জগৎপ্যান্থারে ঝুলে আছে রাত

কামরুল ইসলাম ও আবু হেনা মোস্তফা এনাম


কামরুল ইসলাম


জগৎপ্যান্থারে ঝুলে আছে রাত

লোহিত কণিকায় সাতটি সচল গিরো-
দাঁড়িয়ে থাকা শ্বেতপত্র বলে যায়-- কোনো
কান্নায়-ই আর ভোর হবে না,
জগৎপ্যান্থারে ঝুলে আছে রাত...

রক্তের ভেতরে বেনোজল

কফিনের বিমূর্ত ছায়ায় দাঁড়িয়ে আছে
কয়েকটি হারানো মিছিল
যেন কোনো পুরনো দাঁড় ,কটি হারানো মানিক
নৃতত্ত্বের জলে-
খোলস পাল্টানো দুপুর, গোধূলির উলানে স্মৃতিমুখ
রক্তের খালে
অন্ধ ফাটা-ফুটো চাঁদ ভাটিয়ালি রঙে ,
নক্ষত্রের ওপাশে ঘুমোয়
আতঙ্কিত অধরা ফাগুন, জনান্তিকে পিশাচের ছায়া

মুগ্ধতায় ঘরপোড়া প্রাণ। করিডোরে পড়ে আছে
শহীদী সময় সহজিয়া ঢঙে,
আর মেফিস্টোফিলিসের দুধেল গাভিগুলো
পুরনো বারান্দায় কপালে লাল টিপ পরে
নাচের মুদ্রায় ঘাস খায়
আহা, কী মনোরম দৃশ্য এই স্নান করে ভাটায়!

তাল-তমালের দিকে
বৃষ্টি নামে অনেক ভোরে, রক্তের ভেতরে
বেনোজল আষাঢ়-তমসায় ডেকে ডেকে বলে যায়-
ফিরতে হবে কাঠের নৌকোয় রক্তমাখা গৃহে...


অন্ধ ঘোড়াটি এখন

ন্যানো-তাড়িত এই দুনিয়ায় শিলা ও বজ্রের আড়ালে মৃত হিরালীর মুখ আমি
পাখির পালকে ঢেকে দিই বিরহ-ব্যাকুল রাতে;
পোশাকের অশালীন পুচ্ছ নাড়ানোর দৃশ্য ও মন-মাতানো কথার তুবড়ি,
ভাতহীন হাঁড়িতে বোনা শোক। বিষাক্ত কাসাভোয় জঠরজ্বালা মেটাবার
ফতোয়া দিচ্ছে রেহেলের পবিত্র ভাঁজে লুকিয়ে থাকা খাদ্য-বিজ্ঞানীরা ;
এদিকে কোনো মেঘ ছাড়াই বৃষ্টি নামাবে খুচরো ধার্মিকেরা –
লজ্জার ওপারে নাকি সূর্য থাকে অসীম নগ্নতায় - স্নানঘরে এরকমই শোরগোল।
ঘাসের লকলকে জিহ্বায় কাঁদে এক নবীন বেহুলা, রাত ভারি হয়,
জীবন খসে পড়ে - খসতে খসতে জানিয়ে যায়: অন্ধ ঘোড়াটি এখন
অকাল প্লাবনে ভাসতে ভাসতে পুড়ে মরবে চৈত্র খরায়...

গ্রীষ্ম-তাতানো প্রার্থনা

যে-সকালে বিশ্বাসঘাতকরা মারা পড়ে
তার চেয়ে উজ্জ্বল আকাশ আর নেই।
পল এল্যুয়ার

সন্ধ্যা কিংবা দুপুর কিংবা সকাল জীবাষ্মের ওপারে বসন্তে কিংবা হেমন্তে কিংবা গ্রীষ্মে আমি প্রতিদিনই ঘুমভাঙা চোখে উজ্জ্বল আকাশের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করি । আমরা যৌবন দিয়েও ঠেকাতে পারিনি সেই থাবাগুলোর উত্থান ; প্রতিদিন লজ্জায় আরক্ত আমার ঠোঁট বরফের মতো নি:সঙ্গ এই চোখ আমাকে মানচিত্র থেকে দূরে সরিয়ে রাখে- বৃক্ষের আশির্বাদ থেকে দূরে এই যে বাঁচা, এ কেবল মাটির মমতায় মৃত্যুর দিকে গড়িয়ে নেওয়া সামান্য জীবন; আমার সমুখের ম্রিয়মাণ ঘাসগুলো হারানো সবুজের অপেক্ষায় সাজিয়েছে বনেদী প্রার্থনা, ওদিকে খুন-সংগীতে মত্ত কিছু এলিয়েন শকুন উজান-ভাটির রিসোর্টজুড়ে টাঙিয়ে রেখেছে আরব্য রজনীর কাহিনি-সকল, যখন সকাল হয় হয় কিন্তু হয় না আর মদ্যমাতাল দুপুরের কথা পড়ে থাকে শৈশবের ওপারে। প্রশান্ত খুনীদের দেখি উজ্জ্বল পোশাকে বিস্মৃতির আড়ালে, আমাদের তরুণ সূর্যগুলো দ্যাখো ঐ হিমসাদা চোখে পাথর ছুঁড়ে মারছে ওই সান্ধ্য কার্নিভালে। উজ্জ্বল আকাশের অপেক্ষায় নির্ঘুম তারকারা ফুটিয়ে রেখেছে চোখের পাটাতন আর ঘাতকেরা প্রসারিত হাতে বেরিয়ে পড়েছে পথে-- যন্ত্রণার নীল ঢেউয়ে ডুবে আছে আমাদের অর্ধমৃত মন, আমাদের রাতগুলো বীরঙ্গনার নিদ্রাহীন চোখের তিমিরে ভেসে যায়! উজ্জ্বল আকাশের অপেক্ষায় কতদিন আমরা দাঁড়িয়ে আছি কসবার মাঠে-- আমার স্পাইনাল কর্ডে খোঁচা দিয়ে কে যেন বলে , তবে কি কোনো সকালই নেই বঙ্গের অভিধানে ? - এ প্রশ্ন আমার চোখের রেটিনা হয়ে নেমে যাচ্ছে একঝাঁক মুনাফেক গণতন্ত্রীর চতুষ্কোণ ছায়ায়; উজ্জ্বল আকাশের অপেক্ষায় একটি আনন্দময় সকালের জন্যে আজ আমি আত্মার জাঙলায় টাঙিয়ে দেব সবগুলো পুরনো সাঁতার, আর রাতের কালো চোখে ঢেলে দেব জনতার গ্রীষ্ম-তাতানো প্রার্থনা-- ঘাতকদের মুখে ও চোখে নেমে আসুক বৃশ্চিক ঝড়!

পথের সতীত্ব নিয়ে ভাবো

পাথর পোড়ানো স্বভাবে দাঁড়াও
গ্রীষ্মের গলিতে এসে বাড়াও হাত

হলোকস্ট নিয়ে সীমান্তে কারা
ফুলশয্যা এঁকে
ফুটন্ত জলে চুবিয়ে মারে
রাবিষ মেটাফর-

গভীর রাতের গন্ধ এসে বাঁকে
জীবনের মানে খোঁজে তীব্র পলকে
ঈর্ষার ভেতরে গলে যায় ইস্পাত-বুক
এনভিলে জেগে আছে রাত-

পাথর পোড়ানো স্বভাবে দাঁড়াও
অস্ত্র বানানোর কৌশলে
পথের সতীত্ব নিয়ে ভাবো--

যে জলে দাঁড় ভাঙে

যে জলে দাঁড় ভাঙে সে জলের আদি-অন্ত পড়ি
মন বেয়ে ছুটে চলে অনন্ত আজরাইল--
কেউটের ফণার মতো শিশিরের চোখে
দেখি আজ বেগানা শহর তন্দ্রার মিছিলে--

তুরুকের তাসগুলো রঙিন খোড়ল ছেড়ে
অশান্ত শিলাবৃষ্টির রাতে--
সব তুকতাক সুপুরিগাছের গোপন নৃত্যে ফেরারি
কোরিওগ্রাফির ছিমছাম দেহ গেয়ে যায় ব্ল্যাকহোল

যে জলে দাঁড় ভাঙে সেই জলে মনটুকু ধুয়ে
রাতের কব্জি ধরে হেঁটে যাও প্রভাতের বাড়ি-

বাকবিন্যাসের মারেফতি

এবং সেই আয়নার ভেতরেই বেড়ে উঠছে রক্তের সিঁড়ি
সেই সিড়ি দিয়ে অনেক ওপরে উঠে যাচ্ছে
একটি মিউজিক্যাল বাড়ি-

আমার কৈশোরের হাড়হাড্ডির অভিজ্ঞান নিয়ে
আমার নিউরোটিক প্রতিবিম্ব দেখতে থাকে- অনেকগুলো ধূসর টিলা
বাকবিন্যাসের মারেফতি,লক্ষ্ণীপেঁচা গোপন গানের লিরিক কিংবা
অধোগতির উন্নাসিক রক্তবীজ--

শকুনেরা ভেঙে ফেলে জ্যোৎস্নার স্মৃতি কুৎসিত হাতুড়ে
আমি আমার নিজস্ব স্বরে গেঁথে নিই শান-দেওয়া হার্পুন
গোলাপের পাঁপড়িগুলো বিস্তৃত হতে হতে ছুঁয়ে ফেলে জন্মপাথর
ওপারের জানালায় বটবৃক্ষ খুলে দেয় জঙ্গলের পুরনো শহর
হরিৎপত্রের যখম নিয়ে বুনো পাখিদের সে এক মেডিকেশন
অদ্ভুত করোনেশন - বনস্পতির অন্ধকার গ্রামে--

বড়শির হুঁকে গেঁথে থাকা বাতাসের প্রানায়াম থেকে
অবোধ মুক্তির কথা, লিওনিথ জ্বর, প্রতিসরণের মুখ
আমার প্রতিবিম্বের অর্ধবৃত্ত চোখে গঙ্গা ও শ্মশানফুল
দ্রোহ নিয়ে প্রলয় অবধি হাঁটবে তো, সান্ধ্য বকুল?

