বিধবা নারীর সিঁথি

ওবায়েদ আকাশ ও মাহরীন ফেরদৌস

ওবায়েদ আকাশ


বিধবা নারীর সিঁথি

কেউ একজন ঘাসের ওপর বিছিয়ে রেখেছে
বিধবা নারীর সিঁথি
আমি তাতে আঙুল স্পর্শ করতেই
তার তুমুল দাম্পত্য
হঠাৎ ঝাঁপিয়ে পড়ল, বৃষ্টি...

যখন থেকে বৃষ্টির চাষবাস হচ্ছে
প্রভূত কারণে বাংলার বধূরা
বিধবা হতে শুরু করেছে-

তোমাদের খাঁচায় পোষা বৃষ্টি
আপন আপন গৃহে আশ্রয় খুঁজে পেলে
বিধবা হতে আর
প্রেম থেকে পরিণয়ের প্রয়োজন পড়বে না


ভ্রমণ

সমুদ্রে শামুক কুড়াতে যাবে, ভেবো না

জলের ওপর দিয়ে হেঁটে হেঁটে
গৃহে ফিরছে দক্ষিণা প্রেম
আর তাকে পথে পথে আটকে দিচ্ছে
উত্তুরে হাওয়া

হঠাৎ প্রবাল কুড়াতে যাবে, ভেবো না
প্রস্তরেরা একে অপরের গায়ে গড়াতে গড়াতে
এইসব দ্বীপরেখা জেগে উঠেছিল
রাতের অন্ধকারে জ্বলে ওঠা দ্বীপ মাত্রই
সমুদ্রের প্রসিদ্ধ সন্তান

বহুকাল সমুদ্রে গড়ানো শামুক
স্পর্শ পেলেই ভেবে নিও
বালুকা স্পর্শে সমুদ্রটা কেঁপে উঠেছিল


নদীকল্প

উদ্ধারকৃত নদীগুলো প্রহেলিকাময়
গুঞ্জনে উজ্জ্বল
অথচ তাদের বাহু ও মগ্নতা
কিছুতে বিশ্রাম চাইছে না

তাদের দিন বদল
সবুজ ঘাসের মতো বেড়ে উঠেছিল

বরাদ্দকৃত আলো হাওয়ার শীৎকারে
ফুলে ফসলে ভরিয়ে তুলেছিল
দুই পারের দীর্ঘ জনপদ

নবগঠিত জনপদে আজও তো নদীগণ
মাতৃস্বরূপÑ
কামকাতর দেহে ছলাচ্ছল ছলাচ্ছল
নবনির্মাণের ধ্বনি
আমাকে ব্যাকুল বঞ্চিত সুখে ডেকে নিয়ে যায়

চলো যাই নদীদের আদিম বিত্তান্ত শিখি
মিসিসিপি নীলনদের প্রসঙ্গ যৌবনে

================================================


মাহরীন ফেরদৌস

রতি


একটা টকটকে লাল মার্বেল পাথরের কল্কের ওপর রুপালি রঙের ফয়েল পেপার সুনিপুণভাবে মোড়াতে মোড়াতে মামুন বৈশালীর দিকে তাকাল। বৈশালী বিছানায় কাত হয়ে আধ শোয়া হয়ে মুঠোফোনে কী যেন দেখছে। সম্প্রতি সে মাথার চুল কেটে ছোট করে ফেলেছে। হালকা ঢেউ খেলানো চুল ঘাড়ের একটু নিচে। গলার বাঁ পাশে বেশ গাঢ় বাদামি রঙের একটা তিল প্রকটভাবে তাকিয়ে আছে। চোখে সামুদ্রিক নীল লেন্স। ঝকঝকে ধারালো চেহারা। সব মিলিয়ে তাকে দেখতে আজকাল সোফিয়া লরেনের মত লাগছে। অবশ্য মামুন খেয়াল করে দেখেছে একেকবার ওকে দেখতে একেক রকম লাগে। হয়ত ও রূপবদল করতে ভালোবাসে। আড়চোখে দেখতে দেখতে মামুন চারকোলের প্যাকেট থেকে একটি চারকোল বের করল। বৈশালী মুঠোফোন রেখে গায়ের সাদা চাদর ফেলে বিছানা থেকে উঠে দাঁড়াল। তারপর হেঁটে হেঁটে টেবিলের কাছে গেলো। দেখে মনে হল ধবধবে সাদা কোন বক পাখি পাখা ছড়িয়ে নদীর দিকে উড়ে যাচ্ছে। একটা স্বচ্ছ পেয়ালায় অল্প কিছু মার্টিনি ঢেলে গুন গুন করে গান গাইতে গাইতে সারা ঘরময় পায়চারি করতে থাকল।

মামুন বাহারি জারে পানির পরিমাণ দেখে নিলো। মাঝে কারুকাজ করা পাইপ জুড়ে দিলো। কল্কেতে আলাদা স্বাদের জন্য খাঁটি মধু দেওয়া ছিল। এবার সে কল্কের ফয়েল পেপারে পিন দিয়ে ছোট ছোট কিছু ছিদ্র করল। তারপর প্লেটের উপর বসিয়ে দিয়ে চারকোলে আগুন ধরাল। বৈশালী তখনও গুন গুন করেই যাচ্ছে। মামুনের মনে হল সে কোন সিনেমার দৃশ্যে আছে। যেই দৃশ্যে বৈশালী সোফিয়া লরেন কিংবা এঞ্জেলিনা জোলি। এইটুকুতেই আসলে মনে হল জোলির সাথে সোফিয়ার শারীরিক বা মুখশ্রীর দিক থেকে মিল আছে। ঠিক কোথায় তা মামুন জানে না। তবে আছে। আর এদের দুজনের সাথে মিল আছে বৈশালীর। কেন ওকে এত বেশি বিদেশিনী মনে হচ্ছে আজ? ও নগ্ন বলে নাকি ছোট চুল আর হাতে মার্টিনি নিয়ে ও ইংরেজি গান গুন গুন করছে বলে?

