ঢাকার অসুখ

সাকিরা পারভীন ও মুম রহমান

সাকিরা পারভীন

ঢাকার অসুখ

১.

এই ঢাকা তোমাকে নেবে না

ওর আর একটু যত্ন আত্তি প্রয়োজন

নানীর পানের বাটা

নানার জায়নামাজ

চাচাতো বোনটার উড়ুক্কু মন।

এই ঢাকা তোমাকে নেবে না

ঘুনি পেতে চুনো পুঁটি কই

দু’মুঠো শিউলি কুড়িয়ে

রাঙাতে বন্ধুতা

এক মুঠো মুড়িতে পাতা সই।

এই ঢাকা তোমাকে নেবে না

নারিকেল গুড়ের ক্ষীর লেবুর শরবত

শবইবরাতের রাতে

নির্ঘুম জেগে চেয়ে নেব

আল্লাহর অশেষ নেয়ামত।

এই ঢাকা তোমাকে নেবে না

নদীজলে পয়নিস্কাশন

মেঘের ডানায় ডানায় ঘুমিয়ে

গেল দেবদূত

বিস্মৃতপ্রায় শেখের ভাষন।

এই ঢাকা তোমাকে নেবে না

গোলাপের ঠোঁটে কলাগাছ

খরগোশ কচ্ছপ পিঠে হেঁটে চলে স্কুল

কত যে ক্লান্ত তালশাঁস।

এই ঢাকা তোমাকে নেবে না

মন খুঁড়ে অট্টালিকা কতো

পায়ের তলায় পিষে নিমফুল

হারিয়ে যাবে

নীরবে দুঃখদানা

দুঃখিত থতমত।



২.

ঢাকার কী যে হল

গলগল রক্ত

গড়িয়ে নাক কান গলা

মস্তিষ্ক বেয়ে

খাল কেটে কুমির ডেকেছি এনে

এখন দুকান কাটা

হাটি

রাস্তার মাঝ বরাবর দিয়ে।

হাডুডু দাড়িয়াবান্ধা

মাঠে কাদা খোঁচা

দর্শক বিহীন

করতালি

মুক্তির গান শেষ হলে

ফুঁসে উঠবে

গোরস্তানের সমুদয় মালি।

নির্বিকার নিশ্চিত ঘুমে

নিমফুল এই এপ্রিলে

ঢাকা তুমি ভালো থাকবে কবে

রবীন্দ্রনাথের ফুলে ফুলে

ঢলে ঢলে বইবে মৃদুগতি

হাওয়া

মানুষ মানুষ হলে

নিশ্চিত হবে তোমাকে

ঢাকা পাওয়া।


================================================

মুম রহমান

ঢাকার অসুখ

যক্ষা আজকাল কারো হয় না। একসময় হতো খুব। চেকভ, কাফকা, কিসট, সুকান্ত, ঋত্বিক ঘটক মরে গেলো যক্ষায়। যার হয় যক্ষা তার নাই রক্ষা- এমনি বলতো সবাই। তবে কি ঢাকা শহরের রক্ষা নাই। এই যে গল গল করে রক্ত পড়ছে ঢাকার বুক থেকে, মুখ থেকে। এই ঢাকার ফুসফুস নষ্ট হয়ে গেছে, একদিন হৃদপিণ্ডের গতি নষ্ট হয়ে যাবে, কিডনি, লিভার কাজ করবে না। গলায় রক্ত তুলে মরবে ঢাকা।

কাঁঠালের উপর মাছি ভ্যান ভ্যান করছে। নীল, বড় একটা মাছি, একদম ভন ভন করে উড়ছে। আর্মির হেলিকপ্টরের মতো লাগছে ওটাকে। মনে হচ্ছে টহলে বেরিয়েছে। রোকসানা চেষ্টা করছে মাছির পা দেখার। কয়টা পা থাকে মাছির? সে কাঁঠাল পছন্দ করে না। এর গন্ধটা তার উগ্র লাগে। আর কাঁঠাল ভাঙলেই মাছি। আচ্ছা, আর কোন ফলের ক্ষেত্রে কি ভাঙা শব্দটা ব্যহার করা হয়? হুম, নারকেল ভাঙে, কাঁঠাল ভাঙে... আর কিছু! অর্থহীন চিন্তাভাবনা করছে রোকসানা। ইদানিং এক অর্থহীনতা তাকে গ্রাস করেছে। পা-কাটা যাওয়ার পর বিছানায় শুয়ে আর কীইবা করতে পারে সে? একবার ভেবেছিলো আত্মহত্যা করবে। অনেক ব্যথানাশক আর ঘুমের ওষুধ দিয়েছে ডাক্তার। একসাথে সবগুলো গুলে খেয়ে ফেললে নিশ্চয়ই মৃত্যু অবধারিত। কিন্তু তবুও মরা হয় না রোকসানার। বিছানায় শুয়ে কাঁঠালের মাছি দেখে আর দেখে অসুস্থ-রুগ্ন ঢাকাকে। খুবই শীঘ্রই রোকসানা আলগা পা লাগাবে। একটু চেষ্টা করলেই পাজামা দিয়ে ঢাকা আলগা পা নিয়েই সে হাঁটতে পারবে। কিন্তু এই শহরটা? এই প্রিয় ঢাকা কি সুস্থ হবে? যক্ষা রোগীর মতো হাপাচ্ছে, ফুপাচ্ছে, কাশছে পুরো ঢাকা শহর। এই ঢাকার কি কোন মুক্তি নাই?

