সমোচ্চারণ

প্রসেনজিৎ দত্ত ও অগ্নিজিৎ

প্রসেনজিৎ দত্ত

সমোচ্চারণ ১

তার কাছাকাছি বসি। বেশ লাগে। বৃষ্টি নামার আগে তার কাছে বিবাহভিক্ষা চাই। ওই রাস্তায় মানুষের হাতে গোলাপ ফুল ফুটেছে। বিক্রি হচ্ছে ফুল। কিনি, তাকে বিবাহপ্রস্তাব দেব বলে। গতকালই মরে গেছে আমার আইবুড়ো বয়স। একাকী ভালো লাগে না। একটা চেনা ঠাকুর পড়ে আছে আমাদের সামনের অশথ গাছের গোড়ায়। কার্তিক। তার গায়ে প্রজাপতি উড়ে বসছে। প্রজাপতিরা অস্থির। বাইরে অস্থির। ভিতরে অস্থির। এ আমার কাছে অদ্ভুতদর্শন। কীর্তি না থেকে কর্ম জীবিত থাকে যেমনভাবে, অর্থবান না থেকে আভিজাত্য জীবিত থাকে যেমনভাবে—এ ঠাকুর তেমনই। কোনও সার নেই। স্বর্গ নেই। রিপু নেই। সে দেহ নিথর। পুজো হয়ে গেছে। প্রাণপ্রতিষ্ঠার পরও চলে গেছে। তিরকাঠি ছেঁড়া। নিষ্কৃতি গেয়ে হৃৎপিণ্ড সচল আছে তার। কিন্তু সে বধির। ডাকলে সাড়া দেয় না। গায়ে হাত দিলে অনুভূতি নেই কোনও। অশথ-বাকলে গা এলিয়ে আছে। একটা বিরাট পাঁচিল। তার গায়ে জংলিফুল ফুটে আছে। আরও কাছাকাছি বসি তার। চক্রাকারে আবার সেই দৃশ্য ফিরে যায় তোমার কাছে। আমি বসে আছি তখনও। তোমার গন্ধ লেগে থাকে। গান্ধর্বগন্ধ। তোমার দ্বিধান্বিত ভঙ্গি আমাকে আরও দুর্বল করে...
এই ছিল গল্প। এরপর ঠাকুর আমার সর্বস্ব নিলেন। সর্বস্ব নিলেন মানে আমার পাগলপনা আর ভিতরের কবিটিকে ছিনিয়ে নিলেন। কবিটি মরে গেল। পাঁশুটে নক্ষত্রের কাছে চলে গেল ! ছায়া। তবু সংসার সাজিয়ে রেখো। অনেকটাই নড়বড়ে আমাদের স্বপ্নগুলো। আমি গৃহকন্না শিখিনি। হাঁড়িপাতিল বুঝি না। আমার প্রিয় মহিলাটি এসবের মাঝেও অমৃত গিলে খায়।
—অমৃত কী জানো?
—হ্যাঁ, নারীপরাগ।
—মানে নিজের কথা বলছ?
—ভুল।
—তবে?
—সন্তান... আর তারও আগে পুরুষকণা... বীজ।
—এসব কেমন যেন পিছমোড়াবাঁধা, আমাদের রক্তপিত্তে জটিল।
—আর সম্পর্ক? সম্পর্ক তো জটিল নয়?
—নাহ, সে তো কেবল ডালপালা মেলে...
—সুন্দর তো, তাকে সহ্য করবে না?
—সময় লাগবে একটু।
—লাগুক, তুমি ছোট্ট করে বীজ পুঁতে দিও...
—তারপর?
—তারপর কিশলয়... তুমি আমায় রেণুমাখা জলে কিশলয় দিও...
—আলো জ্বালো।
—আহা, তোমার কণ্ঠে এখনও নিশিতান ভরে আছে ! কতদিন ছিল কঠিন এ বুকে পাথর পাথর পাথর...!!!

