ঈর্ষা

সায়ন্ন্যা দাশদত্ত ও সমরজিত সিনহা


সায়ন্ন্যা দাশদত্ত

ঈর্ষা-১

কইয়ের থেকেও নির্মম কাঁটা ,সাজিয়ে রাখছ ড্রেসিংরুমে । সেন্স ভালো । কমলা পর্দার পাশে উদগ্র বেগুনী মিথ্যে । শয্যায় রেখেছ বামফ্রন্ট মেনিফেস্টো । কাকে চাইছ ?দাবির বাবা কে ? বাপবিহীন মেয়েটা বিকলাঙ্গ ,গতজন্মের পাপ । আহা এসব সাজিয়ে ফেলেছ ! চরম সেন্স তোমার । কবার মিলন ,বিয়ের আগে ? কতবড় সেই পাপ ? শিশুটি ক্রেশে কাঁদল অনেকক্ষণ । ভুলে গিয়েছে বাবা এবং মা ।
পরজন্মে বুলেট রেখে যেও ,যে বিদ্ধ করবে যত্নশীল ছক !



ঈর্ষা-২


আমি চাইছি । আমি চাইছি বারংবার পাহাড়ের মতো বাধা হয়ে যেতে । পালকবিহীন বাধা । উড়তে জানেনা । কেবল স্থবির । কান্না নেই । গিলে ফেলেছে নরকের মতো শোধ ,এখন কেবল দেখছে । এই দেখার বামপাশ ঘিরে হাঁটতে হাঁটতে তোমরা উইকএন্ডে গেলে । তুলে নিচ্ছ বীভৎস লাল সাবান । ঘষে ফেলবে সমস্ত বাড়তি কালির কথা । অথচ আমি দাঁড়িয়ে আছি মুখেই । কিচ্ছু নেই ...ক্ষিদে ,তেষ্টা ,ঘাম !কেবল জঘন্য নীলের মতো গিলে খাচ্ছি ....গিলে খাচ্ছি তোমাদের নবীন বাসা ।


ঈর্ষা-৩

আরেক বাঁকের মুখেই ভেসে যাচ্ছে ঘরবাড়ি । তোমার প্রেমিকার মিথ্যেমিথ্যে সংসার লন্ডভন্ড ক্রোধে । দুর্নিবার খরার শেষে প্রস্তুতি দাবানল । বিবর্ণ মহিষগুলি নেমে গিয়েছে জলে , ক্রমাগত দোজখের পাশে । শীতলপাটি ভক্ষণ করছেন উই ,আমার বিগত আত্মীয় । এই লগ্নে দাঁড়িয়ে তোমরা কুড়িয়ে আনছ তেজপাতা ,ফেনা ওঠা সমূহ বিষ ....নিধনের মুখোমুখি তোমাদের অসহায় সংসার !আমি তালি বাজিয়ে হাসছি !

================================================

সমরজিত সিনহা

ঈর্ষা

ছাগবলি হয় কালীপুজোয় । ছাগ, কালী, বলি, সব মূলত প্রতীক । এই প্রতীক কবিতা বা শিল্পে আলাদা ব্যঞ্জনা বয়ে আনে । ভ্যান গঘের ছবির ঐ হলুদ রঙের মত । এই ব্যঞ্জনা অনুভবের, উপলব্ধির । ছাগ মানে ছাগল নয়, ষড়রিপু । এটা উপলব্ধি করতে পারেনি, বলে, কালীপুজোয় ছাগল বা পাঁঠাবলির প্রচলন করেছে ব্রাহ্মণকূল । এই ব্রাহ্মণ শব্দটিও প্রতীক, এক ইশারা । সকলেই ব্রাহ্মণ নয়, কেউ কেউ ব্রাহ্মণ । যারা রিপুবলি দিতে পেরেছিল আলোর সাধন করে ।
একজন কবির কাজ ঐ আলোর সাধনা করা । এই আপ্তবাক্যটিকে যদি শিরোধার্য করি, দেখা যাবে, বৈষ্ণব কবিদের অনেকেই রিপুপথ পার হয়ে যাত্রা করেছেন অনন্তের পথে । তারপরও, আমরা লক্ষ্য করি, ষড়রিপুর চলাচল কবিতায় থেকে গেছে । যা এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়, বলে, আমি মনে করি ।
কেন আমি তা মনে করি ? বাজার সংস্কৃতি, এই মুহূর্তে, গ্রাস করে নিচ্ছে আমাদের স্বপ্ন এবং দুঃস্বপ্ন, আমাদের ইচ্ছা ও অনিচ্ছা । আমরা আর সাধক নই, বরং ভোগী । ফলে, ষড়রিপু আমাদের নিয়ন্ত্রক না হোক, প্রভাবিত করার ক্ষমতা ধরে । কাম, লোভ, ক্রোধ, ঈর্ষা আমাদের রক্তে । না হলে, জীবনানন্দ দাশ-এর ঐ বিখ্যাত পংক্তি আমরা পেতাম না । সুরঞ্জনা ঐখানে যেও নাকো তুমি ।
জীবনানন্দ ঈর্ষার মত এক রিপুকেও ব্যবহার করেছেন তার কবিতায় । রবীন্দ্রনাথের দুর্যোধন জোর গলায় বলেছেন, ঈর্ষা মহতের ধর্ম । এর আগে বৈষ্ণব কবিদের কবিতায় তা লক্ষ্য করেছি আমরা ।
তারপরও, প্রশ্ন উঠবে, কেন ঈর্ষা কবিতার বিষয় হয়ে উঠবে ? কবিতা বিষয়াতীত, ইশারা মাত্র, যে ইশারা অনুভূতির সন্তান । সে কেন বিষয়াধীন হবে ?