সংসদীয় গণতন্ত্র নাকি মনসবদারির রকমফের

সংহিতা মুখোপাধ্যায়

প্রতি পাঁচবছরে ভারতীয় ভোটাররা নিজেদের প্রতিনিধি পাঠিয়ে থাকেন সংসদে ও বিধানসভায় যথাক্রমে দেশ ও রাজ্যের পরিচালনভার সংখ্যাগরিষ্ঠের পছন্দের প্রতিনিধির উপর ন্যস্ত করার জন্য। কিন্তু এই নির্বাচনী প্রক্রিয়ার সাজ-সাজ রব কাড়া - নাকাড়া বাদ্যির মধ্যে দিয়ে ফুটে ওঠে পরিচালনভারের দায় নয় , শাসনক্ষমতার দম্ভ । তাই বোধ হয় বৃহত্তম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রটিকে অক্লেশে , সমাজতন্ত্রের নামে ধনতান্ত্রিক একনায়কতন্ত্র কবলিত পড়শী রাষ্ট্রটি , মানে চীন ,সামন্ততান্ত্রিক বলে গালাগাল করে । কে গাল পাড়ছে তা উপেক্ষা করে যদি তলিয়ে দেখা যায় যে কেন গাল পাড়ছে , তাহলে হয়তো গোড়ার গলদে পৌঁছোনোও যেতে পারে। তাই পৃথিবীর সবচেয়ে জনবহুল স্বাধীন সমাজতন্ত্রী ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্রী প্রজাতন্ত্রের নেতৃত্বের নির্বাচন পদ্ধতি , দায়িত্ব ও ক্ষমতা , তাঁদের অপসারণের নীতি যেভাবে ভারতীয় সংবিধানে বিধৃত তা নিয়ে নাড়াচাড়া করে দেখা যাক কোথাকার জল কোন খাতে বয়ে কোথায় দাঁড়িয়েছে ।
ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রের গঠনে নানান দেশের রাষ্ট্রব্যবস্থার সংমিশ্রণ ঘটিয়ে ছিলেন সংবিধান রচয়িতারা । ব্রিটিশ ব্যবস্থা থেকে নেওয়া হয়েছিল রাষ্ট্রনেতার ক্ষমতা ও দায়িত্ব । সেই ব্যবস্থানুসারে রাষ্ট্রপতি হলেন রাষ্ট্রনেতা এবং রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য তিনি নিয়োগ করেন মন্ত্রীসভা । এই মন্ত্রীসভা আবার দায়বদ্ধ নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সংসদে । অথচ রাষ্ট্রপতি সরাসরি জনতার কাছে কিংবা তাঁদের দ্বারা নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সংসদে দায়বদ্ধ নন । কারণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচকদের দ্বারা সরাসরি নির্বাচিত হন না, নির্বাচিত হন প্রতিনিধিনিত্বমূলক মতদানের মাধ্যমে । মূলত বিভিন্ন রাজ্যের জনতার দ্বারা নিজের নিজের বিধানসভায় নির্বাচিত বিধায়কদের এবং জনতার দ্বারা নির্বাচিত সাংসদদের দেওয়া ভোটের ভিত্তিতে ভারতের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন । প্রত্যেক বিধায়কের ভোটের পরিমাণ নির্ধারিত হয় তিনি যে রাজ্যের বিধায়ক সেই রাজ্যের জনসংখ্যাকে সেই রাজ্যের বিধানসভায় নির্বাচিত বিধায়কদের মোট সংখ্যার হাজারগুণ দিয়ে ভাগ করে । এতে একটি রাজ্যের প্রত্যেক নির্বাচিত বিধায়কের ভোটের মান সমান হয় অর্থাৎ যেকোনো একটি রাজ্যের