- ওষুধ খাইছো?

রোকসানা কোন উত্তর দেয় না। ফ্যালফ্যাল তাকিয়ে থাকে। কথা বলতে তার ভালো লাগে না। আগে হলে, কাজল চেঁচিয়ে উঠতো, কথা কও না ক্যা! ভং ধরছো! ঝিম মারা লোক আমার পছন্দ না। কিন্তু কাজল এখন চেঁচায় না। সব সময় মিষ্টি সুরে কথা বলে। রোকসানা আগে জানলে নিজেই নিজের পা কেটে ফেলতো, তাতে অন্তত কাজলের এই মিষ্টি ব্যবহারটা উপভোগ করতে পারতো আরো অনেকদিন। কিন্তু ব্যবহার যতো মিষ্টিই হোক, কাজলের কষ্ট হয়ে যায়। ছেলেরা কি এই সব পারে? টয়লেট করানো, মুখে তুলে খাবার খাইয়ে দেয়া? কাজল অবশ্য ভালোই পারে, না পেরে উপায় কি! অপশন না-থাকলে মানুষকে অনেক কিছুই করতে হয়।

কাজল একটা ভেজা টাওয়েল নিয়ে আসে। রোকসানার চোখ মুখ মুছিয়ে দেয়। ঘাড়ের কাছে আর বুকের মাঝেও তোয়ালে বুলিয়ে দেয়। রোকসানার বলতে ইচ্ছা করে, তোয়ালে রাখো, তোমার হাত দিয়ে মুছিয়ে দাও। কিন্তু বলে না। কাজল একটা চিরুনি দিয়ে রোকসানার চুলগুলা আচড়াতে থাকে। একটা পনিটেল করে দেয়। কপালে চুমু দিয়ে একটা টিপ পরিয়ে দেয়। রোকসানার চোখে পানি আসে।

- কী হলো?

- ঢাকা খুব অসুস্থ।

- কে?

- এই শহর, এই ঢাকা শহরের যক্ষা হয়েছে।

- ভালো হইছে।

- ভালো হইছে! শহরটে মরছে। কেউ কিছু করবে না।

- ওঠো, হেলান দাও, নাস্তা দেই।

- উঠবো না। হেলান দিবো না। নাস্তা খাবো না।

- প্লিজ কুসুম।

কাজল বিয়ের আগে রোকসানাকে কুসুম ডাকতো। বিশেষ করে আদরের মুহূর্তেগুলোতে। ইদানিং আবার কুসুম ডাকে। অসুখের অনেক সুবিধা। বাড়তি আদর যত্ন পাওয়া যায়। ওষুধ-পথ্য-সেবার মধ্যে কতো প্রেমই না লুকিয়ে থাকে। কিন্তু ঢাকার সেবাযত্ন কে করবে? ঢাকার চিকিৎসা কে করবে? ঢাকা তো একটা বিরাট পতিতালয়ের মতো, এখানে সবাই আসে, ফূর্তি করে, টাকা ওড়ে। তারপর লাভ কিংবা লস নিয়ে চলে যায় যে যার পথে। এই পতিতালয়ে শরীর আছে, মাংস আছে, ভোগ আছে, কিন্তু লেবুর শরবত নাই, শিউলি ফুল নাই, গুড়ের ক্ষীর নাই। রোকসানা ভাবে, এই শবেবরাতে ঢাকার জন্যে বিশ রাকাত নফল নামাজ পড়বে সে। কেমন করে সে নামাজ পড়বে? জায়নামাজে তো বসতে পারবে না। নানার জায়নামাজটা তার কী প্রিয় ছিলো।

