলো। ভেঙ্গে যাওয়া তানপুরার সাথে সম্পর্ক চুকিয়ে এসেছো জানি। গান ছেড়ে দিলে বুঝি? কেন ? বিষ ভেবে নীল রঙ গিলে নিচ্ছি প্রতিদিন আকাশ থেকে। সেখানে না হয় দু লাইন সুখ দুঃখের এঁটোকাঁটা কোড়ালাম। এক থালায় খেলে ভালবাসা বাড়ার কথা বলে। আর তুমি সেসব তোয়াক্কা না করে গান ছেড়ে চলে এলে! সন্ধ্যা নামার শব্দ শুনতে পাও না বলেই হয়তো। আমি তো তোমাকে জোর করতে পারিনা। শুধু যখনই দেখি পা গড়িয়ে রক্ত পড়ছে পাগলের মতো কথা বলতে চাইতাম। তুমি ভয় পেতে। রাস্তা ছেড়ে ঘাসের মধ্যে দিয়ে পালাতে। যদি লোকসমক্ষে ওসব নগরের বয়ঃসন্ধি ধরা পড়ে। একটা একটা করে সাফ হয়ে যাওয়া গাছগুলো পাচার করে দিতে দিতে তাকাতে। কখন যে আমিও ওই বোবা গাছ হয়ে গেছিলাম । তুমি একটা ক্রিসমাস ট্রির মতো আমাকে একটু মুখে জল দেওয়ার নিয়মকানুন দেখাশোনা করে নিতে। বিশ্বাস করো ওসবে রাগ করিনি। ঘরের কোণে হলুদ পাতা মেলে তাকিয়ে থাকতাম। আমার আঙুলগুলো থেকে আঁকড়ে ধরা হারিয়ে গেছে বলে এখন আর কাগজ ব্যবহার করিনা। রক্ত থামাতে পারতাম না আর তুমি বলতে দেখিস চারার জন্ম এলেই গানগুলো হারাবে। তুমি গান ছেড়ে দিতেই বুঝলাম চারাটা জন্মেই মরে গেছে। ঈশানী বসাক

নিয়ন্ত্রণ
বহুবার দেখেছি চোখের কাছে ছোট হয়ে যায় নিয়ন্ত্রণ। বারবার দেখে ফেলি তোমাকে। অথচ তুমি ভেবে নাও ভেসে আসা জল শুধুই পথ ভোলানোর অজুহাত। তাই না এগিয়ে ধীরে ধীরে একটা চারাগাছ হয়ে যাই। নিজের শরীরটাকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিতে দিতে ভাবি পুড়ে যেতে আগুনের প্রয়োজন হয় না। অ এর সুখ কে চিরকাল অভিনয় ভেবে মুখ ঘুরিয়েছে যারা তারা কোনোদিন জানতে পারেনি আঁচড় আর কালশিটে সবথেকে বেশি মায়ের মত হয়। আমি চারাগাছ হয়ে যেতেই দেখি এসব অভিযোগ কেমন অবলীলায় মিশিয়ে চলে যাচ্ছি আবার জলের গভীরে। পাথর বেঁধে ডুবে যেতে যেতে ফুসফুস ফেটে গেলে বুঝি এ সমস্ত শুধুই মন ভোলানো বায়না। অনেকটা মাটি জুড়ে আমার শরীরটাকে পুঁতে ফেলতে ফেলতে বুঝতে পারছি রক্তের থেকে ভাল সার হয় না। বেড়ে উঠছি শুধুই চুপ করে। আসলে গাছেদের জোরে কথা বলা মানায় না, ঝড়ে পড়ে যাওয়া তার থেকে স্বাভাবিক।

মৃতের আদর
উন্মাদ ঘরে ফিরে আসলে তাকে স্নান করাচ্ছে আঁধার। সৃষ্টি আর ধ্বংস জুড়ে ছড়িয়ে থাকা শ্মশান। সেখানে যে মৃতরা উঠে বসে তাদের না আছে ফেলে আসা না চলে যাওয়া। গাঁজার পরতে পরতে যে মোলায়েম মায়া তাকে নিয়ে আগুন খুশি নয়। ঝলসে যাচ্ছে যে দেহ তার ও ভালবাসা চাই। তাকে পরিবার ভেবে নিজেকে খানিক পুড়িয়ে নিতে পারছে ডোমেরা। ফলপাকুড়ের মাঝে শরীর জন্মাচ্ছে আর শিকারীর নিমীলিত ধূর্ততায় মেয়েটির অনুনয় ঝরে বিল্বপত্রে। মিশে যেতে থাকে দারচিনি আর এলাচের গন্ধের ন্যায় ঝাঁঝালো কামনা। আমাকে উচ্ছৃঙ্খল করে দাও পাগল। যাতে সমস্ত নদীকে এক দলা সন্তান ভেবে পালন করতে পারি। তোমাকে হিংসা করি উন্মাদ, তোমার থেকে কেড়ে নিতে চাই ওই বিষকন্ঠ। সলজ্জ অন্ধকার জুড়ে মন্ত্র পাঠ চলছে। নেশা একটা উপাসনা যাকে প্রহরে লালন করছি। অশান্ত সুখ বিষাদের মতোই বড় ব্যক্তিগত।
............................................................ ......

