বোবাগাছ

মোস্তফা হামেদী ও সাদিয়া সুলতানা


মোস্তফা হামেদী

বোবাগাছ
*
একটা বোবাগাছ চাষ করছি। পাতায় হাত বুলিয়ে দিই। ঢেকে রাখি মোটা কাপড়ে।
যেন কোনো ধ্বনিসংযোগ না ঘটে।

হাওয়ার সংসর্গ থেকে জন্ম নেয় বিবিধ স্বর-কলরব, গুজব ও গুঞ্জন।
ফলে বায়ুশূন্য ঘরের ভিতর তার হিজরত ঘটে। এক নিঃসীম নীরবতার গর্ভে ফেলে আসি তারে।

নিরুপদ্রব বাগান-কল্পনা ধরে হাঁটি। দেখি, ফুলগুলি সেঁটে আছে পাতার শরীরে।
কী এক লুকাছাপার ভিতর পতঙ্গ শুঙ্ শানিয়ে যায়!

তাবড় বৃক্ষেরা পোষ মেনে আছে। সব পাখি একই সুরে গায়। সমতালে ওড়ে। ঠোঁট নড়ে পরিপত্রমাফিক।

জন্তুজাত ধ্বনিপুঞ্জের সুর নিকটে আসছে ক্রমে।
আরণ্যক প্রশান্তি নিয়ে হৃত কোনো জিহ্বার কথা মনেই পড়ছে না আর।



রসদ
*
সাপের শরীরে পেঁচিয়ে থাকার অনুভূতি নিয়ে বেঁচে আছি। হিম কোনো রাত্রির কথা ভাবি।
ঠান্ডায় কাবু হতে হতে নড়ে নিশীথের ফুল। উপগত ভয় থেকে ঘ্রাণ ভালো--ভাবি।

ছোবল থেকে খানিক দূরে যাবতীয় অর্জন আমাদের। এই সান্ত্বনা নিয়ে চাঁদ ওঠে।
বাঁশপাতার শব্দ হয়। তক্ষক ডাকে। ভাবছি, সবকিছুই সহজ-সুন্দর।

ঐ দূরের স্টেশনে কলরোল। বাজারের টুকরা-টাকরা ধ্বনি ভেঙে পড়ছে নদীর এপারে।
ভালো লাগে জীবনের সহজ গতি।

তবু কার ঘৃণা ও রোষ ধেয়ে আসছে?
যেন বাগানের প্রতিটা গাছ, গুল্ম ও ঘাস কচি শাকশুদ্ধ কাল বাহুবন্দনীর ভিতর চুপসে আছে।

রসদগুলি ফুরিয়ে আসছে। বেঁচে থাকার শর্তগুলি ঢিলেঢালা।
চেরা জিভে বিষ মাখিয়ে উদ্যত অজস্র ফণা ঘাড়ের ওপর।
শ্বাস ফেলছে। নাচছে রোষমন্ত্রে।


খেদ
*
কুৎসিত কুৎসিত লাগে। ঐ সব আলোর গল্প আর সব মিথ খোঁড়া পায়ে আসে।
এক ঘোলা জোছনারাত্রির নিচে আমাদের সম্ভ্রমহানী। পাতাগুলো কুঁকড়ে আছে,
যেন তাদের ওপর রাত্রির সমন।

সাফাইমেশিন থেকে গোঁৎ গোঁৎ শব্দ আসছে কেবল। জংলার মধ্যভাগে ঘৃণার বিস্তার।
সারি সারি ছায়াগাছ আর সাফাইখানা।

ঢেকে ফেলছে রাত্রির প্রলাপ। শিকড় উজিয়ে আসা আর্তিগুলি গাছের শীর্ষদেশে কুঁদে মরছে।
যেন অন্ধকারের ডালে ফুটে আছে থোকা থোকা খেদ।

