আমি কেন ঘুমাই

স্নিগ্ধা বাউল ও মহ্‌সীন চৌধুরী জয়


স্নিগ্ধা বাউল

আমি কেন ঘুমাই

যতগুলো ডালসমেত গাছ নেমে আসে
মাটিও ছুঁয়ে যায়
সমুদ্রের লোভে বাতাসে মিশে
ঝাউয়ের মতো দোলে
পুষ্ট বীজে মেপে রাখে রূপকথা;
ততগুলো মানুষ ঘরে ফিরে
ঝাড়বাতির সুখে ঘুমিয়ে পড়ে
সন্তানাদি মেপে রাখে
বাটখারার ভবিষ্যতে
এত সুখ উথলে পড়ে জন্মনিয়ন্ত্রণের কৌটায়;
জিইয়ে রাখি আমি নিজেকে
বিভব পার্থক্যের মতো তাদের
জানালায়; বাতাসের হিংস্রতায় গুনি
কতটা রাত সুখে থাকে একজীবন!
সুখী মানুষের গন্ধ যেন ভোঁজালি
এত অগুনতি সুখী তারা!
আমার নিঃশ্বাসে যেন জ্বলে যায়
সমস্ত গেরস্থালি ;
আমিও হবো শ্রেষ্ঠতম সুখী
ব্রহ্মাণ্ডের কায়েমি সতেজতায়
মুখর হবে অন্তরাত্মা;
নিশ্চন্তে ঘুমাবো অসুখীদের ভবিষ্যৎ রাজ্যে
আজ তবে আর না ঘুমাই।



সে

তার কাছেই যেতে ইচ্ছে করে;
গোপনের বিপরীতে
প্রকাশ্যতর হয়ে,
ইচ্ছে করে যাই তার কাছে
বিনয়বশত এক কাপ চা
ধোঁয়ার আড়ালে হাসির কুশলাদি
ঘর্মাক্ত হাতঘড়ির শব্দ ধরে
অস্থির যেন সজারুর দেহ—
যাই তবু তার কাছে
ভরাকাপ চা সাবধানেও ছিলকে পড়ে যেখানে
রেশ রয়ে যায় পিরিচ থেকে দূরত্বে
ঘন সুগন্ধি ঘরে ভদ্রতর আমরা
যোজন দূরত্ব মেপে রাখি আটলান্টিক দিয়ে;
তবু যাই যাই করি
আমি আর আমার কাঙ্ক্ষা...


সাপ

নিসিন্দায় আর নেমে আসে না সন্ধ্যা
তীব্রতর বিকেলের পর, হোগলার বন
নুইয়ে আসে যখন মাছরাঙা ঠোঁটে ;
পানসে সাপের মতো জরাই লাউয়ের শিকড়ে,
জড়ায় জড়িবুটি আর বিষ শিস
দেওবন্দের মতো সন্ধ্যাও নামে
করুণ প্রার্থনায়, কেরায়া নৌকার আদিম নিঃশ্বাস
অব্যক্ত আঁচল জড়িয়ে যেত খোঁপার সীমানা;
তুলশীর আলোয় সব গুনে নিলো
কাটাকুটির নিসিন্দা;
শ্যামলা পায়ের পুকুর জলে আমিও বসে দেখেছি
কতটা চরিত্রহীন হলে তবে ভর সন্ধ্যায়
এক ঝলক তার দেখা মিলে!
তাকিয়ে দেখি তাদের বিছানায়
তিনসুতা বেশি মখমলে এত সুখ তবে—
ডগডগ করে নকশা
উলের বুনন আর মিহি আঙুলি,
চাকায় জীবন এদিকে চলো
থামে না কেবল পোষ মানার ভয়ে।





