লিলিথের চিঠি

রিমঝিম আহমেদ ও রাজিব মাহমুদ


রিমঝিম আহমেদ


লিলিথের চিঠি
.....
মানুষ নিষিদ্ধ জেনে মানুষের কাছে যাও ফের
অন্তেবাসী বৃন্ত থেকে ঝরে যায় সব ধর্মপাঠ
আদমের ভাই তুমি নিষিদ্ধ গন্দম টেনে খাও
আমিও লিলিথ জেনো অনিন্দ্য দোসর শয়তানের
তোমার হারামিপণা ভুলি নাই মানব মহান
পুরুষের ডামাডোলে পুষে রাখ অহমের ধার
পৃথিবী তোমার যত, ততটা আমারও ভাগে আছে
চাঁদের কলঙ্ক দেখো জোছনার বৈভব-ভোলা গান
ঈশ্বর স্বভাব নিয়ে জঙ্গার একক ভাগীদার
ভাবছ নিজেকে জানি- ভুলের মৌতাতে জেগে
কতখানি ঘুণেধরা মনে রাখো তোমার পাঁজর
কীট ও কণ্টক নাচে মর্মান্ধ শরীর খোলা দ্বার
তুলেছি কি বিষ ফুল? হে ঈশ্বর তুমিও পুরুষ
স্নায়ুতে-শোণিতে জাগে দ্বিধাহীন জন্মগত রোষ


বন্ধক
এই বৃষ্টিপাত, হৃদয়ের বিপর্যয়ে যারা ছাতা ধরেছিলে, তাদের কাছেও বন্ধক রয়েছে
জীবনের কয়েক আনা। অসম্পূর্ণ আমি মৃত্যুকেও ছুঁতে পারি না অপরিশোধ্য ঋণ-ভারে।
বয়স্ক বটের মতো নির্বিকার দাঁড়িয়ে থাকি পাতার ভেতর পাখিজগত নিয়ে, চল আড়ালে যাই, সেরে ফেলি বকেয়া সঙ্গম। যে শিশুটি স্বপ্নে ঘুমিয়ে আছে তার জন্য ঝাঁটপাট দিয়ে রাখি সামান্তরিক উঠোন।

প্রতিআশা
আমার একদিন ঠিক নষ্ট করে দেব
তোমার একদিন ভুলে লেগে যাবে গায়ে
আমার একপাশ যেন অবশ অবশ
তোমার একপাশ যদি সরে যায় দূরে
আমার ডানহাতখানি খসে পড়ে যাবে
তোমার আঙুলগুলো খেলা ছেড়ে দিলে
আমার শরীর যেন শরীর লাগে না
ঘুমের গভীরে তুমি পাশ ফিরে শু'লে
আমার বুকের কাছে নদী এসে থামে
তোমার ভেতরে তার ঢেউ ঢেউ লাগে
জলের বোতাম খুলে জলে ঢুকে পড়ি
তোমার নিশ্বাস নিয়ে ফের বেঁচে উঠি
তোমার জীবন হোক ছেঁড়াপুঁতি-মালা
ছড়াব ছিটাব আর যত্নে তুলে নেব