============================================


সাদিয়া সুলতানা

মেহেরুন ও অনন্ত ঘুমকাল


গল্পেরও মৃত্যু ঘটে। যত্ন না নিলে সরস গল্পের ডালপালা শুকিয়ে যায়। তাই গল্পকারকে হতে হয় একজন পাকা শিকারী। মাছকে কোঁচের ঘায়ে আটকে ফেলতে না পারলে সেটি যেমন হাত ফসকে যায় তেমনি ঠিক সময়ে গল্পকে গাঁথতে না পারলে সেই গল্পও ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যায়। হারিয়ে যায় নিগূঢ় অন্ধকারে। যেমন করে মেহেরুনের গল্পও ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে পৃথিবীর আর আট-দশজন মৃত মানুষের মতো।
যদিও মেহেরুন এখনো জীবিত আছে, ও নিজে তা স্বীকার করে না। ওর ধারণা ও জন্মমৃত্যুর মধ্যবর্তী অদ্ভুত এক স্থিরসময়ে আটকে আছে। তাই ওর বয়স বাড়ে না, দায়িত্ব বাড়ে না। দিন-রাতের বেশিরভাগ সময় দায়িত্বজ্ঞানহীন মেহেরুন নির্বিষ প্রাণির মতো ছাদের চিলেকোঠার ঘরে শুয়ে-বসে ঝিমায়। মাঝে মাঝে ওর আপাদমস্তক আবেগহীন কাঁপে-থরথর। কিন্তু মেহেরুন ফণা তোলে না।
মেহেরুনের ছেলেবেলার বান্ধবী অনন্যা পাল নেশায় চুর বান্ধবীকে নিজের চোখে দেখেও এখন বিশ্বাস করে না যে এ সেই মেহেরুন। যেই মেহেরুন এই চিলেকোঠার ঘরে গলা ছেড়ে দেবব্রত সিংহের ‘ত্যাজ’ কবিতা আবৃত্তি করতো। জামবনের কুঁইড়েপাড়ার শিবু কুঁইড়ের বেটি সাঁচলির মানুষ হতে চাওয়ার ‘ত্যাজ’ পুনরাবৃত্তি করতে গিয়ে যার কণ্ঠস্বর ফুঁসে উঠতো, যা অনন্যার নিজের চোখে দেখা। ওর স্মার্টফোনে মেহেরুনের আবৃত্তির একটা ভিডিও ক্লিপ আছে। ইউটিউবে মেধা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আবৃত্তি শুনে এক ঘন্টার মধ্যে আত্মস্থ করা ‘মৃণালের পত্র’ পাঠরত মেহেরুনের ফর্সা মুখখানা সেই ভিডিওতে গনগনে লাল দেখায়। এখন মেহেরুনের আগুনতেজ মৃত।
অনন্যা বছরখানেক আগেও হঠাৎ হঠাৎ বান্ধবীকে দেখতে আসতো। এসেই মেহেরুনের আবৃত্তির ভিডিও চালিয়ে ওর কাঁধে ঝাঁকি দিয়ে বলতো, ‘এই যে দ্যাখ, এটা তুই। দ্যাখ।’ একত্রিশতম বি.সি.এস. এ উত্তীর্ণ অনন্যা পাল এখন নিজ কর্মস্থলে এতই ব্যস্ত থাকে যে প্রাণপ্রিয় বান্ধবীকে দেখতে আসার তার আর সুযোগ হয় না। দেশের প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা হবার ইচ্ছে মেহেরুনেরও ছিল। কিন্তু কচ্ছপ আর খরগোশের গল্পের মতো কে যে কখন জীবনরথে এগিয়ে যায় কেউ তা জানে না; স্বয়ং বিধাতাও বুঝি এ নিয়ে মানুষকে বিভ্রমে রাখেন। একত্রিশতম বি.সি.এস. পরীক্ষার প্রিলিমিনারিতে উত্তীর্ণ মেহেরুনের লিখিত পরীক্ষা দেবার সুযোগ হয়নি। এর পেছনে একটা গল্প আছে। যে গল্পটা এখন মেহেরুন ভুলে গেছে, মেহেরুনের পরিজনরাও তা বিস্মৃতপ্রায়।
