পোর্ট্রেট

সাজ্জাদ সাঈফ ও ম্যারিনা নাসরীন


সাজ্জাদ সাঈফ


পোর্ট্রেট
:
নিষ্ক্রিয় বাঘের থাবা
দেয়ালে ঝুলে আছে দেখে
এই পোর্ট্রেট ভালো লেগে গেছে; মনে হচ্ছে পাশেই হরিণী হেঁটে যেতে দিলে
বাঘ টের পাবে; যেটুকু হাঁটাপথ আঁকা
তেলরঙে শিশিরসিক্ত ঘাসে,
এর ধারে শাপলা ফুটেছে ঝিলে, এর ধারে ব্রক্ষ্মণ্ড, বহুকাল কুয়াশামূক, যেনো, এই বন আমারও নিজের কাছে
বহুদিন ধরে চেনা!
#
এই ছবি ভালো লেগে গেছে, ফুল ফলাদির অধিক সবুজ এই ট্রাভেলিং,
আর যতোসব
গ্লানি গড়ে ওঠে নগরভর্তি ধোঁকায়
আমি ততো সরে আসি ক্রমে দ্রাঘিমার কিনারে; যে রকম
শতাব্দী জুড়ে অস্বস্তির জ্বর
পৃথিবীকে জাগ্রত রাখছে ক্রোধে, নিনাদে;
এই ক্রোধ শৃঙ্খলা পেরিয়ে এসে আগ্নেয়, গান থেকে খুলে পড়ছে এক একটা কর্ডসহ ভায়োলিন-
#
দেখি চোখ মেলে আছো
পুষ্পপ্রতিকী চোখ,
এ গোপন প্যাপিরাস, পৃথিবীতে,
বলো তুমি কোথায় পেয়েছো, বলো!


ক্রসফায়ার
:
এই যে ঘাগটছায়ার গাছে
ঝুলে আছে বিচার বহির্ভূত হত্যার স্যাম্পল, তারা শিশুকন্যার ডাক শুনবে না আর পৃথিবীতে, খ‌ই ভাজা ডালা নিয়ে শিক্ষার্থী ছেলের সামনে দাঁড়াবে না এরা কোনোদিন; তারা বলিরেখা হয়ে সেঁটে যাচ্ছে
রাষ্ট্রের চোখেমুখে, বিষয়টি অবগত হলে
মহাকাশ বাতলে দেবে মেঘ, ক্রোধ হলে কি প্রচন্ড বাজ!
#
অলিগলি ডুবে যাওয়া বৃষ্টিতে যতো সৎকার
ভিজে যাবে
ভিজে যাবে আর নধর বণিক যাবে
তার গায়ে ডিঙি ভাসিয়ে দিয়ে!



সাবগ্রাম হাট
:
ডেউয়াফলের মতো আম্বলরঙ সূর্যাস্তের নীচে
গালভরা পান চিবায় কেউ কেউ, সামনে
বর্ষাকাল, এই রাস্তাঘাট কতখানি আব্রু হারাবে সেই কথা কেউ কেউ তোলে;
ঘানি ভেবে জীবনটাকে
টেনে এনে হাটবাজারে
ভীড় করে লোনলিনেস;
নাকি ক্রোধ?
নাকি বড় ছেলেটার ব্যাঙ্কমাইনেতে
টান পড়ে, তাই ক্ষোভ?
#
শতায়ু ফুলের গাছটা পাখিবর্ণে ভরে যেতে থাকে, থির হ‌ওয়া মগজে তখনও
ছোট বৌটির দুপুরঘুমে বিরক্তির কথা হয়!
#
নাকি ক্রোধ, নাকি নিথর উজ্জ্বলতা এসে
হৃদয়ে সিঁড়ির ধারে চুপ, কোন‌ও কথা নাই, বার্তা নাই, বুক চেপে বসে পড়ে তীব্র ব্যাথা, অবেলায়, ঘাম হয়, তেষ্টায় শুকায় গলা, আর, হাত ধরে তাকে কত কি শোনাতে থাকে
লোনলিনেস!