প্রত্যেক বিধায়ক সমসংখ্যক রাজ্যবাসীর হয়ে মতদান করে থাকেন । নির্বাচিত সাংসদদের ভোটের পরিমাণ নির্ধারিত হয় সমস্ত রাজ্যের সমস্ত বিধায়কের ভোটের সমষ্টিকে নির্বাচিত সাংসদদের সর্বমোট সংখ্যার যোগফল দিয়ে ভাগ করে , যাতে এঁরাও প্রত্যেকে সমপরিমাণ দেশবাসীর হয়ে মতদান করতে পারেন । যদিও আইনত প্রত্যেক বিধায়ক বা প্রত্যেক সাংসদ নিজের পছন্দের রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থীর সপক্ষে মত দিতে পারেন , কিন্তু সাধারণত প্রত্যেক বিধায়ক ও সাংসদ তাঁদের নিজেদের দলসমর্থিত প্রার্থীর সপক্ষেই মত দিয়ে থাকেন। ফলে রাষ্ট্রপতি নিতান্তই প্রতীকী রাষ্ট্রনেতা কিংবা কাগুজে বাঘ ।
এই ব্যবস্থা প্রভূত সমালোচিত এবং সমালোচনার মোকাবিলায় সংবিধানকাররা জোরালো সওয়ালও করেছেন। সংবিধান প্রণেতাদর যুক্তি ছিল যে প্রতীকী রাষ্ট্রনেতার নির্বাচনে পাঁচকোটি দশলক্ষ ( তৎকালীন ) মতদাতার অংশগ্রহণ বিপুল পরিমাণ অর্থ , সময় ও শক্তির অপচয় । এছাড়াও তাঁদের যুক্তি ছিল যে , সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় নিযুক্ত দায়িত্বশীল সরকারের প্রকৃত ক্ষমতা নিহিত থাকবে মন্ত্রীত্বে । অথচ পাঁচ বছরের সংবিধান নির্ধারিত মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার আগেই প্রয়োজন হলে রাষ্ট্রপতিকে অপসারণের প্রক্রিয়াটি বেশ শক্তপোক্ত । রাষ্ট্রপতি স্বহস্তে উপরাষ্ট্রপতিকে উদ্দেশ্য করে লেখা পদত্যাগ পত্র উপরাষ্ট্রুতির দপ্তরে জমা দিতে পারেন কিংবা সংবিধান অবমাননার অপরাধে তাঁকে ইমপিচ করা হতে পারে । লোকসভা বা রাজ্যসভার যে কোনো একটি কক্ষ রাষ্ট্রপতির সংবিধান অবমাননার অভিযোগটি সংসদের অপর কক্ষে উপস্থাপণ করতে পারে । মানে লোকসভা যদি রাষ্ট্রপতির সংবিধান অবমাননার অভিযোগ আনে তবে তা আনা হবে রাজ্যসভার কাছে । বা রাজ্যসভা রাষ্ট্রপতির সংবিধান অবমাননার অভিযোগ আনতে পারে লোকসভায় । কিন্তু এই অভিযোগ আনার আগে অভিযোগ উত্থাপণকারী কক্ষে মানে হয় লোকসভাতে নয় রাজ্যসভাতে অভিযোগটির সপক্ষে একটি সঙ্কল্প উত্থাপণ করতে হবে । সঙ্কল্প উত্থাপণ করার কম করে চোদ্দোদিন আগে সঙ্কল্পটির ব্যাপারে বিজ্ঞপ্তি জারি করতে হবে এবং বিজ্ঞপ্তিটিতে কক্ষের মোট সদস্যদের ন্যূনপক্ষে চারভাগের তিনভাগের সই থাকতে হবে । তারপর সেই সঙ্কল্পটি কক্ষের মোট সদস্যের ন্যূনপক্ষে দুই - তৃতীয়াংশের সমর্থনে গৃহীত হতে হবে । তবে সঙ্কল্পটি সংসদের অপর কক্ষে অভিযোগ হিসেবে পাঠানো যাবে। তদন্তের সময়ে সংসদের যে কক্ষ অনুসন্ধানে নিয়োজিত সেই কক্ষে অভিযুক্ত রাষ্ট্রপতি নিজে অথবা প্রতিনিধি মারফত অভিযোগের মোকাবিলা করতে পারেন । এই দ্বিতীয় কক্ষেও যদি মোট সদস্যসংখ্যার ন্যূনপক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন করেন অভিযোগ , তবে সেই কক্ষে সঙ্কল্পটি গৃহীত হওয়ার দিনই রাষ্ট্রপতি বরখাস্ত হবেন ।
