রিহার্সাল বিষয়ক

রঙ্গন রায় ও শিবু মণ্ডল

রঙ্গন রায়

রিহার্সাল বিষয়ক

পোড়া পোড়া গন্ধ আমাদের শরীরে শরীরে
অজস্র নাটকীয়তা ভীড় করে আসে মগজে
ফাঁকা গ্রীনরুমে ফিলামেন্ট কাটা বাল্ব -
ক্রমশ প্রকাশ্য কিছু অন্তরাল
কাটা কাটা ছবি পরতে পরতে ছড়িয়ে পড়ছে
চরাচর ... যে আলোকে আমি কোনো দিন ধরিনি
অথচ মঞ্চের সমস্ত আলোকমালায় আমার হাতের মূঠো ...
চরিত্র নয় , বরং প্রপসের হয়ে কিছু কথা
শোনা দরকার - শোনা দরকার অডিটোরিয়ামে
প্রতিটি দর্শকের মঞ্চ দাপানো চিৎকার …
আমাদের গলা টিপে আসছে , আমাদের ডায়ালগ
ভুল হয়ে যাচ্ছে , প্রম্পটার শুধু পালিয়ে পালিয়ে -
এভাবে বেশিদিন চলবেনা হে সমস্ত মাউথপিস -এরকম
শক্তির উৎস হারিয়ে দিচ্ছে প্রম্পটার
শিগগির যাও , প্রতিদিন খুঁজে আনো
আমাদের অজস্র প্রম্পটার দরকার -
মাথাটা ফাঁক করে দেখো কার কতটা
হলদে রঙের ঘিলু …কার কতটা প্রম্পটার প্রয়োজন




যতটা সূর্য আমরা ডুবতে দেখেছিলাম

কাচপোকার কাচে যুদ্ধ থামছে , সঞ্জয় উবাচ যুদ্ধের কথায় শুধুই কুরুক্ষেত্র কুরুক্ষেত্রে কোনো মুসলমান ছিলনা - যুদ্ধ বলতে তো মধ্যরাতে প্রবল শীৎকারও মনে পড়তে পারে নয়তো কিছু শ্রেণী সংগ্রাম! সত্যিই যারা রাতের অন্ধকারে একলা হস্তমৈথুন আমি তাদের দলেই ভিড়ে পড়ি অনায়াসে , এ যুদ্ধের সাথে সমস্ত পৃথিবীতে প্রেমিকার কোয়াশা নেমে আসে ওষুধ - জ্বর - মাথাব্যথা - মানসিক অবসাদ ... চুম্বকের তলে প্রবল নাচছে লোহা বনবনবননননন ঘুরছে পৃথিবী - টলছে মদের ঘোর তালাটা খুলতে পারবেনা ... অবশেষে ফিরে যাচ্ছো আমি তোমাদের যা যা বলেছিলাম সমস্ত কিছু এক কান দিয়ে ঢুকিয়ে অপর কান যে এসেছিল সে যে নারী --- তুমি পূর্ব দিক করে ফিরে যেও , পেছন ফিরে ওভাবে তাকিওনা --- আমার থেকে তোমার দূরত্ব যত দূরে ... যত দূরেই হোক




সাম্প্রতিক যা বলতে চেয়েছি

আমার মাঝে মাঝে বমি পায় ,
ভীষণ বমি করে ফেলতে ইচ্ছে করে
অথচ বমি করতে গেলেই জোর করে
ওষুধ গিলিয়ে দেয় , আমি কোথায় যাব আঁধার?
কাকে বলবো আমার এ অসুখের কথা।
মাঝে মাঝে তো আমরা লিখতেও পারিনা ,
তোমার কথা - আমার কথা
আমাদের বমি করে ফেলবার কথা ...
একটা কেমন অস্বস্তি হয় বুকে , মনে হয়
প্রখর খরা চলছে যেন , কিন্তু এখন শীতকাল।
একটাও শব্দ ফেলবোনা বলে মা
প্লাস্টিক ধরিয়ে দিয়েছে হাতে , বলেছে
বমি যেখানে সেখানে করতে নেই ;
কিন্তু সেই সাত বছরের মেয়েটির যোনীদেশ থেকে
যে চাপচাপ রক্তের দাগ নেমে এসেছে
এই শীতের ফুটপাতে ...
আমি কি এসব দেখেও বমি করতে পারবোনা
যেখানে সেখানে?
আমাকে কি পুলিশ ধরবে? বেদম প্রহার করে
হত্যা করবে রাষ্ট্রযন্ত্র?
আমার লিফলেটটি ছিঁড়ে ফেলেছে সবাই ,
কিন্তু আমাকে বেঁচে থাকতেই হবে
বমি করার মত একটা উপযুক্ত স্থান
খুঁজে বের করাটা আমার মনে হয়
বেঁচে থাকার স্বার্থকতা -
আমি এই রক্তমাখা পৃথিবীর মধ্যে
একাই বিড়বিড় করবো , জীবনের কথা বলবো
ভালোবাসার কথা বলবো , তুমি বলো আঁধার
তোমার কথা - আমার কথা - আমাদের বেঁচে
থাকার কথা

