ইরা

সারাজাত সৌম ও মেহেদী ধ্রুব


সারাজাত সৌম

ইরা
*

দুটি ইঁদুর চিরদিনের মতোই ভালগার—
—ভালোলাগে, সে
—অমৃত অসুখ পায়ে পায়ে
হেঁটে এসে গান, ছুঁড়ে দিচ্ছে—
কাঁচা বাড়িটির কাছে

যেন তারা মাটি, সবচেয়ে বেশি কম্পমান—
আগুনে পুড়া দাঁত—
প্রেমের দাগে এসে মিশে, তারা আজও—
ভূতে লুকানো জামাটির ভেতর—চারু মেশিনগান

তবু ফুসফুসের কাছে কারা যেন পড়ে থাকে—
মসৃণ আরো আরো দুটি কালোজাম

তবে দেহটি কী পাতার মতো—
একা একা দুলে সারারাত—
ও হাওয়া, গাছের সমূলে এসে—
আমিও একটি চোরের অভ্যাসে গাইছি এখনো চিকন তারে গান

ওহ!—দূরে,
সকলেই ভালগার—
উড়ে যাচ্ছে একেকটি জামা ও মানুষের মতো থার্মোমিটার



শব্দ
*

তারা কি কি ধরে রাখে তোমার—
ঘরে-বাইরে, ইঞ্জিনে—
নাকি টনটন ব্যাথার পাশে পড়ে থাকে
—সবুজ ডিলেমা

যেন কালো, একটি নিবিড় শব্দের ভেতর কেউ
কিছু না বলেও চলে যেতে পারে দূর
—অজস্র স্ক্রুপ খুলে দিয়ে
—সমস্ত বাঘের শরীর

ডোরায় ফুটতে থাকা গভীর কোনো ফুল—
বৃষ্টি কিংবা কাদায়, সে কি চৈতন্য
—জলের ভেতর গাঢ় পদ্ম
—পাঁপড়ি খুলে বসে লোহায়

যারা লিখে রাখে সাপেদের স্মৃতি—
এই পঙ্কিল ভরা দিনে
—জানি, কোথাও কোনো রাগী মেয়েমানুষ
—কামড়ে দিলে আজ আর অসুখ হবে না



বাজে কবিতা

*

বাতাস কিভাবে তোমাকে কাঁপায়—
যদি না জানে পুরুষের চোখ আর মন
তবে তারা নিশ্চয় এতিম হতো
—তোমাকে রাখা হতো পাথর করে

যদি তুমিও না জানতে এই শরীর—
কিভাবে, কি কি প্রশ্রয় দিলে
শান্ত হয় একটি ঘোড়ার মাথা
—আর তার সমস্ত খাবারের আয়োজন

যেন আমাদের দেহ চির শয়তান—
অজস্র বাজে কবিতার মতোই
স্তনগুলো চেপে ধরে আছে রোদে
—অথচ বৃষ্টি একটি মিথ, সঙ্গম পেলেই বাজে




