নিজের ত্বকের রঙে প্রাসাদ

অরিত্র সান্যাল ও রুণা বন্দ্যোপাধ্যায়


অরিত্র সান্যাল

নিজের ত্বকের রঙে প্রাসাদ


এক।

তোমার হারিয়ে যাওয়া তিল আমি ভোরের আকাশে খুঁজে পাই,
আর কী অবান্তর পৃথিবীতে সৌন্দর্যের থেকে বড়?
– আমাদের মুক্তি নেই
এই এক অশ্রুর হেতু, তাহাকে পেরিয়ে এই গ্রহে নীল
তোমার বুকের ঝড়ে দেখা যায়
এক ফালি সৈকতে একটাই গাছ আর ছায়া –
আমরা কোথায় যাব?
আমাদের করতলে রাশিফল ধরে থাকে, ঝরে পড়ে
সারারাত
আমরা কোথায় যাব?
দূর কেউ মাতৃভাষার কাঁদে, শোনা যায়
সারারাত আমাদের বড় কোনও ঢেউ বা বাতাস নেই
কোনওদিন, তেমন দ্বীপান্তর ছিল না সেনর
মনে হত কিছু একটা সারারাত আমার শরীর থেকে চুঁয়ে পড়ে

খালি কেউ কেঁদেছিল – মনে পড়ে – জীবনের এমন একটা দিক আছে
ঝঞ্ঝার সামান্য কাজলটুকু দিগন্ত থেকে তুলে নিয়ে
টানা টানা আজীবন পরে ছিলে
তারপর
সব প্রাণহীনতায় আমি দায়ী হয়ে থাকি


দুই।

দূর থেকে ভেসে আসা গান - তাকে এখন একটি
রূপবান ধ্বংসের মত দেখাচ্ছে। যেন সম্পর্ক
প্রাচীন এই শহরের মত - নূপুরতলে থাকা
বস্তিবাসীদের দিকে অবহেলায় বিবর্ণ
সূর্যাস্ত ছেড়ে দিয়েছে

কল্পনা করুন মন্বন্তর।
একটা পুরো ভূখণ্ড আয়ত্ত করার পর
স্বাধীন, অন্যমনস্কতায় সে পাশ ফিরে শুয়েছে
আর যার ঘুম এখনও ভাঙেনি -
সেই ইহজীবনকে আমরা মূলত
ট্রেন থেকে কোনকিছুর অবশিষ্টের মত
অনুভব করি হলুদ চরাচরের ডানা, হাল্কা নদী
রামপিয়ারীর অর্ধেক সুখ
প্রতিমুহূর্ত দেখার দ্রুতগামী একটি আনন্দ নিয়ে
এবার আমরা পান্থনিবাসে ফিরব।

ভ্রমণে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি- যেমন
শৈশবস্মৃতি, টুকরো কাচ, ও ভ্রুয়ের
বিস্ময়ব্যবহার ছাড়া দরকার একটি
বিচ্ছিন্নতাবোধ।
এমন ছারখার রঙের রূপকথায়
রাজকুমার খুঁজতে খোক্কস খুঁজতে
আমাদের শিশুরা জন্মাচ্ছে দেখেও
ভীনগ্রহীদের মত হৃদয়কে যাতে বাতানুকূল রাখা যায়।
প্রবল দিনের আলো উপেক্ষা করে লন্ঠন জ্বেলে
যিনি নিজের দেওয়ালে যুক্তির ফাটল খুঁজছেন
সেই বৃদ্ধর দেখা মেলে
পুষ্পগন্ধের ছায়া পড়ে থাকা পতঙ্গদের বিমানপোত
সেখান থেকে পৃথিবী চলল
যে বয়সে ভালবাসা জীবনের ওজন বাড়ায়নি এখনও