=================================================


আবু হেনা মোস্তফা এনাম

জোনাকিবাবুই


গ্রামের লোকেরা বিস্মিত কি হয়ত বা নয় কেবল আগন্তুক অথবা একমাত্র নতুন কদাপি গ্রামের সান্নিধ্যে, তারা কিছু কৌতুকে থাকে। এরা, মাঠের দূরবর্তী পথের কাণ্ডজ্ঞান থাকে না, কেননা পথের যেহেতু বাক্য নেই, কেবল গতি স্থির করা ছিল; যেন ছোট ছোট ছবির রং সুপ্ত স্রোতের অংশ-- এখানে এরা যারা আগন্তুক, দেখে শস্যক্ষেত হাওয়ায় দুলছে। অথবা হাওয়া কোথায়? এখানে মেঘ দুষ্টু হেসেছিল প্রতারিত ও গোপন দূরভিসন্ধির। তবে শস্যক্ষেত দোলে রঙিন পাখার রৌদ্রচূর্ণাবলি তাদের চোখের ভেতর। তারা দেখে প্রজাপতির ঝাঁকে ঝাঁকে হৈহল্লাহৈহল্লা। এটা অবশ্য ক্ষণিকের, শস্যক্ষেতে প্রজাপতির হৈহল্লাহৈহল্লাÑনাম মোহাম্মদ সিতাব, লোকে বলে পাগলের ঘরের গাছ পাগল!

মোহাম্মদ সিতাব, হয়ত বা সে মোহাম্মদ সিতাবই! হয়ত সে কৃষিকাজ করে, অথবা শরীরে সে শস্যের গন্ধ নিয়ে। শরীরে সে প্রজাপতি নিয়ে। বৃক্ষ নিয়ে। সে কৃষিকাজে গেলে তার শরীরে তার প্রপিতা অথবা তার প্রপিতা অথবা তার প্রপিতার আমলের কোট ছায়ার মতো বয়ে নিয়ে যায়। গ্রামের লোকেরা বলে পনের শ সতের খ্রিস্টাব্দে সমুদ্রযাত্রী পতুর্গিজ সাহেব যে! সন্দেহ কি! কেউ বলে জোআঁ-দ্য-সিলভেরা, বলে সুলতানের সৈন্যদের হাতে নাস্তানাবুদ এবং পলায়নকালে ফেলে যাওয়া কোটমাত্র। মোহাম্মদ সিতাব সমুদ্রের জলজ গন্ধে কোটের ভেতর কোন অতীতকালে ঢুকেছে! প্রপিতাদের স্মৃতির ভেতর কোন বর্তমান কালে ঢুকেছে। কোন ভবিষ্যৎকালে ঢুকেছে। সে গ্রামের কোন গ্রীষ্মকালে, কোন বর্ষাকালে, কোন শরৎকালে, শীতকালে, হেমন্তকালে, বসন্তকালে। কোট গায়ে দিয়ে অতীতের ভেতর যেতে যেতে সে হয়ত নদী হয়ে যায়, অথবা ভবিষ্যতের ভেতর যেতে যেতে সে নদীর মানচিত্রে অপটু হস্তাক্ষর চিত্রিত। মলিন। কেননা, তার কোটের ভেতর নদীর গন্ধ অতীত এনেছিল; তবে কি সে নদী হয়ে যেতে চায়! যে নদী সমুদ্রের অতীত অনুভব আনে তাতে পাগলা ঝোঁক বেড়ে সে আলাভোলা, লোকে বলে ব্যাক্কল। এমন নয় যে! তবু এইসব ধূসর হস্তাক্ষরের ভেতর তার শরীর, এই মাত্র। হস্তাক্ষর বলতে হিজিবিজি রংবেরঙের কাপড়ের টুকরো জোড়াতালির ভেতর যেতে যেতে সেলাইয়ের অমিত্রাক্ষর ছন্দ। কোটময় লাল সবুজ সাদা হলুদ কালো বেগুনি সেলাইয়ের হিজিবিজি নিয়ে সে মাঠের ভেতর হেঁটে গেলে গ্রামের লোকেরা দেখে তাদের শস্যক্ষেত হেঁটে চলেছে দিগন্তের দিকে। অথবা মোহাম্মদ সিতাব শস্য আর শিশিরের অনুভূতি নিয়ে দিগন্তের দিকে গেলে গ্রামের লোকেরা দেখে তাদের সকল শস্যক্ষেতে ঝাঁকে ঝাঁকে প্রজাপতির উড়াল আর হৈহল্লাহৈহল্লা।

লোকেরা মোহাম্মদ সিতাব যে হয় তাকে গাছ পাগল ডাকলে সুতরাং তার নিজেকে বৃক্ষ মনে হয়। তারপর, গ্রামের লোকদের এইসব তাকে নিয়ে রচিত কৌতুক শুনে ভালো লাগে, তার বিনোদনশূন্য নিস্তরঙ্গ জীবনে, জোড়াতালিমারা কোট সম্বল যে অতীতের মধ্যে ঢুকেছে সেই, সুতরাং এরূপ কৌতুকে তার আনন্দ হয়। আর তবে কি মোহাম্মদ সিতাবের কোট হারিয়ে গিয়ে, অথবা কোট নয় (তা তো অতীতের সঙ্গে সমুদ্রস্রোতের জলজ চিত্রশৈলীর গন্ধ নিয়ে ভবিষ্যতের ভেতর ঢুকে পড়েছে!) সে নিজেই হারিয়ে গিয়ে। পিছলে গিয়ে। পাতার কৌতুকে মিশে গিয়ে-- নীরব, দৃশ্যহীন, দুর্নিবার নিরাসক্তির আড়ালে বৃক্ষ হয়ে যায়? সে তবে বৃক্ষের জীবনের মতো। চঞ্চল গতি নেই, অবিরত ঝিম নেই, অথচ জল। তার সাথে ফুল ফোটার শব্দ মিশে আছে। এইসব শব্দে তবে পাখিরা গৃহস্থ নারীর কণ্ঠে কোরাস করে। এ তার বউ একমাত্র। অন্য নারী সে জীবনে ভাবেনি, কিংবা সে দূরের নক্ষত্র দেখে বটে। তার গৃহ যে উঠোনে চারপাশ বৃক্ষের ঝোপে অন্ধকার। লতাগুল্ম। গোধূলিপ্রস্তুতির নির্লিপ্ত ঝোপে নৈশজোনাকিদের ঝিলমিল, কেননা মোহাম্মদ সিতাব জোনাকিঝিলমিল স্তব্ধতার ভেতর আনন্দ; তার বৃক্ষহাতের ফুলপাতায়, লতাগুল্মে জোনাকিপুচ্ছের আলো ঝিলমিল; আনন্দের অনেক বিস্তারিত প্রণয় হলে সে তার বউকে মৃত জোনাকির চাঁদ কপালে ঝুলিয়ে দেয়। উঁকি মেরে দেখে, যেন বউয়ের শরীর আকাশ হয়ে আছে, অথবা একাকী জ্যোতিষ্কলিখিত চন্দ্রাতপ টুকরো জ্যোৎস্না বৃক্ষপল্লবের ফাঁকে ফাঁকে মোহাম্মদ সিতাবের শরীরের সকল অনুভূতির ভেতর ভ্রুকুটি করে। অথবা বৃক্ষঝোপ লতাগুল্ম আঁধার সংগীত করে এবং পাখি ও পতঙ্গ যে সুর সংযোজিত, তা পাতার করোটির ভেতর জোনাকিঝিলমিল তাদের হৃদয়ে ঝংকৃত। তার বউ রাতের জোনাকিরুটি গড়ায়, চাঁদরুটি গড়ায়। মোহাম্মদ সিতাব চুলার পাশে বসে দেখে রুটিগুলো জোনাকিঝিলমিল হয়ে। চাঁদ হয়ে। এইসব চাঁদ, এইসব মৃদু জ্যোৎস্নার জোনাকিপুচ্ছ তাদের পেটের ভেতর, তাদের শরীরের ভেতর কী অপরূপ। আর তার বউ স্বামীর বৃক্ষহাতের ছায়ায় সে দর্শনীয় শোভা চুলার আগুনে। চাঁদের আগুনে। জোনাকির আগুনে। স্বামীর বৃক্ষহাতের ভেতর পাতার গন্ধ পায়, জ্যোৎস্নার গন্ধ পায়। তার মনে হয় কী যে মোহাম্মদ সিতাব বড় ঢ্যামনা। যেমন গ্রামের লোকেরা বলে আলাভোলা, অথবা কী রকম ব্যাক্কল বলে; কীভাবে যে এমন সে সংসার করে। সে এমন বকাবাদ্য করে যে তা তো মিথ্যা নয়। কিন্তু যে হয় মোহাম্মদ সিতাব তবে কে শোনে বউয়ের বকাবাদ্য এমন। এমন নিদারুণ চুপ করে বকা শুনে মৃদু মুচকি হেসে ক্ষেতের দিকে তার চলে যাওয়া কী অনুভব আনে। শুধুই এক প্রকার রাগ তার বউয়ের দাঁতের তলায় কটমট শোনা যায়, কদাচিৎ সংসারের প্রথম দিকে তার অজ্ঞাত কান্নার রং অপরূপ ছিল। মায়া ছিল। এখন নেই। বরং যে হয় আলোর প্রতিবিম্ব বউয়ের মুখে চিবুকে বরং আলোআঁধারের তারতম্যে অনৈসর্গিক গন্ধে মোহাম্মদ সিতাব নির্বাক হয়ত। অথবা স্মৃতির ভেতর এমন আনন্দে উদাসীন। এই আনন্দ নিয়ে মোহাম্মদ সিতাব গৃহে প্রবেশ করলে তার সন্তানেরা খেলছে জোনাকিআলোর ঝিলমিলে। আর তাদের পাঠ্যপুস্তকে জোনাকিঅক্ষর উজ্জ্বল। একটি নিঃশব্দ আকার ও দৃশ্যইঙ্গিতে তারা এসব জোনাকিঅক্ষর হৃদয়ে আকাশ রূপময় করলে তাদের শরীরে চাঁদ ওঠে। শরীরে চাঁদ নিয়ে তারা নিদ্রা গেলে চাঁদের আলোয় মোহাম্মদ সিতাব আর তার বউ সন্তানদের জ্যোৎস্নায় খেলা করে। তাদের এই খেলা কেবলই কি বসন্তের দিন হেমন্তের দিন শরৎ বর্ষার দিন (!) তাদের শরীরের খেলা জ্যোৎস্নার অনুভূতি ছিল। তারা এইসব অনুভূতি জোড়াতালিমারা কোটের পকেটে সুপ্ত রাখে।