চারকোলে আগুন ধরানো শেষ। ছোট্ট একটা চিমটা দিয়ে সেটাকে ফয়েল পেপারে ঢাকা কল্কের ওপর বসিয়ে দেয় সে। তারপর বৈশালীকে বলে, ‘রেডি।’

বৈশালী নির্বিকারভাবে হেঁটে আসে। একজন মানুষ কিংবা বলা যায় নারী দেহ এত নিখুঁত কিভাবে হয়? একদম পর্যাপ্ত পরিমাণে উঁচু হয়ে থাকা বিউটি বোন। উন্নত স্তন, বাঙালি মেয়েদের মত মেদ জমে জমে ঝুলে যাওয়া পেট নয় আবার বিদেশিনীদের মত এলইডি মনিটরও নয়। হালকা কিছু মেদ নাভিমূলের সাথে অলংকারের মত মিশে আছে। যা দেখলে আরও বেশি সুন্দর লাগে। আর পুরো শরীরের কেমন যেন একটা মৌন ঝঙ্কার। শব্দ শোনা যাবে না কিন্তু প্রবলভাবে উপলব্ধি করা যাবে।

বৈশালী মামুনের উরুর ওপর এসে বসে। তারপর কানের লতিতে হাল্কা করে কামড় দিয়ে কিছুটা জড়ানো কণ্ঠে বলে, ‘একটা ফোন করে দিলেই কিন্তু ওরাই শিশা বানিয়ে দিয়ে যেত। কেন যে এই জিনিসটা তোমার নিজেরই বানাতে হবে। আমি আসলেই ভেবে পাই না।‘

মামুন হাসে। তারপর কপট আত্মবিশ্বাস দেখিয়ে বলে, ‘বিকজ, এই অ্যাম দ্য বেস্ট। আমার মত করে কেউ বানাতে পারে না।’

বৈশালী মিন্ট ফ্লেভারের শিশার পাইপে লম্বা টান দেয়। আর সাথে অল্প অল্প করে ঠোঁট ছোঁয়ায় মার্টিনিতে।

‘তোমার ডিভোর্স কেস এর কী অবস্থা?’

‘কথা চলছে। হয়ে যাবে। আহমেদ শরিফের নাম শুনেছ না? শহরের সেরা ডিভোর্স ল’ইয়ার। সে দেখছে আমার কেস। শোভনকে খুব সহজে ছেড়ে দেব কিন্তু ওর টাকা কে এত সহজে ছাড়ব না। ওর ব্যবসায় আমার প্রচুর ক্যাপিটাল দেওয়া আছে। যার অনেকটারই কাগজে-কলমে কোন অস্তিত্ব নেই।’ আনমনে নিজের গলায় হাত বুলাতে বুলাতে বলে বৈশালী। কণ্ঠে কোন ক্রোধ বা রাগ নেই। বরং একইসাথে ওকে উদাস ও বিষণ্ণ লাগে। মামুন পাইপটা নিয়ে টান দেয়। শূন্যে সে পর পর কয়েকটা ধোঁয়ার রিং ছুঁড়ে দেয়। হালকা মিন্ট আর মধুর ধোঁয়ায় ভেতরটা ছেয়ে যায়। ডান হাত দিয়ে বৈশালীর ক্যানভাসের মত উন্মুক্ত পেটে হাত বুলাতে বুলাতে অদৃশ্য আঁকিবুঁকি করে।

বৈশালীর সাথে তার কাটানো আগের দিনগুলোর কথা মনে পড়ে। আজ থেকে প্রায় আঠার কি বিশ বছর আগের কথা। সেদিন বৈশালীদের বাসায় কেউ ছিল না। ঈদের পর দুইটা কাজের লোক ছুটি নিয়ে গ্রামের বাড়িতে গিয়েছে। ড্রাইভার গিয়েছে বাবার অফিসে। মা দেশের বাইরে। ডুপ্লেক্স বাড়ির দক্ষিণ প্রান্তের ঘরে প্রায় কানে শুনতে না পারা বৃদ্ধা দাদি বাদে কেউ নেই। বাড়ির দারোয়ানকে একশত টাকার চকচকে নোট দিলেই সে মামুন কে রীতিমত কুর্নিশ করে ফেলে। আর করবে নাই বা কেন বড় সাহেবের বন্ধুর ছেলে মামুন তো ভবিষ্যতের সাহেবই। লাল গেঞ্জি আর কালো গ্যাবার্ডিনের প্যান্ট পরা মামুন তাই মুখস্থ গানের লাইনের মত তরতর করে উঠে যায় দোতলার ঘরে। সেই ঘরের দরজা গোলাপি। সারা ঘরের দেয়ালে মেঘ, প্রজাপতি, চাঁদ, তারা আর সূর্য আঁকা। আর ঘরের মাঝামাঝি সাদা গোলাপি নরম চাদরে বসে আছে চৌদ্দ বছরের বৈশালী। মামুনের বুক ধক ধক করে। নানা চিন্তা খেলা করা মাথায়। আজ দ্বিতীয়বার। হাতে সময় আছে ঘণ্টা দুয়েক। আজ কিছু একটা করতেই হবে। এর আগের দিনে সে বলতে গেলে কিছুই করতে পারে নি। বৈশালী প্রচণ্ড রেগে গিয়েছিল। তারপর ওকে ইংরেজিতে দু’টা ক্লাসিক গালি দিয়ে চলে এসেছিল। আজ এমন কিছু করা যাবে না। বন্ধুদের কাছ থেকে নেওয়া জ্ঞান, চিকন বইয়ের শিক্ষা, কিছু নীল ছবি আর একরাশ সাহস নিয়ে ওকে আজকে সফল হতেই হবে। বৈশালী বলেছে, এসব না হলে ভালোবাসা হয় না। আজকে মামুনকে ভালোবাসার পরীক্ষায় সফল হতেই হবে।

বৈশালী গোলাপি বিছানা থেকে উঠে আসে। সে আসলেই খুব সুন্দরী। ফর্সা, মখমলের মত ত্বক। ঝকঝকে হাসি। হাসিমাখা মুখে সে খুব কাছে চলে আসে। মামুন দেখতে পায় বৈশালী ঠোঁটে লাল লিপস্টিক দিয়েছে। বেশ গাঢ় করে। তারপর সে অভিযোগের সুরে বলে, সাদা গেঞ্জি পরো নি কেন? আমি তো ভেবেছিলাম সাদা গেঞ্জিতে লাল লিপস্টিকের দাগ ফেলে দেব। মামুন ভেতরে ভেতরে কেঁপে ওঠে। বৈশালী আরও কী কী যেন বলে। কিছুই যেন কানে যায় না। তার শুধু মনে হয় ‘এসব না হলে ভালোবাসা হয় না।’

