নৈবেদ্য

সাবেরা তাবাসসুম ও শাহনাজ নাসরীন




সাবেরা তাবাসসুম

কামনা

কাপড় তুলে আনি ব'লে ভাত-ঘুম ছেড়ে উঠে আসি
উঠে আসি, তোমার কাছে না-- ছাদে-- ছাদের আকাশে
ভেসে থাকা একটাই হাতি সদৃশ মেঘের কাছে
বলি, বৃষ্টি হয়ে ঝরো-- একহাতে মাড় দেয়া শাড়ি
এক হাতে আমার কামনা সামলে বলি :
তোমার সাথে ভিজে যেতে চাই
অথচ তুমি বৃষ্টি নও-- নির্লেপ মেঘমদিরা
তোমারে বাসনা করি-- মায়া করি-- তুচ্ছ করি অতি
এই তুমি এত যত্ন করে কেমন নিপুণ হাতে
আমাকে ছাড়িয়ে দাও-- সংসার, মায়ামন্ত্র হতে
লাউয়ের খোসার মত পলকা, নাজুক-- ছাড়িয়ে দিচ্ছ থেকে থেকে, মন্মথ হে
তবু তুমি, তুমি তো তুমি নও-- মেঘমদিরা
নির্লেপ-- নির্বিষ-- হিংসুক সুনীল ময়ূর!


প্রার্থনা

এই হেতু প্রার্থনায় আছি
এই হেতু সময়ের যাবতীয় প্রতীক ভুলেছি
মেনেছি জীবন সদা অলীকের সাথে এক যুগলবন্দি
বিছানায় অসুখ--বিছানায় নির্ভার রোদ
আকাশে আমার ব্যথা-- আমার বিনতি


এই হেতু প্রার্থনায় আছি
এই হেতু জগতের ক্ষুৎপিপাসায় মজেছি
দেখেছি অপচয় ঢেকে রাখে, পুষে রাখে আদি বাল্মীকি
অতঃপর শয্যা কামনা-- সমূহ বিরোধ
অতঃপর নিরুপায় নির্বেদ-প্রীতি

এই হেতু প্রার্থনায় আছি--
নিমখুন, নিয়ত কলহ, জেগে থাকা
কখনো তবু এ বিশল্যকরণী
এ-ই এক অপরূপ বিষাদভঞ্জক!


নৈবেদ্য

সব গ্যাছে জলে
যা-কিছু কথা--
তেতোমিঠে উচ্ছ্বল মাছ
সবুজে, ঈর্ষায়-- নোনায় গভীরে
গুনগুন গুনগুন জলে
ভুল ক'রে ডোবে
কেউ যদি ভুল করে ডোবে
সংশয়ে, সংরাগে-- সবুজে ঈর্ষায়
কেউ যেন ভুল করে ডোবে
কৃষ্ণপক্ষ প্রেম ঋতুসংহারে
কালব্যথা ক্ষণ তরে ভোলে
সব তার জলে
সবুজে, ঈর্ষায়-- নোনায় গভীরে
গুনগুন গুনগুন জলে!

