পার্শ্বমুখ

কুশল ইশতিয়াক ও হাসান মাহবুব

পার্শ্বমুখ

চুপি চুপি চোখ দ্বারা প্ররোচিত হই খুব;

দুপুর উৎকট হলে আঙুল আমারই দিকে,
হাতে ধারালো ছুরি— তারপর নিজস্ব মক্তবে বসাই
বিচার

কিন্তু
নিজেরে বিচার করা দূরহ— গজ ফিতা মেপে
বারবার খুন হই, ক্রোধ ও কামে

অত্যধিক জৈবিক চাহিদা স্ত্রীলোকের স্তনে, ভাঁজে,
গ্রীবায়, কিন্তু সহজ চাতুর্যে ভাসি— কানে কানে ভালোবাসা
উচ্চারণ করি অহঃরহ ;
অথচ নিখুঁত শব্দের মানে জানি না

যা হয়, মানুষ সম্পর্কে — টুকটাক ধারণা নিই আর কি
ফলত ছড়িয়ে দিলাম দুই হাত, আর জ্বরে লাল চোখ
পাঁপড়ি ; উঠোনে ফুটিতেছে ফুল— দেয়ালে
আক্রোশে ছুড়ে দিই অন্ধ থালা

যখন চোখ বাদী আর আমি আসামী —

দু খানি সত্য, আমারে হলুদ তামাশার রঙে চুবালো,
অতঃপর নিজেরে দেখে নিজেই
দিয়ে উঠি হাততালি

দু খানি সত্য, আমারে অকপট শেখায়, দুটি টান
মানুষ মাটিতে থাকে, মানুষ নারীতে থাকে —

মানুষ এড়াতে পারে না, শুধু, মাধ্যাকর্ষণ ও কাম।

ভন্ডের বিচার শুরু হলে মক্তবে
যারে তারে অগ্রাহ্য করি, নির্মোহে;
কি এক সহজ চাতুর্যে ভাসিতেছি— চারিদিক
থেকে প্রচুর হাসি ও হাততালি

ডালপালা ছড়ায়ে থাকি। ডালপালা মানুষের ডানা।


ধাঁধা

মানুষের মূর্খতা দেখে নির্মল হেসে ফেলি—

অবজ্ঞায়; পরিতৃপ্ত হয়ে হাসি,
ধরাকে সরাজ্ঞান করি— হাতের তালুতে
গোলক রেখে দেখাই জাদু কারুকাজ,

এবং জ্ঞান, অন্য হাতে যা পাই— তা পরিমাপক

কিন্তু কোনো জ্ঞান পর্যাপ্ত নয়, বৃক্ষাকারে ডালপালা
ছড়ালে ছড়ায় এ-কথা
ফলত উঁচুতে ঝুলতে থাকে দুষ্প্রাপ্য চাবি—
আর নিজে ছোট হতে হতে নিজেই
অদৃশ্য

কিন্তু আমি পুরাতন আদলে নতুনরে বাঁধি
জ্ঞানলব্ধ ঈর্ষায়, সবকিছু সহসা প্রাসঙ্গিক নয় —

ওদিকে নতুন থাকে ভাবলেশহীন, নতুনেরই মতো

তারে কিছুক্ষণ ভালো লেগেছিল
নিজেরে বাতাসতাড়িত দেখে সন্দেহ হয়— মানুষের চোখ, মুখ
নিয়ে খুঁতখুঁত করি

অত:পর আয়নার সম্মুখে নিজেই হয়ে উঠি বিভ্রান্ত

ধরনী আমার দিকে সাজালো, চোখ; ধরনী
আমার দিকে একচোট হেসে ফেললে খুব

নিজেরে মূর্খ দেখি— ধরনী আমারে চোখ তুলে তাকায়;
বারবার দেখি নিজেরে— আর লব্ধিত জ্ঞান বদলে বদলে যায়
বাড়তে বাড়তে অপর্যাপ্ত তবু; মানুষরে মূর্খ
বলতে এখন ভুলে গেছি

আমারে দেখে ফিক করে হেসে ফেলে, ধরনী....


