আনত ক্রোধকনা খসে পড়বার আগে

শুভদীপ চক্রবর্তী ও সোহম দাস

শুভদীপ চক্রবর্তী

আনত ক্রোধকনা খসে পড়বার আগে

১.


হিসেব মিলছে না;
মিলিয়ে নিতে চেয়ে ঘড়ি
দম দেওয়া পুতুল ছুঁড়ে দিচ্ছে সভ্যতা ––
দুই আঙুল; তিন দাঁড়ি।

কত কথা বলবে একা? বলো ––
শেষমেষ মোবাইল নিভে গেলে
নিজের উপর কত ঘোরাবে ছড়ি?

সুযত্নে তৈরী করেছো আঘাত।
বদ্ধ ঘরে বাতাস মেলেনি। মৃত্যু ––
প্রয়োগ করবে কত ধারার আইন?

যে রাগেতে শোক নেই কোনও,
সে ব্যথাই ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন।


২.
তব অপাঙ্গে যত ভ্রম
তব অঙ্গ জুড়ে জ্বালা
বিষ ঢাকবে কতক্ষন
আগুন জানে, ডালপালা

যতই আয়না লাগাও চোখে
শুধু সত্যি, হা হা সত্যি
তবু বৃষ্টি এলেই মরছো
খুঁজছো মিথ্যে, একরত্তি

তাই আছাড় মেরে ভাঙছি
ঘুম ঘুম দিন, আর কাব্য
প্রিয় ডেসডিমোনা, শুনছো
তোমার অস্থির,
আমার মদ হোক ––


৩.
সবুজ ছড়িয়ে বসে থাকি যত,
তুমি ততই লাল ছড়িয়ে দাও আমার দিকে।
এমন ওপিয়াম দুপুরে,
জিঘাংসা পেয়ে বসে খুব।
অথচ খুনের হাত আমার আজীবন খারাপ ––
যে বিন্দুতে শেষ রক্তক্ষরণ,
সেই বিন্দু অবধি পৌঁছাতে পারিনা কিছুতেই।

তারপর মাঝরাতে মাথাব্যথা, ছটফট,
এফোঁড়-ওফোঁড় ...
নিজের চোখের দিকে তাকাতে পারিনা,
এত খিদে ! এত খিদে ––
মীরজাফর?


=============================================

সোহম দাস

আসলে তো অন্তর্দাহ, তাই না?


