তুমি এক অনন্য শান্তির হরিনী

আনিফ রুবেদ ও হুসাইন হানিফ

আনিফ রুবেদ

তুমি এক অনন্য শান্তির হরিনী

পৃথিবীর ভেতর তুমি এক অনন্য শান্তির হরিনী
গায়ে লেখা বিচিত্র শান্তির দাগ

আর আমি, এক ভয়ংকর দাগ নিয়ে
পুরো শরীর জুড়ে তোমার কাছে হাজির হয়েছি এক বাঘ হয়ে

পৃথিবীর ভেতর তুমি এক অনন্য শান্তির হরিনী
দুঃখ আমার, তোমার জন্য হরিণ হতে পারিনি।


আনিফ একটু শান্তি পেল মাত্র

আমি একটু শান্তি পেলাম মাত্র -
তুমি বললে, আমার ওড়না গেল পুড়ে

কতজন তোমার মধু অঙ্গ নিয়ে খেলল খেলা

তুমি সবার বেলা সব জানো সব মানো
প্রিয় পৃথিবী, তুমি শুধু আনিফ রুবেদের বেলায় সতিত্বের সংজ্ঞা
টানো, গঙ্গা দেখাও


বসন্ত পাগল

এমন বসন্ত পাগল মানুষ আমি আর দেখি নাই।
বসন্ত এলে ফুলের গায়ে সে মালা হয়ে জড়িয়ে থাকে।
ফুলকে দেখায় মানুষের হাসি - তার নিজেরই হাসি।
লোকজন বলে - ‘লোকটা পাগল, বসন্ত এলে
আর ঠিক মানুষ থাকে না।’

বসন্ত পাগলকে দেখে আমিও হতে চেয়েছি তার মত।
একদিন, বসন্ত পাগল হবার বাসনায় ফুলের গলায়
মালা হতে গিয়ে দেখি, অজ¯্র বিষের কাঁটা কেটে দিচ্ছে আমার শরীর
বসন্ত পাগল আমার কাঁটা ফোটা শরীরে হাত বুলিয়ে দেয়
আর পরম মমতায় বলে - ‘আনিফ রুবেদ, যাও বাবা বাড়ি যাও।
অস্থির মানুষ বসন্ত চোর হয়, বসন্ত পাগল হতে পারে না।’



===============================================

হুসাইন হানিফ

বোকার স্বর্গ

কাজটা করার পর বহুবারের মতো আবারো কুকুরের গা থেকে কাদা ঝাড়ার অনুভূতি কাঁইকুঁই করছে আমার ভেতর; যদিও এটাই প্রথম না, ঠিক কততম বার সেটাও আমি বলতে পারব না; আর এটা করে যে আমি শান্তি পাই না, বা এটাকে আমি খারাপ বলে দেখি ব্যাপারটা ঠিক সেরকম না; কিন্তু কাজটা করেই প্রত্যেকবারের মতো এবারও আমার ভেতর একটা কুকুরকে গা থেকে কাদা ঝাড়তে দেখি আমি- যে এখন সমস্ত পৃথিবীটাকে একশ একবার ধ্বংস করার নিরুপায় অক্ষমতায় আকাশমুখে নিষ্ফল ক্রোধে ভোক ভোক করতে থাকবে কিছুক্ষণ।