যেন নিবেদন। তার স্বর শোনো। স্বরের মধ্যে সমস্ত দুঃখ আছে। স্বরের মধ্যেই আছে গতজীবনের বেহুদা। তবু কোনও রাগ নেই। শান্ত। নারীটি সময় চাইছে আমার কাছে। তারপর অপেক্ষা। অপেক্ষা হল প্রণয়ের উৎসব। তার কাছে আমন্ত্রণ পেলে পাখি হয়ে যাব। নারীটি 'যে কাম সাগরে কামনা করেছিল, কামনার ফলেতে মহৎ আদেশ হল...' কেমন আদেশ? ‘কুল লক্ষণ'-এর আদেশ। কুল লক্ষণ অর্থাৎ আচার, বিনয়, বিদ্যা, প্রতিষ্ঠা, তীর্থদর্শন, নিষ্ঠা, আবৃত্তি, তপস্যা ও দান। কোনওটা কি আমার আছে? কথায় আছে, ‘রাগ আছে যার বাগ আছে তার’... রাগান্ধে আমি তোমার সঙ্গে সংসার করব। ওগো নারী, দীর্ঘ-দীর্ঘশ্বাসেও ক্রমশ বশীভূত হয়ে পড়ছি আমি। তোমার প্রতি মুগ্ধ হচ্ছি বারবার। লোভী হচ্ছি। স্বপনচারী হচ্ছি। আমাকে রহস্যে চুবিয়ে দিও ঈশ্বর। আকাশের দিকে তাকাই। সূর্যপোড়া মেঘ ভাসছে। ঈশানের দিকে ভাসছে পিতামহের মুখ। মেঘগুলো প্রজাপতির মতন। ঈশ্বর ! শেষমেশ তুমিও আমাকে লোভী হতে শেখালে! তাকে ভালোবাসতেও শিখিয়েছ। অভিযোগ নেই, তবু, হৃদয়পুর বড় টলোমলো—তোমাকে গ্রহণ করেও মুক্ত হতে পারছি না। আমাদের এ সন্তান মায়া বাড়ায়। আমাদের তৈরি মোহের মানুষ সে। পিঠের কাছে শোয়। তার উপর রাগ হয়। কিন্তু রাগতে পারি না। পিঠের কাছে শোয়। ঠ্যাং তুলে দেয়। ব্যথা লাগে। শরীরে জরা। অথচ ব্যথা সহ্য করতে হয়। আচ্ছা এ মেনে নেওয়াটা, সহ্য করাটা কি মুক্তি নয়? এত জটিল আবর্ত, তবু তো মোহিত থাকি... এত পাঁককল, তবু তো ছেড়ে যাওয়া হয় না ! এ কি কৃচ্ছ্রে বাঁচা নয়? হে স্বচ্ছ মৃত্যুময় মায়া, পাপ নিও না, আমি তোমাতে বাঁচি। মোহের মাধুরী নিয়ে আমি বাঁচি। আর কোনও ভ্রান্তি নেই। রাগ হলেও তুমি থাকো। যখন ভালোবাসতে ইচ্ছা করে, তুমি থাকো। কঁজুসি নেই কোনও। তোমাতেই ডুবি। তুমি আমাকে স্বর্গে নিক্ষেপ করো... শান্তি—অনাবিল শান্তি... প্রিয় মহিলাটি নয়, এরপর আমি অমৃত গিলে খাই।
—অমৃত কী জানো?
—হ্যাঁ, পুরুষপরাগ।
—অর্থ?
—অতিমায়ায় সম্পর্ক নির্মাণ করেছ তুমি।
¬—কেন?
—‘আরও চাই আরও চাই’ করো বলে। তুমি দাম্ভিক।
—অভিযোগ করছ?
—এত আত্মশ্লাঘা কেন তোমার? কেন পালিয়ে যাও? কেন এত মদান্ধ তুমি? কেন?
—তোমায় ভালোবাসি বলে।
—ভালোবাসোনা। এটা অসুখ... মুক্তি নেই... তুমি আমাতে বেঁচো না। করুণা করো আমায় !
—মুক্তি চাইছ? মুক্তি? করুণার দোহাই দিয়ে ছেড়ে চলে যাব। তারপর? সব ঠিক হয়ে যাবে?

আমি তো তোমার কথা রেখেছি নিরুত্তরে। মেঠো ঘাস, ঝিলমিল জল ঘোড়া খেতে আসে। বসে থাকি। মাঠদূরে স্থাপত্যের পরী—ঘুরছে এখনও? পরীকে নিটোল আদর করত সেই দিনগুলি। এখন আমি তোমার কাছে হ্রদ চাইছি এ স্থাপত্যের মাঠে, যেখানে রোজ জল খেতে আসে প্রেমিকরা...


