আক্ষেপ

ঈফতেখার ঈশপ ও সুবন্ত যায়েদ

ঈফতেখার ঈশপ

আক্ষেপ

তুমি ছিলে এমনই এক যাদুকর!
হুক খুলতেই বেরিয়ে পড়ে দু’দুটো আপেল;
আমি কীভাবে খাবো?
গিঁট খুললেই দেখতাম একটা হাঁ-করা কুমির;
আমাকে কীভাবে খাবে?

বিশ্বাস করো, আমি একটা আক্ষেপ নিয়ে মারা যাবো :
'ঈশ্বর আমাকে কেন দু’টো মুখ দিলেন না...'


রোমান্স

অর্গাজম পরবর্তী নিরবতায় জেনেছি,
তোমার উত্তেজনাকালীন চুমুতেও ছিলো
বিশ্বাসঘাতকতার ব্যাকটেরিয়া।




নিউটন, আপেল ও মিলটন

মনোরঞ্জক নারী
ক্লিভেজে
বুকপর্বতে
থেমে গেল এবারের দৃষ্টিযাত্রা;
ঘুমেরা ফিরেনি নয়ন বাড়ি।

নিউটনের সামনে আপেলেরা ঝরে গেলেও, মিলটনের সামনে মহাকর্ষকে হারিয়ে দিল রিয়ার বত্রিশ সাইজের বক্ষবন্ধনী।

সময় কাটে রমণী বাগানে; তবু আপেলেরা ঝরে পড়ে না..

