শরীরের চেম্বার মিউজিক

কুমার চক্রবর্তী ও মণিকা চক্রবর্তী


কুমার চক্রবর্তী
১.
শরীরের চেম্বার মিউজিক

হোটেল চেলসিয়ায় তুমি খুলে ফেলেছিলে পোশাক
আর তখনই বুঝলাম, পোশাকের আড়ালেই থাকে নগ্নতা,
তোমার ঐশ্বর্য।
দেখছিলাম তোমাকে, তোমার ঠাসবুনোটময় মন্দাক্রান্তা,
আর চাইলাম আবিষ্কার করতে, তার অর্ধস্বর ও অভিপ্রায়।
আয়নাতে প্রতিফলিত তুমি, শরীর― যেখানে জন্ম দিয়ে চলেছে
অসংখ্য গঙ্গা-যমুনার,
আমি দেখি তোমার রূপ আর প্রতিরূপ
ভাবি, দেহই প্রেম, এক শিল্পিত তরবারি।
স্পর্শ করলাম তোমাকে, হে সেমেলে, আমি জুপিটার,
কেউ যেন ফুঁ দিল শিঙায়, ধ্বংস কি হবে ব্রহ্মাণ্ড!
নদীগুলো উঠে যাবে আকাশে, পর্বতেরা নেমে যাবে সমুদ্রে
আর সৃষ্টি হবে এক সুস্বাদু যন্ত্রণার।
তোমার স্যুররেয়াল শরীর, তাতে আর্তেমিসের স্তন,
ঊরুর চাপে উদ্ভ্রান্ত রুপালি প্রিজম আজ গেয়ে যায়
অনন্ত রাতের সোনাটা;
এসো আয়নার গভীরে যাই, শুয়ে শুয়ে হই উপগত
সৃষ্টি হবে শরীরের চেম্বার মিউজিক, আর তুমি ও আমি
হয়ে উঠব― শরীর, সঙ্গমের,
সঙ্গম, শরীরের।



২.
শরীর না মন!

অনেক জীবন ঘুরে, খাল হয়ে, নদী হয়ে, সমুদ্রে এসেছি
বহমানতার কথা ভুলেছি এখন, মনে পড়ে
সঙ্গমস্নিগ্ধ দ্বিপ্রহর, শরীরের স্রোতে বিকেল গড়িয়ে গেল
তোমার পর্বতশৃঙ্ঘে, ভাবছি কখনো, ভাবছি কি
উড়ে উড়ে সঙ্গমের কথা, অথবা কি ডুবে, গভীর সলিলে
যেমন মাছেরা মাতে অতিন্দ্রীয় জলজ সংযোগে,
শরীরে অগুরুগন্ধ, মাতাল পবন।
একটাই মনে রাখি, প্রশ্ন জাগে, রমনে কে গুরুত্ববহ
শরীর, না মন?

রেখা ভাঙে অবিরত
কখনো শরীর ভাঙে নিজস্ব খেয়ালে, একটি পৃথিবী
অবশেষে ক্লান্ত হয়, হয় খণ্ড, এই ভেবে―

রমনে কে বার্তাবহ?
শরীর, না মন!


৩.
কিউপিডের মনন্তত্ত্ব

তোমার শরীর যখন ছোঁয় আমার শরীর
তখনই হয়ে উঠি মুক্ত কিউপিড,
আমার তির বিদ্ধ করে তোমার দেবীপীঠ
তুমি চিহ্নে চিহ্নে হয়ে ওঠো অজানা অ্যাক্রোপোলিস,
তোমার স্কামান্দার নদী, তোমার শরীরের উদ্ভাস
বয়ে চলে আমার ভেতরে, আর ভাসে ও ভাসায়
রসে ভরে ওঠে থোকা থোকা আঙুর
আমি পান করি, দেখি রহস্য, দেখি বুনে যাওয়া হাওয়ার নকশা,

এসো, প্রথাগত পদ্ধতির বাইরে, এসো সাইকি
হই জোড়... উড়ে উড়ে... হাওয়ায় হাওয়ায়...
অথবা হাঁটতে হাঁটতে, যোনি আর লিঙ্গম
করবে রচনা , ভিন্ন এক চিরন্তনতায়...