=============================================

মেহেদী ধ্রুব

রাজহাঁস ও ঘাই হরিণী


শঙ্খঝিনুকের আলোয় অনন্ত মাঠ ঘুমিয়ে গেলে অথবা তুমুল বৃষ্টি শুরু হলে ভালোবাসা রাজহাঁস হয়ে যায়, দম বন্ধ করে পড়ে থাকা পথে মুনি-ঋষিদের ছাপ পড়ে, ঝুলে থাকা মেঘ মাতালের মতো মায়াময় হয়ে ওঠে; আর কারিবের মতো কাব্যময় যুবকের নিঃসঙ্গতা পূর্ণতা পায়। সে নিজস্ব নিয়মে বিছানায় শুয়ে পুরনো কথা ভাবে; কল্পনার ক্যানভাসে ভাসে যমুনার জলে পারমিতার শাড়ি ভেসে যাবার স্মৃতি। হয়তো এই শাড়ি অথবা আঁচলের ছায়া হারানোর পথে কোনো হরিণীর চোখ পড়ে। কখনো মনে হয় কোনো এক শ্রাবণের রাতে ছাদে দাঁড়িয়ে থাকবে একটানা, কারো ঠোঁটে ঠোঁট রাখবে, কারো সাথে মিশে যাবে, মৃত্যুর মতো জলে ডুবে যাবে, অদৃশ্য হয়ে যাবে কল্পনার মতো।
এসব কথা কাকে বলা যাবে? বুঝতে সক্ষম কে বা কারা? শোনার মতো একজন মাত্র অবশিষ্ট আছে পৃথিবীতে, যাকে বলা যায় বৃষ্টির কথা, ঘাই হরিণীর নাভীর ঘ্রাণের কথা, রাজহাঁসের সাঁতার বিদ্যার কথা, যাকে পেলে গতি পায় কবিতার পর কবিতা। অথবা মনে হয় কোনো হৃদয় তার অনুভূতি ধরার ক্ষমতা রাখে না। হয়তো বৃষ্টি বুঝে না-বলা কথা, লুকানো অশ্রু। হয়তো এই কারণেই বৃষ্টির রাতে উতলা হয়েছে, অথবা সে উতলা হলে বৃষ্টি এসেছে। সে আক্রান্ত হচ্ছে, সন্ধ্যা থেকে, রাত থেকে, শেষ পর্যন্ত শেষ বিন্দুতে। মনোযোগ অন্য দিকে নিতে অন্যপথে যাওয়া ছাড়া উপায় নেই। এই সময়টা ফেইসবুকে যাওয়া যায়। এতো রাতে অর্পনা জেগে আছে, সাথে সাথে তার মেসেজ :
- কারিব
- হুম
- জেগে আছো যে, চোখে ঘুম নেই?
- আমার চোখে রাজহাঁস সাঁতার কাটবে, ঘুমিয়ে গেলে ওরা আসবে কেমন করে?
- আমি দেখতে চাই, আমাকে দেখতে দিবে, ওরা কেমন করে সাঁতার কাটে !
- ওরা আসছে কিছুক্ষণের মধ্যে, তুমি দেখতে চাইলে আসতে পারো, দেরি করো না
- আমার খুব ইচ্ছে করছে, আমি যদি ওদের একটাকে মেরে ফেলি কী করবে তখন?
- সে তুমি পারবে না, আমি হাজার বার মৃত্যুর স্বাদ নিয়ে ওদের অমর করেছি
