সাহস

অরবিন্দ চক্রবর্তী ও হামিম কামাল



তাসখেলা বাদ দিয়ে যারা যুদ্ধ করেন, জনৈক দার্শনিক তাদের পরামর্শ দিলেন—
আস্ত জীবন নিয়ে বাঁচতে চাইলে জুয়া খেল।
জুয়া খেললে আয়ু বেড়ে যায়!

(সাহস)


ঝিরঝিরিয়ে পাতা নেড়ে বেল গাছটা বলল, ‘ওই যে, ওরা আসছে। দেখো? কেমন করে হাঁটছে! একদম তালে তালে ফেলছে পা, নাটক আরকি। জিরি জিরি জিরি!’
বেলগাছের নিচে চেয়ার পেতে বসে নিয়মিত রোদ পোহান এক অবসরপ্রাপ্ত সেনাকর্মকর্তা। তার বিরান এবং নধর মুখটা হাতে চেপে চেপে তিনি কোষের ভেতর জড়ো হয়ে থাকা তেলের কাছে ডাক পাঠাচ্ছিলেন। তাকিয়ে বললেন, ‘দুজন যেন মার্চ করছে। মার্চ! ডবল মার্চ! দূর হয়ে যাও চোখের সামনে থেকে যতদ্রুত পারো Stupid fools!’ *১
বাসস্টপেজের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মাঝবয়েসী পিঠাওয়ালার চোখের সামনে অসচ্ছ কাচের এক বাকশো। তার ভেতর দিয়ে দেখা যাচ্ছে ঢেউ খেলানো একজোড়া কালো অবয়ব। দ্রুত এদিকেই আসছে। কিছু পোড়ো রঙা নকশি পিঠা একটার ওপর একটা চড়িয়ে সাজানো এই কাচবাকশের ভেতর।
পিঠাওয়ালাকে একটু আগেও অন্য হকারদের কানে মুখ ফুঁকতে দেখা যাচ্ছিল। বোধয় কারো সঙ্গে বাজি ধরেই তালে তালে পা ফেলে দ্রুত এগিয়ে আসতে থাকা লোকদুটোর পথে বাধা হয়ে দাঁড়াল লোকটা। আমুদে কণ্ঠে বলল, ‘পিঠা খাবেন গো? কেরানীগঞ্জর জামাই পিঠা লো সখী!’
এতোটাক্ষণ বেশ সাহসী আর বেপরোয়া একটা ভাব ছিল পিঠাওয়ালা লোকটার হাঁটায়, কথায়। ওই জোড়া লোকদুটো কাছাকাছি আসতেই হঠাৎ কী যেন হয়ে গেল। মনের ভেতর একটা কালো পাখি ডানা ঝাপটে উড়ে গেল তার। আরো কী কী বলবে বলে ঠিক করে রেখেছিল লোকটা, বলা হলো না।
কালো জামা পরা লোকদুটো যেন হাঁটার গতি আরো বাড়িয়ে জায়গাটা পেরিয়ে গেল।
এর খানিকটা সামনে বিরাট মাঠ। সকাল সকাল শরীরচর্চায় নেমে পড়েছে আগাগোড়া সাদায় মোড়ানো একদল ক্রিকেটার। হঠাৎ ওরা খেলা থামিয়ে মাঠের ধার ঘেঁষে যেতে থাকা লোক দুটোকে দেখতে থাকল। কেউ হেসে ফেলল সশব্দে। কেউ চোখে ভয় নিয়ে দ্রুত মুখ ফেরাল, যেন এসব দেখতে নেই।
ঘর্মাক্ত অধিনায়ক লোক দুটোর ওপর চোখ রেখে কপালের ঘাম ফেলেই চিৎকার করে উঠল, ‘খবরদার, ফেরো সবাই! এটা খেলা না, এটা আমাদের জীবন!’
ক্ষিপ্ত কণ্ঠ শুনে সবাই চট করে ফিরে তাকালেও কারো কারো আড়চোখে তখনও ছায়া ফেলে এগিয়ে চলেছে কালো কোট পরা ওই লোক দুটো। কী এক অব্যাখ্যেয় রহস্য ওরা বীজের মতো ছড়াতে ছড়াতে যেন চলেছে।
অফিসগামী লোক থেকে শুরু করে রিকশাভ্যানের চালক, বাসের যাত্রী, ছোট ছোট শিশু সবাই কাজ ফেলে ফিরে ফিরে দেখতে থাকল সেই সার্কাস। লোক দুটো একদম একসঙ্গে পা ফেলছে, হাত নাড়ছে, তাকাচ্ছে এদিক ওদিক। বেশিরভাগ সময়ে একজন ডান পা ফেললে অপরজন ফেলছে বাঁ পা। একজন বাঁয়ে তাকালে আরেকজন ডানে। যেন গম্ভীর মুখে ওরা মজার কোনো খেলা দেখাচ্ছে।
ময়লা জামার পথশিশুদের একটা দল সব সময়ের মতো এবারও জুটে গেল ওদের পেছনে। লোক দুটো ভয় পেয়ে উল্টোসিধে তাকাতে লাগল, পরম্পরা রেখেই। চোখে ভয় ফুটে আছে। শিশুদের মতো উৎপাত আর কিছু কি আছে? ওদের সবচেয়ে বড় শক্তির জায়গাটি হলো, ওরা দুর্বল, ওরা সুন্দর।
জায়গাটা দৌড়ে পেরোনোও নিরাপদ নয়। তাতে বাচ্চাগুলো মরিয়া হয়ে উঠবে তো বটেই, সঙ্গে এলাকার নেড়ি কুকুরগুলোও পেছন পেছন ছুটতে শুরু করবে। ওরাও ওকে চোখে চোখে রেখেছে বোঝা যায়। এদিকওদিক দেখলেই পিছু নেওয়ার পাঁয়তারা।
কুকুরের সামনে কখনো দৌড়াতে নেই। তবে ওদের হাত করা সহজ। লোক দুটোর একজন একটা খোলা মুদির দোকানে গিয়ে এক প্যাকেট নোনতা বিস্কিট কিনে মোড়কটা ছিঁড়ে হাতে রাখল। আর আগা গোড়া বিহ্বল চোখে তাকিয়ে থাকল তার জোড়ার অপর লোকটা। যেন দুটি জমজ ভাই। একটি পথচলার মতো সপ্রতিভ। অপরটি বোবা, কালা, নির্বোধ। এবং ভীত। কেন আসছে কেন যাচ্ছে তার কিছু সম্বন্ধে কোনো জ্ঞানই যেন তার নেই।
দোকানির সন্দিগ্ধ চোখ ওদের দৃষ্টি এড়াল না। তবে এ নিয়ে কথা বাড়ানোরও কোনো অবকাশ নেই।
একদিন দু’দিন করে আজ সাতটি দিন এই শহর তাকে একসঙ্গে পাগল প্রতিপন্ন করে তুলতে চাইছে।
বেশ খানিকটা পথ এগোতে লাঠি হাতে মাঠ থেকে ফেরা বুড়োদের একটা দল তাকে আগাগোড়া পরখ করে নিজেদের ভেতর কী সব আলাপে লেগে গেল।
প্রায় একই কা- করল আগাগোড়া কালো কাপড়ে মোড়া তরুণীদের ছোট একটা দলও।
সুবেশি তরুণ তরুণিদের কেউ কেউ তাদেরকে উচ্চকণ্ঠে কিছু বলে উঠল, ‘জনাব’, ‘ভদ্রলোক’ এসব সম্বোধন করে। কিন্তু শোনার অবকাশ কোথায়।
কুকুরগুলো বোধয় মানুষের দেওয়া বিড়ম্বনার বাড়াবাড়িতে লজ্জা পেয়ে পিছু ছেড়ে দিয়েছে। বিস্কিট সমোড়ক সপ্রতিভ লোকটির প্যান্টের পকেটে চলে গেল।
অফিসে কাজের ইতি টেনে লোকের অযাচিত ভিড় আর প্রশ্নময় চোখ এড়িয়ে এসে ছোট্ট শহরের একেবারে শেষপ্রান্তে চলে এলে, লোক দুটোর হাঁটার গতি কিছু শ্লথ হলো।
এমন সময় দূর থেকে দেখতে পেল, স্কুলের পোশাক পরা ছোট্ট একটি মেয়ের হাত ধরে রাস্তার এক পাশে দাঁড়িয়ে আছে দীর্ঘাঙ্গী এক নারী।
ওরা চেনা মানুষ। মেয়েটির নাম নিশিথিনী। মায়ের নাম নীল। পরনের নীল শাড়িতে ছোপ ছোপ সাদা মেঘ।
মেয়েটি এক হাতে ফিতেওয়ালা জলের বোতল দোলাচ্ছে আর আগ্রহী চোখে দেখছে লোক দুটোকে। কিন্তু তার মা ভদ্রমহিলা চোখ এদিকে পড়ামাত্র ফিরিয়ে নিলো।
লোকজোড়ার সপ্রতিভজন ছোট্ট মেয়েটির দিকে তাকিয়ে খানিকটা নত হয়ে হাত নাড়ল একবার। গোটা পথে কেবল এই একটিমাত্র মানুষকে সে পেয়েছে যার কাছ থেকে নিষ্কৃতি পেতে দ্রুত পা চালানোর পরিবর্তে তাকে পাল্টা সম্ভাষণ জানানো যায়।
মা মেয়েকে পেরোনোর পর তাদের বাড়ি আর বেশিদূর নয়। মাথার পেছনে সূর্য রেখে, বুড়ো বেলি ফুলের গাছে ভরা উঠোনটা পেরিয়ে লোকটা সাদারঙা কাঠের দরজার চীনা তালায় চাবি ঢুকিয়ে মোচড় দিলো। কবাট ফাঁক করে ঢুকে পড়তেই পেছন পেছন সুট করে তার বিহ্বল মূর্তিটিও।
স্নানঘরের আয়নার দিকে ওরা তাকিয়ে থাকল দীর্ঘসময়। সপ্রতিভ এবং বিহ্বল দু’জনই দেখতে পেল, আয়নার একটিমাত্র বিম্ব পড়েছে।




আমি পান আঁকা বুকে উড়াল
ও দেয়ালে আদর ঘষে সুইচ টিপে দিই।
চাঁদ তো নেভে না!