কর্কটপুত্র

শরীরভর্তি ভান নিয়ে মহানন্দে আছি
দেয়ালে দেয়ালে ঝুলছে পা, দুলছে সকল
খামখেয়ালিপনা

ঝাঁকড়া চুলের মাঝে কিছু ফুল জন্মাল
তার মাঝে দূর্গম কিছু বন্যতা
ছিল

আমার শরীরভর্তি ভান, আর অবাধ নগ্নতা—
শুনে তোমাদের শিশ্ন কি খাড়া হয়ে ওঠে?
তোমাদের স্তন কি খাড়া হয়ে ওঠে?
মানুষ! আত্মহত্যা আশ্চর্য শিল্প
তোমার আত্মার কাছে। চাঁদ আশ্চর্য আর জল আশ্চর্য
তোমার উঠানে— উঠানে গড়াগড়ি খেল রোদ;
সূর্যের গলায় ছুরি ধরে কে?
সূর্যের গলায় ছুরি চালাবার সাহস

আমার আত্নার আছে। কুশলাত্মা
পুরোপুরি ধ্বংস হোক। শরীরভর্তি ভান আর
মাটির থালা ধ্বংস হোক

তোমার সাথে
বেহেশত বা দোজখে
দেখা হওয়ার আগে



=================================================

হাসান মাহবুব

আসমানি ক্রীড়া প্রতিযোগিতার ফলাফল
(১)
আজকে নক্ষত্রদের বড় আনন্দের দিন। আকাশ ভরা যেসব তারা আমরা দেখি রাতে, দেখে মুগ্ধ হই, নয়তো হারিয়ে যাওয়া কাউকে খুঁজতে গিয়ে বিমর্ষ হই, অথবা মহাবিশ্বের বিশালতা এবং তার সৃষ্টিপ্রণালী নিয়ে সংশয়ী অবিশ্বাস নিয়ে ঘুমুতে যাই, কেউ আলো ধার করে তাদের কাছ থেকে ঝিকিমিকি, আজ সেসব রহস্যময়, সুন্দর এবং উদার নক্ষত্রের উৎসবের দিন।
এ ওর গায়ে গিয়ে পড়ছে, সে তাকে নিজের ঔজ্বল্যের অহমিকা দেখাচ্ছে বিনয়ে, হাসছে তারা। হাসছে তারারা। তারার হাসি দেখার সৌভাগ্য কজনের হয়? খুব কম জনের। সেই কমজনদের ভেতরে একজন, মনুষ্যপ্রজাতির একজনকে তারাই উপযাচক হয়ে নিয়ে এসেছে নিজেদের সৌন্দর্য দেখাতে। সপ্তর্ষিমন্ডল, ক্যাসিওপিয়া, দ্যা গ্রেট বিয়ার- তারাদের পাড়ায় মচ্ছব বসেছে। আলোর মৌচাক যেন একেকটা নক্ষত্রপুঞ্জ ।মহাবিশ্বের যাবতীয় রহস্য, বিশালতা এবং বিতর্ক ভুলে গিয়ে তারা যেন পাশের বাসার ভাইটি!

-আমাকে কেমন লাগছে দেখতে?
-বাহ ছোট্ট, সুন্দর, ঝিকিমিকি!