প্রিয় ভাসিতা,
রাগতে দেখেছ আমায়! সংযম, দেখেছ? আমি দেখেছি। এক ভারতীয় মাঝবয়েসী ব্যারিস্টার। আফ্রিকা! ফুটপাথে তিনজন শ্বেতাঙ্গ হুলিগান! ‘গেট অফ দ্য পাইপ ইউ ব্লাডি কুন!’ গায়ের রং নিয়ে তীব্র অপমানের পরেও ফুটপাথ ছেড়ে নেমে না দাঁড়ানো একটা প্রতিরোধ! শান্ত গলায়-‘ইউ উইল ফাইন্ড দেয়ার’স রুম ফর আস অল!’ মোহনদাস গান্ধীর ভূমিকায় শার্প অভিনয়ের বেন কিংস্লে! অভিনয়! আরেকজন! চিরকেলে ঈশ্বর! দৃঢ় গলায় উদাত্ত কণ্ঠ! ‘আয়্যাম সরি, বাট আই ডোন্ট ওয়ান্ট টু বি অ্যান এম্পারার। দ্যাট’স নট মাই বিজনেস। আই ডোন্ট ওয়ান্ট টু রুল অর কংকার এনিওয়ান। আই শ্যুড লাইক টু হেল্প এভরিওয়ান-জিউ, জেন্টাইল-ব্ল্যাক ম্যান, হোয়াইট’। সোজাসুজি তাকিয়ে বলা কথাগুলো, মেরুদণ্ডটা টানটান, চোয়াল শক্ত, এক নিঃশ্বাসে বলে যাওয়া প্রশান্তির আড়ালে রোমান্টিসিজম ছিল না, আগুন ছিল! স্যার চার্লস স্পেন্সর চ্যাপলিন। হাস্যরসের আড়ালে বরাবর মরবিডিটিকে চাবুক পিটিয়ে যাওয়াটা যিনি শিখিয়ে গিয়েছিলেন! আবার কখনও ঘৃণ্য পেশাদারি খুনি, যে অনায়াসে গিলোটিনের সামনে দাঁড়িয়ে বলতে পারে-‘ওয়ান মার্ডার মেকস আ ভিলেন, মিলিয়ন্স আ হিরো! নাম্বারস স্যাংক্টিফাই, মাই গুড ফেলো!’ ভিলেন নয়, অ্যান্টি-হিরো! এই অ্যান্টি-হিরোইজম! এই একই জিনিস, আরও একজনকে দেখলাম! আসলে যেখানে অভিনয়কে ছাপিয়ে মুখ্য হয়ে যায় লাইফ! এক তরুণ শিল্পী, জানো, আগে সেরকম উল্লেখযোগ্য কাজ ছিল না যার! সে-ই কিনা তৈরি করে দিয়ে গেল এমন একটি চরিত্র! মানসিকভাবে তৈরি হতে হতে একসময় একাত্মতা! ‘ইন্ট্রোডিউস আ লিটল অ্যানার্কি। আপসেট দি এস্ট্যাবলিশড অর্ডার, অ্যান্ড এভরিথিং বিকামস ক্যাওস। আয়্যাম অ্যান এজেন্ট অফ ক্যাওস...’ ঠাণ্ডা একটা শিহরণ-জাগান বাক্যের শেল! বজ্র আঁটুনির ঠুনকো প্রতিরোধকে ব্যঙ্গ! হিথ লেজার! দ্য জোকার। একটাই লাইফ, একটাই চান্স, একটাই রোল! কিংবদন্তী, পর্দা পড়ে যাচ্ছে, তাও কী অসম্ভব শান্ত...
আর লাইফ! লাইফ দেখেছ ভাসিতা? নলিনী বাগচীর মত বিপ্লবীরা! ঢাকার কলতা বাজারের ঘাঁটিতে পুলিশি সংঘর্ষে কোমরে গুলি লেগে পড়ে গিয়ে কাতরাচ্ছিলেন। পুলিশ এসে নাম জিজ্ঞাসা করল। বন্দুকের নল ঠেকানো! অগ্রাহ্য করে স্রেফ ওইরকমই একটা শান্ত জবাব-আমাকে বিরক্ত করবেন না! একটু শান্তিতে মরতে দিন! স্পর্ধার চেহারা কখনও কখনও এমনই স্মিগ্ধতারও হয়! কিংবা ভূপেন দত্ত। যুগান্তরের সম্পাদক! দেশদ্রোহী প্রবন্ধ ছাপার অভিযোগে জেল। আদালতে আত্মপক্ষ সমর্থনে গররাজি ভূপেনের জবানবন্দি-‘আমি সর্বদাই যে মত প্রচার করেছি তার সঙ্গে তাদের (ব্রিটিশ আদালতের) সামনে আত্মপক্ষ সমর্থন করাকে আমি সঙ্গত বলে মনে করি