চন্দ্রমল্লিকাকে আবেদন

শতানীক রায় ও জয়দীপ চট্টোপাধ্যায়




চন্দ্রমল্লিকাকে আবেদন

ছয় আঁধার!!
চলাকে ছলকে দিলাম সদানন্দ তীরে
এখানে কোথাও কি তরল আছে!
সূর্যাস্তের বহু পরে অতীতের রেশম নদী
না, গায়ে লাগা সূর্য??
প্রশ্নচেতন হয়ে থাকা বালি চুঁইয়ে পড়ছ তুমি, অকালে।
এখন তবে কী মৃত্যু পেলাম আমি?--
ধবধবে শান্ত চোখে মনের মরুতে
মরমিয়া শরীর
সহজিয়া শরীর।
#
#
সুস্থ এক চন্দ্রমল্লিকাকে আজ তবে বলি,
বসো চরমপন্থায় কারণশক্তি হয়ে।

বকুল কথা
পাতালে চলো
ওখানে চূড়ান্ত রূপান্তর!!
ভাবনাবৃত্তে আমরা সবাই শব্দ বেঁধে রেখে ফুল তুলতে এসেছি।ওখানেই ঘটে গেছে এক মহাবিপর্যয়! কাকে ডাকব?? কার ঘারে চাপাব একান্নভুক্ত আমাদের নাম! কালো হয়ে আসছে মুখগুলো সব। শেকড়ের গন্ধ, মদের গন্ধ এক হয়েছে সব। চূড়ান্ত ফসল তাই বপন করা হয়নি আজ...এমন কথার মাঝে চলে এলো একটি বকুল; একে ফুল বলব না লাশ?

চাঁপা ফুলের ক্ষত

আমাকে পোড়াও নয়তো কবরে রাখো।
আগুনের তাপ চাইছি
কোথায় যাব??
তৃণ থেকে একাধিক মহাবিশ্ব
পাংশু ইতিহাস!!
কোনো বিভাজন নেই
শব্দবন্ধ নেই এমন এক কালে
মাঝরাতে কাক ডাকে...

তৎক্ষণাৎ নেমে পড়ো তুমি
ভয় হয় এই বুঝি পঞ্চানন হবে তুমি
আর এসে বসবে এই ভূতলে।
ওঠো অর্জুন, তীর হানো শিবিরে
ছিন্ন হোক শরীর
যে শরীর আর শরীর নেই
যে চোখ আর চোখ নেই!!
চাঁপা ফুলের ক্ষত রেখে তোমরা কে আজ এখানে এলে?
নাই যদি দাও উত্তর তাহলে এসো
রক্ত ভাগ করে নিই
সবার রক্ত এখানে সেখানে
মননের একটি যোনি নির্মাণ করুক।
এমন একটি চিতার উপর বসে আজ
আমি কি শবসাধনায় বসতে পারি?

------------------------------------------------------------ ------------------------------------------------------------ ---------------------------------------------------------
------------------------------------------------------------ ------------------------------------------------------------ ---------------------------------------------------------