অন্যদিকে মন্ত্রীসভার শীর্ষে থাকেন প্রধানমন্ত্রী । রাষ্ট্রপতি নিয়োগ করেন প্রধানমন্ত্রীকে ও মন্ত্রীসভার বাকি সদস্যদের । কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর সুপারিশক্রমেই বাকি সব মন্ত্রীকে রাষ্ট্রপতি নিয়োগ করেন।তাই প্রধানমন্ত্রী “ সমানদের মধ্যে প্রথম ” বলে বিবেচিত হন । অর্থাৎ পুরো মন্ত্রীসভার গঠনটি দাঁড়িয়ে থাকে প্রধানমন্ত্রীর বিবেচনার উপর । এইভাবে মন্ত্রীদের অপসারণের সিদ্ধান্তটিও মূলত প্রধানমন্ত্রীর । প্রধানমন্ত্রীর সুপারিশেই রাষ্ট্রপতি মন্ত্রীসভার সদস্যদের বরখাস্ত করেন । প্রধানমন্ত্রীর মতো গুরুত্বপূর্ণ পদটি রাষ্ট্রপতি দিয়ে থাকেন সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠদলের নেতাকে । কিংবা সেই সাংসদকে যিনি সংসদের আস্থার্জনে সক্ষম । শুধুমাত্র লোকসভার আস্থা হারালেই মন্ত্রীসভা পদত্যাগে বাধ্য হয় । অথবা লোকসভার পাঁচ বছরের মেয়াদ ফুরোলে মন্ত্রীসভারও মেয়াদ ফুরোয় বা রাষ্ট্রপতি মন্ত্রীসভা খারিজ করেও দিতে পারেন পাঁচ বছরের স্বাভাবিক মেয়াদের আগেই । আবার রাষ্ট্রব্যাপী জরুরী অবস্থার সময় মন্ত্রীসভার মেয়াদ রাষ্ট্রপতি বাড়িয়েও দিতে পারেন । সেক্ষেত্রে লোকসভার মেয়াদও বেড়ে যেতে পারে , কিন্তু সবই সংবিধান নির্ধারিত দেড় বছরের সময়সীমার
মধ্যে । এই সময়সীমার অংশটি কোনো দলই সংশোধনের চেষ্টা করেন নি । কারণ এ জাতীয় সংবিধান সংশোধনের সময় বিশেষ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাগে । বিশেষ সংখ্যাগরিষ্ঠতার মানে সংবিধান সংশোধন করার সমর্থনে সংসদের উভয়কক্ষে উপস্থিত নির্বাচিত সদস্যদের ন্যূনপক্ষে দুই-তৃতীয়াংশের সমর্থন ও সমস্ত রাজ্যের অর্ধেকের বেশি বিধানসভায় ( মানে এখনকার ঊনত্রিশটা রাজ্যের মধ্যে নিদেনপক্ষে পনেরটা রাজ্যের বিধানসভায় ) সংবিধান সংশোধন প্রস্তাবে সংখ্যাগরিষ্ঠের সমর্থন। যদিও রাষ্ট্রব্যাপী জরুরী অবস্থাতে রাজ্যগুলির বিধানসভার বিবেচ্য সমস্ত আইনের ওপর লোকসভার বিবেচনাই প্রাধান্য পায় তবুও সংবিধান সংশোধনের প্রস্তাব যেহেতু আইন নয় , সেহেতু সংবিধান সংশোধনের ব্যাপারে বিধানসভার মতামতের ওপর লোকসভার খবর্দারি চলবে না বলেই এখনও অবধি মানা হয় । এইভাবে সংবিধানেই নিহিত আছে যথেচ্ছ সাংবিধানিক রদবদল আটকানোর উপায় । তাই অধিকাংশ সময়েই মনে করা হয় ভারতবর্ষে সংবিধানেই সমূহ ক্ষমতা নিহিত আছে ।