মসজিদে ঢুকেই বুঝতে পারলাম ওরা কুরআন শরীফ তর্জমার তাকরার (ক্লাশে আলোচিত বিষয়ের পুনরাবৃত্তি, গ্রুপ স্টাডি বলে যাকে সভ্য জগতে) করছে, মন বসবে না এখন তাকরায় সেটা আমার জানা, তবু এসে বসলাম, কারণ হুজুর এসে দেখে যাবে; বসে বসে আগডুম বাগডুম ভাবছি; কুরআন শরীফ এখন ধরা যাবে না, মসজিদেও ঢোকা যায় না যদিও, কিন্তু এটা আর এখন কিছু মনে হয় না, মানে প্রথম দিকে অনেক সংকোচ হতো, আল্লাহর ভয় হতো, শাস্তির কথা মনে আসত, দিন যত গেছে ততই আমি অনুভূতিহীন হয়ে পড়েছি, এটা আমার একার কথা নয় মোটেও, আর এটা আমাকে বিশ্বাস করাতে হবে না কাউকে, কারণ আমি নিজের এবং অনেকের সাক্ষী; এটা ভাবতে ভাবতেই এনায়েতুল্লাহ হুজুর চলে এল, যে আমাদের কুরআন তর্জমা করায়, কেউ কেউ পাত্তা দিল না, আমি ভেতর থেকে পাত্তা না দেবার সাড়া পেলাম কিন্তু হুজুর বলে কথা, তাই সামনে থাকা কুরআন শরীফটা টেনে নিলাম; একটা কাজ করে ধরে পড়েছে বলেই যে তাকে এইভাবে অপমান করতে হবে তার কোনো মানে হয় না; তার কারণ, একজন এনায়েতুল্লাহ আজ ধরা পড়ার কারণে তাকে এইভাবে হেনস্থা করা হচ্ছে, হাজার হাজার এনায়েতুল্লাহ ধরা ছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে তাদের পেছনে শক্ত হাত থাকার কারণে, তাই এই অবস্থাটাকে আমি একটু বাঁকা চোখে দেখি; এখন না পড়লেও চলতো, অবশ্য সেটা কিছু বিষয়- শরহে বেকায়া বা মাকামাতে হারিরী বা মুখতাসারুল মা’আনী- এগুলোর সবক এখন না হলে পরে আর তোলা যায় না সহজে। কিন্তু এগুলোতে এখন মন বসানো যাবে না কোনো ভাবে। রি রি করছে ভেতরে। কাজটা করার জন্য নিজেকে আমার কুকুর মনে হচ্ছে। ডাহা একটা কুকুর। হাড্ডি খায়। ভোক ভোক করে। দৌঁড়ায়। পা চাটে। যেখানে সেখানে সেক্স করে। অথচ আমার পায়ের নিচে নাকি ফেরেশতারা নূরের পাখা বিছিয়ে দেয়। সমুদ্রের মাছেরা পর্যন্ত দোয়া করে। সেই আমি কি না এই কাজ করি! আমি হয়তো বোকা, আমার সহপাঠীরা যেরকম বলে থাকে, তাই হয়তো আমি আসল জিনিসটা ধরতে পারছি না।

