রঙিন

বিশ্বদীপ দে ও দেবব্রত কর বিশ্বাস


বিশ্বদীপ দে
রঙিন

শহিদ মিনারের মাথার উপরে এসে দাঁড়াল একটা অল্পবয়সি মেঘ।
অ্যাকোরিয়ামের মতো শরীর
পেটে খলবলে রঙিন মাছের ঝাঁক

নিচু সেই মেঘের ছায়া আমাদের মেয়েটির মুখে
প্রেমিকের সঙ্গে দিঘা যাওয়ার গোপন বাসের জানলায়
যার মুখ ফুটে আছে

সে হেসে ফেলতেই বাস স্টার্ট দিল আচমকা
অমনি শহরের বুকে বৃষ্টি হয়ে নেমে এল অল্পবয়সী মেঘ

সেই বৃষ্টি আজ শহরের পথে পথে ভাইরাল…
ক্রমশ চরাচর জুড়ে রামধনুর রঙিন অসুখ

============================================

দেবব্রত কর বিশ্বাস
আদরে রঙিন


পেটটা কেমন গুড়গুড় করছে জানো? কেমন একটা ভয় ভয় লাগছে। আবার আনন্দও তো হচ্ছে। এভাবে তো কোনোদিন তোমাকে পাইনি আকাশ! এভাবে, এতটা গভীর নীলে, আকাশ, তোমাকে পাবো ভাবলেই হাসি পাচ্ছে জানো। তোমার দিকে তাকাতেই লজ্জা লাগছে আমার। আমি তোমাকে পাবো, মানে তুমিও তো আমাকে পাবে। আচ্ছা, এই পাওয়া কাকে বলে আকাশ? সারাদিন হোটেলের ঘরে, সারাদিন দুজনে দুজনে! তোমার বুকের কাছে যে তিলটা আছে, সেটা আমি দেখেছি। তোমার জামার ফাঁক দিয়ে উঁকি দিয়ে আমাকে ডেকেছে বহুবার। এবার সেই তিলটাকে ছুঁয়ে দেখব আমি। আমারও একটা তিল আছে। কোথায় আছে বলব না। ছিঃ, এসব কথা কি মুখফুটে বলতে আছে? তুমি খুঁজে নিও। আমাদের দুজনের শরীরের সমস্ত তিল আমাদের দুজনের আপন। আমাদের তিল তিল করে গড়ে তোলা এই দিঘা-সফরের স্বপ্নের মতো। কেউ জানে না আর। শুধু তুমি আর আমি এই বেড়াতে যাওয়ার কথা জানি। বাড়িতে জানে আমার অফিসের ট্রিপ। অফিসে জানে আমার বাড়ির ট্রিপ। বন্ধুরা কিছুই জানে না। জানবেও না কেউ কিছু। জানবে না কীভাবে টাকা জমিয়েছি আমি আর তুমি। জানবে না কত রাত মেসেজের পরে মেসেজ ভেসে গেছে আমাদের পরিকল্পনায়। লোকজন কত দূরে দূরে যায়। বিয়ের আগে যায়। বিয়ের পরে যায়। আমাদের দিঘাই ভালো। দিঘাতে আমি আর তুমি আর হোটেলের রুম, এই আমাদের দুদিনের স্বর্গ। মাঝেমাঝে সমুদ্রের হাওয়া এসে ছুঁয়ে দেবে তোমার কপালের চুল। উড়ব আমরা দুজনেই। এই আকাশ, হোটেলের জানলা দিয়ে সমুদ্র দেখা যায়? যায় না, তাই না? ছাড়ো তো, কী হবে জানলা দিয়ে সমুদ্র দেখে? আমাদের ঘরে কি সমুদ্রগর্জন হবে না? সকালে দুপুরে রাতে? তাছাড়া বিকেলের দিকে সি-বিচে বেড়াতে