(ছিপি ব্যানার্জির ফ্যান্টাসি ব্রোথেল)


বড় আয়নাধরা সাজটেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে চুল আঁচড়ানোর ফাঁকে নীল ভাবছিল হঠাৎ বদলে যাওয়া লোকটার কথা।
লোকটা এ শহরে এসেছে এক মাস। সেই থেকে একাই থাকছে। এ মুহূর্তে যদিও সে একা নয়। একা নয়? যাহোক, নিজ থেকে কোনো সামজিকতায় এগিয়ে না এলেও, কেউ ডাকলে কখনও ‘না’ করেছে বলে কেউ শোনেনি। অবশ্য নতুন আগমনকারী হিসেবে ডাক সে পেয়েছে অল্পই। আবার, ঢাকার মতো শহরের সঙ্গে তুলনা করলে এই অল্পই অনেক বেশি বলে গণ্য হতে বাধ্য।
নিশিথিনীর জন্মদিনে একবার বলতেই রাজি হয়ে লোকটা সময়মতো চলে এসেছিল। মেয়েটার আটতম জন্মদিন ছিল ওটা। আট একটা বিশেষ সংখ্যা নীলের কাছে। আট ফিবোনাকি সংখ্যা এবং এই আট বছর বয়েসে নীল জলে সাঁতার কাটতে শেখে এবং তার জীবনের মোড় ঘুরে যায়। তার বাবামাহীন একাকী জীবনের সূচনাসময় এই আট। যদি তার জীবনে আটতম বছরটা না আসত তো আজ নিশিথিনী নামে পৃথিবীতে আরো অনেক মেয়েই থাকত কিন্তু এই নিশিথিনী নয়।
নীলের প্রিয়তম কবিতা আট বছর আগে একদিন।
নিশিথিনীর এই আটতম জন্মদিনটা সে তাই বিশেষভাবে পালন করতে চেয়েছিল।
লোকটা তার কথা রেখেছিল এবং শুধু তাই নয়। দুই হাতে একটা লাল কেক ধরে রেখে কনুই দিয়ে দরজার বেল চাপতে চেষ্টা করছিল। তখন পেছনে স্বয়ং নীল এসে উপস্থিত। নীল বাজারে ভিনিগার কিনতে গিয়েছিল ভাগ্যিস। তাই লোকটার হাতের লাল মখমল নামের অপূর্ব কেকটা রক্ষা করা গেছে।
টেবিলের ওপর কেকটা রাখার পর লোকটার চোখদুটো হাসি হাসি হয়ে উঠল। এরপর কণ্ঠে ভীষণ সংকোচ ঢেলে বলল, ‘আমি ক্ষমা চাইছি। আসলে আমার কোনো ধারণাই ছিল না যে, এ বয়েসের বাচ্চারা আসলে কী পছন্দ করে, তাদের জন্মদিনে আসলে কী আনা উচিৎ।’
লোকটার কণ্ঠস্বর মনে রাখার মতো সুন্দর। না, ভরাট পুরুষালি কণ্ঠ নয়। কিন্তু তার উচ্চারণের ভেতর একটা কিছু ছিল যেটা ঠিক ভরসা না জাগালেও কেমন প্রেম জাগায়। হ্যাঁ, প্রেমই যথাশব্দ।
লোকটা বলছিল, ‘তো, যেটা করলাম, শেষমেশ, যাকে বলে বুদ্ধি করে, এই কেক নিয়ে নিয়ে এলাম, যেন সবাই অন্তত খেতে পারে।’
লোকটার খুবই কুণ্ঠিত ছিল। তাই এতো বেশি অনাবশ্যক শব্দ ব্যবহার করছিল কথায় যে একেকসময় অন্যেরা কথাই বলে উঠতে চাইছিল মধ্যখানে। অভদ্রতা হয় বলে তা করেনি। কিন্তু নেহাৎ ভদ্রতা করেই নিজেদের দমিয়েছে, অনেকের চেহারা দেখেই খুব বোঝা গেছে।
‘খেলনা আনিনি কেন, কারণ আনলে দেখা যেত হয়ত সেটা তার আছে। কে জানে হয়ত এই সামান্য কেকই; তাছাড়া, এমনকি খেলনা তো বাচ্চাদের এমনিতেই অনেক থাকে। আসলে যদি কোনোটা আবার কমন পড়ে যায়, তো এটাই কারণ। ব্যাপারগুলো, বুঝতেই পারেন, মানে ঠিক আমার ব্যাপার নয় আরকি, এটাই কারণ।এসব কিছুতে ভীষণ কাঁচা আমি। শুধু এসব কিছুতেই নয় আসলে, আমি আরো...’
কে শুনবে এতো কথা? নেহাৎ নতুন বলে কেউ কেউ তাকিয়ে ছিল এই ভরসায় লোকটা কথা বলতে শুরুও করেছিল এবং তাকে যথেষ্ট সুযোগ দেওয়া গেছে।
কেক এসেছিল সব মিলিয়ে ছ’টা। তিনটা কাটা হয়েছে, আর তিনটা চলে গেছে শীতকে। তার ভেতর ওই বেচারার কেকটাও ছিল। ওর কেকটা কাটা হলো না দেখে মনে হয়েছিল ভদ্রলোক যেন খানিকটা ক্ষুণ্ন হয়েছে। হওয়াটা অপরাধ নয়।
একা মানুষ অল্পেই ক্ষুণ্ন হয়। নীলও একটা দীর্ঘ সময় একা কাটিয়ে খুব ভালো করেই জানে অবসর, একাকীত্ব এসবে অভ্যস্ত না হতে পারলে ভয়ঙ্কর বিপর্যয় হতে পারে। বিপরীতে অভ্যস্ত হতে পারলে স্বর্গ থাকে হাতের মুঠোয়।
নিশিথিনীর জন্মদিনে এলাকার আরা যারা এসেছিল সবাই তার বাবার ব্যাপারে জানে বলে তারা কেউ ওর খোঁজ করেনি। নতুন বোকা লোকটাই কেবল নিজের বিপদ নিজেই ডেকে আনল। সেই কেবল জিজ্ঞেস করে উঠল তার কথা। বোধয়ও আর কোনো কথাই তার মনে আসছিল না।
‘ইয়ে ওর বাবা কোথায়?’
উত্তরটা নিশিথিনীই দিয়েছিল।
‘আমার বাবা তো নেই। মারা গেছে। হিমালয়ে চড়তে গিয়ে বরফ ধসে হয়, তারপর পড়ে গেছে। কোথাও পাওয়া যায়নি। হিরণ কাকু তাকে কত খুঁজেছে! তাকে না নিয়ে বুঝি ফিরবেই না। কিন্তু পায়নি। হিরণ কাকুও আজ আসেনি। জন্মদিন ছুটির দিকে পড়েনিতো, তাই। ছুটির দিন ছাড়া কাকু কোথাও আসতে পারে না।’
ছোট্ট মেয়ের মুখে কথাগুলো শুনে নয়, বরং এক অচেনা পরিবারের এই অদ্ভুত বিয়োগব্যথা খুঁচিয়ে বের করার অপরাধবোধে লোকটা এরপর একদম শামুকের মতো গুটিয়ে গেল।
আর নিশিথিনীরও কিছু আলাদা ব্যাপার যেন আছে। ওর বয়েস আট হলেও ওর পক্বতা ঠিক আট বছরের কোনো শিশুর নয়। কী কথায়, কী কাজে তা অনেক বড়কেও হার মানায়। ওর আচার আচরণ কথাবার্তায় শিশুতোষ ভাব অল্পই। একেকসময় মনে হয়, ওর মাথাটাও যেন স্বাভাবিকের চেয়ে খানিকটা বেশি ভারি। যেন ওর মস্তিষ্ক তার আকার অনুপাতে করোটির যথেষ্ট বিস্তার পায়নি। কালো মেঘের মতো ঘন জমাট হয়ে আছে।
ছোট বেলা থেকেই কথাটা নীলের মনে হতো। শুনে সূর্য ‘আরে ও কিছু না’ বলে উড়িয়ে দিলেও পরে চুপ হয়ে যেত। যেন মনের ভেতর কোনো হিসেবের নিকেশ করছে।
এসব ভাবতে ভাবতেই মেয়ে এসে উপস্থিত।
‘মা, আমাকেও কাজল পরিয়ে দাও। চোখের ওপরে না শুধু। নিচেও পরাবে, কেমন? প্লিজ তোমার পায়ে ধরি। শুধু ওপরের পাতায় কাজল আমার একদম ভালো লাগে না। খুবই জিগার লাগে।’
‘জিগার লাগে মানে?’
‘জিগারের সঙ্গে আমার এখন আর বন্ধুত্ব নেই তুমি জানো না? ওকে আমি এখন সহ্যই করতে পারি না। আরে সেও আমাকে দেখতে পারে না, মিটে গেল।’
নীলা মেয়ের দিকে কপট রাগত চোখে তাকিয়ে থাকল কিছুক্ষণ। তাতে নিশিথিনীর মুখভঙ্গিতে কোনো বদলই এলো না।
‘শুধু বলো স্কুলে রাগ করবে রাগ করবে। কোথায় কী! রাগ তো করে না কেউ!’
কলম দিয়ে হাতের তালুতে জবা ফুল আঁকতে আঁকতে বলে, ‘সবাই দিব্বি স্কুলে কাজল দিয়ে আসে, নেইলপলিশ দেয়, টিচাররা কিছুই বলে না। বেশিরভাগ টিচারই কিছু বলে না, উল্টো প্রশংসা করে। বলে, বাহ, তোমার নেইলপলিশটা সুন্দর হয়েছে তো, বাহ, আজ কাজল কে পরিয়ে দিয়েছে! সবাই কত রঙিন রঙিন ফিতে পরে, আর তাই দেখে ম্যাডামরা বলে, বাহ, রোজ রোজ সাদা ফিতে দেখতে একদমই ভালো লাগে না। এই, লালে তোমাকে খুব মানিয়েছে। বলে, আরে, এতো সুন্দর ফিরোজা ফিতে কোথায় পেলে তুমি! ছেলেগুলো কেউ জেল দিয়ে আসে। স্যাররা বলে, এই, এমন শক্ত জেল আমি কতদিন খুঁজে বেড়াচ্ছি। তোকে টাকা দেবো, আমাকে কিনে এনে দিবি? এসব এসব বলে। কেউ এতো ভদ্রতা করে না, শুধু তুমিই আমাকে সামান্য কাজলটাও পরিয়ে দাও না।’
জবার লম্বা মঞ্জুরিতে শেষ ফোঁটাটুকু দেওয়া হয়ে এলে নীলের চোখের সামনে হাতের তালুটা মেলে ধরল নিশিথিনী।
‘দিই না বেশ করি,’ বলল নীল। তারপর ফুল আঁকা কোমল তালুতে একটা চুমু খেয়ে হঠাৎ কণ্ঠ বদলে বলল, ‘আচ্ছা, এই দুটো হয়ে পড়া লোকটাকে তোর কেমন লাগে?’
‘ও মা, তুমি দেখি এই পৃথিবীতে নেই, কাকে এতোক্ষণ কী বলে গেলাম। সেই যে তার কেকটা কাটা হলো না, তাই তুমিও তাকে আর ভুলতে পারছ না। কী, তাই না বলো?’
‘তা খানিকটা সত্যি। গোলগাল বোকাবোকা লোকটা। দেখে মায়া লাগে যে। তবে আমি ওকে নিয়ে ভাবছি তার আরো একটা কারণ আছে। এই যে সে একজন থেকে দুজন হয়ে গেল রাতারাতি, কেমন না ব্যাপারটা? ধর, আমাদের কথা যদি বাদও দিই, তার নিজের জন্যেই বা এটা কেমন? সারাক্ষণ সবখানে তার মতো দেখতে আরেকটা লোক অবিকল একই কাজ করে চলেছে। কতক্ষণ সহ্য হয়? কে যে কোন জন তাও বোঝা মুশকিল। এ লোক তো আত্মহত্যা করবে মনে হয়।’
নিশিথিনী বলল, ‘আত্মহত্যা করলে, যদি করেই, তো তোমাদের জন্যেই করবে। কারণ আর ক’দিনের ভেতর তোমরা তাকে জ¦ালিয়ে পুড়িয়ে ছাই করে ফেলবে। লোকটা এখন আর কোত্থাও বেরোয় না। মাঠে খেলতে গিয়ে তাকে আগে রোজ দেখতাম। এখন আর দেখি না। লোকটা কাজেও যায় না। রাস্তায় বেরোলেই অন্য লোকেরা যা করে! কুকুরও লেলিয়ে দেয়। কুকুরও আগে তার পিছু পিছু যেত, এখন যায় না, বুঝলে? তোমাদের মতো এই বড় বড় মানুষগুলো আছে না? এদেরকে নিয়েই তার সমস্যা। নিজেকে নিয়ে তার কোনো সমস্যা নেই। আর নিজে দুটো হয়ে গেছে দেখে ওরা কিভাবে সামলায় ভাবছ তো? ওরা মনে হয় দুজন কেবল নিজেকেই দেখতে পায়। সঙ্গে যে আরেকজন আছে সেটা দেখতে পায় না।’
নীলা বলল, ‘তুই কী করে জানিস?’
নিশিথিনী বলল, ‘তাকে লক্ষ করে! রিকশায় বসার সময় প্রথমে যে ওঠে সে ঠিক মধ্যখানে বসে। পাশে কারো জন্যে জায়গা রাখে না।’
‘তাহলে বাকিজন কী করে যায়?’
‘বাকিজন দেখতে পায় রিকশাটা তাকে ছাড়াই কেমন এগিয়ে চলেছে। সে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। এরপর দৌড়–তে শুরু করে। ওই দ্বিতীয় লোকটা আরো বোকা। হয়ত ভাবে, ইদানিং রিকশাওয়ালারা বোধয় সব এমন হয়ে গেছে, যাব বলে যাত্রী না নিয়েই সোজা চলে যায়। তবে এই শেষে যা যা বললাম, এসব নিয়ে আমার মনেও কিছু কিন্তু আছে মা।’
‘কিন্ত কারো সঙ্গে এ নিয়ে গল্প করতে পারে না লোকটা?’
‘কে করবে এমন লোকের সঙ্গে গল্প? তুমি করো?’
‘সেটাই।’ বলল নীল। ‘কিন্তু দেখ্, আমি তা অন্তত ভালো কিছু ভাবতে চাই তাকে নিয়ে। আচ্ছা এতো কিছু দেখিস কী করে তুই, ভাবিস কী করে তুই? আমি তো দেখি না, আমি তো বুঝি না!’
‘তুমিও দেখতে! তোমার ছোটবেলায়। মনে করে দেখ।’
‘আয় নিশি মা, তোকে চোখের ওপরনিচ কাজল পরিয়ে দিই। আমিও পরছি তোর সঙ্গে। কিন্তু ওই যে বললি, বেশির ভাগ টিচার কিছু জিজ্ঞেস করে না। কম ভাগ তো করে। তেমন কেউ জিজ্ঞেস করলে কী বলবি?’
‘কী আর বলব! বলব আমি আর আমার মা দুই বান্ধবী তো, আজ সকালে ইচ্ছে করে দুজন একসঙ্গে কাজল দিয়েছি। বলুন টিচার, এখন কি আপনি এটা মুছে ফেলতে বলবেন? টিচার তখন বলবে, থাক মা, কেঁদো না কেঁদো না, তোমার কাজল মুছে যাবে!’