গল্পের সেই রাতে ঢাকা থেকে রাজশাহীগামী সিল্কসিটির গন্তব্যে পৌঁছাতে অনেক দেরি হয়েছিল। মেহেরুন ট্রেনের একঘেঁয়ে ক্লান্তিকর ভ্রমণ শেষে প্রচণ্ড বিরক্তি নিয়ে প্লাটফর্মে পা রাখতে রাখতে প্রতিজ্ঞা করেছিল, চাকরির পরীক্ষা দিতে ও আর ঢাকা যাবে না। এ উটকো ঝামেলা। রেলস্টেশন থেকে বের হয়ে অটোর জন্য অপেক্ষায় থাকার সময়ও মেহেরুন বুঝতে পারেনি যে সামনে কী ভয়ংকর ঝামেলা ওর জন্য ওৎ পেতে আছে। দু’একটা অটোচালক ওর বাড়ির দিকে যেতে রাজি না হওয়ায় মেহেরুন রিকশার খোঁজ করছিল। ওর পাশে দাঁড়ানো লোকটির পরনে যে পুলিশের পোশাক ছিল তা প্রথমে খেয়াল করেনি মেহেরুন। আচমকা নিজের নিতম্বে ভারি কিছুর চাপ লাগাতে ও চমকে তাকিয়েছিল। সেই চাপ কোনো মানুষের থাবার তা মেহেরুন বুঝতে না বুঝতেই ওর ঘাড়ের কাছে কেউ একজন ঘন শ্বাস ফেলে জিজ্ঞাসা করেছিল, ‘রেট কতো?’ মেহেরুন উত্তর দেবার কোনো চেষ্টা না করে শরীরের সব শক্তি দিয়ে লোকটার গালে চড় বসিয়েছিল।
এরপরের ঘটনাগুলো খুব দ্রুত ঘটেছিল। দুদিন থানা-হেফাজতে থাকার পর মেহেরুন জানতে পেরেছিল ওর ভ্যানিটি ব্যাগে ১০৫ পিস ইয়াবা পাওয়া গিয়েছে। ওকে প্রথম যেদিন আদালতে চালান দেওয়া হয়, সেখানকার লালসালু ঘেরা রেলিঙ ঘিরে বারবার উচ্চারিত মিথ্যেগুলো কী করে সত্যি হয়ে গিয়েছিল তা মেহেরুন নিজেও টের পায়নি। আসামীর ডকে দাঁড়ানো মেহেরুন সমাজ-সংসারের অন্য সব মানুষের মতো নিজের দিকে সন্দেহের চোখে তাকিয়েছিল। ভেবেছিল, এ কোন মেহেরুন?
এ সেই মেহেরুন যে আজও জীবিত; কিন্তু জীবিত থাকলেও যে নিজের শরীরে লাশের গন্ধ পায়। লাশের গন্ধ কেমন, তা ও ঠিক জানতো না। ও আন্দাজ করতে পারে এখন ওর শরীরজুড়ে যে গন্ধ বর্তমান তা কেবল ওর মৃত মায়ের শরীরেই আছে। মেহেরুনের মা রোমেলা আনাস মারা গেছে। যদিও হাজতী মেহেরুন মায়ের লাশ ছুঁয়ে দেখার সুযোগ পায়নি, তবু ও বাড়ি ফেরার পর একজন পড়শির মুখে শুনেছিল; গোসল করানোর সময় ওর মায়ের লাশ থেকে ফুলেল সৌরভ ভেসে এসেছিল, যা কোনো পরিচিত পার্থিব সুগন্ধি না। মেহেরুন এখন নিঃসঙ্গ ঘরে সেই সৌরভের মাঝেই ভেসে বেড়ায়। এ এক অদ্ভুত গন্ধমাদকতা, যা কেবল নেশার জগতে বুঁদ হলেই পাওয়া যায়।
মেহেরুন কোনো মরা বাড়িতে যাবার পর দেখেছে আশ্চর্য এক কুহক ছড়িয়ে পড়ে লাশের খাটিয়া ঘিরে আর মৃতের মাথার কাছে আগরবাতি ভুরভুর করে ধোঁয়া ছড়ায়। লাশকে ঘিরে থাকা ক্রন্দনরত স্বজনেরা গলার রগ ফুলিয়ে বিবরণ দেয় লাশটির মালিক কতটা দরদী, কতটা পুণ্যবান ছিলেন। এছাড়া লাশ নিয়ে মেহেরুনের বিশেষ কোনো অভিজ্ঞতা ছিল না। তবে এখন মেহেরুন জানে কী করে লাশ হয়ে পড়ে থাকতে হয়। এ খুব সহজ কাজ। আরামদায়কও।
মেহেরুন যখন নেশাতে বুঁদ হয় তখন ওর মন-মগজসহ সারা শরীর ওর কাছ থেকে লোপাট হয়ে যায়। শরীর-মনে বেদনার সূক্ষ্মতম অনুভূতিও থাকে না তখন। এই চিলেকোঠার ঘরে মেহেরুনকে কে মাদক ‘হরষিনী’ সরবরাহ করে তার খোঁজ ওর বাবা রাখে না। মেহেরুনের বাবা এখন অর্ধমৃত, বিছানায় লেপ্টে থাকা প্যারালাইসিসের রোগী। এই বাড়িটা মেহেরুনের বাবা অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংক কর্মকর্তা কায়সার আহমেদের। দোতলা বাড়িটির চারটি ফ্লাটের একটিতে মেহেরুনের বাবা আর তার দ্বিতীয় স্ত্রী নিশি থাকে।