=====================================================

শিবু মণ্ডল
একটি অসম্পূর্ণ কাহিনী


আজকাল খবরের চ্যানেলগুলো খুললেই যেসমস্ত খবর দেখতে পায় অরিত্র তাতে কেমন যেন ক্রোধ দানা বাঁধে তার মনে। ভীষণ হতাশা বোধ করে সমাজের কথা ভাবতে গিয়ে,দেশের পরিস্থিতি দেখে। চল্লিশ লক্ষ লোক বেআইনি অনুপ্রবেশকারী শুধু দেশের একটি রাজ্যেই বসবাস করছে। একীরে বাবা! আমার দেশের লোক খেতে পারছে না, রোজগার পাচ্ছেনা আর কোথা থেকে উড়ে এসে জুড়ে বসা বিদেশীরা এসে আমাদের ট্যাক্সের পয়সায় বেঁচেবর্তে আছে। মানছি তার মধ্যে অনেক শরণার্থীও আছে কিন্তু বাকি যারা শরণার্থী নয় তারা? তারা কেনো তাদের দেশ ছেড়ে এসে মেকি শরণার্থী সেজে আমাদের দেশে এসে সুযোগ সুবিধা ভোগ করবে? টিভি বন্ধ করে খবরের কাগজ খুলে বসে সে। সম্পাদকীয় কলামগুলো সে মিস্‌ করে না।
“ত্রিবিধং নরকস্যেদং দ্বারং নাশনমাত্মনঃ ।
কামঃ ক্রোধস্তথা লোভস্তস্মাদেতত্রয়ং ত্যজেৎ ।।
অর্থাৎ কাম, ক্রোধ ও লোভ – এই তিনটি নরকের দ্বার, অতএব ঐ তিনটি পরিত্যাগ করবে। এটা শাস্ত্রের কথা। প্রাচীনকালে যেমন শাস্ত্র ছিল তেমনই এখন আছে রাষ্ট্র ও তার সংবিধান। শাস্ত্রকে রক্ষা করার জন্য ছিল শাস্ত্রকার তথা ধার্মিক। ধর্ম তথা ধার্মিক ছিল বলে স্বভাবতই একটা অধর্ম তথা অধার্মিকও গড়ে উঠেছিলো। আখেরে এ মহাজগত সঞ্চালনের মূল শক্তিই কিনা বৈপরীত্য তাই...।
রাষ্ট্রকে রক্ষা করার জন্য আছে এখন কাঁটাতার ও তার আইনকানুন আর তার বিপরীতে আছে কাঁটাতারে ক্ষতবিক্ষত হৃদয় ও আইনভঙ্গের উন্মত্ততা। দেশ ও দেশপ্রেম একটি বিমূর্ত ভাবনা বলে আমাদের আবেগে কিছুটা ভাঁটা পড়ে হয়তো তাই আছে আমাদের ভাগাভাগি, কাঁটাতার, আছে স্বাধীনতা, আছে বৈরী দেশ।
দেশ তখন আমাদের কাছে একটি ভৌগলিক সীমারেখা দ্বারা আবদ্ধ একটি ভূখণ্ড। দেশের মানুষ এক-একটি জ্যামিতিক আকৃতির সমম্বয়ে গঠিত শরীর; এশরিরে কাম থাকবে, লোভ থাকবে, থাকবে অপূর্ণতার ক্রোধ। এটাই তো স্বাভাবিক।...”এরকম একটি সম্পাদকীয় পড়তে গিয়ে গা’টা রিরি করে উঠল তার। কিছু কিছু সম্পাদকের এমন ভণ্ড জ্ঞানগম্যি ভরা লেখাকে তার ন্যাকামোই মনে হয়।
‘শুনছো তোমার মা ফোন করেছিলো আজ তোমার বাবার পুরোনো স্কুলসার্টিফিকেট আর দাদুর মাইগ্রেশনকার্ড নাকি খুঁজে পাচ্ছে না। তোমার কাছে কিছু আছে নাকি দেখতে বলেছে।’ পাশের ঘর থেকে বউয়ের গলা ভেসে এল।
‘বাবার সার্টিফিকেট আমার কাছে থাকবে কেনো? বাবা মারা যাবার পরতো সমস্ত কাগজপত্র একটা ফাইলে গুছিয়ে মাকে দিয়েছিলাম যত্ন করে রেখে দিতে। দাদুর মাইগ্রেশন কার্ড কোথায় পাবো আমি? আর এখন কিইবা দরকার পড়ল মরা মানুষগুলোর সেইসব কাগজপত্র ঘাঁটানোর।’ একরাশ বিরক্তি ঝরে পড়ল অরিত্রর কথায়।
‘না এমনি কোনও দরকার নেই, তবে বলছিল ভবিষ্যতে এ রাজ্যেও যদি আসামের মত জাতীয় নাগরিক পঞ্জিকরণ চালু হয় তবে কিন্তু নাগরিকত্বের প্রমাণ হিসেবে পূর্বপুরুষের সেইসব কগজপত্রের দরকার হতে পারে।’
অরিত্র মুখে কোনও কথা নেই। কেমন চুপ মেরে গেল। একরাশ বিস্ময় নাকি ভয় যেন তার মুখমণ্ডলে ছড়িয়ে গেল। ‘এমনটাও হতে পারে নাকি’ কথাটি মুখ ফুটে বেরতে পারল না। অরিত্রর মায়ের জন্ম বাংলাদেশে হলেও দেশভাগের পরে এদেশে চলে আসে উদ্বাস্তু হয়ে তারা। দাদু- ঠাকুরদা সহ হাজার হাজার বাংলাদেশী শরণার্থীরা সর্বস্ব হারিয়ে কোলেকাঁখে ছেলেমেয়েদের নিয়ে ভারতের উদ্বাস্তু শিবিরে আশ্রয় নেয়।এরপর এক কঠিন লড়াইয়ের পর তারা ধীরে ধীরে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জনপদে বাসস্থান গড়ে তোলে।তবে অরিত্রর বাবার জন্ম এদেশেই। তারপরেও অনেক বাঙালি এদেশে আসতে শুরু করে আশ্রয়ের জন্য। সেই অভিশপ্ত উদ্বাস্তু জীবনের কথা ছোটবেলা থেকেই সে শুনে শুনে বড় হয়েছে মা ঠাকুমার কাছে। নিজস্ব দেশ, ভিটেমাটি ছেড়ে চলে আসার যন্ত্রণা তাদের বুকে এখনো বেজে চলে। অরিত্রই হয়ত তেমনভাবে অনুধাবন করতে পারেনি। যেমন তার রগচটা বাবাও বুঝতে পারতো তার ধীরস্থির-শান্তশিষ্ট মা’কে।