ওরা, মানে সহপাঠী আর শিক্ষকরা, আমাকে বোকা বলে, আস্ত একটা গবেট; আমার সমস্ত কাজে ভুল ধরার জন্য বসে থাকে ওরা: আমার খাওয়া, পোষাক পরা, আমার হাঁটা চলা, পড়ার ঢঙ, উচ্চারণের ভঙ্গি, আমার পারিবারিক সমস্যা- এসব কিছুতেই ওদের ব্যাঙ্গ না থাকলে যেন কাজগুলো অসমাপ্ত হয়ে যায়: আমি ডিম ভাজি পছন্দ করি, সেটা সপ্তায় বা মাসে এক দুবার পাই বলেই হয়তো, মাছ গোশতের (পীর সাহেব হুজুর বলেছেন গোশত বলতে, মাংস হিন্দুদের শব্দ: মা- অংশ; কিন্তু বাইরের বই পড়া এক বড় ভাইয়ের তাহকীকে জানা গেছে গোশত শব্দটাও বিধর্মীদের, গো মানে গরু, ফার্সি শব্দ এটা, আসত্ মানে অংশ বা অস্তিত্ব- ইরাকের লোকেরা আগে গরুকে মা বা দেবতা বলত; আমি জানি না সেটা, হয়তো তাই; মন বলে কথা সত্য, কারণ আমিও ফার্সি বুঝি, গো মানে যে গরু এটা তো আমার জানা, আর আস্ত মানে অংশ এটাও অজানা নয়; কিন্তু পীর সাহেব হুজুর বললে সেখানে তাহকীকের আর অবকাশ থাকে না;) ব্যাপারটা অন্য রকম, পাই না যে তা না, বাসায় স্বাভাবিকভাবে যেই টুকরোটা করা হয়, সেটার আট ভাগের এক ভাগ দেয় বোর্ডিংয়ে- মাসে দুবার, সেও কখনো ভাগে পড়ে কখনো পড়ে না, অবশ্য মাসে একটা দাওয়াত থাকে খতম কিংবা অন্য কিছু সে যাই হোক, সেখানে গরুর গোশত পাই, সে আলাদা কথা; একটা ডিম ভাজি হলে তিন প্লেট ভাত আমি অনায়াসে খেতে পারি- এটাতে দোষের কি আমি বুঝি না; ওরা আমাকে খ্যাপায়; এই যে আমি শুদ্ধ করে কথা বলার চেষ্টা করি এটাও ওদের কাছে ভালো লাগে না, আমাকে ভ্যাংচায়, শব্দের উচ্চারণ নিয়ে, অঙ্গভঙ্গি নিয়ে, সে থেকে বুঝি আমি আসলে একটা বোকা, কারণ ওরা যেভাবে ভাবে আমি হয়তো সেভাবে ভাবতে পারি না, আমার সেই সামর্থ্য নেই যেভাবে ওরা চলে সেই মতো করে চলতে, তাছাড়া মাদরাসায় পড়া মানে স্রােতের বিপরীতে চলা, সেই স্রােতের ভেতরও আরেকটা স্রােত যে এই স্রােতের বিপরীতে চলবে- এটা সত্যিই কঠিন, যদি আমি বোঝাতে সক্ষম হই, মানে দলের ভেতরও আরেক দল; তাছাড়া আরো নানান কারণ আছে নিজেকে বোকা ভাবার: আমি বুঝি কিন্তু কাউকে বোঝাতে পারি না, যেমন তাকরায় একটা বিষয় আমাকে অন্তত তিনবার বলতে হয়, অথচ আমার মনে হয় যে-কারু আমার বলা প্রথম আলোচনাতেই বুঝে যাওয়ার কথা, কিন্তু ওরা বারবারই আমাকে পুনরাবৃত্তি করতে বলে, সেটা কেন আমি জানি না; আর আরেকটা কারণ: আমি পরীক্ষায় প্রশ্ন হাতে পাওয়ার পর সব বুঝি, কিন্তু লিখতে পারি না; মনে হয় লেখার কোনো দরকার নেই, তাছাড়া আমার হাতের লেখাও যথেষ্ঠ খারাপ; হুজুর সবক ধরলেও আমি পারি না, অথচ বসলেই হরহর করে বলতে পারি; আর কোনো দিনই মুখ তুলে চোখ দুটো খোলা রেখে হাত না কচলিয়ে ঠোঁট খুলে পাশের বাসার মেয়েটাকে বলতে পারি নি মনের কথাটা, অথচ সমবয়সী প্রায় সবারই এরকম কিছু কিছু হয়েছে, আমি পারি নি- এতসব কিছুর পরও নিজেকে আমার খারাপ মনে হয় না এখন, আমার বাবা নতুনবাজারের রাস্তায় রাস্তায় ফ্লাক্সে করে চা বিক্রি করে, মা কখনো বাসায় বাসায় রান্না করে দেয় কিংবা বাজারে গিয়ে পুরুষদের সাথে কাজ করে, আমার বড় ভাই পাগল, তার ছোটটা অর্ধেক পাগল- এইসব ব্যক্তিগত আর পারিবারিক পরিচয়, এমনকি ওই কাজটাও আমাকে নিচু কিংবা খারাপ হবার অনুভূতি আমার ভেতরে আনতে পারে নি; তবু কেন জানি না, আমার ওই কুকুর কুকুর ভাবটা ভেতরে থেকেই যায়।

