দেহপট

শতাব্দী দাশ ও কৌশিক দত্ত

শতাব্দী দাশ

দেহপট

[এক্ষেত্রে নিয়মের বিপরীতে গল্পটি প্রথমে লেখা। তিনটি কবিতা তার ভিত্তিতে।]

সকাল

অস্থিসার নদের গায়ে ভোরের আলো সোনা ছড়িয়েছে বেহিসেবি। পাঁজরার মতো যে চরগুলি জেগে আছে, সেখানেও সোনালি জরির কাজ ৷ জবাকুসুমসঙ্কাশ সূর্য এখন নাগপুরি লেবুর মতো কমলা। নদের তটে ছোট ছোট দল পাকিয়ে ঘুমিয়ে আছে কুকুরেরা। এদিক সেদিক পড়ে আছে তাদের বিষ্ঠা, চায়ের ভাঁড় । একটি কুকুর যূথের বাইরে একলা ঢুলছে। টলটলে এক ভোরের উপর কুয়াশার সাদা সর পড়েছে।

বালি ভেঙে হনহন করে এগোচ্ছে সারদা। সারমেয়দের পাশ কাটিয়ে, জঞ্জালের ছোয়াঁচ বাঁচিয়ে। হাঁটতে গিয়ে একটা বিলিতি বোতলে তাও ধাক্কা খেল তার নগ্ন পা । ঘেন্নায় সিঁটিয়ে গেল সারদার শরীর৷ এ’মেলায় শহুরে লোকেদের আনাগোনা বড় বেড়ে গেছে! অথচ শহরের মানুষকে দরকার হয় গোঁসাইদের৷ ওঁয়ারা লেখালেখি করলে আলোচনা হয়, আলোচনা করলে ফাংশান জোটে। ফাংশান জুটলে নাম, টাকা। তেমন তেমন লোক ধরলে বিদেশের শিকেও ছিঁড়তে পারে। সারদার গোঁসাই মনমোহনের সাধক-গায়ক হিসেবে নাম উঠতির দিকে। গজগজ করতে করতে গাড়ু হাতে সারদা দ্রুত পায়ে এগোয় একটা যুৎসই আড়ালের খোঁজে।

মেলা ফেলে, আখড়া ফেলে অনেকটা পথ চলে এসেছে সারদা। খানিক গভীরতা বুঝে শাড়ি গুটিয়ে রুগ্ন নদের জলে পা রাখে সে৷ শীতকাল৷ শরীরে কাঁপ লাগে। এখন এ নদ হেঁটেই এপার-ওপার করা যাবে। গাড়ু ডোবানোর জন্য মাথা নিচু করার আগে সারদা দ্যাখে, নদীর অপর পারে বালিয়াড়ি ভেঙে এগিয়ে আসছে এক সুঠাম যুবা। কষ্টিকালো শরীর। নিখুঁত পেশী-ময় সৌষ্ঠব। ও’পারের কোনো সাঁওতাল গ্রাম থেকে শ্লথ পদক্ষেপে সে আসছে নদীমুখী। চিটেগুড়ে পিঁপড়ে যেমনতরো, তেমনি সারদার চোখ আটকে যায় যুবকের শরীরে।

দূরে অস্থায়ী আখড়ায় রাতব্যাপী আসর ভাঙতে চলল। কোনো নবীন কিশোর ধরেছে ভোরাই-
“রাঈ জাগো রাঈ জাগো, শুক-সারি বলে…”
শহুরে বাবুরা তাঁবুর বাইরে আড়মোড়া ভাঙছেন। ওঁয়াদের গাড়িগুলি এবার ধোঁয়া ছেড়ে রাজপথ ধরবে । আবার এসে পড়বেন আরেক দল। মেলায় ভিড় বাড়ার আগে প্রতাঃকৃত্য সেরে নেয়ে-ধুয়ে তৈরি হতে হবে। যুবকের শরীর থেকে চোখ নামিয়ে নেয় সারদা গাড়ুর দিকে৷ বালিজল উঠে আসে। মাথায় ঘোমটা টেনে দূরের ঝোপঝাড়ে অন্তর্হিত হয় সে।