সেই মামুন আর এই মামুনে তফাৎ অনেক। এখন সে দেশের সেরা পাঁচজন সফল ব্যবসায়ীর একজন, বছরে অজস্রবার যাকে বিদেশ যেতে হয়। যে অফিসে ঢুকলেই এক্সিকিউটিভ থেকে ইন্টার্ন সব নারীর চোখ পদে পদে তাকে লক্ষ্য করে যায়। যে কোন কর্পোরেট দাওয়াত তাকে ছাড়া অপূর্ণ। আজ থেকে বিশ বছর আগে কে জানত এমন হবে? অবশ্য বৈশালী অনেকটা একই আছে। আগের মতই আকর্ষণীয়, জেদি, দুর্বার এবং বুনো। কিংবা ভেতরে ভেতরে মামুন নিজেও হয়ত একই আছে। শুধু তার বাহ্যিক পরিবর্তন এসেছে অনেক। মানুষ কি আদৌ বদলায়? খুব বড় কোন পরিবর্তন না আসলে, স্বেচ্ছায় কেউ তীব্রভাবে নিজেকে বদল করতে না চাইলে কেউ কি বদলায়? মানুষ হল গাছের মত, ঋতুর সাথে সাথে ডাল-পালা, পাতাবদল হবে তবে শিকড় একই। একবার এক আমেরিকান ক্লায়েন্টের সাথে কলকাতায় হাওড়ায় গিয়ে দশ হাজার বছরের পুরানো বট গাছ দেখতে হয়েছিল তাকে। বিশাল জায়গা নিয়ে ডালপালা আর শিকড়ে রীতিমত রাজত্ব গড়ে তুলেছিল সেই গাছ। গাছ কম সেটাকে দানব বেশি বলেই মনে হয়েছিল মামুনের। এই দশ হাজার বছরেও যেখানে সেই গাছের মূল শিকড় বদলায় নি, ক্ষণজন্মা মানুষ তো সেখানে নস্যিমাত্র।

একটানা বেশ কিছুক্ষণ শিশায় টান দিয়ে বৈশালী হালকা টলতে টলতে শূন্য পেয়ালা নিয়ে আরও মার্টিনি আনতে যায়। পেয়ালা ভরে, লেন্সের স্বচ্ছ বাক্সে চোখে থেকে নীল লেন্স খুলে রাখতে রাখতে বিড়বিড় করে বলে, ‘শোভনের সাথে বিছানার স্মৃতিগুলো বিরক্তিকর। ভাবলেই গা রি রি করে।’

মামুন চুপ করে থাকে। বিশ বছর আগে তাকে নিয়েও একই ধরণের কথা বলেছিল বৈশালী। তবে তার ক্ষেত্রে ঘৃণা নয় বরং বিরক্তি, অজ্ঞতা বা আনাড়িপনার অভিযোগ ছিল বেশি। সে কারণেই কী? সেই কৈশোরের জ্বালাময় অভিযোগের কারণেই কি সে থেকে থেকে সব সময়ই বৈশালী খবর নিয়েছে? আর নয়ত এত বছরে কম মেয়ের সান্নিধ্য তো সে পায় নি। চাইলে আরও বেশিই পেতে পারত। কিন্তু চায় নি। তার জন্য অন্তত সফল বা ধনী হওয়া মানেই থ্রি ডব্লিউ তে ডুবে থাকা নয়। আর তাই উইমেন, ওয়াইন ও উইসডোম এর মাঝে সে পরের দু’টাকেই বেশি আপন করে নিয়েছে। আর বৈশালী? সে আপন করে নিয়েছে বিপরীত লিঙ্গের প্রতি আকর্ষণকে। মামুন তার বন্ধু কিংবা বন্ধু নয়। তবে সে মনযোগী শ্রোতা আর সে কারণেই হয়ত বৈশালীর জীবনের নানা গল্প ঘুরে ফিরে মামুন জেনেছে তার কাছ থেকেই। যেমন সৌমিক।

সহপাঠি শিলার বড় ভাই সৌমিকের সাথে বৈশালীর পরিচয় ঘটে কলেজে পড়ার সময়। সৌমিক সদ্য বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া বিশাল কোটিপতির ছেলে। গীটার বাজাতে জানে। ইংরেজি গান ছাড়া কিছুই শোনে না। ইউরোপ থেকে আসা কাপড় গায়ে দেয়। সৌমিকের স্টাইল আলাদা। সে মামুনের মত ভীতু কিংবা নড়বড়ে নয়। পরিচয়ের তিন দিনের মাথায় সৌমিক শিলার অলক্ষ্যে বৈশালীকে জড়িয়ে ধরে চুমু খায়। বৈশালীর ভালো লাগে। খুব ভালো। যেন সকালের ঘুম ভেঙে কফির সাথে কেক খাওয়ার মত ভালোলাগা। যেন নতুন জামা গায়ে দিয়ে তার ওপর আলতো করে হাত বুলানোর মত ভালোলাগা। পরিচয়ের এক মাসের মাথায় তারা একে অপরকে নতুন করে আবিষ্কার করে, নিজেদের ভাঙ্গে-গড়ে, গভীরে যায়। খুব গভীরে। যেখানে আছে গহীন পৃথিবী আর মধু সরোবর। সে সরবরে সৌমিক ডুবুরি হয়ে বিচরণ করে। কলোম্বাস যেভাবে আমেরিকা আবিষ্কার করেছিল ঠিক সেইভাবে সৌমিক বৈশালীর মাঝে অজস্র দেশ-বিদেশ, সমুদ্র, আকাশ আবিষ্কার করে। বৈশালীকে আলুথালু বিছানায় ফেলে রেখে সে গীটারে তার শোনা সেরা প্রেমের গানের সুর তুলে আর বলে,

Close your eyes, make a wish
And blow out the candlelight
For tonight is just your night
We're gonna celebrate,
All through the night