জয়দীপ চট্টোপাধ্যায়

শুধু কম্পন জানে আর কম্পাঙ্করা জানে


মজা নদীতে জল আসত বড় নদী থেকে। সেই যে বড় নদী, যে আটপৌড়ে শাড়ীর আঁচলের মতো এলিয়ে থাকে দুটো গ্রামের মাঝখানে। আর বর্ষাকালে দুধেল গাইয়ের মতো ফেনা ভরা সাদা দুধ বিলিয়ে দেয় অনেক দূর অবধি। তারই বুকের দুধ পেয়ে পুষ্ট হয়ে মজা নদী। শাঁখা পরা শাখা নদী। সখী নদী। এতই ক্ষীণ স্রোত... আছে না নেই, তা-ই অনেক সময় বোঝা যেত না অন্য মাসগুলোতে। কিন্তু জল এলে রূপেও বান আসত তার।
চোরা স্রোত আসে। শালুক-শাপলারা ভেসে যায়। হাঁটু জলেও গোরুগুলো পার হ'তে চায় না। আষাঢ়ের শেষে হঠাৎ একদিন দেখা যায়-- ডিঙিনৌকো ভাসছে। ভাসছে পেট মোটা নৌকো, বোঝাই কাঠ নিয়ে। দাহ করার কাঠ। ওপার থেকে এপারে শ্মশানে কাঠ আসে। মজা নদীর তীরে শ্মশানে দাহ হয় সেই কাঠে। ভাবো কেমন ভীষণ অ-কবিতা। মজা নদীর রূপ দেখতে দেখতে সেই নৌকো ভেসে আসতে দেখলেই, মনে পড়ে যায় 'সোনার তরী'। "ঠাঁই নাই, ঠাঁই নাই-- ছোটো সে তরী / আমারি সোনার ধানে গিয়েছে ভরি।" কোথায় সোনার ধান! কাপড় দিয়ে ঢাকা শুকনো কাঠ। আগুন দিলে চড়চড় করে জ্বলে উঠবে। ছাই হয়ে যাবে এই মজা নদীর ধারে। ভাবো কী ভীষণ কবিতা-- একাধিক মৃতদেহর টুকরো টুকরো অবশেষ জড়ো করে আনা হ'ল ওপার থেকে এপারে। আর এক মৃতদেহর সঙ্গে জ্বালিয়ে দেওয়া হবে বলে।
এই সেই সোনার তরী..., পেট মোটা নৌকো... মড়া পোড়ানো কাঠ নিয়ে আসে।

ঠুন করে একটা শব্দ করেই কাত হয়ে পড়ে গেল চ্যাপটা কাঁচের বোতলটা। একদম তলায় পড়ে থাকা কিছুটা বাংলা আর থুতু বোতলের ভেতরেই মৃদু দুলতে দুলতে থেমে গেল। শান্ত তরঙ্গ, ভাসমান আর কিচ্ছু নেই। এই দামী মদের চ্যাপটা বোতলগুলোর দু'টো সুবিধে আছে--পড়লেই গড়িয়ে যায় না। আর বোতল দামী হ'লে ভেতরে কী আছে, তা হালকা করে ধাপ্পা দেওয়া যায়। অবশ্য তার জন্য বোতলটাও খুব যত্নে রাখতে হয়। লেবেলটা চকচকে থাকতে হবে। যতটা নতুন রাখা যায়। এই যে অবশেষ, অবশিষ্ট... বোতলের মুখ খোলা থাকলেও তারা বাইরে আসে না। চলকে আসতে চায়, কিছুটা পারে... চাতাল শুষে নেয় তাদের। এই চ্যাপটা বোতল, এই লালা মিশ্রিত মাদকীয় অবশেষ, এই মাতাল ধাপগুলো... এরা ভীষণভাবে ধ্রুবক। শুধু স্থান আর সময় পালটে পালটে যায়। গভীর রাত... চিনচিন করে ট্রানজিস্টারটা এখনও বেজে চলেছে...বেহুঁশ হওয়ার আগে বন্ধ করা হয়নি। এমন ফুরফুরে হাওয়ায় কি আরামে ঘুমিয়ে পড়া যায়! চার দেওয়ালের মধ্যে এমন আরাম কোনও সিলিং ফ্যান কিংবা আলিঙ্গন দিতে পারেনি। কিংবা, হয়তো নিতেও পারেনি বেহুঁশ মানুষটা। চেয়েছে কী?
পুকুর ঘাটের ওপরে রাস্তার ধারে দাঁড় করানো আছে নীল ছাউনির রিকশাটা। ছাউনিটা তোলাই আছে। একটা গেরুয়া কুকুর লাফিয়ে উঠে শুয়ে পড়েছে সিটের পায়ের কাছে। বৃষ্টি এলে ভিজবে না। কেউ না তাড়ানো অবধি এমন প্রাপ্তির ওপর অধিকার... প্রাণীকুলে সকলের থাকা উচিৎ।
সূর্যের আলো ফোটার আগেই পাখিরা ডাকে, তারও আগে হঠাৎ ডেকে ওঠে পাড়ার কুকুরগুলো... বেপাড়ার কাউকে দেখলে। এই বেহুঁশ মানুষটা, অথবা ওই কুকুরটা... বাজী ধরে বলতে পারি, কারও কপালেই এই সুখ বেশিক্ষণ টিকবে না।

