শ্যাডো ড্যান্স

মেঘ অদিতি ও অলোকপর্ণা

মেঘ অদিতি



গুঞ্জন

এবার গুঞ্জন তোলো নওল বাতাস
মৃদুস্বরে হোক একবার টুং
ভেঙে ফেলা যাক পুরনো থার্মোমিটার।
সন্ধের ঘ্রাণ মেখে গুল্মলতার মুখবন্ধে
লিখে যাব জ্বরতপ্ত নিস্তব্ধতা
নিরুদ্দিষ্টের দিকে কুঁকড়ে থাকার দিনে
আপাতত নাভিপদ্মে এই বুদ হয়ে থাকা...



মিথ্যে নয়

প্রশ্ন করো না- নিরুচ্চারে বলো, আছি
বাগানের কোণে এই নগ্ন যাপন
দিনমান পাখি পাখি ডানার উড়াল
জেনো মিথ্যে নয় এইসব হাহাকার
আমাদের ছড়িয়ে পড়বার বেলায়
সংঘাত যখন দশদিগন্তে
মুখের চেনা আদল তখনও রাখছে চুমুর মায়া
মনের মানচিত্র থিতু হচ্ছে অনির্ণীত কোনো বন্দরে
পরাগায়নের বেলা এলে ফিরে যাবে ঠিক আদিম শরীর


শ্যাডো ড্যান্স

উড়ে আসে স্লেট গ্রে, গূঢ় সংকেত
দেয়ালের খাঁজে রাখা পানপাত্রে
ফুঁসে ওঠে ঘূর্ণি, দুলে যায় প্রবল আক্রোশ
ঘর জুড়ে হাসে কিছু নবীন ভঙ্গিমা
ভুল করে ভাবি শ্যাডো ড্যান্স

অহোঃ ছায়া! অল্প নম্র হও
এখনই খসে যাবে ঠোঁটের প্রাচীর
আম্বর জগতে
ফুলে ওঠা সিংহকেশরে
চিরকুট জাল ছেড়ে ধরা দেবে
পিঙ্গল ঘূর্ণন এক

তুমি বলো
পাতা ঝরার ঋতু ঠিক কতটা ক্রোধের?



অপেক্ষা

ফুলের চেয়ে নরম কোনো অপেক্ষা
আর রেমাক্রীর জলে জলে বেপথু রোদ্দুর
ভাবামাত্র ঘুমের ভেতর হেসে উঠল এক লুসিড ড্রিমার
তারপর- বহুদূর সরে গেল আততায়ী মুখগুলো

মাথাভর্তি রোদ, ব্যক্তিগত যৌনতা অথবা
কাফেলা বিষয়ক কোনো সংলাপ ভাবতে গেলেই
আজকাল মনে পড়ে যাচ্ছে
একটা দরজা খোলা এখনও বাকি…



===============================================


অলোকপর্ণা

মিলন হবে কত দিনে



তুমি কি জানো, মানুষের একেকটা অঙ্গে একেক রকম ঘ্রাণের খবর? কখনো কারোর কাছে গিয়েছ? বা কারোর ভিতর? মানুষের কপালে কৈশোরের গন্ধ থাকে, গালে শৈশব। চিবুকে প্রথম কামড়ের লালা মেশানো ঘরোয়া ঘ্রাণ। আর মানুষের গলায়,- পুরোনো গুহার আঁধারের সে কি অপূর্ব সুবাস। অন্ধকারের নিজস্ব গন্ধ আছে। পাগল হয়ে যাওয়ার ভয়টুকু গিলে খায় ওই গন্ধটা। তখন তুমি আর মানুষ নও, তখন তুমি গন্ধখেকো বাঘ,- সুর্যের চেয়েও উষ্ণ।

কখনো কারোর কাছে গিয়েছ? বা কারোর ভিতর? নিজেকে কখনো কারোর সুর্য বলে মনে হয়েছে? চাঁদের জন্য অপেক্ষারত, গ্রাসের জন্য নয়, গ্রহণের জন্য। কখনো কেউ গ্রহণ করলো কি তোমায়? তেমন ভাবে, যেমন কালেভদ্রে চাঁদ সুর্যকে গ্রহণ করে।


এখন তুমি সুর্য। তোমার দিকে তাকানো চলেনা বলে চোখ বুজি। সুর্যের কাছে যেতে গেলে, মানুষের কাছে যেতে গেলে, খুব খুব কাছে যেতে গেলে, মানুষ চোখ বুজে নেয়।
ফুলের চেয়ে করুণ কোনোকিছু হঠাৎ মুঠোয় পেলে মানুষ দিশাহারা হয়। সে তোমার গল্পবলা স্তন, যাতে কান পাতলে কোন আদিম সমুদ্র গর্জন শুনতে পায় একান্ত সিগাল। যেভাবে সিগালকে ডেকে নেয় সামুদ্রিক নোনা বাতাস, সেভাবে ডাকল ওরা,- করুণ দুখানি স্তন। সতেজ ও নম্র। মানুষের সকল আদর শুধু করুণের তরে।
আমি সুর্যের গায়ে হাত রাখি। সুর্যকে পুরে নিই মুঠো থেকে মুখে। আমি আলো হয়ে যাই, আলো- আলো হয়ে যাই। লোকে ভাবে আমার জোনাকীরোগ করেছে, লোকে জানেনা এযাবৎ আমার তুমি করেছ।