আর বৈশালী? সে হয়ে ওঠে আরও সাহসী। যেন সে একটা ভাসতে থাকা সুখী জাহাজ। যে জাহাজের গন্তব্য সৌমিক। তবে ঠিক মাস চারেকের মাঝেই সৌমিক চলে যায় লন্ডনে পড়তে। আর কোন খোঁজ থাকে না ওর। বৈশালী ভেতরে ভেতরে ক্ষোভে ফেটে পড়ে। তার মনে হয় পৃথিবীর সকল পুরুষকে জ্যান্ত পুড়িয়ে মারা উচিৎ। সেই সময়ে মামুনের সাথে বৈশালীর কোন যোগাযোগ ছিল না। তবে পরিচিত একজনের মুখে এই গল্প মামুন ঠিকই জেনেছিল। গল্পটা যে শতভাগ সঠিক ছিল তা নয়। গল্পটি সে শুনেছিল সৌমিকের বোন শিলার কাছ থেকে। আর শিলা সেই গল্পে নিজের ভাইকে পরিস্থিতির শিকার আর বৈশালীকে স্লাট, হোর, প্রস এর মত নানা বিশেষণে সাজিয়েছিল। কেন যেন অধিকাংশ পুরুষদের সাথে সাথে নারীরাও অন্য নারীকে বেশ্যা বলে আনন্দ পায়। যেন অন্য নারীকে চরিত্রহীনা সাজিয়ে নিজের চরিত্রকে এক প্রস্থ নতুন সাধুবাদ দেওয়া যায়। আর সে কারণেই বৈশালীর গল্পের সাথে শিলার গল্পের ফারাক অনেক।

‘আমি একটু ঘুমাব। টায়ার্ড লাগছে। তুমি কি থাকবে নাকি যাবে?

‘এখানে একা কতক্ষণ থাকবে?’

‘রুম তো আমার নামে বুকড। তাই তোমাকে ভাবতে হবে না। তুমি গেলে যাও।’

‘না, আমি আছি তুমি ঘুমাও। আমি অফিসের কিছু কাজ করব। ঘন্টাঘানেক পর স্কাইপে একটা মিটিং আছে তুমি কোনো শব্দ না করলে এখানেই করব। আর সমস্যা হলে নিচে চলে যাব।’

বৈশালী কিছুটা শ্রাগ করে খালি মার্টিনির পেয়ালা বেডসাইড টেবিলে রাখে। বালিশে ধপ করে মাথা ফেলে দেয় এরপর হঠাৎ কিছুটা ক্ষিপ্ত হয়ে বলে, ‘আমার কারণে সমস্যা হবে? নাকি বুঝাতে চাইছ আমি সমস্যা করব? রুম কি তোমার মিটিং এর জন্য নেওয়া হয়েছে যে আমি শব্দ না করে চুপ করে থাকব? আমার নামে রুম আমি যা ইচ্ছে করব। মিটিং করতেই যখন এসেছ তাহলে বসে আছ কেন?’

এই আচরণ মামুনের পরিচিত। সে শান্ত হয়ে বলে, ‘আচ্ছা, নিচে চলে যাব মিটিং এর জন্য।’

বৈশালী কেমন যেন একটা ভঙ্গি করে তারপর বিরক্ত হয়ে মুঠোফোন হাতে নিয়ে ক্রুদ্ধ স্বরে কমান্ড দেয়, ‘হেই বিক্সবি, ওয়েক মি আপ আফটার টু আওয়ার্স।’

‘ওকে... টেল মী ইওর ভয়েজ পাসওয়ার্ড টু কন্টিনিউ’ যান্ত্রিক কণ্ঠে উত্তর দেয় বিক্সবি।

‘লাইফ ইফ বিউটিফুল’ বৈশালী জড়ানো অথচ ঝাঁঝালভাবে বলে ওঠে।

‘আই ক্যান নট আন্ডারস্ট্যান্ড, টেল মি ইওর ভয়েস পাসওয়ার্ড।’

‘লাইফ ইজ বিউটিফুল… লাইফ ইজ বিউটিফুল, ইউ স্টুপিড।’
মুঠোফোনের সাহায্যকারী এ্যাপ বিক্সবি আবারও ভয়েজ পাসওয়ার্ড নিতে অসফল হয়। প্রচণ্ড রাগে উন্মাদ হয়ে ‘ফাক ইউ বিক্সবি’ বলে চিৎকার দেয় বৈশালী, তারপর ফোনটা দেয়ালের দিকে ছুঁড়ে মারে।

শিশার চারকোল নিভে গেছে বহু আগেই। মিন্ট এর মৃদু ঘ্রাণ ছড়িয়ে আছে ঘরময়। মামুন শিশার জারের পানিটুকু সিঙ্কে ফেলে শিশা আর বাদবাকি সব কিছু ট্র্যাশবিনে ফেলে দেয়। এই শিশা সেটটা তুর্কি থেকে এনে উপহার দিয়েছিল একজন। বেশ বাহারি, রঙিন আর দামি। একবার ব্যবহার তো হল। এখন ফেলে দেওয়া যায়। বৈশালীর মুঠোফোনটা পাশে পড়ে আছে। অক্ষত। শুধু স্ক্রিনে হালকা ফাটল ধরেছে। মামুন তুলতে যায়। বিছানা থেকে বৈশালীর চিৎকার করে ওঠে, ‘ডোন্ট। আমার ফেলে দেওয়া কিছু তুলে আমার কাছে আনবে না। আমি যা ফেলে দেই তা তুলে নেই না। তোমাকে বিদ্রূপ করেছিলাম। কিন্তু ফেলে দেই নি। সেই জন্যই এত বছর পরেও যোগাযোগ রেখেছি। যদি ফেলে দিতাম, ছেড়ে দিতাম তাহলে তুমি লক্ষবার ডাকলেও বৈশালী ফিরে তাকাত না।’

মামুন বৈশালীর কথা উত্তর দেয় না। এই পরিস্থিতিটা বড় নাজুক। কিছু বললেই বৈশালী চিৎকার করবে। এরচেয়ে চুপ থাকাই শ্রেয়। শার্ট আর স্যুট তুলে ফ্রেশ হবার জন্য বাথরুমে চলে যায় সে। দ্রুত পোশাক বদলে, ফ্রেশ হয়ে আসে। বৈশালী এখনও আগের ভঙ্গিতেই শুয়ে আছে। প্রায় নিথর শুধু খুব ভালো করে তাকালে বোঝা যাবে শরীরটা হালকা কেঁপে কেঁপে উঠছে। সেটা ক্রোধে নাকি কান্নায় তা মামুন জানে না। এই মেয়েটা কখনও কারও সামনে কাঁদে না। অশ্রু তার জন্য ন্যাকামির বিষয়। দুর্বলতা। অন্য মানুষকে অশ্রু দেখানো আর রাজপথে অজস্র মানুষের মাঝে নগ্ন হয়ে হেঁটে যাওয়া তার কাছে একই।

