দ্বৈতা

প্রগতি বৈরাগী ও তন্ময় ভট্টাচার্য


প্রগতি বৈরাগী


দ্বৈতা

কী বিচ্ছিরি আতান্তর!

হাড়মজ্জা থেকে ওঠে গরম বাতাস
বজ্রকশিলায় যেন পরিপুষ্ট সূর্য রাখা আছে
আর তার চারিদিক ঢালু
আর তার মধ‍্য দিয়ে, সূক্ষ্মতম ছিদ্র থেকে
উঠে আসছে অনন‍্যজাতিকা
লম্বাটে গড়ন এক ক্রিস্টালের পথ
যেন মৃদু সন্ধ্যাবেলা
রম‍্যরচনার মতো কফিগন্ধী শহরের স্ট্রিটে

স্বভাবে প্রকৃতিসিদ্ধা,
দাসানুদাসের ঢঙে বাতাসপুরুষ
তার খোলা চুলে চোখ ডুবিয়েছে
সড়সড় সরে যাচ্ছে নীলাভ বাদামী ঢেউ
কুহক প্রহরে, বাসা বাঁধছে মধুটুসি পাখি

আমি ওকে রাখতে পারছি না
আমি ওকে ধরাতে পারবো না এই
গাণিতিক গৃহপট, প্রাত‍্যহিক বাঘবন্দি,
অনাবাসী রত্নবটুয়ায়...
দীর্ঘতম হেলা করতে গিয়ে
ওকে আমি ভয় পাচ্ছি আখরি দমতক্

মেঘজল নেমে আসছে
অগোছালো সাদা সিঁথিটিতে
ভিজে যাচ্ছে পথঘাট, পাতাঝাঁঝি,
ছলাৎ কিশোর মাখা ধানের হৃদয়
আঙুলের শাড়ি তুলে, খানাখন্দ পার হয়ে
গুহাচিত্র বাঁচিয়ে সে চলে যাচ্ছে খোয়াইয়ের দিকে
যেন স্নিগ্ধ, দূরতম মৃদঙ্গ আওয়াজ...
ওর পিছু পিছু, হুল্লোড় কর, উড়ে যাচ্ছে
শহরের সব ফুটপাত – বিকেলের বালকের মতো
আঁচলের কোণটুকু ঝমঝম বেজে যাচ্ছে
বালকের মোহনমুঠিতে

আমি ওকে ঘেন্না করছি
ভেবে নিচ্ছি – 'শালি, দু-নম্বরি'
আমার গহীনে তাও, অবরোহে ফিকে হচ্ছে
এতদিন প্রতিষ্ঠিত লৌকিক দাগ
এরকম চলতে থাকলে, আদ‍্যন্ত সর্বনাশ
সব নষ্ট‌ হয়ে যাবে – পার্থিব চিক্কন আর
বহুযত্নে বুনে তোলা স্বর্ণতন্তু ঘর

আগুপিছু চেষ্টা করছি, চেপেচুপে ঢেকে ফেলতে
হাতে দিচ্ছি লোভনীয় হীরক অঙ্গুরী
আমি তবু খুলে যাচ্ছি
গ্রীষ্মমাসে খসখসে জ‍্যাকেটের মতো
বিশ্বাসহন্ত্রী হয়ে দেহশূন্য, স্মৃতিশূন্য আমি
ধারণ করছি তাকে –
এ তো সেই শানিত আধার,
এ তো সেই ত্রাণ, যাকে জানিনি কক্ষনো

আমরা দুজনে মিলে খেলকাব‍্য লিখে ফেলছি
শালকাঠ বেঞ্চিতে, ধোঁয়াওঠা চায়ের দোকানে
একগ্রাসে খেয়ে ফেলছি
ঘটনাফুচকাবলি, ঝালটক তিতকুটে স্বাদ
ছোটগল্প মেখে ফেলছি শশা, ছোলা, চানাচুর দিয়ে
এদিকওদিক হেসে, দর কষছি মাছের বাজারে

আমরা দুজনে মিলে
প্রতিশব্দ হয়ে যাচ্ছি
খেলা করছি অক্ষরের মাঠে


লোভ বলতে যতটুকু বুঝি...

আমার ভিতরে এক সপ্তাশ্ববাহিত রথ
বহুবর্ণমণ্ডিত দরজা-কপাট

লেগে থাকি ইঁদুরের মতো –
রক্তঘাম মেখে

প্রবেশ করলে দেখি
বিস্তীর্ণ শুয়ে আছে

ছাইভস্ম
মড়কের মাঠ...