==================================================


মহ্‌সীন চৌধুরী জয়

শরীর


।। শফিক আহমেদ।।
সকালের স্নিগ্ধতার মতো অনেকটা কাল অতিক্রম করেছি। চলে গেল সন্ধ্যারাতের কোমল আভার মতো সময়। রাত নেমে এসেছে জীবনে—বয়সের শরীরে। শরীর! শরীর নিয়ে খেলতে খেলতে একটা জীবন পার হয়ে গেল। কিরকম অদ্ভুত এক জীবনচরিত! শুয়ে শুয়ে এখন এরকম ভাবনাই কাজ করে আমার ভেতরে। নির্ঘুম রাত জাগার মতো এ ভাবনাটা সহজাত। পাশে নিথর দেহ নিয়ে শুয়ে আছে দিলারা। অপ্রকৃতিস্থ দেহ নিয়ে শুয়ে থাকাই ওর জীবনের নিয়তি হয়ে গেছে। চল্লিশ বছরের সংসারে বউ কয়দিন শরীরে এসে সহযোগী হয়েছে? অথচ বিবাহের প্রথম জীবনে শরীরে শরীরে আমরা এত কথা বলতাম যে, মনে নিষিদ্ধ শরীরের উৎফুল্লতা কাজ করত। আজ কোনো মুগ্ধতা কাজ করে না স্মৃতিতে কিংবা জেগে থাকা রাতের খতিয়ানে।
দুরন্ত দিলারা বহুদিন দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত। নিভে যাওয়া প্রদীপের মতো অন্ধকারে শুয়ে থাকে শরীর নিয়ে। অক্ষম শরীরের এ জীবন শুকিয়ে যাওয়া নদীর মতো জীবন্মৃত। কথা বলতে পারে না। আপন ইচ্ছেতে অঙ্গের নাড়াচাড়াও বন্ধ। বিছানাতেই বাথরুমের কাজ সারতে হয়। তিন থেকে চারদিন পরপর বাথরুম হয় বলে রক্ষা নয়তো ছেলে-বউয়ের কর্কশ বাক্যবাণে প্রতিদিনই জর্জরিত হতে হতো।
আজ শেষ রাতে দিলারার বাথরুম হলো। এত রাতে কিভাবে ছেলের বউকে ডাকা যায়? আমিও অক্ষম। দুর্গন্ধ নিয়েও বসে থাকা যায় না। শক্তি আর সাহস সঞ্চয় করে ডাকলাম আহমদ আলীকে। আমাদের ছেলে। ছেলে আসবে না জানি। ও একবার ঘুমিয়ে গেলে মৃতদের মতো আচরণ করে। শরীরে আঘাত করলেও ওর ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে না।
‘আহমদ আলী, আহমদ, আলী আহমদ।’
আমার অস্থির হওয়ার কথা, অথচ আমি অস্থির না হয়ে লজ্জিত হই। ছেলেকে ডাকা উছিলা মাত্র। বউকে ডাকতে থাকি ছেলের নামে, ভীত মনে।
‘আব্বা ডাকেন কেন?’
‘না মানে...’
‘এত রাতে ডাকাডাকি করে না মানে, না মানে, করবেন না।’
‘না মানে, বউমা, তোমার শাশুড়ি বিছানায় করে ফেলছে। অনেকক্ষণ হয়ে গেল, আর সকাল হতেও তো অনেক দেরি।’
আমি চোখে না দেখলেও আমাকে রুম থেকে বের হতে হলো। অস্বস্তি লাগে। অন্ধ চোখে দেখতে পাই না—তাই কি অন্ধ চোখে কান্না জমে তাড়াতাড়ি? বউমার অগ্নিমূর্তি আমার কল্পনার চোখ ঠিক দেখতে পায়। কল্পনার চোখে দেখা যে খুব সহজ—চোখের ভাষাও পড়া যায়। আগুন আর তির দুচোখে নিয়ে ভয়ংকর রূপে দাঁড়িয়ে আছে ছেলের বউ। বিছানায় বিকট শব্দ হলো। দিলারাকে ছিটকে দূরে ফেলে দিল কি? বাস্তবতার এই মর্মাঘাত এখন কল্পনার চেয়েও ভীতিকর।
শারীরিক অক্ষমতার এ শরীর নিয়ে দিলারা কী ভাবছে? ওর বোধশক্তিও কি নিথর হয়ে গেছে! শরীরের অঙ্গ আর মুখের জবান তো কবেই গেছে। নৈঃশব্দ্যে মোড়া এ শরীর কি শুধুই একটা মাংসপিণ্ড? নাকি এখনই সত্যিকারের চৈতন্য ফিরে এসেছে?
‘সময়-অসময় নাই আপনাগো। শুধু কাজ সারতে পারলেই হইল! কোন গাধার ঘাড়ে আইসা পড়লাম। জীবনডা ছারখার হইয়া গেল।’
বউ মা কথাগুলো আমাকে শুনিয়ে গেল। জীবনের এ পড়ন্ত বেলায় এসে শুধু শুনে যেতে হবে। প্রতিবাদ করতে পারব না। কোনো কিছুর পরিবর্তন করার ক্ষমতাও আমার নেই। জীবন যৌবনে এক আর বার্ধক্যে আরেক।
আমার ছেলে এখন যৌবনের দাস নাকি বউয়ের দাস? আলী আহমদ একটা স্ত্রৈণ! একি আমার চরিত্রের বিপরীত? নাকি একই চরিত্রে ভিন্ন কাজ করি আমরা নিজেদের মতো করে? ভাবনা কাজ করে। এখন ভাবনাগুলো সাগরের মতো গভীর আর কূলহীন হয়ে যায়। অস্থির হই। জীবনের শেষ চাওয়াতে মন ব্যাকুল হয়। সৃষ্টিকর্তাও তো অনেক দূরে। অসীম আকাশের আড়ালে। আমার ও ছেলের পারস্পারিক জীবন নিয়ে ভেবে আর কী লাভ! যাপিত জীবনের এই আমি আর সেই সময়ের আমিই কি এক? এও কি বলা যায় না, অন্ধ হওয়ার পরই আমার দৃষ্টি প্রসারিত হয়েছে।
সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠেই দোকানে যেতে হবে। অন্ধের দোকানদারি! ছেলে দোকান দিয়ে আমাকে বসিয়ে দিয়েছে। যুবক বয়সের একটা ছেলে বেচাকেনার দায়িত্বে আছে। আমি শুধু পরিচিত এক শরীর নিয়ে কাস্টমারের সামনে হাসিমুখ আর সৌহার্দ্যের বিজ্ঞাপন দেই। ছেলেটা টাকা চুরি করে, ফাঁকিবাজি করে। এই চৌর্যবৃত্তি ধরার কাজ কি আমার? পুলিশকে বেঁধে চোরের থানা পরিচালনার মতো। তবু অক্ষমতার দায় থেকে যায়! কথা শুনতে হয় ছেলে আর ছেলের বউয়ের কাছে। বার্ধক্য এত কঠিন যৌবন আমাকে বলে নি কখনো। যৌবন শুধু বর্তমানের হিশেব কষেছে। ভবিষ্যৎ এক নিষ্ঠুর পৃথিবী এ উপলব্ধি এখন আমাকে যন্ত্রণা দেয়।
সারাদিন পর বাড়িতে যেয়ে দিলারাকে চোখের দেখা দেখতে পারি না। স্পর্শ করি, যদিও সেই শরীর এখন আর নেই। তারপরও স্পর্শ পেয়ে পুলকিত হতে ইচ্ছে হয়। শরীরকে না জাগিয়ে ভালোবাসার এক পরম আস্বাদ পেতে ইচ্ছে করে। তবু সান্ত্বনা, আমারও নেই সেই শরীর। সেই কাম-ইন্দ্রিয় রাক্ষস আমার শরীর ছেড়ে চলে গেছে। সেই মোহময় অভিশপ্ত মন আমাকে আর অস্থির করে না। এ কি শুধুই শরীরের পতন? পাপবোধও কি কাজ করে না নিজের শরীর নিয়ে? গুটিয়ে থাকি। প্রায়ই নিজেকে নিজের অচ্ছুত মনে হয়। তাই কি চোখের আলো নিভে মনে আলো প্রজ্বলিত হয়েছে?