==============================================
ম্যারিনা নাসরীন

বলিরেখা


ব্যথাটা কোথা থেকে প্রথম উৎপন্ন হয়েছিল সেকথা আজ শামিমা মনে করতে পারছে না। কিন্তু ক্রমেই সেটা তলপেট জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। খোয়া ভাঙ্গা রাস্তায় ঘোড়ায় টানা গাড়ি যেমন লাফিয়ে লাফিয়ে চলে তেমনি লাফিয়ে লাফিয়ে তলপেট থেকে উরুতে, উরু থেকে তলপেটে ছুটে বেড়িয়েছিল। তারপর আরো নিচে, অনেক নিচে। পায়ের পাতা অব্দি। বারবার ফিরে আসছিল টমটমের চাকাগুলি। ঘুরে ঘুরে পা থেকে মাথা পর্যন্ত পিশে মারছিল। পুরো শরীর জুড়ে ফুঁড়ে যাচ্ছিল সুচরাজার অজুত নিযুত সুচ। বিছানা ছেড়ে কোনরকম মেঝেতে দু-পা রেখে দাঁড়াতে ঝপ করে ঘোলাটে সমুদ্র গড়িয়ে পড়ল। বেতের টু-সিটার সোফার গা ঘেঁষে বিনু আর মলি ঘুমিয়েছিল। সোফাতে কোনরকম হাঁটু মুড়ে ঘুমোচ্ছিল রবি। তখন রাত কটা? তিনটে? নাহ মনে পড়ছে না। জামে মসজিদে ফজরের আজান কি হয়েছিল? কি জানি! অজন্তা ফার্মেসীর উল্টো পাশের সেই ছোট ঘরে দেওয়াল ঘড়ি ছিল কিনা সেটাও ভুলে গিয়েছে শামিমা। থাকলেও দেখা হয়নি। কি যন্ত্রণা! কিলবিল পোকার মত নড়াচড়া! বিনুই বোধ হয় প্রথম টের পেল। হয়ত শামিমার মুখ থেকে অস্ফুটে বেরিয়ে আসা কোন যন্ত্রণাদায়ক শব্দ তাঁর অগভীর ঘুম ভেঙ্গে দিয়েছিল। ‘বুবু কি হল?’ ওর চিৎকারে রবি উঠে চট করে সুইচ টেপে।ষাট পাওয়ার ফিলিপস বাল্বের আলোয় সবাই দেখলো পায়ের কাছে লালচে পানির স্রোত। শামিমা কোনমতে উবু হয়ে তলপেট আঁকড়ে ধরে। হাতের তালুতে গোটা কিছু আটকে যাচ্ছিল বারবার। সুগোল বলের মত। গড়িয়ে ডান বাম আর ওপর নিচ করছে বলটি। আহ! শাহজাদা! তখন থেকেই ওর মস্তকে কি শক্তি! কি ছটফটে! বিদ্রোহ করেছিল মায়ের সাথে। হয়ত বন্দী দশা থেকে মুক্ত হতে।
কি ব্যাপার? এখানে কি সিনেমা চলছে? সরে যান সকলে। সরে যান। লাশ আইডেন্টিফাই করবে কে? ভিক্টিমের কে কে আছে। কাছে আসুন।
শামিমা বসে থাকে। কেউ বহুতলভবন তৈরি করতে চেয়েছিল কিন্তু শেষ করতে পারেনি। হয়ত টাকায় টান পড়েছিল বা লোন পায়নি। কংক্রিটের পিলার গুলো বেআবরু। ওদের দেহ ব্যাপী শ্যাওলা রঙের অশ্লীল আর অনাবশ্যক হাসি ঝুলছে। আবছা আলোয় তেমনটাই মনে হল শামিমার কাছে। সেরকম একটা পিলার ঘেঁষে ও বসে থাকে।
লোকটির গায়ে অফ হোয়াইট কালারের টি শার্ট। ক্যাজুয়াল ড্রেস। কিন্তু নীল পোশাকের পুলিশগুলো যেভাবে তাঁকে সমীহ করছে তাতে তিনি পুলিশের বস শ্রেণির কেউ হতে পারেন বোধ হচ্ছে। তাঁর নেতৃত্বে ওরা সকলে শাহজাদাকে ঘিরে ধরে।
সাজু সেই লোকটির কাছে এগিয়ে যাচ্ছে। লাশ আইডেন্টিফাই করবে হয়ত। কিন্তু পুলিশের লোকেরা কি শাহজাদাকে চিনতে পারেনি?
সেই রাতে শামিমার পা দিয়ে যখন লালচে পানি গড়িয়ে পুরোটা মেঝেতে ছড়িয়ে পড়ল তখন বিনু রবি মলি সকলে জেগে উঠেছিল। না জেগে উপায় ছিল না। রাজুর বাসাটি ছিল বস্তির ঘর থেকে কিছুটা উন্নত। হাফ বিল্ডিং। টিনের চাল শানের মেঝে। মাঝারি সাইজের দুটো ঘর, একটা খুপরিমত খাবার ঘর। সেখানেই খাট ফেলে মায়ের ঘর করা হয়েছে। ওপাশের বড় ঘরটি রাজুর।
মা ও ঘর থেকে এসে শামিমাকে দেখেই আঁতকে উঠেছিলেন, ‘ওরে শামুরে পানি তো ভাইঙ্গা গেছে। গর্ভের বাইচ্চার যে ক্ষতি হইব।’ মা শামিমাকে শামু বলে ডাকে। তিনি চিৎকার করতে থাকেন, ‘রবি কই, রবি? তাড়াতাড়ি কর। বইনরে হাসপাতালে নিয়া চল বাজান।’ পানি ভাঙ্গা কি সেটা শামিমা অনেক পরে বুঝেছিল। তবে মায়ের উৎকণ্ঠা কি সেদিন মা হবার আগেই সে অনুভব করতে পেরেছিল।