=================================================

মণিকা চক্রবর্তী

অ্যাম্পিথিয়েটার

টাইমমেশিনে চড়ে কি সত্যিই পৌঁছা যায় পেছনে, অতীতে? কে জানে? অদ্ভুত এক স্বপ্নের মধ্যে ভোরের দিকে ঘুম ভেঙে গিয়েছিল তার। আর নিজেকে আবিষ্কাার করেছিল প্রাচীন কলোসিয়ামের ভেতর । কী এক অপরাধে তাকে পরানো হচ্ছিল গ্ল্যাডিয়েটরের পোশাক। আর এক অমোঘ অনিবার্যতায় তাকে ছেড়ে দেয়া হচ্ছিল হিংস্র সিংহের সামনে। বাথরুমের আয়নায় মুখ দেখতে দেখতে তার, মোহনার মনে হতে লাগল তার চোখ, চোখের পাতা, ঠোঁট কিছুই যেন আগের জায়গায় নেই, তারা যেন স্থান পরিবর্তন করেছে! কী অদ্ভুত! আয়নার দিকে আবার তাকিয়ে বিস্মিত হল সে। চোখের মণি থেকে যেন বের হতে দেখল লকলকে এক জিহ্বাকে। ঠিক যেন হরর ফিল্ম। যেন কোনো আকাঙ্ক্ষার সাপ প্রতিফলিত হলো চোখের মধ্যে থেকে। অলৌকিক টাইমমেশিনের কথা ভাবতে ভাবতে সে লকলকে জিহ্বাযুক্ত সাপের বিষাক্ত পৃথিবী থেকে হঠাৎ পালিয়ে বাথরুমের জলের কলের দিকে নুয়ে দেখে, ঝরঝর করে ঝরছে জল। সে জলে মিশে যায় ভয়ের তীব্রতা, ব্যাথার দাগ, স্বপ্ন, ইচ্ছে, প্রতিরোধ । না, ভাবনাগুলো মাথায় নিয়ে বাথরুমে আর দেরি করা যায় না। মুহূর্তেই সজাগ হয়ে উঠল সে। সকাল সাতটা বেজে গেছে। এখনি মেয়েকে স্কুলের জন্য রেডি করে, টেবিলে শাকিলের নাস্তা গুছিয়ে, আর নিজেকে অফিসের জন্য দ্রুত তৈরি করে দশ মিনিটের মধ্যে বেরিয়ে পড়তে হবে। নইলে বিশাল ট্র্যাফিক জ্যামে আটকে পড়বে যে। মেয়ের স্কুলটা ওর অফিসের কাছে বলে মোহনা নিজেই তাকে নিয়ে যেতে সাচ্ছন্দ্য বোধ করে। শাকিল বের হবে একটু পরে । নিজের মতো অতি আধুনিকতায়। অতি আধুনিকতা শব্দটি অস্ফুট স্বরে বিড়বিড় করে মোহনা প্রায়ই নিজের সাথে বলে। আজও আবার একবার মনে মনে বিড়বিড় করল। শব্দটি মেনে নিতে তার যেন ভীষণরকম কষ্ট হয়। শাকিলের অতি আধুনিকতার মনোভাবটি যেন নিঃশব্দে তাকে ধাক্কা দিয়ে দিয়ে পাল্টে দিচ্ছে অনেকখানি। শাকিল কি তার আধুনিক চশমার কাচের আড়ালে টের পায় মোহনার এই বিপন্নতাকে?