।। শ্যামল আহমেদ।।
সন্তানকে কাছে পাওয়ার পর আমার পৃথিবীর রঙ কিরকম পাল্টে গেল। প্রথমদিনের কান্নার শব্দ শুনে এতটাই আত্মহারা হয়ে গিয়েছিলাম যে, বুঝতে অসুবিধা হয় নি, মানুষ সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে আপন সন্তানকেই। একটা পুতুলরূপ শরীর—ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকে—দুর্বল, অক্ষম, অথচ কী এক সম্মোহনী শক্তি দিয়ে আমাদেরকে মন্ত্রমুগ্ধের মতো ধরে রেখেছে। প্রথম দিনের কান্নার শব্দ শুনে স্বস্তি পেয়েছিলাম, আত্মহারা হয়েছিলাম, কিন্তু এখন ওর কান্নাতে কান্না পায়, ওর হাসিতে বিশ্বজয়ের আনন্দ অনুভব করি। শারমিন আমার অদ্ভুত আচরণ দেখে হাসে। স্তন্যপান করার সময়টুকুসহ সারাক্ষণই সন্তানের পাশে পাশে থাকতে চাই। কেন এতটা বাড়াবাড়ি করছি এ নিয়ে মাঝে মাঝে বিরক্তও হয় শারমিন। বাহিরে থাকার সময়ও ছেলে আমার মন আর ভাবনার জগৎ দখল করে রাখে।
মাঝে মাঝে নিজেকে প্রশ্ন করি, কেন করছি এরকম? একি শুধুই মায়া? নাকি সন্তানের মাঝে পুনরায় জীবনকে ফিরে পাবার সাধনা? নিষ্পাপ এ জীবনের স্পর্শে চরিত্রস্খলনের পাপমোচন হবে কি? সন্তানের টানে ফিরে আসার গল্পে আমি যে অন্য এক আমি হয়ে গেছি তা শারমিনও বুঝতে পারে। বিবাহের প্রথম বৎসরের পর শারমিনের প্রতি কি আমার নজর ছিল? শুধু শরীরের টানে মাঝে মাঝে ভালো আচরণের অভিনয় করেছি। অসুস্থ মানসিকতার এই আমি সংসারের প্রতিও চরম উদাসিন ছিলাম। নারী শরীরের মোহ’র সাথে নেশাটাও কাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
গায়েও হাত তুলেছি—রক্তাক্ত হয়েছিল শারমিনের দেহ। তবুও তৃপ্ত হয় নি মন, গায়ের জ্বালা মিটিয়ে মারতে পারি নি বলে। মনে হয়েছিল, ওর রক্তাক্ত হাড় খুলে পুনরায় সেই হাড় দিয়ে পেটাই। অথচ আজ শারমিনের সেই শরীরকে মনে হয় স্বর্গ। পরিপূর্ণ এক জান্নাতি গাছ। এই গাছে সন্তানের আহার আছে। গাছের যত্নে আমি পাব ছায়া, শান্তি আর সমৃদ্ধির পথ।
নেশা ছাড়তে খুব সমস্যা হয়েছিল। শারমিনের গর্ভে সন্তান আসার পর ডাক্তারের পরামর্শ আর শারমিনের অনিহার কারণে ছাড়তে শুরু করলাম একে একে আমার অনৈতিক জীবনের অধ্যায়।
এখন শারমিন আমার সন্তানের মা। ওকে সহযোগিতা করতে আমার এতটুকু খারাপ লাগে না। খুব বেশি সহযোগিতা করতে না পারাতেই বরঞ্চ আমি ব্যথিত হই। আমার উচ্চমার্গীয় ভাব, অহংকার স্ত্রীকে সহযোগিতা করছি বলে একটুও অস্বস্তিতে পড়ে না। এখন তো শারমিনের কাপড়ও আমি ধুয়ে দেই। পানি ধরলেই ওর ঠান্ডা লেগে যায়। এ ঠান্ডা তো সন্তানের শরীরেও সংক্রামিত হবে। মা অসুস্থ মানে তো সন্তানও অসুস্থ। আমার কলিজার টুকরা অসুস্থ। সন্তানের অসুস্থতায় শঙ্কিত হয়ে শারমিনের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছি বিষয়টা এমনও নয়। ভালোবাসাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। মাঝে মাঝে শারমিনের চুল আচড়ে বিনুনি করে দেই। ওর পছন্দের জিনিস এনে উপহার হিশেবে দেই। চমকে দেই ওকে। বউয়ের চমকে যাওয়া মুহূর্ত আর হাসি মুখ দেখতে খুব ভালো লাগে। হঠাৎ হঠাৎ শারমিনের এ আনন্দ সহ্য হয় না। আনন্দাশ্রু দেখি। এ পাওয়া হয়তো ওর চাওয়া থেকে অনেক অনেক বেশি।
ছেলেটার বাড়ন্ত সময় থেকেই বাবার কথা খুব মনে পড়ে। মায়ের জন্য বাবার প্রতি ঘৃণা ছিল, আজ সন্তানের জন্য বাবার প্রতি ভালোবাসা জেগে উঠছে। বাবাও হয়তো আমাকে নিয়ে এরকম আনন্দে মেতে উঠেছিল কোনো একদিন। বাবা কি একটা মুহূর্তের জন্যও আমাকে ভালোবাসে নি? কিছু অস্পষ্ট স্মৃতি পুনরায় মনে পুলক জাগায়।
বাবার বিষয়টা শারমিনও জানে। বিয়ের আগে কিংবা বিয়ের পরেও বলতে সাহস হয় নি। ছেলেটা জন্ম হওয়ার পর বলেছি। সন্তান হওয়ার পর সাহস পেয়েছি কি? আশলে একজন ‘বাবা’ কিরকম হয় উপলব্ধি করতে পেরেছি বলেই বলা। শারমিন জানত আমার বাবা-মা দুজনই মৃত। বাবার ঘটনা শুনে কেন মিথ্যে বলেছি সেই কৈফিয়তও শারমিন চায় নি। ঘটনার মর্ম এতটাই করুণ আর ভয়ংকর যে, জীবিত বাবাকে মৃত বলার যৌক্তিকতাও ওর মন বুঝতে পেরেছে। তবুও সেইদিন থেকে বাবা নতুন করে বেঁচে উঠেছেন। বাবার অনাকাঙ্ক্ষিত জীবনচরিত জেনেও শারমিন বাবাকে ফিরিয়ে আনতে সম্মতি জানিয়েছে। বাবার প্রতি শারমিনের শ্রদ্ধাবোধ থাকার কথা নয়, তবে কি আমাকে দেখেই শারমিনের এ উদারতা?
একজন মানুষ খারাপ হলেও বাবা হয়তো কখনোই খারাপ হয় না।