যে হয় আলোর অন্তরীক্ষ তার বউ রাতের বাসি জোনাকিরুটি চাঁদরুটি কোটের পকেটে দিলে মোহাম্মদ সিতাব কৃষিকাজে যায়। তার নিজের জমি না থাকলে সে অন্যের ক্ষেতে কাজ করে, অথবা কৃষিই তার বর্ণনার যোগ্য কাজ। কিন্তু তাতে তার মন কোথায়?-- এখানে তার শস্যের গন্ধ নেই, শস্যের ছায়া নেই। তবু মাঠের পর মাঠ শস্যের গন্ধ তাকে অবিরত স্বপ্নলোকের দিকে ডাকে। শস্যগন্ধের ঘুম ঘুম আলস্য তার সকল অনুভূতির ভেতর ঝিমঝিম; মেঘের উড়ালে সে চলে, তার বৃক্ষহাতের তলায় মেঘ, মেঘের নীরব নিঃসঙ্গ একটানা সাদা; এ তার মুদ্রাদোষ চলতে চলতে দিগন্তপ্রহেলিকার দিকে মেঘের ভাষায় একা একা হিজিবিজি হাবিজাবি বলা। অথবা কখনো তার শস্য ছিল! ছিল কি! এসবে তার চৈতন্য নেই, ভ্রুক্ষেপ নেই! অতীতের ভেতর তার সকল শরীরে দুঃখ, দুঃখের শূন্যতার ভেতর রক্ত সেলাই করে শস্যগন্ধ উড়ে যায় ধূসর গোধূলিপ্রস্থানে।

এই তবে, একা চলা একা বলা কথার অস্ফুট বিড়বিড়, গ্রামের লোকেরা তার একা একা কথা বলা জানত না, লোকেরা কাছে এলেই মোহাম্মদ সিতাব চুপ। তবু একদিন লোকেরা দেখে ফেলে তার বিড়বিড়, শুনে ফেলে তার বিড়বিড়। কেউ হয়ত দূর থেকে দেখেছিল তার বিড়বিড়, অথবা বালকস্বভাব থাকে না প্রবীণ কেউ কেউ তাদের কৌতূহলে দেখে ফেলে তার একা একা বিড়বিড়। গ্রামের লোকেরা মোহাম্মদ সিতাব বিড়বিড় কি বলে জানতে চাইলে সে চুপ। তখন গ্রামের লোকেরা বলে পাগলের ঘরের গাছ পাগল-- মোহাম্মদ সিতাব সহসা কামলা-দেয়া হারায় হয়ত। অথবা কৃষিকাজে ক্লান্ত সে বসে বৃক্ষছায়ায় বিশ্রামে। কামলা-খাটা ফেলে সে ঘুমায়। কে তাকে ডাকে কাজে। গ্রামের লোকেরা পাগলের ঘরের গাছ পাগল ভেবে এতদিন ফেলে রাখে আর পাকা শস্যের গন্ধ কীভাবে। তারা দেখে একদিন এমন কী যে মোহাম্মদ সিতাব শস্যের পাকা গন্ধের মধ্যে টেনে নিচ্ছে নিঃশ্বাস তার ঘুমে। পাকা শস্যগন্ধে তার ঘুম গভীর অলৌকিক। লোকেরা বলে সে কী ব্যাক্কল, ক্ষেতের গন্ধের ভেতর কীভাবে তার ঘুম আসে! না কি সে মহা ফাঁকিবাজ। তবু কামলা-খাটা হারিয়ে সে শস্যক্ষেতে যায় হুদাহুদি, তার ভালো লাগে এসব নৈমিত্তিক শস্যগন্ধ, পায়ের তলায় মেঘ নিয়ে চলা। অথবা তার ভালো লাগে ক্ষেতের গন্ধের ভেতর কীভাবে সে ঘুমায়। রৌদ্রবিভূসিত শস্যগন্ধের স্তব্ধতা আছে তা সত্তেও, মোহাম্মদ সিতাব নিজের স্বেচ্ছাচারিতায়, জোড়াতালিমারা কোটের পকেটে জোনাকিরুটি বা চাঁদরুটি খেতে খেতে দিগন্তের দিকে গেলে মাঠের দূরবর্তী পথের আগন্তুকেরা দেখে শস্যক্ষেতের ছোটাছুট, অথবা দেখে প্রজাপতির ঝাঁক। অথবা তার বউ বলে কামলা-খাটা হারানো তবে কি সে ঘুমিয়ে পড়েছিল শস্যগন্ধছায়ার ভেতর? সে তবে কি দৃশ্য এবং কৃষিক্ষেতে গোধূলি এসেছিল? তার বউ এরূপ, বরং তার অকপট স্বেচ্ছাচারিতা না বুঝে অস্ফুট খিস্তি করতে প্রস্তুত-- তখন সত্যিই হয়ত বা মোহাম্মদ সিতাব ঘুমিয়ে পড়েছিল। তবু ক্ষেতের গন্ধের মধ্যে স্বামীর ঘুমিয়ে পড়া শুনে তার মায়া হলে একদিন সে দেখে তার স্বামীর বিড়বিড়। স্বামীর বিড়বিড় দেখে তার ভয় হয়, ভয়ের অনুভূতি তার শরীরে ছড়িয়ে তাকে শোকে বড়ই ক্ষুধার্ত আর শূন্য লাগে। তার জোনাকিরুটি বা চাঁদরুটি গড়ানো আলোআঁধারের তারতম্যহীন ভয় অজস্রবার আকাশলোক পরিভ্রমণ শেষে তার পায়ের অনুভূতি আর তার চুলের কালোর মধ্যে ফিরে আসে। উঠোনে ঝিঁঝিঁডাকের নিঃশব্দে রুটি গড়া রেখে সে এসে দেখে মোহাম্মদ সিতাবের বিড়বিড় জোনাকি পোকাদের সাথে। চাঁদ নিভে গেছে। কুয়াশা-কুয়াশা আঁধারে বৃক্ষ লতাগুল্ম ঝোপের জোনাকিরা তার বিড়বিড়ে নাচে। তার ঠোঁটে হাতে কানে কোটের পকেটে জোনাকিরা উড়ে এলে তাদের মৃদু গুনগুন শস্যের গন্ধ আনে, মোহাম্মদ সিতাবের বিড়বিড় বেড়ে যায় বরং তখন পিছনে মানুষের উপস্থিতি টের পেলে সে দেখে তার বউ। অঞ্জলিবদ্ধ মৃত জোনাকি সে বউয়ের কপালে চাঁদ আকাশ ছড়িয়ে দিলে বউ ভ্রুকুটি করে।