আমাকে নিয়ে ওরা হাসাহাসি শুরু করেছে, এমন না যে ওরা কেউ এমন কিছু করে নি যেটা নিয়ে ওদেরকে খ্যাপানো যাবে না, প্রতিদিনই কারু না কারু বিচার হচ্ছে, কিংবা কাউকে না কাউকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে, এমন কোনো কাজে বা সম্পর্কে যেখানে কেউ না কেউ অপরাধ করছে বা এমন জুটির দুজন আছে, যাদের অনায়াসে সন্দেহ করা যায়; অবাক হয়েছিলাম, মোশাররফের ওই ঘটনাটার জন্য, ও একটা কুৎসিৎ চেহারার- আমার চেয়েও কুৎসিৎ- সব দিক দিয়ে, ওর হাতের আঙুলও কম, আমার চেয়ে খাটো, কিন্তু বুদ্ধিতে আমার চেয়ে মোটেও খাটো না, যে কাউকে ওর মেধা দিয়ে তাক লাগিয়ে দিতে পারে, ওও সমকামের জন্য ধরা পড়েছিল; মানে ওকে ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছিল, এবং সেটা ছিল গুরুতর, বিচার হয়েছিল; আর সেই অভিযোগ ছিল আমাদের ক্লাসের সবচে ভালো ছাত্র মাসুমের নামে, যে ছিল ক্লাসের ভেতর সবচে সুন্দর আর ওর আরো অভিযোগ যে, প্রায় এরকম একটা সম্পর্ক তৈরি করত যেটাকে বিসদৃশ লাগে, সন্দেহ করতে সুবিধা হয় আর সেই সন্দেহ অচিরেই একটা বিশ^াসে পরিণত হয় যেখানে ওকে আবারো বিচারের সম্মুখীন হতে হয়; তারপরও ওকে কখনোই মাদরাসা থেকে বের করে দেয়া হয় নি, তার কারণ ও ভালো ছাত্র, হুজুরদের সাথে ভালো সম্পর্ক আছে, আর হুজুরদের সাথে ভালো সম্পর্ক থাকা মানে বোঝাই যাচ্ছে সাত খুন মাপের পর্যায়ে; আমার মনে পড়ছে: সুলাইমানের ওই লুঙ্গিটা, হ্যাঁ ওই লুঙ্গিটা নিয়েই আমাকে সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছিল, আমি ততটা দুঃখ পাই নি আমাকে জ¦ালানোর জন্য, যতটা পেয়েছি ওই লুঙ্গিটা হাত ছাড়া হয়ে যাবার কারণে: ওরা ওটাকে প্রথমে ডাস্টবিনে ফেলেছিল, আমি সেখান থেকে তুলে এনে পরিষ্কার করে আবার ট্রাংকে রেখেছিলাম, কিন্তু ওরা আবারও কোনোভাবে লুঙ্গিটা হাতে পেয়েছিল, আর এরপর আমাকে আর কোনো সুযোগ দেয় নি পরিষ্কার করার জন্য, একটু হাতের ছোঁয়া পর্যন্ত দিতে পারি নি; কারণ ওরা ওটাকে পুড়িয়ে ফেলেছিল; ওটা জানার পর আমি ছাই দেখতে গিয়ে ওর কোনো অস্তিত্ব পাই নি, সাথে সাথে নিজের অস্তিত্বকেও আমি বিলুপ্ত দেখেছিলাম, কারণ আমার অস্তিত্ব হয়ে যাচ্ছিল সুলাইমানের স্মৃতিহীন, আর ওটা ছিল আমার জন্য বড় যন্ত্রণাদায়ক; সুলাইমান, আমার বন্ধু, বসুন্ধরা মাদরাসায় একসাথে পড়তাম আমরা ; বরিশাল বাড়ি, বরিশাল থেকে এসে, একটা বছরের জন্য আমাকে পাগল বানিয়ে আবার বরিশাল চলে গেছে- আমার বলতে ইচ্ছে করছে, ভীষণ ভালো লেগেছিল ওকে, ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না; তবে সেটা কখনোই কামের পর্যায়ে ছিল না, মানে সবাই যেরকম করে আর কি, মানে কখনোই আমি চাই নি ওর সাথে আমার দৈহিক সম্পর্ক হোক; সম্পর্কটা এমন ছিল যেখানে কোনো চাহিদা ছিল না; মানে, আমি