সপ্তর্ষিমন্ডলের সাত তারাদের একজন, ক্রতু জিজ্ঞাসা করে মানুষটিকে। তাকে দেখে ছেলেমানুষী উৎসাহে ছুটে আসে পুলহ, পুলস্ত, অত্রি, অঙ্গিরা, বশিষ্ট, মরীচি। কত প্রশ্ন তাদের!
-এই আমাদের নাকি প্রশ্নবোধক চিহ্নের মত দেখায়?
-আচ্ছা আমাদের চিনে নিতে অসুবিধে হয়নি তো?
-উত্তরদিকের আকাশে সন্ধ্যা নেমে এলে চাইলেই কী আমাদের দেখা যায়?
-আমাদের নিয়ে সবচেয়ে ভালো কবিতাটি কে লিখেছে বলত?
-শরৎ আর হেমন্তকালে নাকি আমাদের দেখা যায়না?
মানুষটি তারাদের প্রগলভতায় উচ্ছসিত হয়ে রূপকথারঙ ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে হাসে। সে কত সৌভাগ্যবান! যে তারাদের নিয়ে এত গবেষণা, চর্চা, কবিতা, নাম- তাদেরকে আজ সামনাসামনি চর্মচক্ষে দেখতে পাচ্ছে! শুধু কী তারা? ছায়াপথের গোপন সুরঙ্গ দিয়ে চলে গিয়েছিলো নোভা, সুপারনোভার কাছে। সুপারনোভার আবির্ভাবে তুষারযুগ ফিরে আসবে কিনা পৃথিবীতে তা ভাবতে বয়েই গেছে তার। সুপারনোভা সবচেয়ে চঞ্চল তারা, তার দুষ্টুমিতে অন্যদের তিষ্টানো দায়। নীহারিকা সবচেয়ে শান্ত। ঠান্ডা ঠান্ডা কুয়াশা আলো। মানুষটি তার কাছে গিয়েই আড্ডা দেবে খানিক, ভাবে।
-আচ্ছা ব্যাপার কী বলতো? আজ তোমাদের এত আনন্দ কেন?
-আজ আমাদের ক্রীড়া উৎসব।
লাজুক হসে বলে কোন এক নীহারিকা।
-তোমাদের জন্যেই তো এতসব আয়োজন।
লজ্জা ভেঙে সে মৃদু উৎফুল্ল কন্ঠে বলে।
-আমাদের জন্যে?
-হু! এই এখন তুমি যাও আমি একটু ধ্রুবতারার কাছ থেকে ঘুরে আসি।
-আচ্ছা যাও।
মানুষটি উপভোগ করতে থাকে বিস্ময়কর এক অভিজ্ঞতা। তারাদের তীরবেগে ছোটাছুটি, তাদের নিজস্ব আতশবাজী সবখানে শুধু গতি আর রঙ। হলদে তারা, লাল তারা, সাদা তারা...নাক্ষত্রিক আবেশে সম্মোহিত হয়ে পড়ে সে।
ধ্রুবতারা একটু মাতবর গোছের। সবচেয়ে উজ্জ্বল কি না! আর ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে এক জায়গায়। পৃথিবী এবং নক্ষত্রমন্ডলীর আবর্তনে অন্য তারাদের অবস্থান পরিবর্তিত হয়, কিন্তু সে, একমাত্র সে'ই তার জায়গায় অনড়। এ কারণে সে 'আলসে বুড়ো' খেতাব পেলেও দিব্যি মেনে নিয়েছে তা।
- তো কিরকম লাগছে আমাদের আয়োজন?
-অপূর্ব!
মানুষটি উত্তর দেয়।
-আপনারা কি প্রতি বছরেই এরকম উৎসবের আয়োজন করে থাকেন?
মোহাবিষ্ট গলায় সে জিজ্ঞাসা করে।
-হাহা! আমাদের বৎসরের কোন ঠিক ঠিকানা আছে নাকি? এমনি ঘুরি ফিরি, তোমাদের আকাশের শোভাবর্ধন করি, এসব করেই আনন্দ দিয়ে আসছি তোমাদের মহাকালের হিসেবে।
কথার ফাঁকে সূর্য এসে ঘাড়ে চড়ল মানুষটার।
-এইযে ভাগ্নে কেমন আছো?
-আরে সুয্যিমামা! তোমাকে দেখে কী যে ভাল্লাগছে!
-বাইট্টা!
ধ্রুবতারা খোঁচা দিল সূর্যকে।
-এই আমি বাইট্টা, তাতে কী হয়েছে, মানুষদের সবচেয়ে কাছাকাছি আমিই থাকি। থাকি পৃথিবীর কাছে। তোমরা তা পারোনা বলে হিংসা হয় বুঝি?
-আরে ঝগড়া থামাও তো! এমন আনন্দের দিনে কেউ এরকম বাজে বকে নাকি? হ্যান্ডশেক করে মিটিয়ে নাও, তারপর চল যাই আ্যানড্রোমিডার কাছে।

আহা! আ্যানড্রোমিডা নিয়ে কত গান , কবিতা, ফিকশন! সূর্যের ঘাড়ে চড়ে বাইবাই করে ঘুর্ণন গতিতে চলে নিমিষেই পৌছে যায় আ্যানড্রোমিডার কাছে। চলতে চলতে তাদের মধ্যে কত কথা হয়!
--আ্যানড্রোমিডাকে নিয়ে চন্দ্রবিন্দু গান বেঁধেছিলো না?