অথচ তবুও টের পাওয়া যায় সংসদীয় গণতন্ত্রের হাত ধরে রাজনীতিকরাই ক্ষমতা ট্যাঁকস্থ করে ফেলেছেন । এমনটা হওয়ার কারণ কী “ সমানদের মধ্যে প্রথম ” বলে বিবেচিত প্রধানমন্ত্রীর সংসদীয় গুরুত্ব ? কারণ সংসদে তিনিই সংখ্যাগরিষ্ঠের নেতা বলে সংসদের মতামত তাঁরই আঙুলের আগায় ঘোরাফেরা করে । তারওপর আছে সংবিধানেরই দশম তপশীল , বাহান্নতম সংবিধান সংশোধনের ফসল , যার বলে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি তাঁর নির্বাচিত হওয়ার সময়ের সমর্থক রাজনৈতিক দলের বদলে অন্য রাজনৈতিক দলে যোগ দিলে নির্বাচিত প্রতিনিধির পদাধিকার খারিজ হয়ে যায় চালু সংসদ বা বিধানসভার চলতি মেয়াদে । ফলে রাজনীতিকে জীবিকা করে যাঁরা বিধায়কবৃত্তি বা সাংসদবৃত্তি নেন , তাঁদের পক্ষে নীতির বা স্বার্থপ্রশ্নে দলবদলের সিদ্ধান্ত নেওয়া কল্পনাতীত । একই কারণে বৃত্তি রক্ষায় তাঁরা গরিষ্ঠের দলে ভিড়ে থাকার চেষ্টাও করেন । তাই হয়ত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সময়ে বা আস্থা ভোটের সময়ে তাঁরা কোনো প্রার্থীকে সমর্থন করার দলীয় সিদ্ধান্তকে আদেশের মতো পালন করেন । না হলে তাঁরা দল থেকে বহিষ্কৃত হতে পারেন এবং জনপ্রতিনিধিত্বও খোয়াতে পারেন ।
অর্থাৎ প্রধানমন্ত্রীত্ব বা মুখ্যমন্ত্রীত্ব নিতান্ত সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের উপর নির্ভর করে । সেই হিসেবে প্রধানমন্ত্রীত্ব পেতে হলে লোকসভায় কোনো মতে পাঁচশো তেতাল্লিশ ( ৫৪৩ ) - টা আসনের ( বাকি দুটো আসন অ্যাংলো ইণ্ডিয়ান কমিউনিটির থেকে রাষ্ট্রপতি মনোনীত প্রতিনিধিদের জন্য সংরক্ষিত ) অর্ধেকের বেশি মানে নিদেনপক্ষে দুশো একাত্তরটা ( ২৭১ ) – টা আসন দখল করা । “ কোনো মতে ” আসন দখল করতে এবং সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে হলে উপায় হলো মোর্চা গঠন করা কিংবা নিজের দলের লোকেরা মারপিট এবং খুনোখুনি করে হলেও যদি সংখ্যাওগরিষ্ঠতা তৈরি করতে পারে তো তাতে উৎসাহ দেওয়া ।
তাহলে নির্বাচনে মারকুটে লোক বা অপরাধীদের পরোক্ষ ব্যবহার করা এবং কালক্রমে এই সব লোকেদের প্রত্যক্ষে রাজনৈতিক দলে যোগদান করা এবং নির্বাচনে অংশ নেওয়াটা অবশ্যম্ভাবী পরিণতি ছিল । কারণ এই অপরাধীদের আনুগত্য স্বীকার করে তাদের সাহায্যে নির্বাচন জেতা যায় এবং সংসদে ও বিধানসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতাও অর্জন করা যায় এদের হাতযশে জিতে আসা প্রার্থীদের গুণতিতে রেখে । আবার কালক্রমে এদেরকেই নির্বাচনে জয়ী জনপ্রতিনিধি হিসেবে ব্যবহার করার চলও হয়েছে । তাই উচ্চাভিলাষী নেতা বশংবদ মারকুটে অপরাধীদের