সাজু কি ভাইকে চিনতে পারছে না? এত ইতস্তত করছে কেন? খুবই ভদ্র অমায়িক ছেলে সাজু। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র। খাবার কাপড় বাসস্থান কোন কিছুরই চিন্তা করতে হয় না। সে দায় বহুদিন ধরে শাহজাদার ঘাড়ে। সাজু সারাদিন বইয়ের টেবিলে মুখ গুঁজে পড়ে থাকে। পাড়ায় ভার্সিটিতে তার ভদ্র একটা ইমেজ আছে। পাশ করে ক্যাডার সার্ভিসে যোগ দিতে চায়। থেঁতলে যাওয়া লাশ চিনতে কিছুটা গ্লানী তার হবারই কথা।
মায়ের চেঁচামেচিতে ততক্ষণে রবি একটা বেবীট্যাক্সি এনে দাঁড় করিয়েছে। বেবীট্যাক্সির কর্কশ শব্দে পুরো পাড়া ঝনঝন করে ওঠে। শামিমা ছোট দুটো জামা, কখানা কাঁথা, মায়ের সাদা পুরনো একখানা পাতলা শাড়ী ব্যাগে গুছিয়ে রেখেছিল। মা টুকটুক করে ঘরের এ কোণ ও কোণ থেকে সাবান, পেস্ট ব্রাশ শরিষার তেল আরো কি কি সব গুছিয়ে নিলেন। রাজু চোখ কচলাতে কচলাতে এসে দাঁড়াতে মা ঝংকার দিয়ে ওঠেন, ‘নবাবের বেটির ঘুম ভাঙ্গে না। হগলটি জাইগা গেল নবাবের মাইয়া ঘাপটি মাইরা রইছে। ওই রাজু , তর বউরে উঠা।’
রাজুর বৌ সুরমা জাগার আগেই বেবী ট্যাক্সি রওনা দিয়েছিল। পেছনের সিটে শামিমার একপাশে মা অন্যপাশে বিনু। সামনে ড্রাইভারের সাথে রবি। গলিটা পার হয়েছে মাত্র। যন্ত্রণার সমুদ্র যেন বিশাল ঢেউ নিয়ে গর্জে উঠলো। শামিমা কিছুতেই সইতে পারছিল না। কোনমতে দাঁত চেপে বলেছিল, মেডিকেল অনেক দূর। যেতে পারব না । মাদার এন্ড চাইল্ড কেয়ার হোমে চল বিনু। মাদার এন্ড চাইল্ড কেয়ার হোম বেশি দূরে নয়। সাত রাস্তার মোড়ে। কিন্তু সেখানে তো সব বড়লোকদের কারবার। রবি একবার ইতস্তত করে বলল, ‘ওখানে অনেক খরচা পড়বে বড়াপা।’ রবির উৎকণ্ঠার জবাবে কেউ কিছু বলল না।
এরপর ডাক্তার নার্সের তোড়জোড়, স্যালাইন, ইঞ্জেকশন। পেটের ভেতর শাহজাদার কসরতের ফাঁকে ফাঁকে ঘোর। ঘোরের মধ্যেই শামিমা প্রার্থনা করেছিল, ‘খোদা, ছেলেই যেন হয়!’ ছেলে কেন চেয়েছিল শামিমা?
সাজু মুখ নিচু করে নিবিষ্ট ভাবে শাহজাদাকে দেখছে। সম্ভবত পুলিশ অফিসারটির প্রশ্নের জবাবও দিচ্ছে তবে সেসব কথা এখান থেকে স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে না। শাহজাদা এখন আর শাহজাদা নয়, লাশ। পুলিশ কর্মকর্তাটি হাতের লাঠি দিয়ে শাহজাদার গায়ে মাথায় মুখে নির্দেশ করছে। শামিমা ভাবছে লোকটির কি সন্তান আছে? শাহজাদার মত যুবক বয়সী কোন সন্তান?
শাহজাদা শামিমার প্রথম সন্তান। তারপরে আরো দুজন এল। সাজু,ইমা। সকলের সময়েই প্রসব যন্ত্রণা হলো কিন্তু তলপেট ছিঁড়ে বেরুলো যেন কেবল শাহজাদা। ওই কেবল মনে করিয়ে দেয়। কত বছর আগের কথা! আগের ব্যথা। প্রায় পঁচিশ বছর! তবুও কারণে অকারণে প্রথম মা হবার যাবতীয় সুখ যন্ত্রণার কথা বারবার মনে পড়ে শামিমার।
ডাক্তার নার্স মিলে অনেক চেষ্টা করেছিল শামিমার পেট কেটে বাচ্চা বের করবে। তাতে বিলের অংকটা তাগড়া হবে। শামিমাও তাই চাচ্ছিল। ব্যথা সহ্য হচ্ছিল না। কিন্তু মা রাজি হননি। বলেছিলেন, ‘মাইয়া মরে মরুক। প্যাট কাটতে দিতাম না। শামু টিপ মাইরা থাক। আল্লাহ চাইলে বাইচ্চা এমনিতেই সুরসুরাইয়া আইয়া পড়ব।’ চোখের সামনে মেয়ের এত যন্ত্রণা দেখেও মা কেন বলেছিল এমন? টাকা খরচের ভয়ে নাকি মেয়ের পেটে দাগ থেকে যাবে সে কারণে? পরদিন রাত নটা পঁচিশ মিনিট পর্যন্ত শামিমাকে শাহজাদার আসার জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছিল। এরমধ্যে পেটের ভেতর সেই ঘোড় দৌড় এক মুহূর্ত থামেনি। রাতে রাগান্বিত ভঙ্গীতে নারী ডাক্তারটি নার্সকে বলেছিলেন, ‘পেসেন্টকে লেবার রুমে নাও।’ লেবার টেবিলেও তার সেই রাগ অব্যাহত ছিল।