"আ্যানড্রোমিডারা নর্থে
ব্ল্যাকহোল নিঃশর্তে
গিলে খাচ্ছে অতিবেগুণী আর পেঁয়াজী"
-হাহা! হ্যাঁ ওদের কাজ কারবারই আলাদা। মঙ্গল গ্রহকে নিয়েও একটা গান করেছিলো।
সূর্য সমঝদার সাংস্কৃতিক ভঙ্গীতে মাথা নাড়ে।
আট আলোকমিনিট পথ পেড়িয়ে এ্যানড্রোমিডার কাছে এসে মানুষটির চোখ ঝলসে যাওয়ার জোগাড়! আক্ষরিক অর্থেই তারার মেলা বসেছে সেখানে। তারারা এসেছে ক্যাসিওপিয়া থেকে, সপ্তর্ষিমন্ডল থেকে, কালপুরুষ, বুটিস মন্ডলী থেকে।

তারাদের গান
তারাদের হাসি
তারাদের গতি
বোঝা ভার মতিগতি!

-আমাদের উৎসব ভালো লাগছে তো? এসবই তোমার জন্যে। তোমাকে বিশেষ অতিথি করে নিয়ে এসেছি মনুষ্যপ্রজাতির পক্ষ থেকে!
-আহা আমার কী সৌভাগ্য! একজন মাত্র নির্বাচিত হয়েছে এবং সেটাই আমি?
-আমাদের সৌন্দর্য তো দেখলে সামনাসামনি, এবার বল কে সর্বশ্রেষ্ঠ?
-আরে রোসো! দাঁড়াওনা একটু বিহবল ভাবটা কাটতে দাও! যাদের এতদিন দূর থেকে দেখে এসেছি, তাদের এত কাছে পাওয়া, এ যে কী...

হঠাৎ একটা বিস্ফোরণের শব্দে সচকিত হয়ে ওঠে সবাই।
-ও কিছু না, হ্যাঁ বল বল। বলতে থাকো তুমি। থেমোনা।
-শব্দ কিসের?
-ও কিছুনা, তুমি বল।

সমস্বরে অনেক তারা বলে উঠলো নিজেদের পারফরম্যান্স সম্পর্কে মানুষটির মহামূল্যবান মতামত জানতে। কিন্তু বিস্ফোরণের শব্দ বেড়েই চলেছে।

এই মহাবিশ্বে কোথাও মৃত্যু এসেছে অনেকদিন পর। একটা সুপারনোভা পৃথিবীর খুব কাছে এসে বিস্ফোরিত হচ্ছে। বিস্ময়কর বিস্ফোরক মৃত্যু। আলোর ঝলকানিতে চোখ ধাঁধিয়ে যায়। এই উৎসব এখন বন্ধ হবে সেরকমই আকর্ষণীয় ভাবে। কৃষ্ণ গহবর থেকে বার্তা আসে।

-আমার খুব গরম লাগছে! আমার বয়স বেড়ে যাচ্ছে!
আতঙ্কিত কন্ঠে শঙ্কা প্রকাশ করে মানুষটি।

এ কথা শুনে কেমন যেন নিস্প্রভ হয়ে যায় নক্ষত্রদল। তারাও এই আশঙ্কাটিই করছিলো
-আচ্ছা, বয়স বাড়লে কী হয়? আমরা কত লক্ষ বছর ধরে একইরকম আছি, কিন্তু তোমাদের বয়স বাড়লে কিরকম যেন হয় বুঝিনা!
হতাশ কন্ঠে বলে সূর্য।
-সরে দাঁড়াও! ছয় হাজার ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায় আমাকে তো ভস্ম করে দিবে। যাও পৃথিবীর কাছে গিয়ে ওকে লাটিমঘুরানি দাওগে, তোমাকেই আমাদের প্রয়োজন একমাত্র শক্তির জন্যে। বাকি তারাগুলো চুলোয় যাক।
এহেন রূঢ় বাচনভঙ্গীতে আহত হয় তারারা। তাদের জোনাক জোনাক ঝলকানি বন্ধ হয়ে আসে।