লালন , পোষণ এবং পালন করে থাকেন , তাদের নির্বাচনে জেতাতে উদ্যোগী হন বা নির্বাচনে জেতার যে প্রক্রিয়াই অপরাধীরা গ্রহণ করুন না কেন সেটাকেই নেতারা সমর্থন করেন । অন্যথায় এইসব মারকুটে অপরাধীরা উচ্চাভিলাষী নেতাদের রাজনৈতিক বিরুদ্ধপক্ষে যোগ দিলে প্রধানমন্ত্রীত্ব বা মুখ্যমন্ত্রীত্ব পেতে চাওয়া নেতাদের শক্তিহানি ঘটে অর্থাৎ তাঁদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের রাস্তা বন্ধ হয়ে যায় । তাই অপরাধী ও রাজনৈতিক গোষ্ঠীর পারস্পরিক তোষণ ও পোষণ চলতে থাকে , কখনও নিজের দলের সদস্যপদ দিয়ে, কখনও সমর্থনভিত্তিক মোর্চা গঠন করে ।
মধ্যযুগের ভূমিভিত্তিক শাসনব্যবস্থায় চালু মনসবদারিও কতকটা এমনই ছিল । কেউ একটা এলাকার শাসক আর সৈন্যদলের নিয়োজক হলেই অপেক্ষাকৃত বড়ো এলাকার বা বেশি শক্তিশালী শাসক এবং বৃহত্তর সৈন্যবাহিনীর নিয়োজকের কাছে বশ্যতা স্বীকার
করতেন । বিনিময়ে প্রথম শাসক সৈন্যপিছু শস্য বা শস্যের মূল্য পেতেন এবং দ্বিতীয় শাসকের হয়ে যুদ্ধে অংশগ্রহণে বাধ্য থাকতেন । প্রথম শাসক নিজের এলাকায় উৎপাদিত ফসল ও অন্যান্য দ্রব্যের নির্দিষ্ট ভাগ কর হিসেবে দ্বিতীয় শাসকের কোষাগারে জমা দিতেও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকতেন । বদলে প্রথম শাসকের দখলী এলাকা বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে রক্ষা করতে দ্বিতীয় শাসক প্রতিশ্রুতি বদ্ধ থাকতেন । প্রথম শাসকের দেওয়া করের ও সৈন্যবাহিনীর মাপ দিয়ে নির্ধারিত হতো তাঁর ক্ষমতার মাপ । অর্থাৎ তিনি পাঁচ হাজারী কী দশ হাজারী নাকি বিশ হাজারী মনসবদার । শক্তির এই জনসংখ্যাভিত্তিক লেনদেন ভারতের সংসদীয় গণতন্ত্রে অটুট আছে বলেই দেখা যাচ্ছে । বরং এই লেনদেনের মানাবনয়ন হয়েছে কারণ এই লেনদেনে শস্য ও অন্যান্য উৎপাদিত দ্রব্যের কোনো জায়গাই এখন নেই । তার জায়গা নিয়েছে শাসনক্ষমতা আর ‘ সুবিধে ’ , যেমন পঞ্চায়েত সদস্যপদ ও ‘ হাইওয়ের কন্ট্রাক্টরি ’ , বিধায়ক পদ ও ‘ নির্বাচন ক্ষেত্রের সমস্ত প্রাইভেট সম্পত্তি হস্তান্তরের ওপর দুই শতাংশ দালালি ( নিষ্কর ) এবং সমস্ত সরকারি পরিকল্পনা ও নির্মাণের কাজের ওপর দশ শতাংশ দালালি ( নিষ্কর ) ’। চৌথ ( কৃষিজ উৎপাদনের একচতুর্থাংশ ) এবং সরদেশমুখী ( কৃষিজ উৎপাদনের একদশমাংশ ) সেকালে আইন স্বীকৃত কর ব্যবস্থা ছিল । একালের সামন্তরা বেআইনকেই যুগসিদ্ধ করে নিয়েছেন ।