......আসাম সহ পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরাতেও লক্ষ লক্ষ লোকের তালিকা তৈরি হয়েছে অবৈধ অনুপ্রবেশকারী চিহ্নিত করে। সারা দেশ জুড়ে তোলপাড়। চল্লিশ-পঞ্চাশ বছর ধরে এদেশে বসবাস করার পরেও একটা পূর্বপুরুষের পরিচয়পত্র না দেখাতে পারার জন্যই কেবল বিশাল একটি জনগোষ্ঠী দেশহীন হয়ে পড়ল। তারা সবাই প্রায় বাঙালি। এতে যেমন শুধু সরকারী রেশনের উপর টিকে থাকা জনগণ আছে তেমনি আছে অরিত্রর মতো সরকারী কর্মচারীও। ভিটেমাটি হারানোর ভয়ে জনগণ ক্ষোভে আন্দোলনে ফেটে পড়েছে। দেশের সরকার না পারছে এই তালিকা গিলে খেতে না পারছে উগড়ে দিতে। শুধু সান্ত্বনা দিচ্ছে যে পুনঃমূল্যায়ন হবে তালিকার। বিরোধীরাজনৈতিক দলগুলিও আন্দোলনে সামিল হয়েছে। আন্দোলন ক্রমশ হিংসাত্মক রূপ নিতে শুরু করেছে। দেশের সরকারের সাথে সংবদ্ধ হয়ে সরাসরি সংঘাতেও নেমে পড়েছে কিছু কিছু জায়গায় আন্দোলনকারীরা। আন্দোলন কিছুকিছু স্থানে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় জরুরী অবস্থা জারি করতে বাধ্য হয়েছে সরকার। এরমধ্যে আন্দোলনকারীরা বিরোধী রাজনৈতিক নেতানেত্রিদের সাহায্যে আলাদা ‘অবিভক্তবঙ্গ’ নামে একটি স্বতন্ত্র দেশ গঠনের কথা ঘোষণা করায় আন্দোলন আরও ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে। আন্দোলনকারীরা সরাসরি সংঘাতে যাওয়ায় দু’এক জায়গায় সরকারের ক্রোধও বেরিয়ে আসছে। ফলে সরকারী সম্পত্তির ক্ষতির পাশাপাশি আন্দোলনকারীদের মধ্য থেকেও মৃত্যুর খবর আসছে। খবরের কাগজগুলিতে এখবর ছাপা হচ্ছে যে এই আন্দোলনে নাকি পাশের দেশও গোপনে সাহায্য করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে আন্দোলনকারী নেতা নেত্রীদের। তারাও নাকি সহমত এই অবিভক্তবঙ্গ দেশের গঠনে। যেসব বাঙ্গালিদের নাম তালিকায় নেই তারা এবার দ্বিধাগ্রস্ত যে এই আন্দোলনকে সমর্থন করবে কি করবে না । সব মিলিয়ে তিন রাজ্য জুড়ে এক অরাজকতার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। চারিদিকে মিটিং মিছিল, গণ্ডগোল, আর শুধু ‘জয়বঙ্গ’, ‘জয়বঙ্গ’ ধ্বনি যা ওপারের বাংলাতেও ছড়িয়ে গেছে। দু’দেশের বিশিষ্ট আন্দোলনকারী বাঙ্গালিরা মিলে খসড়া প্রস্তুত করতেও নাকি নেমে পড়েছে; কেমন হবে সেই নতুন দেশ। তারা জনগণকে স্বপ্ন দেখাচ্ছে যে সেই নতুন দেশ নাকি হবে একেবারে বাউলের দেশের মতো; যেখানে জাতি-ধর্ম ভুলে সবাই শুধু একটি ভাষাকে ভালোবেসে তার সংস্কৃতিকে ভালোবেসে, সহজিয়া ধর্মের ভিত্তিতে একসাথে বাস করবে। ‘জয়বঙ্গ’, ‘জয়বঙ্গ’......
এই অরিত্র এই ওঠো, ওঠো অরিত্র, আটটা বেজে গেছে, অফিস যাবে কখন? বউ স্নান সেরে এসে একেবারে ধাক্কা দিয়ে দিয়ে অরিত্রকে ঘুম থেকে উঠিয়ে দিল।
‘কি স্বপ্ন দেখছিলে তুমি? জয়বঙ্গ জয়বঙ্গ বলে চেঁচাচ্ছিলে যে !’
অ্যাঁ ! স্বপ্ন দেখছিল সে তবে! চোখ ডলতে ডলতে অনুভব করল স্বপ্নের মিছিলে স্লোগান দিতে দিতে সে ঘেমেও গেছে। ‘আরে আটটা বেজে গেল আর তুমি ডাকোনি কেন এতক্ষণ? আজ অফিসে জিএম মিটিং ডেকেছে ঠিক ন’টায়পরের ট্যুরের ব্যাপারে! কেলো হয়ে যাবে আজ।’ বউয়ের উপর চোটপাট করতে করতে বাথরুমে চলে গেল অরিত্র।