২.
মেয়েকে যথারীতি স্কুলের গেটে ঢুকিয়ে দিয়ে সিদ্ধান্ত পাল্টাল মোহনা। না, আজ সে অফিসে যাবে না। কিছুতেই কোনো কাজে মন বসাতে পারবে না আজ। গতকালও অফিসে যেয়ে মনমরা হয়েছিল । অব্যক্ত কান্না আর গোপনীয়তাগুলো মিলেমিশে মনখারাপের যন্ত্রণাটা বেশ স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছিল চোখেমুখে। সহকর্মীদের চোখ এড়ায়নি তার চোখ মুখের হাবভাব। মনে হচ্ছিল কিছু পেঁচার মুখোমুখি হয়ে নীরবে একঘেয়ে কাজ সারছিল সে। কী বিরক্তিকর অনুভুতি! আজ বরং বাসাতে ফিরে গিয়েই দিনটি কাটানো যাক! শাকিল নিশ্চয়ই এতক্ষণে বেরিয়ে গেছে। ভাবতে ভাবতে মোহনা কখন যেন গ্রিন রোডের কাছাকাছি এসে গেল। আর একটু গেলেই বাসায় চলে যাওয়া যেত। কিন্তু বাদ সাধল রাস্তার উপর আড়াআড়িভাবে থেমে থাকা একটা পাজেরো গাড়ি। গাড়ি আটকে পড়ে পুরো রাস্তায় বেহাল অবস্থা। রিকশাটাকে ঘুরে যেতে বলল সে। আর ধানমন্ডির নিরিবিলি রাস্তায় এসে উত্তেজক বাতাসের ঝাপটায় মনে হলো, আজ বসন্তেরই কোনো একটি দিন। বুকের মধ্যে আটকে থাকা অসমাপ্ত কথাগুলোর উন্মাদনার ভেতর সে রিকশা থেকে নেমে ধানমন্ডি পার্কের দিকে হাঁটতে লাগল।