না’। উফ, কোথা থেকে আসে এই মেন্টাল স্ট্রেংথটা? জানো তুমি? প্রথমগুলো তো নাহয় অভিনয়, কিন্তু এ তো সত্য ইতিহাসের ভরসায় লিখছি আমি! কোথাও এতটুকু ক্রোধ নেই! কিংবা ধরো রবীন্দ্রনাথ! অস্থির হয়ে সারারাত ঘুমোতে পারেননি অসুস্থ শরীরে! মে ৩০, ১৯১৯! ‘দ্য টাইম হ্যাজ কাম হোয়েন ব্যাজেস অফ অনার মেক আওয়ার শেম গ্লেয়ারিং ইন দ্য কনটেক্সট অফ হিউমিলিয়েশন, অ্যান্ড ফর মাই পার্ট, উইশ টু স্ট্যান্ড, শোর্ন, অফ অল স্পেশ্যাল ডিস্টিংশন্স, বাই দ্য সাইড অফ দোজ অফ আমি কান্ট্রিমেন, ফোর দেয়ার সো কলড ইনসিগ্নিফিক্যান্স, আর লায়াবেল টু সাফার ডিগ্রেডেশন নট ফিট ফর হিউম্যান বিইংস’। ফার্স্ট ভিসকাউন্ট চেমসফোর্ডকে লেখা চিঠি! হয়ত তুমি বলবে এখানে প্রতিটা ছত্রে ঝরে পড়ছে ক্রোধের স্ফূরণ, না ভাসিতা, এ তো অন্ধ রাগ নয়, এ তো আমি দেখছি কান্নার নোনাজল কীরকম ভাবে যেন আগুনের ফুলকির রূপ নিচ্ছে! আরও অনেকে! ওই যে বললাম যে প্রশান্তির আড়ালে রোমান্টিসিজম থাকে না, সেই প্রশান্তি আমাকে শিহরিত করে বেশি! রাগের থেকেও বেশি! ইতিহাস থেকে আমি বর্তমানে আসি! ক্রমশ! যেখানে আসানসোল আর বার্মিংহ্যাম এক হয়ে যায়। দুই পুত্রহারা পিতা! ধর্মীয় দাঙ্গার এক কোপে শেষ হয়ে যাওয়া দুটো তরতাজা যুবকের পিতা! তাদের দেখি। দুজনেই কীরকম যেন এক হয়ে যান একটা বিন্দুতে এসে! মারের পালটা মার চাই আমরা, হে স্লোগানপ্রেমিক! তবু তাঁরা বলেন, প্লিজ, আর কোনও রক্ত ঝরিয়ো না! হ্যাঁ, ভাসিতা, ছেলের অন্ত্যেষ্টি করে আসার পথেই তাঁরা উদ্ধত প্রতিবেশীদের নরম গলায় হুকুম দিতে পারেন কী অবলীলায়, প্লিজ, আর কোনও রক্ত ঝরিয়ো না! ভাসিতা, নতশির হই! যেরকম কর্ণাটকী সুঠাম এক মিতবাক ক্রিকেটার! একটা সময়ের পর থেকে ছিঁড়ে খেয়েছিল তারই দেশের মানুষ, মিডিয়া, হয়ত তার দলের অনেকেও! আজ অবধি, আজ অবধিও দেখিনি, বিশ্বাস করো, একটিবারের জন্যও কাউকে কটূ কথা বলতে! আগ্রাসন শরীরে ছিল না, ছিল দুটো চোখে, সেটা বেরিয়ে আসত ব্যাটে! রাহুক দ্রাবিড়! প্লেয়ার সবাই হয় ভাসিতা, স্পোর্টসম্যান সবাই হয় না! একজনকে দেখেছিলাম, স্পেনের রক্ষণে প্রাচীরসম এক মহীরূহের মত! বিপক্ষ এসে অশোভনীয়তা দেখালেও পালটা অশোভনীয়তা দেখানোর পৌরুষকে গুরুত্ব দিত না যে, লম্বা চুলের কার্লেস পুওল সাফোরকাদা! বড্ড এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে ভাসিতা! কোথা দিয়ে শুরু করেছিলাম, আর কোথায় এসে পড়েছি! আসলে মার্ক টোয়েন, ভাসিতা! অ্যাংগার ইজ অ্যান অ্যাসিড দ্যাট ক্যান ডু মোর হার্ম টু দ্য ভেসেল ইন হুইচ ইট ইজ স্টোরড দ্যান ডু এনিথিং অন হুইচ ইট ইজ পোরড! আসলে তো অন্তর্দাহ, তাই না?

ইতি,
দংশন (কার? বিবেকের?)