আজ অফিসে আসতে আসতে দশটা বেজে গেল। দেরি হচ্ছে কেন জানতে রাস্তায় থাকতে একবার জিএম এর ফোনও এসেছিলো। আজ একপ্রস্থ ঝাড় খাওয়া নিশ্চিত। দু’একদিনের মধ্যেই কোডারমা সাইটে পাঠানোর কথা আছে কাউকে; জিএম প্রাথমিকভাবে অরিত্রকে বলেও রেখেছিলো, আজ ফাইনাল হবে কে যাবে। তবে অরিত্র নিশ্চিত যে বুড়ো স্যান্যাল ওকেই পাঠাবে।অরিত্র কলকাতা অফিসে একদিনের জায়গায় দুদিন বসে থাকলেই বুড়োর যেন চোখে জ্বালা ধরে যায়। অথচ দেখো সুজন ব্যানার্জি কেমন তেল মেরে মেরে দিনের পর দিন কলকাতায় পড়ে থাকে। ট্যুর দিলেও আশেপাশের সাইটগুলোতেই পাঠায় যেখানে দিনের দিনেই ফিরে আসা যায় বা খুব বড়জোর দু’দিনের জন্য। আর যদি কোনও ফরেন প্রোজেক্ট সাইটে পাঠানোর দরকার হয় তখন কিন্তু আগে আগেই সুজনের নাম পাঠিয়ে দেয় ডিরেক্টরের কাছে। গত মার্চেই তো প্রায় পনের দিনের জন্য ভুটান থেকে ঘুরে এল। পনের দিনে মোটা টাকাও কামিয়েছে যেহেতু সেই কটাদিনের স্যালারি ডলারে কাউন্ট হবে যে! শালা হারামি সব! এই নিয়ে অরিত্রও যে স্যান্যাল কে শোনাতে ছাড়েনি; সে হোক না তার জিএম। আর স্যান্যালও অরিত্রের এই বেপরোয়া ব্যবহারের জন্য খাপ্পা হয়ে ছিল ওর ওপর। যদিও পরে সে ক্ষমা চেয়ে নিয়েছিলো জিএম এর কাছে। আজও তার অন্যথা হবে না, আবার রেগে আজকেই না পাঠিয়ে দেয় সাইটে। এই ভাবতে ভাবতে সে জিএমের চেম্বারে ঢোকে।
‘মর্নিং স্যার!’
‘মর্নিং, বোসো ! একটা ভালো খবর আছে।’ বলেই কোনও ফাইল নিতে উঠে গেল পেছনের আলমারিটা থেকে।
বুড়োর খোশমেজাজ দেখে মনে মনে প্রমাদ গুনছে অরিত্র। কি বাঁশ টা যে দেবে আজ! আবার অবাকও হচ্ছে দেরি হবার কারণে গালাগাল না করায়।
‘শোনো তোমাকে ট্যেকনিকেল সার্ভিস থেকে ইরেকশন-কমিশনিং এ ট্রান্সফার করেছে ডিরেক্টর। আর ফরেন প্রজেক্টে পাঠাচ্ছে! কোথায় জানো?’
অরিত্র চুপচাপ। ট্যেকনিকেল সার্ভিস থেকে ইরেকশন-কমিশনিং এক অন্য চাপের কাজ। চার পাঁচ বছর ধরে সাইটেই থাকতে হবে প্রজেক্ট শেষ না হওয়া পর্যন্ত, যদিও ফরেন প্রজেক্টে প্রচুর টাকা। যাই হোক ট্রান্সফারের ক্ষেত্রে কিছু বলার থাকে না কারও।
‘ বাংলাদেশে নতুন প্রোজেক্ট এর সিভিল এর কাজ শুরু হয়ে গেছে। আগামী পনের দিনের মধ্যেই সাইটে রিপোর্ট করতে হবে। পাসপোর্ট আর যাবতীয় ডকুমেন্ট ডিরেক্টরের অফিসে কালকের মধ্যেই জমা করে দাও। কোনও অসুবিধা নেই তো!’
বাংলাদেশ প্রজেক্টে যাবার জন্য অনেকেই যে হা পিত্যেশ করে বসে আছে সে খবর অরিত্র ভালো করেই জানে। বিশেষ করে কোলকাতা বা তার আশেপাশে যারা থাকে তাদের জন্য তো সোনায় সোহাগা ! ঘরের কাছে একেবারে ঘরের পরিবেশে থাকা খাওয়ার কোনও সমস্যাই হবে না আবার মাইনেও ডলারের হিসেবে পাওয়া যাবে! সুতরাং আপত্তির কোনও কারণই নেই।‘ আমি কালকের মধ্যেই সব ডকুমেন্ট জমা করে দিচ্ছি স্যার।’
‘গুড ! কংগ্র্যাচুলেশন ফর ইওউর নিউ অ্যাসাইন্মেন্ট।’