।। শফিক আহমেদ।।
পাশের গ্রামের রোজিনাকে ভালোবেসে বিয়ে করেছিলাম। দুপরিবারের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। রোজিনার বাবা মারা যাবার আগে আমার বাবাকে কথা দিয়েছিল আমাদের বিয়ের ব্যাপারে। সেই প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতে আমরা একে-অপরকে স্ত্রী-স্বামী হিশেবে আগেই মেনে নিয়েছিলাম। অথচ আমরা বিয়ের সময়ই কিশোর-কিশোরী। বয়স অনেক কম ছিল বলে কৈশোরের চঞ্চলতা আমাদেরকে ঘিরে রাখত সবসময়। দুজনের মধ্যেই জেগেছিল অবুঝ ভালোবাসার মুগ্ধতা। সেই বয়সে কোনোরকম মোহ কাজ করে নি, বিপরীত শরীরকে আবিষ্কার করার মতো চোখ, কিংবা শারীরিক উত্তাপও অনুভব করি নি। যুগল প্রেমের এক মার্জিত অধ্যায় ছিল আমাদের প্রেমে। পরস্পরের প্রতি শুধু বন্ধুত্ব আর ভালোবাসাই কাজ করেছিল।
বিয়ের পর আমরা নতুন করে নিজেদের মাঝে পরিচিত হলাম। কী এক স্বর্গীয় অনুভূতি। কিছুদিন বেশ ভালোই চলল। বিয়ের দু’বছরের মধ্যে বাবা মারা গেল। সংসারের প্রথম জীবনেই আমরা অভাবের মধ্যে পড়লাম। বাবার চাকরির টাকাতেই মূলত আমাদের সংসার চলত। আমি উপার্জন করতে পারছি না, অথচ মা, ছোট ভাই আর রোজিনা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। এমনও সময় গেছে আমরা দুবেলা খেয়ে থেকেছি দিনের পর দিন। তখন বাঁচার জন্য পরস্পরের শরীর-মনে যথেষ্ট ভালোবাসা ছিল বলে ক্ষুধার যন্ত্রণা আমাদেরকে পরাজিত করতে পারে নি।
এক সকালে রোজিনা গোসল সেরে এসে আমার হাত ধরল। আমি অদ্ভুত দৃষ্টি দিয়ে ওর দিকে তাকালাম। হাত ধরাটা স্বাভাবিক কিন্তু হাত ধরার কারণটা হয়তো অস্বাভাবিক।
রোজিনা বলল, ‘আমার একটা কথা আপনাকে রাখতেই হবে।’
সাধ্যের মধ্যে থাকলে রোজিনার কথা রাখি নি এমন কখনও হয়েছে বলে মনে পড়ে না। আমার চোখ রোজিনাকে আশ্বস্ত করল।
‘আমার গয়না বিক্রির টাকা আর আপনার জমানো টাকা দিয়ে ব্যবসা শুরু করেন। আগামীতে আমাদের সন্তান হবে। অর্থ ছাড়া সন্তানকে মানুষের মতো মানুষ করতে পারবেন না।’
আমি আপত্তি করি নি। আপত্তি করার কোনো উপায়ও ছিল না। হাতে পর্যাপ্ত টাকা না থাকলে কিভাবে সম্ভব ব্যবসা করা। ধার-দেনা করে ব্যবসা করলে লাভ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। তাই সকল অস্বস্তি দূরে ঠেলে গয়না হাত পেতে নিলাম। পরস্পর পরামর্শ করে ব্যবসার পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি নিলাম। কাপড়ের দোকানের পক্ষেই স্থির হলো আমাদের যুগল মতামত। কিছুদিনের মধ্যেই প্রতিদিন আমার শরীরে হরেক রকম রঙিন পোশাক আর চাকর ছেলেটার হাতে ব্যাগভর্তি ঘন ঘন বাজার দেখে এলাকার মানুষের বুঝতে আর অসুবিধা হয় নি যে, ব্যবসা করে আমরা কিভাবে ভাগ্যকে পরিবর্তন করে ফেলছি।
রোজিনার জন্য নতুন করে গয়না গড়লাম। নতুন নতুন শাড়ি পরে বউ আমার রানির মতো সারাবাড়ি ছুটোছুটি করে। বিয়ের প্রায় সাত বছর পর আমাদের প্রথম সন্তান হলো। সন্তান জন্মের আনন্দ আমার পৌরুষকে গৌরবান্বিত করল, মনকে আন্দোলিত করল।
অনাগত সন্তান ও বউয়ের সেবার জন্য সার্বক্ষণিক একজনের প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল। মায়ের শারীরিক সক্ষমতা ছিল কম। তাই শাশুড়ি এসেছিল শ্যালিকাকে নিয়ে। সেই থেকে বেশ কিছুদিন ধরে শ্যালিকা আমাদের বাড়িতে। ওর দায়িত্ববোধ আর অক্লান্ত পরিশ্রম করার মানসিকতা দেখে আমি মুগ্ধ হয়ে যাই। মুগ্ধ করেছিল ওর সহজাত স্বচ্ছন্দতা। ছেলে হওয়ার পর শ্যালিকা সদ্য যুবতী হওয়া শরীর নিয়ে আমার কাছে শাড়ির আবদার করে বসল। আমি ফ্রকের কথা চিন্তা করেছিলাম—অতঃপর একটা রঙিন শাড়ি এনে দেই। ওর উচ্ছ্বাসিত মুখ দেখে আমি আশ্চার্যান্বিত হই। শাড়ি পরে আমার সামনে এলে দেখি পরিপূর্ণ এক নারী।