তিন।

একসময় থেকে বারমের হয়ে অন্যসময়ে যাওয়ার পথে
লম্বা তৃষ্ণা পড়লে
পেট্রোল স্টেশনে ময়ুরের ডাক শোনা যায়।
শিল্পে প্রকৃত নিবেদনের জন্য যা লাগে - রুটম্যাপ বলে
এটাই সে আদর্শ অসহায়তার পথ - রোদে পুড়ে
আংরা হয়ে যেতে যেতে জীবন জীবনকে
শুধায়- অউর কিতনা হর্ফ লিখনা বাকী হ্যায় জী?
ব্যস্ এতদূর অব্দিই বেঁচে থাকার ইজাজত দেয়
এই দুনিয়া - তারপর থেকে খালি শূন্যতা রঙের নীল
কখনও তরল কখনও বায়বীয় কখনও কঠিন একটি
দৃষ্টিতে আমাদের বিঁধে রেখে চলে যায়

অতএব এখন উচিত দ্রুত ওই পাথরের
টিলার ওপারে সূর্য ও আরশিনগর কল্পনা করা
রাইফেল উঁচিয়ে জনৈক ক্লান্ত পুলিশ যদিও চেঁচিয়ে উঠতে পারে - রোক্কে!
পায়ের তলায় তার ছায়া নির্বিকার এক তৃণভোজী
প্রাণীর মত দেখায় - সহ্য করার একটাই ভাষা-
নিস্তব্ধতা - সব থেকে প্রকাণ্ড হয়ে ওঠে
যুদ্ধের মাঝে - হঠাৎ-
যেন চাকা থেমে গিয়েছে, হঠাৎ-
লেখা বন্ধ করে দীর্ঘকায় নারী চলে যাচ্ছেন
যাবজ্জীবন স্মৃতিহীনতার সঙ্গে প্রায়
চোখে চোখ তাকিয়ে থাকতে-
সুন্দরবনে, শোনা যায়, এমতাবস্থায় বাঘও
কিছুক্ষণ আক্রমণ করতে ভুলে যায় -
বনের খুব গভীরে
বাকি দুই চরিত্রের একটি মধুরভাণ্ড
অন্যটি মৃত্যু


চার।

এতদিন আসলে নিঃসঙ্গতারই এক রূপ – রক্তাল্পতা
শরীরের ভিতর থেকে আমাকে বিবর্ণতার অধীনস্থ করে রেখেছিল ঈশানী
আমি তখন নিজের ত্বকের রঙে এক প্রাসাদে থাকতাম –
কেউ দেখতে পেত না।
নিজের অনুশোচনা প্রাণের অনুকূলভাবে জ্বলে থাকত নতুন গ্রহে –
সারারাত। আমি লিখতাম –

সময়, মনে হত, একটা পুরের মতো যে কোনওকিছুর ভেতরে ঢুকেই
আস্ত জীবন বাঁধিয়ে দিয়েছে। তোমার মধ্যে
চতুর্দিক এখন ভরাট। পুকুরের গভীরতার মতো বিস্মৃত
স্বপ্নের শেষে সূর্য উঠছে একটা, দুটো তিনটে
পাখি আটকে যাওয়া প্রাণের অন্ধকার আর কাটছে না
তোমার থেকে দূরে এলেও তোমার শরীর ফুরোচ্ছে না আর কোথাও

আমি লিখতাম – প্রত্যেকের কররেখা আলাদা
নিজের দুঃখের দিকে মন দাও –
কালিকাপুর ছাড়লেই পাখি সুদ্ধু গাছের ডাল
ক্যানিং লোকালে ঢুকে বাস্তবতা ভেঙে দেয় – মট্‌
এরপর রোদের ঝলকানি এলে দেখি
ক্লান্ত মৎস-বিক্রেতার ছায়াতে আকাশের সাক্ষাৎ হৃদিবর্ণ তিল
খড়কুটো নিয়ে তোমার পুরোনো শরীরের কোটরে
ডাক দিচ্ছে – পিয়াস বুঝাও পিয়াস বুঝাও পিয়াস বুঝাও