শস্যক্ষেতে সে তবে কি হয়ত বা তা নয় সত্যিই ঘুমিয়ে পড়েছিল? নিঃশ্বাসে পাকা শস্যগন্ধ নিয়েছিল, এই তবে, এই মাত্র! তার ঘুমের ছায়াগন্ধে গ্রামের লোকেরা দেখে তাদের ক্ষেত থেকে শস্য চুরি যাচ্ছে, কিন্তু তারা চোর ধরতে ব্যর্থ হলে দেখে মোহাম্মদ সিতাব একটি আনত বৃক্ষের নিচে নিদ্রার প্রহেলিকায় বিড়বিড় করে। অথবা তারা দেখে তাদের শস্য, পাগলের ঘরের গাছ পাগল, মোহাম্মদ সিতাবের ঘুমের গোধূলিগন্ধে উড়ে উড়ে যায় কত কত দূরের দিগন্তে, অথবা তাদের শস্য কমে যাওয়ার কিছুই বুঝতে পারে না তারা, কেবল দেখে মোহাম্মদ সিতাব বৃক্ষের নীরব ভাষায় ছায়া হয়ে যাচ্ছে। অথবা মোহাম্মদ সিতাব সে তবে কি ছায়া কিংবা মেঘের হেমন্তে দেখেছিল তার ঘুমে গোধূলির প্রতিচ্ছবি! আর গোধূলির ভেতর একটা বাবুই পাখি উড়েছিল, উড়ে এসেছিল তার জোড়াতালিমারা কোটের পকেটে। পাখিটিও কি ভেবেছিল গ্রামের আগন্তুকদের কৌতুকে মোহাম্মদ সিতাবের জোড়াতালিমারা কোট বৃক্ষছায়ায় ফুললতাপাতার লুকোচুরি বা প্রজাপতির রঙিন পাখাবিস্তার। অথবা সে বৃক্ষ, বাবুই তবে এই ভেবে আশ্রয় নিয়েছিল। জোড়াতালিমারা কোট সেলাইয়ের শুকনো সুতার খড় বাবুইয়ের বাসার চিরন্তন সোনালি, তবে পাখিটি তখন নির্ভয়। যদিও তার উড়ালে আকাশ চিত্রিত ছিল, তার ডানায় নক্ষত্রের আলো সজীব যথার্থই ছিল; তখন সে ক্লান্ত কি, (?) কেননা আকাশের স্তব্ধতা অনুবাদের মধ্যে দিগন্তব্যাপ্ত শূন্যতার আনন্দ, শূন্যতার আনন্দের মধ্যে সংগীতের স্বাভাবিকতা বাবুই পেয়েছিল সহজেই। কেননা কোটের পকেটে মৃত জোনাকি আর মৃদু আঁধারের নরম ছায়াজ্যোৎস্না তাকে নির্ভয় করে; হয়ত বা নির্ভয় নয়, নিরুপায় শোকে ম্লান। অন্যত্রে, মোহাম্মদ সিতাব ঘুম অথবা গোধূলিদৃশ্যে হেমন্তমেঘের ছায়ায় অবাক, হয়ত বা আশ্চর্য নয় সে স্বাভাবিক অবলীলায়। সে পাখিকে দেখে, পাখি তাকে। সে পাখির কোমল করুণ বুকে করতল মেলে দিলে শোনে বিজন জ্যোৎস্নায় দ্রবীভূত তার হৃদয়ের অশ্রুনির্ঝর। তার শিথিল ডানায় ছিন্ন হাড়ের হৃদয়বিদারক ধ্বনিসমূহ যন্ত্রণায় স্তব্ধ।

বাবুইয়ের অশ্রুনির্ঝর শিথিল ডানার স্তব্ধ মোহাম্মদ সিতাবের করতল ছুঁয়ে শরীরের সকল অনুভবের ভেতর ছড়িয়ে পড়ে। তার শরীরে বাবুইয়ের করুণ কোমল বুক আকাশচিত্রিত নক্ষত্রের নীল ছড়িয়ে পড়ে, পালকের নরম অভিজ্ঞতা তার করোটির ভেতর ছড়িয়ে পড়ে, সন্ত্রস্ত চোখের বর্ণমালা তার হৃদয়ে ছড়িয়ে পড়ে, তবে তার-- এই করুণ কোমল বাবুই, তার সন্তানদের শিশুমুখে ছড়িয়ে পড়ে, শিশুমুখের আশ্চর্য তুলতুলে পা আহ্বানময় হাত চোখ তার অনুভূতির ভেতর ছড়িয়ে পড়লে সে বাবুইয়ের বুকে নিঃসীম আকাশচিত্রিত শূন্যতাবোধের মায়ায় অসহায়। আর তার বৃক্ষহাতের ফুললতাপাতার বুনো গন্ধ যে বাবুইয়ের ধুকধুক বুকের ভয় নানা ধরনের গানের বাজনায় ব্যবহার হয় ইত্যাদি তো সত্যিই। মোহাম্মদ সিতাবের অসহায়, তা হলেও বাবুইয়ের ধুকধুক বুক তাকে অজানা কল্পনার আনন্দ হয়।

বাবুইকে নিয়ে কী করবে তবে সে? তার তো এখন, যখন আকাশের উড়াল নেই, চাঁদের নাচ নেই। তার অনিশ্চল আকুলতর বেদনা বিকেলের নিঃশব্দ দীর্ঘশ্বাসে ভেসে গেলে সে পাখি নিয়ে বাড়ি ফেরে। তার একা একা বিড়বিড় পরিদৃশ্যমান বাবুইয়ের বেদনায় চুপ। সে বেদনা নিয়ে বাড়ি এলে তার বউ আর সন্তানেরা এমন কোমল রেশমের মৃদু পাখির আনন্দে মেতে ওঠে। গৃহের নতুন অতিথিকে তারা এমন তবে কী দেবে আহার। বউয়ের কপালে চাঁদ খুলে দেয় পাখির ঠোঁটে। মোহম্মদ সিতাব বউয়ের এই অলঙ্কারশূন্য হয়ে গেলে তার ভালো লাগে তবু বাবুইয়ের প্রাণ রোমাঞ্চিত হলে। সন্তানেরা তাদের শস্যভাজা দেয় পাখির আহারে। তারা স্বামী-স্ত্রী আর সন্তানেরা নিদ্রায় যায় পাখির স্বপ্নের ভেতর, পাখির আহত ডানার ভেতর, পাখির ধুকধুক বুকের ভয়ের ভেতর; আনন্দে অথবা অজানা শঙ্কায় নানাবিধ অপ্রকৃতিস্থ শব্দ বিকট ও নিদ্রাকে সারারাত তটস্থ পায় তাদের। বাবুই আহত ডানার বেদনায় জোড়াতালিমারা কোটের পকেটের আঁধারে, আর গৃহের অধিবাসীদের তটস্থ নিদ্রা তার আকাশচিত্রিত হৃদয়ে সঞ্চারিত হলে সে মানুষের ভালোবাসার ভেতর বসবাসে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে; আর গ্রামের লোকেরা দেখে মানুষের প্রণয়ে যে কি না মোহাম্মদ সিতাব, জোড়াতালিমারা প্রাচীন কোটের পকেটের আঁধারে বাবুই তার ডানায় জড়িয়ে পড়া অজ্ঞাত মৃত্যুভয়ে কান্না প্রতিধ্বনিত ছিল তা তার নির্ভার শরীর বিবিক্ত করে। লোকেরা তখন বিস্মিত তারা এই দৃশ্য দেখে যে পাখি আর মানুষের প্রণয়ের অন্তর্গত সম্পর্কের এই রূপ। গ্রামের লোকেরা আবিষ্কার করে মোহাম্মদ সিতাবের জোড়াতালিমারা কোটের পকেটে আহত পাখিটি ক্রমেই সুস্থ, সে উড়ে যায় কত কত দূরের নীলিমায় এবং ফিরে আসে পুনরায় মোহাম্মদ সিতাবের কোটের পকেটে। অতঃপর গ্রামের লোকেরা দেখে আকাশের সীমা অতিক্রম করে পাখিটির সঙ্গে আসে আরো একটি পাখি দুটি পাখি তিনটি পাখি, এভাবে অসংখ্য পাখি, এরূপে অগণিত পাখি, পাখি পাখি পাখি... পাখিপাখি পাখিপাখি পাখিপাখি... পাখিপাখিপাখি পাখিপাখিপাখি পাখিপাখিপাখি...। এবং তারা উড়ে উড়ে আসে উড়ে উড়ে যায় অবিরত টুইটুউ টিউট টিউট টিটিউ টিউটিউ টুইটুউ টুউটুই কত সুরের গান করে আকাশে অথবা কোটের পকেটে কিংবা মোহাম্মদ সিতাবের বৃক্ষহাতে মূলত তা ক্লাসিক গানের বহু লয়েরই রকমফের। আর মোহাম্মদ সিতাব অবাক অনেকদিন পর যে পাখিদের গানের রাজ্য অন্তহীন। পাখিরা মোহাম্মদ সিতাবের জোড়াতালিমারা কোটের পকেটে গান নিয়ে গান গেয়ে আসে যায়, যায় আসে-- ফুড়ুৎ ফুড়ুৎ... ফুড়ুৎ ফুড়ুৎ ফুড়ুৎ... ফুড়ুৎফুড়ুৎফুড়ুৎফুড়ুৎ ফুড়ুৎফুড়ুৎ...