--- --- ---

- একশো টাকা নিয়েচি তো কী হয়েচে! চোর নাকি বাঁআ!
- টেনে এক একটা থাবড়া লাগাবো খানকিচ্ছেলে... মালের টাকাটা দেওয়া হয়েছিল সবার জন্য বুঝে আনতে। মেরে দেওয়ার জন্য নয়।
- খিস্তি কচ্চ কেন! খিস্তি আমিও কত্তে পারি। মাল আনিনি আমি? কী রে... চুপ করে আছিস কেন? বল? আনিনি মাল?
- মাল আনার কথা হচ্ছে না। বাকিটা গেল কোথায়?
- এ... যাও তো ওয়াড়া... বেশি হ্যাজাচ্চে। মাল খেয়ে নিইচি। এখন নেই টাকা... যাও।
- অ্যাই খানকিচ্ছেলে অ্যাই... পুরো ঢুকিয়ে ছেড়ে দেবো পেছোনে... চিনিস না আমাকে। সবার সামনে দাঁড়িয়ে বলছি...
- যা বাঁআ... অনেক দেখা আছে...
- ধোর ল্যাওড়া... চল তো সালা! আজ এখানেই মেরেমুরে দিয়ে চলে যাব। স্ট্যাণ্ডের কেউ বাঁচাতে আসবে না ওয়াড়া।
- মারো না... মারো। গায়ে হাত তুলেই দ্যাখো না!
একজনের এগিয়ে আসা হাত দু'জনকে ঠেলে দূরে সরিয়ে দিল। বলা ভালো, যে সত্যিই মারতে পারতো তাকেই প্রশমিত করে একটু দূরে ঠেলে দিল। রিকশাকেই ঢাল বানিয়ে ওপারে দাঁড়িয়ে আস্ফালন করে যাচ্ছে অন্য মানুষটা। তার চোখ দু’টো এরকম লালই থাকে। যেন শিরা ফেটে গেছে চোখের। আক্রমণের আড়ালে অসহায় ভাব, ঢোক গেলা। চোখ মিথ্যে বলে না। এই রিকশাটা মাঝে না থাকলে এতক্ষণে দু'ঘা পড়েও যেতে পারত। কেমন যেন আশ্রয়ের মতো বাঁচিয়ে দিল মানুষটাকে। সেই মধ্যস্থতা করা লোকটা ফিনফিনে কালো ফুলশার্টের হাতা গুটিয়ে মারমুখী লোকটাকে ঠেলতে ঠেলতে দূরে সরিয়ে নিয়ে গেল। তারপর বুঝিয়ে দিল-- পরের দিন সকালেই ফেরত পেয়ে যাবে, সামান্য ক'টা টাকার জন্য হাতাহাতি করে লাভ আছে?
এইগুলো যে বা যারা পথে চলতে চলতে, বা কোনও দোকানে জিনিস কিনতে এসে হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ে দেখছিল; তারা কিছুক্ষণ পরে ওই রিকশার পাশ দিয়ে গেলে শুনতে পেতো সেই কালো ফুলশার্ট পরা লোকটা বলছে-- সব জায়গায় মাথা গরম করলে চলে না। এদের সঙ্গে বাওয়াল নিচ্ছিস... তাও সালা মাল খাবি বলে! কী রে তুই? ধার করে করে তো এমন হয়েছে যে তোর মুখ দেখে কেউ ওয়াড়া আর এক পয়সাও ঠেকাবে না। এখন টাকায় ঘাপলা করছিস, তাও এদের? ক্যাল-ফ্যাল খেয়ে কোথায় পড়ে থাকবি জানিস! এই তো বালের চেহারা...
যাকে বলছিল, সে রাস্তার এদিক ওদিক সব কিছু দেখে গেল তার রক্তজবার মতো চোখ নিয়ে, শুধু বক্তার দিকে তাকাল না। হয়তো সেই লোকটাকেই এখনও খুঁজছে চোখ দুটো, কোনদিকে গেল। রিকশার হাতলে দু'টা হাত রেখে সামনে ঝুঁকে 'হ্যাঁ বাঁআ... দেখা যাবে বাঁআ...' বলতে বলতে রেডিওটা চালিয়ে দিল ফুল ভলিউমে - "দিওয়ানা লেখে আয়া হ্যায়... দিল কা তড়ানা।"