ফিরতি পথে সারদা আবার দেখতে পায় যুবাকে, স্নানরত। কমলা গোল্লাটা সব রঙ বিলিয়ে তখন মোটামুটি সারদার শাড়ির মতো সাদা। সারদা লক্ষ্য করে, আঁজলা ভরে নদের বুক থেকে পাঁক তুলে নিচ্ছে যুবক। লাক্স সাবানের মতো মাখছে গায়ে ঘষে ঘষে৷ ধুয়ে ফেলছে জলে। তার উজ্জ্বল শরীরে সূর্যের আলো পিছলে যাচ্ছে। পৌষসংক্রান্তির শীতেই বোধহয়, সারদার শরীর আবার কেঁপে ওঠে।

দুপুর

তিথিদের গাড়িটা এসে দাঁড়ালো মেলামাঠের বাইরে। হোলনাইট জার্নি। । স্টিয়ারিং কখনও ছিল শৌনকের হাতে, কখনও সুহৃদের৷ ওরা দুজন এখন গাড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে হাত-পা ছাড়াচ্ছে। ক্লান্ত দেখাচ্ছে ওদের। তিথির চোখ লেগে এসেছিল গাড়ির দুলুনিতে, শক্তিগড় ছাড়ার পরই। চাকা গতিহীন হতেই তার ঘুম ভাঙল। আর মনে পড়ল এখুনি মিলিয়ে যাওয়া স্বপ্নটা৷ একটা অচেনা চাতালে অন্ধকার আর ধোঁয়া ভেদ করে সুহৃদকে আবছা দেখা যাচ্ছিল। কিন্তু সে দূরে সরে যাচ্ছিল ক্রমশ। হারিয়ে যাচ্ছিল। স্বপ্নটাই অস্বস্তিতে ঘুম ভাঙিয়ে দিল কি তিথির?

নিজের ডিএসএলআরটা হাতড়াতে গিয়ে তার চোখ পড়ে রিমার উপর। আশ্চর্য চুপচাপ আর বিমর্ষ থাকে মেয়েটা সারাক্ষণ৷ জানলার বাইরে কোন দিকে তাকিয়ে আছে সে ? রিমার দৃষ্টি অনুসরণ করে তিথি একটা মৃতপ্রায় নদ আবিষ্কার করে।
রিমার পিঠে হাত রেখে বলে- ‘চ! ঘুরে আসি।’
রিমা হাসার চেষ্টা করে। বলে- ‘চল্!’
সুহৃদ গাড়ির বাইরে থেকে আড়মোড়া ভাঙতে ভাঙতে বলে, ‘ যাচ্ছিস-ই যখন, তমালতলির আখড়াটা খুঁজে বের কর দেখি লোকজনকে জিজ্ঞেস করে!’

ওখানেই নাকি ভালো গানবাজনা হয়। শৌনকের চেনাজানা নদীয়া-বীরভূম-মুর্শিদা াদের তাবড় তাবড় বাউলেরা ওখানেই ঘাঁটি গেড়েছেন। শৌনকের অভিজ্ঞতা ও জ্ঞানগম্যির উপর সুহৃদের ভরসা আছে। এই মেলায় শৌনকই তাদের গাইড৷ শৌনক বাউন্ডুলে ছেলে। প্রথম যৌবনে চাকরি জুটিয়েছিল বেসরকারি ব্যাঙ্কে। রিমা মেয়েটার সাথে ব্যাঙ্কিং সেক্টরেই আলাপ। ও খাওয়া-পরার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে শৌনক ঝাড়া হাত-পা হয়েছে। মেলা-মোচ্ছবে ঘুরে বেড়িয়ে সে নাকি গান সংগ্রহ করে। নিজে চমৎকার গায়৷ দোতারায় সুর তুলতেও শিখেছে ইদানিং।

তাও শৌনককে কোনো অনির্দিষ্ট কারণে ভালো লাগে না তিথির। রিমার নৈস্তব্ধ্য তিথির মনে থমথমে সব আশঙ্কা আনে। সুহৃদের সাথে শৌনকের মেলামেশা পছন্দ করে না সে খুব একটা৷ সে জানে, সুহৃদ যখন-তখন টাকা ধার দেয় শৌনককে, ফেরত পাওয়া যাবে না জেনেই৷ বাউলসঙ্গ, বোহেমিয়ানপনা, গান-সব নিয়ে এই বাল্যবন্ধু বেশ সমীহের পাত্র সুহৃদের চোখে। শৌনক যা পারে, সুহৃদ তা পারতে চায়। চাকরি ছেড়ে দিতে চায়, ঘুরে বেড়াতে যায় হেথায়-হোথায়, গান গাইতে চায়।

