ভোর ও সন্ধ্যার কথা

অঞ্জন আচার্য ও স্মৃতি ভদ্র

অঞ্জন আচার্য

ভোর ও সন্ধ্যার কথা


“নির্লিপ্ত প্রতিকূল বিশ্বে মানুষ এক অনন্য নিঃসঙ্গ প্রাণী, যে নিজ কর্মের জন্য দায়ী এবং নিজ নিয়তি নির্ধারণের ব্যাপারে স্বাধীন।”
—কিয়র্কেগার্ড (১৮১৩-১৮৫৫), ড্যানিশ দার্শনিক



রাতজাগানিয়া হাঁপানি রুগীর চোখের মতো নিষ্প্রভ আজ
আমার ফেলে আসা কৈশোর দিনলিপি।
জানি, মানুষ তো কেবলই আকড়ে থাকে তার শৈশব-কৈশোরের দিনের পাণ্ডুলিপি নিয়ে
আমৃত্যু-জীবন।
আমিও মানুষ বলেই হয়ত...

একঘেয়েমি নাগরিক উদ্বাস্তু প্রাণীজ দেহে, যেখানে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আছি—
অনেক কষ্টেসৃষ্টে অলিগলি দালানের নালা বেয়ে আকাশ দেখা যায়;
কবে শেষ এই পথে রেখেছিল পা সূর্যের আলো
ভুলে গেছে তা মাটির স্মৃতিকোষ।

ধোঁয়ার ঘরে ধুলার চাদর গায়ে তস্কর সাজে গোপন সুড়ঙ্গ কেটে—
ক্রমাগত ফাটা বাঁশের ভেতর দিয়ে মাঝেমধ্যে গলে যায় চিকন বাতাস;
বাতাসের গায়ে তার কখনও বৃথাই খুঁজে ফিরি ছেলেবেলার বিস্মৃত
কচি লেবুপাতার ঘ্রাণ।

এই শহরের তাড়া খাওয়া হরিণীর মতো ছুটন্ত মানুষের দল
বাদুড়ের কসরত শিখেছে বেশ
আমরা যারা সনাতনী স্কুলের পেছন সারির পড়া না-পারা অভ্যস্ত ছাত্র
গণিত মাস্টারের বেতের সাঁইসাঁই শব্দাঘাত সয়ে যাই প্রতিদিন।

সেদিন পত্রিকায় রক্তিম শিরোনাম হলো—
‘চিনির বদলে লাল পিঁপড়ের দল খুঁটে খেয়েছে পত্ররন্ধ্রের জমানো জলকণিকা’।

তবুও কেটে যায় দিন কৈর্বতের ছেঁড়াখোঁড়া মেরামতি পুরানো জালে লেগে থাকা
আঁষ্টে গন্ধে-গন্ধে সারাদিন,
আর আমাদের স্বপ্নসংসারে অনাগত শিশুর দুধের জলে
ক্রমশ অগোচরে মিশে যায় চুনাজল।

তার পরও বলে যাই, আমাদেরও কতিপয় জলজ দিন ছিল মাছের মতো
আমাদেরও মায়াময় ঘর ছিল তালপাতা তলে বাবুইয়ের ঝোলার মতোন,
ভোর ও সন্ধ্যায় আজও বাস করি যেখানে বসবাস করে তোমাদের নগরী।


আমাদের অচ্ছুৎ পদাবলি


আমাদের নামগুলো বেমানান
গুটিকয় নাম রেখো যা খুশি,
নামস্রোত যে-পাশে টেনে নেয়—
প্রতিকূল স্রোতে দেই হামলা।

সভ্যতা আমাদের গলা-ভাত
অচ্ছুৎ মহারাজ আমরা,
গালি খাই পথে যেতে প্রতিদিন;
কোতোয়াল-ডায়েরিতে নাম নেই।

কালসাপ পুষে রাখি পকেটে
মোবাইলেতে রিংটোন বাজে না,
ধুলো-ঘ্রাণে ঘরে ফেরা খোঁয়াড়ে;
আমাদের সাবানের ফেনা নেই।