আহ! অসভ্য লোকটি শাহজাদার শরীর বারবার এভাবে খোঁচাচ্ছে কেন? রাগ? কিসের জন্য? শামিমার চোখে ক্রোধের অগ্নিস্ফুলিঙ্গ জ্বলে নিভে যায়। পুনরায় চোখের সামনে সেই নারী ডাক্তারের মুখ ভেসে ওঠে।
পেট কাটতে না পেরে শাহজাদার বেরিয়ে আসার রাস্তার খানিকটা একটানে কেটে দিয়েছিলেন তিনি। সেই টানে ক্ষোভ ছিল। এখনো সেটা অনুভব করে শামিমা। পরের ত্রিশদিন ঘন্টাখানেক ধরে হারিকেন জ্বালিয়ে দু-পা ফাঁক করে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছিল। তবে সেই ঘা শুকলো। না ব্যথা ছিল না। প্রবল চাপের সাথে একসময় মনে হয়েছিল পেট থেকে সবকিছু বেরিয়ে শরীর পালকের মত হালকা হয়ে গিয়েছিল। টমটমের খটখটও নিমিষে উধাও। চোখের সামনে নার্সের হাতে উলটো হয়ে ঝুলছে শাহজাদা। সাদা ধবধবে শাহজাদা। ওইটুকুন বাচ্চাকে ঝপ করে ওয়েট মেসিনে ফেলে দিতে চিৎকার করে পুরো পৃথিবীকে সে জানিয়ে দিল, ‘মা, আমি এসে গেছি।’ বিনু বাংলায় খুব ভাল ছিল। অনেকগুলো কবিতাও লিখেছিল। শখ ছিল কোন এক বইমেলায় কবিতার বই বের করবে। কোন কারণে হয়নি। বিনু শাহজাদার নাম রেখেছিল নির্জন। নির্জন নির্জন। যেন মৌণ মিছিল! শামিমার ভালো লাগেনি। কদিন পর বদলে রাখলো শাহজাদা। সুলতান পুত্র, রাজার পুত্র না হোক মায়ের কাছে তো সে শাহজাদাই!
পাশের কোন এক মসজিদ থেকে আজানের সুর ভেসে আসছে। খুব বিষণ্ণ সেই সুর। কোন কারণে কি আজ মুয়াজ্জিনের মন খারাপ? এত বিষণ্ণ কেন? নাকি শামিমার কাছে এমন মনে হচ্ছে। পলাশীর এই নির্জন গলিতে, এই অর্ধসমাপ্ত বিল্ডিঙয়ে কিভাবে আর কেনই বা শাহজাদা এল। নাকি আনা হয়েছে? কতজন মিলে ওকে মেরেছে? কাল রাতে যারা ওকে ডেকে নিয়ে এল ওরা কারা? কতটা ছুরি, কতটা গুলি? কি এমন প্রতিহিংসা? যে মুখটা থেঁতলে দিল? শেষ সময়ে ও কি মাকে ডাকেনি? কত কত প্রশ্ন! শামিমা জবাব জানেনা। কখনো জানবে না হয়ত। কিন্তু শামিমা এই ভেবে অবাক হয়, মা হয়েও সন্তানের আশু বিচ্ছেদ কেন টের পায়নি সে?
শাহজাদার জন্মের পর লেবার রুমের পাশেও সেদিন আজান হয়েছিল। নবজাতকের কানে আল্লাহর নাম পৌঁছে দিয়েছিল শাহজাদার বড় মামা রাজু। রাজু এত সুন্দর করে আজান দিতে পারতো সেটা শামিমার জানা ছিল না। কিশোর বয়স থেকে এক গাদা ভাইবোনের ঘানি টানতে টানতে রাজু কেমন কুঁজো হয়ে গিয়েছিল। শামিমার থেকে দুবছরের ছোট কিন্তু দেখলে মনে হতো দশ বছরের বড় ভাই সে।
হাসপাতালে কত বিল আসে সে ভাবনায় শামিমা ঠিকমত ঘুমুতে পারেনি। প্যারালাইজড শাশুড়ির চিকিৎসার খরচ অনেক। মিজান সাফ বলে দিয়েছিল, ‘বিয়ের সময় তো তোমার বাড়ি থেকে কানাকড়ি দিল না। বাচ্চা হবার খরচা তাঁদেরকে দিতে বল। আমি এক পয়সা দিতে পারব না। দেবার সামর্থ্যও নেই।’ বাড্ডার আলাইতুন্নেসা উচ্চ বিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞানের শিক্ষক মিজান। শামিমার স্বামী, শাহজাদার বাবা। মা অন্তপ্রাণ কিন্তু সন্তান অন্ত বাবা হতে পারেনি কখনো। শাহজাদা পেটে আসার দুমাস পরেই শামিমাকে মায়ের বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছিল। বাবাহীন সংসারে একমাত্র রোজগেরে ভাই রাজু। মা বিনু মলি রবি সকলের অন্নের যোগানদাতা সে। এরপর এলো শামিমা। মুখ শুকিয়ে গেলেও চুপ ছিল রাজু। কিন্ত সুরমা চুপ থাকতে পারেনি। স্বামীর রোজগারে প্রতিদিন শাশুড়ি ননদের পাঁচ পাতে ভাত বাড়া চাট্টিখানা কথা নয়। সুরমার থালাবাটির ঝনঝনানিতে কতদিন যে ভাতের প্লেটে শামিমার চোখের পানি টুপ করে পড়ে গিয়েছে! কে তার খোঁজ রাখে!