এখন জয়েন্ট বানাচ্ছে রোগা, ক্ষয়াটে চেহারার
শৌনক, একটা গাছের তলায় বাবু হয়ে বসে। । সুহৃদ হাঁটু মুড়ে জুলুজুলু চোখে দেখছে শৌনকের দক্ষ কারিগরি। ক্রাশারে গাঁজা পিষে ফেলা, সিগারেটের খোলস খালি করা, গাঁজা-সিগারেটের তামাক মেশানো, পুরে ফেলা আবার কাগজে। সুহৃদকে শৌনকের সাথে ছেড়ে যেতে তিথির ঈষৎ দ্বিধা জাগে । তবু সে রিমাকে নিয়ে মরা নদের দিকে এগোয়।

খাবারের দোকানগুলো আস্তে আস্তে জেগে উঠছে। গতসন্ধ্যার জিবেগজার উপর মাছি বসছে আজ। নারকেল-খোলের ফুটো দিয়ে নক্সা কেটে পড়ছে জিলিপির ব্যাটার৷ তিথির ছায়ার মতো হাঁটছে রিমা। দোকানের সারির মাঝ দিয়ে সরু পথ একদিকে এঁকেবেঁকে চলে গেছে মন্দিরের পানে। অপরদিকে সেই পথই মিশেছে নদীতটে ।

স্নানপর্ব শুরু হয়েছে তখন। পুণ্যার্থী মানুষ আঁজলা ভরে জল নিয়ে মাথায় দিচ্ছে। গামছা পরে ডুব দিচ্ছে কোমরজলে৷ খালি গা, মাথায় চূড়া বাঁধা একজন লোককে ঘিরে কিছু ভিড়। কিছু ক্যামেরার ঝলকানি, কিছু আগ্রহী চোখমুখ৷ সে লোকের চোখে-মুখে পরম প্রশান্তি।

-আমাদের ধর্মে ভাবের কারবার নাই গো! অনুমান নাই। সবই বর্তমান। এই দেহ বর্তমান৷ ওই তোমাদের ঠাকুর হল অনুমান৷ লালন কয়েছেন-’মাটির ঢিবি কাঠের ছবি/ভূত ভবে সব দেবাদেবী/ ভোলে না সে এসব রূপি/ ও সে মানুষ রতন চেনে।’
গুবগুবি কথা বলে ওঠে৷

শহুরে মানুষ এবার দেহসাধনা নিয়ে আদেখলামি প্রশ্ন শুরু করে। সাধক মিটিমিটি হেসে গুহ্যসাধনার কারিকুরি গোপন করে। কথার ছলে ভোলায়

-সাধনার কোনো নির্দিষ্ট সময় আছে?
-রাত্রিকালে শ্বাসের কাজ ভালো হয়।
-যুগলে ছাড়া সাধনা হয়?
-মেয়ে ছাড়া কী সাধনা হয় গো? ওরা হল গে রাধারূপী৷ হ্লাদিনী শক্তি। ওদের চরণ ধরেই তো মোক্ষলাভ।

আবার একতারায় আঙুল সুর তোলে। ‘সাধন করো রে মন/ ধরো মেয়ের চরণ…’

-বুইলেন কিনা! পাঞ্জু শাহ বলছেন- ‘পাঞ্জু ধরবি যদি -গুরুর চরণ/মেয়ের চরণ আগে ধর রে!’

