আগুন শিখে ফেলার পর

সৌমনা দাশগুপ্ত ও ইন্দ্রনীল বক্সী

সৌমনা দাশগুপ্ত

আগুন শিখে ফেলার পর

চোখ আর কতটা সাঁতার পারে
উত্তল ছাদ
শুধুই গড়িয়ে যাওয়া
একলা মার্বেল
উদ্বাস্তু সে বর্ণমালা
কেবলই গল্প বলে
যেন সেইই কথক আজ
সন্ধ্যার আসরে
মুখোমুখি শব্দেরা বসে
যেন নিজেই নিজের পোর্ট্রেট
আঁকবে বলে অক্ষর নিয়েছে
হাতে সোনালি সবুজ
যেন কেয়ামতের দিন
ফসল পোড়ানোর ঋতু
বেজে উঠল অন্তিম ছেঁকায়

পুড়িয়ে ফেলার পর আর কোনও শর্তেই এগিয়ে নিয়ে যেতে পারছ না এই হরফের সারি। আর একটা ঢেউ, একটাই ঢেউ তোমার মাথার ভেতর থেকে নেমে আসছে। তুমি ওকে লাভা বলতে পার, এমনকি আগুন বলেও ডেকে ফেলতে পার, শুধু তোমার হাসির মধ্যে থেকে কিছুটা ছাই খলখল করে উঠবে আর চাপা দেওয়ার কথা ভাবতে ভাবতেও দেখবে কোনও দরজা বসিয়েও তুমি এই ধারাপাতকে আটকে ফেলতে পারছ না। একটা জ্বলন্ত পাথর এইমাত্র পুড়িয়ে দিল তোমার একমাত্র তাঁবুর কানাত। এই লম্বা এবং চ্যাটালো জিভকে আর সামলে রাখা যাচ্ছে না। শুধু ধোঁয়ার ভেতর চিৎকার করে উঠল এক অস্থির বর্ণমালা
শেষ অব্দি রূপোলি হতে হতে
লাল
লাল থেকে বেগুনি হয়ে গেল
ঘর
ছিটমহলের এই বাড়ি
সীমান্ত নামের একটা শব্দ
বারবারই নড়েচড়ে বসছে
ঘরের ভেতর কোনও ঘর
আদপে ছিল না অথবা তুমিও
ঘরের নেশায় আগুন শিখেছ
অধিকার বুঝে উঠতে উঠতেই
ফুরিয়ে যাচ্ছে শস্যপ্রজননের ঋতু
আর তোমার ঘরের মধ্যে সাপ
আদপে বাস্তুই ছিল না তবু
লকলকে সেই জিভ আদ্যন্ত
চেটে খাচ্ছে তোমার বসত

এরপর আগুন লিখে ফেললেই তোমার গল্পটা শেষ হয়ে যেতে পারে। তুমি শুধু কলম কামড়েই চলেছ। আর সেই লাভা তাঁর অন্তর্গত ক্ষরণে জ্বালিয়ে দিচ্ছে তোমার ইড়া ও পিঙ্গলা। কৌতুকের অন্যপাশে কটুক্তি বসিয়ে দিতে দিতে তোমার কাঠের তলোয়ার গুঁড়ো হয়ে যাচ্ছে। একান্ত ডোবার ভেতর পচে ওঠা পাটের থেকে সোনালি শ্বাস বের করে আনতে আনতে তুমি ক্রমেই আগুনের উপাসক হয়ে উঠছ

==============================================


ইন্দ্রনীল বক্সী


ট্যাক্সির হলুদ থেকে বেরিয়ে ফুটপাতে একরাশ ছাপা ছাপা মানুষজনের কলকলে ভিড়ের মুখোমুখি দাঁড়াই ।
কেউ গুড মর্নিং বলে না ...কেউ হ্যালো বলে না ... কাঁধ উচিয়ে কেমন তেড়ে আসে গুঁতিয়ে দেবে বলে !
কম্বলের মতো ধোঁয়াশার চাদর বিছিয়ে শহর শুয়ে আছে ফুটপাথ উঁচিয়ে । ফুটপাথে ফুটপাথে জলজ প্রাণীদের ভিড় , জ্যাক দ্যা রিপার একদিন এখান দিয়েই হেঁটে গেছিল কি নগর বেশ্যার অনুসরনে !