বালিশ ছুটছে, বাহুবল উড়ছে- আমি পাশ করে দিচ্ছি।
তুমি ঘাস পেতে বসো, আয়তন বহাল রাখো।
অংশবিশেষ হয়ে দেহবন্দরের পাশে যোগাযোগচিহ্ন হোক

(চেয়ার)


ঘরের ভেতর থেকে ভাঙচুরের শব্দ আসছে। অবসরপ্রাপ্ত মেজরের উচ্চকিত গলার স্বর যেন জানালার শার্সি ফাটিয়ে দিতে চায়। বেল গাছটা খুব ভীত হয়ে জুরু জুরু জুরু শব্দ করতে থাকল।
ব্যাপার কী। এই লোক আজ এমন চটেছে কেন।
সব সময় অবশ্য চটেই থাকে। তার মনে হয় কেউ কোথাও কোনো নিয়ম মানছে না। তখন একটা কোনো অজুহাত পেলেই হলো। খুব চোটপাট দেখাবে। কিন্তু আজ? যেন তারও বেশি কিছু ঘটছে ঘরের ভেতরে।
লোকটা একা থাকে। আর সবাই জানে, একা থাকা মানুষের মানসিক বিকারের বড় লক্ষণ হলো তার দুর্ব্যবহার। ক’দিন হলো মেজর সবার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করছে। বিশেষ করে তার স্বজাতির সঙ্গে চলছে দুর্বার!
অবশ্য একজন ব্যতিক্রম।
সেই লোকটিও এর স্বজাতি বটে। কিন্তু তার সঙ্গে অন্যরকম কোনো সম্পর্ক আছে বোধয়। এর সঙ্গে আলাপের কালে মেজর কেবল তার দুঃখের কথা বলে। বলে, কেউ তার খোঁজ নেয় না। একসময় অনেক করেছে সবার জন্য। সবাই তখন ছুটে ছুটে এসেছে। আজও কি তার ক্ষমতা নেই? আছে, খুউব আছে। কিন্তু মূর্খেরা ভাবছে নেই, তাই তার খোঁজটাও নেওয়া ছেড়েছে। আবার যেদিন টের পাবে যে এখনও ঢের ক্ষমতা তিনি রাখেন, তখন হাতজোড় করে আবার দৌড়ে আসবে। সেদিন পলিশ করা বুটে লাথি কষানো হবে!
লোকটা ভাঙচুর করছে খুব। জুরু জুরু জুরু। কী করা যায়? গাছের ওপর না আবার ক্ষোভ ঝাড়তে আসে আবার। গাছ হওয়ায় বিপদ বুঝলে সরেও যাওয়া যায় না। অবশ্য গাছের ওপর কখনো চোটপাট করেনি লোকটা। এমনকি মাঝে মধ্যে হাত যে বুলোয়, তাতে মনে হয়, খানিকটা ভালোও বাসে গাছটাকে।
ওই যে দূরে কে আসে! আরে, ওই লোকটাই তো, যে এলে মেজর শান্ত হয়ে যায়।
সর্বনাশ। এই লোকটাও আজ পাত্তা পেল না। দরজায় কড়া নাড়ার পর ভেতর থেকে বিজাতীয় কর্কশ করে স্বরে ভেসে এলো, Who the hell!*২’
লোকটা বলল, ‘আমি রাজন খালু। আপনাকে দেখতে এলাম।’
‘জাহান্নামে যাও!’
মনে হলো রাজন নামে লোকটা নিজের কানকে স্রেফ অবিশ্বাস করছে। মাথা নিচু করে কী যেন ভাবল কিছুক্ষণ। এরপর একবার জানালা কাচ ভেদ করে ভেতরে কী ঘটছে একবার উঁকি দিতে গিয়ে টাল হারিয়ে পড়তে যাচ্ছিল ফণিমনসার ঝোপে। অল্পের জন্যে বাঁচোয়া। জানালার শিকগুলো বাইরের দিকে হওয়ায় শিক ধরে রক্ষা।
বৃথা অভিযান। ঘরের ভেতরটা অন্ধকার, কিছু দেখা যায়নি। শব্দের তো আর আসতে বাধা নেই। সবল শব্দে তখনই একটা চেয়ার ভাঙা হলো।
‘কী হয়েছে আজ খালুর? পাগল হয়ে গেল নাকি লোকটা!’ কথাগুলো যেন নিজেকেই শোনাল বেচারা।
সে চলে যাওয়ার কিছুক্ষণ পর বোধয় মেজরের মেজাজ ফিরল। ছিটকিনি সরানোর শব্দ হলো দরজায়।
মেজর বেরিয়ে আসামাত্র বেল গাছের পাতায় শব্দ হতে থাকল, সর সর সর! সর সর সর! কী বিস্ময়!
দরজা খুলে একজন নয়। বরং দুজন মেজর বেরিয়ে এসেছে। দুজন একসঙ্গে এপাশ ওপাশ তাকিয়ে ভাগনে খুঁজল। তারপর মন খারাপ করে দাঁড়িয়ে থাকল কিছুক্ষণ। তখন বেলা ক্রমে চড়ে উঠছে। বেলগাছের ফাঁক গলে যে রোদ আসছে তাতেও টিকে থাকা কঠিন। লোকটা একবার গাছের দিকে তাকাতেই দেখা গেল, একজন সেই চেনা মেজর। অপরজন হুবহু একই মুখ ধরে রেখেও যেন আগের জন নয়। কেমন সবজেটে।
মেজর দু’জন ভেতরে গিয়ে দরজা দিলো। রাত পর্যন্ত আর কোনো শব্দ নেই।
বাইরে বাতাস বইতে থাকল, উশশ, উশশ। বাতাসে ডালপালা নাড়তে নাড়তে বেল গাছটা হঠাৎ দেখতে পেল ঘরের আলো জ¦লে উঠেছে। এবং আগের আরো অনেক মন খারাপের দিনের মতো মেজর সেনাবাহিনীর ইউনিফর্ম পরে তার লেখার টেবিলে বসেছেন। তবে আজ একজন নন।
অপরজনের গায়েও সেনাবাহিনীর তারকাখচিত জলপাইরঙা পোশাক। সেও একটা চেয়ার টেনে টেবিলে বসেছে। দুজনের হাত প্রায় লাগোয়া। মেজর লিখতে শুরু করলেন আর ঠিক মেজরের মতো লোকটা বিহ্বল হয়ে বসে থাকল। যেন সে কেন এখানে, কী তার পরিচয়, কোথায় তার গন্তব্য সে কিছুই জানে না। এমনকি সে ভরাপেট না ক্ষুধার্ত, তা নিয়েও যেন তার সংশয়। কিন্তু সে অনড়। অস্থিরতার কোনো চিহ্নই তার শরীরে নেই।
অনেক কিছু নিয়েই বেলের পাতা যেন বিভ্রান্ত! বাতাসের উশ উশের সঙ্গে গা এলিয়ে সে তার ডালপালা দোলাতে থাকল, ঝিরি ঝিরি, ঝিরি ঝিরি, ঝিরি ঝিরি! তার মন সারা রাতের সহ¯্র ঝিরি ঝিরিতেও শান্ত হলো না।
দুই মেজর চিৎ হয়ে ছাদের দিকে তাকিয়ে ছোট শিশুর মতো চোখ পিট পিট করতে করতে একসময় ঘুমিয়ে গেল।
চলতে থাকল একটানা, হুউম, শুউন, হুউম, শুউন, হুমম!