-‘শহরে ষোলোজনা বোম্বেটে’ কারা?
-ছয় রিপু আর দশ ইন্দ্রিয় এজ্ঞে!
-দশ ইন্দ্রিয়?পাঁচ না?
-না। আমাদের শাস্ত্র মতে দশ। সেই ছজনাকে বশ করার, সেই দশজনকে দাবিয়ে রাখার জন্যি তো সাধনা গো!
-কীভাবে হয় এই সাধনা?
-আমি যতবার মরতে যাই, ও আমারে বাঁচায়। সেই যে লালনের গানে আছে- ‘আবার চন্ডীদাস মরিয়া গেলে/রজকীনি বাঁচায় তারে!’
-কীভাবে?
-আগে স্থূল ও প্রবর্ত স্তরে গুরু ধরে শিক্ষে-দীক্ষে৷ দেহ-মন সাধনার জন্য প্রস্তুত করতে হয় গো! তারপর আসে সাধক স্তর। সে তো নারী বিহনে সম্ভব নয়। রিপুর রাজা হল কাম৷ দেহসাধনায় কামের ঊর্ধ্বে উঠতে হয় প্রেমে। রমণ হবে, কিন্তু স্খলন হবে না। বিন্দুকে স্থির করে পতনবিমুখ করতে হবে। সে যাবে ঊর্ধ্বমুখী৷
-সে কী করে সম্ভব?

-শ্বাসের কাজ জানলে সম্ভব। যোগাভ্যাসে সম্ভব। আর সহায় নারী। তেমন তেমন মতির নারী খুঁজি পেলে তোমার মোক্ষ হবেই। সেই কষ্টিপাথরে যাচাই হয়েই তো সিদ্ধিলাভ৷

তিথির কেমন অস্বস্তি হয় এত অনুসন্ধিৎসায়। যেন খড়খড়ি ফাঁক করে অপরের শয়নকক্ষে উঁকি মারা! বাউল বলছেন দেহকে ধরে দেহাতীতে পৌঁছনর কথা। কামসহ ছয় রিপু জয় করার কথা৷ কিন্তু ওরা কি তাই চাইছে? নাকি চাইছে কোনো অতিলৌকিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যৌনতায় বৈচিত্র‍্য আনতে?

বাউলের সঙ্গিনী বসে আছে তাঁর পাশটি ঘেঁষে। পরনে সাদা শাড়ি৷ কপালে খড়িমাটির টিপ। এলো চুল পিঠ জুড়ে। এই নারীই তবে বাউলের পারানির কড়ি! এর চরণ ধরেই মুক্তি! তিথির মুগ্ধ চোখে তাকায়। আর কোনো ধর্ম নারীর এত কদর করেছে?
বাউলানি তার দিকে চেয়েই মিটিমিটি হাসছে।
-কোত্থেকে আসা হচ্ছে?কলকাতা?
-হ্যাঁ।
-কখন এলেন? সেবাশান্তি করেচেন?
-এইমাত্র এলুম।
-থাকা হবে কোতায়?

ভাববাচ্যে আন্তরিকতার ঘাটতি নেই।

-কোথাও না৷ সারারাত গান শুনে চলে যাব৷ আপনার নাম?
-সারদা।
-নিবাস?
- তেহট্ট।
-আচ্ছা এই যে সব শ্বাসের কাজটাজ, আপনি পারেন? মেয়েরা পারে?
-আমাদের কিছু শিখতে হয়৷ রেচক, পূরক...এই সব। পুরুষদের সাহায্য করার তরে৷
-আর মোক্ষ? সিদ্ধিলাভ? মেয়েদের হয়?

সারদা থমকায়।
-বাউলের সেবাতেই বাউলানির মোক্ষ, মা।

বাউলানি বাউলের চূড়া খুলে দ্যায়। ‘প্যারাসুট’-এর বোতল উপুড় করে দীর্ঘ কেশে নারকোল তেল লেপে মাসাজ করতে থাকে। তারপর তাঁর কপালে খড়িমাটি দিয়ে টিপ আঁকে যত্নভরে।


সন্ধে

শৌনকের সঙ্গে মনোমোহন গোঁসাই-এর জমে গেছে। শৌনক দোতারায় টুংটাং শব্দ তুলছে। গোঁসাই মাথা নেড়ে নেড়ে বলছেন,
-হবে৷ তোমার হবে। লেগে থাকো।

ওরা বসেছে তাঁবুর অস্থায়ী আখড়ার পিছনে। টিন দিয়ে ঘেরা খড়ের চালের অস্থায়ী এক ঘরে৷ গাঁজা কুচছে বাউলের শিষ্য । মঞ্চে গান গাইছে মহিলা বাউলেরা। এরা ঝাঁক বেঁধে বসেন আখড়ার এক কোণে। দু-একজন ব্যতিক্রম আছেন, তা বাদে বাউলানিদের গানের তেমন কদর নেই। রাত বাড়লে মঞ্চে উঠবেন নামজাদা বাউল সব৷