==============================================


শাহনাজ নাসরীন

সাতচল্লিশ বছরে একদিন


সেক্সি শব্দটি কানে ধাক্কা দেয় চপেটাঘাতের মতোই। অনিতার হাত থেকে পানির মগ ছিটকে পড়ে। সে কোনদিকে না তাকিয়ে দৌড়ে প্রথমে ড্রইংরুমে ঢুকে লাইট অফ করে দেয়। যেন কেউ তাকে না দেখে। ভেতরে অবশ্য কেউ নেই যার যার ঘর বন্ধ করে শুয়ে পড়েছে। লাইট জ¦ললে বাইরে থেকে দেখা যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। তাই সে দ্রুত লাইট অফ করে। চারদিকে অসংখ্য বিল্ডিং তাই শব্দটি কে উচ্চারন করেছে, কোত্থেকে করেছে আর এখনও তাকিয়ে তাকিয়ে মজা দেখছে কিনা বুঝতে তো পারছে না। তাই ঘর অন্ধকার করেই বসে রইলো কিছুক্ষণ।
এই কিছুক্ষণের মধ্যে সে একহাজার রকমের চিন্তা করে ফেললো। সে সুন্দরী তাই বলে এই বয়সে কে তাকে সেক্সি বলতে পারে। তার কি কোন উদ্দেশ্য আছে। শত্রুতা তৈরি করতে চায়? ওদেরকে এই ফ্ল্যাট থেকে তাড়াতে চায় নাকি? সে দৌড়ে বেডরুমে ঢুকলো। বিনয়ের সাথে আলোচনা করা দরকার। কিন্তু ঘরে ঢুকেই থমকে গেলো বিনয়কে বললেই ও তার স্লিভলেস রাত পোশাকের দিকে তাকাবে ভাবটা এমন করবে যেন এই শব্দটি শোনার জন্য ইচ্ছে করেই সে রাতে বারান্দায় গিয়েছিল। এরপর শুরু হবে তার বকাবকি। তাকে হাইপার বলবে পাগল বলবে এবং ফু করে উড়িয়ে দিয়ে উল্টোপাশ হয়ে শোবে।
অনিতা অবশ্য সত্যিই একজন প্রেসক্রাইবড আতঙ্কগ্রস্থ নারী। ইতিহাসের বিখ্যাত বছরগুলিতে মাতা বা মাতামহীরা সংখ্যালঘুতার যে মাসুল দিয়েছিল তার বাবা মা শৈশব থেকেই সেই অভিজ্ঞতার সবটুকু ভার তাদের সুন্দরী মেয়ের মাথায় চাপিয়ে রেখেছিলেন। বিকৃত শৈশব কৈশোরে অনিতা নিজেও অভিজ্ঞতা কম অর্জন করেনি। ফলে বিন্দুর মধ্যে সিন্ধু দেখার মতো সামান্য ব্যতিক্রমেই সে অস্বাভাবিকতা আবিস্কার করে অস্থির হয়ে যায়।
বিনয়কে ডাকার সাহস অনিতার হয় না। কিন্তু সে শুতেও পারে না। আয়নার সামনে বসে নিজেকে দেখে আর নিজের পক্ষে সাফাই গায়। যেন অপরাধটা আসলেই তার। এরপর আবার পাল্টাযুক্তি দিতে দিতে সবটুকু দায় কখনও পুরুষতান্ত্রিক সমাজ, কখনও অশিক্ষা, কখনও রাষ্ট্রের বৈষম্য এরকম নানাবিধ বিষয়ের ওপর চাপায়। যতই ভাবে ততই তিক্ততায় অতিষ্ট লাগে, চোখের জল বাধ মানে না শ্রাবনের মেঘের মতো অঝোর ঝরছেই। দু’বার বাথরুমে গিয়ে মুখ ধুয়ে এসেছে কিন্তু কান্না থামাতে পারছে না। সেক্সি শব্দটা তার খুবই অশ্লীল মনে হয়। সুন্দরী হবার কারণে প্রশংসা বাক্য শুনেছে, ইভটিজিংয়ের শিকার হয়েছে কিন্তু এমন সরাসরি সেক্সি কখনও কেউ বলেনি। আর এই বয়সে এমন একটা গালি শুনতে হলো! তাকে যে বয়সের চেয়ে কম বয়সী দেখায় এই কি তার অপরাধ!