একটি যাত্রাপথের দু প্রান্তে দাঁড়িয়ে তাই আমার খালি মনে হয়
তোমার দু-পলক তলিয়ে যাচ্ছে অন্ধ মানুষের স্বপ্নে
আজ উত্তরাকাশে, ভোরের দিকে দেখি
একমাত্র দীন দুঃখী পাঠক ছাড়া আমার কোনও নিয়তি নেই এ গ্রহে

কল্পনা করো, কেমন লাগবে যেদিন
এ সমস্ত কিছুর নায়ক আর তোমাদের মাঝে থাকবেন না

=================================================

রুণা বন্দ্যোপাধ্যায়

ষড়বৈরীর অন্তর্বর্তী বারান্দা


আমরা কোথায় যাব? এই এক সংশয়। শুরু না হওয়া শেষ না হওয়া এক ধারার দিকে অনর্গল সাজিয়ে রাখি প্রশ্নচিহ্ন। চিহ্নের আগে পা ছড়িয়ে বসে থাকে একটা অবান্তর পৃথিবী। অথচ অন্তরকে অবগত হলে ধারণা থেকে ক্রমশ ফিরে যেতে পারি নির্ধারণে। তো এই ধারণের আগে নির্‌ এক উপসর্গবিশেষ। এক বিয়োগব্যথা। ঢেউ হতে পারে। বাতাস হতে পারে। দ্বীপান্তরও। নিরন্তর নিঃসঙ্গযাপন। নির্‌ থেকে নীরে ফিরলেও সেই কাজল সেই কান্না, এমন নীরজ যেন নীবিয়োগে রজঃ গুণ তার দোসর সত্ত্ব ও তম-কে নিয়ে ফুটে উঠবে ভোরের আকাশে। ফোঁটা ফোঁটা জীবন থেকে তুলে নেওয়া আজীবন গাঁথতে বসবে এক নীল গ্রহের কাহি্নি। আর সারা কাহিনিই আমাদের তামস রাতের কাহিনি। যেখানে ঝুলে থাকে অন্তরের ঘুলিয়ে ওঠা অনন্বয়, প্রান্তিক অনুভব আর তোমার আদিম। অথচ রজ কে রজকে নিয়ে গেলে কিছুটা রং লেগে যায় অবান্তর পৃথিবীটার গায়ে। একটু স্পেস পেলে কিছুটা লিঙ্গান্তর, রজকিনী থেকে লীলা বা প্রেম। এ সবই সত্ত্বের দরজা, অনুভবের প্রবেশপথ যার অপরিহার্য আনুগত্য লেগে থাকে আমাদের দৈনন্দিন পায়ে।

এখন হিমপ্রহর। দূরাগত গান যেন বরফের সাদা চিৎকার। বরফের অন্যপাশে লাশ হয়ে আছে সম্পর্ক। তবু দেখো নস্টালজিয়ার চাকায় এখনও সূর্যাস্ত।। গেরুয়া গোধূলি এলে রূপকথা মনে পড়ে। অথচ সব রূপ ওই নূপুরতলে পড়ে থাকা অবহেলা বয়ে নিয়ে কথা হয়ে যায় সংসদে সংবাদে। রামপিয়ারীর অর্ধেক সুখ শীত ও শান্তি বিনিময় করে। তুমি চ্যালেঞ্জ নিলেই চিহ্নিত বিপজ্জনক। মুঠোভরা ক্রোধ কিছুটা দূরত্বে বুনে রাখে রিপুর ক্লোজ্‌ড সার্কিট। গায়ে গায়ে ষড়। জমেছে দেহের সীমায়। তুমি বৈরী ভাবলে ভাবতেই পারো, শলাহ্‌ যখন যুক্তির ফাটল খুঁজছে। বিপজ্জনক হয়ে উঠছে দেয়াল। ভেঙে পড়ার আগে ধ্বংসস্তূপের উপমা যেমন। তবু ফেরা। স্মৃতির ভেতর চিহ্নিত বস্তুর ভেতর নামিয়ে রাখা অসুস্থতা এক বিচ্ছিন্নতাবোধ। ভূমিহীনতাও বলতে পারো। তবু ফেরা। শহরচিতার আগুনে ঝাঁপ দেবার আগে প্রথম ভালোবাসার কাছে বিষণ্ণ তার নাম খুঁজে ফেরে। তবু ফেরা। হলুদ জখম থেকে, আশার ম্যাজিক থেকে, অনিবার্য ঈশ্বর থেকে। পলায়নবাদী চিহ্নের ভেতর ঝাঁপ দেবার আগে অবাক হয়ে হয়ে গান হয়ে হয়ে বিস্ময় তার নাম খুঁজে ফেরে।