পার্কে ঢুকেই মোহনা নিশ্চিত হলো বসন্ত এসেছে । যদিও তার সময়গুলো বরই অসংলগ্ন,আর কেবলই হারিয়ে যায় ভীষণ অপচয়ে। লেকের জলে মেঘের ছায়া । তীব্রভাবে ফুটে আছে শিমুলের লাল রং। নির্জনতার মধ্যে পরে থাকা স্তূপাকার ঝরা পাতার উপর পা রেখে সে হেঁটে চলে। তার মনে হতে থাকে, অনেক ঝরে যাওয়া পাতার নীচে কখন যেন হারিয়ে গেছে তার নিজস্ব বসন্তের অনুভব। ভেতরে ভেতরে এক অসুখী দাম্পত্যের বোঝা সে বয়ে বেড়াচ্ছে। কাকে বলবে সে এসব অপমানজনক অনুভবের কথা। শাকিলের সাথে সর্ম্পকটা কেমন যেন অদ্ভুত মনে হয় আজকাল। শাকিলকে সে বিয়ের আগ থেকেই চিনত । বরাবরই স্মার্ট আর চটপটে ছিল শাকিল। বিয়ের পর ওদের দুজনকে একসঙ্গে দেখে বান্ধবী নাজনীন তো বলেই ফেলছিল, ‘দারুণ মানাইছে তোদের। শাকিল ভাই তো আর আলমের মতো ফ্রোজেন না। আলমের কোনো তাপ-উত্তাপ নাই বুঝছস। সম্পর্কটা খালি জোড়াতালি দিয়া চালাইতাছি। মাঝে মাঝে এত অসহ্য লাগে, না পারি কইতে, না পারি সইতে।’ মোহনার সবুজ তাঁতের শাড়ির সাথে ম্যাচ করা রঙিন চুড়িগুলোও না বুঝে হেসে উঠেছিল নাজনীনের কথায়। তখনও মোহনা বুঝেনি দাম্পত্যের পরতে পরতে কত জটিলতা! আহা ! নাজনীন যদি এই দেশেই থাকত! তার সাথে গলা জড়িয়ে ধরে মন খুলে বলা যেত এইসব টানাপোড়নের জটিল অভিজ্ঞতা। দিন দিন দাম্পত্যের ওপর মহাবিতৃষ্ণায় আছে সে। গতকালও ঘটেছিল যথারীতি ঝগড়া। রাতে ঘুমোতে যাবার আগে সবসময়ের মতই পর্নো দেখছিল শাকিল। মোহনা কোনোদিন মেনে নিতে পারেনি এই বিকৃতি। অনেকবার অনুরোধ করে বলেছে। শাকিল পাত্তায়ই দেয়নি। গতরাতে মোহনা আর ধৈর্য রাখতে পারেনি। তাই বলেছিল:
‘রোজ রোজ তোমার এই বিকৃতির সাথে আমি মানিয়ে নিতে পারছি না।’
‘যাকে তুমি বিকৃতি বলছ তা আমার কাছে ফ্যান্টাসি।’
‘ফ্যান্টাসি মাঝে মাঝে হতে পারে। তাই বলে রোজ রোজ এসব! তুমি আসলেই অসুস্থ, পারভার্টেট। এসব তো রোজ রোজ দেখছই, আমার শরীরকেও ব্যবহার করছ বিকৃতভাবে।
‘আমি অসুস্থ নই, খুবই আধুনিক মানুষ আমি। বরং তোমাকেই অসুস্থ আর শুচিবাইগ্রস্ত বলা যেতে পারে।’
‘প্রতি রাতে পর্নো দেখে বিকৃত সেক্সের পর ঘুমোতে যাওয়া যদি আধুনিকতার মানদণ্ড হয়, তবে ঘৃণা ছাড়া আমার আর প্রকাশ করার কিছু নেই।’
‘কেন? তুমি এনজয় করো না বুঝি?’
‘শাকিল, তুমি কেন বুঝতে পারছ না আমি অপমানিত হই, আমার শরীরও হয়। ওইসব শরীরের সামনে আমার শ্বাস বন্ধ হয়ে আসে। ছবিগুলোর গা থেকে লালা গড়িয়ে পড়ে, আমার ঘেন্না হয়। তাছাড়া আজকাল আমাদের মধ্যে কোনো সুস্থ কথাবার্তা হয় না। তুমি কি টের পাও! তুমি কি কখনো বুঝতে পেরেছ আমার মনটাকে?’
‘শোনো, নিজের শরীরের মানচিত্র দেখেছ? এসব বলার আগে নিজেকে একবার আয়নায় দেখো। খুব তো চটাং চটাং কথা! ’
‘কেন আয়নায় দেখব? আমার স্বাভাবিকত্ব যদি তোমার না পোষায়,তবে তুমি আলাদা থাকার কথা ভাবতে পারো! তোমার এসব ইতরামি আমার আর পোষাচ্ছে না। প্রতিরাতে একটা বাঘের সামনে নিজেকে ছিঁড়ে ছিঁড়ে দেয়া ! মনে হয় কুত্তায় চাটতেছে শরীর!’
শাকিল পাল্টা উত্তর না দিয়ে যা ঘটিয়েছিল তাকে ধর্ষণই বলা যায়। আর মোহনার চোখের কোল বেয়ে একটু বেঁকে যেয়ে ঝরেছিল চোখের জল,এলোমেলো খোলা চুলগুলো ফুলে-ফেঁপে বিদ্রোহ করেছিল এই বিপন্নতার বিরুদ্ধে, আর ভেতরে ভেতরে অপমানিত ছিন্নভিন্ন শরীরটি যেন মরে গিয়ে স্তব্ধ হয়ে ছিল অনেকক্ষণ। বিপন্নতার ঘোরের মধ্যে মনের অবচেতন থেকে সে টের পেল সর্ম্পকহীনতার নিরেট স্তব্ধতা।