--- --- ---

রিকশার হ্যান্ডেলে একটা আয়না আচে, আর একটা রেডিও। দুটোই হেভি পচোন্দের জিনিস মাইরি। আর রিকশার সীটের নিচে জামা-প্যান্ট, থালা-গেলাস, দেশলাই, বিড়ি, জলের বোতল, মালের বোতল... সব। টোটাল ব্যবস্থা। যে মালগুলো বলে আমি নেশাভাঙ করে সারাদিন পড়ে থাকি... সব ক'টা পয়লা নম্বরের হারামি। নেশাভাঙ করতে টাকা লাগে না? অত টাকা কোথায়? আর পাতা খাওয়া প্রায় ছেড়েই দিইচি। তবে হ্যাঁ, হাতে টাকা থাকলে জমিয়ে মাল টানি। একেবারে টোটাল। খাব তো ওয়াড়া এমন খাব যে দিনরাতের হুঁশ থাকবে না। নাহ'লে খেয়ে কোনও মজা আচে? ওই গেরস্থ বাড়ির লোকজনদের মতো মেপে ঠাপ দিয়ে পাশ ফিরে ঘুমিয়ে পড়া... আমার পোশায় না বাঁআ। সাফ কোথা।
আসলে ইচ্ছের ব্যাপার। সেই একবার ইচ্ছে হ'ল খেলাম। তারপর ইচ্ছে লেগেই থাকে। ইচ্ছেরা যায় না। সামর্থে কুলোয় না বলে পারি না, কুলোলে পারি। এই যেমন সেদিন অনেকদিন পর চুল কাটতে গেলাম। দেখলাম কেমন একটা মেশিন দিয়ে চেঁচে দিচ্ছে। একেবারে শানদার করে নিলাম, কানের ওপর দু ইঞ্চি পুরো খালি। একেবারে টপ ক্লাস। নেশাও এমন, খসানোর মতো ট্যাঁকের জোর থাকলে রোজ সেরা জিনিস নামাতাম। স্কচ, হুইস্কি, ভদকা... জানি বাঁআ... সব জানি। খাইও... সেরা না হলেও, মন্দের ভালো কিচু... ছোট পিস তুলে নিই। রেখে দিই। বড় দোকানে,তারপর টিভিতে দেখায় বারগুলোতে... সিনেমায়... বিদেশী মালের বোতলগুলো... ওফফ! সালা দেখলেই তুলে নিতে ইচ্ছে করে। মাল খেয়ে বোতল ভাঙার কোনও সিনই নেই। পেরাইজের মতো জমিয়ে রেখে দাও তাক ভর্তি করে। বাঁআ ওই বাইরেটাই আসল, ওটাই দেখে সবাই। তাই আমিও ভালো বোতল পেলে জমিয়ে রাখি। মাঝে মাঝে প্যাসেঞ্জারদেরও জিজ্ঞেস করি, ভালো মদের বোতল ঘরে আছে কি না। দিশী, চোলাই, বাংলা যা-ই খাই... ভালো বোতলে খাব। দ্যাখ সালা... আমারও লেভেল আচে!
রিকশাটা ক'মাস এই পাড়াতেই রাখচি। স্ট্যান্ডে না... ওই গলির মোড়ে রুটি-ঘুগনি-আলুর দম বানায়... ওর গুমটির পাশে। আগে অন্য পাড়ায় রাখতাম, একদিন কী বালের কিসের চাঁদা নিয়ে এমন ঝাঁট-জ্বালালো যে ক'দিন আগেই পালিয়ে এলাম। কোথাও টাকাপয়সা চাইলেই রিক্সা নিয়ে পালিয়ে যাই সেই পাড়া থেকে। আর দিতেই যদি হয় বাঁআ... পুরোটা উসুল করে নেব মাল খেয়ে। কোনও ছাড়াছাড়ির সিন নেই। টাকা তুললে মাল খাওয়াতে হবে। মালের ব্যাপার নেই, তো আমিও নেই। এখন এখানেই ক'দিন থাকি... তারপর ভালো লাগলে আরও ক'দিন... ক্যাচাকেচি হ'লে ফুররর।
কোনও ফোকট ফ্যাচাং-এর মধ্যে থাকব না বলেই তো সব কিচু এই রিকশায় ভরে নিইচি। রিকশাটাও তো ছিল না, ওটাও সেকন্ড হ্যান্ড নেওয়া। থাকবেই বা কেন? চালু মুদিখানার দোকান থাকতে কেউ রিকশা চালায়?
দোকান?... হ্যাঁ দোকান, ঘর, ফ্যামিলি সব আচে। থাকবে না কেন। একটা জয়েন্ট অ্যাকাউণ্টও আচে, তাতে টাকাও আচে। দিয়ে এসিচি। যা যা দরকার... মানে, আসলে ওদের যা দরকার সব দিয়ে এসিচি। আমি না থাকলেও চলবে। কিস্যু অসুবিধে হবে না। সব করচি, মাসে টাকাও আসচে, কারও কিছু কমতি নেই। তাও সালা এক পোস্ন। একটু মাল খাই, কি একটা রাত বাড়ি ফিরি না... সেই নিয়ে কিচির কিচির। ধুস। এই কৈফিয়ৎ দিতে দিতে পুরো লাইফটা বাআঁ হিন্দি সিনেমার কোর্ট হয়ে গেচিল। আমি মাল খাই, কারও শ্বশুরের টাকায় তো খাই না। আমি রাতে ফিরি না, কারও বউয়ের আঁচলের নীচে তো পড়ে থাকি না। তাহ'লে রোজ সালা এত কথা কীসের? যত বলি 'আমার কোনও দুখ্যু নেই, আমি কাউকে ভুলতে মদ খাই না...' তাও সালা কানের ধারে সেই এক কথা 'দেবদাস হয়ে যাচ্চে', 'লিভার পচাচ্চে'...আমি মদ খাব, বেশ করব। কাউকে কিচ্চু জানতে হবে না, কিচ্চু বিশ্বাস করতে হবে না। যখন যেখানে মন চাইবে যাব, থাকব বেশ করব... অনেক হয়েছে, আর পাচ্চি না। ব্যস্‌!
কেউ আমাকে ছাড়েনি... আমার আর পোশাচ্চিল না। দম বন্ধ হয়ে আসচিল। আমি নদ্যমার ধারে পড়ে থাকি, আমার টাকা, দোকান... সেসব তো থাকে না! সব দিয়ে এসিচি, সেগুলো নদ্যমায় না ঢেলে সব রেখে এসিচি। থাকুক সব নিয়ে। যা পারে করুক।