পাখিদের আসা-যাওয়া যাওয়া-আসা কত কত বার কত কত দূর আবহমানকাল বিস্তারিত পায় যে, মোহাম্মদ সিতাব কামলা যেতে অসম্ভব হয়, অথবা সে পাখিদের আনন্দে বিহ্বল ও চঞ্চল বালক-স্বভাব ফিরে আসে। তখন তার বউয়ের এতদিন পর মনে হয় এ তার ভালো লাগে না; এত পাখি দিয়ে তারা কী করবে, এত পাখির আহার তারা কোথায় পাবে, তার স্বামী এত পাখি নিয়ে মেতে তাহলে সংসার কীভাবে চলে। তার শাড়ি ছিঁড়ে গোল গোল কদাচিৎ শরীরে অজ্ঞাত মাধুর্য তাকে মেঘাবৃত গোল চাঁদের মতো লেগেছিল সেসব। তার চাঁদশরীর। কিন্তু তা তো চাঁদ নয়, শরীরও নয়। মোহাম্মদ সিতাব কবে যে শেষ এমন নিদারুণ দেখেছিল তার শরীরে মেঘাবৃত জ্যোৎস্নার মাধুর্য সেই সোনালি অপরূপ। অতঃপর ছেঁড়া শাড়ির ভেতর তার শরীরের অনাবৃত গোল গোল চুলায় চাঁদরুটির অনুভব আনে, এই মাত্র। এতসব বিবিধ চিন্তা তাকে উত্তেজিত করলে তার মনে হয় এর চেয়ে তার স্বামীর একা একা বিড়বিড় ভালো ছিল, কামলা দিতে শস্যগন্ধে ঘুমিয়ে পড়া ভালো ছিল, জোনাকিদের সঙ্গে বিড়বিড় নাচ ভালো ছিল... তখন সে রাগ হয়, রাগে তার বাসি চুলার ভেতর লাল গোধূলি লাফিয়ে পড়লে সে চিৎকার করবে ভেবে অবাক যে, তার স্বামী জোড়াতালিমারা কোটের পকেট থেকে বের করে আনে শস্যদানা। তারা স্বামী-স্ত্রী দেখে পাখিদের এই যে এই যাওয়া-আসা আসা-যাওয়ার মুখরিত কোলাহল স্বামী-স্ত্রীর নিস্তরঙ্গ অভিজ্ঞতার অন্তর্গত ছিল না, তারা দেখে পাখিদের ঠোঁটবাহিত শস্যদানায় জোড়াতালিমারা কোটের পকেট ভরে উঠছে। এরূপ অজস্র আলোকদীপ্ত শস্যবিন্দু কত আশ্চর্যে বউয়ের আনন্দকে চিৎকারে রূপান্তরিত করলে গ্রামের লোকেরা ভাবে কামলার বাড়িতে কী সমস্যা! তারা পথের ধূলি উড়িয়ে শস্যরেণুর স্পর্শে শিশিরের ভেতর মোহাম্মদ সিতাবের বাড়ির দিকে দেখে, তখন তারা দেখে বাড়িটি নিশ্চুপ। তখন তারা আবিষ্কার করে-- কী রে মোহাম্মদ সিতাব তো কামলা দেয় না, তার অসুখ করেনি তো! অথবা কেউ বলে পাগলের ঘরের গাছ পাগল, কী জানি কী না কী করে! তখন গ্রামের লোকেরা দেখে আসন্ন গোধূলির ধূলিস্বরলিপির ভেতর মোহাম্মদ সিতাবের সন্তানেরা দিগন্তের উপকণ্ঠে উজ্জ্বল ছায়ার প্রতিবিম্বিত সূচনা করে বিদ্যালয় শেষে ফিরছে। তারা নিকটবর্তী হলে গ্রামের লোকেরা ঠাট্টা করে, দেখে মোহাম্মদ সিতাবের সন্তানদের মাথার উপর পাখির ছায়া নিঃশব্দ ও মর্মরিত। তারা ভাবে এরাও দেখি বাপের মতোই পাগল, একা একা হাসে, একা একা কথা বলে, একা একা হাঁটে; তারা মোহাম্মদ সিতাবের কথা জানতে চায়। তখন মোহাম্মদ সিতাবের সন্তানদের মন দূর অতীতে আহত বাবুইয়ের বিষণ্নতায় ডুবে গেলে তারা চুপ, আর লোকেরা বলে হয়ত বা, অথবা যাকিছু বলে তার পরবর্তী প্রসঙ্গ তাদের বিষণ্ন করে। লোকেরা হয়ত বলে তাদের বাপ ইদানিং পাখিপুখি নিয়া ঘোরে; এবং বলে পাগলের যত আজাইরা কাম। ফলে এই দ্বিতীয় অংশটি তাদের বিষণ্ন এবং যে বিষয় গ্রামের লোকদের খুব একচোট তামাসার, সুতরাং তারা বাপের পাখিপ্রীতি বা শস্যদানা নিয়ে চুপ থাকে। তারা মন খারাপ এবং বিষণ্নতা নিয়ে বাড়ি ফেরে; একদিন দুইদিন তিনদিন কতদিন তাদের মন বিষণ্ন হলে তারা একদিন দেখে বিদ্যালয়ে তাদের বন্ধুরাও তাদের বাবাকে জোড়াতালিমারা কোট পরার নিন্দা করে, তখন তারা একদিন দুইদিন তিনদিন তাদের বাবাকে বলে, বাবা তুমি এই ছিরা কোট পিন্দো ক্যা, পাখিপুখি নিয়া ঘোরো ক্যা! এই কথা শুনে মোহাম্মদ সিতাব শিশুকণ্ঠস্বরে খোলামকুচির প্রতিধ্বনি উপলব্ধি করে আর তাকে সহজাত বোকা বোকা হাসির অকপট আলোড়ন পায়। বাবার হাসিতে তাদের রাগ, রাগে হয়ত তারা কাঁদে বা তাৎক্ষণিক কাণ্ডজ্ঞান লুপ্ত তারা বলে পাখিরা তবে উড়ালে যাক, হয়ত বলে এইসব পাখিপুখি নিয়া ছিরা কোট পিন্দা বাবা যেন বাইরে গেলে তাদের মান থাকে না। তখন মোহাম্মদ সিতাব পুনরায় হাসে; যা হাসি তা তার নিঃশব্দ প্রশ্রয়, যা হাসি তা তার নীরব গোপন অশ্রু। সে তখন লতাগুল্ম ঝোপের পায়ের কাছে বসে জোনাকিপুচ্ছের জ্যোৎস্নার ভেতর গোপনে কাঁদে। তবু তার গোপন কান্না শুনে ছেলেমেয়েরা মন খারাপে মাধুর্য, এবং সে তখন জোড়াতালিমারা কোটের পকেট থেকে পাখিদের ঠোঁটবাহিত শস্যদানা সন্তানদের করতলে দেয়, তারা পাখির কোলাহলে শস্যদানা ছড়িয়ে আহার করালে বন্ধুদের ক্ষ্যাপনো ভুলে যায়, গ্রামের লোকদের তামাসা ভুলে যায়। পুনরায় তারা পাখিদের ভালোবেসে ফেলে আর অনেকদিন পর হয়ত অনেক অনেকদিন পর তারা দেখে তাদের উঠোনে গোল হয়ে আসা লতাগুল্ম ঝোপের ভেতর গোধূলিছায়ায় ঝিঁঝিঁসংগীতের অস্ফুট স্পন্দনে ঝিকমিক জোনাকিনাচ।

পাখিদের এই তবে যে আঁধার-আঁধার প্রভাতই নৈসর্গিক সংগীতের যোগ্য! প্রত্যুষে অপস্রিয়মাণ আঁধারের নিঃশব্দে মোহাম্মদ সিতাব পাখিদের শস্যদানা ছড়িয়ে দিলে গৃহপ্রাঙ্গণ এবং আকাশমল্লারে পাখিরা অপরূপ ছন্দে খুঁটে নেয় তার করতলের শস্যসমূহ। তখন পাখিদের চন্দ্রছায়াকোমল পালকের উড়াল আর শস্য খোঁটার চঞ্চুধ্বনি বাতাসে এবং তা যেন ককুভা রাগিণী তরঙ্গের অস্ফুট হাসি। প্রত্যুষে এমন মল্লার বাতাসে বাতাসে আনন্দ ছড়িয়ে যে গ্রামের লোকেরা আকাশের দিকে তার উৎস সন্ধান করে, আর তাদের দৃশ্যবাহিত হয়ে সকল শরীরে বেজে ওঠে পাখির কণ্ঠস্বর। তারা দেখে তাদের প্রভাতের ভেতর এত এত পাখির উড়াল-- তবে কোথা হতে আসে তারা, তবে কোথায় থাকে তারা, কত কত দূরের মাঠে তারা, কত কত নক্ষত্রের শরীরে তারা-- এসব অজানার উত্তর জানতে তবে কোথায় যাবে গ্রামের লোকেরা-- বিভ্রান্ত তারা দূরের দিকে দেখে। বিভ্রান্ত প্রতীক্ষার ভেতর, এখন যেন শোকার্ত, গ্রামের আকাশ দেখে কুয়াশাধূসরিত নিঃশব্দ বায়ুপ্রবাহে প্রস্ফুটিত ফুলের গন্ধ; হয়ত ফুলের গন্ধ ভেবে তারা ভুল করে; তারা ভুলের বিধুরতাময় দেখে দিগন্তপ্রহেলিকার ভেতর চন্দ্রসুবাসিত খঞ্জশস্যের অজস্র। অথবা তখন তারা কুয়াশালিপ্ত প্রভাতি পাখির কণ্ঠস্বরের অস্পষ্ট ছায়া দেখে পথের পদচিহ্নচিত্রিত ধূলির উপর। তারা প্রায় বিলীয়মান ছায়াপুঞ্জ অনুসরণ করে, কিন্তু তখন পথের ধূলি উপর পতিত ছায়াবিন্দুসমূহ মিলিয়ে যেতে যেতে গ্রামের লোকদের চোখের কালো মনির মতো তাদের শরীরের ভেতর হারিয়ে গেলে তারা পাখিদের হারিয়ে ফেলে এবং রাগ হয়। অতঃপর তারা পাখি ভুলে যায়। তারা ভুলে যায় প্রত্যুষ আলোর কণায় কণায় কত কত পাখির হৃদয় স্ফুরিত ছিল। কিন্তু পরের দিন প্রভাত নির্মাণের কৌশলে পুনরায় পাখির কণ্ঠস্বরলিপি গ্রামের লোকদের সকল ইন্দ্রিয়ের ভেতর জমা হলে তাদের কৌতূহল-- বরং তারা পাখিদের কণ্ঠস্বরলিপি লিখতে গিয়ে সুরের স্বরূপ ভুল করে, ফলে এ এক অনিবার্য ইন্দ্রজাল-- তারা খিস্তি করতে অবলীলায় সহজ এবং কৌতূহল নিবৃত্ত করে এবং হয়ত বা তারা পাখির কণ্ঠস্বর বিস্মৃত হলে কুয়াশালুপ্ত উজ্জ্বল সূর্যালোকে শস্যক্ষেতের দিকে যায়। এবং গ্রামের লোকেরা অবাক, দেখে তারা বাক্যশূন্য যে-- মাঠের দূরবর্তী প্রান্তসংলগ্ন পদচিহ্নচিত্রিত পথের উপর অজস্র পাখির মাঝে দাঁড়িয়ে মোহাম্মদ সিতাব জোড়াতালিমারা কোটের পকেট থেকে মুঠো মুঠো ছড়িয়ে দিচ্ছে সেসব একটা কিছু।