===============================================

সুবন্ত যায়েদ

একটা টেলিফোন আসবে, কিংবা স্বপ্ন আসবে, মানুষ আসবে না


টেলিফোনটা বেজে গেলো কয়েকবার। সে ঘুমঘুমে স্বপ্নে টেলিফোনটা ধরবে বলে বার কয়েক পাশ ফিরে শুলো, কিন্তু চূড়ান্ত ঘুমটা তার তখন আর ভাঙ্গলো না। আলস্য ঘুমে মিতালি করে করে সেই বেলাটা পার হলে ঘুম ভাঙ্গা চোখ নিয়ে সে উঠলো। এবং দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে আয়েশ করে বসতে বসতে তার মনে হলো, আবারো ঝেপে আসতে শুরু করেছে কয়েক শতাব্দীর অপেক্ষমান ঘুম। তারপর সে আবারো তুলতুলে বালিশটা টেনে নিলো এবং ঘুমের ভেতরে পুনরায় ডুবিয়ে দিলো। আর তার ভেতরে স্বপ্নের মতো একটা জগত প্রচ্ছন্ন হয়ে এলে সে মনে করার চেষ্টা করলো একটা স্বপ্নে, দীর্ঘ ঘুমে তাড়া করে ফেরা একটা টেলিফোন। যেটা মেজাজ বিগড়ে যাবার মতো তীক্ষè স্বরে বাজছিলো, আর সে বুঝি ঘুমঘোর চোখে ভুতের মতো লম্বা হাতে টেলিফোনটা টেনে নিলো। ওপাশে ভরাট কণ্ঠে কোনো পুরুষ কথা বললে, সে চঞ্চল হয়ে নড়ে উঠলো আর টেলিফোনটা কানের সাথে মজবুত করে ধরলো।
তুমি ঈশপ?
হা, আজকে তোমার কাছে আমার আসবার কথা ছিলো। কিন্তু তার আগেই আমি ভীন দেশে উড়ে এসেছি দীর্ঘ মেয়াদে, হঠাৎ।
এক ধরণের ব্যথা নেমে এসে তার বুকজুড়ে, তারপর ছড়িয়ে গেলো রক্তের প্রতিটি শিরায়। আর টেলিফোনে রাখা হাতটা দুর্বল লাগলো খানিক। সে বললো, তুমি আসবে না তাহলে, সেটাও বলো নি। তোমার সাথে রাতের দীর্ঘতা মাপবো বলে দিনে অঢেল ঘুম জমাচ্ছি। তুমি আসবে না তাহলে!
আই এ্যাম সরি ফর। তবে এটা জেনেছো যে, আমি এই ক’দিনে, তোমার সাথে কিছু কথা বলে আর সামান্য কয়েকখানা ফটো দেখেই, কেমন মাতাল হয়ে গেছি। এই রাত আজ বহু প্রতিক্ষীত ছিলো আমার।
এই সব কথা থাক। মুখোশের ভেতর থেকে কথা বলাটা পছন্দ হয় না আমার।
মুখোশ?
হা, তোমরা শিল্পীরা, অসুন্দর আর নোংরাকে এমন কায়দায় বলো যে, মনে হয় কী মহান! অথচ সব ফেইক। তোমরা প্রেমে ফেইক বলে কামে পশু। মনে ভ-ামি, মুখে মাহাত্যের গান। তবু, শিল্পীদের আমি পছন্দ করি। একটা জীবনের যাবতীয় শিল্পিত নোংরামি কতো প্রকারে বিভক্ত থাকতে পারে, তাদের ছাড়া আমার সেসব অভিজ্ঞতার বস্তা ভরতো না। তাই তোমাদের বারবার ডাকি, আমারে আরো অভিজ্ঞতা দাও, নোংরা আর কুৎসিত অভিজ্ঞতা।
তোমার মেজাজ বিগড়ে আছে আসলে। একটু শান্ত হও, ঠা-া জল খাও। আর শোনো, সরি টু সে। আমি ফোনটা রাখছি। তোমার কথা হঠাৎ মনে হলো বলে ইমার্জেন্সি কলটা দিয়েছি। পরে কথা হবে। বাবাই।
একটা বিচ্ছেদের ধাক্কা খানিকটা জাগিয়ে তুললে চোখের পাতা খানিকটা টেনে তুলে বাহিরের ধূসর আকাশখানা সে দেখলো। তারপর বিষাদের ভারে চোখদুটো বুজে আসতেই গভীর জলের মতো কোথাও ডুবে যেতে থাকলো। তখন আবার টেলিফোনটা মেজাজ বিগড়ানো স্বরে বেজে উঠলে সে লম্বা হাতে তুলে নিলো।
ঈশপ বলো, আচ্ছা ধরো তুমি আমার কাছে আজ আসলে, মানে আমার দরজায় দাঁড়িয়ে আছো, কলিংবেল টিপছো।
হা তাইতো, ইন্টেরেস্টিং! আমি দাঁড়িয়ে আছি। এতো লেইট হচ্ছে কেনো, দরজা খোলো নিক্তি, ক্রিং ক্রিং...
নিক্তি? আচ্ছা শোনো, এবার তোমাকে এক গল্প শোনাই। সেটা হলো, তুমি আমার দরজায় এসে ধুকপুকানো বুক নিয়ে দাঁড়ায়ে আছো। আর আমি প্রায় নিরাভরণ হয়ে, বুকের ভেতরে এক বেলুন বাতাস পুরে বুক ফুলিয়ে দরজা খুলবো বলে খট্ করে এক শব্দ করলাম। তুমি চমকে উঠে কুচকানো মুখটা প্রশস্ত করে দরজা বরাবর দাঁড়ালে। কিন্তু আমি তোমার অপেক্ষা বাড়ালাম আর সেই সাথে বুকের ধুকপুকানিতে কিঞ্চিৎ গতি দিলাম। হয়তো সে এখনি দরজাটা খুলছে না, কিংবা সে হয়তো দরজার আশে পাশে নাই, এই ভেবে তুমি আবার মুখের সহজ ভাবটা ফিরিয়ে এনে আর শরীরটা ছেড়ে দিয়ে দাঁড়ালে, তখন দরজাটা খুলে যেতে দেখে তুমি আর প্রসন্নমুখে ফিরে আসার সুযোগটা পেলে না।
কিন্তু তাতে কিছু হলো না। যেটা হলো, আমার নিরাভরণ বুকের দিকে, মুখের দিকে, ঈষৎ মেদ জমা পেটের দিক থেকে চোখ ফেরাতে পারলে না। তুমি কবি, কিন্তু আমি জানি তোমার ভেতরে তখন কোন সে কবিতা পঙক্তি রচনা করছে। তখন তোমাকে ঘরের ভেতরে ডাকলাম আর তুমি এমন নার্ভাস হয়ে গেলে যে, বুকের ভেতরে আনাড়ি ধুকপুকানি শরীর-মন অবশ করে দিলো। যেনো যৌবনের প্রথম অধ্যায়ে দাঁড়িয়ে আছো কোনো যৌবতীর নগ্ন দেহের সামনে। তখন তোমার আসলে কী চাই?
আমি তিনটি জিনিশ এগিয়ে দিলাম তোমার দিকে, এই শর্তে যে, তিনটির যে কোনো একটি গ্রহণ করা যাবে।
এক, এক গ্লাস ঠা-া জল।
কারণ, তোমার কণ্ঠ শুকিয়ে তখন কাঠ, বুকের ভেতরে খা খা করছে জল বিনে। তোমার জল চাই।