মামুন আস্তে করে বলে, ‘যাচ্ছি আমি।’

‘প্লিজ গেট লস্ট।’ চাপা অথচ তীব্র স্বর ভেসে আসে প্রতিউত্তরে।


টুং টাং করে পড়ে থাকা মুঠোফোনটা বাজছে। বৈশালী হাতের তালু দিয়ে চোখের পানি মুছতে মুছতে উঠে বসে। সে ভেবেছিল ফোনটা নিশ্চয়ই বাড়ি খেয়ে বন্ধ হয়ে গিয়েছে। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে হয় নি। উঠে গিয়ে দেখে আহমেদ শরিফ কল করেছেন।

‘হ্যালো’

‘বৈশালী, তোমার কেস সাজানো হয়ে গিয়েছে। আর চিন্তা করো না। শোভনকে বেশ ভালো রকমের ধাক্কা খেতে হবে।’

‘থ্যাঙ্ক ইউ মিস্টার শরিফ।’

‘আমার দিক থেকে আমি সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি। একাধিক কেস দেওয়া হয়েছে ওর বিরুদ্ধে, আর সাথে ডোমেস্টিক ভায়োলেন্সের ফাইলও দাঁড় করিয়েছি। এইসব অভিযোগ থেকে সহজে ছাড় পাবে না। মোটা অংকের টাকা জরিমানা হবে, জেল পর্যন্ত হতে পারে।’

‘কুল! কিন্তু শোভন তো আমার গায়ে কোনদিন হাত তোলে নি। তবে আমার বাবা আমার মায়ের গায়ে মাঝে মাঝেই হাত তুলতেন।’

‘তোমার পরিবারের প্রসঙ্গ এখানে গৌণ। হাত না তুললেও শোভনের বিরুদ্ধে শক্তিশালী একাধিক অভিযোগ না তুললে আমরা কেস জিততে পারব না। আর ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স এখন শুধু শারীরিক আঘাতেই সীমাবদ্ধ নেই, মানসিক ও পারিপার্শ্বিক অনেক কিছুই এর সাথে জড়িত। তবে শারীরিক আঘাত আলাদা পয়েন্ট যোগ করবে। এছাড়া শোভন তো পরনারীতেও আসক্ত। সেই তথ্য যুক্ত করা হয়েছে।’

হালকা হেসে বৈশালী বলে, ‘মিঃ শরিফ আমি নিজেও পরপুরুষে আসক্ত। আমরা দুজনেই একত্রে না থেকে নানা জনের সাথে থাকি। এ ক্ষেত্রে আমাদের বেশ মিল আছে।’

‘থাকতেই পারে। কিন্তু সেটা তোমার দিক থেকে স্বীকার না করাই ভালো। অন্যকে দাগ দিতে হলে নিজেকে পরিচ্ছন্ন, ত্রুটিমুক্ত রাখতে হয়। তাহলেই কেবল লাভবান হওয়া যায়। কেস এর সমাধান না আসা পর্যন্ত তাই সাবধানে থেকো। আর আপাতদৃষ্টিতে কেস প্রায় আমাদের দিকেই আছে। সাফল্যের বেশ সম্ভাবনাও আছে।’

‘থ্যাংক ইউ এগেইন।’ বলে বৈশালী লাইন কেটে দেয়। আহমেদ শরিফের কণ্ঠের আত্মবিশ্বাস বলেই দিচ্ছে খেলা এখন অনেকটাই তার হাতে। এটাই তো চেয়েছিল। শোভনের একটা শিক্ষা হবে কিংবা শোভন মুখ থুবড়ে পড়বে। সে সব কিছু সহ্য করতে পারে কিন্তু কেউ তাকে ব্যবহার করে মুনাফা লুটবে তা হবে না। শোভনের সাথে এমন কিছুই হওয়া উচিৎ। তবুও কেন যেন স্বস্তি কাজ করছে না মনে। অথচ আগে সে ভেবেছিল এই কেস জিতে গেলে কিংবা জেতার দিকে এগিয়ে গেলেই উদযাপন শুরু করে দিবে। এখন এই কেস নিয়ে ভাবতেই বরং বিরক্ত লাগছে। আহমেদ শরিফ লোকটাই বা কেমন? টাকার বিনিময়ে একজনের বিপক্ষে মিথ্যে কেস সাজিয়ে জয়ী হবেন আর সুনাম কামাবেন। কী বিচিত্র এই সমাজ ব্যবস্থা।

বৈশালীর ক্লান্ত লাগে। খুব ক্লান্ত। মাথা ঝিম ঝিম করে। সে কেস নিয়ে সকল চিন্তা ছুঁড়ে ফেলে দিতে চায়। মামুনের চলে যাওয়াও তার মধ্যে কোন ছাপ ফেলে না। কিংবা ফেলে, যা নিয়ে সে ভাবতে চায় না। এক কাপ কড়া কফি খেতে পারলে ভালো হতো। সে চোখ বন্ধ করে থাকে। বাবা খুব ভালো কফি বানাত। মা কফি খেতে পছন্দ করতেন না। তার পছন্দ ছিল চা। আর তাই বাবা সব সময় দু কাপ কফি বানাতেন। তাঁর আর বৈশালীর জন্য। বাবা লোকটা আসলে শারীরিক ভাবে অক্ষম এবং স্বাভাবিক পুরুষ না হলেও মনের দিক থেকে ততটা মন্দ ছিলেন না।

