স্বর্ণাভা ঝিলকে উঠছে মৃত্তিকায়...

ফারহানা রহমান ও রুমা মোদক

ফারহানা রহমান

স্বর্ণাভা ঝিলকে উঠছে মৃত্তিকায়...

১.
তোমার জন্য এই যে
চিবুকের হাড়ে লুকিয়ে রাখছি গোপন হাহাকার
এই অলিখিত বন্ধনের ঘোরে
পতিত তুষারের মতো অনিয়মিত সঙ্গম
এই মন খারাপের দিনগুলোতে
আমাদের বসতবাড়ি কেবলই শূন্যে ভেসে থাকে...
আঙ্গুল গড়িয়ে নেমে আসছে শ্বেত
আর সেই জলের কাছে আমার আত্মসমর্পণ !

এখানে আমি কেউ নই
আমার কন্ঠ জড়িয়ে ঘুমিয়ে আছে গোপন ভালোবাসা
এই বিস্তৃত কাঁটাতারের ঠিকানা
শুধু বাসনার কথা বলে...

উদাস সময়ের মুদ্রায় সন্ধ্যা নেমে এলে
বিষণ্ণ গানটির মতো
বৃষ্টি এসে জমে প্রেমের রঙে
আমার এই উন্মনা খোলা দেহে
তুমি শাশ্বত কবিতার মতো
নাভীর শেষ সীমানায় ফিরে যাওয়ার পথে
আমাকেও সাথে নিও জীবন...


২.
বলো, হে শ্যাম -
কেমন পাথরের কায়া তুমি শ্যাম
যে আকাংখ্যার বিনিময়ে তোমার শরীর
স্ফীত শিরায় আনে বাসনার ধ্বনি
রক্তের নিভৃতে প্রেম, অভিমান
মায়া মায়া ,সঞ্চিত মুদ্রার অমৃত ছন্দে জাগাও পিপাসা
অপেক্ষা থাকে বক্ষে, মজ্জায় আর অনন্ত আকাংখ্যায়...
বলো , তুমি শ্যাম
কেমন পাথরের কায়া তুমি শ্যাম ?
আমি তো বারবার ফিরে যাই
অন্য কোথাও , অন্য কোন অন্বেষণে
লাস্যময়ী ধুলায়
প্রেম থেকে কামনায়...

৩.
সুখের নীরব দূরত্বে কেঁপে উঠি বারবার
নিভে আসা অঙ্গীকারে
জ্বলতে জ্বলতে তামাদি হয়ে গেছি, ঈশ্বর !
এই ক্রমাগত পাপের প্রতি হেলে পড়ার দায় !
আমাকে স্বীকার করে নিও তুমি প্রভু......

এই মুগ্ধতা , অনাগত সায়াহ্নের দিকে হেলে পড়া নাভির শিকড়
আমি তো কিছুই চাইনি, তবু
এ দহন ক্রমাগত দাহ করে পুতুলের দেহ

যতবার নিঃসঙ্গ হই
পুরনো লেখার মতো হারানো সময়ে
প্রগাঢ় হয় ছায়ারাত
এই ঘোরলাগা না ছোঁয়া সময়
ঘুম ঘুম অসুখ...
সকালগুলো নিঃশেষ হয়ে গেলে
কোন এক দীর্ঘতম অসার দিনেও
অসুখী কাফেলা হেঁটে যায় অনন্ত বালুপথে !
আর যা কিছু ছিল মোর আলোকিত চিন্ময়, তোমায় দিয়ে, রয়ে গেছি বনবাসে...

===========================================


রুমা মোদক

আর্তি তার বক্ষজুড়ে.....