তবু মন ফুঁসে না তো নীরবে
কবিতায় পেট ভরে কেমনে?
টাকা নেই পকেটে—সিগারেট;
‘বাকি নাই’ —দোকানের নোটিশে।

এমনই খাপছাড়া জীবনে
খাপখাওয়া নাম রেখো আমাদের,
প্রতিদিন নুন-মাখা জামাতে—
প্রতিরাতে ঘুম ভাঙে স্বপনে।


কথার ভূত—ভূতের কথা

শাশ্বত সত্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যদি বলি আজ
নেই কোনো আর জমা-ভালোবাসা ভেতরে-বাইরে,
মিথ্যে নয়; সেকথা মিথ্যা হবে না এতটুকু—সময়ের কাছে;
কালের সেইসব আবেগ পচে-গলে একাকার হয়ে গেছে।

ছিল কথা মৃত্যুর ওপারে দাঁড়িয়ে ভেলার কারুকাজে প্রতীক্ষা করার
দোঁহার আলিঙ্গনে জলের ছোটবড় যাবতীয় ঢেউ ভাসাবার, আর...

ঢেউগুলো আজও বয়ে বয়ে চলে; দিন যায় যেভাবে যাবার ছিল কথা,
কেবল কথা-দেওয়া কথাগুলো মরে-পচে ভূত হয়ে আছে।



===============================================

স্মৃতি ভদ্র


নিষাদ


শীতকালের শুরুর সময় এখন। বিকেল হতে না হতেই চারপাশে ধোঁয়ার মত কুয়াশা ঘিরে ধরে। বাতাসে থাকে হিমের আভাস। শিনশিনে ভাব বেড়ে যায় বিকেলের দিকে। এরপর ঝুপ করে সন্ধ্যা তাড়িয়ে রাত নেমে আসে। ঠিক সেরকম একটি শীতের রাতে আঁধার আর কুয়াশা ভেদ করে হনহন করে হেঁটে চলেছে রোকন।

গঞ্জে যাওয়ার রাস্তা পেরিয়ে কিছুদূর সামনে এগোলেই বিল। শীতের সময় তাই বিলে পানির জায়গায় আছে সরিষার ক্ষেত। আর সেই ক্ষেতের আইল ধরেই যেতে হয় এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে। কোন গ্রামে পাঁচ ঘর তো কোন গ্রামে সাত ঘর। বর্ষার সময় গ্রামগুলো ঠিক যেন বিচ্ছিন্ন দ্বীপ।

সরিষা ক্ষেতের আইল ধরে পা চালিয়ে হাঁটছে রোকন। শীতের রাত অল্পতেই নিশুতি মনে হয়। গ্রামের বাড়িগুলো অল্প পাওয়ারের বাতির আলোয় ধুকছে যেন। একটি আলটপকা বাতাস এসে আরোও হিম নামিয়ে দেয়। ঠান্ডা বাতাসে মিশে থাকা সরিষাফুলের গন্ধ টাও রোকনের কাছে এখন বাড়াবাড়ি মনে হতে থাকে। কত তাড়াতাড়ি সামনের জমিটুকু পেড়িয়ে গ্রামের রাস্তাটা ধরতে পারবে ওর মাথায় শুধু তাই ঘুরছে। তাড়াতাড়ি হাঁটতে গিয়ে দুইবার হোঁচট খেলো রোকন। তিন বছর আগের তলা ক্ষয়ে যাওয়া বাটা কোম্পানির জুতোটা এ যাত্রায়ও অক্ষয় থেকে গেলো।

গ্রামের রাস্তায় ওঠার ঠিক আগে একটা সবুজ চোখের বিড়াল রোকনের সামনে এসে পড়লো। অন্ধকারের মধ্যে সেই সবুজ চোখ দেখে একটা হিমশীতল অনুভূতি বয়ে গেলো ওর মধ্যে। তবুও গলায় জোর এনে," যা, দূরে যা" বলে খেদানোর চেষ্টা করলো। রোকনের কেঁপে যাওয়া গলার আওয়াজে এমন কিছু একটা ছিল যাতে সেই সবুজ চোখ আরোও জ্বলে উঠলো। এবার এর সাথে যোগ হলো কর্কশ শব্দে "মিউ, মিউ"। বিড়ালের এমন অদ্ভুত আওয়াজ কখনো শোনে নি রোকন।