মালাকর

প্রকৃ্ত প্রস্তাবে আমার প্রেমিক বড় বোকা
আর আর কবিদেরই মতো –
বারবার ভুল করে রমণী ও ফুলে
এত যে বারণ করি, তবু বেশ জানি,
ব্যালকনিপথে পোড়াচোখে ঠিকদেখে
প্রতিবেশী নারীটির নরম দু’হাত
অমনি কবিতা থেকে ঝাঁপায় মৃণালভুজ
কলমের ডগা বেয়ে আঙুল চম্পক

রিক্সায় চলে যায় তরল কিশোরী যত
এক বেণী দুই বেণী, ঢেউ তুলে দিয়ে
কবি তাতে ভেসে চলে, আঁজলায় ঘ্রাণ নেয়
মুঠোয়, পকেটে রাখে কচি পারিজাত

আমিও তো দেহ ছুঁয়ে আকাঙ্খার বীজ বুনি
গলে যাই বাহুডোরে, বালকের বুকের ভিতরে
এত যে নরম হই, বৃন্ত ছুঁয়ে রোহিণীবিলাস
তবুও পুষ্পগাছ হতে যে পারিনি!

কবির অবাধগতি কবিতার ডালিটিকে নিয়ে,
মোহময় মালাকর ফুল তোলে বাগানে বাগানে
শরীরে নরম বাস, সারারাত আমি ঘ্রাণ পাই
ভরা শীতে গোলাপ আর বর্ষায় কদম্বজুঁই
নিঃশ্বাস তুলে রাখি, অপেক্ষা – তাও তোলা থাকে
পুষ্পবন দেখে-দেখে একদিন যুবকের চোখ গলে যাবে
পদ্মপলাশদুটি মাটি থেকে তুলে বিবাহআঙুলে গেঁথে নেব