ভারতে যদি রাষ্ট্রপতিকে সরাসরি নির্বাচিত করে তাঁকে সংসদে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের কাছে যাবতীয় সরকারি সিদ্ধান্ত ( বা সিদ্ধান্তহীনতা ) এবং কাজাকাজের জন্য দায়বদ্ধ করা হতো বা হয় তাহলে হয়তো সংখ্যাগরিষ্ঠের মনসবদারি থেকে নিষ্কৃতি পাওয়া যেত। কিন্তু সেক্ষেত্রেও সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের সাথে রাষ্ট্রপতির আঁতাত হতে অসুবিধা থাকত না । ফলে প্রাথমিকভাবে বিধ্বস্ত মনসবদারি পুনর্কায়েম হতে বেশি সময় লাগত না । প্রধানমন্ত্রীর বদলে রাষ্ট্রপতিকে শীর্ষে রেখে রমরমিয়ে চলত মধ্যযুগীয় শক্তিচর্চা , গণতান্ত্রিক নির্বাচন প্রক্রিয়ার মোড়কে।
এই ব্যবস্থা থেকে নিস্তার পাওয়া যায় যদি বেআইনিগুলোকে অপরাধ হিসেবে মেনে নেওয়া হয় ও তার নিরসনে উদ্যোগী হওয়া যায় । সাংসদদের অপরাধ দমনের সাংবিধানিক প্রক্রিয়াটি সরল । সাংসদদের যে কোনো ফৌজদারি মামলায় যেকোনো সময় গ্রেপ্তার করা যায়। শর্তাধীন অব্যাহতি তাঁরা পেতে পারেন কেবল সিভিল মামলায় । সেক্ষেত্রে সাংসদ অপরাধে লিপ্ত হলে তাঁর বিরুদ্ধে ফৌজদারি অভিযোগ দায়ের করাটা তাঁর নির্বাচকদের এবং তাঁর নির্বাচক নন এমন নাগরিকদেরই অবশ্য কর্ত্তব্য । এমনকি সাংসদ/বিধায়ক মন্ত্রী হলেও তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করতে কোনো অসুবিধে নেই । শুধু খেয়াল রাখতে হবে অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করার চেষ্টাটা সংসদ বা বিধানসভা ভবনে না করে যেন তাঁর আবাসে বা ব্যক্তিগত কাজের জায়গায় করা হয় । ক্ষুদ্র স্বার্থের ঊর্ধে উঠে নাগরিকরা এমন একটা কাজ করে ফেলবেন সেটা ভাবাটা সোনার পাথরবাটিতে দুধ খাবার সামিল কল্পনা হয়ে দাঁড়িয়েছে অবশ্য ।
তাছাড়া অপরাধী বা প্রতিশ্রুতি পালনে ব্যর্থ জনপ্রতিনিধিকে পাঁচ বছর সময় দেওয়ার বদলে পাঁচ বছরের মধ্যেই বরখাস্ত করার সাংবিধানিক নাগরিক অধিকার অর্জন করলেও মনসনবদারি ব্যবস্থাটি প্রকৃত গণতন্ত্র হয়ে উঠতে পারে । “ করছি , করব ” করে পাঁচ বছর কাটিয়ে ভাগ্য , কেন্দ্রীয় বা রাজ্য সরকারের নামে দোষারোপ করে অনেক প্রতিনিধিই সমবেদনা কুড়িয়ে নির্বাচনের পর নির্বাচন জিততে থাকেন । অনেকে এই কাজটাতেও মনসবদারিমূলক পেশী শক্তিই ব্যবহার করেন । এই দুরকম হিসেবেই অযোগ্য জনপ্রতিনিধিদের কবল থেকে গণতান্ত্রিক নির্বাচন প্রক্রিয়াকে বাঁচানোর একমাত্র উপায় হতে পারে নির্বাচিত প্রতিনিধিকে প্রত্যাহার করার সাংবিধানিক ব্যবস্থা । ব্যবস্থা এরকম হতে পারে যে একটি নির্বাচন ক্ষেত্রের ন্যূনপক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ নাগরিক সংশ্লিষ্ট নির্বাচন কমিশনের কাছে কোনো একজন প্রতিনিধিকে প্রত্যাহারের লিখিত আবেদন জানালে প্রত্যাহারের সপক্ষে মতদান / নির্বাচন আয়োজন করা হবে এবং সংখ্যাগরিষ্ঠের মতটি প্রতিষ্ঠিত হবে ।