অবিশ্বাস্য নীরবতা নামে মহাবিশ্ব জুড়ে। সুর্যই নীরবতা ভাঙে।
-তোমাদের জন্যে সব করতে রাজি, এবং করবও, কিন্তু বয়স বাড়লে আমাকে মামা ডাকো না কেন তোমরা? এটা বলো তো আগে!
-হুহ! হিলিয়াম আর হাইড্রোজেন ভর্তি শরীর দিয়ে জ্বালিয়ে মারছো অসহ্য উত্তাপে আবার আহ্লাদ করে মামা ডাক শুনতে চাও। শখ কত! উহ, সরে দাঁড়াও, ভীষণ গরম, ছয় হাজার ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড। আমি পুড়ে একদম অদৃশ্য হয়ে যাবো তো!
-আমি তোমার এত কাছাকাছি দাঁড়িয়ে আছি, ছয় হাজার ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রা হলে টিকতে পারতে এক মুহূর্ত? কেন বুঝতে পারছোনা এটা একটা বিশেষ পরিস্থিতি! আমাদের ক্রীড়া উৎসবে তোমাকে মনুষ্য সমাজের প্রতিনিধি হিসেবে নিয়ে এসেছি। সব মাটি করে দিওনা। ক্ষতি কিন্তু তোমারই হবে। যখন তোমাকে নিয়ে এসেছিলাম, তুমি ছিলে বালক, সময় পরিভ্রমণের হিসেবে দ্রুত বয়স বেড়েছে তোমার, তাতেই ভুলে গেলে নক্ষত্ররূপকথা? বিজ্ঞানের বুলি ছাড়ছো এখন! এরকম কেন তোমরা? বয়স তো আমাদেরও বাড়ে। বাড়ে না? আমরা তো পরিবর্তীত হইনা, তোমরা কেন এরকম হয়ে যাও?
মানুষটা সংশয়ে পড়ে যায়।
-আমি কোথায় এখন আসলে? অনন্ত নক্ষত্র বীথির রাবিশ রূপকথা রাজ্যে? নাকি কোন সুররিয়্যাল স্বপ্নে?
-রাবিশ! কথাটা একটু রূঢ় হয়ে গেলোনা? হ্যাঁ, এখন তুমি সেই রূপকথার রাজ্যেই। থেকে যাওনা এখানে চিরকাল!
-আবদার! ভোজবাজির খেলা দেখিয়ে বিভ্রমে রাখলে কিছুক্ষণ, তাতেই সব হয়ে গেলো, সুয্যিমামা ওরফে শ্বেতবামুন!
-এভাবে বলোনা। কষ্ট পাই।
-তোমার কষ্টের নিকুচি করি! বাস্টার্ড! উহ, গরমে মারা যাচ্ছি! সরে দাঁড়াও!

থমকে গেল সবাই। সূর্য, চাঁদ, ক্যাসিওপিয়া, সপ্তর্ষিমন্ডল, ছায়াপথ, নীহারিকা, বুটিসমন্ডলী, শিশুমার সবাই!
-এ কথা কেন বললে?
-তোমাদের জন্মের কোন ঠিক আছে? আমাদের না হয় বাবা-মা আছে। তোমাদের বাবা-মা কে? কারা?

স্তব্ধতার অনুরণন ছড়িয়ে পড়ে মহাকাশ জুড়ে।

-এই প্রশ্নের উত্তর তো তোমাদেরই বের করার কথা, তাইনা?

শোকার্ত কণ্ঠে বলে একটা ক্ষুদ্র তারা।

-হ্যাঁ, আমাদেরই বের করার কথা। আমাদের অনেক কাজ। রূপকথার জগতে খামোখা এতটা সময় নষ্ট করলাম! যাচ্ছি!