কারিব ও অর্পনার কাব্য থামে না। এই কাব্য ঘর থেকে বাহিরে, বাহির থেকে গ্রহ নক্ষত্র পর্যন্ত পৌঁছে। এক সময় তারা আরো কিছু চায়। এই চাওয়া রাঁজহাস বুঝে, ঘাই হরিণী বুঝে, আকাশ বুঝে, শ্রাবণ বুঝে, বৃষ্টি বুঝে। এ এমন এক রাত, যে রাতে কেউ কেউ কোনো নীতির তোয়াক্কা না করে হত্যা করতে পারে রাজহাঁস অথবা ঘাই হরিণীর চোখে চোখ রেখে মৃত্যু কোলে ঢলে পড়ে। তবুও অর্পনা অথবা কারিব নিজের সাথে বোঝাপড়া করে, নীতির সাথে বোঝাপড়া করে মেসেজ থেকে ফোনকলে যায়। অর্পনা বলে যায়, ‘কারিব, তোমাকে আগেও বলেছি, আমার খুব ইচ্ছে করে কেউ আমাকে হত্যা করুক, এই তুমি হাসবে না, কেউ মানে কেউ, তুমি বুঝো? জানো, মাঝে মাঝে অর্ণবকে বেশ মিস করি, কারিব জানো? অর্ণবকে কেন বিয়ে করেছি?’ কারিব শুনে যায়, ‘ও খুব ভালো, কখনো কোনো দিন কোনো কিছু চাপিয়ে দেয়নি আমার ওপর, ও হয়তো সুদর্শন না, কালো, খাটো, কিন্তু ও কতো উদার, আকাশের মতো বড়ো ওর মন।’
এসব শব্দ, বাক্য অথবা কথা ও নীতির নৃত্যের সাথে অথবা রাজহাঁসের সাথে অথবা ঘাই হরিণীর সাথে কতো বৃষ্টির ফোঁটা মিশে যায়। কোনো কোনো ফোঁটা কষ্টের কণার মতো, কোনো কোনো ফোঁটা রক্তের মতো, কোনো কোনো ফোঁটা গন্ধের মতো। কষ্ট, রক্ত, গন্ধ। তারা কতোটুকু পায়? তারা ভুলে যায় অথবা ভুলে যেতে বাধ্য হয় অথবা বাধ্য করে। বন্ধুত্বের নতুন মানে দাঁড়িয়ে যায়, চেতনার পথ ভিজে যায়, বৃষ্টির ফোঁটার অত্যাচারে ভেসে যায় কেউ কেউ। রাজহাঁস ও ঘাই হরিণী লুটোপুটি খায়।
তারা কর্মক্ষেত্রে পাশাপাশি, বসবাসে কাছাকাছি। কাজের চাপে নুয়ে পড়লে অথবা কখনো হারিয়ে গেলে নির্জন চরে অথবা কোনো উন্মুক্ত মঞ্চে মৃত্যুর মুহূর্তে এক ফোঁটা জল ঢেলে দেয়ার মতো সম্পর্ক। কতো কতো রাতে কতো সন্ধ্যায় কতো কবিতা আর গান, কতো মধুরতা, কতো বন্ধুত্ব !
এতো এতো স্ক্রিনশট মিছিলে, এতো এতো রেকর্ডের মহড়ায় তারা আস্থা রাখে যন্ত্রে। বয়সের ব্যাপারটাও কখনো শব্দ বা কবিতা বা গদ্যে লিখিত হয় না, বরং তা জীবনের ছেঁড়াখোড়া পৃষ্ঠায় ম্রিয়মাণ সংখ্যা মাত্র।