আকাশ খোলা। জানালা বন্ধ। মণ্ডল করছি।
জানো তো চিত্রগুপ্ত, মানুষ তারা ফোটায়, চাঁদ মানুষ ফোটায়?

(নিরক্ষমণ্ডল)


সকালে মেজরের জন্যে এক বিকট বিস্ময় অপেক্ষা করে ছিল বাইরে। বেরোতেই লোকে তার দিকে অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকাতে থাকল। প্রথমে রাস্তার শেষ মাথায় গিয়ে একটা গলিতে মোড় নিলেন মেজর। গলির ঠিক মধ্যখান দিয়ে যে নর্দমাটা চলে গেছে সেটা এক লাফে পেরোলেন। অপর দিক থেকে আসছিল এক ছোট্ট ছেলে। বিড়ম্বনাটা তাকে দিয়ে শুরু। স্থূল দেহের একজোড়া মানুষকে লাফিয়ে নর্দমা পেরোতে দেখে সেই ছেলের আঙুলতোলা সেকি বিচ্ছিরি হাসি। মান তোলা ব্যাপার। আগে হলে মেজর রেগে একটা কোনো ভাঙচুর করতেন। কিন্তু আজ তার মনের ভেতর কী এক বদল ঘটে গেছে।
তিনি বললেন, ‘কী খোকা, হাসছ কেন। আমি বুড়ো মানুষ।’
ছেলেটা তার কণ্ঠের ওঠানামা অবিকল নকল আর স্বর বিকৃত করে বলে উঠল, ‘কী খোকা, হাসো কেন, আমি বুড়ো মানুষ! ঘ্যাঙট ঘ্যাং, ঘ্যাঙট ঘ্যাং, সাথে একটা কোলা ব্যাঙ!’ এরপর সেই হাসি।
মেজর দু’জন আর এ নিয়ে মাথা না ঘামাতে চাইলেন না। সামনে যেতে যেতে আরো কয়েকবার শুনলেন, পেছনে বেজেই চলেছে সেই ভাঙা রেকর্ড। মনে হলো, আরো কয়েকটা কণ্ঠ যুক্ত হয়েছে।
তাকে দেখে ছেলে বুড়ো পথ ছেড়ে দিয়ে কুল পেতো না। আর আজ এক ছোকরা এমন টেনে নামিয়ে দিলো। বেশ তো। দেখাই যাক, পথে আরো কি কি দুর্ঘট আজ আছে।
আরেকটু সামনে যেতেই পূর্বপশ্চিম চলে গেছে একটা চওড়া রাস্তা। রাস্তাটা পশ্চিমে একটা বিরাট মাঠের দিকে চলে গেছে। এটাকে বলে উদ্যানের পথ। মাঠের শেষপ্রান্তে বিরাট জাতীয় উদ্যান। আকাশ ছোঁয়া সবুজ অন্ধকার ওখানে দেয়ালের মতো মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে।
রাস্তাটা ধরে হাঁটতে হাঁটতে আরো অনেকে তাকে পেরিয়ে গেল। চেনা মানুষেরা একটা ভীত নীরবতায় তার পাশ কাটালেও অচেনারা ছাড়ল না। ওরা আমুদে চোখে তাকিয়ে কানকথার সুড়সুড়ি ছড়াতে শুরু করল। মেজর কোনোক্রমে নিজেকে শান্ত রাখলেন। তার অপর অস্তিত্বটি ভীষণ অস্বস্তি নিয়ে অনেকের মুখপরীক্ষা করতে থাকল। তার দিকে তাকিয়ে বিকট ভেংচি কাটল এক এলাকার চেনা উন্মাদ। গরমেও তার শরীরে কাপড়ের বিরাট স্তূপ। চিৎকার করে বলে উঠল, ‘পুরান পাগল ভাতে মরচে, আর নতুন পাগলের আমদানি হয়েচে দেখো! কোট পাগলের হিল্লে না হতেই, এখন এয়েচে এই পল্টন পাগল! ও সেনাপুত্তুর, তোমার পল্টন কোথায় গো। এক পল্টন সোনা নিয়ে তিনি করবেন এই এমন করে, দেখো সবাই, লেফট রাইট, লেফট রাইট! ’ এরপর পেট ভেতরে ঢুকিয়ে কট কট শব্দে এক বিকট হাসি।
মেজর জায়গাটা দ্রুত পেরিয়ে গেলেন।
যত বিড়ম্বানাই হোক, গোটা রাস্তায় কেউ অন্তত তার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। চূড়ান্ত বিপত্তি বাঁধল মাঠে তার ঢোকার মুখে। তল্লাশি চৌকি আছে একটা। সেখানে নতুন প্রহরী দেখা গেল একজন। পোশাক একদম ভাঁজের ওপর ইস্ত্রি করা। বোধয় চাকরিটা ভালো মনেই করতে এসেছে। মেজরকে থামিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘দাঁড়ান! আপনারা কোথায় যাবেন?’
মেজর পেছনে তাকিয়ে কাউকে খুঁজে পেলেন না। তবে প্রহরী কেন একা তাকেই ‘আপনারা’ বলে সম্বোধন করছে? তিনি বললেন, ‘আমরা মানে? আমি! আমি মাঠে যাব। এ সময়টায় আমি হাঁটি সবসময়। ইউনুস কোথায়। তুমি কি নতুন?’
‘ইউনুস নামে কাউকে চিনি না। আমি নতুন কিনা সেটাও কোনো বিষয় না। আপনাদের চিনি না আমি। এবং চলাফেরা আমার কাছে সন্দেহজনক ঠেকেছে। আপনারা এখানে দাঁড়ান। আমি স্যারকে ডেকে আনছি।’
‘আবার বলে আপনারা!’
নতুন রক্ষী কড়া চোখে একবার তাকিয়ে কিছু না বলে চৌকিঘরের পেছনে আড়াল হয়ে গেল।
খানিক বাদে তুলনামূলক বয়স্ক এক লোককে সঙ্গে করে নিয়ে এলো। এই লোকটাকে মেজর আগে থেকে চেনেন। অন্য সময় তার হাতার বোতাম আটকানো থাকে দেখেছেন। আজ কনুই পর্যন্ত গোটানো। নিশ্চয়ই কোনো কাজ করছিলেন। চোখভরা জল। কিন্তু মুখের পেশিতে দুঃখের কোনো চিহ্ন নেই। নির্ঘাৎ অসময়ে নতুন ছোকরা তাকে ডেকে আনায় তাই বিরক্ত হয়েছে। এ সুযোগ কাজে লাগানো চাই।
কিন্তু মেজর কিছু বলে ওঠার আগেই লোকটা রক্ষীর দিকে তাকিয়ে খেঁকিয়ে উঠল, কোথায় তোমার অদ্ভুত Case! কোথায় কী!’
স্পষ্টতই লোকটা মেজরের পেছনে দাঁড়ানো আরেক মেজরকে দেখতে পায়নি। চিৎকার শুনে ভড়কে গিয়ে ওই দ্বিতীয় মেজর খানিকটা পিছিয়ে যেতেই নড়াচড়ায় চোখ পড়ল কমান্ডারের। যা দেখল তাতে তার চোয়াল ঝুলে গেল। একবার চেনা মেজরের দিকে, আরেকবার তার জমজের দিকে তাকাতে থাকল কমান্ডার।
এবার তার বিস্ময়াভিভূত চোখজোড়া দেখে স্বস্তি পেল নতুন প্রহরী। কিছু একটা বলতে গেলে তাকে থামিয়ে ধীর পায়ে এগিয়ে এলো কমান্ডার লোকটা। হঠাৎ পেছনে তাকিয়ে প্রহরী ছেলেটিকে বললেন, ‘তুমি কিছুক্ষণ আমার ঘরের সিঁড়িতে গিয়ে বোসো যাও!’
মেজর দেখতে পেলেন কমান্ডার তাকে দেখেই ক্ষান্ত হয়নি। তার পাশের কোনো এক অদৃশ্য অবয়বের আগাগোড়া পরখ করছে। মেজরের মাথা অপরিষ্কার নয়। কমান্ডারকে থামিয়ে দেওয়ার ভঙ্গিতে হাত তুলে বললেন, ‘বুঝতে পেরেছি। তুমি কি আমাকে দুজন দেখতে পারছ কমান্ডার?’
‘জি স্যার।’ বলল লোকটা।
‘বেশ। কী করে এটা হলো? আমরা দুজন কি মার্চ করার মতো একসঙ্গে পা ফেলছিলাম, হাত নাড়ছিলাম?’
কমান্ডার বলল, ‘তা তো আমি দেখিনি স্যার। তবে এমনই কিছু একটা হবে।’
‘এমন কেন হলো?’ নতমুখে মেজর নড়েচড়ে দাঁড়ালেন। কমান্ডার বলল, ‘আমি আপনাকে চিনি স্যার। আপনি ভালোয় ভালোয় বাড়ি চলে যান। এটাই ভালো হবে। আমি যাই।’
লোকটা বোধয় নিজের সঙ্গে যুদ্ধ করতে ময়দানে ফিরে গেল। মেজরও বিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলেন। একবার আশেপাশে তাকালেন তার নিজ দৃষ্টির অতীত জমজ লোকটিকে দেখার আশায়। দেখতে পেলেন না। তবে কি ওই কালো কোট পরা ওই অদ্ভুত জোড়া লোকটা তাকে অভিশাপ দিলো? তিনি বোধয় দূর দূর করে তার মনে কষ্ট দিয়েছিলেন খুব।
এমনিতে যেমন তেতে ওঠেন মেজর, তেমনই দ্রুত ঠা-াও হয়ে যান। যেমন সহজে দুর্ব্যবহার করে বসেন, তেমনই দ্রুততায় অনুতপ্তও হয়ে ওঠেন।
মেজর ঘুরে দাঁড়ালেন এবং গোটা রাস্তা মাথা নিচু করে হেঁটে সবার চোখের সন্দিগ্ধ দৃষ্টি নিজের অভিজ্ঞতায় না নিয়ে, সবার আড়কথা কানে না তুলে ধীরে ধীরে নিজ বাড়ির বেল গাছটার নিচে এসে দাঁড়ালেন। পেছন পেছন বিমূঢ় আরেক মেজর। অগ্রপশ্চাতজ্ঞানহীন।
মাথা তুলে বললেন, ‘তুইও কি আমাকে দুটি করে দেখছিস বৃক্ষ?’
বেলগাছ নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে থাকল। ডাল কিংবা পাতা কিছুই দোলাল না। মেজর পকেট থেকে চাবি বের করে তালার মোচড়ে ভেতরে ঢুকে পড়লেন। তার সহমূর্তিটিও।
স্নানঘরের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে অপলক তাকিয়ে থাকলেন দীর্ঘসময়। দুটি অস্তিত্বই আয়নায় একটামাত্র বিম্ব দেখতে পেল।