আইল থেকে একটা মাটির ঢিলা নিয়ে ছুড়ে মারে বিড়াল টাকে। বিড়াল টা সরে গিয়ে একপাশে দাঁড়িয়ে ক্রমাগত মিউ মিউ করতে থাকে। সাহসী রোকনও ইয়াসিন সুরা পড়তে পড়তে প্রায় দৌড়ে চলে বাড়ির দিকে যেতে বাধ্য হয়। একটু আগাতেই করিম মৃধার বাড়ি। রেডিও থেকে ভেসে আসছে "ত্বকের রঙ উজ্জ্বল করতে ব্যবহার করুন ফেয়ার & লাভলী"। এরপর যোগেন কাকার বাড়ি পাড় হলেই রোকনের ফুফু'র বাড়ি। ফুফু'র বাড়ির উঠোনে ষাট পাওয়ারের বাতি টা এখনো জ্বালানো রয়েছে। এরমানে ফুফা এখনো ফেরেন নাই। আর সেই বাতির কল্যাণে রোকনের বাকি রাস্তা টুকুর অন্ধকার কেটেছে।

বাড়িতে ঢোকার মুখে কাঁঠাল গাছের ছড়ানো গুড়িতে আরেকবার হোঁচট খায় রোকন। তবে পরিচিত পথ বলেই হয়তো খুব তাড়াতাড়ি নিজেকে সামলে নেয়। নতুন বানানো টিনের সদর দরজাটা হাত দিয়ে ঠেলে উঠোনে পা রাখে। কানমাথায় জড়ানো মাফলার খুলতে খুলতে গলা খ্যাঁকানি দেয় দুই বার। এরপর দাওয়াই উঠে ডাকে,

" বৌ, ও বৌ। ঘুমায়ছো নি?"

কাঁঠাল কাঠের নতুন দরজায় দুইটা টোকা দেয় রোকন। পিছন বাড়ির বড় কাঠাল গাছ কেটে রোকন বিয়ের আগে একটা খাট, আলমারি আর এই ঘরের দরজা,জানালা বানিয়েছে।

শীতের দিন, দরজাগুলো শুকিয়ে কেমন কড়কড় আওয়াজ করে। দরজা খুলতেই ভিতরের এনার্জি সেভিংস বাতির সাদা আলো দুয়ার পেড়িয়ে উঠোনে পৌছে। হলুদ লাল ছাপা শাড়িতে পুস্প যেন ঠিক একটা পরী। হাত বাড়িয়ে রোকনের কাছ থেকে মাফলার টা নিয়ে আলনায় রাখে।

" একটা সাইকেল কিইন্যা নেও। শীতের রাত এমনিতেই নিশুতি। টিনের চালে হিমের শব্দেও এখন ডর লাগে।"

" ডরো ক্যান বউ? তুমি না রোকন মৃধার বউ।"

" হুম, ডরাই তো তার ল্যাইগাই!"

টিউবওয়েলের উষ্ণ পানি হাতে মুখে ছোঁয়াতেই রোকনের সব শীনশীনে ভাব কেটে যায়। আর এফ এল -এর প্লাস্টিক জগটা ভরে পানি নিয়ে ঘরে আসে।

" কোর্টের ডেট আবার পড়ছে। যাইতে হইবো।"

মুখের ভাত টুকু শেষ না করেই পুস্প কি যেন বলতে যায়। বিষম খায়। রোকন পানির গ্লাস টা হাতে দিয়ে বৌয়ের মাথায় আস্তে আস্তে হাত বুলায়।

" এত ভাবো ক্যান? কিচ্ছু হইবো না। ডরাইলে ডর আরোও জাইক্যা বসে।"

এরপর আর কেউ কথা বাড়ায় না। টিনের চালে হিমের শব্দের সাথে রোকনের পোনা মাছের মাথা চিবানোর আওয়াজ শুধু।

রাতের পরতে আরেক পোচ অন্ধকার জমে। কাঁঠাল কাঠের সেই খাটে কার্পাস তুলার লেপের ওম। বিছানার চাদরে ফুল,লতার নকশি।

" বৌ, ও বৌ। সামনের অগ্রহায়ণে আমার একটা ফুলের মতো কইন্যা দিবা?"