ফ্ল্যাটে ফেরার সময় ট্যাক্সিতে বসে বসে অফিসের একটি হোয়াটস্‌অ্যাপ গ্রুপের কিছু ছবি দেখছে অরিত্র। দু’দিন আগেই এসেছে মেসেজে, এড়িয়ে গেছিল। আজ নিজের কৌতূহলেই কেন যেন স্ক্রোল করে করে দেখছে। স্থানীয় সন্ধ্যা নামক একটি মাছ বাজারের ছবি তাতে একটি বিশালাকার কাতলা মাছ সদ্য জল থেকে উঠে এসে শুয়ে আছে কলাপাতা মুড়ে। খুলনা সিটি থেকে পাঠিয়েছে সুহাসদা। আরেকটা ছবিতে দেখা যাচ্ছে চারিদিকে শুধু জল আর জল আল দিয়ে বাঁধা, তারই মাঝখান দিয়ে ভেসে গেছে একটি চওড়া কাঁচা রাস্তা। আল দিয়ে বাঁধা এগুলো নাকি মাছখেত; বিভিন্ন মাছের চাষ হয় এখানে। সেইসব খেতের বেশ দূরে দূরে একটি করে খড়ের মাচান বাঁধা আছে। খুলনার কাছাকাছি এরকম একটি তরল জায়গার আশেপাশেই নাকি শুরু হয়েছে ভারর-বাংলাদেশের যৌথউদ্যোগেমৈত্রী তাপ বিদ্যুৎপ্রকল্প। দিন পনের আগেই সুহাসদা’র ট্রান্সফার হয়েছে বাংলাদেশে। ছবিগুলো দেখতে দেখতে অরিত্রর ছোটবেলার কথা মনে পড়ে; মা, ঠাকুরমা গল্প করতো তাদের দেশে কথা; বর্ষার সময় যখন নাকি বাড়ির উঠোন সহ রাস্তাঘাট সব কিছু জলে ভরে যেত তখন ঘরের দাওয়ায় বসেই নাকি বড় বড় কই,মাগুর মাছ ধরত তারা। সবার বাড়িতেই একটি করে নৌকা থাকত বাঁধাধরা। অরিত্রর জীবনের এই বিশেষ দুই নারীই তাদের কৈশোর ও প্রথম যৌবনের বেশ কিছুকাল কাটিয়েছে তাদের দেশের বাড়ি মানে বাংলা দেশে। মনে মনে ইচ্ছে হয় ঠাকুরমা আজ বেঁচে থাকলে এখনি ছুটে যেত মালদার বাড়িতে; গিয়ে বলতো ঠাকুমা তোমার দ্যাশের গল্প কও তো শুনি। আমি যামু চাকরী নিয়া। তুমি যাইবা নাকি তুমাগো ঢাকায়। বাগইর নাকি নদ্‌দা কি যেন নাম বলতো ঠাকুমা। যখন দেশের কথা বলতে শুরু করতো চোখদুটো চিক্‌চিক্‌ করে উঠত ঠাকুমার নিশ্চিত যেমন মা’র এখন হয়; অরিত্র হয়তো বুঝত না ছোট ছিল বলে। সত্যিই কত বছর হয়ে গেল মায়ের সাথে একটু গল্প করা হয় না। কলেজে পড়ার দিনগুলোতেও মনে পড়ে মায়ের সাথে কতো গল্প করেছে সে। তারপর চাকরী, বাবার হঠাৎ করে চলে যাওয়া... মা , মা এখন কার সাথে কথা বলে তবে? কাকে তার দেশের কথা শোনায়?
রাতের ডিনার শেষ করে গতকালের অর্ধেক পড়া খবরের কাগজের সম্পাদকীয়টা নিয়ে বসে অরিত্র।–
“তবে ভারত-বাংলাদেশের সীমান্ত আর দশটা দেশের সীমান্তের মতো নয়। সেখানে কাঁটাতারের বাঁধা যেমন আছে তেমনই আছে অবিচ্ছিন্ন আবেগের একটা অবাধ স্রোত। সে স্রোত জোয়ার ভাঁটার মতো মানুষগুলিকে কখনো এপার কখনো ওপার করে ভাসিয়ে নিয়ে চলে। জোয়ারের টানে নৌকো এদেশে চলে এলেও তারা জানে একটা চোরা দড়ি ওপার বাংলার ভাঁটিতে নোঙ্গর বাঁধা আছে যে। ভারতের সংবিধান মতে তারা অনুপ্রবেশকারী বা উদ্বাস্তু হলেও তাদের মন এসব কিছু মানে না। এ পাড়ের দেশ যতটা তাদের মা ওপারের দেশও ততটা তাদের মা। একটা দেশ যে ভাগ করা যেতে পারে এই বোধটাই হয়তো ছাপোষা মানষগুলোর তৈরি হয়নি তখন। অনেকের হয়তো সেই বোধ এল অনেক পরে। আর যাদের এখনো জন্মায়নি বোঝাই যায় দুমুঠো খেয়েপরে বেঁচে থাকাটাই তাদের একমাত্র জীবন, মাথার উপর মুলিবাঁশের ছাউনিটাই একমাত্র দেশ সে কোনও নদীর চরায় হোক বা জঙ্গলের আশেপাশে। আর কোনও দেশ তো এদের কখনো ছিল না; না কোনও রাষ্ট্র তাদের স্বীকৃতি দেবে কখনো। তবে তারা কোথায় যাবে? এই প্রশ্নটা কি কোনও দেশ উঠিয়েছে? বা কোনও দেশের সুনাগরিক? যে মেয়েমানুষটা এদেশে এসে লোকের ঘরে ঘরে পরিচারিকার কাজ করে স্বামীর সংসারে দুটো উন্নতি করার চেষ্টা করছে তাকে যদি তার দেশে শুধু ভিন্ন ধর্মের কারণে লাঞ্ছিত হতে হয় তার পরও তাকে আমরা জোর করে ফেরত পাঠাবো ওর দেশে? অথবা যে লোকটা ঝড়, বন্যায় সর্বস্বান্ত হয়ে এপারে এসে রিকশা চালিয়ে শুধু অন্নসংস্থানের জন্য একটা প্লাস্টিকের ঝুপড়ি বানিয়েছে রাস্তার ধারে; সে লোকটার কোনও বক্তব্য না শুনেই কি পারে কোনও রাষ্ট্র তাকে ফায়ারিং স্কোয়াডের সামনে দাড় করিয়ে দিতে? না পারে না, কোনও সুস্থ রাষ্ট্রই তা পারে না। তাই আমাদের দেশও তা পারবে না।
তবে কেন যজ্ঞাহুতির কাষ্ঠ হিসেবে এতগুলো লোককে ব্যবহারের জন্য অমানবিকভাবে বাছাই করা। আর কেনই বা সেই অজুহাতে যারা তাদের ঠিক সেভাবেই ব্যাবহার করে এসেছে এতদিন তারাও সেই কাষ্ঠ বেহাত হয়ে যাবার ভয়ে এক অসুস্থ ক্ষোভের পরিস্থিতির সৃষ্টি করছে।”