পেশায় তিনি ছিলেন মস্ত বড় সরকারি কর্মকর্তা। আর মা ছিলেন দেশখ্যাত উদ্যোক্তা। বাবা-মায়ের নয়নের মনি ছিল বৈশালী অনিমা খান। লাল ফ্রক পরে যখন বাবা-মায়ের হাত ধরে বাইরে যেত সে তখন পাড়ার সকলে ঈর্ষাভরে দেখত এই সুখী পরিবারকে। সুখ, এক অচিন পাখি। সেই পাখির ডাক তো অনেকেই শুনতে পায়। কিন্তু দেখা পায় ক’জনা? তাই বৈশালীর পরিবারকে সুখী বলা আর ভ্রমে থাকা একই বিষয় ছিল। বৈশালী ঘুমাত বাবা মায়ের লাগোয়া ঘরে, রেশম চুলের বার্বি ডল নিয়ে। আর গভীর রাতে হাওয়ায় উড়িয়ে আনা পাতার মত করে থেকে থেকে পাশের ঘর থেকে আসত দুর্বোধ্য শব্দমালা। এরপর অচিরেই বদলে যেত শব্দ। মায়ের রাগত কন্ঠ, গ্লাস, ফুলদানি কিংবা দেয়ালে ঝোলানো ফটো ফ্রেমের কাচ ভাঙা আওয়াজ মিলে মিশে এক হয়ে যেত। ঝন ঝন ঝন। ঝন ঝন ঝন। সে ভয় পেত। ঘুমাতে পারত না। পাশের ঘরে যেতে পারত না। শুধু কোনো কোনো দিন খুব সকালে মায়ের মুখের গভীর এক ক্ষত বলে দিত কোন এক দীর্ঘ নিঃশ্বাসের গল্প। বৈশালী যখন ছোট ছিল তার একটা ভাই অথবা বোনের শখ ছিল, কিন্তু সে জেনে গিয়েছিল তা সম্ভব না। তার বাবার কারণেই সম্ভব না। আর সে জন্যই বৈশালীর জন্ম নিয়েও বাবা যখন এক মধ্যরাতে প্রশ্ন তুলে চিৎকার করছিলেন। মা ও অপ্রকৃতস্থের মত হাসতে হাসতে বলেছিল, বাবার আশায় বসে থাকলে কোনদিন তার মাতৃত্বের স্বাদ অনুভব করা হতো না। সেই রাতে এরপর বাবার কণ্ঠ হঠাৎ করে নিচে নেমে এসেছিল। বৈশালী দেয়ালে কান পেতেছিল। শুনেছিল বাবা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছেন আর বলছেন, ‘কিন্তু, আমি তো তোমাকে ভালো বেসেছিলাম।’

আর তার উত্তরে মা বলেছিলেন, ‘ভালোবাসতে জানো তুমি? বিছানায় গেলে তিন মিনিটেই যার সাড়া থেমে যায়, বিয়ের দশ বছরেও যে সন্তানের মুখ দেখাতে পারে না তার আবার ভালোবাসা কী?’ বাবা উত্তর দেন নি। শুধু তার কান্নার শব্দ আসছিল। খুব বিচিত্র একটা ব্যাপার হল, মায়েদের কান্না শুনলে মায়া বা দুঃখবোধ জেগে ওঠে। আর বাবাদের কান্নাকে কেন যেন কুৎসিত আর ঘিনঘিনে মনে হয়। বৈশালী আর সহ্য করতে পারে নি। দু হাতে কান চেপে মেঝেতে বসেছিল বাকিটা রাত।

ভালোবাসা কী? কাকে বলে? বুঝতে অনেক সময় লেগেছে বৈশালীর। সে ভেবেছিল তার সেই গোলাপি রঙা ঘরে মামুনের সাথে শারীরিকভাবে সব হয়ে গেলেই মামুনের প্রতি তার ভালোবাসা আবেগ ছলকে পড়বে, সিনেমা কিংবা বইতে দেখায় ছেলেমেয়ে, নারী-পুরুষ এক হলে তা কি অসহনীয় সুখে পরিণত হয়। অথচ চেহারা প্রায় রক্তশূন্য করে মামুন যখন কাঁপতে কাঁপতে থেকে তার স্তনে প্রথম হাত রাখল বৈশালীর তখন কিছুই মনে হয় নি। এরপর তারা অনেক কিছু করেছিল। ক্লাসে যা যা গল্প শুনেছিল সবই করেছিল। এডাল্ট সিনেমার মতও অনেক কিছু করেছিল। কিন্তু কোন স্বাদ নেই, অসহনীয় সুখ নেই। থেকে থেকে শুধু মামুনের প্রশ্ন, ‘আর কী করব?’ বিরক্ত হয়ে গিয়েছিল বৈশালী।

নিজের মাকে দেখেই জেনেছিল সে বিয়ে এবং ভালোবাসা এক নয়। কিংবা স্বামী মানেই সুখ নয়। ভালোবাসার যে সংজ্ঞা সে মাকে বলতে শুনেছিল সেই সংজ্ঞা মেনেই এরপর সে ভালোবাসা খুঁজেছে। যে পুরুষ সুদর্শন, স্মার্ট, বিছানায় দক্ষ সেই ভালবাসতে জানে। অথচ তিন মিনিটের চেয়েও ভীষণ লম্বা ভালোবাসার গল্প সে তার জীবনে অনেক পেয়েছে তবু সেগুলোকে তার ভালোবাসা মনে হয় নি। শিশুকাল থেকে সে নিঃসঙ্গতার সম্রাজ্যে বসবার করত। বাবা-মায়ের আলাদা হয়ে যাওয়া। প্রায় অনুপস্থিত থাকার মতই দাদির মৃত্যু। বিশাল বড় বাড়ি আর নানা অঞ্চলের কাজের লোক ছাড়া আর কিছুই ছিল না তার জীবনে। দামি দামি কাপড় ছিল, বই ছিল, সিনেমা ছিল, তার টাকার জন্য তার সাথে মিশতে চাওয়া কিছু বন্ধু নামের ছেলেমেয়ে ছিল কিন্তু সত্যিকারভাবে কেউ ছিল না। অথচ প্রকৃত ভালোবাসার জন্য বৈশালী কত কিছু করেছে। কিন্তু মন টানে নি। ইয়াহু চ্যাটরুম থেকে বার্লিনের বিশ্ববিদ্যালয়ের এক প্রফেসরের সাথে তার পরিচয় হয়েছিল। সেই প্রফেসর নিজের নাম, ঠিকানা, ছবিসহ সব ইমেইল করেছিলেন। ভিডিও কলে এসে তার দেশ বিদেশের পড়ানোর অভিজ্ঞতা নিয়ে খুব গল্প করতেন। জ্ঞান বা বুদ্ধিমত্তাও যে যৌন আকর্ষনের চাবিকাঠি হিসেবে কাজ করতে পারে সেই লোকের সাথে পরিচিত হয়ে বৈশালী বুঝতে পেরেছিল। সেই লোক এই আকর্ষণের দারুণ একটা নামও বলেছিলেন, স্যাপিও সেক্সুয়াল। যার কাছে বুদ্ধিমত্তা সম্পন্ন মানুষকে শারীরিকভাবে আকর্ষণীয় মনে হয়। বৈশালীর সত্যি ভালো লেগেছিল। অল্প কদিনের মধ্যেই সে প্রেমে পড়েছিল। অন্তত তার তাই মনে হয়েছিল তখন। এক রাতে ফোনে কথা বলতে বলতে সেই প্রফেসর বলেছিল তার সাথে বৈশালীর দেখা হলে সে কী কী করবে। এরপর এ কথা, সে কথা বলে নানা যৌন ফ্যান্টাসির কথা বলতে বলতে প্রফেসর এতই উত্তেজিত হয়ে গিয়েছিল যে, এক পর্যায়ে ফোনে শীৎকার করতে করতে বলছিল, ‘বাইসালি, আই নিড সামথিং রাইট নাউ। আই ওয়ান্ট টু পুট মাই থিং ইনসাইড সামওয়ান। প্লিইইইজ…’ গা গুলিয়ে এসেছিল তখন তার। অসম্ভব জ্ঞানী, স্মার্ট কেউ কামাতুর হলে এত সস্তা হয়ে যায় তা কে জানত?