কথা দিয়ে দাঁড়িয়ে আছি।
দেখতে ভালো লাগে— পাঁজর ছুঁই ছুঁই আয়ুরেখা ছুটে এসে এড়িয়ে যায়।
রক্তাক্ত হই না।
নির্ভয়ে তখনো দাঁড়িয়ে থাকি।

(শিল্প)


সবাই যাকে নতুন লোক বলে চেনে, নিজেকে সে জানে সমুদ্র নামে। সেদিন সন্ধ্যার কথা। আসল সমুদ্র লেখার টেবিলে একটা হলুদ আলোর টেবিলল্যাম্প জ্বালিয়ে দিনলিপি লিখছিল। অপর সমুদ্র চুপ করে বসেছিল খাটের ওপর। তাদের ঘিরে ধরে ছিল হলদেটে তরল আঁধার। টেবিল থেকে ক্রমশ দূরে তা জমাট হয়েছে। হলুদ আলোর বড় অংশ সপ্রতিভ সমুদ্রের মুখ সোনালী করে তুলেছে। আর বিহ্বল সমুদ্রের চোখের মণিতে কেবল দুটো সোনালী বিম্ব।
টেবিলের অপর দিকের কোণে একটা মোটা বই। টেবিলল্যাম্পের আলোয় টিন ড্রাম শব্দ দুটো কালচে অপচ্ছায়ার মতো দেখাচ্ছে। এদিককার কিনারে সমুদ্রের কলমের নিচে খসখস শব্দে ক্রমশ ভরাট হয়ে উঠছে রুলটানা কুমারী কাগজ।

আমি বুঝতে পারছি যে, এই সমাজে আমি অনাকাক্সিক্ষত হয়ে উঠছি। আমি দুজন হয়ে গেছি। এটা অস্বীকারের কিছু নেই। আমি আমার কাছে কিংবা পাশেই বসে থেকে এই দিনলিপির ওপর উবু হয়ে থাকা আরেকজনকে দেখতে পারছি না, কিন্তু জানি সে আছে। তাকে দেখতে পাবে অন্য কেউ। হাটে বাটে মাঠে আর সমস্ত মানুষ দেখতে পাবে। আর পাবে নিশিথিনী।
নিশিথিনী। সেদিন জন্মদিনে ওর সঙ্গে কথা বলে আমার খুব মনে হয়েছে এমন একটা শিশুর যদি আমি বাবা হতে পারতাম। কিন্তু মনকে বুঝিয়েছি। এসব ভাবনার কোনো মানে হয়? আমি একা আছি বেশ আছি। বাবা হতে চাইলেই কি আর হয়? আরো ভালোভাবে বললে আমার আসলে নিশিথিনীরই বাবা হতে ইচ্ছে করেছে। সেদিনের অনুষ্ঠানের কথা আমার মনে এখনো ভাসছে। প্রতি মুহূর্তে আমি প্রতিটা দৃশ্যের আরো গভীরে চলে যাচ্ছি। সেখানে কে কিভাবে হেসেছে, কে কিভাবে তাকিয়েছে সব আমার মনে আছে। নিশিথিনীর মা নীলকেও আমার খুব আপন মনে হয়েছে। তার মুখের সঙ্গে ত্রপার কি গাঢ় মিল। দেখে আমি অবাক হয়েছি। কিন্তু আচরণে নিশ্চয়ই দুজনের ঠিক বিপরীত। যদি ত্রপার সঙ্গে দেখা না হয়ে নিশিথিনীর জন্মেরও আগে নীলের সঙ্গে দেখা হতো কেমন হতো? হয়ত আমার শরীর থেকে আরেকজন বেরিয়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে আমায় যেতে হতো না।
আচ্ছা এমনটা ঠিক কখন হয়েছে? ঠিক কখন আমার শরীর থেকে আরেকজন বেরিয়েছে? জানি না। জানতে চাইও না।
যে বেরিয়েছে, তাকে স্বাগত জানাই। থাকছে থাকুক।
আচ্ছা, সেও কি ভাবছে যে আমি তার কাছ থেকে বেরিয়েছি?
বড় এলোমেলো কথা লিখছি। কিন্তু লেখা ছাড়া তো আমি গুছিয়ে আনতে পারব না কিছুই। কাজ করছি না। আর বোধয় একমাস চলতে পারার মতো টাকা আর শুকনো খাবার আমার কাছে আছে। আমার বাইরে যাওয়া বন্ধ হয়েছে। টাকা দিয়ে করব কী। কাঁচাবাজারও কিছু করতে পারছি না।
ঘরে বসে কেবল জাউ খেয়ে আর কতদিন কাটবে হে প্রাজ্ঞ প্রকৃতি? হে মহানিয়ম?


বাইরে কে যেন কড়া নাড়ল এমন সময়। কে আসতে পারে এমন সময়ে এমন একজোড়া মানুষের কাছে? কার কোনো প্রয়োজন থাকতে পারে এখানে, কেবল বিব্রত করা ছাড়া? বিরক্ত করতেই বোধয় কেউ এসেছে। কিন্তু তার সঙ্গে তো আর একই আচরণ করা যায় না। ধাতে নেই। সুতরাং সমুদ্র দুজন দরজার দিকে এগিয়ে গেল।
দরজায় একটা ফুটো আছে বাহিরটা দেখার। কিন্তু সেখানে আর চোখ রাখল না সমুদ্র দুজন। ইচ্ছে করল না। দুজনেই ফুটোর দিকে তাকিয়ে হাসল। কী করে দেখবে দুজন এক ফুটো। মাথায় মাথায় ঠোকাঠুকি লেগে যাবে যে!
দরজা খুলে বাইরে তাকিয়ে অবাক হয়ে গেল সমুদ্র। বাইরে তিনজন মানুষ দাঁড়িয়ে ছিল, দরজাটা খুলতেই একজন একদিকে ফিরে মৃদু কণ্ঠে বিদায় জানিয়ে তখনই যাওয়ার পথ ধরল। তার মুখটা রাস্তার বৈদ্যুতিক থামে মৃদু আলোয় ঠিক বোঝা গেল না, চেনাও মনে হলো না। তবে তার চলে যাওয়া মূর্তির দিকে তাকিয়ে অবশিষ্ট অবিকল একই দেখতে যে দুই মূর্তি একসঙ্গে বিপরীত দুটো হাত তুলল তাদের দেখে সমুদ্র ঠিক চিনতে পারল।
দূর থেকে এই লোকটিকে সমুদ্র অনেকবার দেখেছে। তার ফোলা কিন্তু সুগঠিত গাল যেন তুবড়ে গেছে। তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা অবিকল তার মতো দেখতে লোকটিকেই বরং অনেক বেশি লাগছে তার মতোন। যেমনটা সমুদ্রের দেখা অভ্যাস।
সেও তাহলে তারই পথ ধরেছে! বেশ বেশ। মনে পড়েছে। লোকটি তার দিকে তাকিয়ে প্রায়ই মুখ কঠিন করে কী যেন বলতো। দেখা যেত, কিন্তু শোনা যেত না। তা বাছা আজ তুমি আমারই দ্বারস্থ। মন্দ কী!
যাক, মহানিয়ম হয়ত এই ব্যবস্থাই করছে। সব নতুন করে লিখছে। সব ক’টাকে এই এমনে বদলে দিলে কেমন হয়? বেশি জটিল কিছু?
তোবড়ানো গালের মূর্তিটি বলে উঠল, ‘ইয়ে, মাঠের কমান্ডার আমাকে পৌঁছে দিয়ে গেল। আমার তো আর আপনার বাড়ি চেনা ছিল না। আপনাকে কেবল দূর থেকে দেখতাম, এই মনে আছে। Not more than that! But, somehow*৩, খুব রহস্যময় একটা কিছু আমার সঙ্গে ঘটে গেছে। বাইরে তো দাঁড়াতে পারব না। কেউ দেখে ফেললে বিব্রত করবে। ভেতরে আসব কি?’
সমুদ্র কোনো কথা না বলে ঘরে ঢোকার পথ ছেড়ে দিলো। লোক দুটো একই সঙ্গে ঠিক বিপরীত হাত পা সঞ্চালনে ঘরে এসে চারদিকে তাকাতে থাকল। সমুদ্রের মনে হলো, প্রথমজন জানে সে কি চায়। দ্বিতীয় জন তা নয়। দুজনই অভিন্ন। কিন্তু অস্তিত্ব দুটোর ভেতর কে আগের মানুষটির প্রতিনিধি, তা হাবেভাবে স্পষ্ট বোঝা যায়। বিষয়টা তাহলে এই!
সমুদ্রের বসার ঘর বলতে কিছুর অস্তিত্ব নেই। সামনের ছোট্ট ঘরে একটা পাতলা তোষক কেবল পাতা। তোষকের মাথার কাছে একটা বইয়ে ঠাসা একটা কাঠের তাক। বিছানার ব্যাপারে সমুদ্রের একটু শূচিবায়ু আছে। সে বরং লেখার টেবিল থেকে একটা চেয়ার নিয়ে এলো। আরেকটা চেয়ার উদ্ধার করল বারান্দা থেকে। এরপর দুটোই বেশ শক্তি খাটিয়ে সামনের ঘরে এনে রাখল।
বৃদ্ধের মুখ দেখে মনে হচ্ছে, সমুদ্রকে নিষেধ করা দূরে থাক, বরং এতো কসরৎ করে হলেও তাকে সম্মান দেওয়ায় সে স্পষ্ট খুশি হয়েছে।
দুজনে হাত পা নেড়ে অনেক কথা বলল। আর তাদের বিহ্বল সত্ত্বা দুটো পরস্পরকে দেখতে থাকল নানা ভাবে। কয়েকবার খুব কাছাকাছি হয়েও তারা পরস্পরকে ছুঁতে সাহস করল না।
বাইরে, ছাদের ওপর আম গাছের সবুজ পাতা বৈদ্যুতিক থামের নীলচে সাদা আলোয় ধুয়ে যাচ্ছিল। মাঝরাতে কালচে আকাশে অনেক ক’টা তারা ফুটল আর চাঁদ উঠল। ডুবল। বাতাসের গণের পর গণ বয়ে গেল। প্রকৃতির সবাই সবার সঙ্গে গল্প করল সারারাত।
ভোরের দিকে ওরা সবাই বিছানায় গেল। প্রত্যেকেই নিজ সত্ত্বার জন্যে জায়গা রাখল পাশে। এরপর পরস্পরের দিকে তাকিয়ে ঠোঁট উল্টে বিব্রত হাসল।
সমুদ্র দু’জন বলল, ‘তাহলে আমাদের দল ভারি হলো যখন এর তো একটা সুবিধা পাওয়া যায়। আমরা তাহলে টুকটাক এটা ওটা কাজে ঘর ছেড়ে বেরোতে পারি এবার একসঙ্গে। আপনার কী মত।’
মেজর দুজন উত্তর দিলেন, ‘তা করা যায়। যেহেতু ক’দিন দুজন যখন একসঙ্গেই থাকছি। আর লোকে যদি তেড়ে আসে আমরাও তেড়ে গেলাম! কী বলেন।’
সমুদ্র দুজন বলল, ‘তা করা যায়, মন্দ হয় না। কারণ আমাদের যতই বিরক্ত করুক না কেন, ওদের মন কিন্তু দুর্বল। আর আমরা তো আলাপই করলাম। ওদেরও দিন ঘনাচ্ছে। টিটকিরি ক’দিনই বা করবে। ভয় আর ক’দিনই বা পাবে।’
‘সেটাই সেটাই।’ বলে মেজর দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার শ্বাসের নিয়মিত হুম শুন শুরু হলো প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই। সমুদ্রের চোখে ঘুম নামতে নামতে বাহির ফর্সা হয়ে গেল।
ওদের ঘুমিয়ে থাকার সময়ে দুজনের জমজ দুটি, সেই বিছানার শিয়রে কি পায়ের কাছে কতবার যে জায়গা বদল করে দাঁড়াল, তার হিসেবকড়ি নেই। এরই ভেতর জাগ্রত মেজর টেবিলের ল্যাম্প, লেখার কাগজ, রঙ করা সাদা দেয়াল সব একে একে স্পর্শ করে চোখের ভাষায় কত কথা যে বলতে চাইলো জাগ্রত সমুদ্রকে। কী এক ভীতি আর অনিশ্চয়তা তাকে ক্রুশবিদ্ধ করে রেখেছে বলে কিছুই সে বলতে পারল না। কেবল ছটফট করাই সার হলো। জাগ্রত সমুদ্রও তার কাঁধ স্পর্শ করেছিল। হয়ত কী যে বলবে তা ভেবে না পেয়ে মূক হয়ে থাকল সারাটা সময়।