সন্তান হওয়ার পর রোজিনার শরীর বেঢপ হয়ে যায়। সৌন্দর্যের প্রতি আগ্রহ কমে যায় মন থেকে। পার্থিব সৌন্দর্য তুচ্ছজ্ঞান করে একমাত্র সন্তানকে নিয়েই মেতে থাকে সারাদিন। আমাকে সময় দেওয়ার মতো সময়ও থাকে না। এদিকে নারী হয়ে ওঠা গল্পে শ্যালিকার সাথে খুনসুটি চলতে থাকে প্রতিনিয়ত। শ্যালিকা-দুলাভাই পরস্পর মেতে থাকি ঠাট্টা-তামাশাতে। এভাবে চলতে চলতে আমাদের মানসিক জড়তা দূর হয়ে যায়। শ্যালিকার শরীরে চেয়ে চেয়ে অঙ্গ থেকে অঙ্গে ভ্রমণ করি। একদিন ওর শরীরও স্পর্শ করে ফেলি। বুঝতে পারি স্পর্শকাতর জায়গাতে হাত দিলেও ও ব্যথিত হবে না। কতটুকু আনন্দিত হবে সেটাই বোঝার চেষ্টা করেছি তখন, প্রতিনিয়ত। শারীরিক আড়ষ্টতা দূর করতে আমি উদ্‌গ্রীব হয়ে উঠি। শ্যালিকাকে শাশুড়ির সাথে দেখা করতে নিয়ে যাওয়া কিংবা শ্বশুর বাড়িতে রেখে আসার অজুহাত তৈরি করে আমরা বের হই। পার্কে যেয়ে আমোদিত হই আর সিনেমাতে গিয়ে রোমাঞ্চিত হই। একান্তে ওর শরীরের ঘ্রাণ নেই, স্পর্শ করার বাহানা তৈরি করি। মোহ জেগে ওঠে প্রচণ্ড। ওর দুচোখেও লক্ষ করি গভীর প্রেম। ঠোঁটে খুঁজি অফুরান চুম্বনের জীবনী। লোভ জেগে ওঠে। মাংসের আকাঙ্ক্ষার মতো এ লোভ! ভাগ্যের কিরকম অদ্ভুত আচরণ, অনভিপ্রেত শরীরগুলো আমার চোখে আকাঙ্ক্ষিত হয়েছে সব সময়। সিনেমা হল থেকে বেরিয়ে ওর নিপুণ পদক্ষেপে হেঁটে চলার বিমুগ্ধকর মুহূর্ত দেখি। এ পা-ও তো রোজিনার মুখের চেয়ে সুন্দর! নিতম্বে দম্ভ কি? তা নয়। শুধু সর্পিল ভঙ্গিতে এঁকেবেঁকে হেঁটে যাচ্ছে আমার আগামীর রানি। উদগ্র বাসনা কাজ করে ভেতরে। হাত চেপে ধরলাম। শ্যালিকা হাসে। আমি বিমূঢ়! কী প্রচণ্ড চপেটাঘাত এই অনুভূতির সৌন্দর্যে।
আমি আরো বেশি অস্থির হয়ে যাই। ঘামতে থাকি। এ ঘামের অনুকূলেই যেন এক নদী রচিত হবে। ডুবে যাব—ডুবতে হবে। শ্যালিকার হাত ধরলাম পুনরায়। আমার চোখের দিকে এবার রাগত চোখের চাহনি। কী চমৎকার অভিনয় তোমার, নারী!
আমি বললাম, ‘আমি তো তোমাকে পছন্দ করি।’
আমাকে হতভম্ব করে দিয়ে উচ্চস্বরে হেসে উঠল।
অতঃপর গম্ভীর হয়ে বলল, ‘তুমি আমাকে পছন্দ করো আর আমি তোমাকে ভালোবাসি। আমাকে ছাড়া তুমি অন্য কারো সাথে থাকতে পারবে না।’
মুগ্ধ হয়ে যাই। এ নারীর জন্য জাহান্নামে যেতেও আমার আপত্তি নাই। অতঃপর আমরা পরস্পর গভীর চুম্বনে আবদ্ধ হয়ে পাপবোধকে উড়িয়ে দেই এবং সুষুপ্তির ভেতর চলে যাই।
বাড়িতে যেয়ে আবার স্ত্রীর সাথে মিলিত হই। নারী শরীরের জন্য আমি যে প্রচণ্ডরকম অস্থির। নারী ছাড়া, বেঁচে থেকেও মরণে মিশে যাই গোপন ব্যথায়।
আমাদের অবৈধ সম্পর্কের বয়স বাড়তে থাকে ধীরে ধীরে। এক পর্যায়ে পরিবারের সবাই বিষয়টা জেনে যায়। বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্নভাবে শাশুড়ি আর শ্যালককে কিনে ফেলায় রোজিনা অসহায় হয়ে যায়। সামাজিক প্রতিবন্ধকতা না থাকলে ওরা দুজন মিলেই শ্যালিকাকে আমার হাতে সমর্পণ করত। টাকার ঝলকে ওদের দুচোখ অন্ধ—দেখেও দেখে না রোজিনার অসহায়ত্ব।
এদিকে মা আর ছোট ভাই আমার সাথে কথা বলা বন্ধ করে দেয়। ওদের নীরব প্রতিবাদ, আমিও নীরবে মিলিত হতে থাকি দিলুর সাথে। কখনো পার্কে, কখনো সিনেমায়, কখনো-বা হোটেলে চলে আমাদের নিষিদ্ধ অথচ আকাঙ্ক্ষিত পাঠ।