জৈষ্ঠ্যে তৃষ্ণার্ত মাঠ ফেটে চৌচির,বর্ষায় ভিজে চাতক তৃষ্ণায়। ঘোর শ্রাবণে ঘাসগুলো আলগা সবুজ, সজল ধারার সোহাগে খানিক, খানিক জমে থাকা সব ধুলো ময়লা ধুয়ে যাবার।
সোহাগী বিবি রাস্তায় যেতে কুদ্দুস মিয়ার গা ঘেঁষে বসে। কারণে অকারণে কুদ্দুস মিয়ার হাতটা নিজের হাতে নেয়, দৃষ্টিকটুতা অগ্রাহ্য করে ঠাসাঠাসি বাসে মলিন শাড়ির আঁচলে কুদ্দুস মিয়ার ঘাড়ের ঘাম মুছে দেয়। কুদ্দুস মিয়ার নিরুত্তাপ দৃষ্টি বদলায় না। সে ঘুমে ঢুলে, ঘুমিয়েছে সন্ধ্যা থেকে ভোররাত।তবু ঘুম ছাড়ে না। বাসের জানালা ছুঁয়ে ছুঁয়ে সরে যায় আমগাছ, কড়ই গাছের ডাল।
গড়-গড়াগড়,গড়-গড়াগড় ইট ভাঙা আর মিশ্রণের শব্দে চারদিকে মহাকোলাহল। ছাদ ঢালাইয়ের আয়োজনে আজ কামলা মজুরের আমদানি বেশি। পুরুষ নারী। সিমেন্ট বালু মাখানো ঝাঁকা মাথায় নিয়ে সারি বেঁধে সিঁড়ি বেয়ে ওঠার সময় সোহাগী বিবি আড়চোখে দেখে নবাগত রুমানার সাথে কুদ্দুস মিয়ার রং ঢং। একবার ডাকে অধিকারের বাহুল্যতায়-ঐ কুদ্দুইছা কাম ফালাইয়া ঢং করতাছস ক্যান! কুদ্দুছ ফিরেও তাকায় না। সোহাগী ভালোই জানে কুদ্দুইছা নিজ থেকে না তাকালে, তাকানোতে বাধ্য করার মতো কোনো কিছুই নেই তার। বয়সও নয়, রূপও নয়,শরীরও নয়।
চতুর শিকারির মতো ছিপে গেঁথেছে মাছ। শুধু অদম্য শরীরি নেশাগ্রস্ততার সন্ধান পেয়ে। নইলে সোহগী জানে না তার আছে ছিপে জোর না আধার আকর্ষনীয়।
এই নিরজোরি ছিপ ফেলে সোহাগী বসে থাকে দিনের পর দিন। একসময়, যৈবনকালে সবাই ছোঁক ছোঁক করতো। ইস কী অমূল্য সম্পদই না মনে হতো এই গা-গতরের উপচে ওঠা জোয়ার। সাবধানে বাঁচিয়ে রাখতো নিজেকে, যেনো কোনোভাবেই 'নষ্ট' না হয়ে যায়। এখন বয়সকালে সে মনে মনে হাসে। বার্ধক্য ছুঁতে যাওয়া শরীর এখন আর কিছুই মনে হয় না। শরীরের খিদেও তেমন টের পায় না, বৈষয়িক লাভের বিনিময়ে যেখানেসেখানে বিলিয়ে দিতে কার্পণ্য নেই।
কুদ্দুইছা রুমানার সাথে বসে দূরে টোস্ট বিস্কুট চুবিয়ে চা খায়। নিজের শরীর বেয়ে দরদর ঝরে যাচ্ছে এই ঘন্টাকয় একনাগাড়ে কায়িক পরিশ্রমের শ্রমক্লান্ত ঘাম। পাঁচতালা সিঁড়ি বেয়ে এই ইট-বালি-সিমেন্টের ঝাঁকা ছাদ পর্যন্ত পৌছে দেয়ায় পুরুষের চেয়ে মোটেই কম যায় না সে। তাই ছাদ ঢালাইয়ের কাজে প্রায়শই ডাক পড়ে তার।
দূর থেকে রুমানার চটুল দৃষ্টিতে আগুন দেখে সে, কুদ্দুছের দৃষ্টিতে দেখে পতঙ্গের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ার বাসনা। অযাচিত জেনেই টং দোকানের বেঞ্চে কুদ্দুছের গা ঘেঁষে বসে। কুদ্দুছের উদ্দেশ্যে আমারেও চা খাওয়াছ নে, বলে নিজেই টং দোকানদারকে চা দেয়ার নির্দেশ দিয়ে কুদ্দুছের পায়ের উপর অশালীন ভাবেই হাতখানা রাখে সোহাগী।
দেখে রুমানার আগুন দৃষ্টিতে কোনোই পরিবর্তন নেই। দুজনের রং ঢংএ ও বিন্দুমাত্র ভাটা পড়ে না।বুঝি কুদ্দুছের সাথে তার বয়সের পার্থক্যের দৃশ্যমানতা কোনোই গোপন সম্পর্ক দৃশ্যমান করে না।
বুকটা দুরুদুরু করে সোহাগীর। পাঁচ পাঁচটা পোলাপান নিয়ে ছয়টা পেট তিনবেলা একার রোজগারে ভরানো কঠিন। ভাগ্যিস পোলাপানের বাপটা আরেকটা বিয়ে করে চলে গিয়ে বাঁচিয়েছে।নইলে এরেও টানতে হতো নিশ্চিত।
কুদ্দুইছা রাত কাটানোর বিনিময়ে চাল-ডাল টা আনতো। সময়ে অসময়ে হাত পাতলেও শ -দুইশো টাকা মিলতো।বুঝি ফসকে যায় সেও........।