এখন সেটিং করচি। বোতলের মতো এদিক সেদিক আশ্রম, মন্দিরের সেটিং করচি। কেতরে ফেতরে গেলে সেই দিকে শেলটার নেব। প্রসাদ-ভোগ খেয়ে চলে যাবে। তখন রিকশাটাও কাউকে বেচে দেব। রেডিওটা পারলে রাখব, যতদিন চলে... ওটা রাখব সঙ্গে। কিন্তু ওই বাড়িমুখো আর হচ্ছি না। সেটিং হেব্বি জিনিস বাআঁ... একদম এক ঘর।
বাড়ি থেকে কেউ যোগাযোগ করে কি না? কী করে জানবে আমি কোথায়? যাক না পুলিশের কাছে, পুলিশের খেয়ে দেয়ে কাজ নেই, সালা হারিয়ে যাওয়া মুদি খুঁজবে! আর ওই ফোন-টোন কিচ্ছু নেই। দু'নাম্বারী ফোন পেলেও কিনব না বাঁআ। টাকা ভড়ানো, চার্জ দেওয়া, সাইলেন্ট রাখা, সুইচ অফ করা... অনেক ঝামেলা। দরকারই নেই সালা। কিচ্ছু দরকার নেই। রিকশা টেনে টাকা উঠবে, খাব, মাল টানব, ঘুমব। আজকাল খালি পেটে বাঁআ ভরপেট পুকুরের জল খেলেও নেশা হয়ে যায়... একেবারে নাকানি-চোবানি নেশা। সত্যি!