দরকার ছিল না তবুও ডাক্তার তিনদিন ওদেরকে হাসপাতালে রাখলো। বিল পরিশোধ করে তবে বাসায় ফিরতে হবে। প্রায় পনের হাজার টাকার বিল। সেই সময়ে পনের হাজার টাকা অনেক। শামিমার কাছে আছে মাত্র পাঁচ হাজার টাকা। রাজু সেই যে লেবার রুমের পাশে দাঁড়িয়ে আজান দিয়েছিল আর কোন খোঁজ খবর রাখেনি। অগত্যা টাকার জন্য রবিকে মা বাসায় রাজুর কাছে পাঠালেন। রাজু হাত জোড় করে মাফ চেয়েছিল। সে কোন টাকা দিতে পারবে না। বাকি দশ হাজার টাকা রবি কোথা থেকে জোগাড় করেছিল শামিমা আজো জানে না। জানার চেষ্টাও করেনি!
পুব আকাশ ফর্সা হয়ে এসেছে। শাহজাদার রক্তাক্ত মুখে আলো পড়ে আরো লাল দেখাচ্ছে। শামিমা কাঁদে না, কাউকে কোন কথাও বলে না। কিচ্ছু বলার নেই, শোনার, বা জানার নেই। যাকে জানার ছিল বলার ছিল তাকে সময়মত কিছু বলতেই পারেনি। বা পুনরায় অভাবের নৃত্য দেখার ভয়ে বলার সাহস হয়নি ।
শাহজাদাকে নিয়ে হাসপাতাল থেকে ফেরার পর মা বলেছিলেন আঁতুড় কেটে যাক তবে নিজের ঘরে ফিরে যাস। কিন্তু সুরমার তীব্র দৃষ্টির সামনে শামিমা দিনে দিনে কুঁকড়ে যাচ্ছিল। সুরমার চোখে রাজ্যের বিরক্তি। এই চোখ ছেলের অমঙ্গল ডেকে আনবে না তো? বাড়ি ফেরার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে শামিমা। সন্তান জন্মের সাতদিন পর মিজান এলো। প্রথম সন্তানের পিতা হিসেবে কোন উচ্ছ্বাস নেই, আয়োজন নেই। যতটা সময় ছিল মায়ের অসুখ, অভাব অভিযোগ আর শ্যালিকাদের সাথে খুনসুটি। স্ত্রী সন্তানকে বাড়ি ফিরিয়ে নেবার সামান্যতম আগ্রহ নেই ।
কি আর করা! দশদিনের মাথায় রবিকে সাথে নিয়ে নিজেই মেরুল বাড্ডার বাসায় ফিরে গিয়েছিল শামিমা। মিজান খুশি হয়নি। স্কুল থেকে ফিরে ওদেরকে দেখে বিকৃত স্বরে বলেছিল, ‘এত তাড়াতাড়ি এলে যে! ভাই কি তাড়িয়ে দিল?’
বিল্ডিংটার ওপাশের গলির মুখে মানুষের ভিড় বেড়ে গেছে। লাশ নিয়ে তাদের রাজ্যের কৌতূহল, গবেষণা। কে, কিভাবে মরল? রাতে কে কয়টা গুলির শব্দ পেয়েছে। গলির মধ্যে দৌড়াদৌড়ির কারণে কার ঘুম ভেঙ্গে গিয়েছিল! সব জল্পনা কল্পনার কথা শামিমার কানের গহবরে ছিটকে এসে পড়ছে। কিছুক্ষণ বাদে এরাই হয়ত এই রাস্তা ধরে যখন ঘরে ফিরবে তখন মুখে থাকবে অন্য গল্প। এবার কতটা বৃষ্টি হলো, রাস্তা ঘাটের ইট বালুর কতখানি বৃষ্টির পানিতে চলে গেল। সিটি কর্পোরেশনের বরাদ্দ থেকে কাউন্সিলর কত পার্সেন্ট খেলো তেমন সব নাগরিক গল্প। অথবা পাড়ার কোন মেয়েটি হুট করে বেশ্যাসুলভ হয়ে উঠেছে, রূপার মা কিভাবে অল্প বয়সী যুবকদের মাথা চিবুচ্ছে এমন রসালাপে কারো কারো জিহ্বা আরো পিচ্ছিল হবে। ওরা ঘণঘণ পানের পিক বা থুথু ছিটিয়ে ভিজিয়ে ফেলবে গলিপথ।
গলিমুখ থেকে চোখ ফিরিয়ে শাহজাদাকে দেখে শামিমা। খোলা চোখে অপরিসীম ভয় আর বিস্ময় জড়াজড়ি করে আছে। চোখ দুটো এখনো কেউ বন্ধ করে দেয়নি। ছোটবেলায় মাকে ছাড়া কিছুই বুঝতে চাইতো না শাহজাদা। রোগা পলকা ছেলে। বারো মাসে তেরো পার্বণ। আজ কাশি তো কাল জ্বর, পরশু পেট খারাপ। খাবার মুখে দেবার সাথে সাথে বমি করে ভাসিয়ে দিত। স্কুলের মাস্টারির টাকায় তিনবেলা খাবার জোটানই ছিল কঠিন। এলোপ্যাথির ডাক্তারের ভিজিট জোগাড় হবে কোথা থেকে? সুমি হোমিওপ্যাথির পুরিয়ায় ঘর বোঝাই হয়ে গিয়েছিল। তবে শামিমার বুকের ওম ছিল ছেলের সবথেকে বড় ওষুধ। মায়ের বুকের মধ্যে চব্বিশ ঘন্টা সেঁধিয়ে থাকতে চাইতো। কবে কবে যেন বুক ছেড়ে দূরে গেল আর আজ দুনিয়া ছেড়ে দূরে।
তিনটে ছোট্ট ছোট্ট ছেলে মেয়ের যাবতীয় কাজ। পক্ষাঘাতগ্রস্থ শাশুড়ি। একাকী কসরত করে তাঁর বিছানা বদলে দেওয়া। চায়ের চামচে করে বার্লি, সুজি, নইলে ফেনা ভাত খাওয়ানো। ঘর দোর ঝাড় পোছ। রান্না বান্না। সবকিছু একাই সামলাতে হতো। মিজান ছেলে মেয়েকে স্কুলে নিয়ে যাবার কাজটুকু পর্যন্ত কখনো করেনি। বললে হাত ঝেড়ে বলত, চাকরী করে আয় তো কর না । সারাক্ষণ ঘরে কাজ কি?