মেহেরুনের গল্পের বয়ান করতে গেলে প্রাসঙ্গিকভাবে নিশির গল্পও চলে আসে, যা গল্পের অনেকটা জুড়ে বেকায়দা এক পাখির আধভাঙা জোড়ডানার মতো ছড়িয়ে থাকে। এবার তাই খানিকক্ষণ নিশির গল্প বলা যাক।
দ্বিতীয় বিয়ের আগে থেকেই মহল্লার লোকজন কানাঘুঁষা করতো; কায়সার আহমেদ এক নম্বরের চরিত্রহীন, লম্পট, নিয়মিত গণিকালয়ে যায়। পুলিশের খাতায় নাম লেখানো মেয়ের হাজতবাস আর বুড়োকালে মেয়ের বাবার বিয়ের খবর শুনে পাড়া-প্রতিবেশিরা দিনের আলোতে আর এই বাড়িমুখো হয় না; নিজেদের বউ-ঝির ওপরেও নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। কেউ কেউ লুকিয়ে রোমেলার সাথে দেখা করে জানিয়েছিল, নিশিই সেই নিশিকন্যা। রোমেলার দুর্বল হৃদপিণ্ড সেই খবরের চাপ সামলাতে পারেনি।
কায়সার আহমেদের মতো গণিকাসঙ্গে অভ্যস্ত দু’চারজন পুরুষমানুষ নিশ্চিতভাবে নিশির পরিচয় জানলেও আজ অবধি তারা প্রকাশ্যে তা স্বীকার করেনি। অবশ্য এতে কারো কিছু আসে যায় না। নিশি যখন গৃহপরিচারক রাব্বিকে সাথে নিয়ে স্টেশনরোড কাঁচাবাজারের উদ্দেশ্যে রাস্তায় বের হয় তখন টঙ দোকানে চা পানরত পুরুষেরা আড়েআড়ে নিশির দিকে তাকায়। উন্মাতাল দৃষ্টিতে ঘন ঘন শ্বাস টেনে তারা নিশির ছড়িয়ে যাওয়া পারফিউমের সুবাস নিজের ভেতরে নেয়। কয়েকপ্রস্থ পোশাকের আড়ালে থাকা সুডৌল শারীরিক গড়নের সাতাশ/আটাশ বছর বয়সী এই নারীকে দেখতে দেখতে একসময় তারা দম ফুরানো ভঙ্গিতে বসে থাকে। তারপর লম্বা একটা শ্বাস ফেলে সশব্দে কাপের ঠান্ডা চায়ে চুমুক দিতে দিতে বুড়ো বয়সে কায়সার আহমেদের ভিমরতি নিয়ে মুখরোচক আড্ডায় মাতে আর নিজেদের শরীর উষ্ণ করে তোলে।
এসব পুরুষের কেউ কেউ রাতে বিছানায় নিজের স্ত্রীর বুড়িয়ে যাওয়া থলথলে শরীরে সেই উত্তাপ ছড়াবার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। উল্টোদিকে তাদের গৃহলক্ষীরা সারাদিনের সাংসারিক পরিশ্রম শেষে নিজের নিরুত্তাপ শরীর নিঃসংকোচে পেতে দিয়ে স্বামীকে সন্তুষ্ট করতে পারার সুখযন্ত্রণায় মেকি সুরে গোঙায়। তখন তাদের পতিদেবতারা কায়সার সাহেবের সৌভাগ্যের কথা ভেবে ঈর্ষাকাতর হতে হতে মুচকি হাসে, ‘বুইড়া খাটাসটার তো এখন আর খেইল দেখানোর বয়স নাই, শরীরও নাই।’
কায়সার আহমেদ নিশিকে বিয়ে করেছিলেন প্রথম স্ত্রী রোমেলার জীবদ্দশাতেই। তখন মেহেরুন মিথ্যে মামলায় হাজতবাস করছিল। চার মাস সাত দিন পরে মেহেরুন যেদিন বাড়িতে ফিরেছিল সেদিন বাবা-মায়ের শোবার ঘর থেকে মায়ের শাড়ি পরিহিত মেয়েটিকে বেরিয়ে আসতে দেখে বিবমিষায় ওর শরীর গুলিয়ে উঠেছিল। অবিনাশী ক্রোধে দিশেহারা হয়ে ও নিশিকে টানা-হেঁচড়া করতে করতে চিৎকার করেছিল, 'তুমি শেষ পর্যন্ত একটা বেশ্যাকে ঘরে তুলেছো?' কায়সার আহমেদ প্রচণ্ডবেগে ছুটে এসে ওর দুগালে চড় মেরেছিল। মেহেরুনের ফর্সা গালে বাবার হাতের ছাপ বসে গিয়েছিল সেদিন। তারপর 'তোমার মতো জানোয়ার, নোংরা মানুষের টাকায় থুতু দিই' বলে ঘর ছেড়েছিল মেহেরুন। ঘর ছেড়ে ও তখন সত্যি সত্যি নেশা ধরেছিল।
