সার্থক জনম নয়

অনুরাধা কুন্ডা ও দীপাঞ্জনা শর্মা

সার্থক জনম নয়
অনুরাধা কুন্ডা ও দীপাঞ্জনা শর্মা

সার্থক জনম নয়
সারিবদ্ধ মুণ্ডিত মস্তক
পিঁপড়ের মত চলে যাচ্ছে
ভেঙে পড়ার সেতুর ধ্বংসস্তূপের
ঠিক মাঝখান দিয়ে।
মুণ্ডিত শির বৃক্ষেরা
কবন্ধের সুরে গাইছে
এবার এখানে অ্যাসিড বর্ষণ হবে।
আকাশ থেকে ঝড়ে পড়বে লোভ আর হিংসা,
পা-এর নিচে বৈভবের স্রোত,
দুহাতে কুড়িয়ো নিচ্ছো পোড়া কাঠ,
হেঁটমুণ্ড উর্দ্ধপদ ভয়ে কাঁপছে,
জন্ম নেবার কোনো কারণ পাচ্ছে না সে
পিশাচ নাচের ছন্দে ঝাঁপতাল,
বিষণ্ণ ত্রিতালে বদ্ধ সুর
পথ হারিয়ে ফেলছে আর ঘুরছে
ঘুরতে ঘুরতে পাক, উর্দ্ধমুখী স্বর
আর নিঃস্বরে মথিত তরবারি
মেখে রেখেছে তোমার ক্রোধ।

প্রথম গল্পঃ সেতু
আগে সকালে চা খেতো না ঐশী। সকালে কেন, দিনের কোনো সময়েই চা খাওয়ার ইচ্ছে হত না তার। অভ্যাসটা ছোটোবেলা থেকেই।এজন্য প্রথমে ভালো, ভালো যেমন শুনেছে তেমনি পরের দিকে ‘গায়ের রঙ কালো হবে না’ জাতীয় উদ্ভট ব্যঙ্গও হজম করেছে। কিন্তু মাস দুয়েক হলো ঐশী নিজে থেকেই গ্রীন টি ধরেছে। সুধন্যর আগে সকালে দুধ চা-র নেশা ছিল, দু চামচ চিনি দিয়ে, দুধ ঘন করে, পাত্রে বাদামি সর ফেলে যাওয়া পাঞ্জাবী কড়া চা। সুগার ধরা পড়ায় নিজেই গলা খাঁকরে তুলেছিল গ্রিন টি’র কথা।ঐশীও বুঝেছিল। পাত্রের জলে পাতা ঢেলে ঢাকনা দিল ঐশী। কিছুক্ষন ভিজবে। দুধের পাত্র থেকে একটা ছোটো কাপে দুধ ঢালল। অর্ধেক, কী ভেবে আরেকটু ঢালল। তারপর জল দিয়ে কাপটা ভর্তি করল।সেটা নিয়ে বাইরের স্ল্যাবের পাশে রাখা বাটিটায় ঢেলে দিল সেই তরল। পাশের বারান্দার গ্রিল থেকে চোখ উঁচু করে দেখল আকাশে মেঘ আছে কিনা। গাদা কাপড় জমেছে কাঁচার জন্য। গুমোট আছে।বৃষ্টি হবে কিনা বুঝতে না পেরে ফিরে রান্নাঘরে। চা ছেঁকে দু’কাপ নিয়ে টেবিলে বসল। সুধন্য আগেই মুখ ধুয়ে বসেছে পেপার নিয়ে। ঐশী কাপ এগিয়ে দিল। প্রায় তক্ষুনি শব্দ শোনা গেল ম্যা-অ-ও-ও-ও।
সুধন্য চমকে তাকাল ঐশীর দিকে। তারপর উঠে বাইরে গেল। ফিরে এসে বিস্কুটের দিকে হাত বাড়াতেই ঐশী বলল, “ হাতটা সাবান দিয়ে ধুয়ে এসো। বিড়াল আমি মোটে ভালোবাসি না।” সুধন্য দু’সেকেন্ড চুপ। খবরের কাগজটা সরিয়ে দিয়ে চেয়ারটা টেনে বসল।
ঐশীর মুখোমুখি। বেশ কিছুদিন পরে।