গ্রামের লোকেরা কৌতূহলে নিকটবর্তী এলে পাখিরা ফুড়ুৎ ফুড়ুৎ উড়ালে অদৃশ্য; পাখিদের সম্মিলিত উড়ালে গ্রামের লোকেরা একখণ্ড বৃত্তাকার মেঘ উড়ে যেতে দেখে-- মাথার উপর তাদের মেঘ, নিচেও নীলাঞ্জন মেঘ; অথবা তারা দেখে মেঘ নয়, কুয়াশালিপ্ত ধূসর বনস্থলীর মর্মর তরঙ্গ। তাদের মনে হয় এইসব বুনো অথবা আকাশযাপিত পাখিরা বড়ই চতুর এবং কী তাদের কূট বুদ্ধি। তাদের সহসা মনে পড়ে এবং সচকিত বুদ্ধির দীপ্তি খেলা করে, কেউ বলে কী আশ্চর্য তাহলে পাখিরা এমন যে কেন মোহাম্মদ সিতাবের সান্নিধ্যে নির্বিকার! তখন তারা সকলে মোহাম্মদ সিতাবের দিকে ফেরে, তাকে জিজ্ঞেস করে এসব চতুর পাখিদের ধান্দা কী? গ্রামের লোকদের প্রশ্নে সে তথাপি চুপ, তারা বলে পাগলা ব্যাটা জাতে মাতাল তালে ঠিক; তারা পুনরায় জিজ্ঞেস করে সে পাখিদের ঠোঁটে মুঠো মুঠো সেসব কী ছড়িয়ে দেয়? মোহাম্মদ সিতাব গ্রামের লোকদের এই উপর্যুপরি জিজ্ঞাসায় ভয় পেয়ে সহজের মরিয়া চেষ্টায় মৃদু হাসে; এবং তার হাসির নিঃশব্দ যদিও তা পরিহাস ছিল না কি না গ্রামের লোকেরা মহা বিরক্ত এবং ভয়ানক রাগ হয়। তারা তাদেরই গ্রামের এই প্রান্তিক কামলা এবং আলাভোলা ব্যাক্কল লোকটির উদ্ধত নিঃশব্দ হাসির সমুচিত জবাব দেবে ভেবে তার জোড়াতালিমারা কোটের পকেটে হাত ঢুকায়। এবং তাদের করতলে তখন উঠে আসে জ্যোৎস্নাছায়ামথিত রাশি রাশি মৃত জোনাকি।

তাহলে পাখিরা আসে মৃত জোনাকির লোভে! গ্রামের লোকেরা তবে এ আর এমন কী কঠিন কাজ ভেবে জোনাকির সন্ধানে যায়। তারা সন্ধ্যাকালে দিগন্তের দিকে, তাদের গ্রামের ঝোপজঙ্গলের আঁধারকালে, মাথার উপর মেঘকালে সমাহৃত আকাশের ভেতর জোনাকি খুঁজে পায় না। কেউ বলে সব গাধা নাকি, মরা পোক পাইবা ভুঁইয়ে, আকাশে মরা পোক কোইত্থিকা আইব! গ্রামের লোকেরা তখন শস্যক্ষেতে যায়, আর তাদের তুমুল এক বিস্ময়ের ঘোরের ভেতর নিমজ্জিত হতে হয়, কেননা এইসব উদ্দেশ্যতাড়িত মানুষের অনৈসর্গিক কোলাহলে আতঙ্কিত পাখিরা এবং পাখিরা হয়ত তখন তাদের মৃদুপ্রায় অদৃশ্য ঠোঁটে খুঁটে নিচ্ছিল নিতান্ত অবহেলায় ঝরে যাওয়া শস্যকণা, তারা ভয় পেয়ে ফুড়ুৎ ফুড়ুৎ ফুড়ুৎ ফুড়ুৎ উড়ালে যায়। গ্রামের লোকেরা ধূসর ছাই-ছাই মেঘ করে পাখির উড়ালে নিজেদের নির্বুদ্ধিতায় হতাশ, কেউ বলে এহন বুঝছি হালায় খ্যাতেত্থন কেমনে ফসল চুরি যায়।

হালায় এইসব পাখিপুখি বহুত ধান্দাবাজ, হালার সিতাবে একটা বিটলা-- গ্রামের লোকেরা মৃদু হেসে এইসব বাক্যে কাঠিন পরিহাস ছিল, তথায় হাসির নির্মলতা কোথায়? তারা মাঠে শস্য চুরি ঠেকাতে ফাঁদ পাতে, কিন্তু ফাঁদে পাখিরা আটক না হলে সম্ভবত তারা গ্রামের লোকদের এইসব চালাকি ধরে ফেলে। পাখিরা গ্রামের লোকদের সঙ্গে লুকোচুরি খেলে; হয়ত তারা একবার ধানক্ষেতে উড়ে পালায়, হয়ত তারা একবার সরিষাক্ষেতে উড়ে উড়ে পরিণত ফল নিয়ে হারায়, হয়ত বা তারা একবার ভুট্টার দানায় পায়খানা করে উড়ালে যায়। পাখিদের লুকোচুরি ঠেকাতে গ্রামের লোকেরা মাঠের চারদিকে বৃত্ত তৈরি করে, লাঠি নিয়ে গোধূলিকাল পর্যন্ত তারা হৈ হৈ করে। পাখিরা তখন লুকোচুরি ফেলে শস্য চুরির কৌশল বদলায়, তারা মাঠে আসে ভোর ভোর আঁধারকালে, দিগন্তবৃত্তের ধূসর নীরবতার ভেতর, নিদ্রায় গ্রামের স্তব্ধতার নীল ছায়া-ছায়া আলোর নির্ঝরে-- মেঘের ভেতর থেকে রোমাঞ্চশিহরিত ঝাঁকে ঝাঁকে বাবুই গ্রামের লোকদের এইসব ফাঁদ নিয়ে উড়ে পালায়।

শস্য চুরি বন্ধে পরাজিত হলে গ্রামের লোকেরা দেখে কত আর শস্য কমেছে মাঠে! কত শস্য আর নিতে পারে পাখির ছোট্ট শরীর! কত আর শস্য কাটবে তারা কুট কুট কুটুস! কত আর ধার পাখির দাঁতে! তথাপি মানুষের রক্তের অন্তর্গত উল্লাসে উন্মাদনায় গ্রামের লোকেরা পাখিদের শাস্তি দিতে নতুন কৌশল পায়। তারা শস্যক্ষেতে বিষ ছড়িয়ে রাখে। পাখিরা জেনেছিল কেবল মানুষের প্রণয়, তারা জেনেছিল প্রণয়ের অভ্যাস, জেনেছিল প্রণয়ের অন্তর্গত করুণ অশ্রু আর লুকোচুরি, লুকোচুরির ফাঁদ, লুকোচুরির আনন্দ। প্রণয় ফুললতাপাতা ফসলের রং অনুকরণমাত্র নয় যে রেশমি পালকে সে শিল্প সূচিত করে,-- এ বরং পাখিদেরই কল্পনার দৃশ্য, তারই স্বরূপচিত্রিত পুরস্কার। প্রণয়ে আনন্দ; যা আনন্দ পায়ে পায়ে শিশিরের অনুভূতি কান্তিময় ছিল, শস্যের অনুভূতি প্রণয়ে নিহিত তবে পাখিরা প্রণয়ের খোঁজে কোন শীতকালে ঢুকেছে, কোন বসন্তকালে গান তুলেছে, কোন শরৎকালে উড়েছে নীলিমায়, উড়েছে সভ্যতার কত কত পথে, পাখায় সমুদ্রের জলজ গন্ধ নিয়ে এসেছে কত কত স্মৃতির জ্যোতির্ময়ে; তবে পাখিরা আর কোথায় যাবে প্রণয়ে, কতদূর উড়বে তারা মহাদেশ, সমুদ্রের জলজ গন্ধ আর নদী আর আকাশের সন্ধানে-- তা যেন এই নদীমাতৃকের সংগ্রাম-- এই তবে যে প্রভাতের লুব্ধ দিনলিপিচিহ্নিত নদীর মানচিত্রে একদিন মানুষের প্রণয়ের অর্থ ও লুকোচুরির আনন্দ না বুঝে সহস্র পাখি সূর্যজরাগ্রস্ত ফোঁটা ফোঁটা লাল রৌদ্রে বিষ পানে শিহরিত মৃত্যুর ভেতর লুটিয়ে পড়ে।