===============================================



রাজিব মাহমুদ

শ্যোওভিনিজম

একটা এ্যাডফার্মের ক্রিয়েটিভ টিমের সাথে আজ হাসানের ইন্টারভিউ। ওর কাজ হবে মূলত দু’টো: (১) ক্লায়েন্টের প্রোডাক্টের বিবরণ শুনে টিমের সাথে বসে বিজ্ঞাপনের কনসেপ্ট তৈরিতে সাহায্য করা ও (২) বিজ্ঞাপনের সাথে যাবে এমন ট্যাগ-লাইন, পাঞ্চ-লাইন ও ক্যাপশন তৈরির আইডিয়া দেওয়া। চাকরিটা হলে ইংরেজিতে ইভিনিং এম.এ টা চালিয়ে যেতে পারবে। পাশাপাশি কবিতা লেখার অবাধ্য শখটাকেও খানিকটা প্রশ্রয় দেওয়া যাবে। যদিও তখন দিন-রাত কাজ আর পড়াশোনার চাপে জীবনটা চ্যাপ্টা বাসি বার্গারের মত হয়ে যাওয়ার বাঘ-ভাল্লুক ভাগ সম্ভাবনা রয়েছে।
ইন্টারভিউয়ের দিন এসব ভাবতে ভাবতে কিছুটা দ্বিধা নিয়ে পৌঁছে গেল এ্যাড ফার্মের সুদৃশ্য ত্রিতল অফিসটাতে। ঢুকতে গিয়ে দেখল যে ওর ঢোকার অনুমতি নেই। অফিসের লোকজন যে যার মত কার্ড সোয়াইপ করে ঢুকে যাচ্ছে। একজনের দয়া হলো ওর ওপর। কেন এসেছে জিজ্ঞেস করে পাতলা ঠোঁটে একটা হালকা হাসি মিলিয়ে যেতে দিতে দিতে তার পেছন পেছন হাসানকে ভেতরে ঢুকতে বললেন ভদ্রলোক।
বাইরে ঘন রোদের সাথে দীর্ঘ ও ঘর্মাক্ত চিপকা চিপকি’র পর ভেতরের এসি’র মিষ্টি বাতাস ‘কফি উইথ বর্ষা’র চৌকস হোস্ট বর্ষার মত একটা সুগন্ধি ও শীত-শীত ‘হাগ’ দিল ওকে। শরীরটাও এই আরামের উইকেটটুকু লুফে নিয়ে এতক্ষণের ক্লান্তিটুকুকে খারিজ করে দিয়ে খুশি হয়ে উঠল- কয়েক মিনিটের মধ্যে ঘাম শুকিয়ে বেশ ‘ভদ্রস্থ’ একটা ইন্টারভিউই-সুলভ চেহারা ফুটে উঠল হাসানের।
যাই হোক, ইন্টারভিউটা ঠিক টেবিলের এপাশ-ওপাশ মার্কা ফর্মাল কিছু না। ক্রিয়েটিভ টিম বলে কথা! এরা তাকে ইন্টারভিউ করছে ওদের অফিসের ক্যাফেটেরিয়ায়। পুরো টিম চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে গেল। সংখ্যায় তারা চার জন; একজন একটা টেবিলে হেলান দিয়ে সামনের দিকে পা ছড়িয়ে বেশ কায়দা করে দাঁড়ালেন। আরেকজন তো টেবিলে চড়েই বসলেন। আর বাকি দু’জন হাসানের দুই পাশে চেয়ার টেনে বসলেন। দু’জন পুরুষ ও দু’জন নারী। দলনেতা গোছের যাকে লাগছে তিনি নারী। একে একে সবাই নিজেদের পরিচয় দিলেন ইংরেজিতে আর শেষ জন তার দিকে ফিরে মুখে মাকড়সার ঝুলের মত বিনবিনে হাসি ঝুলিয়ে বললেন-
‘এন্ড ইউ?’
হাসান ঠিক-ই ধরে ছিল। দলের প্রধান একজন নারী। পরিচয় পর্বেই সেটা পরিষ্কার হয়ে গেল। নিজের পরিচয় দিয়ে টিমের বিভিন্ন জনের নানা প্রশ্নের উত্তর দিয়ে গেল হাসান। এরপর শুরু হলো ইন্টারভিউয়ের দ্বিতীয় পর্ব। এই পর্বে ওকে কয়েকদিন পর আসা একটা আন্তর্জাতিক ক্রিমের উদযাপিত নারী দিবস উপলক্ষে নারীদের উদ্দেশ্য করে ৮-১০ শব্দের একটা উৎসাহমূলক ট্যাগ-লাইন লিখতে বলা হলো। লিখতে হবে ইংরেজিতে আর সময় বেঁধে দেওয়া হলো ১৫ মিনিট। একই সাথে চমকপ্রদ ও কমিউনিকেটিভ কিছু লিখতে হবে। সামনে এক কাপ গরম কফি আর কাগজ-কলম রেখে বেরিয়ে গেল পুরো দলটা। ১৫ মিনিট পরে ফিরে এসে ওর ট্যাগ-লাইনটা বিশ্লেষণ করবেন তাঁরা।
অনেক চিন্তা করেও প্রথম দশ মিনিট লেখার মত কিছুই খুঁজে পেলো না হাসান। সব উপমা-উৎপ্রেক্ষারা যেন ওর মগজের বহু ওপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছে আর নিচে ওর দিকে তাকিয়ে নিঃশব্দে টিটকারি মারছে ওকে। হাল ছেড়ে দেওয়ার আগের মুহূর্তে হঠাৎ খসখস করে লিখল ‘দিস ইজ ইওর ডে। গিভ বার্থ টু ইট।’