পুষ্প কিছু একটা বলে। চুড়ির রিনিঝিনি আওয়াজে সে শব্দগুলো ঢাকা পড়ে যায়। আকাশের একটি খসে পড়া তারা দিকভ্রান্ত হয়। হিমের পতন শীত বাড়ায়। পুষ্প রোকনের কাছ থেকে সবটুকু ওম নিয়ে লতিয়ে থাকে রোকনের বুকে। নিশুতি রাতের অন্ধকার ছিঁড়ে চাঁদের আলোয় ভাসে রোকন আর পুষ্পের ঘরের চাল।

আজ রোকন ওর মুদিখানার দোকান খুলতে পারবে না। দোকানের কর্মচারী অল্পবয়সী ছেলে পলাশ। ও এসে চাবি নিয়ে গেছে। পলাশ জানে আজ তার মালিক আসবে দুপুরের পর বা আরোও পর। তাই মনের মধ্যে বেশ ফুরফুরে ভাব ওর। দোকান খুলে আজ আর ঝাড়ু দেওয়া, পানি ছিটানো বা আগরবাতি জ্বালানো কোনটাই করে না। ক্যাসেটে হিন্দি গান চালিয়ে শিস্ বাজাতে থাকে," মুন্নী বদনাম হুয়ি......"।

গেলবার শীতে পাশের গ্রামের হাইস্কুলে মেলাতেও এই গান বাজতো। সার্কাস এসেছিলো। আর যাত্রাদল। তাতে যাত্রা কম নাচ বেশি হতো। হামিদ চেয়ারম্যান সেবার ভোটে জিতে এই মেলার আয়োজন করেছিলো। লাল-নীল মরিচবাতি জ্বলেছিল সেই মেলায়। শহর থেকে চেয়ারম্যানের ভাগ্নে এসে চপ, সিঙ্গারা, চায়ের স্টল দিয়েছিল। সেই মেলার পর থেকেই রোকনের সাথে হামিদ চেয়ারম্যানের একটা শীতল যুদ্ধ শুরু হয়। অথচ একসময় রোকন এই হামিদের হারিকেন মার্কার লোক ছিল। হামিদের পক্ষে মিছিল, ভোট চাওয়া সব করেছে। কিন্তু সেই মেলার পর থেকেই হামিদ চেয়ারম্যানের বিপক্ষে চলে যায় রোকন। সরল রোকন মৃধার ক্রোধের পারদ ঠিক তখনি বাড়ে যখন অন্যায় কিছু তার চোখে পড়ে।

পুষ্প কতবার বলে," দুনিয়াত কি তুমি একাই আছো প্রতিবাদ করনের লাইগ্যা? সবার সাথে ক্যান লাগতে যাও"।

"বউ বোঝে না। আমি, তুমি চুপ কইরা থাকতে থাকতে তামাম দুনিয়াই চুপ কইরা যায়। আর লাভের আখের গোছায় ওই পিচাশ গুলার দল।" মনের কথা মনে রেখেই রোকন বউয়ের দিকে তাকিয়ে থাকে। তিনমাসের পোয়াতি বউ যেন চাঁদের আলোর মতো। আলগোছে পা ফেলে যখন এঘর ওঘর করে তখন রোকন চন্দনের সুবাস পায়। সন্ধ্যারাতে যখন কালো ফিতায় চুল জড়ায় বউয়ের শরীর থেকে কামিনী ফুলের আলো ঝরে। সবাই বলে পুষ্প'র মেয়ে হবে। তারজন্যই এত লাবণ্য। রোকন মেয়ের নাম খোঁজে মনে মনে।