কোনো একদিন এই পৃথিবী স্বপ্নকাটা ঘর ছিল।
মানুষ এরই ওপর করেছে সরাইখানা। পশুসব ভুলভাল আনন্দী নাচছে।

(হত্যা)


নিশিথিনী তার পড়ার টেবিলের ওপর প্রায় ঝুঁকে পড়ে অংক কষছিল। অংক কষা কিংবা কিছু লেখার সময় তার জিভের খানিকটা বেরিয়ে থাকে। নীল তার কাছ ঘেঁষে পায়চারি করছে। মনে ক্ষীণ আশা, মেয়ে মুখ তুলে একবার জিজ্ঞেস করবে, কী ব্যাপার মা? তুমি এমন করছ কেন। কী ভাবছ বলো তো?
নিশিথিনীও মায়ের মনের কথা জানে। বেশ মনোযোগ দিয়ে অংক কষার অভিনয়টাও তাই তার জন্যে খুব উপভোগ্য হয়েছে।
একসময় মনে হলো, নাহ অনেক হয়েছে, আর নয়।
ক্লাস ওয়ানে ওঠার পর লেখার জন্যে কলম ব্যবহারের অনুমতি পেয়েছিল স্কুল থেকে। কলম ব্যবহারের সবচেয়ে প্রিয় অংশ হলো এর মুখ লাগিয়ে কলমদানিতে সাজিয়ে রাখা। প্রিয় কাজটি করার পর, নিশিথিনী উঠে দাঁড়িয়ে মায়ের দিকে একবার তাকিয়েই সোজা খাবার ঘরে চলে গেল। নীল গেল তার পিছু পিছু।
মুখ থেকে জলের গ্লাসটা নামিয়ে নিশিথিনী বলল, ‘আর না। এবার বলো তো মা, তুমি কী এমন ভাবছ?’
নীল বলল, ‘এতো কিছু বুঝিস আর এটা বুঝতে পারছিস না! এখানে কি ভাবার কিছুই নেই! শহরে জিনের আসর হয়েছে। একের পর এক মানুষ দুটো হয়ে যাচ্ছে। একটা কোনো আঘাত পেলেই দুটো হয়ে যাচ্ছে। এরপর ওদের না দেখা অংশটার জন্যেও তাদের দরদ উথলে উঠছে। সবাই নিজেরটা বাদে বাকি সবার না দেখা অংশকে দেখছে। শহরের যা লোকসংখ্যা, দেখাচ্ছে তার কয়েক গুণ! এই কয়েকগুণ দেখতে দেখতে শত গুণ হাজার গুণ হয়ে যাবে। কী হবে তখন! রাস্তায় তো চলাই যাবে না। ভুতুড়ে একটা শহরে পরিণত হবে এটা। সারাপথ এখন কেমন গা বাঁচিয়ে চলতে হয়। আগে ওদের দিকে লোকে অদ্ভুত চোখে তাকাত এখন ওরাও সমানে সমানে আমাদের দিকে তাকাতে শুরু করে করেছে। তবে ওরা যতটা জ¦লেছে ততটা জ¦ালায় না, এটাই একমাত্র ভরসার কথা। তাতে কী। চোখে সারাক্ষণ, সারাটাক্ষণ পীড়া লাগছে আমার। এসব কী। এভাবে থাকা যায়! ভেবেছিস কিছু?’
নিশিথিনী বলল, ‘ভেবেছি মা। কিন্তু কই আমার কাছে তো কিছুই মনে হচ্ছে না ব্যাপারটা।’
ঘরের দেয়ালের কোণে একটা মাকড়শার বাসায় একটা মাছি আটকা পড়েছিল। মাকড়শাটা ধীরে ধীরে এগোচ্ছিল মাছিটার দিকে। এই বুঝি ধরে ফেলে সুতার বেড়ে পেঁচিয়ে নিতে শুরু করবে! ঠিক সেই মুহূর্তে মাছিটা জাল ছিঁড়ে ফেলল। আর এক মুহূর্ত দেরি নয়। ভোঁ উড়াল। কিন্তু উড়ে সে বেশিদূর যেতে পারল না। তার স্বচ্ছ ডানায় জড়িয়ে আছে মাকড়ের জাল। ডানা ভার হয়ে সে ঘরের কালো মেঝেতে মুখ থুবড়ে পড়ল।
নীল বলল, ‘হ্যাঁ, আমিও কিভাবে তোর মতো কিছুই হয়নি মনে ঘুরতে পারব তাই বল।’
‘আমি তো জানি না আমি কিভাবে ঘুরছি মা! কিন্তু তুমি যদি মনে করো দশ জনের যা হবে তোমারও তাই হবে, তাহলেই দেখবে অনেকটা সাহস পাবে।’
‘দুঃখিত বিদূষী! আমি না এটা মনে করতে পারছি না। দশজনের যা হবে আমারও তা হতে পারবে না। কারণ আমার যা হয়েছে তা দশজনের হয়নি।’
এ কথার পর দুজনই চুপ করে অনেকটা সময় দাঁড়িয়ে থাকল। পরস্পরের দিকে একটাবারও তাকাল না।
একসময় নিশিথিনী ধীরে ধীরে বসার ঘরের দিকে এগোল। আরাম চেয়ারে বসে চাঁদা মাছ আঁকা কুশনটা কোলে তুলে নিয়ে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকল মাছের গায়ের ডোরাগুলোর দিকে।
পাশের ঘরে চেয়ারের হেলানটা ধরে একা দাঁড়িয়ে থাকল নীল। পড়ে থাকা মাছিটার দিকে এবার লাল পিঁপড়ের একটা সারি এগিয়ে এসেছে। ওরা ঘরে খাবার তুলতে চায়। সামনে লড়াই।
বাইরে ছুটির দিনের সকালটা ক্রমশ দুপুরে রূপ নিচ্ছে। জানালার স্বচ্ছ কাচের ওপর থেকে পাখার বাতাস পর্দা সরে যাওয়ায় বাহিরটা চোখে পড়ছে। মনে হলো একপাল লোক যেন হেঁটে গেল। অথচ একপাল নয়, হয়ত কয়েকজনমাত্র। কিন্তু তার চোখে পালকে পাল দেখা ছাড়া কোনো উপায় নেই।
নিশিথিনী দূর থেকে মায়ের দিকে একদৃষ্টি তাকিয়ে থাকল। মা অন্য আরো কিছুর সঙ্গে লড়াই করছে। কিসের সঙ্গে নিশিথিনী তা বুঝতে পারছে না।
নীল ধীরে ধীরে রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে গেল। দুজনের জন্যে পোলাওর চাল চড়িয়ে ভিনেগারে ডোবানো সবজিগুলো তুলে একটা কড়াইয়ে রাখল। লবণ কমে এসেছে, বাজারে যাওয়া দরকার। কিন্তু বেরোতেই তো কেমন খারাপ লাগে। সেও কবে দুটো হতে যাচ্ছে? এরপরই বোধয় ব্যাপারটা সয়ে আসত। সয়ে আসত কী, তখন তো বোধয় ভালোই লাগত রীতিমতো!
বিকালে মা মেয়ে দুজনে হাঁটতে বেরোল। মাঠের কাছে গিয়ে দেখল তল্লাশি চৌকিতে পাহারারত রক্ষীটি দুটো হয়ে বিরস মুখে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ওদের দেখে কেমন আগ্রহী হয়ে তাকাল। পরমুহূর্তে চোখে একটা দুঃখী ভাব ফুটে উঠল তার। কিন্তু স্থায়ী হলো না তা। যেন এক ধরনের নির্লিপ্ত ভাব এসে সেই দুঃখটাকে সুড়ুৎ শব্দে পান করে নিলো। হাত তুলে লোকটা ইশারায় বলল, ‘যেতে পারেন।’
নীল মাথা নিচু করে হাঁটছে। চোখের কোণ দিয়ে সে দেখতে পারছে অসংখ্য পায়ের ছাপ। মুখ তুলে কারো দিকে তাকানোর ইচ্ছে তার হলো না। কিন্তু নিশিথিনী যেন উপভোগ করছে।
শিশুদের জগৎটা বিস্ময়কর। তাই বিস্ময় সেখানে বিস্ময়বিহীন। নিশিথিনীর কথা ভেবে নীলের কি খানিকটা ঈর্ষা হলো?
নীল হঠাৎ ভাবল, ‘এতো এতো লোক হাঁটতে এসেছে, তাদের ভিড়ে কি আর সেদিনের সেই গোলগাল বোকাটে লোকটা নেই? প্রথমবারের মতো জোড়া মানুষের বিনোদন হয়ে ওঠা সেই নিরবলম্বন লোকটা? এমন সরল লোককে কে কী কষ্টই বা দিলো যে তার এমন পরিণতি হলো? কেবল কষ্টেই কি এমন হয়? আর কোনো প্রস্তুতির ব্যাপার নেই? সূর্য নিখোঁজ হওয়ার পর নীলা কি ভয়ানক বিপর্যস্ত সময় কাটায়নি? দুঃস্বপ্নের মতো একেকটা দিন সে কাটিয়েছে। সে হিসেবে তো তার জায়গায় লোকের ষোলোটা নীলা দেখার কথা। তবে কি তার প্রস্তুতি ছিল না? কেমন প্রস্তুতি দরকার হয় এতে? এই যে এতো এতো লোক এখন দুজন হচ্ছে, সবার কি প্রস্তুতি আছে? নাকি এখন এটা রোগের মতো কেবল সংক্রমিত হচ্ছে।
‘নিশি, আচ্ছা এটা কি কোনো রোগ?’
নিশিথিনী জানে মা কিসের কথা বলছে। তবু বলল, ‘কিসের কথা বলছ।’
নীল তার প্রশ্নের কোনো উত্তর দিলো না। নিশিও একটা দীর্ঘশ^াস ফেলে খানিকটা হালকা বোধ করল। সকালের ঘটনার পর সে এ নিয়ে শিগগিরই কোনো আলাপে যেতে আগ্রহী নয়।
হঠাৎ মায়ের এক হাত টেনে বলল, ‘ওই লোকটা মা! ওই যে, লাল মখমল কেকের লোকটা।’
নীলের যেন হৃদপি-ের ছন্দে একটা ছোট গোলমাল হয়ে গেল। বলল, ‘কোন লোক! কোথায়!’ মনে ভাবল, কী আশ্চর্য, ভাবতে না ভাবতেই? এমনও বুঝি হতে আছে?
‘কোন লোক বুঝি জানো না! তার জন্যেই তো তোমার মনটা ছোট হয়ে আছে। চলো আজ তাকে আমাদের বাসায় নিয়ে যাই। মা? মুখটা তোলো!’