মেহেরুনের স্মৃতিকোষ মৃতপ্রায়। ও ভুলে গেছে, যে টাকাতে একদিন থুতু মারত সেই টাকার প্রয়োজনে কবে ও বাড়ি ফিরেছিল। আগে হঠাৎ হঠাৎ হাজিরা বাদ পড়ায় পুলিশ বাড়ি এসে মেহেরুনকে ওয়ারেন্টমূলে ধরে নিয়ে যেত, খণ্ডকালীন হাজতবাস শেষে ও ফিরেও আসতো। নেশার জগতে তৈরি হওয়া নতুন বন্ধুরা উকিলের কাছে গিয়ে দুএকবার জামিন অপব্যবহার করা মেহেরুনের জামিনও করিয়েছে। সেই মামলায় খালাস পেয়েছে মেহেরুন, কিন্তু নেশায় গারদে নিজেই নিজেকে বন্দি করেছে। প্রথম প্রথম বন্ধু-বান্ধব, হিতাকাক্সক্ষীরা মা মরা মেয়েটার দুর্ভোগ দেখে ঠোঁটে চুকচুক শব্দ করে আফসোস করতো। ধীরে ধীরে মেহেরুনকে সবাই পরিত্যাগ করেছে।
মেহেরুন ও তার পরিবারের সংশ্রব ত্যাগ করলেও মহল্লার লোকজন এখনো কায়সার আহমেদের বিয়ের মুখরোচক গল্পটি ভোলেনি। বরং সদ্য ভাজা মুড়ির মতো সেই গল্প এখনো মুচমুচে। তাদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু এখনো নিশি যে কামমেদুর নিশিতে মহল্লার পুরুষদের স্বপ্নে হানা দেয়, স্পর্শহীন চটুলতায় চলতি পথে তাদের কামার্ত করে।
আর দিনশেষে নিশি হানা দেয় চিলেকোঠার ঘরে, যেখানে মেহেরুন নেশায় আপাদমস্তক ডুবে থাকে। প্রথমদিকে নিশি মেহেরুনের কাছেও ঘেঁষতো না। কায়সার আহমেদ বিছানায় পড়ার পর এই বাড়ির তদারকির দায়িত্ব ঘাড়ে পড়ায় মেহেরুনের খোঁজখবরও নিশিকে রাখতে হয়। এই বাড়িতে চারটি ফ্লাট। কায়সার আহমেদ যেটিতে সস্ত্রীক থাকেন সেটি বাদে তিনটি ফ্লাটের মধ্যে দুটির ভাড়া নিশির হাতে যায়। আরেকটির ভাড়া গত ছয়মাস ধরে মেহেরুন পায় কিংবা পায় না। মেহেরুনের জন্য এই ব্যবস্থা করে দিয়েছে ওর বড় চাচা হায়দার। নিশির তীব্র আপত্তি সত্ত্বেও মেহেরুনের সিঙ্গাপুর প্রবাসী চাচা কুরবানি ঈদ উপলক্ষে দেশে আসার পর ভাতিজির জন্য এই ব্যবস্থা করে গেছেন। এ নিয়ে বিছানায় নিথর পড়ে থাকা কায়সার আহমেদকে এখনও কম গঞ্জনা সহ্য করতে হয় না। চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত পেয়ে বিছানায় শুয়ে থাকা কায়সার আহমেদের অবশ্য এতে কোনো ভ্রুক্ষেপ হয় না। মেহেরুনেরও না।
জাগতিক বিষয়ে ভ্রুক্ষেপহীন মেহেরুন ঠিক এই মুহূর্তে চিলেকোঠার ঘরের চৌকাঠ বরাবর লম্বা হয়ে শুয়ে আছে। কারো ছায়া ওর শরীরের ওপর পড়ে। মানব শরীরের ছায়া দেখে মেহেরুন নারীর স্বভাবজাত তাড়নায় ধড়ফড় করে ওঠে না বা ওড়না টানতে ছোটে না। নির্জীব পড়ে থাকে।
কে যেন ওকে ডাকে। ডাকতেই থাকে-মেহেরুন, মেহেরুন...। আষাঢ়ে বৃষ্টির নিরলস ঝরে পড়া সেই ডাক শুনে ও বুঝতে পারে না, এই সম্বোধনযোগ্য নামটা ঠিক কার। আবার কেউ ডাকে, মেহেরুন, মেহেরুন...। ছায়াশরীরটি ঝুঁকে পড়ে ওর কপালে হাত রাখে। এই মুহূর্তে স্বর্গ থেকে বিচ্ছিন্ন হবার কোনো ইচ্ছে ওর নেই। কিন্তু মেহেরুনের জগৎবিচ্ছিন্নতা উপেক্ষা করে সে ডেকেই চলে...। এবার ডাকের পৌনঃপুনিকতা মাথার শক্ত খোলের ভেতরের নরম স্তরে বিষাক্ত সাপের দংশন বসিয়ে মেহেরুনকে জাগিয়ে তোলে।