রোকনের আজ কোর্ট থেকে ফিরতে প্রায় দিন গড়িয়ে যায়।
যোগেন কাকার বিলের জমি নিয়েও ঝামেলা করছিলো চেয়ারম্যান। বাড়ি যাবার পথে যোগেন কাকার বাড়ির উঠোনে ভিড় দেখে রোকন ভিতরে ঢোকে। মধ্যবয়সী কাকাকে যেন আজ একদম বুড়ো লাগছে। উঠোনের মাঝে মাথায় হাত দিয়ে বসে আছে নির্বিকার। কাকী শুধু উদভ্রান্তের মতো প্রলাপ বকছে, চেয়ারম্যানকে শাপশাপান্ত করছে। লোকের মুখে শুনে আর কাকীর প্রলাপে রোকন জানতে পারে কাকার বিলের জমি আজ থেকে চেয়ারম্যানের হয়ে গেছে। এতগুলো মানুষ অথচ সব অথর্ব। দাঁড়িয়ে থাকাই শুধু সার। অনিয়মকে নিয়ম মানা রোকনের ধাঁতে নেই কখনো। যোগেন কাকার পাশে গিয়ে বসে। তীব্র ক্ষোভ চেপে রেখে বলে,

" কাকা, এভাবে মাইন্যা নিলে কিন্তু কাল ওরা তোমার ভিটাও কাইড়া নিবো। তুমি থানায় যাইবা। কেইস করবা।"

রোকনের চোখের দিকে তাকিয়ে যোগেন কাকা ফিসফিসিয়ে বলে,

" জমি গেছে যাক, ছাওয়্যালডা হারাইতে পারুম না।"

কি যেন ছিল সেই স্বরে। রোকন আর কথা বাড়ায় না। কিন্তু এই মানুষগুলোকে কেঁচোর মতো মনে হয়। একদলা থু থু সেই বাড়ির উঠোনে ফেলে বের হয়ে আসে রোকন।

রাস্তার মধ্যেই চেয়ারম্যানের খাস লোক জুনায়েদ, রোকনকে দেখে এগিয়ে আসে।

" রোকন ভাই আপনের হালচাল জানব্যার আইলাম। ব্যবসা ক্যামন চলে?"

"ভাল"

"আরেকটু ভাল কইর‍্যা দিবার পারি কিন্তু। আপনে তো আমাগো নিজের লোক।"

রোকনের কথা বাড়াতে মন চায় না।

" আমারে নিয়া ভাবতে হইবো না।"

" তাইলে আপনে আমাগো নিয়া ভাবাও বাদ দেন। ঘরে পোয়াতি বউ, তারে নিয়া ভাবেন।"

জুনায়েদের মুখে পুষ্প'র কথা শুনে রোকনের ভিতরে আগুন জ্বলে যায়। সেই আগুনে পুড়িয়ে ফেলতে মন চায় সবকিছু। কিন্তু অনেক কষ্টে নিজেকে সংযত করে। বলে,

" রোকন মৃধা রে ডরাইতে আইছো? ভুল জায়গায় আইছো মিয়া। নিজেদের সংশোধন করো তাইলে রোকন মৃধাও চুপ কইরা যাইবো।"

" তাইলে আপনে মেলায় জুয়াখেলার কেইস টা তুলবেন না? চেয়ারম্যান রে জানায় দিমু। সাবধান করতে আইছিলাম কিন্তু আমি।"

রোকন কোন উত্তর দেয় না। শুধু চোখে তাচ্ছিল্য এনে তাকায় জুনায়েদের দিকে। অন্যায় দেখলে রোকনের ভিতরে যে অগ্নুৎপাত হয় তার কাছে এইসব হুমকি ধামকি যেন কিছুই না।

শীত তো আগেই চলে গেছে। এরমধ্যেই বসন্ত পেরিয়ে গ্রীষ্মকালের বাড়বাড়ন্ত। পুষ্পের শরীর ভারী হওয়া শুরু হয়েছে। কোমড়ে হাত দিয়ে ওঠাবসা করে। গঞ্জে প্রতিমাসে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যায় বউকে রোকন। সন্তানের বুকের ধুকপুকানিও শুনিয়েছে রোকনকে ডাক্তার আপা সেদিন। এখন পুষ্প'র কাছে গেলে কদম ফুলের সুবাস আসে।পুষ্প হাসলে শিউলি ফুল ছড়িয়ে পড়ে। রোকন বুঝে যায় ওদের ঘরে মেয়ে আসছে। মেয়ের নাম ঠিক করে ফেলে রোকন। মেয়ের নাম হবে পদ্ম। পাঁকের মধ্যে আলো বিলানো পদ্ম।