পাখিদের মৃত্যু হলে মোহাম্মদ সিতাব কাঁদে। নিঃশব্দে। নৈঃশব্দ্য কি সংক্রামক? তার বউ কাঁদে। নিঃশব্দে। তার সন্তানেরা কাঁদে। নিঃশব্দে। দিগন্তপ্রান্তের ধূসরতার ভেতর তাদের বাড়িটি মিশে থাকে। নিঃশব্দে। যেন অসীম শূন্যে মৃদু দুলছে তাদের সকল নিঃশব্দ। আর আঁধার জোনাকিরা নিশ্চুপ।

গোধূলিধূসর আঁধারের ভেতর কতদূর নিঃশব্দে কতদূর ভয়ে কতদূর শূন্যতা নিয়ে একটা একটা পাখি কতদূর নক্ষত্র চিনে কত কত দূরদেশ উড়ে আসে মোহাম্মদ সিতাবের জোড়াতালিমারা কোটের পকেটে। পাখিদের ফেরা এতক্ষণে মোহাম্মদ সিতাবের নিঃশব্দ কান্না বিড়বিড় ধ্বনিতে রূপান্তরিত হলে লতাগুল্ম ঝোপে কোথাও একটা দুটো জোনাকি জ্বলে ওঠে। মোহাম্মদ সিতাব লতাগুল্ম ঝোপের পায়ের কাছে বসে, পুনরায় তার বিড়বিড় এবং তা যেন বদনার কোরাস সংগীত। তার বউ বলে তার স্বামীর বিড়বিড় কোরাস এবং জোনাকিঝিলমিল চিনে সেরাতে ফিরে আসে অনেক অনেক ক্লান্ত মুমূর্ষু পাখি। মোহাম্মদ সিতাব সরারাত জোনাকিঝিলমিল নিয়ে পাখিদের আগমনের প্রতীক্ষায় জেগে বসে থাকে লতাগুল্ম ঝোপের পায়ের কাছে। প্রতীক্ষার ভেতর তার তন্দ্রা তাই বলে এমন তা ঘুম নয় দূরে কোথাও টুইটুউ টিউট একটা ধ্বনির মৃদু অনুভব তার রক্তকে চঞ্চল করে। এবং সে তো মিথ্যা নয় আঁধারে রাতের নিদ্রিত মেঘের অনুভব এমন কী নিদারুণ যে পাখিদের গানের রাজ্য শেষ হয় না। সেই টিউট টুইটুউ টিউট নির্দয় বেদনার লয়েরই রকমফের বটে, মোহাম্মদ সিতাবের তন্দ্রার ভেতর উড়ে আসে এমন একটা একটা বাবুই।

অতঃপর গ্রামের লোকেরা দেখে এত এত পাখির মৃত্যুর পরও মোহাম্মদ সিতাবের করতলের ভেতর পাখিরা প্রভাত নির্মাণ করে। গ্রামের লোকেরা তখন পদচিহ্নচিত্রিত পথের ধূলির উপর আসে, তারা মোহাম্মদ সিতাবকে বলে পাখি ধরে দিতে; তারা বলে যত পাখি তত তবে মাংসের যোগ্য এবং পাখিরা হয়ত গ্রামের লোকদের উচ্চারিত এইসব বাক্য শোনে, তারা এইসব বাক্যের অর্থ উপলব্ধি করতে পারে বা পারে না, তারা হয়ত তাদের আকাশচিত্রিত হৃদয়ে স্মৃতির ভেতর ভাইবোন মাবাবা বন্ধু হত্যার দৃশ্য দেখে, স্বপ্ন হত্যার দৃশ্য দেখে, বাক্য হত্যার দৃশ্য দেখে, ঘুম হত্যার দৃশ্য দেখে, বিকেল হত্যার দৃশ্য দেখে, গ্রাম হত্যার দৃশ্য দেখে, দেশ হত্যার দৃশ্য দেখে, গৃহ হত্যার দৃশ্য দেখে, চাঁদ হত্যার দৃশ্য দেখে, অতীত হত্যার দৃশ্য দেখে, স্মৃতি হত্যার দৃশ্য দেখে, শিশু হত্যার দৃশ্য দেখে, সবুজ হত্যার দৃশ্য দেখে, পা ও পথ হত্যার দৃশ্য দেখে, বনস্থলি হত্যার দৃশ্য দেখে, আকাশ হত্যার দৃশ্য দেখে, নদী হত্যার দৃশ্য দেখে-- এইসব বিবিধ হত্যাদৃশ্যের ভেতর গ্রামের লোকেরা হত্যা নিয়ে লোফালুফি করলে পাখিরা মোহাম্মদ সিতাবের করতলের ভেতর প্রভাত সূর্যালোকে হারিয়ে যায়।

পাখি না পেয়ে গ্রামের লোকেরা ফিরে যায় পুনরায় প্রত্যাবর্তনের বাক্যে। মোহাম্মদ সিতাব আর তার বউ আর তার সন্তানদের ভয় কীভাবে তারা পাখিদের রক্ষা করবে। তার সন্তানেরা বিদ্যালয়ে গেলে পথের ধূলির ভেতর গ্রামের লোকেরা তাদের বিবিধ ভয় দেখালে তারা নিশ্চুপ; কেউ তাদের ধাক্কা দেয়, কেউ তাদের পাঠ্যপুস্তক ছুঁড়ে ফেলে ধূলির ভেতর। তখন তারা পাঠ্যপুস্তক হারিয়ে। তখন তারা বাক্য হারিয়ে। তখন তারা নিঃস্ব বোধে ভয়। এবং এখন তারা নিঃস্ব কান্নায় ব্যাকুলতর এবং বিদ্যালয় হারিয়ে গৃহে ফেরে। মোহাম্মদ সিতাব আর তার বউ সন্তানদের বিদ্যালয় হারানো গেলে কীভাবে তারা গৃহের বাইরে যাবে, কীরূপে তারা বাক্যের ভেতর প্রবেশ করবে? ক্রমেই তাদের সকল ইচ্ছা গৃহবন্দি। তাদের সকল পাখি গৃহবন্দি। তাদের সকল বাক্য গৃহবন্দি। কিন্তু একদিন তাদের বাইরে যেতে হয়; এবং মোহাম্মদ সিতাবের বউ বলে জোড়াতালিমারা কোট খুলে রেখে যেতে, তাহলে তাকে হয়ত কেউ চিনবে না, তাকে হয়ত কেউ লক্ষ করবে না। বউয়ের পরামর্শে সে জোড়াতালিমারা কোট গৃহপ্রাঙ্গণে পেয়ারা গাছের ডালে ঝুলিয়ে গ্রামের হাটে যায়। হয়ত সে যায় কেরসিন অথবা লবণ আনতে। হয়ত সে যায় মানুষের হৃদয়ের অন্তর্গত মুক্তির আকাঙ্ক্ষায়। বৃক্ষের আড়ালে আড়ালে হেঁটে মোহাম্মদ সিতাব মাঠের শস্যগন্ধদৃশ্যাবলির ভেতর নেমে এলে গ্রামের লোকেরা তাকে দেখে না, তখন হয়ত তারা মোহাম্মদ সিতাবের বাড়ির দিকে যায় এবং তারা পদচিহ্নচিত্রিত ধূলি উড়িয়ে শস্যরেণুর স্পর্শের ভেতর মোহাম্মদ সিতাবের গৃহপ্রাঙ্গণে উঁকি দিলে দেখে বাড়িটি পড়ে আছে শূন্য-- কোনো পাখির ছায়া নেই। দেখে বাড়িটি পড়ে আছে কণ্ঠরুদ্ধ নিঃশব্দে-- গান মরে গেছে আর পেয়ারা ডালে ঝুলছে মোহাম্মদ সিতাবের জোড়াতালিমারা কোট। তারা তবে কেউ কোটটি দখলে পেতে চায়, তবে তারা কেউ বলে মোহাম্মদ সিতাব তো কখনো কোট ছাড়া কোথাও-- তবে কি সে হারিয়ে গেছে, তবে কি সে লুকিয়ে গেছে, তবে কি সে গ্রামের লোকদের চোখ ফাঁকি দিয়ে গেছে। সহসা তারা যেন মোহাম্মদ সিতাবের চালাকি ধরে ফেলে এবং তারা কোটটি পেয়ারা গাছের ডাল থেকে নিয়ে আসে।