দুই, লেখার খাতা আর একটা বলপয়েন্ট।
কারণ, তুমি কবি, শব্দশিল্পী, নারী দেহের সৌন্দর্য তোমার কাছে নিসর্গসমান। যার ছোঁয়ায় এলে তোমার খেয়ালি মনে, নিমগ্ন করোটিতে থৈ থৈ ঘোর এসে ভর করে। আর বৃষ্টির মতো নাযেল হতে থাকে পঙক্তি। তোমার দুই ছত্র লেখার মতো খাতা আর বল পয়েন্ট চাই।

তিন, এগিয়ে দিলাম আমার নিরাভরণ বুক, ঈষৎ মেদ জমা পেট, কিংবা আর যা কিছু আছে একটি যৌবতির নগ্ন দেহে। এখানে অবশ্য কোনো কারণ নাই, এটা জানার পরে যে, তুমি প্রথমত একজন পুরুষ।

একটা পুরুষের চোখ প্রথমত কোন দিকে বদ্ধ সেটা আমি জানি। কারণ আমি নারী এবং আমার আজন্ম অভিজ্ঞতা সে বিষয়ে কথা বলে। আর তুমি তাই দারুণ পিপাসার্ত সত্ত্বেও জলভরা গ্লাসের দিকে তাকালে না, তুমি বড়ো শব্দশিল্পী হওয়া সত্ত্বেও বল পয়েন্ট আর দুপেজ খাতার দিকে হাত বাড়ালে না। কারণ একজন পুরুষ সবার আগে পুরুষ-ই, আর কিছু না। তাই তুমি যাবতীয় আনাড়ি উত্তেজনা পরিহার করে বুকের ভেতরে বড়ো করে শ্বাস নিলে। তারপর উঠে এলে আমার বিছনার কাছে, যে বিছানার কাছে জমা দেয়া আছে আমার জীবনের অজ¯্র প্রকাশিত-অপ্রকাশিত অধ্যায়। কিন্তু সেসব অধ্যায় তুমি জানো না, কিংবা জানে সবাই, নতুন কাসুন্দির কালে পুরনো কাসুন্দি কেউ আর ঘাটে না। তুমি তাই এগিয়ে এলে সহজ পথে, যে পথে জার্নির ক্লান্তি নাই, স্মৃতির অসংলগ্ন হানা নাই। একটিবার চোখের দিকে তাকাও আমার, আমি আকুল হয়ে প্রার্থনা করছিলাম।
কিন্তু ওখানে তাকালে না ভুলবশত একটিবার, বুঝি জানতে, ওখানকার আগুনের দাউ দাউ জ্বালিয়ে দিতে পারে তোমার সত্তার যাবতীয় দৃঢ়তা। তুমি তাই আমার গাল ছুঁলে, ঠোট ছুঁলে সুডৌল বুকের দিকে তাকিয়ে, ঈষৎ সরু কোমরের দিকে তাকিয়ে। আমি বুঝি একটু নিভে গেলাম নাকি খানিকটা জ্বলে উঠলাম, তুমুল এক দ্বিধাবোধ আমাকে বুঝতে দিলো না সেসব। কিন্তু আমি নিজেকে সমর্পণ করে দিলাম একটি দীর্ঘশ্বাসের দামে। তখন আমিও আর চাইলাম না যে তুমি আমার চোখের দিকে তাকাও, তাই চোখ বুজে থেকে, সর্বাঙ্গে তোমার ছোঁয়া পেয়ে ছোটো ছোটো শীৎকার দিলাম। তখন হঠাৎ, তুমি আমাকে আর ছুঁলে না, আমি চোখ বুজে কতোক্ষণ অপেক্ষা করলাম। তারপর আলতো করে চোখ খুলে দেখলাম, তুমি আমার মুখের দিকে চেয়ে দারুণ ঘোরে মগ্ন হয়ে আছো। কী যে হলো হঠাৎ, মনে হলো তুমি আর সামান্যও প্রকৃতিস্থ নও। এজন্য হয়তো যে, একটি সত্তার ভেতরে অন্য কোনো সত্তা এসে নাড়া দিয়ে যাচ্ছে তোমায়। এবং সত্যি সেটাই, তখন বুঝলাম, যখন তুমি আমার মুখের বরাবর ঝুকে এসে আমার ঠোটে-মুখে-চুলে ছুঁয়ে ছুঁয়ে দিলে আর বলেলেÑ
তুমি ছিলে এমনই এক জাদুকর!
হুক খুলতেই বেরিয়ে পড়ে দু’দুটো আপেল;
আমি কীভাবে খাবো?