রোকনের অনেক বুঝানোর পর যোগেন কাকা চেয়ারম্যানের বিরূদ্ধে কেইস করে। আর এ কারণে হুমকি ধামকিও বেড়ে গেছে অনেক। যত হুমকি দেয় ওরা রোকনের তেজ আরোও বাড়ে। দূর্বল মানুষগুলোর কেঁচো হয়ে যাওয়া দেখলে সেই তেজ আরোও বেড়ে সবকিছু ঝলসাতে থাকে। ঝলসে যাওয়া সময় থেকে আলো বের হয়। কিন্তু আঁধার সয়ে যাওয়া মানুষগুলো আলোতে তাকাতে পারে না। তাদের চোখ বুজে আসে সে আলোয়।

হঠাৎ একদিন দুপুরে কেইস তুলে নেয় যোগেন কাকা। আর সেদিন রাতেই পরিবার নিয়ে পাড়ি জমায় এক নতুন দেশে। সবাই বলে," চেয়ারম্যানের কাছে বাড়ি জমি সব বেইচ্যা মোটা ক্যাশ নিয়া ওরা চইল্যা গ্যাছে ওগো দ্যাশে!"

রোকনের অস্থির লাগে। বুকের ভিতর সেই আগুনে এবার যেন তুষ পড়ে। চারদিকে অসংখ্য কেঁচোর কিলবিলানি দেখে রোকনের তেজ যেন ছারখার করে দিতে চায় সবকিছু।

যোগেন কাকার বাড়ির জং ধরা টিনের জায়গায় নতুন টিনের গুদামঘর হয়। কাকির ঠাকুরঘরের পিতলের বাসনগুলো গিয়ে ওঠে চেয়ারম্যানের মেয়ের ঘরে। গুদামঘরের দুই কর্মচারীর সারাদিন উচ্চস্বরে হিন্দি গানের ক্যাসেট বাজানোয় বিরক্ত হতে শুরু করে গ্রামের লোকজন। আর এরসাথে যোগ হয় মেয়েদের নিয়মিত ত্যক্ত করা। তবুও সবাই চুপ।

পুষ্প এখন ভর পোয়াতি। বর্ষা এসে গেছে। বিলে নতুন পানির জোয়ার। সূর্যের আলোয় সে পানি ঝকমক করে আর চাঁদের আলোয় করে ঝলমল। রাতে দোকান বন্ধ করে নিজের ডিঙ্গি নিয়ে রোকন বাড়ি ফেরে। ফেরার সময় মাথার উপরে চাঁদ আর সামনে বিরান বিল নিয়ে গেয়ে ওঠে," শোন শোন ইয়া এলাহি, আমার মোনাজাত"। বিলের পানির ঢেউয়ের শব্দ, চাঁদের আলো আর শরীর জুড়ানো বাতাসের সাথে সেই সুর মিলে খুব পবিত্র হয়ে ওঠে সে সময়। খুব অল্প সময়ের জন্য হলেও রোকনের মনে হয় পৃথিবী থেকে পাঁক হারিয়ে গেছে।

পুষ্প'র স্ফীত চামড়ার সর্বত্র এখন সন্তানের অস্তিত্ব স্পষ্ট। রোকনের তড় সয় না।

" বৌ, বাচ্চা আইজ কয়বার নড়ছিলো?"

" অনেকবার"

" ক্যামন জানি সুখ সুখ লাগে বৌ। অহন তো কড়ে গোনা দিনের হিসাব।"

পুষ্প হাসে। রোকনের বুকের ভিতর মুখ ঘোষে।

" সকল তড়প মেয়ের জন্য। আমার কদর বুঝি এবার ফুরাইলো।"

রোকন ভারি শরীরের পুষ্পকে আগলাতে আগলাতে ভাবে রোকন মৃধার সুখে এবার নজর টিকা দিতে হবে।