কানু কহে

আমিই বস্ত্র দেই, আমিই চুরাই
কি নামে ডাকবে বলো?
প্রিয় অনুঘটক?
ছকে ছকে মিলে গেলে
নিজেই নিজেকে বলি
দত্তাপহরক।
তুমি কোন দিকে যাবে?
একশো আটের ফান্দে
শোনো বগা কান্দে।
আমি ত্রিভুবনেশ্বর, আমারি গোলোক
ফাঁকা মাঠে গোল দেবে?
আমি ধর্ম বক।
রোগী দেখি, ডাক্তারও দেখি
চিরন্তন পলায়নপর
ধরিলে তো ধরা দেবো না
দাও ছেড়ে দাও
আমি ফেক জাতিস্মর।
আমি সব বুঝি তাও
বেঁধে রাখি আমার দুহাত
আমার ক্রোধের তূণে থাক
তুমি খোঁজো ভাত।

দ্বিতীয় গল্পঃ জলছবি

প্রজাপতি আঁকা হয়ে গেলেই ময়না আঁকবে --- ভেবেছিল তুতাই। খাতা ভরে ডলফিন লাফাচ্ছে ঘন নীল জলে। সাদা মেঘের বালিশে মাথা দিয়ে শুয়ে আছে পরী। হাতির ছানা শুঁড়ে পেচিয়ে নিয়েছে মায়ের লেজ। অসমাপ্ত সজারু, বাঁকা লেজের কাঠবিড়ালি, মাথায় ঝাঁকা নেওয়া মুটে --- সবই তুতাই মন প্রাণ দিয়ে রঙে ভরিয়েছে। কিন্তু আজকে পেন্সিল নিয়ে বসে আছে ঠায়। টিভিতে তাদের স্কুল দেখাচ্ছে। স্কুল তো ছুটি। পরশু দিন থেকে। মান্থলি টেস্ট ছিল। ছুটির সময়টা এগিয়ে এসেছিল। দেবদূতের সাথে মারামারি করছিল তুতাই। মিস এসে ধমকালেন। জিজ্ঞাসা করলেন, সারাকে দেখেছে কিনা। ওরা তো দেখেনি। মারামারির ফয়সালা হল না।চ পরস্পরকে ঘেচু দেখিয়ে চলে এসেছিল বাড়িতে। মানে, পরদিন to be continued! এরকমই তো হত, হওয়ার কথাও ছিল। কিন্তু হোলো না। রাতে বাবা খাবার সময় নিউজ দ্যাখে। মামাই রাগারাগি করে, তাও। হঠাৎ করে তাদের স্কুলের ছবি, পাশে আবার ছোট্ট করে সারার।তুতাই বলল, “ বাবা, বাবা, এটা তো সারা, টিভি আঙ্কল কী সব বলে জাচ্ছে? ওকে কে মেরেছে? ওর চোখে কী হয়েছে? ওই লোকগুলো কারা? সারা এখন কোথায়? কাল স্কুলে আসবে না? ওর কাছে আমার মিকিমাউসের মুখওয়ালা ইরেজারটা আছে।” --- অজস্র প্রশ্নে বোবা হয়ে থাকে সিদ্ধার্থ আর তমালিকা। সারাকে ওরা চেনে না। কিন্তু ওর ব্যাথা বুঝতে পারে কিছুটা, অন্তত আন্দাজ করে। তুতাই কিন্তু খুব ভালো করে জানে সারাকে, অথচ সারার যন্ত্রণাটা ওর কিছুতেই বোধগম্য হচ্ছে না। মামাই বলেছিল ছবি আঁকতে গেলে আগে subject কে বুঝতে হবে। তাহলেই ছবি lively হবে। তুতাই তো তাই করেছে। বোঝার চেষ্টা করছে আপ্রাণ। ময়না পাখির জায়গায় সারাকে আঁকতে চেয়েছে। কিন্তু বোঝাটা যে সম্পূর্ণ হয়নি। পেন্সিল ছুঁতে পারছে না সাদা খাতাকে। এক মন অবোধ আবেগ বর্ণহীন খাতাকে ভিজিয়ে দিচ্ছে শুধু।