--- --- ---

কেউ নিজের সঙ্গে কথা বলে অন্য কেউ কি শুনতে পায়? ঠোঁট নড়লে, বিড়বিড় করতে দেখলে হয়তো অবাক হয়... পর্যবেক্ষণের চেষ্টা করে। চেষ্টা করে আলগোছে কান পাতে। এভাবে নিজের সঙ্গে কথা বলতে মানুষটাকে মাঝে মাঝেই দেখা যায়। দুপুরে, বিকেলে, রাতে... যে কোনও সময়। তবে রোজ নয়। অনেকেই বলে নেশার ঘোরে কথা। কিন্তু চোখ তো এমনিতেই জবাফুল, গন্ধ পাওয়ার মতো কাছে না গেলে নেশার ব্যাপারে নিশ্চিৎ হওয়া যায় না। আর অত কাছে কে যাচ্ছে? এই সেদিন একজন দর্জির দোকান থেকে বেরিয়ে নীল ছাউনির রিকশাটা দেখেই থমকে দাঁড়িয়ে গেল। রিকশাআলা সোজা লোকটার দিকেই তাকিয়ে। একটা শাসানী দেওয়ার ভঙ্গিতে বলল "বেশি বাড়াবাড়ি করলে না... একদম ঢুকিয়ে দেব সালা!" লোকটা প্রথমে থমকে গেল, তারপর সাবধানে রাস্তা পার হয়ে এগোতে শুরু করল। দেখল রিকশাআলা সেই একই দিকে চেয়ে আছে তখনও, মানে-- লোকটাকে বলছে না কথাগুলো। কাকে বলছে... তাও বোঝা গেল না। অদৃশ্য কারো দিকে তাকিয়ে সে একটানা কিছু না কিছু বলে চলছে। কথোপকথনের একটা দিকই শুনতে পাচ্ছে সবাই। কেউ দেখছে দোকান থেকে। কেউ হাঁটতে হাঁটতে তাকে দেখতে দেখতে চলে যাচ্ছে।
"আমি বিষ মাল আচি। কিচু বলি না বলে সব্বাই পেয়ে বসেচে... না? যেদিন ধরব না..."

রাতে ঘুম না এলে যারা বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকে, তারা অনেকেই ফাঁকা রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকে ওপর থেকে। রাস্তার আলো, বৃষ্টির জল, কুকুরদের ছুটোছুটি, সিকিওরিটি গার্ডের উগ্র হুইসল... গভীর রাতে সে এক আলাদা জগৎ। সেই রুটি-ঘুঘনির দোকানটার কাছাকাছি যে দোতলা-তিনতলা বাড়িগুলো... তাদের বারান্দা থেকে ওই গুমটিটাও দেখা যায়। দেখা যায় নীল ছাউনি রিকশাটা, গুমটির কাছাকাছি কোনও দেওয়াল বা লাইটপোস্টের গায়ে দাঁড় করানো। মানুষটা যেদিন পুকুরের ঘাটে, বা অন্য পাড়ার কোনও মন্দিরের সিঁড়িতে ঘুমোতে যায় না... সেদিনই দেখা যায় রিকশাটা। ভেসে আসে রেডিওর শব্দ, অনেক রাত পর্যন্ত। অনেকে ভাবে "ওই রেডিওটা আসলে টু-ইন ওয়ান। ক্যাসেট ঢুকিয়েও গান শোনা যায়। নাহ'লে এত গভীর রাতে কোন রেডিওর চ্যানেলে পর পর এত ভালো ভালো হিন্দি গান বাজে? কই, আমরা রেডিও চালালে তো এই সময় এই গানগুলো শুনতে পাই না?!" মদের নেশায় চুর, শূন্যের সঙ্গে ঝগড়া করে যাওয়া মানুষটা এত গভীর রাতে কি সত্যিই এই গান শুনতে শুনতে ঘুমোয়? বারান্দার আলো নিভিয়ে অন্ধকারে দাঁড়িয়ে সংসারী কেউ মাঝে মাঝে পর পর দু-তিনখানা গান শুনে তারপর দরজা বন্ধ করে ভেতরে চলে যায়। নীল ছাউনির রিকশায় গান বেজে চলে--
বো ক্যায়া চীজ থি, মিলাকে নজর পিলা দি
হুয়া বো অসর, কে হামনে নজর ঝুঁকা দি।