এক রাতে রোজিনার সাথে প্রচণ্ড ঝগড়া হয়। আমি অবৈধ নারীর পক্ষে বৈধ নারীকে প্রহার করতে থাকি। পুরুষ মানুষ এমন হবেই তাই বলে কি বদমাশ, লম্পট বলে গালাগাল দিতে হবে? ছেলেটা আমাদের ঝগড়া দেখে। আমি শিশু বয়সের মনস্তত্ত্ব বোঝার চেষ্টা করি। সেই সময় রোজিনার পক্ষ থেকে ফুলদানির একটা আঘাত আমার মাথায় এসে লাগে। রক্তাক্ত হই। অতঃপর পশু হয়ে যাই নির্দ্বিধায়—মারতে মারতে রোজিনাকে অজ্ঞান করে ফেলি। দিলুর শরীরের মোহ আমাকে এতটাই উন্মত্ত করে রেখেছিল যে, ওই শরীরের বাধা হয়ে যে দাঁড়াবে তাকে রক্তাক্ত করতে, ক্ষত-বিক্ষত করতে আমার এতটুকু খারাপ লাগবে না, কোনোরকম অনুশোচনা জাগবে না। তখনকার সময়টা এমন, নিজেকে নিঃশেষ করে দিতেও এতটুকু খারাপলাগা কাজ করত না। এই মোহ সাময়িক হলেও এতটাই মরণধর্মী যে, মুহূর্তে মৃত্যুর মতো সামগ্রিক ব্যাধিতে নিমজ্জিত হতেও দ্বিধা থাকে না। দিলুকে তখনই কাছে পেতে মন চাইছিল। বৈধ হোক আর অবৈধ হোক, প্রণয়দ্বিধা আর যৌনবিনয় নিয়ে ভালোবাসা উপভোগ করা যায় না।
ছেলে বড় হতে থাকল আর আমিও উত্তাল মোহে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হতে থাকলাম। রোজিনা অসুস্থ হয়ে পড়ল । আপন বোনের কাছ থেকে এরকম আচরণ সহ্য হয় নি। মা আর ভাইয়ের অসহযোগিতায় একেবারেই ভেঙে পড়ল। বিকৃত হয়ে যাচ্ছিল ওর মন-মানসিকতা। এসব দেখে রোজিনা আরো অসহ্য হয়ে উঠেছিল আমার কাছে। একটা সময়ের পর ওর ছায়াও আমার কাছে অসহ্য হয়ে উঠল। নামাজ পড়ে আল্লাহর কাছে দোয়া করতাম, এ অসুস্থতায় ভোগে ও যেন মরে যায়। নিরাপদভাবেই শেষ হয়ে যাক অবাঞ্ছিত অধ্যায়। মরল না এ যাত্রায়। অথচ আমি ধীরে ধীরে মরতে থাকলাম দিলুর সংস্পর্শ ছাড়া। অন্য নারীতে, হোটেলে হোটেলে চলতে থাকল আমার শরীর বিনিময়। এত কিছুর পরও আমি দিলুকে ভুলতে পারছিলাম না। সব বাধা অতিক্রম করে, সব নিষেধ অবজ্ঞা করে ঘন ঘন যাতায়াত চলতে থাকল দিলুর বাড়িতে। একদিন দিলুর বাসায় যেয়ে দেখি রোজিনা সেখানে আগেই উপস্থিত হয়ে দিলুর সাথে মারামারিতে লিপ্ত হয়ে গেছে। কী ভয়ানক আক্রোশ একে-অপরের প্রতি। আবারও রোজিনার গায়ে হাত তুললাম। রক্তাক্ত অবস্থায় মেজেতে পড়ে রইল বেশ কিছুক্ষণ। চলে গেলাম বাহিরে। আক্রোশ নিয়ন্ত্রণের এর চেয়ে ভালো উপায় তখন আমার মাথায় আসে নি।
দুপুরের পর বাড়িতে ঢুকে আমি হতভম্ব। চারদিক থেকে চিৎকার, চেঁচামেচির শব্দ। কাছে যেতেই দেখি, কী ভয়ানক দৃশ্য! শরীরে আগুন লাগিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছে রোজিনা। অর্ধেকের বেশি শরীর তো পুড়েই গেছে। পানি ঢালা হচ্ছে প্রতিনিয়ত। অ্যাম্বুলেন্সও চলে এসেছে। এ শরীরের প্রতিও তো একসময় ভালোলাগা ছিল! আমার অভিশাপেই কি এই করুণ দৃশ্য! নাকি আমার অভিশপ্ত জীবনের জন্য! ছেলেটাও স্কুল থেকে ফিরেছে অনেকক্ষণ। হাতে খুন্তি, মায়ের শেষ স্পর্শ হয়তো খুন্তিতেই জেগে ছিল। বসেছিল রাগ, হতাশা আর বিষণ্নতাকে একসাথে জড়ো করে। মাথায় হাত রাখতেই চোখ বরাবর গুতো দিয়ে বসল প্রচণ্ডরকম আক্রোশে। অন্ধ জীবনের অভিশাপ কি? এ চোখও একদিন অপর চোখকে অন্ধ করে দেয়।
দিন যায়, রাত যায়। সময় প্রচণ্ড অভিমান নিয়ে পার হতে থাকে আমার জীবনে। এ অভিমানটা আমি বুঝতে পারি। অনুতপ্ত হই। আশলে একটা চোখ চলে যাবার পর আমার ভেতরে ধীরে ধীরে আলোর জ্যোতি অনুভব করতে থাকি। অথচ বাহিরের জগৎ অন্ধকার হলেই ভেতরের জগৎ আলোকিত হয়ে যায় না। একটা ধাক্কা ছিল, প্রচণ্ডরকম; সীমাহীন অনুশোচনা ছিল, মর্মোপলব্ধি ছিল। এত কিছুর পরও দিলুকে ছাড়তে পারি নি। প্রায় তিনমাস পর আমরা দুজনে পালিয়ে যাই। ছেলেটার কাছে অপরাধী হয়ে রইলাম সারাজীবন। ভালো থাকুক পাপী বাবাকে ছেড়ে। রোজিনাও ভালো থাকুক মৃত্যুতে মিশে, ওপারে। ক্ষমা করুক আমাকে।