আরেক দফা নির্বাচনকে খরচ সাপেক্ষও মনে হবে না যদি নির্বাচনে কমিশন নিয়ম করে দেন বা সংবিধানের নির্বাচনী ধারাগুলোতেই নির্ধারণ করে দেওয়া হয় যে যে কোনো নির্বাচনী ক্ষেত্রের যাবতীয় নির্বাচন হবে বছরের একটি নির্দিষ্ট দিনে যেমন , এপ্রিল মাসের দ্বিতীয় রবিবার । কারণ এই সময়ে প্রাকৃতিক দূর্যোগের সম্ভাবনা আসমুদ্র হিমাচলব্যপী ভারতবর্ষে সবচেয়ে কম । হিংসাত্মক ঘটনা যাঁরা ঘটান তাঁদের প্রতিহত করার জন্য অবশ্য অনেক অনেক পরিমাণে নিরাপত্তা বাহিনী লেগে যাবে তাতে । সেক্ষেত্রে এপ্রিল মাসের দ্বিতীয় থেকে চতুর্থ রবিবারকে ব্যববহার করা যায় নির্বাচনের দিন হিসেবে । এছাড়াও চালু বিধানসভাগুলোর মেয়াদ চার বছর থেকে পাঁচ বছর ছমাসের মধ্যে বেঁধে ঊনত্রিশটা বিধানসভা এবং সাতটা কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের মোট ছত্রিশটা নির্বাচনকে প্রতি বছরে তিনটে করে রাজ্যের বিধানসভার নির্বাচনে ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের নির্বাচনে সীমিত করে ফেলা যায় । আরেকটা বছরে লোকসভা নির্বাচনের ব্যবস্থা করা যায়। পঞ্চম বছরকে রাখা যায় সমস্ত পঞ্চায়েত ও পৌরসভা নির্বাচনের জন্য । অথবা এই শেষদুটো নির্বাচনকেও সংশ্লিষ্ট বিধানসভা কেন্দ্রের নির্বাচন বা লোকসভা নির্বাচনের সাথে একই দিনে ঘটানো যায় । তাতে কেন্দ্রীয় নিরাপত্তাবাহিনীর প্রয়োজন কিছুটা কমানো যায় কারণ হিংসার লগ্নীকারীদেরও একই দিনই একাধিক প্রতিনিধির নির্বাচনে পর্যাপ্ত হিংসুটে/মারকুটে লোক জোটাতে খানিকটা বেগ পেতে হবে । তারওপর এক নির্বাচনী ক্ষেত্রে দায়িত্বপালনে ব্যর্থ কিংবা পরাজিত প্রার্থীকে একাধিক পদে মনোনীত করা রাজনৈতিক দলগুলোর জন্যও মুশকিল হবে ও তাদের সমর্থনে পর্যাপ্ত হিংসুটে/মারকুটে লোক জোটাতে আরও বেশি বেগ পেতে হবে তাদের । কারণ দেখা যায় যে পঞ্চায়েতসফল নেতাকে মন্ত্রীত্ব দেওয়া হলে তাঁরা অনেকসময় ব্যর্থ হন ও পঞ্চায়েতের ক্ষমতায় ফিরে নিজ এলাকায় দখল আর শাসন কায়েম রাখার স্বাচ্ছন্দ্যে ফিরে যান । একই দিনে পঞ্চায়েত / পৌরসভা এবং বিধানসভা বা লোকসভার নির্বাচন হলে কোথায় কোন প্রার্থীকে দেওয়া হবে সেটা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো আভ্যন্তরীণ অশান্তিতেও জেরবার হয়ে যেতে পারে ও , ফলে , তাদের পক্ষে প্রশাসনিক অশান্তি বাঁধানোও দুরূহ হয়ে যেতে পারে । মানে আভ্যন্তরীণ মনসবদারি কোন্দলে প্রশাসনিক ব্যবস্থায় আতঙ্ক ছড়ানোর জন্য পর্যাপ্ত সংখ্যায় যোদ্ধৃ পাওয়া দুরূহ হয়ে উঠতে পারে। তাছাড়াও এক এলাকার গুণ্ডাবাহিনী সেই এলাকার স্থানীয় সংস্থার নির্বাচন ছেড়ে অপর এলাকায় বিধানসভার লোকসভার নির্বাচনে গিয়ে অশান্তি পাকাবার সময় ও সুযোগ দুটোই নাও পেতে পারে । এতে কেন্দ্রীয় নিরাপত্তাবাহিনীর প্রয়োজন কমতে পারে । সেক্ষেত্রে উদ্বৃত্ত পঞ্চম বছরে সমস্ত অন্তর্বর্তী নির্বাচন করে ফেলা যেতে পারে ।