৩.
বাস্তবে যেন কিছুই ঘটেনি এমনই ভেবে ভোরে চুপচাপ বিছানা ছেড়ে সংসারের সব কাজ শেষ করে সে তো অফিসেই যেতে চেয়েছিল। হয়তো অফিসে গেলে এসব মনেই পড়তো না! সময় তাকে ভুলিয়ে দিত গতরাতের নির্মমতা।এই যে তার ঘুমহীন দু-চোখে রাতের কালিময় উপাখ্যান থমকে আছে, একথা কার কাছে বলা যায়, সে নিজেকেই প্রশ্ন করে। হাঁটতে হাঁটতে সামনে একটা বড় বট গাছ দেখে হিন্দি সিনেমার একটা দৃশ্যের কথা মনে পড়ল মোহনার। সিনেমাটিতে নাসিরুদ্দিন শাহ ট্যাক্সিচালকের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন। গভীর হতাশায় বুকের ভেতর জমে থাকা কথাগুলো বের করে দেওয়ার জন্য সেই টেক্সিচালক নির্জন মাঠের একাকী গাছকে বেছে নিত। আর তাকে জড়িয়ে ধরে ভীষণ জোরে চিৎকার করে বের করতে চাইত সমস্ত ব্যর্থতা আর হতাশা। নির্জন মাঠে ছড়িয়ে পড়া সেই চিৎকারের সাথে সাথে তার হতাশাগুলো সান্ত্বনা পেত। কিন্তু সে তো চিৎকারও করতে পারছে না। ভেতর থেকে শুধু একটা ব্যর্থতার দীর্ঘশ্বাসই বের হয়ে এল এই কথা ভেবে।