পুনরাবৃত্তি করছি, কখনোই ভাবি নি: ওকে আমি আমার চাহিদার জন্য জায়েজ ভাবছি, তবে এটাও সত্য আমি যদি নিজেকে কারু ওপর উপনীত দেখতে চাইতাম সে ছিল সুলাইমান; মানে ওকে ছাড়া কাউকে আমি কল্পনা করি নি, তার মানে এই না যে আমি ওকে ব্যবহার করতে চাইতাম; ব্যাপারটা কঠিন হয়ে যাচ্ছে: আমার ভেতরে আসলে দ্বৈত একটা অনুভূতি কাজ করত; মানে, আমি কখনো ওই কাজটা করি নি, মানে, বোঝাই যাচ্ছে, সব করা হয়ে গেলেও, ওটা, মানে কারু পায়ূপথে ওটা প্রবেশ করানো, কখনোই আমার রুচি হয় নি; কিন্তু এটাও সত্য আমি নিজের বিপরীতে কল্পনা করেছি, হয়তো সেখান থেকে খুব দ্রুত তাড়া খাওয়া একটা কুকুরের মতো বেরিয়ে পড়েছি, কিন্তু সত্য তো এটাই যে আমি আসলে ভাবতাম, যে ওই কাজটা করলেও করা যায়, এমন কি আর, কত জনই তো করল, কিন্তু পরক্ষণেই আমাকে বিবমিষা নিয়ে বেরিয়ে আসতে হয়েছে; তার মানে কিন্তু এই না যে আমার শুধু সুন্দর কোনো কিশোরের উপরেই কাম জাগে, নারী দেখলেও জাগে, কিন্তু নারীটা পাচ্ছি কই, আর শুধু নারীর প্রতিই জাগে না- উষ্ণতা ছড়াবে এমন যেকোনো যোনী জাতীয় বস্তুই মূলত ওটাকে জাগিয়ে তোলে ; আর আমার এই অদ্ভূত মানসিকতার জন্য আরেকটা জিনিস দায়ী, এটা প্রকাশ করলে হয়তো আমাকে নাস্তিক ঘোষণা করা হবে, যদিও এটাই সত্য, কুরআনে যে কিশোরদের কথা বলা আছে, গেলমান, ওরা যে পুরুষদেরই ভোগ্য, হোক সে দুনিয়ায় হারাম, আর হারাম বা নিষিদ্ধ বলেই তার প্রতি দুর্মদ কৌতুহল- ওই তথ্যটাই আমার মতো আরো অনেকের রুচিটা গড়তে সাহায্য করে বলে মনে হয়; তাছাড়া আমার যৌনতাও এর জন্য দায়ী বলে মনে করি, আর সমাজের চলমান ধ্যান ধারণা আর সিনেমার কথা আর তসলিমার ওইসব তো থাকছেই, ভেবে অবাক হই, যে ছাত্র জীবনে কখনো বাইরের বই পড়ে না সেও তসলিমা নাসরীনের নষ্টামির ব্যাপারে জানে, পড়ে এমন কোনো বই যেটাতে রয়েছে যৌনতার রগরগে বর্ণনা, সেরকম আমিও, এমনিতে মাসিক পত্রিকা পড়া হয় দুই একটা, ভাষাটাকে শুদ্ধ করার জন্য, খতীব হলে কিংবা কোথাও ওয়াজ করতে গেলে অথবা নূন্যতম প্রয়োজন ইসলামের দাওয়াত দেয়ার জন্য, আর হুজুররা এখন মাতৃভাষা শিক্ষা করাকে সওয়াব মনে করে, তাছাড়া কবিতা আমার ভীষণ পছন্দ, সেদিন সানি লিওনের বাংলাদেশে আগমন ঠেকাতে পল্টনে যে মিছিল হয়েছিল সেটাতে যোগ দিতে গিয়ে আসার পথে পল্টন মোড় থেকে ত্রিশ টাকা দিয়ে একটা কবিতার বই কিনে এনেছি, মুরাদ চৌধুরি না কি যেন নাম লেখকের; ভালো লেগেছে আমার; কিন্তু ওটা নিয়েও হয়েছিল মজার একটা ঘটনা, ওরা আমাকে খ্যাপানোর জন্য, আমার রুচিটাকে খাটো করে দেখানোর জন্য যে কতটা বাজে রুচি আমার, ওরা আমার কেনা বইটাকে নিলামে তুলেছিল, আর ওটার সর্বশেষ দাম উঠেছিল তিন হাজার টাকা, কিন্তু আমি তো জানি ওটা কখনোই হবার নয়, আর ওটা আমাকে মজা করার জন্যই, তাই আমি মুচকি মুচকি হেসেছি শুধু।