মহাপ্রাণ
তারপর তিনি চোখ তুলে তাকালেন।
তাঁর প্রশান্ত অধর, তীক্ষ্ণ নাক
মুখমন্ডল প্রসন্ন।
তাঁর হাসিতে মুক্তোচ্ছটা,
চোখে ক্ষমা, বিস্তৃত হৃদয়ে শান্তি
সকরুণ হাতে প্রেম বিলায় ও কে?
তিনি দু’হাত প্রসারিত করলেন
তাঁকে ঢিল ছুড়ে বিক্ষত করলো হাসি
চোখ উপড়ে নিল স্নেহ।
তিনি প্রান্তরে এসে দাঁড়ালেন,
তাঁর দিকে ছুটে এল ক্ষমার তীরেরা,
প্রেম তার পায়ে পরালো শিকল।

তিনি ঘুরে দাঁড়ালেন।
শোণিত আর্দ্র দুই হাত।
নগ্ন বাহুতে সহস্র ক্ষত চিহ্ন,
প্রান্তরময় এত পিপীলিকা
তিনি পা ফেললেই দলিত হবে তারা।
কথা ব্যহত। চোখ আহত।
উপড়ে গেছে গাছেদের শিকড়
রুক্ষ মাটি ছেনে ডান তর্জনী দিয়ে
তিনি কপালে, দুই ধৈর্যের ভ্রূ’র মধ্যে
আঁকলেন একটি ক্রোধবিন্দু।

তৃতীয় গল্পঃ খাবার
ফ্রিজ খুলেই মাথাটা গরম হয়ে গেল তিতাসের। অজস্র ছোটো ছোটো ঢাকনা দেওয়া বাটি। কোনটার মধ্যে যে আছে কী করে বুঝবে? নীলির এই এক দোষ। জানে পর্যন্ত যে একবারে জিনিষ খুঁজে না পেলে তিতাস খেপে যায় , বিশেষ করে খিদের সময়। ডালাটা খোলা রেখেই তিতাস চেঁচাল --- “পাচ্ছি না তো!” নীলির উত্তর আসল--- “দু’নম্বর তাকের ডানদিকে আছে, সাদা চৌকো প্লেট ঢাকা দেওয়া।” তিতাস মনে মনে গজরাচ্ছে --- “আগে বললেই হতো।” আবার ভাবে--- “আমি তো জিজ্ঞেস করে নিই নি।” যা হোক, এতগুলো ক্লু পেয়ে শেষে বাটিটা ধরা গেল। নিয়ে এল টেবিলে। কালঠাণ্ডা হয়ে আছে। নীলি বলল, “ গরম ভাতের তলায় রাখো কিছুক্ষণ , ঠিক হয়ে যাবে”। তিতাস জানে, আগেও করেছে। তবু এই ভাতের আবরণে তাড়াতাড়ি খাবারটা লুকিয়ে ফেলতে—হ্যাঁ, লুকিয়েই তো! লুকিয়ে লুকিয়ে কাল দুপুরে পার্কস্ট্রিটের অনেকদিনের চেনা রেস্তোরাঁ থেকে এনেছে এই ছোট্ট ফয়েলটা, তিতাস। অকারণেই রাস্তার চতুর্দিক একটু বেশি সতর্কতার সঙ্গে তাকাতে তাকাতে। মনে হল, রাস্তার নেড়িটাও একটু বেশি সময় ধরেই পিছু আসছিল। নীলি কিন্তু ওর চোখমুখ দেখেই বুঝেছিল , কী আছে প্যাকেটে। ভাবলেশহীন মুখ করে নিল। তিতাস ঢুকে দু’জোড়া অন্যধরণের চটি দেখে চোখে প্রশ্ন নিয়ে নীলির দিকে তাকায়। নীলি বলল – “দিদি জামাইবাবু”। তিতাস এই ভয়টাই করছিল। সাধের খাওয়া ঢুকে গেল ফ্রিজে। রাত কাটিয়ে দিদিরা গেল আজ সকালে। নীলির সে কি আপ্যায়ন! দু’দিনের আচমকা ছুটি কি দারুণই না জমল--- পালংশাক, মুগডাল, চালকুমড়ো পুর, চিংড়ি পোস্ত, পাবদা ঝাল, চিকেন---
------------------