দুই.
শ্রাবণের ধারা থামে। আলোর নহর বয়। কারিব ততোক্ষণে বাসায় ফেরে। কিন্তু অর্পনার যন্ত্রণা বেড়ে যায়। নিশ্চুপ পায়ে আয়নার সামনে, বিশেষ স্থান বিশেষভাবে পরীক্ষা করে। কারিব যে এতোটা বেপরোয়া হতে পারে, এতোটা বেসামাল হতে পারে দেখে বোঝা যায় না। কিন্তু এতো আনন্দ এতো সুখ এতো এতো তৃপ্তি কে দিয়েছে কবে? কিছু পুরুষ আছে, যাদের দেখে গৌতম বুদ্ধের মতো মনে হয়, কিন্তু এরা খেলার মাঠে বা বক্তৃতার মঞ্চে অথবা প্রেমে মজে গেলে থামানো যায় না, সবকিছু ভেঙেচুড়ে তছনছ করে দিয়ে সিংহাসনে ওঠে। কারিব এই শ্রেণির পুরুষ। কিন্তু ও আরেকটু সাবধান হলে তাকে টেনশন করতে হতো না। এই যে এখনো ব্যথায় টনটন করছে, তার চেয়ে বড়ো ভয় কখন অর্ণব চলে আসে !
সকাল হয়ে গেলেও ঘুমাতে পারে না অর্পনা। বুকের কোনো এক পাশে ডুবোচর ভাসে, কোনো কোনো পার ভাঙে। কোন পার? ভয়, শঙ্কা বা দ্বিধার মতো কিছু, স্বপ্নের মতো কিছু। কতো দিন একা একা আছে, কতো কথা হলো, কিন্তু এসব কেমন স্বপ্নের মতো, অথবা এই রাত যেন এক দুঃস্বপ্ন। কিন্তু আয়না কথা বলে, ‘না, সব সত্য, সব সত্য।’
সাপ্তাহিক ছুটির দিন বলে অফিসে যেতে হবে না। অর্ণব নেই, ইচ্ছে করলে সারা দিন ঘুমোতে পারবে, ইচ্ছে করলে কারিবকেও ডেকে আনা যাবে। না, কারিবকে আনা যাবে না, এই দ্বিধা বা শঙ্কা বা ভয় নিয়ে সম্ভব না। আগুনের ঢেউ নেভাতে অন্য সব খানে আগুন পোহানো যাবে না। সে পণ করে, কারিবের গ্রাস থেকে বেরোতে হবে, বাসা বদলাতে হবে, প্রয়োজনে অফিস বদলাতে হবে, এই জাদুকর কারিবকে ব্লক করে দিতে হবে।
এসব ভাবনা বা সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করার পরেও আরাম বোধ হয় না। কারিবের মতো ছেলেকে ছেড়ে দেয়ার মতো মানসিক শক্তি আছে কি? কী অসাধারণ ছেলে, কী ভঙ্গি, কী প্রকাশ, কোনো সংকোচ নেই, বুক ফেঁড়ে দিয়ে দেয় সব। কিন্তু অর্ণব? পাঁচ ফুট চার ইঞ্চির অর্ণব, ওকে কী বলা যায়? ও ভীতু চড়াই পাখি একটা, একটুতেই সব শেষ। আর কারিব শিকারী বাঘের মতো ঘায়েল করে আনমনে বসে থাকে। আবারো এলোমেলো হতে থাকে অর্পনা, তার খোলা চুল আর উন্মুক্ত বুকে আলোর ঝিলিক পড়ে। হঠাৎ কলিং বেল বেজে ওঠে। কে আসবে এতো সকালে, পেপারওয়াল বা কাজের বুয়া আসবে আরো পরে। কলিং বেল বেজে চলে, রাজ্যের বিরক্তি নিয়ে দরজার দিকে পা চলে। কিন্তু দরজা খোলার সাথে সাথে আঁতকে ওঠে সে। কেন আঁতকে ওঠে? অর্ণব দমকা হাওয়ার মতো প্রবেশ করে। তার চোখে মুখে ঠোঁটে বিজয়ের হাসি, দুষ্টুমির ভঙ্গি, সে চোখের পলকে বউকে কোলে তুলে গভীর চুম্বনে চুম্বনে মাত করে দিতে চায়। এক মাস না পাওয়ার ব্যাকুলতা তার সর্বাঙ্গে।
বউকে মাত করার মধ্যে অথবা মাতলামির মধ্যে জাদুর মতো কিছু আছে, আর তা যদি হয় প্রণয়-চমক অর্থাৎ হঠাৎ আগমন, ঝড়ো বৃষ্টির মতো, কোনো সংকেত না দিয়ে, না জানিয়ে, তবে তা হয় সুখের আগুনে পোড়ে যাবার মতো ব্যাপার। কিন্তু বউ সুখের আগুনে পোড়ে না, তার চোখে মুখে উৎকণ্ঠা, মেঘের মতো, যেন মুখোশের ভেতর মুখ অথবা মুখের ভেতর মুখোশ।