অন্ধজন যেভাবে পৃথিবী দেখে সেভাবে তোমায় দেখি আমি, হাতড়ে হাতড়ে, শুঁকে শুঁকে, ঠাহর করি, কোথাকার তুমি কতখানি উন্নত, কতখানি গভীর উপত্যকা নেমে গেছে তোমার কোমর হতে নাভিমূলে। সেখান থেকে গড়িয়ে পড়ে আমার সমস্ত ডাক, প্রতিধ্বনির মত ফিরেও আসে। নির্জন বাজপাখি হয়ে উড়ে বেরাই তোমার আকাশে, আমার ডানার ছায়া তোমার শরীর হাতড়ে ফেরে, আজন্মের খোঁজ তাকে পেয়েছে যেন। কি সে খুঁজে ফেরে তোমার ভিতর? কি এত আগ্রহ তোমার প্রতি? অন্ধজন পৃথিবী দেখে আত্মা দিয়ে। আমার আত্মা গভীর মারণ রাতে তোমার নগ্নতার পাশে চুপ করে এসে বসে। অন্ধকারে তুমি তাকে আমি ভেবে আঁকড়ে ধরো।

দাঁড়কাক কুয়াশা প্রেমিক। শামুক শ্যাওলার। গাছেরা অপেক্ষা করার জন্য জন্মিয়েছে, একই জায়গায়। আমার যাত্রাপথ শহরময় ঘুরে ফিরে এসে তোমার ভিতরে প্রবেশ করেছে।
আমি অন্ধজন। আমারে পথ দেখাও।


যখন তোমার ভিতরে ছিলাম, বোধ ছিল না কোনোখানে। যেভাবে শিশু ঘুমোয় উষ্ণতায় জড়সড় হয়ে মাতৃগর্ভে, তেমন সাবলীল লাগে নিজেকে তোমার ভিতর। এ যেন আমারই পুরোনো পাড়া, উচ্চশিক্ষা লাভের জন্য কোনো একসময় ছেড়ে গিয়েছিলাম। এবার ফিরেছি।
আবার ফিরেছি। আবার ফিরেছি।
দ্রুত ফিরেছি। দ্রুত ফিরেছি।
দ্রুত ফিরেছি। আরো দ্রুত।
গমন করেছি বারবার। পাড়ার টিউবওয়েল, লন্ড্রি দোকান, প্রস্রাবখানা, খবরকাগজ স্ট্যান্ডের মত আমার চিরপরিচিত তুমি আর তোমার অন্তর। যেন আমার জন্মান্তরে ছিলে, তুমি না থাকলেও, তোমার ভিতরটুকু ছিল।

তোমার চুলে আমার হাত খসে যায়। হাত ঝরতে থাকে তোমার চুলের মধ্য দিয়ে। সে হাত ধরার কেউ নেই ওখানে,- তোমার চুলের মধ্যে। নিজেকে কাকতাড়ুয়ার মত নিষ্পাপ লাগে। একটা এসপার ওসপার মাঠের ঠিক মাঝখানে এনে তুমি আমায় দাঁড় করিয়ে ছেড়ে দিলে। হাত ফসকে বেরিয়ে যাওয়া গ্যাস বেলুনের অসহায়তায় তোমার দিকে চেয়ে থাকি, তোমাকে আমার অপার লাগে, দিগন্ত বিস্তৃত মাঠের মত অপার। অথবা তুমি আমার ডাকবাক্স,- লালচে, মিষ্টিপানা। সম্মতি দিলে তোমার মধ্যে ঠিকানাবিহীন চিঠি ভরে দেব। মানুষ অনেক চিঠি লেখে, ওকে একে। ডাকবাক্সকে প্রথম চিঠি আমিই দেবো,
- সম্মতিক্রমে।


পিয়ানো বাজাতে জানিনা আমি, তোমাকে জানি। তোমার মেজর স্বর, তোমার শার্প কার্ভ, তোমার মাইনর তিল, সেভেন্থ সেন্স। ঠিক কোথায় কোথায় নিজেকে নিয়ে গেলে তোমার মোৎজার্ট হওয়া যায়, আমায় শেখালে। দেখালে। সুর উঠে কোথায় মিলায়? সুর বার বার ওঠে কিভাবে? উতলা হয়ে থাকি বড়, সারারাত ঘাম ঝরে। তোমাকে বাজাতে বাজাতে শত সহস্র বছর চলে গেল, আলো এসে আলো পিছিয়ে পড়ে। আলোর চেয়ে দ্রুত আমরা নিজেরা সকাল হই, একে অন্যের গ্রহে।
কখন ফোনে এলার্ম বাজে “আজ দিন চঢ়েয়া তেরে রঙ্গ য়ার্গা…”

ঘরের কোথাও আমরা নেই। শূন্যঘরে পড়ে আছে সমুদ্রের ঘ্রাণ। আর ছাই। কেউ কিচ্ছুটি টের পাবে না। কাজের লোক এসে ময়লা ভেবে ফেলে দেবে আমাদের দেহাবশেষ।
শুধু রোদ আটকে রাখা জানালার পর্দা হাওয়ার টানে মাঝে মাঝে ফিসফিসিয়ে বলবে,- তেমনভাবে মিলতে পারলে মিলিয়ে যাওয়া যায়।
তেমনভাবে মিলতে পারলে মিলিয়ে যাওয়া যায়।