যাবো কেমন? মাছ ভাজা খাবো। শুনেছি ভালো পমফ্রেট ভাজা পাওয়া যায়। আইসক্রিম খাবো। তুমি কিন্তু একটাও সিগারেট খাবে না, কথা দাও। আর ওসব এনেছ বুঝি ব্যাগে? আমি কিন্তু এক চুমুকও খাবো না। কী তেতো! ছিঃ। তুমি খেতে হলে খাও। আমি ওসবে নেই। উমমম, আচ্ছা দিও। জাস্ট এক পেগ খাবো, কেমন? যদি মাথা ঘোরে? কে আর দেখতে আসছে! কেউই দেখতে আসবে না আমাদের, আকাশ। সবাই ভেবেছিল আমি আর তুমি আলাদা হয়ে গেলাম চিরতরে। সবাই ভেবেছিল বুঝি মুখ দেখাদেখি বন্ধ হয়ে গেল আমাদের। সবাই সান্ত্বনা দিতে এসেছিল আমাকে। ওরা জানেই না আকাশ আর রাত্রি, রাত্রি আর আকাশ একে অপরের থেকে আলাদা থাকতেই পারে না বেশিদিন। আমাদের নামেও কী মিল! তাই তো তুমি আকাশ নও, তুমি ‘রাত্রির আকাশ’। তোমার আকাশে তারা ফুটে থাকে। আর আমি সেই দিকে চেয়ে থাকা চোখ। ফোনটা রাখো না, আকাশ? কী খালি সারাদিন খুটুর খুটুর? হোটেল বুকিং তো হয়েই গেছে। আচ্ছা, আমরা তালসারি বেড়াতে যাবো না? কীইইই? না, মোটেও আমি সারাদিন হোটেলে থাকব না। খালি দুষ্টুমি তোমার! এই দ্যাখো দেখো, দিঘা ঢোকার গেট। আর কিছুক্ষণ পরেই তোমার তিলে ঠোঁট ছোঁয়াবো আমি। তোমার বুক রোমকূপগুলো কেঁপে কেঁপে উঠবে ঢেউয়ের মতো। আজ পূর্ণিমা, জানো তো? একটু বেশি রাত অবধি সি-বিচে থাকতে দেয়? আমি কখনও সমুদ্র দেখিনি। আর চাঁদের আলোয় দুলে ওঠা ঢেউ কেমন লাগে তাও জানি না। শুনেছি সমুদ্র টানে। রাতের কালো জল কাছে টানে। বলে, এসো। মনে হয় ছুট্টে চলে যাই। চলো চলো আকাশ, দিঘা এসে গেছে। বাস থেকে নামতে হবে। একটা ব্যাগ তুমি নাও না প্লিজ। সব আমি নেবো? ধুৎ, তুমি খুব ফাঁকিবাজ। দাঁড়াও, সাবধানে রাস্তা পেরোই আগে। রাস্তা পেরোতে আজকাল খুব ভয় লাগে আমার। এই তো আমাদের হোটেল। দাঁড়াও, রুমটা নিই। আমার নামেই তো বুক করা। চলো আকাশ, আর তর সইছে না। হেসো না তো! চলোওও। দেখো দেখো আমাদের রুমটা কী সুন্দর! এখন শুধু তুমি আর আমি। হোটেলটা ভালোই পেয়েছি। শুধু কাউন্টারে বসা লোকটা ভালো না। কেমন করে যেন আমাকে দেখছিল। জানতে চাইল, দু’জনের জন্য বুক করে রাখা রুমে আমি একা কেন? আমি কোনও উত্তর দিইনি। রাগ ধরে গেছিল। ওকে কেন এত কিছু বলব? সবাই কি সব কিছু বোঝে? সবাই কি অনুভব করতে পারবে, তুমি ছাড়া আমি অসম্পূর্ণ? তুমি আমার কাছে নেই এটাই একটা দুর্ঘটনা।