অর্ণবের দেহ বলে হাজার বছর পরে কাছে পেয়েছে বউকে। এক্ষণি বুঝি প্রেমে কামে ঘামে ডুবে যেতে চায়; কিন্তু বউ জার্নির ধকল ও ফ্রেশ হবার কথা বলে সময় নিতে চায়। নাকি অভিমান করেছে বউ? এই এক মাস যোগাযোগে ভাটা পড়েছে। বিদেশে কতো কতো ব্যস্ততা, কতো মিটিং, কতো প্রেজেনটেশন, কতো কী ! অর্ণব চিন্তা করে অনেক, ঝড়ের পরে বাস্তুহারা মানুষ যেভাবে চিন্তা করে, বিদেশি ত্রাণ শেষ হয়ে গেলে পলি নিয়ে পড়ে থাকার মতো।
অর্ণব কিছু একটা চায়, বুকে কহর পড়ার মতো কিছু। এই যে এতো দিন পরে দেখা, এতো সুন্দর সময়, এতো সুন্দর বউ, এতো ভালো চাকরি, খ্যাতি, ক্ষমতা, স্ট্যাটাস, সব কিছু মিলিয়ে ছবির মতো, সাজানো গোছানো। অথবা অন্য কোনো চিন্তার সমুদ্রে চলে ডুব সাঁতার।
অর্ণব আবারো বেপরোয়ার ভাব দেখায়, চোখে মুখে সংক্রান্তির ধোঁয়া উড়ায়। কিন্তু অর্পনা কেঁপে ওঠে, মুহূর্তে মুহূর্তে কেঁপে ওঠে। তার দেহের পরতে পরতে নৃত্য করে ঝরনার মতো চঞ্চল ঘামের বিন্দু, বুকের ভেতরে জুয়ো খেলার আসর বসে। ইচ্ছে করে বাতাসের সাথে মিলিয়ে যেতে অথবা ঘুণ পোকার হয়ে যেতে অথবা বৃষ্টির ফোঁটা হয়ে যেতে অথবা বজ্রপাতের মতো অদৃশ্য হয়ে যেতে। জীবনের কতো স্তরে কতো কী ঘটে, মানুষ মেনে নেয়, সেও হয়তো মেনে নিতো, মানিয়ে নিতো। হৃদয়ের ক্ষত লুকিয়ে রাখা যায়, কিন্তু শরীরের ক্ষত, তাও বিশেষ কোনো স্থানে বিশেষ কোনো ক্ষত। পিরিয়ডের কথা বলে বাঁচা যাবে কি? যাবে না হয়তো, একসাথে থাকলে বুঝে ফেলবে। নাকি মা অথবা বাবার অসুখের কথা বলে বের হয়ে যাবে বাসা থেকে, দুই দিন পরে ক্ষতটা শুকিয়ে যাবে, ডাক্তারের কাছে গেলে হয়তো দ্রুত সেরে যাবে। না, এই কাজ করা যাবে না, তাতে কাজ হবে না, অর্ণব যদি সাথে যেতে চায়। কতো কতো চিন্তা আসে, কতো ফন্দি আসে, কিন্তু উদ্ধার পাবার মতো উপায় আসে না।
অর্পনা আরো ঘেমে যাচ্ছে। এ যন্ত্রণা নিতে চায় কে? সে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারিনি কেন? ফেইসবুকে কারিবের কবিতা উপেক্ষা করার মতো মনোবল ছিলো না কেন? নাকি প্রায় ছয় ফুট লম্বা দেহের সাথে অর্ণবের পাঁচ ফিট চার ইঞ্চি দেহের পার্থক্য আঁকা আছে কোথাও? কাকে দোষ দিবে সে, কারিব নাকি তাকে? নাকি এই উচ্ছৃঙ্খল শ্রাবণ ধারাকে? কাকে? মানুষ কখনো নিজের কাছে অসহায় হয়ে পড়ে অথবা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। এই সময় সে সব করতে পারে, খুন খারাবি, চুরি ডাকাতি, আরো যতো কিছু আছে। ভাগ্যও অনুকূলে নয়, তা না-হলে না-জানিয়ে অর্ণব চলে আসবে কেন, অথবা গতকাল কারিব এতোটা ক্ষ্যাপাটে হয়ে যাবে কেন ! অর্ণব চলে না আসলে অথবা কারিব সাড়া না দিলে অথবা সে সাড়া না দিলে অথবা এতো বেপরোয়া না হলে অথবা শ্রাবণ উতলা না হলে অথবা রাজহাঁসকে সাঁতার কাটতে না দিলে অথবা ঘাই হরিণী ছুটে পালালে কেমন হতো !
অর্ণব বুঝি আরো উচ্ছ্বল হচ্ছে, আরো উন্মত্ত হচ্ছে, আরো বেশি প্রস্তুতি নিচ্ছে। ওকে বলার মতো কিছুই নেই, ও যেমন পুরুষ, যেমন গোয়ার, যেমন চালাক, এক নিমিষে সব বুঝে ফেলবে, এক পলকে দেখে ফেলবে তার বাম স্তনে জোঁকের মতো দাঁত কামড়ে পড়ে আছে এক কামড়।