গিঁট খুললেই দেখতাম একটা হাঁ করা কুমির;
আমাকে কীভাবে খাবে?
বিশ্বাস করো, আমি একটা আক্ষেপ নিয়ে মারা যাবো:
‘ঈশ্বর আমাকে কেনো দু’টো মুখ দিলেন না...’
আহা, আমি দারুণ মুগ্ধ হয়ে গেলাম বলে জড়তার যাবতীয় স্তর ভেঙ্গে নড়ে উঠে উচ্ছাস প্রকাশ করলাম। শিল্পীদের সঙ্গমও আসলে মায়াময়, ভাবছিলাম। তখন তোমার ভেতরে জোড় তাড়া উঠলো আমার উপরে উপগত হবার। এবার বুকের ভেতরে বিঁধলো খানিক। তোমার স্পর্শ কেমন শাপের মতো শীতল মনে হলো হঠাৎ, কেনো যে তুমি আরেকটু মায়াময় করে তুলতে পারলে না! কিংবা তোমরা কেউ পারো নাই কোনো দিন।
কেমন এক গন্ধ পেলাম নাকে, উৎকট, নাক চেপে ধরলাম একবার কিন্তু গন্ধ কমলো না মোটে। ঠিক এমন এক গন্ধের কথা মনে পড়লো, তখন আমার প্রথম সঙ্গমের কাল। অবশ্য প্রতিটা সঙ্গমেই আমার প্রথম সঙ্গমের দৃশ্য মনে আসে। সে আমার প্রথম বয়সের প্রেমও বটে, অরূপ, তখনকার ফাইন আর্টসের তুখোড় মেধাবী ছাত্র। তখন আমার আঠারো চলে বলে এই ধান্দায় পথে পথে ঘুরি যে, কেমন করে ছেলেদের ছোবল দেয়া যায়, আর বুকের ভেতরে কেমন করে ছোবলের নীল বিষ ভাগাভাগি করে নেয়া যায়। তখন মনের কোঠরে অনেকের ভেতরে প্রথম হয়ে উঠলো অরূপ। এভাবে, প্রথম যেদিন সে আমার ঘরে এলো, তার সাথে আঁকার যাবতীয় সরঞ্জাম। বললো, তোমাকে আঁকবো রঙ্গের সকল উপাদান ব্যবহার করে।
আমি তখন দারুণ শিহরিত, বললাম, আমাকে আরো শিল্পিত করে তোলো। তোমার তুলির আচড়ে কেমন ম্যাজিক ছড়িয়ে যায় আমার দেহের সদর রাস্তায় আর অলি-গলিতে, দেখবো।
তারপর আমি পোশাকের সমস্ত জঞ্জাল ছাড়িয়ে তার ক্যানভাসের সামনে দাঁড়ালাম আনাড়ি ভঙ্গিতে। সে আমাকে কতোক্ষণ দেখলো, তারপর ভঙ্গি পাল্টাতে বললো। আমি একবার কোমর বাঁকা করে দাঁড়ালাম তো অন্যবার ঘাড় বাঁকিয়ে ভরাট বুকটা টান টান করে দাঁড়ালাম। এভাবে সে আমার সমস্ত ভঙ্গি দেখলো তাড়িয়ে তাড়িয়ে। আর বলে গেলো উত্তেজক কতোক ইংরেজি বাক্য। আমি বুঝলাম যে, ততোক্ষণে তার ক্লাসিক শিল্পসত্তা উধাও হয়ে গেছে আর পুড়তে শুরু করেছে আদিম আগুনে। সেই সূত্রে, সে ক্যানভাস ছেড়ে উঠে এসে আমার শরীরের বাঁক ছুঁয়ে কয়েকটি ক্লাসিক ভঙ্গির প্র্যাকটিস করালো। কিন্তু দারুণ উত্তেজনায় কাঁপতে কাঁপতে সে আর ক্যানভাসের সামনে ফিরে যেতে পারলো না। বরং সে যখন আমাকে দুর্বল ভঙ্গিতে কোলে তুলে নিয়ে বিছানার দিকে এগোলো, তখন আমি রিনরিন করে হেসে উঠে বললাম, এটাই কি সর্বোচ্চ ভঙ্গি তোমার, আমার শিল্পী সোনাই!
তখন তার মুখে আর কথা জোগালো না বলে চেহারায় তার পরিষ্কার হয়ে ফুটে উঠলো ভাষা, সে ভাষা আমি পড়তে পারলাম। আমরা আসলে সর্বোচ্চ ভঙ্গিটির দিকেই গেলাম। এবং সে যখন আমার উপরে পুরোপুরি উপগত হয়ে পড়লো তখন এক গন্ধ পেলাম যেটা ভীষণ উৎকট, নাক চেপে ধরে যে গন্ধ থেকে আসলে বাঁচা গেলো না। এবং মনে হলো, এই গন্ধের সাথে আমার কখনো কখনো পরিচয় ঘটেছিলো কিন্তু মাথা কুটেও সে আর মনে পড়লো না আমার।