অন্ধ তাকে শয্যামধ্যে সোহাগে জড়িয়ে
কিছুদিন দয়াবতী ক্যাকটাস হব।



=================================================

তন্ময় ভট্টাচার্য

উদাসীন সতর্কতা

দ্যাখো – এক বৃক্ষ থেকে আরেক বৃক্ষের দিকে যেতে যেতে তোমার পা থেকে খসে গেল শিকড়, অনন্ত এক অসম্ভবের মধ্যে দিয়ে উড়ে চলেছ শুধুমাত্র সহজ হবে বলে। জন্মলগ্নে যারা কাজল দিয়েছিল, সেইসব আঙুলের খোঁজে এতদিন রাত জেগেছ অনেক। এবার শুধু ভোর, শুধুই উদ্ভাসের দিকে তাকিয়ে মনে-মনে বলা – ‘পেরেছি’। জানো, পারোনি। কিন্তু পারতে চাওয়ার ইচ্ছে তোমাকে বসন করে তুলছে, একসময় খুলে ফেলবে আর নগ্ন বুকে মেখে নেবে একটুকরো জিভ। ওটুকুই মায়া, যা তোমার হয়ে ওঠার বিপক্ষে এনে দাঁড় করাচ্ছে ঈর্ষাকাতর এক পাখিকে – সহজ হতে চাইছ বলে ভেবে নিল আকাশ ছোট হয়ে যাবে। হাসো। তার ভুরু স্পর্শ করে বলো – ধনুক নয়, কখনও-কখনও কুঞ্চন তাঁবু হয়েও আসে। ঠোঁটের অলংকরণ থেকে তুলে নাও আফগানি পশম। মাংস – তারও ভিতরে রয়ে গেছে অনুভূতি নামের চেহারা। অক্ষর হোক সব। ওঁ। নাভি থেকে উঠে আসা তরঙ্গ শরীরপথে মিশে যাক অশরীরী সেই কেন্দ্রে। পৌঁছোতে চাইছ বলে সংযমময় এই দিন। জাগরণ তোমাকে ব্যথা দিয়েছে। সুপ্তি দিয়েছে প্রতারণা। আজ থেকে শুরু হোক বিশ্বাসের ভ্রম। সমস্ত ব্যবহার ছাড়িয়ে, পৃথিবী অর্থে এখন শুধুই সমর্পণ আর অপেক্ষা। আমি হও। আমি হই যেন...
অথচ, এই হতে-হতেই তোমার হাতে ফুটে উঠছে অস্ত্র
আশীর্বাদের নামে বসিয়ে দিচ্ছ বুকে, যেন একমাত্র
রক্তই পারে পিছুটান শেষ করতে, তোমার বেয়ে নামা
আর আমার শুষে নেওয়ার মধ্যে লেখা ছিল একটা
গোটা রাত – মরফিন – কবিতার দেশোয়ালি ভুখ্‌ –
শুধু অন্যে কী বলবে তা ভাবতে গিয়ে কেড়ে নিচ্ছ
সম্ভাবনাও, ভেঙে পড়ছে আমরণ জেহাদি শরীর
আর, এভাবেই... না, কেউ মুখ থুবড়ে পড়ছে না। হাত থেকে ছিটকে যাচ্ছে না খুচরো, উঠে দাঁড়াতে গিয়ে পা থরথর করে কাঁপছে না কারোর। অন্ধকে দেখে পঙ্গু নেমে যাচ্ছে পরের স্টেশনে, দিলখুশ উঠল বলে বাদামওয়ালা ছেড়ে দিল আপ শান্তিপুর। আর তুমি, সামনে বৃদ্ধ দাঁড়িয়ে আছেন দেখেও চোখ রাখছ জানলার বাইরে, গুনগুন করে বুঝে নিচ্ছ ঠিক কোথায় অতুলপ্রসাদের জাদু। এভাবে বেশিক্ষণ চলতে পারে না। সটান একটা নখ বিঁধে যাবে তোমার বুকে। হন্তদন্ত হয়ে উঠে দাঁড়াবে, প্রয়োজনে লাফিয়ে নামতে হবে তোমাকে। ফিরে যাও। নিজের নারীটিকে ধরে ঝাঁকাও কয়েকবার। বিহ্বলতা কাটিয়ে, জিজ্ঞেস করো – ‘কেন?’ উত্তরের বদলে, জড়িয়ে ধরা পেতে পারো তুমি। পেতে পারো অকালে ঘনিয়ে তোলা একমুখ শ্রাবণবিকেল। নখের জ্বালা তখন বেড়ে চলেছে উত্তরোত্তর। একসময় বিষিয়ে যাবে। মণিতে চুমু খেয়ে, চোখ উপড়ে নিতে ইচ্ছে করবে তোমার। উঁহু, হাসো। গালে হাত রেখে, শান্ত গলায় বলো – ‘বেশ!’ কেননা, তুমি ভালোমানুষ। তোমার চিৎকার করতে নেই। শুধু, মহৎ একটা ‘বেশ!’ যুধিষ্ঠির হয়ে যাচ্ছ হে! পেছনে কুকুর নিয়ে ওপরে চড়া শুরু হল বলে...
আসলে এভাবেই তুমি আমি হয়ে যাচ্ছি, আমি তুমি। আমরা একসঙ্গে
কোথাও বসার জায়গা পাচ্ছি না, এই ভারাক্রান্ত পৃথিবীতে আর কোনো
পাপ আমাদের ছুঁড়ে ফেলছে না পাতালে। এত ভালো দেখে আজকাল
সন্দেহ হয়। আলাদা আলাদা মুখ নিয়ে আমরা কথা বলছি, খেয়ে উঠে
ধুয়ে ফেলছি সব। আলাদা আলাদা। আমার থেকে, এরই মধ্যে খিস্তি
শিখেছ দারুণ। শেখার পরও, জোরসে লাথ্‌ ঝাড়তে পারছি না কেন!
কারণ, একেকটা রাত্রিবেলা। এখনও বিশ্বাস করতে পারি না, সাইকেলে চাপার বয়স তোমার নেই। একটা লোক এইমাত্র কাঁধে ছিপ ফেলে বাড়ি ফিরে গেল। আজকের মতো আর কিছু ধরবে না লোকটা। আমি তোমার হাত ধরতে চাই। শুকনো পাতার ওপর হঠাৎ-নেমে-আসা বৃষ্টির মতো চাঞ্চল্য দিতে চাই তোমাকে। সবাই ঘুমিয়ে পড়লে, কলকাতা এখনও পঞ্চাশ বছর আগে ফিরে যায়। বন্দুকের নলের পাশে জেগে থাকে ভীরু চোখের উৎসও। এসব ভাবতে ভাবতে এড়িয়ে যাই পথ। আমার ভার নিতে পারে এমন কোনো মানুষ নেই পৃথিবীতে। লম্বালম্বি একটা দাগ – যা সাইকেলেরও হতে পারত, ছড়িয়ে পড়ে শহরজুড়ে। আমি সেই দাগের পায়ে পা ঘষি। জেগে ওঠে শরীর। কলকাতায় থাকতে থাকতে, আভাস ছাড়াও যে কিছু রমণযোগ্য, সে-কথা ভুলে যাই আমি...