কামশাস্ত্র

দেবাশিস মুখোপাধ্যায় ও অর্ণব বসু


দেবাশিস মুখোপাধ্যায়

কামশাস্ত্র ১

অন্ধকার নিয়ে খেলছে জোনাকি
মর্জিনা পানি ঢালতে দেহ
শিরশির করে ওঠে
কুয়োতলার সাপ জড়াতে চায়
তালাক দেওয়া একলা মেয়েমানুষ
কবরের জিন
আরব্য রজনী মাখে খুব
যে চারদিকে খুশবু আতরের
ঢেকে দেয় রক্তগন্ধ

রাত্রির নীড় এভাবে নষ্ট হয়ে গেলে
দিনের আলো কাগজে লেখে
কিছু হলুদ পালক
কিসসায় নীল

২.

এই তীব্র বর্ষার ভিতর
সিক্ত শাড়ির অঙ্ক
বুঝিয়ে দিচ্ছে চোখকে
ব্রাকেট পেরোলেই সরল
শূন্য পায় কিন্তু উপচে পড়ে
পূর্ণতার মান নাভি থেকে
নাভিতল দেশে
মুখিয়ে থাকে জিভ
সুস্বাদু উপত্যকার সৌন্দর্য
শুষে নিতে কলাকারের কলায়
রাত্রির এই পরতে পরতে
ভিজে যাওয়া
জ্বর নিয়ে আসে বিছানার
নাড়া লাগে অঙ্গে অঙ্গে
রাত্রি সুন্দরী হয়ে ওঠে
আরব গল্পে

৩.

কালো ব্রা সরে যেতেই সে আর সে মেঘ না
নতুন খদ্দেরের মতো চেয়ে আছি তো
আছি
স্তন ঝাঁপিয়ে বৃষ্টি নামলো
আর আমার শরীরের ঘাম ধুয়ে নিল
তার জিভ
গুহার কাছাকাছি যে পুকুর
সব জল চুপ করে আছে
আর উরুর মসৃণ রাস্তায় দৌড়তে
দৌড়তে
বেরিয়ে এসেছে জিভ
গুহার লবণাক্ত স্বাদ মাখামাখি হয়ে আছে
গভীরে ঢুকে গেলে জল
আর ফেরার রাস্তা নেই

একটা পরিস্কার আকাশের নীল হাসি
এখন প্রাপ্তির ঝুলিতে
চোখের বড়ো দোষ ছিলো

৪.

ক্রমশ মাকড়সা শরীরে দেখছি জালের বিস্তার
বিষাক্ত লালার টানে ক্ষুদ্র পোকাকুল
হজমের ভিতরে কিছুটা যম বা সবটাই
জমজমাট না
কেউ আসছে না রোদ নিয়ে এই
অন্ধকার কোণে
প্রস্তুতি অঙ্গে অঙ্গে রাখি
মৃত সেইসব সাদা রক্তের কীট
ঝুলে আছে এদিক ওদিক
ফেরার উপায় নেই ভেবে
সারা বাড়ি দখলে পর
হেসে উঠছে ভিতর দানব

৫.

চোখের অপেক্ষায় রয়ে গেছে ব্ৰা

বসে আছে নীল আলো করে ঘর


আঙুলের অসুখ ধান বেছে রাখতে

পারে না

পারলে দুধসাদা চালের ভাগ তার


জিজ্ঞাসা অস্থির খুঁজে আনে প্রশ্নের ঠোঁট

নরমে নরম বসে যায় বার বার


স্বপ্নের দেশের ভাঁজ খুলে গেলে

ডানা ও উড়ান সবই তার


বৃষ্টির রাত বেশ ঘোর ঘোর

শীৎকার , মিলন তারপর কান্না অঝোর

৬.

কৃষ্ণাস্তনে মুখ দিয়ে পাশ ফিরেছেন

ধর্মরাজ । জনন অঙ্গের সে যন্ত্রণা

চাপা । পাশা নয় অনেক আগেই হার । রমণী শরীরে তিনি স্থির যুদ্ধে । ধে

ধে করে নাচবার পর বৃহন্নলা হাত

বাড়ায় শিশুমাতার দিকে । কেশ

ছড়িয়ে রেখে মেঘ তার সমকামী

সঙ্গীকে আকর্ষণ করে । রেখা উঠে

আসে বিদ্যায় আর বিদ্যায় রেখা ।

খাদ্য মানেই ভেজাল নয় কিছুটা ভিজে কলমী তুলে আনা রুগ্ন মেয়েটি লজ্জায় ফেলে দেয় । দেয়ালের গায়ে লাল অক্ষরে চারু ।

রু কাঁপিয়ে চলে যাচ্ছে এমনই

দমকা হাওয়া

======================================================

অর্ণব বসু

সাইলেন্স

(১)

