আগুনের করতালি

ফেরদৌস নাহার ও সুমী সিকানদার


ফেরদৌস নাহার

আগুনের করতালি

ক.

ও আমার বাচ্চা বয়সের ভুল
টেনে নিয়ে আসি তারে এই-বয়সের সন্ধিক্ষণে
কী তার নাম দেবো ভাবি
হয়রান লাগে
মনে হয় ফেলে দেই, তাও
সাথে সাথে চলে। এতকাল পর
জানি না কোন নতুন ইচ্ছায়
এলোমেলো লাগে
আগুনের আঁচে

টিনের বাক্সে জমানো পয়সারা
দোকানের দিকে যাত্রা করে
বাঁধা দিলেও মানবে না জানি
তারা এখন বিনিময় হতে চায় সাধ্যমতো
পা থেকে মাথা পর্যন্ত
বাদ্য বাজাও
খুব বাদ্য বাজাও প্রিয় ধ্বনি
করো না খুব দেরী
পশ্চিমে যাব বলে নিয়েছি প্রস্তুতি
অচেনা লাগতে পারে
চেনা হলেও ক্ষতি নেই
বাজে নিরবিচ্ছিন অন্তহীন দ্রিমি
এশব্দ শুনেছিলাম বাচ্চা বয়সের প্রান্তসীমায় যেদিন
সেদিনই জেনেছিলাম, যেদিকেই তাকাবো
আগুন লেগে যাবে তক্ষুণি

খ.

ঠিক এভাবেই
মৃতদের পোশাক থেকে বোতাম খুলে
জীবিতের বন্ধন গড়ি
ভুল পথে হেঁটে হেঁটে ক্লান্ত হলে জন্মান্ধ গৃহে ফিরি
ডাক দিও না পাখি
অরুণ ভোরের সাথী
তোমাদের ডাকে আছে পরোক্ষ অশান্ত কোনো নদী

বিনুনি খুলতে খুলতে পরিয়েছ মায়ার ফসল
যাবতীয় স্বপ্নদৃশ্য নগর
মাঝখানে করতালি
বয়স-বিতান রোজ বিক্রি করছে
রংহীন রং মাখা বরফের কোট
শোকান্ধ স্যুভেনির চোখ

গ.

খুলে ফেল শরীর সংগীত গত জন্মের ব্যথা
মনে পড়া নিয়ে কোনো কৌশল নয় কেবলি
মনোরোগ নিয়মিত খেলা

নদী মেখলা
পাখি হলে অন্য কথা, হাসপাতাল ব্যথিত বালক


পুড়ে যাবার গান ধরে অযাচিত নিঃসঙ্গ আদল

তুমি দূরে বসে, কখনো শুয়ে শুয়ে গান শোনো
বোঝো না মানে তবু ওই গান শোনো রোজ
নক্সার মতো করে সাজিয়েছ ক্ষরণের ভাষা
বলেছ, ধারালো ছুরিতে গাঁথি শিষ

খুনের বিপরীতে আনকোরা আনমনা শোক
উদ্বাস্তু দিন শেষে শামুকের আবরণ-প্রহর
মুছে গেলে পিছুটান অবনত হয় সন্দেহ


====================================================

সুমী সিকানদার

না পুরব না পশ্চিম

দোসর এক আয়োজন করা ভুলের পান্ডুলিপি। আপাত বিপরীত এই প্রয়াসেই একসাথে নামে নির্বাচিত সত্য মিথ্যে। এ কোন স্পর্ধা নয় বরং অভিমান। ভুল কবেকার সে নিজে তার বয়স জানে না। উ সকে দেয়া আগুনের মত বেদিশা জ্বলতে থাকা টানাপোড়েনের উপর আস্থা চলে না। তবু আঁচে থাকে মনে রাখার যাবতীয় আয়োজন। দিন তারিখ মেনে নেয়া এক রকমের মুখরতা।

আমি মন্থর হতে ভালবাসি। ভালোবেসে মন্থর হই লাজুক শামুক ।

যেদিনটি গতকাল পেরিয়ে গেছি তার ভুলসমগ্রকে মানা না মানার ধার ধারে না ফায়ারপ্লেস। কোথাও গিয়ে নিজের কিছু কিছু ভুল ভালোবেসে ফেলাই সারাৎসার। কবুতরের ওমে রয়ে যায় সে আলগোছে আড়ালে তীব্র প্রেমে।

পূরব ছেড়ে আসার আগে আগে ভ্যানে তুলে দেয়া মালসামানের সাথে রওনা করে তেলচিটচিটে ক্যাম্বিসের ব্যাগ। তাতে উপচে থাকা আঁকার সরঞ্জমাদি , না আঁকারও। পশ্চিম সে আমার নতুন নাম. কখনো প্রদর্শনের অপেক্ষায় ঝুলে থাকা নৃত্যরস ভঙ্গিমা। কারো মুখায়ব আঁকার শেষে উড়ে গেছে প্রাণপ্রিয় চোখ তুলির অবসরে। সাজানো নৌকা চরিত্রগুলোকে নিতে এসেছে পরবর্তী মঞ্চায়নের তাগিদে।