ক্লান্ত শরীর-মন নিয়ে সে আরএকটু এগিয়ে গেল সামনের দিকে। রাস্তাটা বেশ নিরিবিলি। কাছেই ছোট একটা বিশ্রামঘর , তার ঠিক ডান পাশেই একটা তাবু টাঙানো। টহলদার পুলিশেরা এখানে ডিউটি শেষে বিশ্রাম করে। বিশ্রামঘরটির ঠিক পেছনেই বিশাল বিশাল ঝুরি বের হওয়া দৈত্যের মতো পুরানো বটগাছটির নিচে শ্যাওলাধরা সিমেন্টের বেঞ্চি। কিছু আলো পড়ে ঝিকমিক করছে লেকের জল। আর অনেক হলুদ পাতা ঝরে পড়ে স্রোতের টানে কেবলই ভাসছিল। মোহনা বসে পড়েছিল বেঞ্চির ঠিক সেই জায়গাটায়। যেন সে তার নিজের মুখোমুখি হয়ে ঠিক ঠিক বুঝে নিতে চেয়েছিল জীবনের অর্থহীনতার অদ্ভুত সংকেতগুলো। সভ্যতা, আধুনিকতা শুধু ঘৃণা ছাড়া আর কিছু কি দিতে পেরেছে? সবজায়গায় প্রেমের মৃত্যু। আধুনিকতার আস্তিনের তলায় লুকানো বাঘের নখ। আর এই সব কাঁটা বুকে নিয়েও হাসিমুখে বাঁচিয়ে রাখতে হয় সংসার ! সত্যিই তো! মেয়েটা না থাকলে তাকে আর ওই প্রেমহীন লাশকাটা ঘরে ফিরতে হতো না। একটা সিদ্ধান্ত সে নিতে পারত কোনো পিছুটান না রেখে। সে কীভাবে পারবে এই প্রেমহীনতার মধ্যে সংসারের ভারসাম্য বজায় রাখতে? নিশ্চুপ, নিঃশব্দ যে প্রেমকে সে অতি যত্নে লালন করেছে নিজের সত্তার ভেতর, তা যেন জীর্ণ হয়ে গেল অসভ্যতায় আর অস্বাভাবিকতায়। পারস্পরিক মিলনের মধ্যে যে স্নিগ্ধ নিবিড় সর্ম্পক গড়ে উঠতে পারত, তা হয়ে উঠল না। যা হতে পারত অবর্ণনীয় মানসিক শক্তির উদ্ভাস তা হলো না। এক প্রেতাত্মা এসে যেন সব নষ্ট করে গেল। যেন এক অ্যাম্ফিথিয়েটারের ভেতর সে এগিয়ে গিয়েছিল হৃদয়ের সবটুকু প্রেম নিয়ে, আর তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল হিংস্র সিংহ। এই ভয়ংকর বিপন্নতা আর বিষণ্ণতা নিয়ে সে কোথায় দাঁড়াবে? শাকিলের কাছে যা বিচিত্র বিনোদন, তার কাছে তা-ই চূড়ান্ত নিষ্ঠুরতা বলে মনে হচ্ছে। যেন প্রাচীন রোমান সাম্রাজ্যের গ্ল্যাডিয়টরদের রক্তাক্ত যুদ্ধ! হিংসা, উন্মত্ততা, আর নীরব কান্না।
দু-ফোটা জল ঝরে পড়ল মোহনার ক্লান্ত চোখ থেকে। হঠাৎ বাতাসে মুখের উপর এসে পড়া কয়েকটি এলোমেলো চুলকে সে টেনে দিল পিছন দিকে। বিশাল গাছটিকে সে দেখছিল একমনে। দেখছিল পাতার গায়ে ছড়িয়ে পড়া বাতাসের আন্দোলন। নিঃশব্দে যেন ছড়িয়ে পড়েছিল একটা ভালো লাগার সুর। হঠাৎ তার চোখ আটকে গেল গাছের কোটরে লুকিয়ে থাকা একটা পাখির বাসার দিকে। চমকে যেয়ে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগল বাসাটিকে। বেশি উঁচুতে নয়। বেঞ্চির উপর দাঁড়ালেই দেখা যাচ্ছে। কী চমৎকারভাবে বানানো! তিনটি ছোট্ট ছানা। সদ্য ডিম ফুটে বেরোনো। মা পাখিটা নেই। মাথাটা ঝুঁকিয়ে দেখছিল মোহনা। কোনো দূর থেকে যেন ভেসে এল একটা কন্ঠস্বর। চিকন লাঠি হাতে সামনে এগিয়ে এল পার্কের টহলদার একটি মেয়ে। নীল মোটা বেল্টের প্যান্ট পড়েছে সে। গায়ে স্ট্রাইপড সাদা শার্ট। মাথায় ও বুকে কালো কাপড় জড়ানো। মোহনার দিকে হেসে বলল. ‘এমনে কইরা দেইখ্যেন না। মা পঙ্খিডা কাছে ধারেই আচে। মানুষে দেখচে টের পাইলে বাসাডা সরাইয়া ফেলব।’
মোহনা অবাক হয়, ‘কেন?’
‘মাইনষের হাতে বিষ! মাইনষে টের পায় না। বেবাক জন্তু জানোয়ার, গাছপালা টের পায়। বহুতদিন ধইরা জঙ্গলে ডিউটি কইরা এই দেখতাছি । এই সব বোবা জস্তু জানোয়ার, গাছপালা সক্কলেই মানুষ দেইখ্যা ডরায়। পেপারে দেহেন না মাইনষে কেমনে সুযোগ পাইলে জন্তুর লাহান হইয়া ওডে ! ওই পইখের বাসাডা এহনি কোন চ্যংড়া পোলাপাইনে দেখবার পাইলে যহনতহন ভাইঙা ফালাইব।’