হঠাৎ করেই মনটা বিশ্রী হয়ে গেল, আজগুবী সব ভাবনা চলে আসছে ; আজগুবি হলেও এগুলো সত্য, সত্য এইসব আমি যা ভাবছি, সবাই হয়তো আমার মতো করে ভাবে না, কিন্তু ওটার ব্যাপারে, মানে এই স্বমেহন, আমার কাছে খবর আছে, আমাদের ক্লাসের সবচে ভালো ছাত্রগুলো যাদের বুদ্ধির চমকে কাছে চাপা দায়, ওরাও এটা করে, মানে ওদের ওটা নিস্তেজ হয়ে গেছে এই বয়সেই, তাই নেত্রকোণার কোনো এক মাহফুজকে দিয়ে ওষুধ আনিয়েছে, তার কারণ হয়তো আমার চে একটু বেশিই করে; কিন্তু ব্যাপারটা কেমন হাস্যকর: একজন মাদরাসার ছাত্র, মাথায় টুপি, গায়ে জোব্বা, বাথরুমে ঢুকে বসার বদলে দাঁড়িয়ে ওই কাজটা করছে; কিংবা মসজিদে শোওয়ার জায়গা হওয়ায় রাতে হুজুরদের টহল বন্ধ হয়ে যাবার পর নিজের মোবাইল না থাকায় অন্যের মোবাইলে ওইসব দেখছে- এই দৃশ্যটা যতটা দৃষ্টিকটু তার চেয়ে বেশি হতবুদ্ধিকর; কেননা, কেউই কখনো ধারণা করে নি, একজন মাদরাসার ছাত্র ওগুলো করবে- তবে তারা কী ধারণা করে? তারা কি ধারণা করে মাদরাসার ছাত্র হলে ওটা কেটে ফেলতে হয়? নাকি ওটা দিয়ে কোনো কাজ হয় না? আমি হয়তো খুব অশ্লীল মনে করছি। কিন্তু ব্যাপারগুলো আমাকে ভাবাচ্ছে। যদিও আমি একটা বোকা। তবু আমি আমার মতো করে ভাবতে চাই। হাদিসে বলা আছে, ওটা করলে কেয়ামতের দিন আঙুলগুলো ফেটে ফেটে বাচ্চা বের হবে। হারাম আরো কত কী। সমাজের মানুষও এটা করতে পছন্দ করে না হয়তো। যদিও আমার মনে হয় এমন কোনো লোক নেই যে এই কাজ থেকে বাদ গেছে। যার প্রমাণ হাদিসের ওই বক্তব্য, যদি নাই করত, আদিম যুগ থেকেই, সেটার ব্যাপারে হাদিস আসবে কেন, বা এটার আলোচনা ওই যুগে কেন করা হল? যদি থাকেই, এটাকে খারাপ বলা হচ্ছে কেন? আর যেই সমাজটা আমাকে দেয়া হয়েছে, সেই সমাজে আমার অবস্থাটা আসলে কীরকম হলে খুশী হবে মানুষ? প্রথমত আমি গরীব এটা আমার একটা দোষ; দ্বিতীয়ত, আমি মানুষটা একটু নিম, গরুর মতো বিশাল আমার মাথা, ওটা আমি জানি, কারণ আয়না বলে একটা জিনিস পৃথিবীতে আছে, আর আমারও চোখ আছে; ওরা যতই বলুক টিটকারি মেরে যে আমার মাথা মোটেও বড় না, হাতির চেয়ে তো নয়ই, এমনকি মহিষের চেয়েও বড় না; কিন্তু আমি জানি ওটা বেমানান; যেরকম বেমানান আমার চেহারা, এটাতে আছে গরুর চোখের মতো বড় বড় দুটো চোখ, কিছু অপরিষ্কার দাঁত, আর বিশ্রী ঠোঁট; একটা চার ফুট এগারো ইঞ্চির শরীর; আর মাদরাসা পড়ার তকমা- আল্লাহর ইচ্ছায় এইসব আমার বৈশিষ্ট্য; আর এটা আমার ভালো করেই জানা এসবের কিছুই একজন মেয়েকে কিংবা তার পিতাকে কিংবা মাতাকে কোনোভাবেই সন্তুষ্ট করতে পারবে না; তাই আমার বিয়ে করার চিন্তাটা খুবই বাতুল; আর বাতুল বলেই কি আমার এখন ওটা, মানে ওই মাস্টারবেশন- না কি যেন বলে- করা উচিৎ না? ওটা ছাড়া আমি নিজেকে কন্ট্রোল বা সেফ করব কীভাবে? সাধু হব? সাধু হওয়ার জন্যই যদিও মাদরাসায় আসা, কিংবা আল্লাকে মানা, সেই আল্লাহ যদি আমাকে এইভাবে পৃথিবীর সব থেকে বঞ্চিত করে তখন তো আর বলার কিছু থাকে না; (তবুও প্রশ্ন জাগে, কেন এই নিষ্ঠুর খেলা, বঞ্চিতই যদি করবে পৃথিবীতে পাঠানোর কি দরকার ছিল, আর পাঠালেই যেহেতু, বঞ্চিত কেন করছো, আর এই যে বঞ্চিত হওয়ার কারণে, সেটাকে পুষিয়ে নিয়ে একটা বিরাট ঝামেলার- ঝামেলার কেননা, শুনি, বড়রা বলেন, পৃথিবীতে এত ঝামেলার মূল কারণ প্যাট আর ওই চ্যাট- ব্যাপার থেকে মুক্ত থাকতে পারছি একটা অবদমনের মাধ্যমে, সেটার কারণে আবার কেন পাপ হবে; আর যেই জিনিস পৃথিবীতে হারাম সেটাই আবার জান্নাতে হালাল কেন, আর পাপ থেকে বিরত থাকা মূলত সুখের জন্য, যেরকমটা ধারণা করা হয়, তাহলে যে সুখের জন্য আমি পাপ থেকে বিরত থাকছি, সেই সুখ যদি ওই পাপ কাজেই পাই তাহলে আর তা থেকে বিরত থাকা কেন, বা সেটা আর পাপ কেন- এই ব্যাপারগুলো আমার কাছে পরিষ্কার না;) কিন্তু এই যুগে সাধু কাউকে তো দেখি নি, যদিও কথিত সাধুদের সাথেই বসবাস, সাধুতা ব্যাপারটা চোখে পড়ে নি, পড়লেও সেটা উল্লেখ করার মতো না, অবশ্য প্রশ্ন আসে- কেউ সাধু না বলেই কি আমি নিজে সাধু হব না? একজন বোকা মানুষের সাধু হওয়াটা কখনোই সাধুতা না। সাধু তো তাদের হওয়া উচিৎ, যারা চালাক; যারা দুনিয়াকে ভেজে খায়; আমার মতো নির্বোধের সাধু হওয়ার কী দরকার? আর সাধু হওয়ারই বা কী আছে? আমি কি সাধু নই? ওই কাজটা বাদ দিলে, বা গুটিকয়েক অপরাধ বাদ দিলে আমি নির্ঘাত সাধু। তাছাড়া পাপের কথা যদি আসে, যদি কেউ বলে, আমার অপরাধ আছে, আমি সাধু হতে পারব না, তাহলে বলব, অপরাধ যে করতে পারে না, সে আবার সাধু হয় কি করে? আমি কি খুব ভুল ভাবছি? একজন বোকা মানুষের এরচে ভালো ভাবে ভাবা আর সম্ভব না মনে হয়।