অবশ্য এই দিক থেকে অনিক অন্য রকম ছিল। অনিকের সাথে পরিচয় হয় এক জন্মদিনের দাওয়াতে। বৈশালী যদিও দাওয়াতে যেতে অপছন্দ করত তবে সেবার বাবার আদেশে যেতে হয়েছিল। সেদিন সে নীল রঙের শিফন শাড়ি পরেছিল। সাথে ডায়মন্ড আর হোয়াইট গোল্ডের নেকলেস আর দুল। দাওয়াতে অনেকেই ওকে ঘুরে ঘুরে দেখছিল। তবে তাদের মাঝে বলিষ্ঠ, সুদর্শন পুরুষ বলতে শুধু অনিকই ছিল। যাকে দেখে প্রথম নজরেই মুগ্ধ হয়ে যাওয়া যায়। বৈশালী ও অনিকের একে অন্যের আকর্ষণে বুঁদ হওয়ার জন্য মাত্র কয়েক পলক সময় লাগল। সেই বাড়ির বিশাল হলরুমে সকলে যখন কেক কাটায় ব্যস্ত তখন তারা দুজনে চলে এসেছিল ছাদে। নাম আর অবস্থানটুকু বাদে দুজন দুজনকে নিয়ে তখনও কিছুই জানে না। জানার সময়টুকুও ছিল না। কারণ, সময়, পরিস্থিতি আর অবস্থার সাথে সাথে মানুষের জীবনে নানা কিছুর গুরুত্ব কমে কিংবা বাড়ে। আর যেখানে শরীর জেগে উঠেছে সেখানে মস্তিষ্ক কোন ছাড়।

সেদিন অনিক ছাদে আসার কিছুক্ষণের মাঝেই আবছা অন্ধকারে, নিয়নের হালকা আলোতে বৈশালীর পায়ের গাছে হাঁটু গেড়ে বসেছিল। তারপর পরনের গ্লাস হিলটা খুলে তৃষ্ণার্তের মত চুমু খেতে শুরু করেছিল তার পায়ে। যেন প্রতি চুম্বনে অনিক ভালোবাসার ইশতিহার ছাপিয়ে যাচ্ছে সারা শহরজুড়ে। তার মনে হয়েছিল সারা শরীর কেউ নিঃশব্দে আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে। আর সেই আগুনে পুড়তে পুড়তে তার দুটো ডানা গজিয়েছে। সে চাইলেই উড়ে যেতে পারে। সে চাইলেই লুমেন আলোর বর্ণচ্ছটায় সব জ্বালিয়ে দিতে পারে। সেই রাতে আকাশভরা নক্ষত্ররাজির সন্ধিতে অনিক আর বৈশালী অভিন্ন হয়েছিল, ভিন্ন হয়েছিল, একক মানুষ হয়েছিল। আবার একের ভেতর আরেক মানুষ হয়েছিল।

সেই রাতের পর অনিকের সাথে তার আর দেখা হয় নি। বৈশালী বুঝতে পেরেছিল অনিক শরীরে পুলক জাগালে মনে জাগাতে পারে নি আর সে কারণেই তার নিজেরও মনে হয় নি সে ছেলেটিকে খুঁজে বের করবে।

শোভনকে সে বিয়ে করেছিল অনেকটা হুট করেই। শোভন তার প্রেমে তীব্রভাবে হাবুডুবু খেয়েছিল। শরীর কিংবা অন্যকিছু নয়। সরাসরি বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিল। ওর সাথে এতো স্বল্প সাক্ষাতে এর আগে কেউ সারা জীবনের জন্য সংসার করার আহ্বান জানায় নি। শোভনের এই আহ্বান তাই অন্যরকম লেগেছিল। আর অনেকেই বলে, তুমি যাকে ভালোবাসো তাকে নয় বরং যে তোমাকে ভালবাসে তাকে গ্রহণ করো। ট্র্যাশ এবং ক্লিশে কথাবার্তা, কিন্তু সে সময় খুব সত্য মনে হয়েছিল। অবশ্য বিয়ের খবরে বাবা অবশ্য খুব একটা আনন্দিত হন নি। শোভনের মত শিক্ষিত, বনেদি পরিবারের ছেলে তাদের পরিবারের সাথে যথার্থ মানানসই। কিন্তু বাবা সব সময় বলতেন বৈশালী যেন খুব সাধারণ পরিবারের শিক্ষিত কোন ছেলেকে বিয়ে করে। তাতে নাকি সে সুখী হবে। প্রতিবারই সে কথা শুনে তার মনে হয়েছে একখানা ঘরজামাইয়ের স্বপ্নে তার পরাজিত বাবা বিভোর। পরাজিত তো সে বটেই, নিজের সন্তান না জেনেও যে অন্যের সন্তান কে নিয়ে বেঁচে বর্তে থাকে, তাকে সেকালে উদার বললেও একালে সবাই পরাজিত বা কাপুরুষই বলবে। যদিও বাবা মাকে আর সংসারে গ্রহণ করেন নি। মা ও পড়ে থাকেন নি। বৈশালী কে রেখেই অন্যজীবন গড়েছেন।