ঠিক একই গন্ধ, একই রকম মুহূর্তে আমাকে ডুবিয়ে দিলো নতুন করে আবার। আর আমি হাতড়ে চললাম এর উৎসভূমি খুঁজতে, যেটা আদতে আমি পাইনি, কিংবা পেলাম না। কিন্তু এই গন্ধ আমার অচেনা না, ছোটো এই নশ্বর জীবনে একাধিকবার এই গন্ধের সাথে আমার পরিচয় ঘটেছে।
তোমার যাবতীয় উত্তেজনা শীতল হয়ে এলে টেবিলে গিয়ে ঠা-া জল খেলে। আর আমি উৎকট এক গন্ধরাজ্য থেকে বাহির হয়ে এসে বড়ো বড়ো দম নিলাম। আর তুমি একটার জায়গায় তিনটা অপশন ব্যবহার করে (জল খেয়ে, কবিতা বানিয়ে, এবং সঙ্গমে লিপ্ত হয়ে) বিজয়ীর মতো হাসলে। আমি তখন বললাম, তোমাকে আরো বিজয়ী বানিয়ে দিই। বলে আমি বাক্সো খুলে একটা বাঘের আর একটা হরিণের মুখোশ ও পোশাক এনে রাখলাম। তুমি বাঘের মুখোশটা পরে নাও আর আমি হরিণে মুখোশ ও পোশাকটা। তারপর আমি তুমি(হরিণ ও বাঘ) অন্ধকারে ছড়িয়ে পড়বো আর তুমি মূলত পালিয়ে বেড়াবে। আমি(হরিণ) তোমাকে(বাঘকে) অন্ধকারে আলোতে, ঘরের কোনায় বনে জঙ্গলে হন্যে হয়ে খুঁজে বেড়াবো তোমার তীক্ষè দাঁতের কামড় খাওয়ার নেশা উঠবে বলে। ভীষণ নেশার যন্ত্রণা কোমল গলায় আর ঘাড়ের রক্তে, তীক্ষè দাঁতে কামড়ে না চুষলে আরাম হয় না যে আমার। কিন্তু আলো অন্ধকারে, অলিতে গলিতে, বন বাদাড়ে আর জনমুনিষ্যিহীন সকল প্রান্তরে তোমাকে আর খুঁজে পেলাম না আমি। কিন্তু তুমি আছো এতোটাই গোপনে আর তুমুল আড়াল নিয়ে যে, আমার সাধ্য নাই সে পর্যন্ত যাই। অথচ খুব কাছেই তোমার গন্ধ পাই, উৎকট, তবু একবার দু’বার করে প্রিয় হয়ে গেছে সে গন্ধ আমার।
তুমি এলে না তবে, আসবে না কখনো। আমি তবু জীবনভর সমস্ত বন-জঙ্গল খুঁজে গেলাম নেশার রক্ত নিয়ে। এভাবে ধুপ করে একদিন আমি মরে গেলাম। আর আমি মরে গেলে আমার নেশার রক্ত স্বপ্ন হয়ে গেলে শেষ দৃশ্য দেখতে পেলাম যে, একটা বাঘ একটা হরিণের কোমল গলায় আর ঘাড়ে দাঁত বসিয়ে বুঁদ হয়ে আছে। আর হরিণটি দারুণ আরামে, প্রশান্তিতে চোখদুটো বুজে আছে। যদিও বাঘের শরীর থেকে উৎকট এক গন্ধ এসে তাকে নাড়িয়ে দিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু কয়েকবারে অভিজ্ঞতায় গন্ধটা তার প্রিয় হয়ে গেছে।

তীক্ষè স্বরে টেলিফোনটা বেজে উঠলে সে সত্যাসত্যই এবার ঘুম থেকে জেগে উঠলো। আর জেগে উঠেই দেখলো তার শরীরজুড়ে বিন্দু বিন্দু ঘাম গলে গলে ঝরণার মতো বইতে শুরু করেছে। তারপর সে টেলিফোনটা ধরতে গেলো এই ভাবতে ভাবতে যে, আধো ঘুমে আর স্বপ্নে কেমন প্রচ্ছন্ন এক জগত সত্যায়িত হয়ে আসে।