ফেরার গল্পে দিনলিপি লিখছে শূন্যতা রঙের এক নীল। নৈশলিপির নির্যাসে গড়ে তোলা জাদুঘরের দেয়াল। গায়ে তার মোহ নামে এক মায়াহরিণ। রিপুর রুমালে রাখা মামুলি জীবন অক্ষর খুঁজছে অনিবার্য অসহায়তায়। সেপিয়ান্স হুল্লোড়ে জড়ানো সুতো ও আঁশ ছাড়িয়ে ফুঁসে উঠতে চায় পৃথিবীর প্রথম ভাষা। পারে না। মনোবিকারের গ্রন্থিতে আরো জট পড়ে। দোটানায় রাখা ছুরিতে জমাট বাঁধে চুপকথারা। ব্যারিকেডের সামনে নত হয়ে আসে তাপখোয়ানো অক্ষরসমূহ। মনোরোগীর কপালে সাঁটা বিচ্ছিন্নতার বিজ্ঞাপন দেখে বিষাদমগ্ন কড়িকাঠে ঝুলে থাকা নির্মোহ অক্ষর। সমস্ত স্মৃতি যেদিন অস্তিত্বের জীবননাট্য খসিয়ে যাবজ্জীবন দ্বীপান্তরে যায় সেদিন নির্মোহের মুখোশ খুলে অক্ষর একটু কাঁদে। দূরে অপেক্ষা করে থাকে মৃত্যু, জীবনের একমাত্র সত্য।

শরীরের ভেতরে থাকা প্রাসাদ আসলে এক বিভ্রম মাত্র, যাদুঘরের কোলাজ। জিইয়ে রাখা সলিউশান উবে গেলে পড়ে থাকে বিষাদের গ্রন্থিসকল। মৃত্যুমুখী তির যেন। তিরের মুখ ঘোরানো থাকে মমি করে রাখা দুঃখের দিকে। সময়ের মায়াজালে জড়ানো জীবন একটা আশমানি আশকারা চায়। তাই আকাশ, তার নিঃসঙ্গতা, তার হৃৎবর্ণ গল্প নোঙর নামায় বন্দরহারানো জীবনের ঘাটে। দিগন্তে উড়ে পড়া পাখি অস্তিত্ব থেকে, প্রতিরোধ থেকে, ছায়া ও আঁধারে ঝুলে থাকা ষড়বৈরীর অন্তর্বর্তী বারান্দা থেকে খুঁজে ফেরে খড়কুটো। দূরে বহুদূরে ভেসে ওঠে শব্দের সাম্পান। জলবাহিত দোলাচলে ভাটিয়ালি সুর আঙুলবেলার গল্প শোনায় অন্ধকারকে। গল্পেরা আপেক্ষিকতায় নেমে গেলে খুন হয়ে যায় ভাবনার পারম্পর্য। একা ঘর। সাদা বিছানা। ডুবু্রির বুদবুদের ভেতর ভেসে ওঠে তোমার পুরোনো মুখ। বাঁকা ঠোঁটের পাশে রাখা হাসির ব্যাকরণ বাজিকরের গল্প বলে। অথচ অক্ষরখচিত এই শহরে হারজিতের গল্প নেই। পুরোটাই আঙুলের গল্প, দাগের কথা, অসীমের ব্যথা, শূন্যতার শব্দ।