কাগজ ওলা
পুরোনো দড়ি বেয়ে নিংড়ে নামছে ঘামের নুন ।একমাত্র এই দড়ি জানে কতটা মায়ায় মানুষটা যখন তখন টান আর ঢিল দেয়। ওর মাপের বাটখারা গুলো আসলে জানে কালোদের বাদামী জার্নির গল্প। বাড়ির পুরনো গল্প, খবরের পাশাপাশি কত যে খাতায় জমা আঁচড়ের দাগ নগদে কিনে বয়ে নিয়ে যাচ্ছে সে তা ভাবে বাড়ি। বাড়ির যদি পা থাকত, বাড়ি হয়তো হেঁটে যেত ওর বস্তার পাশাপাশি। দেখে আসত, কাগজওলা কোথায় নিয়ে যায় সব স্মৃতি দের। কাগজওলা তার বেঁকে আসা ঘাড় আদৌ কি কখনও সোজা করে! ওর কি কখনও দেখতে ইচ্ছে হয় আকাশ, তারা, নীল রঙ টা ! গাছেদের কাছে প্রশ্ন করে বাড়ি। ঘুলঘুলির চড়ুই এর কাছে প্রশ্ন করে বাড়ি। বাড়ি জানে, ফেরির চিৎকার আর ওজন ও দাম বলা বাদে আর কোন কথা কেউ ঐ মানুষটার কাছে শোনেনি। উদাসীন কাগজওলা বয়ে নিয়ে যায় এ শহরের মৃত সব প্রেমের আঁকিবুকি, তার বস্তার রঙ চলে যাওয়া বসন্তের মত ফ্যাকাশে কালো

ব্যাকুল
গাছেদের কাছ থেকে সরে যাওয়া মানুষের কাছে গাছ এক নিয়ত সংযম। তারা ভাবে, গাছ এক অভিমানী আত্মা, যার পায়ের পাতা বেয়ে ভেসে যায় অনাহূত চোখের জল। সিউড়ির এক ফকির এক মাঝরাতে সপ্তমী মগ্ন আবেশে আমায় গাছ চ্রনাচ্ছিলেন। বলেছিলেন, “ দেখ পাগল, রাত্তিরে সব গাছ কেমন এক হয়ে যায়। গাছেদের রাজ্যে তাই এঁটো -কাঁটা বলে কিছু নেই “।সেদিন বুঝেছিলাম, গাছ আসলে মগ্ন এক প্রেমিক কবি, যে প্রতিটি আবেশে মানুষের বুকে পৌঁছে দিচ্ছে উষ্ণতা। কিছু কিছু মানুষ বুঝে ফেলে সেই নিষ্কাম প্রেমের গন্ধ, আর তারা ব্যাকুল হয়ে যায়। এদের কারুর নাম হয় কবীর, কারো নাম তুকারাম, কারো জয়দেব। তাই বাউলের পরমারাধ্য প্রকৃতি।

নীলকন্ঠ
মৃতদের দেহের ওম মেখে যে লোকটা একা বসে আছে শ্মশানে, সে আসলে দেখতে চেয়েছিল পরমাপ্রকৃতি জীবনের রূপ। অথচ মুন্ডমালা প্রিয় মেয়েটা ভালবেসে তার বুকে তুলে দিল পা। আর সেই রাতে অখণ্ড আকাশ জুড়ে বেজেছিল ডমরু। নেমেছিল অঝোরে বৃষ্টি। লোকটার সারা গায়ে মাখা ছাই ধুয়ে বেরিয়ে আসছিল তার অনন্ত চামড়ার বর্ণ। লোকটা বারবার ডাকতে চাইছিল প্রেয়সীকে, কিন্তু পেরে ওঠেনি। মনকেমন করছিল হয়তো। হয়তো হারাতে চায়নি এটুকু সান্নিধ্যের লোভ। তাই চুপিচুপি ডেকে নিয়েছিল নীল রঙা নদীকে। পরম আদরে গলায় মেখেছিল তার জল। সেই শেষ, তারপর আর কেউ কখনও মানুষটাকে কথা বলতে শোনেনি। যারা শ্মশানে আসত, দূর থেকে সভয়ে দেখত নির্বাক নীল গলার মানুষটাকে। নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করত, বলত, পৃথিবীর শেষ প্রেমিক।

অযোনীসম্ভূত
সবশেষে আর কোন ছবি থাকে না। থাকে এক অদ্ভুত অন্ধকার, মৃত্যুর মত গভীর, নিঃস্পন্দ। কোন গতি নেই, ছন্দ নেই, মায়া নেই, শুধু এক অতিন্দ্রিয় তমসা। যার মাঝে পায়চারি করে বোবা পাথরের মত নির্বিকার এক অস্তিত্ব। আদিম সে, অনন্ত ও সে। প্রেমহীন এই অঘোরী উপাসক কে আমরা সময় নামে চিনি ।যে কখনও কারো অপেক্ষা করেনি তার আর কিছু থাকেনা, থাকে শুধু যাওয়া। এক অনন্ত গমন যার কোন অন্তিম নেই। এই প্রেম, মায়া, রূপ, কাম মাখা মিথ্যেদের দেখে মুচকি হাসে সে। তার সত্যি একটাই, এসবের কোন অস্তিত্ব নেই। কিছুই ছিলনা আসলে, পুরোটাই আগাগোড়া মিথ্যা। মিথ্যা র এই বিশ্বে একমাত্র অনাদি সে। তাই, সময়ের কোন জন্মদিন নেই, থাকেনা।

বিশ্ব, পৃথিবী, প্রেম
সবটাই মিথ্যে, আগাগোড়া কৌতুক বলা উজ্জয়িনীর সেই অঘোরী সন্ন্যাসীর পায়ের কাছে বসে পড়েছিলাম, মিথ্যা আর কৌতুকের এই ঔদ্ধত্য সহ্য করতে না পেরে পরাজিত সৈনিকের মত।
ঊনি পাত্তাই না দিয়ে নির্বিকার হেঁটে চলে গিয়েছিলেন চক্রতীর্থ ঘাটের দিকে

আর দেখা হয়নি

আর দেখা হবে না ...