সংসার করতে করতে হাঁফিয়ে উঠতো শামিমা। একমাত্র বিনু এলে কিছুদিনের ছুটি। প্রায়ই শামিমার বাসায় হাজির হতো বিনু। বাচ্চাগুলো খালামনি বলতে অজ্ঞান। যে কদিন বোনের বাসায় থাকতো সংসারের কুটোটি পর্যন্ত শামিমাকে ধরতে দিত না। আহা! সংসারহীন বোনটি! শামিমা মনে মনে ভাবতো বোনের ছেলে মেয়ে দিয়ে হলেও মেয়েটা কিছুদিন সংসার করার আনন্দটা নিচ্ছে, নিক। ম্যাট্রিক পাশের পর বিনুর বিয়ে হয়েছিল সাভারে। কিন্তু কালো মেয়ে বরের পছন্দ নয়। দুমাস না যেতে তালাকের নোটিশ ধরিয়ে বিনুকে বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছিল। এরপর কয়েকবার চেষ্টা করেও আর বিয়ে দেওয়া গেলো না। কালো রঙয়ের মাসুল হিসেবে বরপক্ষ কাড়ি কাড়ি টাকা চায়। কিন্তু এত টাকা দেবে কে?
সেই বিনু, বোন বিনু যে রাতের পর রাত বোন জামাইকেও সেবা করে সেটা অনেক পরে শামিমা বুঝেছিল। এক রাতে বিনুর ঘরে মিজানকে আবিষ্কার করে পাগলপারা হয়ে গিয়েছিল শামিমা। ওদেরকে আঁচড়ে কামড়ে একাকার করে ফেলেছিল। বিনু কাঁদতে কাঁদতে বেরিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু পরের সপ্তাহে সে শামিমার বাসায় পুনরায় ফিরে আসে। এবার মিজানের বঁধু বেশে। শামিমার সামনে তর্জনী উঁচিয়ে খুব গর্ব করে বিনু বলেছিল, মিজানের সন্তান তার পেটে।
শামিমার মুখ থেকে কথা বের হয়নি সেদিন। তারপরেও কোনদিন এই বিষয়ে কথা বলেনি। শাহজাদার বয়স তখন তেরো, সাজুর দশ আর ইমার সাত।
রবি এসে শামিমাকে বলেছিল, ‘বড়াপা চল এ বাসায় তুমি আর থাকতে পারবে না। অটোমেটিক্যালি তুমি এখন তালাক প্রাপ্তা।’ অটোমেটিক্যালি কেন, সেটা শামিমা সেদিন বুঝতে পারেনি রবির মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল ফ্যালফ্যাল করে। ‘আহা, তুমি কি জানোনা ইসলাম ধর্মমতে দুইবোন একত্রে কোন পুরুষের জন্য হারাম?’ রবির মুখে কেমন একটা তাচ্ছিল্যের হাসি! সেটা ধর্মকে লক্ষ্য করে নাকি বিনুকে লক্ষ্য করে জানেনা। শামিমা অনেক কিছুই জানেনা ।
রবির সাথে যখন বাচ্চাদের নিয়ে শামিমা মিজানের বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছিল তখন কোথায় যাবে ভাবেনি। রাজুর বাসার কথা মনে হলেই সুরমার কথা ভেবে মন দমে যাচ্ছিল। আসলেই কি মেয়েদের যাবার মত নিজের কোন বাড়ি কখনো ছিল? নাকি আছে? বদলেছে নিশ্চয় অনেককিছু। কিন্তু মেয়েদের নিজের ঠিকানা এখন সেভাবে তৈরি হল কই? সেদিন শেষ পর্যন্ত রাজুর বাড়িই যেতে হল। মা শামিমার মুখের দিকে তাকাতে পারছিলেন না। যেন বিনুর কোন ভুল নয়, ভুল সব তাঁর। কিন্তু সুরমার অশ্লীল সব বক্রোক্তি ছুটে এসে তীরের মত ছুটে এসে শামিমার বুক এফোঁড় ওফোঁড় করে দিচ্ছিল।