সেটা ছিলো ঊনিশশ পঞ্চাশ-টঞ্চাশের কথা। তখন নানা হজ্বে গিয়েছিলো। তখনকার হজ্ব এতো সোজা ছিলো না। হজ্জ্বে যাওয়া এক অর্থে মৃত্যুর প্রস্তুতি। সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে হজ্জ্বে যেতে হতো। নানাজান ঠিকই হজ্ব থেকে ফিরলেন, সুস্থ-স্বাভাবিক। তার চেহারায় কেমন একটা মিষ্টি-তারুণ্য চলে এলো। গায়ের রঙ আরো টকটকে। চোখে সুরমা দিয়ে, মুখে মিষ্টি পান দিয়ে পাঠ করতেন, ইয়ুবাশ্শিরুহুম্ রব্বুহুম বিরহামতিম মিন্হু অরিদ্ব্ওয়া-নিওঁ অজ্বান্না-তিল্ লাহুম্ ফীহা-না‘ঈমুম্ মুক্বীম্। কে জানে, প্রতিপালকের এই রহমত আর সন্তুষ্টির সংবাদ নানাজানের কাছে এসেছিলো কি-না। হয়তো জান্নাতের স্থায়ী নিয়ামতে পেতেই হজ্জ্ব থেকে ফেরার সপ্তাহখানেরে মাথায় তার মৃত্যু হলো। মৃত্যু শয্যায় নানাজান রোকসানাকে বললো, তোরে আমি মেয়ের মতো পালছি, তোর বাপের অভাব বোধ করতে দেই নাই, তুই ক, আমার কাছে কি চাস?

রোকসানা বললো, তুমি ঠিক হয়ে যাও, সুস্থ্ হয়ে ওঠো নানাজান।

- আমি ঠিক আছি রে পাগলি, এর চেয়ে বেশি সুস্থ ছিলাম না কখনো, যাই রে, আমার ডাক আসছে।

- তোমার জায়নামাজটা আমারে দিয়া যাও।

- আইচ্ছা।

এই ‘আইচ্ছা’টা ছিলো নানা জানের মুখের শেষ কথা। রোকসানা আজও জানে না, কেন সে জায়নামাজটা চেয়েছিলো। সে নামাজি না। কালে ভদ্রে দুয়েক ওয়াক্ত নামাজ সে পড়ে। কিন্তু নানাজানের কাছে জায়নামাজটা কেন চাইলো সেটা আজও রহস্যময়। তবে মক্কা থেকে আনা মখমলের সবুজ জায়নামাজটা বড়ই সুন্দর, কোমল। বসলে মনে হয়, এক অবারিত মাঠে বসে আছে সে।

বাসাবো মাঠটা কারা যেন ঢেকে দিয়েছে। সম্ভবত মসজিদ কমিটি। মাঠের ভেতর খোঁড়াখুড়ি হচ্ছে। মনে হয়, সার্জারি চলছে। এই মাঠ কি ডেভলাপারদের দিয়ে দেয়া হবে? দীর্ঘদিন মাঠটায় সবুজ ঘাস হয় না। দীর্ঘদিন এই মাঠে সবুজ শিশুরা আসে না। মাঠের বোধহয় আর প্রয়োজন নেই। হাতে হাতে মোবাইল আছে গেম খেলার জন্যে।

- ওঠো, কুসুম। আমাকে অফিস যেতে হবে না?

- তুমি চাকরিটা ছেড়ে দাও।

- বলো কি! খাবো কি?

- অন্য কিছু করো।

- কী করবো?

- আর যাই করো এই শহরটাকে হত্যা করো না।

- আমি! আমি এই শহরটাকে হত্যা করছি।

- হুম। তুমিও একজন ষড়যন্ত্রকারী। হত্যাকারী। তোমাদের ফ্যাক্টরি বুড়িগঙ্গাকে খাচ্ছে। তোমাদের কষ্ট হয় না, বুড়িগঙ্গাটা শ্বাস রোধ করে মারতে।

কাজলের খুব রাগ ওঠে। কতো আর সহ্য করা যায়। সারাদিন ফ্যাক্টরির হিসাব নিকাশ, লেবারদের সাথে হাউকাউ, তারপর ঘরে ফিরে আসা। একটা কাজের লোক নেই। ডাল-ভাত রান্না, রোকসানার ওষুধ পথ্য, সব কিছু তাকে একা দেখতে হয়। একটা ছুটা বুয়া ছিলো, ঘরদোর ঝাড়মুছ আর কাপড় ধুতো। তিনকাজে পনেরশ টাকা। সেও এখন নেই। এইসস ঝামেলার মাঝে রোকসানার কথা-বার্তা, পাগলামি তার অসহ্য মনে হয়। ডাক্তার নজরুল অবশ্য বলেছিলো, আপনার খুব কষ্ট হবে। মানুষ পঙ্গুত্বকে সহজে মেনে নিতে পারে না। আপনার স্ত্রী আবেগি মানুষ। তার আরও কষ্ট হবে। আপনাকে মানিয়ে চলতে হবে। আমরা শুধু রোগীর শারীরিক বেদনা দেখি, মানসিক কষ্টটা দেখি না। কাজলের ইদানিং খুব বলতে ইচ্ছা করে, রোগীর সেবাকারীরও কষ্ট হয়, শারীরিক, মানসিক- সেটা কি কেউ দেখে?