মজা নদীর চোরা স্রোত। মজা নদী, মজা নদী... মড়া নয়। মৃত তারা, যাদের দাহ-সৎকার হ'তো মজা নদীর পারে ওই শ্মশানে। ওপার থেকে কাঠ আসত এপারে। বর্ষাকালে নৌকোয়, অন্য সময় ঘুরপথে। বেশ্যাদের কাছে গেছে জানলে সবাই ছি ছি করে। আরও ছি ছি করে, কোনও মুখপোড়ানো মেয়েকে ভালবেসে ফেললে। কিন্তু সে হঠাৎ অকালে ঝরে গেলে, স্বস্তির নিঃশ্বাস পড়ে। অজস্র মানুষের স্বস্তির নিঃশ্বাস ঝড়ের মতো শোঁ শোঁ শব্দ তোলে। মজা নদীর পাড়ে বসে সেই চিতার ধোঁয়া সেই যে চোখ দু'টো জ্বালিয়ে লাল করে দিল, সে রঙ আর গেল না... জ্বালাও গেল না। অথচ সব কথা সবার জন্য নয়। সব কিছু বেরিয়ে গেলে নিজেকে খালি কৌটোর মতো ঠনঠনে মনে হয়। ফাঁকা মদের বোতলের মতই ছুঁড়ে ফেলে দিতে ইচ্ছে করে নিজেকে।

--- --- ---

রাস্তার উপশিরা গলি। সেই গলির শেষ প্রান্তে একটা সবুজ দরজা, তারপর বাঁ দিকে বাঁক। ঠিক সেইখানে, সিমেন্ট বাঁধানো ভিজে পথে পড়ে থাকে দু'টো বেলফুল। আর উপুর হয়ে শুয়ে এক রিকশাআলা... ঘুম, অথবা নেশা। ছিটকিনি খোলার শব্দ, সাইকেলের ঘণ্টি অথবা কুকুরের ডাকে কোনওটাই ভাঙে না। পড়ে থাকা বেলফুলের কথা ভাবলে যার মন ভারী হয়, সে ঝুঁকে পড়ে কুড়িয়ে নেয় তাদের। গাছের গোড়ার কাছে, অথবা বুকপকেটে রেখে দেওয়া--ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত।
সন্ধের বয়স বাড়লে এমন হয়।
মফঃস্বলের কোনও পুকুর পারেই মজা নদীর মায়া নেই। কিন্তু জলের দিকে তাকিয়ে থাকলে আকাশের চাঁদকে নাচতে দেখা যায়। জলে পা ডুবিয়ে চোখ বন্ধ করে বসে থাকলে কোনও মড়া-পোড়ানো গন্ধ তাড়া করে না। বোতলের মধ্যে নিজেকে ঢেলে কাউকে বলতে ইচ্ছে করে-- এক চুমুকে শেষ করে দে আমাকে। দে... শেষ করে দে এক চুমুকে।
অথচ, সন্ধের শুরুতে, এই মানুষটাই নীল ছাউনির রিকশাটা কলোনির দিকের পুকুরে ভাড়া নিয়ে যেতে রাজী হ'ল না। জমা জলে ডুবে যাওয়ার অজুহাত দিয়ে মুখ ঘুরিয়ে নিল। নেশার কোনও বুকপকেট নেই?