বিরতিহীন ঘুমানোর মধ্যে যেমন একটা প্রশান্তি আছে তেমনি এভাবে আধো-ঘুমে আধো-জাগরণে থাকার মধ্যেও তুমুল আনন্দ আছে, যা ওর নষ্ট করতে মন চাইছে না। আবার সেই ডাক, মেহেরুন, মেহেরুন...। ও চকিতে তাকায়। ওর দৃষ্টি ঘোরগ্রস্ত। এই দৃষ্টিতে বন্দুকের গুলিতে ঝাঝরা হয়ে যাওয়া বিক্ষিপ্ত স্বপ্নেরা নেশায় চুর হয়ে আছে। মেহেরুন এবার অনাকাঙিক্ষত আহ্বান উপেক্ষা করে স্বপ্ন দেখে। স্বপ্ন দেখতে দেখতে মায়াবী একটা হাসি ওর ঠোঁটের ভাঁজে আলগোছে লেগে থাকে।
এই স্বপ্ন হরেক রকম। যে স্বপ্নে জুবেরি ভবনের সামনের রাস্তা ধরে অহেতুক গালগল্প করতে করতে এক ঝাঁক পায়রার সাথে একটি চঞ্চল মেয়ে উড়ে বেড়ায়। কবিতার নিমগ্ন প্রহর শেষে সন্ধ্যার ধূপছায়া আলোয় রিকশায় যেতে যেতে দুজন মানুষ প্রথম স্পর্শের মোহময়তায় বিভোর হয়; প্যারিস রোডের নতজানু গগনশিরিষের ছায়ার নিচে পাশাপাশি শব্দহীন হাঁটতে হাঁটতে হীনস্বাস্থ্যের ছেলেটির চিবুকে লেগে থাকা রোদরেখা দেখে মেয়েটি আনমনা হয়ে ওঠে।
মেহেরুনও আনমনা হয়। কেউ ওর নাম ধরে ডেকে বলে, মেহেরুন, চল কফি খাই। শুনে ওর দু’চোখের পাতায় আবার মখমলী স্বপ্ন নামে।
কফিশপের ঝাঁঝালো আড্ডায় মেয়েটি হৈ হৈ করে ওঠে, ‘মামা, তুমি কোন দোকান থেকে চিনি কিনো গো? দাম কম পাও? না ওরা চিনি মুফতে দেয় তোমায়?’ ছেলেটি অকারণ খুনসুটিতে মাতে, ‘আরে না মামা, একেবারে ফার্স্টক্লাস কফি, ওপরে যে কদানা কফিগুঁড়ো ছড়িয়েছো এর সাথে আরও কদানা চিনি মেরে দাও তো। আহ মামা, যা বানিয়েছো না...ইচ্ছে হচ্ছে তোমার হাতে চুমু খাই।’
ছেলেটি মেহেরুনের প্রাক্তন প্রেমিক। যে এখন দিনশেষে মেদসর্বস্ব শরীর নিয়ে তার ক্ষীণাঙ্গী স্ত্রীর ওপর হামলে পড়ে চুমু খায়। ভাঙাচোরা মেহেরুনকে ভুলে গিয়ে আসলে সবাই ভরপুর আছে। এমনকি মেহেরুনের প্যারালাইজড বাবারও একটা দাম্পত্য জীবন আছে, সুস্থ হবার স্বপ্ন আছে। মেহেরুনের কিছু নেই। এ কথা মেহেরুন জানে। বিশেষ করে নেশার তেজ থিতিয়ে এলে মেহেরুন ঘর ছেড়ে ছাদে এসে দাঁড়ালে বাতাসের কানাকানিতে ওর মনে পড়ে, ওর জীবনে এখন জীবন নেই। জীবনহীন শরীর বড় অপয়া। ভারি। যে শরীর উপড়ে ফেলতেও ওর কষ্ট হয়।
মেহেরুন উঠে দাঁড়ায়। খানিকক্ষণ আগে ওর ঘোর কেটে গেছে। ক্ষুধা পেয়েছে। এতক্ষণ বোঝেনি। নিঃশ্বাস টানতেই খাবারের পচা গন্ধ ওর নাকে লাগে। মেহেরুন টেবিলের কাছে গিয়ে সরপোশের আড়াল থেকে ভাতের থালা বের করে। কাঁচা পেঁয়াজের হলদেটে আলুভর্তা ঘেমে সাদাটে হয়ে গেছে। মেহেরুন ভর্তার অর্ধেকটা খায় আর অর্ধেকটা ঘরের কোণে ছুঁড়ে মারে। এই ঘরটি এমন অনেক খাদ্যাংশ আর আবর্জনায় ভরা। ঘরে একটা খাট, একজন শোয়ার পর যাতে আর ফুটখানেক জায়গা থাকে; একটা আধভাঙা আলনা; যেখানে মেহেরুনের গোটাকতক সালোয়ার কামিজ, আধময়লা অন্তর্বাস বেকায়দায় ঝুলছে। এছাড়া এই ঘরে ঘুণেধরা টেবিল চেয়ার আর একটা আর.এফ.এল এর প্লাস্টিকের টুল আছে।
মেহেরুন সেই টুলে বসে কাচকি মাছের চচ্চড়ি দিয়ে আঁঠালো ভাতের কয়েক দলা মুখে নেয়। এরপর বোতলে মুখ রেখে ঢকঢক করে পানি খায়। গলায় পানি আটকে গিয়ে কাশতে কাশতে ও হাসে, ‘কে আমার নাম নেয়!’