অর্ণব নিষ্প্রাণ হয়ে পড়ে থাকে, মৃতপ্রায় ঝরনার মতো, দেহে ক্লান্তির নদী, চোখে ঘুমের নৌকা। তবু সে বউকে দেখে চঞ্চল হয়ে ওঠার মতো কিছু করে, কামনার জন্য ব্যাকুলতা দেখায়। এই সময় পাশের ঘর থেকে উদ্ভ্রান্তের মতো কে আসে? অর্পনা? সে হাউমাউ করে কান্না করে বলতে থাকে :
- অর্ণব, শুনছো, মা ফোন করছে, নানু আইসিইউ-এ, এক্ষুণি যেতে হবে
- কী সর্বনাশ ! কখন? কীভাবে হলো?
- এতো কিছু জানি না, মা কান্না করছে, অবস্থা খুবই খারাপ
- আচ্ছা, দাঁড়াও, আমি একটু রেডি হয়ে নিই
- আরে না, তুমি থাকো, কতো কষ্ট করছো, এতো লম্বা জার্নি করছো, তুমি থাকো
- সমস্যা হবে না সোনা, তুমি একা যাবে কীভাবে? আমি পারবো, আমার ছুটি আছে তো
- কিচ্ছু হবে না, আমি একাই যেতে পারবো, তুমি বরং রেস্ট নাও, তোমার শরীর খারাপ করবে
- আমার খুব যেতে ইচ্ছে করছে জান, তোমাকে একা ছাড়তে ভয় হচ্ছে
- সোনা বাবু, চিন্তা করো না, খারাপ কিছু হলে তো তোমাকে যেতে হবে, কয়েক দিনের ছুটি পাইছো, প্লিজ তুমি থাকো, বুয়াকে সব বলে দিবো ফোন করে, কোনো অসুবিধা হবে না।
এভাবে কিছুক্ষণ কথা চলে। অর্ণব শক্ত করে জড়িয়ে ধরে, সাহস দেয়, কপালে চুমো খায়, কাপচোপড় গোছগাছ করে টেক্সিতে উঠিয়ে দেয়।
অর্পনা চলে গেলে অর্ণব দুর্বল পায়ে বাসায় ফেরে। জানালার কোনো এক ফাঁক দিয়ে এক চিলতে আলো চোখে পড়ে, এই আলোতে কিছু একটা আছে, এতো বেশি প্রখর যেন চোখ গলে যাবে, যেন হত্যা করবে তাকে। হাত দিয়ে আটকানোর চেষ্টা করে, কিন্তু আঙ্গুলের ফাঁক দিয়ে চোখের মণিতে ঢুকে পড়ে। সে দ্রুত পায়ে বেড রুমে ঢুকে, কেমন অচেনা, উৎকট গন্ধে বমি চাপে, নাকি তার মনে কোনো এক বিক্ষিপ্ত চিন্তা ভোজবাজি খেলে? তবুও কোথাও সিক্ত কোথাও রিক্ত বিছানার কোঁকড়ানো চাদরের উপর শুয়ে পড়ে।
চোখে ঘুম আসার আগে কতো কথা মনে পড়ে, একটা দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে আসে। কিন্তু দ্রুততার সাথে সামলে নিয়ে হাসে, কিছু হাসি মৃত্যুর সময় হাসা যায়, কিছু হাসি নিজেকে বিক্রি করে হাসা যায়, কিছু হাসি সুখ কিনে হাসা যায়। সে কোন্ হাসি হাসে? কোন্ হাসি? তার মতো কালো খাটো পুরুষকে বাঁ পায়ের সাথে বেঁধে রাখতে পারে কে? কে যেন বারবার আকারে ইঙ্গিতে বলে যায়? কে যেন? অর্পনা? নাকি কোনো জাদুপুরীর ঘাই হরিণী? নাকি ছাত্রজীবনের সেই মেয়েটি, যে তাকে ছেঁড়া জুতো সেলাই করে দিতে বলেছিল? নাকি এসব তার সাথেই ঘটে আজন্ম অথবা আরো আরো জীবনে? কালো বা খাটো বা অর্থহীন চামার? অথচ তার একটা স্বপ্ন ছিলো, কে পেরেছে বুঝতে? মেয়েটি, অর্পনা, কোনো ঘাই হরিণী?
অর্ণব জ্বলে ওঠে। এতো ভাবার কিছু নেই, এতো পীড়নের কিছু নেই। এই যে তাকে ছুঁতে পারছে না কিছু, একটুও না। বরং বুক ফুলে যাচ্ছে, আরেকটু ভাবলে হয়তো হৃদয় মাঠে খেলা করবে হাজার হাজার শত্রুকে হত্যার পরে বিজয় নিশান উড়ানোর আনন্দ। কারণ, সে জানে, পাকা কাঁঠালের মতো রসালো পিএসের সাথে এক মাসের ফরেন ট্যুর শেষে শরীর পরিশুদ্ধ করতে ও পূর্ণ শক্তি ফিরে পেতে বিশুদ্ধ ঘুমের বিকল্প নেই।