এটাও সোনার পাথরবাটিতে চাটনি চাটার মতো লাগলে নাগরিক ম্যানিফেস্টো বানানো যায় । একেক নির্বাচন ক্ষেত্রের নাগরিকরাই কী কী চাই আর কী কী চাই - নার ফর্দ বানিয়ে পাড়ায় ফেস্টুন/ হোর্ডিং লাগাবেন, স্থানীয় কেবল নেটওয়ার্কে ( নেটওয়ার্ক ডিস্ট্রিবিঊটরের দাবিও ফর্দে রেখে ) জনস্বার্থে ( নিঃখরচায়? ) প্রচার করবেন, তা বাদে সোশ্যাল মিডিয়াতেও প্রচার করা যায় । বিভিন্ন দলের নানান প্রার্থীর মধ্যে যাঁরা নাগরিক পছন্দের সঙ্গে একমত হয়ে রাজনৈতিক দলের মধ্যেকার দলগুলির নিজেদের খরচে করা প্রাথমিক নির্বাচনে জিতে সমগ্র নির্বাচন ক্ষেত্রের প্রতিনিধিত্ব করার যোগ্যতা অর্জন করবেন নির্বাচন কমিশন পরিচালিত নির্বাচনে তাঁকেই প্রতিনিধিত্বে বরণ এবং প্রয়োজনে বরখাস্ত করা যাবে ।
যতদিন না এসব করা যাচ্ছে ততদিন প্রতিশ্রুতি পালনে ব্যর্থ জনপ্রতিনিধিকে প্রতারণার ফৌজদারি মামলায় ফাটকে পোরার ব্যবস্থা করাই যায় । অর্থাৎ প্রত্যেক জনপ্রতিনিধিকে তাঁদের নির্বাচকসমষ্টির প্রতি , নির্বাচনক্ষেত্রের প্রতি দায়িত্বশীল করে তোলার জন্য ব্যবস্থা নেওয়াই যায় । সমষ্টিগতভাবে সেই দুঃসাহসটা করতে হলে বুঝতে হবে যে মিলিটারি ক্যাম্প করার জন্য আমাদের মাঠটা ছেড়ে দিতে হলেও তাত্র দেশ সুরক্ষিত হব, কিংবা আমার বাগান আর ক্ষেতের খানিকটা হাইওয়ের জন্য দিলে কাল আমার বসত ভিটাটা ঢাবা, ঢাবা থেকে হোটেল হতে পারে । ভবিষ্যতের লাভের দিকে তাকিয়ে বর্তমানের ক্ষতি স্বীকার করার জন্য প্রস্তুত হতে হবে। ঘুষ দিয়ে কাজ হাসিলের ব্যবস্থা ছেড়ে যুক্তি দিয়ে হক আদায়ের চেষ্টায় লাগতে হবে । জনপ্রতিনিধিকে দায়িত্ব বোঝাবার আগে নিজেদের দায়িত্ববান হতে হবে ।
অতএব সোনার পাথরবাটিটা যতক্ষণ না কাঁচ / প্লাস্টিক / ইস্টিলের মতো বাস্তব হয়, সে পর্যন্ত না হয় গলা মেলাই আর তাল দিয়ে যাই , “ তুমিই আমার সিপিএম , তুমিই আমার এটিএম , তুমিই আমার সিরিজ প্রেমের শেষটা ” , “ তুমিই আমার তৃণমূল , তুমিই আমার টোপাকুল , তুমিই আমার সিরিজ ভুলের শেষটা” কিংবা তুমিই আমার বিজেপি, তুমিই আমার জিলাপি,তুমিই আমার সিরিজ লোভের শেষটা ।
ঋণঃ
১। Introduction to the Constitution of India, 18th Edition, Acharya Durga Das Basu,
২। http://rajyasabha.nic.in/rsnew/rsat_work/chapter-8.pdf
৩। চন্দ্রবিন্দু।