মোহনা আর কিছু বলে না। চুপচাপ ওই জায়গা থেকে সরে আসে। সে বুঝতে পারে মহিলাটি দীর্ঘদিন এখানে নিরিবিলি কাজ করতে এসে অনেক কিছু অনুভব করতে পারছে । তার চারপাশের পরিবেশের সাথে একটা সহমর্মিতার অনুভব। যে অনুভব কোলাহলময় পরিবেশে থাকলে তার মধ্যে হয়তো কোনদিনই তৈরি হতো না। মহিলাটিও আর কিছু না বলে তার নিজের পথে হাঁটতে থাকে। মোহনার হাতে আরও কিছুক্ষণ সময় আছে। মোবাইল ফোনে সে একবার সময়টা দেখে নিল। একবার ভাবল কাছের আত্মীয়দের সাথে একবার হাই-হ্যালো করবে। কিন্তু মনের মধ্যে বিষণ্ণতার ভার নিয়ে তার তাও করার ইচ্ছে হলো না। সে চাচ্ছিল নিজের কাছ থেকে একটা গভীর সিদ্ধান্ত। এটা সে বুঝে গিয়েছে শাকিলের সাথে ভালোবাসার বা বন্ধুত্বের কোনো সম্পর্ক আর নেই। যেখানে অপমানিত হতে হয় সেখানে কখনও ভালোবাসা থাকে না। আহা তার যদি ওই পাখিটার মতো একটা নিরালা বাসা থাকত। পাখিটাও তার ছোট্ট জীবনে জীবনের উত্তাপে ভরপুর। আর সে শিক্ষিত নারী হয়েও তাড়া খাওয়া জন্তুর মতো উদ্ভ্রান্ত, আশ্রয়হীন, অস্থির। না আছে সম্মান, না আছে প্রেম। সে শুধু মাংস মাত্র। তীব্র জৈব আকুতির ভোগ্যবন্তু।
ভেতরে ভেতরে মরুভুমির হু হু শূন্যতা নিয়ে মোহনা মেয়ের স্কুল গেটে যায়। গভীর স্নেহে মেয়েকে বুকের কাছে ধরে রেখে বাড়িতে ফিরে আসে। আহা , সারা পৃথিবীটাই যেন কন্যা শিশুর বধ্যভূমি। সে জানে তার সামনে অজানা অন্ধকার। বিস্তারিত অন্ধকারের পাশাপাশি দমবন্ধে আক্রান্ত হবার বোধ।

৪.
বিকেল ও সন্ধ্যাটা বিপন্নতার মধ্যে পার হয়ে রাত নয়টা বাজে। শাকিল আসে খুব হাসিখুশি ভাব নিয়ে। ওয়াশরুম থেকে ফিরে এসে বলে, ‘আজ বেশ ভালো খবর আছে। খবরটা সেলিব্রেট করার জন্য একজন কলিগকে নিয়ে বনানির একটা শপিংমলে গিয়েছিলাম। প্রয়োজনীয় টুকিটাকি কিনলাম। আমার মামনি কোথায়? ওর জন্য একটা টিশার্ট এনেছি। পরিয়ে দেখ তো, গায়ে লাগে কি না !’
ভালো খবরটা মোহনা জানতে চায়নি। সে শুধু রোবটের মত শাকিলের আদেশ পালন করছিল। মেয়েকে টি শার্টটি পরালো যত্ন করেই। বেশ সুন্দর আর ভালো কাপড়ের কালো টি শার্টটি। তাতে একটা লাল হার্ট চিহ্ন আঁকা, তাতে লেখা আছে ‘আই লাভ মি’। আই লাভ ইউ নয়! মি! মি! মানে আমি! নিজেকেই ভালোবাসব! এক মুহূর্তেই মোহনার নিজের ভেতরের যুদ্ধটা যেন থেমে গেল। মুহূর্তেই যেন থেমে গেল কলোসিয়ামের সমস্ত প্রদর্শনী। নিজের ভেতরে জেগে উঠল অন্য এক আমি।
অন্ধকারের পর্দাটা একটু দুলে উঠল মোহনার চোখের ওপর। সেই নির্দিষ্ট মুহূর্তে কোথাও জ্বলে উঠল আলো।
শাকিল তার সুখবর বলতে থাকল, ‘এক বছরের জন্য অফিস থেকে মালয়েশিয়ায় যাচ্ছি আমি, তোমরা এখানে ঠিকঠাক থেকো। ’
মোহনার চোখে একফোঁটা জল। কোথাও যেন এক নতুন মানচিত্র তৈরি হয়েছে তার জন্য, নতুন মানচিত্র, যেখানে সে মুক্তভাবে শ্বাস নিতে পারবে। সে আবার ‘আই লাভ মি’ লেখাটির দিকে তাকাল গভীরভাবে। জ্বলে উঠল একটা প্রতিরোধের রিফ্লেকশান নিজের ভেতরে।