শহরের বাড়িরা নিত্য রঙ পালাটায় ...হলুদ থেকে বেগুনি , বেগুনি থেকে সবুজ ...সবুজ থেকে ...
শহরতলীর ভিড়ে গুঞ্জন শুধু বেঁধে বেঁধে থাকার উব্দাস্তু শিবির । গ্রামহারা , শহরহারা নির্জীব মানুষের নতুন মানচিত্র । একটা সালোঁর বড় মতো আয়নায় নিজেকে দেখে ফেলি একঝলক ...কি বিচিত্র ! কি বিভৎস! গেস্টাপো হানায় পুড়ে গেছে আমার উপজাতি শিবির , বাবা মা ,শিশুকন্যা , স্ত্রী... উপহাসের মতো কি করে যেন বেঁচে গেছি আমি , এক আমি ! আমার নসল বিলুপ্ত প্রায় ।
হাঁটতে হাঁটতে নদীর সীমান্তে দাঁড়াই । নদীর কালো জলে টুকরো ভেসে যায় সেই কবেকার সোনালী স্মৃতির বন্ধুতা । একে একে সবাই চলে গেছে ... কেউ হারিয়ে গেছে ভুগোলে, কেউবা স্বেচ্ছা হননে । রোগা হাড় জিরিজিরে শরীরে প্রশ্বাসে শুধু নীল ধোঁয়া উঠে আসে ... কি করব! ঝাঁপিয়ে পড়ব জলে ? নাকি ভীষণ রেগে প্রচন্ড বিস্ফোরণে জ্বালিয়ে দেব সমস্ত নির্মান ! আমার বুকে আর কতটুকুই বা উর্জা জমে আছে! এই সামান্য জ্বালানী দিয়ে আগুন জ্বালাব কি করে ?

এশহরের নিচে আরও একটা শহর আছে । ইঁদুরদের শহর । ওরা ভীষন সংঘবদ্ধ আর প্রতিশোধ পরায়ণ , ওদের দলে বরং নাম লিখাই ! নিঃশব্দে একটু একটু করে কুড়ে কুড়ে ওরা একদিন ধ্বসিয়ে দেবে এ শহরের যাবতীয় অহংকার অট্টালিকা । আমি দেখেছি ,প্রচন্ড প্রত্যয়ে ওদের লাল পুঁতির মতো চোখ , জিঘাংসার তীব্র ধাড়ালো দাঁত । ওরা পারবে , রোজ একটু একটূ করে মাটি সরাচ্ছে ওরা ওদের গোপন এজেন্ডায় । গোটা শহর জুড়ে মাটির নিচে ওরা বাংকার তৈরী করে রেখেছে । প্রতিআক্রমণ শুধু এখন সময়ের অপেক্ষা।

নদীর পাড় ছেড়ে এক ফাঁকা ময়দানে এলাম । দূরে দূরে বিক্ষিপ্ত কিছু শস্য খামার । এখনও বীজ বোনে চাষির দল ! এখনও শস্য দোলে দখিনা হাওয়ায় , এখনও চাষির উলঙ্গ ছেলে পাখি উড়ায় মাচায় বসে ।
ফিরে চলি শহর অভিমুখে , প্রাচীন গম্বুজের মাথায় যেখানে গোলা পায়রারা বসে থাকে কিংবা মর্চে ধরা লোহার গেট পেরিয়ে যেখানে অবিন্যস্ত বাগানে ফুটে আছে পিটুনিয়া । বৃদ্ধ টাঙাওয়ালা যেখানে কুয়োপাড়ে রোজ তার ঘোড়াকে স্নান করায়, সারি বেঁধে বসে মাটির পাত্র নিয়ে কুমোর আর মাদুর বিক্রেতারা । সেখানে এসে দাঁড়াই । দু দন্ড পরে এখান দিয়ে বাঁশি বাজিয়ে হ্যামলিন যাবে ...পিছুপিছু যাবে এশহরের সব শিশু !
জীর্ণ বাড়ির ফাটলে অযত্নে , অলক্ষ্যে অঙ্কুরদগম ঘটেছে অজানা এক চিকন চারাগাছের ... আমি দেখেছি , যাই সযত্নে তাকে তুলে আনি ... নিজের সবটুকু দিয়ে যদি দিতে পারি তাকে তার প্রয়োজনের মাটি।