এত দেরি কইরা ভাত খাও ক্যান? নেশা কইরা সুখে পেট ভইরা ছিল?

মেয়েটিকে প্রথমে চিনতে পারে না ও। যখন চিনতে পারে তখন ওর মন চলে যায় অচেনা পথে। যে পথে অনন্ত বিতৃষ্ণার চোরাবালি। ঘরের মেঝেতে একটা পাখির পালক পড়ে আছে। মেহেরুন সেটা তুলে নিয়ে নিচের দিকের ভারি অংশ সরিয়ে সামনের কোমল দিকটা দু’আঙুলের ভাঁজে মোলায়েম করতে থাকে। পালকটির অগ্রভাগ ডান কানের ভেতরে ঢুকিয়ে আলতো করে ঘুরাতে ঘুরাতে আবেশে ওর দু’চোখের পাতা বুঁজে আসে।

কোন পাখির পালক গো এটা? এত আরাম? পরের বার এলে ডেকে দিও, দুটো গল্প করবো। ও যাবার সময় দুটো পালকও ছিঁড়ে রাখবো।

নিশির মাথা থেকে পা পর্যন্ত চিড়বিড়ে একটা রাগ ছড়িয়ে পড়ে।

আমারে দেখলেই যত ভোগলামি। ওই যে কয় না, জাতে মাতাল তালে ঠিক! তুমি গতকাল রাইতে রাব্বিরে কী বলছো?

মেহেরুন জবাব দেয় না। ওকে নিশ্চুপ দেখে নিশি তেতে ওঠে।

তুমি কি রাব্বিরে নিচতলার গফুর সাবের কাছ থেইকা ভাড়ার ট্যাকা আনতে বলছো?