২.
ছাদের ব্যলকনিতে বসে ছটফট করে সামির। অনেক রাত হয়েছে। কিন্তু সে ছাদ ছেড়ে যেতে পারছে না। আজ একটা ঘটনা সে ঘটিয়েছে। এটাকে অপরাধ সে কিছুতেই ভাবতে পারছে না। সে ভালো লাগা থেকেই বলেছে, এভাবে প্রশংসা করা সঙ্গত নয় বোঝে সে। সত্যি করে বলতে গেলে সে আসলে বলেনি মনের ভাবটি আচমকা মুখ ফুটে বের হয়ে গেছে। কিন্তু তাতে তিনি যেমন চমকালেন, ছুটে পালালেন, এরপর থেকে এই যে বেডরুমের লাগোয়া বাথরুমে মানুষটির কান্নাভেজা মুখ এসমস্ত প্রতিক্রিয়া বাড়াবাড়ি মনে হলেও একজনের কষ্ট পাওয়া দেখে তার খারাপ লাগছে এখন।
এই নারীকে সামির সারাক্ষণ অনুসরণ করে। কখনও রাস্তায় কখনও ঘরে। বাইরে অবশ্য তিনি কমই বের হন, শুধু তার বাচ্চা মেয়েটিকে নিয়ে মাঝে মাঝে দোকানে যান। তবে তাকে চোখে পড়ার ঘটনাটি বেশ অভিনব। এ লেভেল পরীক্ষা শেষ হলে এক নির্জন দুপুরে সামির ছাদে বসে ছিল। ছাদের কোণ থেকে একটি বটের চারা ওপড়াতে গিয়ে চোখ পড়ে লাগোয়া ফ্ল্যাটের বাথরুমের বিশাল আয়নায় নিটোল দুটি পা। তিনি হয়ত খাটে শুয়ে ছিলেন বা বাথটাবে, আর তার পায়ের প্রতিবিম্ব পড়েছিল আয়নায়। সামিরের হঠাৎ জীবনানন্দের নগ্ন নির্জন হাতের কথা মনে হলে সে মনে মনে বলে নগ্ন নির্জন পা। এরপর ঐ আয়নায় তাকে নানা সময়ে নানাভাবে দেখেছে সে। এই দেখার নেশা তাকে পাগল করে দেয়। সে সারাক্ষণ ছাদে ঘুরঘুর করতে থাকে। বাথরুমের আয়নায় চোখ ফেলতে বেশ একটু ঝুকে পড়তে হয় তাই অন্যদের ফাঁকি দেয়ার জন্য সে কিছু টব কিনে ঐ কোণটিতে রাখে। তবে তিনি যখন বারান্দার গাছগুলির পরিচর্যা করেন সামির ছাদের অন্য পাশে গিয়ে উদাশভাবে আকাশের দিকে তাকানোর ভান করে। ওখান থেকেই সম্পুর্ণ তাকে দেখতে পায়। মনে হয় যেন আকাশ থেকে বীণাপাণি নেমে এসেছেন তার সমস্ত ভালোবাসা উজার করে দিতে।
আজ তিনি যখন দুলে দুলে পানি দিচ্ছিলেন কম পাওয়ারের নীল আলোতে রাতের পোশাকে তাকে কেমন অপার্থিব লাগছিল। সে আওড়াচ্ছিল, বৃষ্টিভেজা যৌনযূথিকা/ আর এই মৃদু কল্পনা /খুলে দাও সব ডানা পাখি/এ জীবন তবু অল্প না/ রক্ত আর রাত্রি কিছু বলে/ এই দেহ নিঃসৃত ঘাস/ নিয়ে যাও ভোমরার গান/ এই জল-- শুধু চৈত্র মাস। ‘যৌনযূথিকা’ যেন এই শব্দটি তার জন্যই লেখা। এমন ভাবতে ভাবতে সে এক অন্য অবস্থায় চলে যায়। তীব্র একটা শিহরণ অনুভব করে শরীর জুড়ে। হয়তো তখনই মুখ ফসকে... আহা সে কি আর আসবে না বারান্দায়? এখন তবে কী করছে সে? আয়নায় ছায়া কেন পড়ে না। সামির ছাদের কোণটিতে অনেকটুকু ঝুঁকে খুব চেষ্টা করে তাকে আরো একটিবার দেখতে। নইলে সে যে ঘরে ফিরতে পারছে না।

৩.
মর্নিং ওয়াক শেষ না করেই বিনয় ফিরে আসে। ধীর স্থির বিনয় একটু উত্তেজিত ভাবে বলে জানো পেছনের বাড়ির একটা ছেলে ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করেছে। অনিতার প্রতিক্রিয়া সব সময়েই বেশি। তার ঠোঁট কাঁপতে থাকে। নাকেমুখে প্রশ্ন করে, কোন ছেলে, কার ছেলে, কেন আত্মহত্যা করলো শুনলে কিছু? আজ আর বিনয় ধমক দেয় না। বলে, আহা বাচ্চা ছেলে। কী সুন্দর তরতাজা ছেলেটা! কারণ তো কেউই কিছু বুঝতে পারছে না। কোন ঝগড়াঝাটি রাগারাগি হয়নি। রাতে খাওয়া দাওয়া করেছে ঠিকঠাক। কাল রাতে কখন ছাদে উঠেছে বাবা মা জানে না। তবে ইদানীং নাকি ছাদে খুব উঠত বাগান করার শখ হয়েছিল। তবে রাস্তায় নেমে সামনের ফ্ল্যাটের ভদ্রলোক বললেন, যে কোণটা দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে সেই কোণটায় অনেকদিন ছেলেটাকে ঝুঁকে থাকতে দেখেছেন। তো ওখানে অনেকগুলো টব তাই তিনি ভেবেছেন টবেরই পরিচর্যা করছে হয়ত। সে যে আত্মহত্যা করার পায়তারা করছিল একবারও মনে হয়নি তাঁর।