তবে হ্যাঁ, শোভনকে পেয়ে বৈশালীর সাময়িকভাবে হলেও সংসারের স্বপ্ন জেগেছিল, কিন্তু শোভন বনেদি পরিবারের ছেলে হলেও তাদের পারিবারিক ব্যবসা তখন পতনের পথে। বৈশালী শুধু তার স্ত্রী ছিল না বরং তার অর্থকড়ি শোভনের ব্যবসায়ের মূলধনও ছিল। আর দুজনের মিল নেই, কিছুতেই মিল নেই। প্রতিবার অকথ্য ঝগড়ার পরে একটা তুমুল বর্ষণের মত শারীরিক মিলন। তারপর ক্লান্ত হয়ে দুজনেরই ঘুমিয়ে যাওয়া। যেন এতে করেই সমস্ত সমস্যার সমাধান চলে আসবে। এভাবে দিনের পর দিন টেকা যায়? আর শরীর? খুব নাটুকে কাহিনি ভরা বইয়ের মত। একবার পড়ে ফেললে আর পড়তে ইচ্ছে করে না। নতুন কোন টুইস্ট নেই, সাসপেন্স নেই। বরং প্রতিবারের শারীরিক মিলন যেন মানসিক আবেগের ক্ষয়িষ্ণু রূপ। বৈশালীর মনে হয় শারীরিক মিলন পোশাকের মত। পরে পরে ছুঁড়ে ফেলে দিতে হয়। আর প্রেম হয়ত সত্যিকারের শরীর যা আত্মার সাথে জুড়ে থাকে সব সময়। একুশ জন, হ্যাঁ এ যাবতকালে একুশটি পোশাক পরে ছুঁড়ে ফেলেছে সে। তবে প্রকৃত শরীর খুঁজে পায় নি। মন খুঁজে পায় নি। মামুন ভালো, অন্য অনেকের চেয়ে কিছুটা হয়ত আলাদা। তবে তার মাঝে সেই গভীরতা নেই যেখানে প্রবেশ করলে বৈশালী পাবে স্বাধীন বাতাস। মামুন সেই পথ হতে পারবে না যে পথে হেঁটে হেঁটে সে কোন সবুজ পাহাড়ের দিকে হেঁটে যাবে। এই যে সে শোভনের কাছ থেকে বিচ্ছেদের কাগজের জন্য অপেক্ষা করছে এই অপেক্ষা তো অমূলক। বিচ্ছেদ ঘটে গেছে বহু আগেই কিংবা বলা যায় মিলনের সেতু সেখানে ছিল না কখনওই। ভালোবাসার সংজ্ঞা তার মা ভুলই জানতেন। ভালোবাসা শরীরে নয়। আত্মায় কিংবা মনে। সেখান থেকে তার পরিণতি শরীরে। সেখান থেকে হয়ত বংশবৃদ্ধি। তবে সম্পর্কে যদি অনুভূতি, প্রেম, রূপ, রস, গন্ধ, শব্দ, স্পর্শর উপস্থিতি না থাকে তাহলে সেটা সম্পর্ক বা ভালোবাসাই নয়। কারও জন্য কামাতুর হয়ে থাকাই প্রেম নয়। আর তাই তো বৈশালী জানে সেই একুশ জনের জন্য যতটা সহজে দু পা ছড়িয়ে বিছানায় শুয়ে শরীরের দরজা খুলে ফেলা যায়, ততটা সহজে মনের দরজা খুলতে পারা না। সে পারে নি। এক ঘুমন্ত মন চিরনিদ্রা যাপন করছে তার শরীরের বহু বহু গভীরে। চেতনার অতলান্তিক সাগরে। সেখানে কেউ প্রবেশ করতে পারে নি। শরীরের নিঃসঙ্গতা কাটানো যায়। দিনশেষে মন তবু একলাই থাকে।

দেয়াল ঘড়িতে টিক টিক করে আরও কিছু সময় বদল হয়। একসময় বৈশালী সাদা চাদর সরিয়ে রুমের বড় আয়নার সামনে এসে দাঁড়ায়। নিজের নগ্ন শরীরকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে। কী আছে এই শরীরে? একটা ফাঁপা খোলস। যা বাইরে অনিরুদ্ধ নক্ষত্রের মত জ্বলজ্বল করে আর ভেতরে ভেতরে মোমের মত গলে যায়। পুড়ে যায়। নিঃশেষ হয়ে যায়। বেশ অনেকক্ষণ অপলক তাকিয়ে থাকে সে। তারপর কিছু একটা ভেবে, গলিত শরীরের ওপর কাপড় চড়িয়ে নেয়। তারপর ভ্যানিটি ব্যাগ আর ভাঙা ফোনটা নিয়ে রুম থেকে বের হয়ে যায়। রিসেপশনে কার্ড জমা দিয়ে চলে যাওয়ার সময় হঠাৎ এক চল্লিশ ছোঁয়া, সুদর্শন ভদ্রলোক সামনে এসে দাঁড়ায়। পরিপাটি হাসি দিয়ে উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলে, ‘আরে বৈশালী যে! লং টাইম নো সি…’

বৈশালী ভেতরে অসহ্য লাগে। ক্রোধ জাগে। কিন্তু সে কিছুই প্রকাশ করে না। শুধু সেই ভদ্রলোক এর চোখের দিকে তাকিয়ে নিজের চিরাচরিত পাগল করা মোহনীয় হাসিটা দেয়। চকচক করে ওঠে লোকটির মুখ। এবার বৈশালী একটু ঝুঁকে তার কানের কাছে মুখ নিয়ে নিচু স্বরে বলে, ‘আই এ্যাম নট বৈশালী এনিমোর। গো, ফাক ইউরসেলফ। টোয়াইস!’

সুদর্শন ভদ্রলোক হতভম্ব হয়ে রোবটের মত সটান দাঁড়িয়ে থাকে। তাকে পাশে কাটিয়ে বৈশালী লাউঞ্জ থেকে দীপ্ত ভঙ্গিতে বের হয়ে যায়। তাকে ভিড়ের মাঝে মিশে যেতে হবে। এই ক্লান্তিকর মেকি পৃথিবী থেকে পালিয়ে যেতে হবে। সে বড় ক্লান্ত। এবার শরীরটাকে বিশ্রাম দিয়ে মনটাকে জাগিয়ে তোলার পালা। শরীর তখনই জাগবে যখন মনপাখিটা ডেকে উঠবে আপন সুরে। আর তার জন্য কিছুটা নিঃসঙ্গতা চাই।

একান্ত ব্যক্তিগত নিঃসঙ্গতা।