চোখের কোণের পিঁচুটি সরাতে সরাতে মেহেরুন নিশির দিকে তাকায়। মেহেরুনের চুল রুক্ষ, মুখ অপরিচ্ছন্ন। ওর মুখে হাসি ফোটে। হাসতে হাসতে ও ঠোঁটের কোণের ফুস্কুরি পরিষ্কার করে।

রাব্বি খুব ভাল। ওর সাথে আমার মায়ের দেখা হয়। ওর কাছে মা আমার জন্য গাদি গাদি জোছনার ফুল দেয়।

মেহেরুনের কথা শুনে নীল বিষে নিশির মুখশ্রীর ভরাট সৌন্দর্য হারিয়ে যায়। একটা ফণা তোলা সাপের চেরা জিভ হিসহিসিয়ে ওঠে,

ন্যাকামি কইরো না। আমার কাছে ওইসবের ভাত নাই। তুমি কোনো ভাড়ার ট্যাকায় হাত দিতে পারবা না। তোমার যা লাগবো আমি দিমু। বইসা বইসা দুইবেলা ভাত খাইতেছ, আল্লাহর কাছে শোকর করো।

ভাতে বকুল ফুলের গন্ধ। থোকা থোকা সাদা বকুল।

বাতাসের কল্লোলে দুটো অলকানন্দা ফুল উড়ে এসে মেহেরুনের পায়ে লুটায়। গন্ধহীন হলুদ ফুল দুটো হাতে তুলে নিতেই ও শুনতে পায় ফুলেরা বিপুল ফূর্তিতে কানাকানি করছে, ‘মা, ভালো আছে। খুউব ভালো আছে।’
মেহেরুন ভাঙা ভাঙা হাসি মুখে নিশির দিকে তাকায়। ওর দৃষ্টি অস্বচ্ছ। যেখানে ঘৃণার ক্লেদ নেই, ক্রোধের দহন নেই। তবু সেই দৃষ্টিতে কিছু একটু দেখতে পেয়ে নিশি চমকে ওঠে। ওর মনে পড়ে, এই নেশাখোর মেয়েটা প্রথম দেখার দিন প্রবল আক্রোশে ওর মুখে থুতু দিয়েছিল। ওকে বিশ্বাস করা যায় না। হোক না, বিষদাঁত ওপড়ানো। যে কোনো সময় যে কোনোকিছু করে ফেলতে পারে।

কয়েক পা পিছু হটে তর্জনী উঁচিয়ে নিশি সতর্কবাণী শোনায়,
কাছে আগাইবা না। বেশি ফড়ফড় করলে ডানা দুইটা কাইটা দিমু। বাপের মতো বিছানায় পইড়া থাকবা, মুখ দিয়া লালা ঝরবো। নেশার বড়ি দূরে থাক, মুখে এক লোকমা ভাতও জুটবো না।

নিশি আর দাঁড়ায় না। ধোঁয়াহীন অনলে পুড়তে পুড়তে ও সিঁড়ি ধরে নিচে নেমে যায়। অনেকক্ষণ ওর ধুপধাপ পদশব্দ শোনা যায়। নিশির উৎকণ্ঠাকে মিথ্যে প্রমাণ করে মেহেরুন ভাবলেশহীন দাঁড়িয়ে থাকে। যেন একটা বোবাবৃক্ষ, যার পাতাহীন শাখা-প্রশাখা নতজানু। শত আঘাতেও ওর ভেতরে অনুভূতির কোনো কম্পনের সৃষ্টি হয় না। দূর থেকে দেখলে মনে হয় শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সাড়হীন মেহেরুন তালিমারা জীবনের গতিহীনতায় আটকে গেছে।
নিষ্প্রভ, নির্বাক মেহেরুন অবিন্যস্ত পা ফেলে ছাদের মাঝখানে দাঁড়ায়। ওর শরীরে নরম বাতাসের ছোঁয়া লাগে। বাতাসে বকুল ফুলের গন্ধ। দীপ্তিহীন মেহেরুনের ‘ত্যাজহীনতা’ সেই বাতাসকে বিমর্ষ করে। বাতাসের দোলায় সন্ধ্যার ম্লান আলোটুকু ফুরিয়ে যায়। আকাশের স্লেটে পাখিদের যুক্তাক্ষরে তৈরি হতে থাকে নানান জ্যামিতিক রেখা। সেই রেখা দূরে, বহুদূরে যেতে যেতে ক্রমশ মিলিয়ে যায়। আবছা আলোতে ফিরে যাবার সুতীব্র বাসনা দেখা যায় না আর। একসময় আকাশের গা উপচে পড়া অন্ধকারে শেষ আলোটুকু উবে গিয়ে পৃথিবী অনন্ত ঘুমকালে বন্দি হয়ে যায়। সেই সাথে অন্ধকারে হারিয়ে যায় মেহেরুন। মেহেরুনের গল্পও।