ক্রিয়েটিভ টিমের সবাই এসে গেল ঠিক ১৫ মিনিট পরেই। ওর ট্যাগ লাইনটা পড়ে টিমের নেতার ভ্রু কুঁচকে উঠল। ওর দিকে শীতল চোখে তাকিয়ে তিনি বললেন-
‘আচ্ছা আপনাদের পুরুষদের প্রব্লেমটা কোথায়? হোয়্যার এগ্‌জাক্‌ট্‌লি লাইজ দ্য প্রব্লেম?’
হাসান কী বলবে ভেবে পেলো না। হাতের বুড়ো আঙুলটা তর্জনীর সাথে চেপে ধরে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল কিন্তু তার আগেই দলনেতা হুঙ্কার দিয়ে উঠলেন-
‘ইউ এন্ড বাই ‘ইউ’ আই মিন অল মেন থিংক দ্যাট উইমেন উইল ওনলি গিভ বার্থ, রাইট? মানে বাচ্চা জন্ম দেওয়া ছাড়া মেয়েরা আর কিছু করার উপযুক্ত নয়, তাই তো?’
ওর লোমকূপের শুকিয়ে যাওয়া ঘাম পুকুরের জন্য কাটা গর্তে পানি জমার মত কলকল ধারায় ফিরে আসতে শুরু করেছে আবার। এসির শীতল বাতাস কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলছে। ধীরে ধীরে তর্জনীটা আবার বুড়ো আঙ্গুলে চেপে ধরে হাসান নার্ভাসভাবে বলল-
‘ওয়েল আই ডিড নট মিন দ্যাট। ইউ নো, ইট্‌স্‌ নট রিয়েলি এ ফার্টিলিটি মেটাফোর। ইট্‌স লাইক...ইউ গিভ বার্থ টু আ নিউ ডে। দ্য ডে ইজ অল ইয়োর্স। মানে দিনটাকে আপনি একেবারে নিজের মত করে জন্ম দিন...ইউ নো...এটা একজন পুরুষের ক্ষেত্রেও হতে পারে। ইটস নট আ লিটারাল বার্থ...’
নেতা এবার সব ধৈর্য হারিয়ে আগের হুঙ্কারটুকুর সাথে আরও ২ চিমটি চিৎকার যোগ করে উনার উষ্মাকে এক নতুন মাত্রা দিয়ে বললেন-
‘দেন আই উড সে দিস ইজ এ রাবিশ মেটাফোর কামিং ফ্রম ইওর আটার শ্যোওভিনিজম...উইমেন উইল জাস্ট গিভ বার্থ...ও মাই গড...হাউ ডিমিনিং’
টিমের অন্য মেয়েটা হাসানকে কিছুটা সমর্থন দিতে চাইল-
‘আপা আই গেস...হি হ্যাজ আ পয়েন্ট...ইউ নো...দিস্ ইজ আ কম্পেরিজন বিটুইন...’
এবার মানব-সুলভ চিৎকারে আর পোষাল না, শোনা গেল প্রাগৈতিহাসিক গর্জন-
‘হেল উইথ ইওর রাবিশ কমপেরিজন ...কাম অন্ অনিন্দিতা...ইউ আর আ উওমেন...হাউ কাম ইউ আর সাপোর্টিং সাচ এ শ্যোওভিনিসটিক ক্যাপশন...শেইম অন ইউ’।
কিছুক্ষণের জন্য নীরবতা। দলনেতা আবার বলল, “বরং সকালে যে ফিমেল ক্যান্ডিডেট এ্যাপিয়ার করেছিল ওর ক্যাপশানটা বেটার ছিল। শি রোট, ‘হ্যাভ এন আইসক্রিম এন্ড স্পয়েল ইওর ডায়েট টুডে’...হাউ স্মার্ট এন্ড ক্রিস্প।”
হাসান যখন বেরিয়ে এলো, আকাশটা ঘোলা হতে শুরু করেছে। অফিসের বাইরে এক পা দিতেই আকাশ আড়াল করে রাখা বিলবোর্ডটা চোখে পড়ল ওর। সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটা হাসছে। খোলা চুল, হাতে একটা বিশাল আইসক্রিম যাতে সে একটা চোখ বন্ধ করে কামড় বসিয়েছে...
নিচে লেখা, ‘হ্যাভ এ্যান আইসক্রিম এন্ড স্পয়েল ইওর ডায়েট’।
এর মাঝে কোনো ভাব-আলামত না দিয়েই বিলবোর্ড, আইসক্রিম, হাসান আর মেয়েটাকে ভিজিয়ে দিয়ে আঙুরের মত বড় বড় ফোটায় বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল। বৃষ্টিটার বৈশিষ্ট্য কি নারীর না-কি পুরুষের না-কি সবার এ নিয়ে ভাবার সময় এই মনোরম মেট্রোপলিসের অধিবাসীদের নেই। বৃষ্টি থেকে বাঁচতে এরই মধ্যেই এরা পিল পিল করে এদিক-ওদিক-সেদিক ছোটাছুটি শুরু করে দিয়েছে।