অন্ধকার হয়ে গেছে অনেকক্ষণ; মোবাইলের স্ক্রিন অন করে দেখল আটটা বাজতে দশ। এই সময় সাধারণত খুলনার আবাসনে পৌঁছে যায় অরিত্র। কিন্তু আজ এখনো সাইটেই পড়ে আছে। আসলে কিছু পাইপলাইনের ওয়েল্ডিঙের রেডিওগ্রাফি রিপোর্ট প্রায় অপ্রত্যাশিতভাবে খারাপ এসেছে। তার বিশ বছরের চাকরী জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে সে এটুকু জানে যে যেখানে ৫% টেস্ট রিকোয়্যারমেন্টেও যদি পুরো পুরো ফিল্মে ওয়েল্ডিং ডিফেক্ট আসে তবে শুধু রাগই হয়না সন্দেহও জাগে সেই ওয়েল্ডার সম্পর্কে। তবুও অরিত্র কিছু কিছু সেগমেন্টে রিস্যুট করাতে দিয়েছিল ইন্সপেকশন এজেন্সিকিউমেক্‌কে । তারই রিপোর্টের অপেক্ষায় বসে আছে। স্থানীয় ঠিকাদার সংস্থা কালাম ফেব্রিকেটরস্‌ এর ইঞ্জিনিয়ার রাসেলকে রিপোর্ট আসার পর থেকেই তার চেম্বারে বসিয়ে রেখেছে। বহুত ঝাড় খেয়েছে ছেলেটা। বাঙালি বলেই হয়তো এরকমভাবে ঝেড়ে বকাবকি করতে পারলো অরিত্র। আর ছেলেটাও মাথানিচু করে শুনে গেল আর অরিত্রকে এই বলে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করল যে ‘ স্যর কালকের মধ্যেইসব ডিফেক্ট রিপেয়ার করিয়ে দেব। আর ওয়েল্ডার ও চেঞ্জ করে দেবো।’
‘কালকের মধ্যে মানে? আজ রাতের শিফটের মধ্যেই সমস্ত রিপেয়ার করা চাই! আর তার পরও যদি কোনও ডিফেক্ট আসে তোমাদের কোম্পানিকে ব্ল্যাকলিস্টেড করা হবে! কি যাচ্ছেতাই ওয়েল্ডিং করেছে। এ কি গ্রিল ফ্যাক্টরির কাজ পেয়েছ নাকি! এক্ষুনি ডেকে আনো তোমার সেই ওয়েল্ডারকে।’
‘হ্যাঁ, না মানে স্যার ও মানে হাসিবুলের তো ডে শিফট্‌ ছিলো তাই বেরিয়ে গেছে। কাল সকালেই নিয়ে আসবো।’
‘তোমাদের সমস্ত ওয়েল্ডারের টেস্ট কোয়ালিফাইড্‌ সার্টিফিকেট নিয়ে আসো এক্ষুনি,আমি চেক্‌ করবো। আর কাল থেকে যেন সেই ওয়েল্ডারকে আর সাইটে না দেখি!’
রাসেল দু’তিন মিনিটের মধ্যেই ওর অফিস থেকে একটা ফাইল এনে অরিত্রর টেবিলে রেখে সামনেই দাঁড়িয়ে রইল।
ফাইলের মধ্যে রাখা দু’পাতার একটি লিস্টের দু’বার করে চোখ বুলিয়েও হাসিবুলের নাম খুঁজে পেল না অরিত্র।-‘কোথায় এখানে তোমার হাসিবুলের নাম? কোথায় দেখাও তো’ বলে ফাইলটি রাসেলের দিকে একরকম ছুঁড়ে দিল সে।
রাসেলের কাছে দেবার কোনও উত্তর নেই সেটা রাসেল নিজেই ভালো করে জানে। ভুল তো তাদের হয়েছেই। আসলে প্রায় দশদিন আগেই ওদের মালিক হাসিবুলকে পাঠিয়ে দিয়ে বলে যে - ছেলেটা অনেকদিন থেইক্যা কাইজের লইগা পিছনে লাইগ্যা রইছে; ওয়েল্ডিংএর কাইজ জানে কয়; দেখ রাখা যায় কিনা।’কোনও সার্টিফিকেট ছিল না বলে রাসেল ওকে স্ট্রাকচারাল ওয়েল্ডিঙে লাগিয়েছিল। এদিকে ওয়াটার সাপ্লাই পাইপলাইনের কাজে একজন অসুস্থ হয়ে পড়ায় কালামকে সেখানে আনা হয় টেম্পোরারি ভাবে এই ভেবে যে দু’একদিনেরই তো কাজ কেউ খেয়াল করবে না। অবশ্য দুয়েকদিনের মধ্যেই ওর টেস্ট মারার জন্য কথাও বলেছিল কিউমেকের ইঞ্জিনিয়ারের সাথে। কিন্তু তার আগেই এসব বিজিকিচ্ছিরি সব কাজ হয়ে গেল। আর অরিত্র স্যারও এতটাই খেপে গেছে যে কিছুতেই তাকে কনভিন্স্‌ করতে পারছে না সে।
এর মধ্যেই রিস্যুটের ফিল্ম ও রিপোর্ট নিয়ে এল কিউমেক্‌ কোম্পানির অরভিন্দ। না, ফিল্মের ডেভেলপমেন্ট ঠিকই আছে; তার মানে যে ইন্ডিকেশনগুলো দেখা যাচ্ছে সবই নন্‌ফিউশন!
‘ দেখো কীসব ওয়েল্ডিং করছ তোমরা দেখ ভালো করে। তুমিও তো একজন মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার; দেখো কীসব ব্লান্ডার জব্‌ করেছে তোমার ওয়েল্ডার! অ্যান্ড মিঃ অরভিন্দ ডু ইউ নো, দ্য ওয়েল্ডার হু ওয়েল্ড দ্য জব্‌ ইজ নট্‌ টেস্ট কোয়ালিফাইড্‌!’ বলে দুজনের দিকেই ফিল্মগুলো এগিয়ে দিল অরিত্র।
‘নো স্যার আই’ম নট্‌ অ্যাওয়ার আবাউট দ্যাট। বাট আওয়ার টিম রেগুলারলি চেক দ্য...’ কিছু একটা সাফাই দেবার চেষ্টা করল মিঃ অরভিন্দ। তাকে মাঝপথে থামিয়ে দিয়েই অরিত্র একটু মেজাজ দেখাল-‘আপলোগ কোয়ালিটি অডিট সিরিয়াসলি নেহি কর রহে হো! আগে সে এইস্যা ব্লান্ডার মিস্টেক নেহি হোনা চাহিয়ে।’
‘ ঠিক্‌ হ্যাঁয় স্যার ম্যায় দেখ লুঙ্গা। আগে সে অ্যায়সা নেহি হোগা স্যার।’ – হিন্দি ভাষায় ধমকানোতে যেন একটু আত্মবিশ্বাস ফিরে পেয়ে উত্তর দিল আদতে বিহারের বাসিন্দা অরভিন্দ।
‘অ্যান্ড ইমিডিয়েট ইস্যু দ্য এনসিআর টু কালাম ফেব্রিকেটরস্‌!’ অরভিন্দকে আদেশ দিয়ে সমস্ত ফিল্মগুলো রাসেল কে দিয়ে বলল- যেন আজ রাতের মধ্যেই সমস্ত ডিফেক্ট রিপেয়ার হয়ে যায়।
অরভিন্দ ও রাসেল দু’জনেই ‘ওকে স্যার, গুড নাইট’ বলে বেরিয়ে গেল চেম্বার থেকে। অরিত্রও প্রয়োজনীয় ফাইলপত্র অফিসব্যাগে ভরে গাড়ির ড্রাইভার হাসানকে ডেকে পাঠাল।