।। শ্যামল আহমেদ।।
বিকেলের একটা সময়ে বাবাকে খুঁজতে বের হই প্রতিনিয়ত। এতটা টান কেন হলো বাবার প্রতি? আমার ভেতরে বাবার জন্য ভালোবাসা খুব বেশি কি জাগার কথা? বাবার সমূহস্মৃতিই তো অস্পষ্ট—মুগ্ধতার স্মৃতি আর কয়টা বেঁচে থাকবে?
হারিয়ে যাওয়া বাবার ফিরে আসার গল্পে আমার পরকীয়াসক্তকে একটা কারণ বলা যায়। বাবার নষ্ট জীবনে পরকীয়াসক্তি এতটাই নিন্দনীয় ছিল যে, আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম শ্যালিকা ছাড়া বিয়ে করব। মেয়ের ছোট কোনো বোন না থাকলেই আমি রাজি হবো। বাবার মতো আমিও যদি ভুল করে ফেলি! আমার মায়ের মতো করুণ পরিণতি অন্য কোনো মেয়ের জীবনে নেমে আসুক এমন চাওয়া তো কোনোভাবেই থাকতে পারে না।
নিয়তি যেখানে নিয়ত নির্দিষ্ট সেখানে মানুষ কিভাবে সাধ্য রাখে পরিবর্তনের। একদিন শারমিনের চাচাত বোন সুমি আক্তার আমার বাড়িতে এল বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি কোচিং করার উদ্দেশ্যে। শুরুতে মনে হয় নি যে, মেয়েটা দেহে গন্ধম ফল বয়ে এনেছে। নিষিদ্ধ জিনিস এড়িয়ে চলেছি অথচ সেই মোহ সম্মোহনের মতো আমাকে আকৃষ্ট করল কিনা কিছুদিন না যেতেই। ভর্তি কোচিং সংক্রান্ত যাবতীয় কাজে আমি সাথে গিয়েছি। যাতায়াতের সময় দেখেছিলাম মেয়েটার সাবলীল ভঙ্গি। শরীর স্পর্শ করা, দুষ্টুমিতে মেতে ওঠাসহ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কিছু বিষয়কে ও নিছক ভালোলাগার প্রকাশভঙ্গী মনে করেছিল। অথচ দুজনের মনোজগতেই মুগ্ধতা ছাড়িয়ে মোহময় এক জগৎ তৈরি হয়ে যায় ততদিনে। একদিন রিকশায় আমার হাত ধরে বলে বসল, ‘শ্যামল দাদা, এরই নাম কি প্রেম?’
আমি বোধশূন্য হয়ে বসেছিলাম। বাবার কথা মনে পড়েছিল। আমরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম কি নিষিদ্ধ নারীর প্রতি আকৃষ্ট হবো? সুমি কি নিষিদ্ধ নারী নয়? আমিও সুমিকে উপেক্ষা করতে পারি নি। প্রায় তিনমাস আমরা একে-অপরের প্রতি শারীরিক ও মানসিক উত্তাপ অনুভব করেছি। এ অপরিণত পরিণয় শারমিনের বুঝতে অসুবিধা হয় নি। মেয়েদের চোখ ফাঁকি দেওয়া যায় না। সেই মেয়ে স্ত্রী হলে ফাঁকি দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। এরপর মান-অভিমান, সত্য-মিথ্যা, যুক্তি-তর্ক, গায়ে হাত তোলা, মায়ের দগ্ধস্মৃতি, অনুশোচনা, উপলব্ধি, সন্তানের আগমনসহ কিছু স্মৃতির সৌন্দর্য আর বিবেক ও দায়িত্ববোধের জোরে আমি ফিরে আসতে পেরেছিলাম। ফিরে এলেও পাপ করেছিলাম নিশ্চিত। পাপী হয়ে বাবার পাপে সমব্যথী হয়ে উঠেছিলাম কি? এভাবে বাবা ফিরে এসেছিল মনে। রাতুলের জন্মের পর বাবা মনের মধ্যে আবারও উঁকি দেয়। পিতার কাছে সন্তান হলো সমগ্র পৃথিবীর চেয়ে বেশি মূল্যবান। প্রথম সন্তানের বাবা হওয়ার এ আনন্দ বাবাকে আরো বেশি কাছে নিয়ে এল।
কাকুকে বাবার কথা জিগ্যেস করাতে উনিও কান্না লুকাতে পারে নি। শত হলেও সহোদর। কাকু বলল, ‘তোর বাবার একটা দোষ বাদে আর কোনো দোষ তো আমিও খুঁজে পাই নাইরে। মানুষই তো ভুল করে। তবে তোর বাবার ভুলটা সমাজ ও পরিবার জীবনে মস্ত বড় এক ভুল। অবশ্য তোকে খুব ভালোবাসত। একটা চোখ নষ্ট করে দেওয়ার পরও কিন্তু তোকে নিতে কয়েকবার এসেছিল। মা দেয় নি। পরবর্তীতে আমার আর তোর কাকিরও মত ছিল না।’
ভেতরটা কেমন হাহাকার করে উঠল। আমার চোখও টলমল করছে। চোখে পানি চলে আসবে কি? এই বাবার জন্য কান্না করা কি ঠিক হবে?
কাকুর কাছ থেকে ঠিকানা নিয়ে বাবার দোকানে চলে যাই। শ্মাশ্রুতে ঢাকা মুখমণ্ডল, উজ্জ্বল চেহারা, সৌম্যকান্তি; অথচ ক্লান্ত, বিধ্বস্ত। অন্ধ চোখ নিয়ে বসে আছে হাসি হাসি মুখ করে। অসহায়, পরাজিত এক যোদ্ধার ছবিও মুখে লেগে আছে। কোথায় সেই শরীর? আসক্তি! মোহ! পার্থিব জীবনে অপার্থিব মোহ সাময়িক, অথচ সেই সাময়িক মোহে আমরা এতটাই মাতাল হয়ে যাই যে, নেশা ছাড়তে ছাড়তে জীবনের অনেক বড় ক্ষতি করে ফেলি।