মানুষটা ছুটে চলে মহাকাশের হাইওয়ে ধরে, নাক্ষত্রিক সৌন্দর্যের প্রতি মোহ কেটে গেছে তার। লুদ্ধকের করুণ দৃষ্টি উপেক্ষা করে, ধ্রুবতারার স্থির চোখের ব্যাকুলতাকে পাত্তা না দিয়ে, ছুটে যায় সে পৃথিবীর দিকে, জীবনযাপনের সমীপে, মহাকাশের রূপকথাকে ডাস্টবিনে ফেলে দিয়ে, ছোটবেলার প্রিয় আকাশের তারা আর বড়বেলার বড়পর্দার তারাদের মধ্যে অসম তুলনা করে দ্বিতীয়টাকে শ্রেয় ধরে নিয়ে, লোকটা ছুটে যায়...

(২)
-ভাড়া দেন।
বাসের কন্ডাকটর তাড়া দেয় মানুষটিকে। কিন্তু সে হা করে তাকিয়ে ছিলো একটা তারার দিকে। বিলবোর্ডে আজকাল ভালো ফোটে তারার ফুল।
-ঐ মিয়া ভাড়া দিবেন না? কয়বার কমু?
সুর্যের প্রখর তাপে ঘামতে ঘামতে সূর্যের প্রতি অভিসম্পাত বর্ষণ করে সে পকেটে হাত দেয়।

(৩)
রাতের বেলা জানালা দিয়ে তারাভরা আকাশ দেখতে দেখতে মা'টি তার শিশুকে তারা দেখায়। রূপকথার গল্প বলে। শিশুটি তারার দেশের গল্প শুনতে ভালোবাসে।

(৪)

মানুষটি ছুটে চলছে মহাকাশ ধরে। মহাকাশের অবিশ্বাস্য বিশালত্ব, বিভ্রমময় ক্রীড়া প্রতিযোগীতা সবকিছু উপেক্ষা করে। সে ছুটে চলেছে অসীম থেকে সসীমের দিকে, সে ছুটে চলেছে তারাদের আলোকসজ্জার দিকে না তাকিয়ে। সে ছুটে চলেছে তার গ্রহের দিকে শান্তিময় তারাবাস ত্যাগ করে। অনন্ত তারাবাসের চেয়ে পৃথিবীর কারাবাস ভালোবাসে সে...


(৫)
-তারপর হল কী, ঐ যে তারাটা দেখছোনা, ধ্রুবতারা, সে অভিমানে গাল ফুলিয়ে থাকলো ও কথা শুনে। এখন তার মান ভাঙাবে কে...
-মামনি, ওটা কী?
আকাশ থেকে একটা পড়ন্ত বস্তু দেখে বালকটি জিজ্ঞাসা করে।
-ওটা হল উল্কা। কোথাও গিয়ে পড়বে। যেখানে পড়বে সেখানে একটা বিশাল গর্ত তৈরী হবে। আচ্ছা তারপর কী হল শোন...
শিশুটি মহানন্দে শুনতে থাকে নক্ষত্রের রূপকথা। আড়চোখে পড়ন্ত উল্কাটিকে দেখার সময় তার মনে হয় নি যে সে জাদুর আয়নায় নিজের বয়স্ক প্রতিচ্ছবি দেখছে। ও জানে শুধু আনন্দ। ও অভিমান করতে জানে। জানে না ক্রোধ, ক্ষোভ আর মাৎসর্যের রিপু সংবিধান। তারারা নেমে আসে জানলার কাছে। তারা মুগ্ধ চোখে দেখে রূপকথা রচিত হতে। তারা ফিসফিস করে বলে, বড় হয়ো না, রাগ করো না সামলে রাখো ক্রোধ...
তাদের সেই আহবান শুনতে পান শিশুটির মা। আগলে রাখেন বুকপিঞ্জরে। শক্ত করে বুকে টেনে নেন দেবশিশুটিকে। যেন সে শুনতে পায় নক্ষত্রস্পন্দন!