সাইট থেকে বেরিয়েই গাড়ি সাপমারি খালের ব্রিজ পেরিয়ে হাইওয়ের দিকে ছুটছে। আজ অনেকটাই দেরি হয়ে গেছে। রাস্তাটি বোধহয় আগে কাঁচা ছিল এখন প্রোজেক্টের জন্য পাকা হয়েছে, নতুন পিচ্‌ চিক্‌চিক্‌ করছে লাইটের আলোয়। এখানে আশেপাশে তেমন ঘনবসতি নেই; যা কিছু বাড়িঘর আছে দু’ চারটা করে তাও অনেকটা দূর দূর। এখানে রাস্তা ও বাড়িগুলি মাটি ভরাট বেশ অনেকটাই উঁচুতে বানানো হয় যাতে বর্ষার জল না উঠে যায় তাতে। আর চারদিকে শুধু জলাজমি; মূলত ফিশারির কাজে ব্যবহার হয় এসব জলাভূমিগুলি। নভেম্বরেও বর্ষার মতো চারদিক ডুবে আছে জলে। স্ট্রীট লাইটের আলোগুলি সেই জলে এমনভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে যেন মনে হয় আলো বাঁধানো এ পথ। দ্বিতীয় খালটার ব্রিজও পেরিয়ে গেল তারা। প্রতিদিন যাওয়া আসা করতে করতে মুখস্থ হয়ে গেছে এ রাস্তা অরিত্রর। তবে এ খালটির নাম তার এখনো জানা হয়নি। আরও প্রায় দু কিমি গেলেই খুলনা- মংলা হাইওয়ে। সেখানে হাইওয়ে লাগোয়া একটিই মাত্র দোচালা বেড়ার ঘর সাথে লাগোয়া ঝুপড়ি মতো একটি দোকান। তার পাশে একটু পিছনে অবশ্য একটি পাকা বাড়িও আছে আর তার চারদিকে ফিশারি। ঝুপড়ি দোকানটিতে এখনো হ্যারিকেনের আলো জ্বলে আছে। অন্যান্য দিন ফেরার পথে এখানে দাঁড়িয়ে একটি সিগারেট টানে অরিত্র। আজ রাত হয়ে গেছে বলে দাঁড়ায় না। এখনো প্রায় চল্লিশ কিমি দূরে খুলনার আবাসন।ঘড়িতে দেখল সাড়ে আটটা বাজে- অর্থাৎ ঘরে পৌছতে পৌছতে সাড়ে ন’টা বেজে যাবে হাসানকে কে একটু জোরে চালাতে বলল সে। ঘুটঘুটে অন্ধকার হাইওয়ে ধরে আলো ছুটিয়ে চলছে তাদের গাড়ি। বাইরের হাওয়াতে বেশ ঠাণ্ডা; গাড়ির কাঁচগুলো উঠিয়ে দিল অরিত্র। আজ একটু বেশিই রাগারাগি করেছে সে রাসেলের উপর। এতটা না করলেও হয়তো চলত। আগের মতো সে আর যখন তখন একটুতেই রেগে যায় না; অন্যের বক্তব্য ধৈর্য্য সহকারে শোনে- সে কাজের ক্ষেত্রেই হোক বা ঘরে। আর তাছাড়া এসব ক্ষেত্রে স্থানীয় কর্মচারী বা ঠিকাদাররা ব্যাক্তিগতভাবে নিয়ে নিলে প্রতিহিংসাও নিতে পারে। আবার আজ যা হয়েছে তাতে কড়া হয়ে না বললেও হোতো না। সবেমাত্র প্রোজেক্টের শুরু, পরের দিকেও এমন ভুল করলে তো আর জটিল হয়ে যাবে সামলানো; ফার্স্টট্র্যাক প্রোজেক্ট হিসেবে রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্প সময়মতো কমপ্লিট করতে এমনিতেই চাপ আছে দু’দেশের মিনিস্ট্রি থেকে তাদের কোম্পানির উপরেও।মৈত্রী বিদ্যুৎ প্রকল্প বাংলাদেশে রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্প নামেই পরিচিত।
সকালে অফিসে ঢোকার মুখেই দেখল বাইরের চাতালে একটি লোক বসে আছে। কাছে যেতেই চিনতে পারল অরিত্র; হাত জোড় করে দাঁড়িয়ে পড়া এ সেই হাইওয়ের ঝুপড়ি দোকানের লোকটা না যার দোকন থেকে সে যাবার পথে মাঝেমধ্যে চা-সিগারেট খায়। এখানে কেন? না চেনার ভান করে ভেতরে ঢুকে গেল অরিত্র। কিছুক্ষণ পরেই দরজা ঠেলে উঁকি দেয় লোকটির কাতর স্বর -‘ সার আসতে পারি একটু।’
‘ কি ব্যাপার আসুন।’ লোকটিকে ভেতরে ডাকে অরিত্র।
ভেতরে ঢুকেই কেঁদে দিল লোকটি- সার এইবারের মতন মাপ কইর‍্যা দেন। আর একটা মকা দিয়া দেহেন আমারে খালি।’
কিছুটা হতভম্ব হয়ে যায় অরিত্র লোকটি কি বলতে চাইছে! আর কাঁদছেই বা কেন?- আরে আরে কান্না করছেন কেন? কি হয়েছে?
‘সার আমার নাম হাসিবুল। কালাম সাহেবের কোম্পানিতে দশদিন ধইর‍্যা কাম করত্যাছি। আইজকা সকালে কামে আইতেই রাসেল সাহেব ছাটাই কইর‍্যা দিল, কইল আর কামে না আইতে আপনের কড়া নির্দেশ আছে। সার না খাইয়া মরুম যে বউ-পোলাপান লইয়া কাম না পাইলে। আপনে তো দেখছেন রাস্তায় ঝুপড়ি কইর‍্যা থাকি। পোলাটার আবার পোলিওর ব্যারাম ওইরে নিয়া বউ আমার কুনোমতচায়ের দোকান চালায়। তায় ক্যামনে চলে। দয়া করেন একবার!’
এবার পুরো ব্যাপারটা পরিষ্কার হল। লোকটার দোকানে চা খেতে খেতে একটু আধটু কথা হয়েছিলো, তবে ও যে কালাম ফেব্রিকেটরে ওয়েল্ডিংএর কাজ করছে সেটা জানে না। অবশ্য এর মধ্যে হয়তো দেখাও হয়নি দোকানে।
‘আচ্ছা তুমিই সেই সেই ওয়েল্ডার হাসিবুল! তুমি তো ওয়েল্ডিং টেস্ট পাসই করনি। কি করে কাজে নিল তোমাকে? আগে কখনো করেছো ওয়েল্ডিঙের কাজ কোথাও?’ এবার জেরা করতে লাগলো অরিত্র লোকটিকে।
‘সার আপনার কাছে আর কি মিথ্যা কমু। আপনি তো সবই জানেন। পরায় নয় বছর আগে যখন সর্বস্বান্ত হইয়া পশ্চিমবাংলায় পলাইয়া যাই তখন পর্‌থম্‌ পর্‌থম্‌ রাজমিস্তিরির যোগালির কাজ করতাম হাঁসনাবাদে। তার তিন বছর বাদে ঢুকি একটা গিরিলের দোকানে বসিরহাটে। সেইখানেই ওয়েল্ডিঙের কাজ শিখি। গতবছর দেশে ফিরা আসা পর্যন্ত ওইখানেই কাজ করছি। আর কোথাও আমি ওয়েল্ডিঙের কাজ করি নাই সার। তবে কালাম সাহেবেরে আমি মিথ্যা কইছিলাম যে ইন্ডিয়ায় আমি পাইপলাইনের কাজ করছি।’
অরিত্রর মনে পড়ে যায় সেই প্রথম দিনটির কথা যেদিন হাসিবুলের দোকানে সিগারেট খেতে থেমেছিল সে-
‘ সার আপনে কি পশ্চিমবাংলা থেইকা আইছেন।’ হাসিবুল জিজ্ঞেস করেছিল।