নদীর চারপাশের বাতাসেরা লুটিয়ে পরে উপনিষদের পায়ে। আমি তেরসা হাওয়া লুকাই। কন্ঠে তুলে নেয়া নয়াদ্রিমি’তে আবিষ্ট হয়ে যাই। নাম সমেত ভুলে যাই উল্কি করা অচেনা টারকয়েজ স্কেচ।
জীবন তার যে কোন রঙ্গেই বাজে , ধীরে ধীরে একে একে বাড়তে থাকে ধাঁধা। শীতল করে আসা রঙ সম্বিত ফিরে পায় চাপা হাসির কোলাহলে। আমি তারে ভালোবাসি আপামর শব্দে এবং শব্দহীনতায়ও। লাল জ্যামিতিবক্সের লুকিয়ে রাখা চিরকুটগুলো স্পর্শ করে ফের লুকিয়ে রাখাও যে প্রেম তা এক পারদ জানে। পারদ প্রয়োজনে ওঠে প্রয়োজনে নামে।

মৃতের পোশাক নামের যে অধ্যায় কড়া নাড়ে তাকে অগ্রাহ্য করার কোন লিখিত নিয়ম নেই। আমি হাসিমুখে দামি কাচপুরি বোতাম খুলে রাখি জীবিত তার নামে। একমাত্র নামই একযোগে জীবিত এবং মৃত দুইবাড়িতেই অনায়াস আসন গ্রহণ করে ।

বেলা করে অভিমানে থেকে যাই লগ্ন ভ্রষ্ট আলোর হাতছানিতে। আমার সাথে সবার স্পর্শ সরে সরে যেতে যেতে শুধু হাতে এসে থাকে সুক্ষ্ম কারুকাজ বোতাম । তাকে খুলে রাখি কিম্বা বন্ধ, সে আমার একার আঙ্গুল , একনিষ্ঠ কনি ষ্ঠা ।
রঙ্গহীনেরা যে তীব্র শীতল আঁকড়ে ধরে তা বসন্তের চেরি বৃষ্টির সাথে পেরে ওঠে না। থিতু হয়ে থাকা চোখে ফের উছলে ওঠে ।

নদী যেন মনের গোছানো এক মনোলোগ । স্পষ্ট ভাবনা স্থির সম্বোধন। কিন্তু পাখি আবার ভিন্ন রকম। তাকে বেঁধে রাখার ভাবনা নেই , উড়ে গেলেও হতাশা নেই। সে হামিংবার্ড হোক কিম্বা বুলবুলি।

পিছুটান যেমন এক সমুদ্র মায়া । ডাক নামে ডাকে আবার সন্দেহ ঘিরে থাকে। মিথ্যাসহ পোশাক বদলে নিও ফের মিথ্যে করে ভালোবাসতে চাইলে। পাতার পর পাতা মিথ্যে মিথ্যে ভালবাসা শুনতে বড় ভালোলাগে । সত্যি করে এত আকঁড়ে ধরা ইশারা তোমার পাইনি তখনও।

সম্পর্ক নিজের মত করে দাঁড় করায় খাড়াবাটখাড়ায়। তাকে অগ্রাহ্য করে মনের ভেতর থেকে যে ডাক আমি পেতে চাই। তা বরাবর হেলে যাওয়া ভঙ্গিমায় শীতল উড়ে যায়।
চেনা শামুক খেই পায় না। শামুক তার ভাবনার অধিক ভাবনায় পৌঁছায়। মন্থরতার দোহাই দিয়ে অন্যমস্কক হয়ে আসা অপরাহ্ণকে সুযোগ না দিয়েই বদলে দেবে গতিপ্রকৃতি। ছেঁড়াদ্বীপ কখনও ছেঁড়া তো নয়। প্রহরের কমলা রঙ বদলায় চোখের প’রে। শামুকের আবরণ তোমার আমার কোন নির্দিষ্ট প্রহর জানে না।

যা কিছু আমি ভাবতে পারি কিম্বা না পারি তাতে তুমুল বাদানুবাদে পরে না আগুনের নম্র আলোর আঁচ কিম্বা গলতে থাকা কাচ। তারা স্বতঃস্ফূর্ত ধাবন্ত । সৃষ্টি শীলতার নামই মেটাফোর । আমরা টের পাই না অনেক অনেক দৃশ্য যা প্রতিদিন ঘটে কিন্তু আমাদের চোখ থেকে সরে সরে থাকে চুপচাপ। লুকানো লালজ্যামিতিকাল ,টিফিনব্রেক, স্যাকারিন দেয়া আইসক্রিম গলা সবুজাভ জিভ সব মিলিয়ে গেছে চারআনা সিকিতে। ইশ পূরবে তুমি ছিলে না পশ্চিমেও না। অনুচ্চারিত কথারাই জীবনকে ঘিরে রাখা খোলা হাওয়ার কীর্তনিয়া । খানিকটা ক্রোধ আর অনেকটা প্রেম এক মুদ্রার দ্বৈত সহাবস্থান।