তিন সন্তান নিয়ে ভাইয়ের ঘাড়ে কতদিন! রবির নির্দিষ্ট কোন আয় নেই। বিয়েও করেনি। মলি কোথায় কোথায় পড়িয়ে বেড়ায়। নিজের খরচটা চালাতে পারে। রাজুর দুই ছেলে মেয়ের ভবিষ্যত। অনেক ভেবে রবিকে সাথে নিয়ে শামিমা দুটো ঘর ভাড়া নিল গুলিস্তানের এদিকে। আন্ডার ম্যাট্রিক শামিমা চাকুরী করার যোগ্যতা তো ছিল না। ইসলামপুর থেকে সস্তা দরে কাপড় কিনে ভাই বোন মিলে সেগুলো বাড়ি বাড়ি বিক্রি করতে লাগলো। সেও বারো বছর হলো। তিন বাচ্চার লেখাপড়ার খরচা, চার মুখের খাবার! কি দুর্দিন গিয়েছে সেসময়। কোন কোনদিন সারাদিনে বাচ্চাদের মুখে দু পিস পাউরুটি শুধু তুলে দিতে পেরেছে। কিন্তু থেমে তো ছিল না! এই পৃথিবীর কোথাও কিছু থেমে থাকে না। হয়ত স্থবির হয়ে পড়ে কিছু সময় বা কালের জন্য।
ছোটবেলা থেকেই শাহজাদা ক্লাসের সেরা। পড়ার কথা কোনদিন মনে করে দিতে হয়নি। স্কুল থেকে ঘরে ফিরে সারাদিন দুই ভাই বোনের সাথে হৈ হল্লা লাফালাফি হাসি তামাশা। কি প্রাণবন্ত আর উজ্জ্বল ছিল শাহজাদা। সাজু ইমা ভাইয়ের পিছু ছাড়তে চাইতো না। সেই ছেলে হুট করেই যেন বদলে গেল। তের বছরে যতটুকু বুঝার বুঝে গিয়েছিল হয়ত। ওর চোখের সামনেই তো ঘটেছিল সব! কখনো বাবা বা বিনু খালামনির বিষয়ে কিছু মুখ ফুটে বলেনি। হয়ত লজ্জায় বলেনি। গল্প করতে করতে অনেক রাতে শাহজাদাকে শামিমা বলেছিল, আমি মরে গেলে বিনুর কাছে থাকবি তোরা। মায়ের পরেই তো খালা। সেই মায়ের মত খালা আর পিতার বিষয়ে কি বলতে পারত শাহজাদা? বদলে যাওয়াই সুবিধে। একদম বদলে গেল। কারো সাথে তেমন কথা নেই, হাসি খেলা কিছুই নেই। মুখ বুজে স্কুলে যায়, আসে। সারাক্ষণ কোন এক ভাবনায় ডুবে থাকে। খুব কি দূরে চলে গিয়েছিল? ওই তো শুয়ে আছে। এত কাছে! অথচ যোজন যোজন দুর।
সূর্য খোলস ছেড়ে পুরোপুরিভাবে বেরিয়ে এসেছে। চারপাশে ঝলমলে আলো। সাজু পাশে এসে দাঁড়ায়, ‘মা লাশ মর্গে নিতে এসেছে। যাবে?’
শাহজাদা এখন ভাইয়ের কাছেও লাশ! শামিমা কথা বলে না। দুজন লোক শাহজাদাকে চাটাইয়ে পেঁচিয়ে ভ্যানের ওপর দড়াম করে ফেলে দেয়। ছোটবেলায় একবার শাহজাদা সাজুর সাথে খেলতে খেলতে খাটের নিচে লুকিয়েছিল। মাত্র পাঁচ মিনিটে হাপসে শ্বাস আটকে নিস্তেজ হয়ে গিয়েছিল। সেই ছোট্টকাল থেকে ওর এজমার ধাত। এখনো আছে। শামিমা ওর পকেটে সবসময় ইনহেলার দিয়ে রাখে। সেদিন পকেটে ছিল না। আজ আছে কিনা কে জানে! আজ তো চাটাইয়ের মধ্যে শ্বাস আটকে যাবার শ্বাসটুকু ওর বুক থেকে বেরুবে না।
ম্যাট্রিক পর্যন্ত শাহজাদা নিজের মধ্যেই নিমজ্জিত ছিল। কিন্তু কলেজে উঠে সমস্ত নির্জনতা ভেঙ্গে প্রগলভ হয়ে উঠলো। আবারো বদলালো। শামিমা যেন ওর মা নয়, ওই শামিমার বাবা। একদিন জিদ করে বসলো। মাকে কিছুতেই বাড়ি বাড়ি কাপড় ফেরী করতে দেবে না। সত্যি আর বেরোতে দিল না। সংসারের পুরো ভার ওইটুকুন কাঁধে নিয়ে নিয়েছিল। শামিমা কি খুব ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল? নাহলে এতটুকুন ছেলে রাতারাতি কোথা থেকে এত টাকা পাচ্ছে সে খবর কেন করল না?