নীল মুখ তুলতেই পশ্চিমের সূর্যটা তার মুখের ওপর পড়ল। সোনালী হয়ে উঠল শ্যামল মুখটা। খনিজ পাথরের নাকফুলটা ঝিকিয়ে উঠল। ঘামে ভেজা কপালটা শিরশির করে উঠল ঠাণ্ডায়। কিছুক্ষণ কেবল অসংখ্য কালচে অবয়ব দেখা গেল, চোখের সামনে নাচছে। ধীরে আলো সয়ে আসতেই অবয়বগুলো স্পষ্ট হতে শুরু করল।
ইট বিছানো রাস্তাটা ধরে অনেক মানুষ যাওয়া আসা করছে। তাদের ভেতর হুবহু এক দেখতে এবং একইসঙ্গে হাত-পা ফেলে চলাচল করতে থাকা মানুষ যেমন অনেক, তেমনই তারই মতো একা মানুষও কম নয়। দুই পক্ষের ভেতরই অল্পবিস্তর কুশল বিনিময় চলছে। দেখে নীল হেসে ফেলল। যেন এটাই চাইছিল তার মন। এসময় চোখে পড়ল গোলগাল লোকটাকে। তার মুখটাই কেবল গোলাকার। বাকি শরীরে কোথাও মেদের আধিক্য নেই। তবে একেবারে মেদশূন্যও নয়। হয়ত এটাই তাকে একটা বন্ধুত্বপূর্ণ চেহারা দিয়েছে। আবার হাস্যকরও করে তোলেনি।
সমুদ্র দুজনই এগিয়ে আসছে ক্রমে। নিশিথিনীর দিকে তাদের চোখ। চোখে চোখ পড়তেই দুই সমুদ্রের একজন হাত নাড়ল। অপরজন সেই নাড়তে থাকা হাতের দিকে তাকিয়ে থাকল কেবল, কোনো কথা নয়। সমুদ্রের চোখ পলকের জন্যে তাকাল নীলের দিকে এবং একটিবার তাকিয়েই বিমূঢ় হয়ে গেল। যেন তার অদেখা জমজ অস্তিত্বটির হুবহু অনুকরণ করছে।
জোড়ামানুষ হয়ে ওঠার পর প্রতিবারই তাকিয়ে দেখতে পেয়েছে নীল চোখ সরিয়ে নিলো। এই প্রথম দেখতে পেল চোখ সে ফিরিয়ে নেয়নি। অর্থাৎ উপেক্ষা করেনি তাকে। সমুদ্র নীলের পাশে বা পেছনে সাবধানে দেখে নিলো, তারও কি কোনো জোড়া বেরোনার পর ব্যাপারটা স্বাভাবিক হয়েছে কিনা। তেমন কিছু দেখা গেল না।
নীল বেশ সহজভাবে বলল, ‘বাসায় তো আর এলেন না। নিশিথিনী আপনার কথা প্রায়ই বলে।’
নিশিথিনী বলল, ‘আমার চেয়ে মা বেশি বলে।’
সমুদ্র হেসে ফেলল। নীল দুজনের দিকেই তাকাতে থাকল পালা করে। সমুদ্র কিছু বলল না। তার কোন অংশকে সে খাটো করবে?
‘আপনি আজ আমাদের বাসায় চলুন,’ বলল নিশিথিনী। ‘আপনার লাল মখমল কেকটা এখনো রয়ে গেছে। জানেন! আজ গিয়ে ওটার একটা ব্যবস্থা করুন।’
সমুদ্র বিস্মিত হয়ে বলল, ‘সে কী। ওটা এখনো তোমরা কাটোনি!’
নীল বলল, ‘কে বলেছে কাটিনি! পরদিন সকালেই কেটেছি। আপনার জন্যে এই এতটুকুন রেখে দেওয়া আছে।’
‘যাক, শান্তি পেলাম। আমি তো ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম সত্যি। কারণ সেদিন আমার একটু মন খারাপ হয়েছিল। আসলে, অস্বীকার করব না। মনোভাব লুকোতে পারি না আমি। আর, বোকার মতো সেটা বোধয় আমার মুখচোখ দেখে সেদিনও খুব বোঝা যাচ্ছিল, তাই না? আসলে আমি বরাবরই এমন, বুঝলেন? আপনাদের নিশ্চয়ই অনেক বিরক্ত করেছে আমার ওই, মানে, আমার মুখের ভাবটা। নিশ্চয়ই অনেক করুণা করেছেন আমাকে।’
নিশিথিনী বলল, ‘করুণা কী?’
সমুদ্র বলল, ‘হ্যাঁ মা, করুণা হলো... আসলে করুণা হলো গিয়ে, ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করা কঠিন। কী করে তোমাকে বলি মা!’
তাকে বাঁচাতে নীল বলে উঠল, ‘চলুন, একসঙ্গে হাঁটা যাক কিছুক্ষণ। যদি আপনার কোনো আপত্তি না থাকে।’
‘না, আপত্তি কিসের। চলুন না। তবে আমি আসলে নিজেকে নিয়ে খুব বিব্রত থাকি। কখন কী বলতে যে কী বলি নেই ঠিক। বিশেষ করে, বিশেষ করে’ একবার সঙ্কোচ করে সমুদ্র বলেই ফেলল, ‘কোনো ভদ্রমহিলার সঙ্গে আমি একেবারেই আড়ষ্ট। আমাকে আসলে ছোটবেলায় মিশতে দেওয়া হতো না মেয়েদের সাথে। যদি তা হতো ঠিকঠাক, তাহলে বোধয় এসমস্ত অপ্রয়োজনীয় জড়তা থাকত না।’
নীলা বলল, ‘ঠিক বলেছেন। এসব জড়তা একদম অপ্রয়োজনীয়। আর মেয়েদের জন্যেও ভালো নয়। তারা প্রথম প্রথম নিজেকে আলাদা ভেবে মজা পায়। কিন্তু একটু তলিয়ে ভাবলেই নিজেদের Alieneted*৪ ভাবতে বাধ্য। ফলটা শেষমেশ শুভ হয় না।’
দীর্ঘ নীরবতা। নিশিথিনী একটা কাকের পেছন পেছন দৌড়ে খানিক আলাদা হয়ে গেল।
নীলা বলল, ‘আচ্ছা যদি কিছু মনে না করেন। একটা ব্যক্তিগত ব্যাপার জানতে চাইবো।’
সমুদ্র শিহরিত হয়ে উঠল। কী জানতে চায় নীল?
‘একটা বিশেষ কারণে জিজ্ঞেস করছি। আপনাদের অফিসে, মানে যেখানে আপনি কাজ করতেন, কী খবর ওখানে? মানে ওরা আপনাকে কিভাবে দেখছে। কী বলছে, বা কী। অনধিকারচর্চা হচ্ছে নাতো আমার? তাহলে মাফ করবেন।’
‘না না, একদম না।’ বলল সমুদ্র। ‘অফিসে আসলে আর কিছু বলার অবকাশ দিইনি ওদের, বহু আগেই ইস্তফা দিয়েছি। পরিবেশটা যাচ্ছেতাই হয়ে উঠছিল।’
‘আচ্ছা। পট কিন্তু খুব দ্রুত বদলে যাচ্ছে। দেখতেই পাচ্ছেন। আমার মনে হয় আপনি আবার অফিসে যোগাযোগ করুন যদি অহমে না লেগে থাকে। আর যদি আমার মতো মস্ত বড় একটা অহম থেকে থাকে তো, কী আর করা। অপেক্ষা করুন। উপায় একটা বেরোবেই।’
উত্তরে সমুদ্র কিছু বলল না। নীরবতা অস্বস্তিকর মনে হওয়ায় নীল বলে উঠল, ‘বললাম না একটা বিশেষ কারণে জানতে চাইছি? কারণটা হলো গিয়ে, আমাদের অফিসে এখন এই কাণ্ড ঘটছে। এখন অর্ধেকের বেশি মানুষ আপনার মতো। চোখে ধাঁধাঁ লেগে যায়। একসময় যারা হয়ত আপনার, আপনাদের জীবন ঝালাপালা করে দিয়েছে তারাও এখন এর ফাঁদে পড়েছে। বুঝতে পারছি না, এটা কি সংক্রামক কিছু? এর ভালোমন্দ সম্বন্ধেও কিছুই জানি না। তো যাক, এখন ওই অর্ধেক অংশ চাইছে দাপ্তরিক কাজকর্ম মাস খানিক বন্ধ থাকুক। অযৌক্তিক নয় কিন্তু। একদমই নয়। আমিও তাই চাই। আমি ওপরে বলেছি, যেন, যারা ওই জোড়া হয়ে ক্ষতিগ্রস্ত, মানে, Sorry! You know what I mean...*৫’
‘আপনি বলে যান দয়া করে। আমি আপনার মন পড়তে পারছি। আমি খুব জানি আপনি কী বোঝাচ্ছেন।’
‘ছন্দ হারিয়ে ফেলেছি। আসলে বলতে চাইছিলাম, আমাদের অফিসে কোনো সিদ্ধান্তে আসতে পারছি না আমরা যে কী করা উচিৎ। তাই আপনাকে জিজ্ঞেস করা। যাক, থাক এসব। বিকেলটাকে কেমন ঘোরালো করে তুললাম।’
‘মোটেও না।’ নীলের মুখের দিকে তাকিয়ে হাসল সমুদ্র। ‘এই আমি আপনাকে বলছি। এখানে আমিই আপনার শ্রোতা, এবং আপনি আমার। সুতরাং পরস্পরের জন্যে আমাদের চেয়ে বড় কোনো বিচারক এ মুহূর্তে এখানে কি আর আছে?’
নীল হেসে বলল, ‘না, নেই।’
‘আপনার অনেকগুলো নীল শাড়ি, তাই না?’
‘না, খুব বেশি নেই। এই, অল্প কয়েকটা। ওগুলোই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বারবার পরি। এই রংটার ওপর আমার দুর্বলতা আছে।’
নিশিথিনী অনেক দূরে একটা পাথরের ওপর বসে আরো দূরের কৃত্রিম অরণ্যের দিকে তাকিয়ে আছে। অতো দূরে কখন গেল মেয়ে?
সেদিকে যেতে যেতে পৃথিবীর পটে নীল আর সমুদ্র ক্রমে ছোট হতে থাকল। সন্ধ্যা এই নামল বলে। সবুজের ওপর শেষ মুহূর্তের সোনালী আলোর মিড়।



খুশি যদি হও, হাসি যদি হও
ঘুড়ি ঘুড়ি উড়ালের নিচে তোমার দেউলাকে ফালা করে দিই!