===============================================


অগ্নিজিৎ

সমোচ্চারণ ২

প্রতিটা সকাল পায়জামার গিঁট খুলে আসে। তন্দ্রায় তখনও ভাঙা হাট। অনুষ্ঠান কাটেনি চোখের পাতার। কিছু কিছু বিদায় শুধু ফিরে পাওয়ার মুহূর্ত। কত কী খবর দিচ্ছে শরীর। জোনাকি জ্বলে ওঠে ভাঁজে ভাঁজে। প্রশ্রয়ের তারিখ তখন দেবতাবিমুখ। এই যোগাযোগ শুধু সময়ের কাছে আর একটু সময় দাবি করে। গাছের গোড়া যেন জল চাইছে আকাশ ঝেপে। ঝরনা তখন বৃষ্টি খুলছে মেঘে মেঘে। বহু আগের অমীমাংসিত অঙ্ক আর মীমাংসা চায় না। শুধুই কষে যাওয়া জটিল নিয়ম থেকে সহজ উত্তরে। জমানো মাধুকরীর হিসেব। ত্বকের নরম বিশ্লেষণ। প্রজাপতি অন্ধ বলেই রাত্তির শেষ হয় না ওড়াউড়ির।
এখানে কোনও পুরুষ বা নারীর রাজধানীর সকাল-বিকাল নেই। আগুন জ্বালিয়ে নিচ্ছি পুড়ে যাওয়া ঘরবাড়ির মোম থেকে। জ্যোৎস্নায় দাউদাউ রহস্য। আলো তোমায় জাপটে ধরুক সর্বনাশে। নক্ষত্র ভুলে যাওয়া আকাশ। জল ও জল…। নুন ও নুন…। তবু হাঁড়িতে সেদ্ধ করব সংসার। নিশ্বাসের ঘর হবে হাওয়ামেদুর। তোমার জবাব খুঁজি তোমারি প্রশ্নে। কথার প্রলাপ বন্ধের ঘোষণা। আঙুলের চাপে ফেটে যাবে ফোয়ারা। আর কতটুকু দাবি থাকতে পারে উন্মাদের?
প্রয়োজনে দখলপত্র প্রস্তুত করব সমবেত। তোমায় গোলাপি ভেবে পেতে চেয়েছি আরও রঙিন। আতি রঙে। দড়িতে শিখছি বাঁধার যত্ন। আমার দীর্ঘশ্বাসে তুমি পায়রা। তোমার গাছ হয় না। তাই পোষা খাঁচা দানায়পানি। সংকীর্তন রাখো পালকে। ব্যথা থেকে শুরু নিরাময়ের।
পেরিয়ে পেরিয়ে চোখের দপ্তর শুকিয়ে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত পৃথিবী কোনও নিরাপদ আলমারিতে লুকিয়ে। মুদ্রারূপে নাচ বন্দি করছে নর্তকী। সাদা ধর্মের বক পুকুর পার করে দাঁড়িয়ে। তার ঠোঁটের কাছে মার্জনা চায় দিঘি অবাস্তব জলে। সফল উড়ে যাবার পরও ডানা রয়ে যায়। ভিড় হাঁটি শোভাযাত্রার আন্তরিক অভ্যুত্থানে। সোজা শিরদাঁড়ার আনুগত্য ফুড়ায় না। ছায়ার যৌবন নষ্ট হয়ে যায়। আয়ু কাটাই জীবনের।
অস্থির জানলার চাঁদ। সন্ধে মানেই একটা দৈত্যর অসুখ। ওইটুকুই বাজি ধরে হেরে যাব। বন্দুকে পেয়েছি খুনের প্রস্তাব। শব্দের তীব্র তাপমাত্রা। তবু উল্লাস। কোনও নমস্কার নেই। হাতের কছে স্পর্শ পেয়েছি অজ্ঞানের। ছুঁয়ো না। হাতের রেখা পালটে নেব চুপিচুপি। আমার ভাগ্যে থাকবে তুমি। অজান্তে সমাধান করে নেব পাপ। এই তো স্বর্গ ভেবে মিশে যাচ্ছে পাতাল। অস্বীকার রাখছি গৃহপ্রবেশ।
ওই পরীর কোনও প্রেমিক থাকবে না। দৌড়ে ছাড়াব ঘোড়ার হৃদয়। যেখানে ফিরবে না পাখির আদেশ। আমি তার আকাশ গুলিয়ে দেব। যা যা পারিনি অপরাধে, সেই সব গলির শোকে, জখম সুপ্রভাত। নকল বেদি থেকে শহিদ উপড়াই। বসিয়ে দিই ছদ্মবেশের স্মারক। বাজেয়াপ্ত সত্যের নিয়ম। ঘোড়ার হৃৎপিণ্ডে খুড়ের আওয়াজ। দিঘির মুখে মুখ ঠেকাই জিরিয়ে। সেইখানে প্রেমিকরা তলিয়ে গেছে অপেক্ষায়। এসবই জীবিতের কথা। এমন মৃত্যুর আবদার কি আমার থাকতে নেই...!!!