সময় হয়ে যাচ্ছে টিউশনির। কিন্তু যেতে মন চাচ্ছে না। কারণ এখন আর ওই মেয়েটাকে পড়াতে ভালো লাগে না। ভালো লাগে না বলতে আমি ওর চোখের দিকে তাকাতে পারি না। যদিও ওর এতটা বয়স হয় নি যে চোখে কোনো ভাষা আনতে পারে, কিন্তু আমার ভেতরের দূর্বলতা আমাকে সেই সাহসটা দিতে পারে না। অথচ এই মেয়েটাই আমার কত ভক্ত ছিল। আমি এলেই কী থেকে কী করবে বুঝতে পারত না। কেউই জানবে না আমি আর ও ছাড়া- ওর মা বাবা অফিসে যাবার পর আমি পড়ানোর ফাঁকে কী করেছিলাম, আর কেন ও কোনো দিনই আর আমার সামনে হাসি মুখে কথা বলে নি কিংবা আমাকে যে সম্বোধনে ডাকত সেই ডাকটা দেয় নি। তবু প্রতিদিন নিয়ম করে আমাকে পড়াতে যেতে হয়। তা না হলে বৃদ্ধ বাপ আর শ্রমিক মাকে আরো কষ্ট করতে হবে, আমারও মাসে দু তিনশ টাকা আর খরচ করার কোনো সুযোগ থাকবে না। এভাবে আরো কত কিছুই আমাকে করে যেতে হয় আমার ইচ্ছের বিরুদ্ধে। জীবনটাই কি এমন? ইচ্ছের বিরুদ্ধে চলাই কি জীবন? আমি বোকা, তাই হয়তো ভাবতে পারছি না; যারা জ্ঞানী তারা নিশ্চয় জানে, জীবনের অর্থ কী, আর এর বর্ণ কতটা উজ্জ্বল, এসব হয়তো কখনোই আমার ভাগ্যে হবে না, জানা কিংবা উপভোগ করা, তার কারণ প্রথমত আমি গরীব, দ্বিতীয়ত আমি একটা বোকা।