(চেয়ার)



একি হিরণ, তুমিও দুটো হয়ে গেলে?
নীলের কথায় দরজার চৌকাঠের ওপার থেকে ম্লান হাসল দু’জন হিরণ। ওদের গোঁফে সাদা ছোপ। সাদার ছোঁয়া ওই গোঁফে আগেও ছিল, কিন্তু দেখা যেতে না। রঙে আড়াল হয়ে থাকত। হিরণ ছিল তেমনই। বয়েস হয়ে যাওয়াকে খুব ভয় করত। ঘন ঘন বলতো বুড়ো হয়ে যাওয়ার কথা, মৃত্যুর কথা। মৃত্যুর ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে থাকত না। ¯্রফে মনে পড়ত আরকি খুব।
হিমালয় অভিযানের সময় ওর মনে হচ্ছিল এই তার শেষ অভিযান। কিন্তু শেষ অভিযান হলো সূর্যের।
‘ভেতরে এসো। অনেক দিন পর এলে। প্লিজ, বলো কী খবর।’
‘নীল, তোমাকে একটা খবর দেবো। কোনো ভণিতা না করেই বলতে চাই।’
এই বলে হিরণ দু’জন চুপ করল। মনে হলো ভেতরে খুব বড় ভণিতার প্রস্তুতি নিচ্ছে। নীলার কাঁধের ওপর দিয়ে একবার ঘরের ভেতরের দিকে তাকাল হিরণ। যেন খুঁজল কাউকে।
‘নিশিথিনী ঘরে? ছুটির দিন ছাড়া আসার উপায়ও ছিল না। কিন্তু নিশিথিনীর জন্যেও মনে ভয়।’
‘তোমার ভাগ্য ভালো। নিশিথিনীর স্কুলে একটা অনুষ্ঠান আছে আজ। ও সেখানে গেছে। তুমি নিশ্চিন্ত থাকো। আর হ্যাঁ, শোনো, যা বলার পরেই বোলো ভাই। এবং ভণিতা বাদ দিয়ে নয়। পর্যাপ্ত ভণিতাসহই বোলো। আমার আবার হঠাৎ কোনো কথা সহ্য হয় না। ধাপে ধাপে শুনতে হয়। নয়ত চাপ নিতে পারি না। একটা কোনো দুর্ঘটনা হয়ে যেতে পারে। তুমি নিশ্চয়ই এতোদিন পরে এসে দুর্ঘট বাঁধিয়ে যেতে চাও না!’
এরপর কণ্ঠস্বর বদলে অনেকটা সহজ স্বরে নীলা বলল, ‘কী খাবে বলো। বাইরে তো বেশ গরম আজকাল। চট করে লাচ্ছি করে আনছি।’
হিরণ কোনো কথা না বলে আরাম চেয়ারে বসে থাকল। তার অবিকল মানুষটি কেমন জড়োসড়ো হয়ে নীলের জানালার কাছে শিকগুলো ধরে দাঁড়িয়ে আছে।
সামনের কাচের টেবিলের ওপর একটা পুরনো পত্রিকা। আলগা হয়ে আসা মলাট পাখার বাতাসে উড়ছে সশব্দে। এমন সময় বাইরে কেউ চিৎকার করে উঠল, ‘বল দাও মোরে বল দাও!’ গলিতে কোনো রিকশা বুঝি ঢুকে পড়েছে। মোড় নিতে না পেরে সমানে টুংটাং করে চলেছে।
নীল আর কিছু জিজ্ঞেস না করে ভেতরে চলে গেল।
খানিক বাদে দুই গ্লাস লাচ্ছি বানিয়ে বসার ঘরে এসে দেখল, কেউ নেই। হিরণ চলে গেছে। মলাট আলগা হয়ে আসা ম্যাগাজিনের নিচে চাপা পড়ে আছে একটা সাদা কাগজ।
অর্থাৎ যা বলার সে তা বলতে পারবে কিনা এ নিয়ে বোধয় সন্দিহান ছিল, তাই লিখেও এনেছিল। রেখে গেছে।
কী আছে ওতে? সূর্যের কোনো খবর?
যদি বলার মতো তেমন কোনো খবর হতো তো ও ঘরে এসে খুশিতে চিৎকারে ছাদ মেঝে এক করে সেটা বলতো। কারণ সূর্যের কোনো ভালো খবর, তার পরিবারের কোনো সুসংবাদ, হিরণের জন্যেও সমান বড়। তা করেনি যখন, নিশ্চয়ই এখানে কোনো উদ্ভট সংবাদ আছে। হয়ত দুঃসহ অপমানজনক। হয়ত ভীষণ কষ্টের। কে বলতে পারে।
নীল কাগজের খবরটা পড়ার মতো মন তৈরি নিতে অনেকটা ক্ষণ চেষ্টা করে গেল।
ঘরের বাহিরটা আচমকা শান্ত হয়ে এসেছে। বারান্দার ফাঁক গলে ঠা-া বাতাসও আসছে এমনকি। দূরে কোথাও কি বৃষ্টি শুরু হলো? ঝড়জলের ভেতর আবার না কোনো দুঃস্বপ্ন মনে তৈরি করতে করতে হিরণ ফিরে চলেছে।
নীল ধীর পায়ে এগিয়ে গেল সেই ভাঁজ করা কাগজটার দিকে। এরপর খুব যতেœ সেটাকে তুলে নিলো, যেন কাগজটা ব্যথা পেতে পারে।
আরেকটু হলে খুলেই ফেলেছিল! নিজেকে দমিয়ে জানালা কাছে চলে গিয়ে বাইরের এককোণে এলিজাদের চালতা গাছটা দেখতে পেল নীল। টিয়েরঙা নতুন পাতা এসেছে গাছে।
এই গাছে এ নিয়ে শতবার টিয়ে রঙা পাতা এসেছে। আর কোনোদিন এতো রূপ নিয়ে তা নীলের চোখে ধরা পড়েনি। তার চোখজোড়ায় প্রশংসার সাদা আলো ফুটে উঠল। আর জানালার বাইরে কালো মাটিতে ধীরে ঝরে পড়তে থাকল হাতের কাগজটির ছেঁড়া টুকরো, বিশ্লিষ্ট বর্ণমালা।
পড়েই তারা স্থির থাকল না। হাওয়ায় হাওয়ায় এদিক সেদিক কোথায় উড়ে চলে গেল ঠিকানাবিহীন!
অনেকক্ষণ পর ঘুম ভেঙে উঠে লালাট ঠোঁট মুছে নিলো নীল। কোথাও কি কোনো শব্দ হলো? দরজার ঘণ্টাটা আবার বেজে ওঠায় ঘড়ির ওপর চোখ পড়ল নীলের। হ্যাঁ, এই শব্দেই তবে তার ঘুম ভেঙেছে।
বাইরে দাঁড়িয়ে নিশিথিনী। তারই দাঁড়িয়ে থাকার কথা। তবে ঘরের ভেতরে দাঁড়িয়ে ওরা কারা? নিশিথিনীর জন্যে মূর্তিমতি দুটি বিভ্রান্তি। হাত বাড়িয়ে রেখেছে নীল। পাশে তার নিরুপমা মূর্তি দাঁড়িয়ে।
দু’জনের দিকেই পালা করে তাকিয়ে নিশিথিনী হেসে বলল, ‘কার কাছে যাব?
সাজগোজ করে বিকেলে হাঁটার জন্যে বেরিয়ে মেজর দু’জন তার দরজার পাশে তাকিয়ে অবাক হয়ে গেলেন। আকাশের নীল পটে সবল হাওয়ায় ডাল দোলাচ্ছে অবিকল এক দুটি বেল গাছ।
কণ্ঠে কপট রাগ পশিয়ে মেজর বললেন, ‘You dumb tree!*৬ এতোদিনে তার টনক নড়েছে!’
পরমুহূর্তে স্বর নামিয়ে পালা করে দুটোর গুঁড়িতে হাত বুলিয়ে বললেন, ‘তারপর? বল্ দেখি, দেহমনের কী এমন জটিল অস্ত্রোপচারের ভেতর দিয়ে গেলি যে; আচ্ছা থাক, থাক। এখন নয়। আজ রাতের স্বপ্নে আমায় বলিস। কেমন? এখন আমি যাচ্ছি To the walk that I need!*৭ বৈকালিক! ট্রালা-লালা! আমার মনে ভারি আনন্দ! তুই দাঁড়া! আমাকে স্বপ্নে যেন সব বলবি, সব। কিছুই যেন বাদ না পড়ে!’
পশ্চিমে মাঠের দিকে হেঁটে যাওয়া জোড়া বৃদ্ধের ছোট একটা দল তখন ঢিলেঢালা লেফট রাইটে মেজরের বাড়ি অতিক্রম করছে। দুটি বৃদ্ধ হাত তুলে তার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাইলো। দেখাদেখি তাদের জমজ দুটিও হাত তোলার ভঙ্গি করল নিষ্প্রাণ।
সাড়া দিয়ে জোড়া বুড়ো মেজর লম্বা পা ফেলে মিশে গেল তাদের দলে।


গল্প, কাছেই এক শহরে

*১ বেকুব মূঢ়ের দল!
*২ কোন নরক রে তুই!
*৩ এর বেশি কিছু নয়। কিন্তু কোনো একভাবে...
*৪ জনবিচ্ছিন্ন, বহিরাগত
*৫ মাফ করবেন, আমাকে ভুল বোঝেননি তো!
*৬ নির্বোধ গাছ কোথাকার!
*৭ আমার বড় আপন হন্টনের কাছে যাই।