গ্রামের লোকেরা দেখে কোটের ভেতর এত অতীত জমেছে যে, এত জলজ গন্ধ জমেছে যে, এত ঘাম জমেছে যে, এত আকাশ জমেছে যে, এত নদী জমেছে যে তারা কোটের পকেটে উঁকি দিতে কাণ্ডজ্ঞান লুপ্ত। তথায় অতীতের ভেতর পড়ে আছে মৃত জোনাকির একটা-দুটো। এসব মৃত জোনাকিকঙ্কাল দিয়ে তারা কী করবে-- প্রয়োজন তাদের পাখি। গ্রামের লোকেরা কেউ বলে ঘুণে ধরা কোট অতীতের ক্লিশে সমাচার-- তবে পুড়িয়ে দেয়াই কর্তব্য। কেউ বলে এ পুরোনো ছেঁড়া কোটই নিছক, এ এক দর্শন অদ্ভুত বটে-- তবে হত্যা করা হোক। কেউ বলে গ্রামের একমাত্র হেরিটেজ এ এক-- ধুলো আর রোগজীবানু ভরা। এসব বাক্যে বিলাসিতা হয়ত বা সূক্ষ্ম পরিহাস হলে জীবনের ব্যাকুলতর স্বাদগন্ধ মস্তিষ্কের গোপন কোষে ছড়িয়ে পড়ে এবং গ্রামের লোকেরা সিদ্ধান্তহীনতা ও পরস্পর রক্তের ভেতর নিঃসঙ্কোচ সন্দেহ ঈর্ষা এবং দুর্বিসহ লোভের স্ফুলিঙ্গে পুড়তে পুড়তে বিভ্রান্ত। পরস্পর নির্বিচারে আপাদমস্তক মুখোমুখি-- বীভৎস গর্দান, দুর্গন্ধময় দাঁতাল ও অনির্বচনীয় হিমশীতল ঘোলাটে চোখে একে অপরের দিকে তাকায় নিঃশব্দে। আর মানসিক উত্তেজনা ভেতরে ভেতরে পর্যুদস্ত করে তাদের, যেন শীতার্ত রাত্রির গভীর নিস্তব্ধতা; নীরব নির্মম আত্মনিয়ন্ত্রণহীন ক্ষমতার নিষ্ঠুর আঁচড় অজান্তে আশ্চর্য দুঃসাহসী এক-একটা অব্যক্ত গোপন বাক্যের ফিসফিস উসকে ওঠে তাদের রক্তের ভেতর। সকলেই অনড়। পোড়া কুণ্ডলিত কালো রক্তস্তূপের মতো জোড়াতালিমারা কোট শস্যক্ষেতের ভেতর ফেলে রেখে তারা প্রতীক্ষায়। তারা জানে চলে যাওয়া মানেই ভয়াবহ ও শোচনীয় পরাজয়, জ্বলেপুড়ে খাক হয়ে যাওয়া; চাপচাপ রক্ত মাড়িয়ে অনাহূত ভয়ঙ্কর সব বিপ্লব-- তারপরই পুনরায় খুন, খুনের মরীমড়ক, হত্যার অন্ধ প্রতিযোগিতা। অতঃপর একজন প্রতীক্ষার স্তব্ধতা চুরমার করে। সে আচমকা মৃত্যুদূতের মরিয়ায় কোট নিয়ে দৌড়ে পালায়। কিন্তু কতদূর সে যাবে-- একাকী মানুষ কতদূর যেতে পারে মৃত্যুর ভেতর। একাকী মানুষ কতদূর যেতে পারে আনন্দে। কতদূর জীবনে। কতদূর আকাশে। গ্রামের লোকেরা সম্ভবত এই পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত ছিল, তারা ধাবমান শিকারী চিতার ক্ষিপ্র মুহূর্তে তাকে ছোঁয়, এবং গ্রামের লোকেরা দেখে তাদের নখরাঘাতে তাদের টানাহেঁচড়ায় শস্যহীন ধূসর পরিত্যক্ত চৌচির মাঠে ভাঙা কুচি কুচি টুকরো টুকরো কোট পড়ে আছে-- প্রাণহীন, মৃত। রোদ নিভে গেছে। মেঘ সরে গেছে। গান সে ভেসে গেছে।

কিন্তু হেমন্তবিকেলের শরীরে যেন ময়ূরকণ্ঠের বিস্ময় ছিল গ্রামের লোকদের, কেননা তারা দেখে পরদিন মোহাম্মদ সিতাবের করতলে শস্যকণা খুঁটে খুঁটে উৎফুল্ল পাখিরা প্রভাত নির্মাণে। আর মোহাম্মদ সিতাব জোড়াতালিমারা কোটের পকেট থেকে পদচিহ্নচিত্রিত পথের উপর ছড়িয়ে দেয় তার বিড়বিড় সুর। গ্রামের লোকেরা বিস্ময়ে অথবা কেউ বলে অজানা দুর্জ্ঞেয় ভীতিবোধে, এই প্রথম তাদের ভয়, হয়তা বা তা নয়, কেউ বলে নিয়তিতাড়িত অনিবার্য আকর্ষণে তারা মাঠের ধূলি উড়িয়ে দৌড়ে আসে মোহাম্মদ সিতাবের দিকে। গ্রামের লোকদের এভাবে দৌড়ে এলে আলাভোলা ব্যাক্কল মোহাম্মদ সিতাব অবশ্যম্ভাবী ভয়ে, কিন্তু যদিও গ্রামের লোকেরা নতুন এক বিস্ময়ের ঘোরের মধ্যে নিপতিত হয়, তারা দেখে মোহাম্মদ সিতাবও দৌড়ে চলেছে এবং পদচিহ্নচিত্রিত ধূলিমেঘে চারদিক আচ্ছন্ন হয়ে গেলে হাজার হাজার পাখি উড়াল দেয় দূরের আকাশ পথে আর মোহাম্মদ সিতাব আচ্ছন্ন ধূলিমেঘের ভেতর দৌড়াতে দৌড়াতে দৌড়াতে শূন্যে উঠে যায় এবং সে ডানা ছড়িয়ে উড়তে থাকে উড়তে থাকে উড়তে থাকে উঁচুতে উঁচুতে উঁচুতে। গ্রামের লোকেরা তখন দেখে মোহাম্মদ সিতাবের শরীর উড়ালের ভেতর ছোট হতে হতে একটি মৃদু পাখির আত্মায় রূপান্তরিত হয়ে হারায় উড়ালে উড়ালে পাখিমেঘের নিরুদ্দেশে।

জোড়াতালিমারা কোট হারিয়ে মোহাম্মদ সিতাব হারিয়ে যায়; অথবা মোহাম্মদ সিতাব হারিয়ে ফেলে তার নাম, তার আয়ু, তার প্রপিতা, তার ভবিষ্যৎ, তার গৃহ, তার গ্রাম, তার আকাশ, তার সমুদ্র, তার দেশ। তখন সে নামপরিচয় শূন্যতায় গেলে গ্রামের লোকেরা বলে হয়ত সে তার বউকে পেয়ারা ডালে ঝুলিয়ে রাখা জোড়াতালিমারা কোট হারিয়ে দোষারোপ করে, বকাবাদ্য করে, রাগে হয়ত বা দুঃখে বৃক্ষের শুকনো ডাল নিয়ে তেড়ে যায় মারতে। তার বউ বলে ছেঁড়া কোট তাদের কপাল পুড়িয়েছে, হারিয়ে ভালো হয়েছে। তখন কোট হারিয়ে ভালো অথবা মন্দ, তারা এই দ্বিধায় পড়ে এবং তাদের গৃহ প্রাঙ্গণে অনেক অনেক অতীতের ভেতর লুকানো এমন গন্ধ আর ছায়াসম্পাত দেখে। তারা দেখে এই গন্ধ তাদের চেনা, এই ছায়া তাদের চেনা, ছায়াগন্ধের হৃদয়ে গোপন সুর তাদের কণ্ঠে সুপ্ত। তারা দেখে বিস্ময় যে গোধূলিধূসর জোনাকিঝিলমিলের ভেতর পাখিরা বয়ে নিয়ে আসে ভাঙা ভাঙা কুচি কুচি টুকরো টুকরো কোট। তখন তারা শোক ভুলে তারা বেদনা ভুলে দ্বিধা ভুলে খুশি পায় আনন্দ পায়। আনন্দে তারা সারারাত কোটের ভাঙা টুকরো কুচি কুচি টুকরো ছেঁড়া ছেঁড়া টুকরো সেলাই করে এবং গ্রামের লোকেরা গভীর রাতে গোপন জিঘাংসায় শস্যরেণু মাড়িয়ে শিশিরের ভেতর মোহাম্মদ সিতাবের খড়ের সোনালি গৃহ অভিমুখে এলে দেখে মোহাম্মদ সিতাবের বাড়ির কোনো প্রবেশদরজা নেই, কোনো জানালা নেই। গ্রামের লোকেরা প্রবল গোলকধাঁধাঁয় পড়ে। দরজা না থাকলে, জানালা না থাকলে তারা কীভাবে প্রবেশ করে গৃহে! কীভাবে যায় গৃহের বাইরে! কীভাবে যায় শস্যক্ষেতে! কীভাবে যায় বিদ্যালয়ে! এমন তবে অদ্ভুত এরূপ গৃহে প্রবেশের চেষ্টায় তারা দেখে কেবল অন্ধকার; তারা দেখে এবং তাদের বিস্ময় যে মোহাম্মদ সিতাবের গৃহের প্রবেশ ও বাহির পথ ঊর্ধ্বমুখী আকাশমণ্ডলের নক্ষত্রলোকে প্রবাহিত। গ্রামের লোকেরা আকাশপ্রবাহী ঊর্ধ্বমুখী প্রবেশ ও বাহির পথের দিকে তাকিয়ে দেখে যে সেই পথে গ্রামের দিগন্তঅভিসারী মাঠের মধ্যে সকলের অযত্নে অবহেলায় বেড়ে ওঠা সারি সারি তালগাছ। তারা দেখে তালগাছের মজবুত শক্ত ও পুরু পাতায় পাতায় বাতাসে দুলছে বাবুইয়ের অগণিত সোনালি বাসা। ওইসব খড়ের সোনালি বাসায় বাতাসের সুর আর দুলে দুলে জ্বলেনেভে ঝাঁকে ঝাঁকে জোনাকি। গ্রামের লোকদের মনে হয় কোট হারিয়ে বাবুইয়ের বাসার ভেতর জোনাকিঝিলমিল তাদের গ্রামের সকল আঁধার অপসারিত হয়ে যাচ্ছে ক্রমেই অসংখ্য নক্ষত্রের ঝিকমিকে।