স্বপ্নের ভেতর খানিক অপেক্ষা করতেই একটা মানুষ এসে এঁকে দিয়ে গেলো তিনটে বিন্দু। হতে পারত একটা সরলরেখা অথবা একটা ত্রিভুজ। জ্যামিতির ব্যাপারে বরাবর কাঁচা অনির্বানদা মাঝখানের বিন্দুটাকে নিয়েই লোফালুফি শুরু করে দিল। কী শান্ত অথচ নিষ্কাম একটা বিন্দু, যার ভেতরে তাকালে দেখা যায় কোনো এক প্রাগৈতিহাসিক যুগের অন্ধকার।এক সন্ন্যাসীর ধ্যানদৃশ্য। ভেসে আসে ওম শব্দ,যেন শূণ্যতার দিকে ছুটে আসছে ত্রিকাল। হারিয়ে যাচ্ছে চশমা, গলার ভেতর এঁটোকাঁটা সমেত উঠে আসছে পাপ। সারা ঘর জুড়ে টাঙানো উলঙ্গ ছবি। ছবির দৃশ্যে কোনো আলোর জন্ম নেই। প্রেতের শরীর থেকে যেভাবে উঠে আসে ছাই, নির্লোভ অথচ মিশে যায় শ্মশানের ঘাটে, যেন কেউ এমাত্র পুড়িয়ে দিয়ে গেলো সংসার। সিঁথির মাঝখান দিয়ে যে চোরাস্রোত নেমে যায়, তা কোনোদিন ছুঁয়েও দেখেনি অনির্বানদা। এসব স্বপ্নের দিন নিজেকে মনে হয়,লালচে ইটের টুকরো। যে যেখানে ছুঁড়ে ফেলে দেবে সেখান থেকেই কুড়িয়ে নেবে অন্য কেউ। এ এক লোফালুফির জীবন, কেবল কোনো নদীর ভেতর ডুবে যাওয়া অবধি অপেক্ষা করা যায়।নরম মাটির ভেতরে আস্তে আস্তে নিজেকে সেঁধিয়ে নিতে নিতে মনে পড়ে যায় গতবারের সুইসাইড নোট। অথচ এ জন্মে সে মাটি বন্ধ্যা। তাতে ফলল না নতুন কোনো স্পর্ধা, দিগন্ত ঢেকে ফেলার মত পেলো না বিস্তার। গোটা শরীর জুড়ে কোনো তেষ্টা নেই, কেবল আঘাতে আঘাতে টুকরো হয়ে যায় সমস্ত হাড়গোড়। ঘরময় হা হা হি হি, মানুষেরা সেজে ওঠে নতুন পোষাকে।

(২)

বেলুন ফোলাতে ফোলাতে দম শেষ হয়ে আসে।ভেতরে ভরা বাতাস, ধার দিচ্ছে না কেউ। আজকাল কৃপণ হয়ে যাচ্ছে সবাই, কেবল বেলুন বিক্রেতা ছাড়া। সমস্ত দীর্ঘশ্বাস কিনে নিয়ে জড়ো হচ্ছে ঘরে ঘরে। ফাটিয়ে দিলেই মিশে যাবে বাতাসে, এও এক অনবদ্য চাতুরী, হাওয়া যে কীভাবে হাওয়া হয়ে যাচ্ছে, ধরতে পারছে না কেউ। এসব মনে হত, অনেক ছোটবেলায়,এখন আরেকটু ঝুঁকে পড়ি বুকের কাছে, ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে অচেনা প্রেমিকার নাম, যাকে কোনোদিন আঙুলের ডগায় রাখতেই পারা যায় নি। অথচ কীভাবে দুজন প্রেমিক-প্রেমিকা ঋণী হয়ে যাচ্ছে লোকটির কাছে! নিয়মমাফিক বিক্রি হয় না কিছুই। শ্বাসযন্ত্র দূর্বল হয়ে আসে, টলোমলো নেশায় হাঁটতে হাঁটতে ফিরে যায় বাতাসের কারিগর।

(৩)

পুজো শেষ। কমে আসছে আলো। চিরকালীন অন্ধকারময় গলিগুলো একে একে তাদের ভাই-বোন চিনে নেবে। রিক্সাওয়ালা মাতাল হয়ে পড়ে থাকবে। ড্রেন দিয়ে ভাসতে ভাসতে কোথাও আটকে যাবে কন্ডোম। ভীড় কমবে। হুট করে বেড়ে যাবে আত্মহত্যার সংখ্যা। পুজোর পর কেউ কেউ ঘুরতে চলে যাবে ডুয়ার্স অথবা মানালি। কেবল গুমটিতে পড়ে থাকা দুটো খারাপ বাস মনখারাপ করে একটা রামের পাঁইট নিয়ে বলে উঠবে "চিয়ার্স"।

৪)

অল্প একটু আগুন ধরাতেই জ্বলে উঠল বিড়িটা। নিভে যাওয়ার আগে শেষ টান। টানতে টানতে সুতোর খুব কাছে চলে আসে ঠোঁট। ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে বসে থাকা অনন্তকাল। এও এক আশ্চর্য জগত।প্রিয় কোনো মুখ নেই,প্রিয় কোনো রঙ নেই।সাদা হয়ে আসে কাপড়ের রঙ। শীতকাল বড় ভালো নয়। কখন যে কার শরীর কাঁপিয়ে চলে যাবে কেউ বলতে পারে না। ফিরে যাচ্ছে মানুষ। ফিরে যাচ্ছে অর্দ্ধেক চুমু খাওয়া জীবন। বাজারের ভীড় ভেঙে ডানদিকে এগোলে সেলাইয়ের দোকান।তাতে বড় বড় করে লেখা, “ এখানে শূণ্যতা জোড়া দেওয়া হয়।”