‘হ্যাঁ কি করে বুঝলে?’
‘আপনার কথার টোন থেইকাই বুইঝা গেছি।’
‘আচ্ছা তুমি গেছ কোনোদিন পশ্চিমবঙ্গে।’
‘গেছি মানে, আমরা তো আট বছর ধইরা ওইপারেই ছিলাম। গত বছরই তো আয়া পড়লাম পরিবার নিয়া; যখন শুনলাম যে রামপালে বিদ্যুৎকেন্দ্র হইব। অনেক লোক রোজগার পাইব। চাকরীও হইতে পারে এইখানকার লোকের।’ হাসিবুল গল্প করে। ‘ সার চা খাইবেন নাকি এককাপ, বানামু?’
‘চা? হ্যাঁ বানাও! তো তোমার বাড়ি কোথায় এইদেশে না ওই দেশে?’ অরিত্রর মধ্যে কৌতূহল জাগে।
কেটলিতে চায়ের জল বসিয়ে দক্ষিণ-পশ্চিম কোণের দিকে হাইওয়ে বরাবর আঙুল দেখিয়ে বলে ‘ওই যে রূপসা নদীর ওইপারেই তো আমাগো কামারখোলা গ্রাম।’
‘সাতবিঘা জমি আছিল সার। দশ বছর আগে আইলা ঝড় আইল আর আমাগো সবার জমি এক ঘণ্টার মইধ্যে নদী হইয়া গেল..., নদী না সাগরই বলা চলে, সুন্দরবনের অঞ্চলে তো নদী আর সাগর আলাদা কইরা কিছু হয় না। সে দিনের কোনও সময় নদী আবার কোনও সময় সাগর! চা বানাতে বানাতে হাসিবুলেকে যেন এক আতঙ্ক গ্রাস করে-‘ বউ-পোলাপান লইয়া কোনোমতে বান্ধে উইঠা পড়ি। প্রাণে বাঁইচা গেলেও সাতদিন ধইর‍্যা একফোঁটা জলও খাইবার পাই নাই। যমে মানুষে টানাটানি! তারপর কোনোমতে খুলনার রিলিফ ক্যাম্পে পৌঁছাই; পরায় একবছর আছিলাম সেইখানে।’
‘সরকার থেকে কোনও সাহায্য করে নাই।’ চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে জানতে চায় অরিত্র।
‘হ দিছিল তো , দুই-তিন মাস ধইরা খাবার দিছে,জামা কাপড় দিছে, প্লাস্টিকের ত্রিপল দিছে। সরকার আর বহায়া বহায়া কত খাওয়াইব। কেউ কেউ তো ঘরও পাইছে তবে আমরা পাই নাই’- উদাস হয়ে বলে হাসিবুল।‘আর ঘর পাইয়া কোথাই বা বানাইতাম ঘর; জমি তো এখনও নদীর তলায়। কত লোক তো এহনও দেখেন গিয়া বান্ধের উপরে ঝুপড়ি বানাইয়া বসবাস করতাছে কোনওমতে। আমরা আর ফিরা না আইসা পশ্চিমবাংলায় পলাইয়া গেলাম।’
‘তা তোমরা ভারতে গেলে কেন?’
‘পেটের টানে সার! খুলনায়ও তখন কুনো কাজ কম্ম পাইনা খায়া-পইরা থাকবার মতন। কেউ কেউ পরামর্শ দিল যে ইন্ডিয়ায় গেলে নাকি রোজগারের কুনো সমস্যাই হইব না। তাই তো রাতের অন্ধকারে লুকাইয়া লুকাইয়া বর্ডার পেরইয়া হাসনাবাদে গিয়া উঠলাম।’
‘বিনা পাসপোর্টে যে এইভাবে বর্ডার পার হও , তোমাদের ভয় করে না? সীমান্তরক্ষীরা যখন তখন গুলি করতে পারে দেখলে।’ প্রশ্ন করেছিল অরিত্র।
‘আমরা হইলাম গিয়া সুন্দরবনের সন্তান। আমাগো ভয়ডর করলে চলে সার। সেইখানে সাগর কখনো নদীতে ঢুকে পড়ে আবার নদী কখনও সাগরে- এই দেখতে দেখতেই তো আমরা বড় হই।’ হাসিবুল ঠিক এইরকম একটি দার্শনিকের মতই উত্তর দিয়েছিলো সেই প্রশ্নের জবাবে; খুব মনে আছে অরিত্রর। আর সেই লোকটাই যখন আজ হাতজোড় করে কান্না করছে কাজের জন্য তখন কিন্তু আর কোনও করুণা নয় বরঞ্চ হৃদয়ে একটা ব্যাথা অনুভব করে অরিত্র হাসিবুল বা হাসিবুলদের মতো সর্বহারা মানুষগুলির জন্য।
আচ্ছা ঠিক আছে তোমারে কেউ ছাঁটাই করবো না। তুমি এখন যাও আর রাসেলকে বল গিয়া যে আমার চেম্বারে আইসা যেন এক্ষুনি দেখা করে।
হাসিবুলের সজল চোখে এক অদ্ভুত হাসি খেলে গেল-‘আল্লায় আপনার ভালা করুক সার।’ মাথা ঝুঁকিয়ে বেরিয়ে আসে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই রাসেল চলে আসে- ‘গুড মর্নিং স্যার।’
‘গুড মর্নিং রাসেল। এক কাজ করো হাসিবুলকে ছাঁটাই করবে না। ওকে স্ট্রাকচারাল ওয়েল্ডিঙে রেখে দাও। আর যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ওকে শিখিয়ে পড়িয়ে আরটি লেভেল ওয়েল্ডিঙের জন্য টেস্ট পাস্‌ করানোর দায়িত্ব কিন্তু তোমার।’
আজ ফেরার পথে দাঁড়াল হাসিবুলের চায়ের দোকানে। হাসিবুলের বউ দোকানে বসে, পাশেই বসে খেলছে তাদের পোলিও আক্রান্ত সন্তানটি। জিজ্ঞেস করে জানতে পারল হাসিবুল এখনও আসেনি কাজ থেকে। অরিত্র আজ সিগারেটের সাথে এককাপ চা’ও খেল। যাবার আগে সাহিবুলের বউটিকে বলে গেল -‘ছেলেটিকে একটা ডাক্তার দেখাও না কেন? হয়ত কিছুটা ঠিক হয়ে যেতে পারে!’
যেতে যেতে কি মনে হল ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করল- ‘আচ্ছা হাসান সাপমারি খাল পেরিয়ে দ্বিতীয় যে খালটা পেরিয়ে আমরা হাইওয়েতে উঠি তার নাম কি গো?’
হাসান স্থানীয় ছেলে তাই তার অজানা নয় নামটি, বলল ‘ওইটা তো বেলাগোনা খাল সার।’
এভাবেই মাত্র চারমাসের মধ্যেই কখন যেন এই দেশটি নিজের দেশের মতো হয়ে যায় আর এই দেশের লোকগুলি নিজের আত্মীয়র মত হয়ে যেতে থাকে। খুলনার পথে যেতে যেতে সে ভাবে সে যেন তার ঘরেই ফিরছে ডিউটির পরে। মা তো নেই সেখানে! সে না থাক তবুও তো মাতৃদেশ !
মাকে ফোন করে অরিত্র। কলার টিউনে গান ভেসে আসে- ‘এ তুমি কেমন তুমি চোখের তারায় আয়না ধর এ কেমন কান্না তুমি আমায় যখন আদর কর...’
‘বল খোকা !’ ওপারে মায়ের গলা এপারে ছেলের চোখে জল মাঝে মুহূর্তের নীরবতা।
‘মা...! ভাইকে দিয়ে যত তাড়াতাড়ি পারো তোমার পাসপোর্টটা বানিয়ে রাখো। এবার গিয়ে আমি তোমায় তোমার দেশের বাড়ি দেখাতে নিয়ে আসবো।’