পলাশ এখন দোকানের সব কাজ বুঝে নিয়েছে। ওকে ভরসা করা যায় চোখ বন্ধ করে। দু'চারদিন রোকন দোকানে না এলেও পলাশ সব সামলে নেয়। তবে দোষের মধ্যে একটাই দোকান সকালে খুলতে দেরী করে। অনেক বলেও ওকে শুধরাতে পারছে না রোকন। পুষ্পকে নিয়ে ব্যস্ত থাকতে হয় বলে কয়দিন দোকানের দিকে নজর কম। নতুন মাল উঠেছে। গত একমাস দোকানের বিক্রিও বেড়েছে। শুধু পলাশের কথা নয় এটা, ক্যাশবাক্সের দিকে তাকিয়ে রোকনেরও তাই মনে হয়েছে। হিসেব করতে হবে, তা শুধু ভাবনাতেই থাকছে। হচ্ছে কই? এদিকে কেইস-এর এখন ঘন ঘন ডেট পড়ছে। রায় পেতে মনে হয় বেশিদিন অপেক্ষা করতে হবে না।

বর্ষা যায় যায় করছে। বিলের পানি শুকিয়ে আসছে। কাঁদা আর পাঁক রোকনের সব সময় অপছন্দ।

ভাদ্র মাসের ভ্যাপসা রাত। থেমে থেমে বৃষ্টি পড়ছিলো। পুষ্প'র পায়ে পানি আসায় রোকন ওর পায়ের নীচে বালিস রেখেছে। টিনের সদর দরজায় শব্দ হয়। প্রথমে রোকন পাত্তা দেয় না। আবার শব্দ। সাথে 'রোকন' 'রোকন' ডাক। এবার পুষ্প জেগে যায়। কিছু একটা ভেবে রোকনের হাত টা শক্ত করে ধরে। করিম চাচার কন্ঠ। হয়ত চাচীর কিছু হয়েছে। রোকন হাত টা ছাড়িয়ে নিয়ে বাইরে আসে। করিম চাচার সাথে পুলিশ। কিছু ভাবার আগেই করিম চাচা এগিয়ে আসে।

" বাপ, পুলিশ তোরে খোঁজ করত্যাছে। আমার বাড়ি গেছিলো। আমারে তোর বাড়ি দেখ্যাইয়া দিতে কইলো।"

রোকন কিছু বলার আগেই পাঁচজন পুলিশের একজন এগিয়ে এলো।

" আপনাকে থানায় যেতে হবে। চাল ডালের আড়ালে সিরাপের ব্যবসা কবে থেকে শুরু করছেন?"

এই কথার উত্তর দিতে হয় না। হ্যাঁচকা টানে বাড়ি থেকে বের করে আনে রোকনকে। বিমূঢ় রোকনকে নিয়ে অন্ধকারে মিলিয়ে যায় ওরা।

এবার পলাশ কেঁচো হয়ে যায়। দোকান তল্লাশি তে কয়েক বোতল সিরাপ পাওয়া গেছে। পুষ্প'র আজাহারি বা রোকনের পূর্বের স্নেহ কিছুই পলাশকে মানুষ মানুষরূপে ফিরিয়ে আনতে পারে না। জুনায়েদের দেখানো আরোও কয়েক বোতল সিরাপের লোভ তখন ওকে কেঁচো হয়েই থাকতে বলে।

পূর্ণিমা পেরিয়ে যাওয়া আজ দু'দিন। চাঁদের আলো এখন অনেকটাই ম্লান। সবচেয়ে অপছন্দের প্যাচপেচে পাঁকের মধ্যে চারপাশে কয়েকটি গুলির খোসা, একটি দেশী পিস্তল আর কয়েক বোতল সিরাপ চারপাশে ছড়ানো থাকলেও রোকনের চোখ অনেকদূর একটি বাড়ির দিকে। সেই বাড়ির উঠোনের ষাট পাওয়ারের বাতির দিকে। বাতির আলো ওর চোখে ঘোর ধরিয়ে দেয়। হলুদ সেই আলো আস্তে আস্তে রঙ বদলায়। লাল, কমলা হয়ে নীলের দিকে যেতে থাকে। সে নীল রোকনকে ছাপিয়ে আকাশে গিয়ে মেশে।

রোকনের ঠিক গা ঘেষে সেই সময়ই পাঁকের মধ্যে ফুঁটে ওঠে একটি পদ্ম।