বাবা আমার পরিচয় পেয়ে কিরকম চমকে উঠল। অপ্রত্যাশিত বলে? ভেতরটা নড়ে উঠল কি? বাবার দুচোখ বেয়ে তরতর করে পানি বের হচ্ছিল। স্পর্শ করল আমার চেহারা। হাত ধরে বসে রইল কিছুটা সময়। দোকানের ছেলেটা আমাদের দিকে নিশ্চুপ চোখে তাকিয়ে আছে।
দোকান থেকে বের হয়ে আমরা বটগাছের নিচে গিয়ে বসি। নীরবে কথোপকথন চলে—দুজনের একজনও মুখ ফোটে কিছু বলতে পারি না। উনি স্পর্শের অনুভব নিয়ে বসে আছেন আর আমি খুটিয়ে খুটিয়ে দেখছিলাম উনাকে, উনার প্রকৃতি। বাবাকে অক্ষম মানুষ দেখতে ভালো লাগছিল না। চোখে দেখা বাবার অক্ষম জীবন, সন্তান হিশেবে মানুষের সবচেয়ে বড় পরাজয়।
কাঁপা গলায় আমাকে বলল, ‘বিয়ে করেছ জানি। সন্তান হবে এটাও শুনেছিলাম। হয়েছে কি? ’
বুঝলাম কাকুর সাথে বাবার নিয়মিত যোগাযোগ হয়।
‘আমার পুত্র সন্তান হয়েছে।’
‘মাশাআল্লাহ। কী নাম রেখেছ?’
‘রাতুল আহমেদ।’
‘আল্লাহ ওকে মানুষের মতো মানুষ করুক। বউ মা ভালো আছে?’
‘জি ভালো আছে।’
এসব কথার উত্তর দিতে আমার খুব কষ্ট হচ্ছিল। রাতুলের নাম তো বাবারই রাখা উচিত ছিল। অথচ স্পর্শ করার অধিকারও তিনি হারিয়েছেন। রাতুল কি মানুষের মতো সত্যিই মানুষ হবে? এই রক্ত না-জানি ওকেও বিভ্রান্ত করে। অতঃপর কিছুটা সময় আমরা আবারও নিশ্চুপ। নৈঃশব্দ্যের গাঢ় রূপ আমাদের চেহারায় অথচ ভেতরে ভেতরে আমরা নিশ্চয়ই কথা বলছি মনের সাথে। আমার স্ত্রী-সন্তান সম্পর্কে তো বাবা খোঁজ-খবর নিল। আমারও কি খোঁজ-খবর নেওয়া উচিত বাবার দ্বিতীয় পরিবার সম্পর্কে? এ সৌজন্যবোধের দায় কি এড়ানো উচিত নাকি অনুচিত? কার খোঁজ নেবো? দিলু খালার? যার জন্য আমার মা আত্মহত্যা করেছে? মায়ের আদর, স্নেহ, মমতা থেকে আমি বঞ্চিত হয়েছি। অথচ এই দিলু খালাই নাকি আমার জন্মের সময় রাতদিন এক করে মায়ের সেবা করেছেন। আমার নোংরা বিছানাপত্র পরিষ্কারসহ যাবতীয় কাজ হাসিমুখে সম্পন্ন করেছেন। পরবর্তীতে আমার শিশুকালটাকে উনি আর মা পরস্পর মিলে সযত্নে লালন করেছেন। অথচ অদৃশ্যে সেই দিলু খালাই একদিন আমার চরম শত্রুতে পরিণত হয়। যৌবনের মোহ কিছু মানুষকে এমনই বিপথে নিয়ে যায় যে, সারাজীবনে সে আর সঠিক পথের সন্ধ্যান পায় না। সুমির প্রতি আমার নিষিদ্ধ আসক্তির কথা শুনলে বাবা হয়তো নিজের শরীরে চেপে থাকা ভার হতে কিছুটা হলেও হালকা অনুভব করত।
‘দিলু খালা কেমন আছে? কাকুর কাছে শুনলাম উনি অসুস্থ। বিছানাতেই নাকি শুয়ে থাকতে হয়?’
এ প্রশ্ন হয়তো বাবার প্রত্যাশিত ছিল না। চমকে উঠলেন। এই সেই নারী, যে পিতা-পুত্রের মধ্যে অযথা চমকে উঠার পরিবেশ তৈরি করেছে।
‘দিলু প্রায় ত্রিশ বছর শরীর নিয়ে বিছানায় পড়ে আছে।’
শরীর শব্দটা শুনে এবার আমারই চমকে উঠার পালা। সেই শরীর, যে শরীর দিয়ে তছনছ করে দিয়েছিল কয়েকটা মানুষের পৃথিবী।
বাবা আবার আমার হাত ধরল। কিছুটা সাহস সঞ্চয় হলো যেন।
‘তোমার মায়ের কবরে আমি প্রায়ই যাই। ক্ষমা প্রার্থনা করি। যদিও এ পাপের কোনো ক্ষমা নেই।’
হঠাৎই দাউদাউ করা আগুন আমার চোখের সামনে ভেসে উঠল। কী করুণ আর মর্মান্তিক সেই দৃশ্য! ঘেমে উঠছি ক্রমশ। রাগে শরীরও কাঁপতে লাগল। বাবাকে বাড়িতে নিয়ে যাবার ইচ্ছে ছিল। পারলাম না। এটাই বোধহয় বাস্তবতা। বিষাদের নদী মুহূর্তে পাড়ি দেওয়া যায় না। বিদায় চাইলাম। বাবা দিলু খালাকে চোখের দেখা দেখে যেতে বলল। সেক্ষেত্রেও উদার হতে পারলাম না। বিদায় মুহূর্তে পায়ে হাত দিয়ে সালামও করা হলো না। অদৃশ্য আরেকটা হাত আমাকে আটকে রাখল। বাবা! এই বাবা আমার মায়ের হত্যাকারী। আমার অস্তিত্বের প্রায় পুরোটাই উনি হত্যা করেছেন। শূন্য শরীর বাদে কী বেঁচে আছে আমার? ছোট বয়স থেকেই একা একা—স্বপ্ন দেখার অধিকারও হরণ করেছেন উনি। মোহময় একটা জীবন নিয়ে উনি একাই পথ চলেছেন নিজের মতো করে। এ কেমন বাবা! সন্তানের চেয়ে প্রিয় হয় নিজের জীবন! কেমন স্বামী! আদর্শ স্ত্রীর জীবন নিতেও কুণ্ঠিতবোধ করে না। কেমন মানুষ! মোহ'র কাছে পরাজিত হয় বারবার!