- দেখো কুসুম, শহরের আলাদা কোন প্রাণ নেই। মানুষই হলো শহর। শহরের শরীর বলো, মন বলোÑ মানুষই সব। মানুষ বাঁচলেই শহর বাঁচবে। ওই যে পুরো শহরটা ধ্বংস হয়ে গেলো, রাতারাতি, সেই পম্পেই শহরের মানুষগুলো বেঁচে থাকলো শহরটা ঠিকই বেঁচে উঠতো।

- জানো, নিমগাছটা কেটে ফেলেছে?

- কোন নিমগাছ?

- পাশের বাড়ির বড় নিমগাছটা। ওখানে ফ্ল্যাট হবে।

- বনফুলের নিমগাছটার কথা মনে আছে?

- আমরা যখন প্রেম করতাম, তখন তুমি আমাকে এ গল্প পড়ে শুনিয়েছিলে, টিএসসি’র বারান্দায়।

- এখন বুঝি আমরা প্রেম করি না।

- না। অসুস্থ শহরে প্রেম হয় না।

- কি বলছো, এ সব! আমি তো তোমাকে ভালোবাসি কুসুম। আমাদের প্রেম...

- ওই দেখো!

- কী!

- দেখো জানালা দিয়ে।

- কী দেখবো?

- আমার পাশে বসো।

কাজলের হাতে সময় নেই। তাকে যেতে হবে নদীর ওইপারে। কেরানিগঞ্জের ফ্যাক্টরিতে বসে সে। তবু রোকসানার পাশে বসে। রোকসানা ধারা বর্ণনার মতো বলতে থাকে। যেন তার জানালাটা একটা সিনেমার পর্দা।

- ওই দেখো ছোট্ট মেয়েটি। ওর পিঠের উপর কতো বড় বোঝা!

- ওটা তো স্কুল ব্যাগ।

- হু, বিদ্যার বোঝা। বোঝার ভারে ওর বেনি দুটোও দোলে না। কী ক্লান্ত মেয়েটি? ওকে কি কেউ তাল শাঁস কিনে দেয়? ওকে কি সবাই খরগোশ আর কচ্ছপের গল্প শেখায়? আর ওই দেখো, ওই টিংটিংয়া লোকটিকে। কোনদিকে না তাকিয়ে রাস্তা পেরুচ্ছে। কি ব্যস্ত! পাশের লোকটাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিলো। যেন ফুটবল ময়দান। একটা অদৃশ্য বলের দিকে ছুটছে।

- এবার যে আমাকেও ছুটতে হবে কুসুম।

- সবাই ছুটছে। এই শহরে সবাই ছুটছে। শহরটা যে ধুকে ধুকে মরছে সেটা কেউ দেখছে না। হয়তো আমি পঙ্গু বলেই...

- ওই কথাটা আর কখনও বলো না। তোমার পায়ে পড়ি...

- আমার পা নেই।

কাজল আর কিছু বলতে পারে না। ফ্যালফ্যাল তাকিয়ে থাকে। স্লোমোশনে ওঠে। রোকসানার কপালে আরেকটা চুমু খেয়ে বেরিয়ে যায়।

রোকসানা হাতে মোবাইলটা তুলে নেয়। ফেসবুক ঘাটতে থাকে। কেউ খাচ্ছে, কেউ বেড়াচ্ছে, কেউ সাজগোজ করছে, কেউ কবিতা লিখছে... সবাই যার যার মতো ব্যস্ত। কেউ খেয়াল করছে না, ঢাকা শহরটা মারা যাচ্ছে, ধীরে ধীরে মারা যাচ্ছে। এখন যক্ষায় কেউ মরে না, কিন্তু ঢাকা শহরটা মরবে। অবহেলায় মরবে, যক্ষায় মরবে, ধূয়ায় মরবে, ধূলায় মরবে। এই শহরের পানি, বাতাস ক্রমশ বিষাক্ত হয়ে উঠছে। এই শহরের গা বেয়ে উঠে যাওয়া পিঁপড়ার মতো মানুষগুলো ক্রমশ আত্মহত্যা করছে।

রোকসানা চিৎকার করে, গায়ের সমস্ত জোর দিয়ে চিৎকার করে, বাঁচাও, বাঁচাও, এই ঢাকা শহরটাকে বাঁচাও।

ফ্ল্যাটবাড়ির বন্ধ দরজার চিৎকার ঘরের মধ্যেই মুখ থুবড়ে পড়ে থাকে। রোকসানার চিৎকার রোকসানার মতোই পঙ্গু, কোথাও পৌঁছায় না।