এখান থেকে মর্গ বেশি দূরে নয়। ভ্যান চলতে শুরু করেছে। জড় হওয়া মানুষের হাট ভাঙ্গে । সাজু আর শামিমা নিঃশব্দে ভ্যান অনুসরণ করে।
সেই ছোটবেলা থেকে ঘুমের মধ্যে অনেকদিন, অনেকদিন শাহজাদা মাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে উঠতো। শামিমা বুকের মধ্যে চেপে ধরলে তবেই শান্ত হতো। শাহজাদার সবকিছু বদলে গেলেও ঘুমের মধ্যেকার সেই কান্না, ভয় এখন বদলায়নি। এজন্যই হয়ত মাঝে মধ্যে গভীর রাতে শাহজাদা মায়ের কাছে আসে। শামিমার হাতটা টেনে মাথার নিচে দিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। কি নিস্পাপ, কি সুন্দর লাগে তার ঘুমন্ত শাহজাদাকে!
কাল রাতেও শাহজাদা মায়ের হাতটা মাথার নিচে দিয়ে পরম নির্ভরতায় ঘুমিয়ে ছিল। এত রাতে দরোজায় বেল কেন? ধড়ফড় করছিল শামিমার বুক। সাজু দরোজা খুলেছিল। কালো পোশাকের মোচ ওয়ালা লোকটি গমগমে কন্ঠে বলল, ‘আমরা থানা থেকে এসেছি শাহজাদাকে আমাদের সাথে যেতে হবে।’
শাহজাদা যেতে চায়নি। বলেছিল সকালে যাবে। ওরা শুনলো না। সাজু দৌড়ে ওদের পিছু পিছু গিয়েছিল কিন্তু ততক্ষণে কালো রঙয়ের গাড়িটি গো গো শব্দ করে এগিয়ে গেছে। রাতভর সাজু আর রবি এ থানা ও থানা দৌড়ে কোন খোঁজ পায়নি। তাঁদের এক কথা, শাহজাদা নামে কাউকে থানায় আনা হয়নি। রাতের শেষ প্রহরে সাজুর কাছে ফোন এল। নিজেদের মধ্যে বন্ধুক যুদ্ধে শাহজাদা মারা গেছে। লাশ সনাক্ত করতে যেতে হবে।
নিজেদের মধ্যে যুদ্ধ? কার সাথে, কোথায়? পলাশি বাজারের পেছনে অসমাপ্ত বিল্ডিংটির মেঝেতে শাহজাদা উপুড় হয়ে পড়ে ছিল। পিঠ দিয়ে গুলি ঢুকে বুক ফুঁড়ে বেরিয়ে গেছে। দুহাতের কব্জিতে গভীর কালশিটে দাগ।
ভ্যানটি খুব আস্তে চলছে। লাশ টানতে টানতে লোকটি হয়ত ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। এই হাসপাতালের মর্গে কাটাছেঁড়ার জন্য আজ কতগুলো লাশ এলো কে জানে!
মর্গের সামনে শামিমা বসে থাকে। শামিমার কাছ থেকে দুশো টাকা নিয়ে সাজু কাকে দিয়ে এলো। হয়ত ডোমকে। তাতে কি সুবিধে শামিমা জানেনা। কখন যেনো রবি এসে পাশে বসেছে। বিড়বিড় করছে, ‘এনকাউন্টার হইছে বড়াপা, এনকাউন্টার। হিরন কাউন্সিলর টাকা দিয়া করাইছে।’
শামিমা কিছু বলে না। পেটে চিনচিনে একটা ব্যথা হচ্ছে। শাহজাদার জন্মের সময় যেমনটি হয়েছিল। ক্রমেই সেটা তলপেট জুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে। খোয়া ভাঙ্গা রাস্তায় ঘোড়ায় টানা গাড়ি যেমন লাফিয়ে লাফিয়ে চলে তেমনি লাফিয়ে লাফিয়ে তলপেট থেকে উরুতে উরু থেকে তলপেটে ছুটে বেড়াচ্ছে। তারপর আরো নিচে, অনেক নিচে। পায়ের পাতা অব্দি। বারবার ফিরে আসছে টমটমের চাকাগুলি। ঘুরে ঘুরে পা থেকে মাথা পর্যন্ত পিশে মারছে। পুরো শরীর জুড়ে ফুঁড়ে যাচ্ছে সুচরাজার অজুত নিযুত সুচ। শামিমা বুঝতে পারছে না এ কি প্রসব বেদনা? নাকি মৃত্যু!
ধীরে ধীরে চারপাশের সবকিছু ফিকে হয়ে যায়। মর্গ, রবি সাজু কিচ্ছু নেই তার সামনে। সে এখন পঁচিশ বছর আগের সেই লেবার রুমে শুয়ে আছে। তার ঝাপসা চোখের সামনে নারী ডাক্তারটির হাতে নবজাতক শাহজাদা উলটো হয়ে ঝুলছে। ওর ছোট্ট দুহাত পেছনে বাঁধা, মুখ বাঁধা। শরীর জুড়ে মোটা সুতোয় জোড়াতালি দেওয়া অসংখ্য জখম!
মোটা সুতোগুলো যেন জরাগ্রস্থ বৃদ্ধার শরীরের অজস্র ভাঁজে কুঞ্চিত বলিরেখা। কি অদ্ভুত! সেগুলো ধীরে ধীরে শাহজাদার শরীর থেকে বেরিয়ে আসছে। আরো মোটা, আরো কুঞ্চিত, কৃষ্ণ কালো, বীভৎস শেকড়ের মত! শেকড়গুলো পিলপিল করে ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে। সেঁটে যাচ্ছে দেওয়ালে দেওয়ালে। অলিতে গলিতে। এই শহর আর রাষ্ট্রের চোখে মুখে!