শৌনক তার জেলা-জেলান্তর পরিক্রমার গল্প শোনাচ্ছে নাগাড়ে। মস্তিষ্কের কোষে কোষে নেশা চারিয়ে গেলে সে বড় বেশি বকে। শৌনকের বর্ণনায় সতীর্থদের খুঁজে পেয়ে বাউল উৎফুল্ল। সুহৃদ চোখে বিস্ময় আর মুগ্ধতা নিয়ে মন দিয়ে শুনছে ৷ তাদের ডিসেম্বরের অফিস গেট্টুগেদারে একটা ‘ফাংশান ’ করিয়ে দেওয়া গেছে এইমাত্র। সাধকের চোখে আলো জ্বলতে দ্যাখে তিথি ফাংশানের কথায় । রিমা এক ছিলিমের পর আরও নিঃঝুম। এরকম সময়ে আবার বেরসিকের মতো সেই প্রশ্নটাই করে তিথি,

-সাধনায় মেয়েদের মোক্ষলাভ হয়?
-ওদের আবার মোক্ষ কী? ওরা হল সাধন-পাত্র। ওরা এমনিতেই নমস্য।
-না তাহলে আপনাকে সঙ্গ দিয়ে ওঁর কী লাভ?

শৌনক ও মননোহন উভয়েই বিরক্তি নিয়ে তাকান তিথির দিকে। মনমোহনের চোখে ক্রোধের মতো কিছু একটা দ্যাখে তিথি৷ তা কী করে সম্ভব? এতদিনের সাধনার পর… চোখের আগুন ধীরে নিবে আসে। গলায় মধু ঢেলে বাউল বলেন,

-বই-এ সব লেকা নেই গো মা। তোমাদের বই-এ যা কিচু লেকা, তা আমাদের সাধনের সাথে মেলেনা। লালন সাঁই কয়েছেন-’ব্যাদে কি তার মর্ম জানে?’
বই মগজকে এঁদো করে দেয়। আলাদা করে মেয়ের মুক্তি আবার কী? এক মুক্তিতেই উভয়ের মোক্ষ। জয়রাধে!

-আচ্ছা ধরা যাক উনি যদি অসুস্থ হয়ে পড়েন কখনো, আর সাধনায় সঙ্গ না দিতে পারেন?
-পারবে গো!
-আচ্ছা, রজঃকালে যদি ইচ্ছে না করে?
-সে কি কথা! ওটাই তো সময়! ওই সময়েই ফল পাওয়া যায় তো! সাধুরা বলেছেঃ ‘ঋতুমতী বিলাস সতী দুই এক হবে/ তাহলে নায়ক রতি ঊর্ধ্বে চালাইবে।’

দরজা ক্যাঁচকোঁচ কান্নায় খুলে যায়। সারদা প্রবেশ করে৷ থালার উপর মাটির খুরিতে চা সাজানো। চা রাখে হ্যাজাকবাতি ঘিরে বসা সকলের সামনে। তারপর দরজার কাছেই বসে।

গোঁসাই বলেন,
-এ খেপি আমার কাছে আছে বারো বছর বয়স থেকে। ওকে নিজের মতো গড়ে পিটে নিচি৷

তিথি কাশির শব্দ শুনে বোঝে, রিমার গলায় ধোঁয়া আটকেছে।

তিথি জিজ্ঞেস করে সারদাকে,
-ততদিন থেকে সাদা কাপড় পরছ?
-হ্যাঁ। ছোটবেলায় মা-গোঁসাই রঙিন কাপড় পরালে গোঁসাই রাগ করত৷ থুতু ছিটিয়ে দিত মুখে। গোঁসাই-এর খুব রাগ৷

সারদা প্রশ্রয়ের হাসি হাসে। তিথি ভাবে-কেমন রাগ? যেমনটা জ্বলে উঠতে দেখল চোখে?

সারদার কাছ ঘেঁষে বসে সে।
ফিসফিসিয়ে জানতে চায়
-তোমার ভালো লাগে?
-কী?
-সাধনা?
-ও তো গুরুর দেখানো পথ।

কপালে হাত ঠেকায় সারদা।
বলে- আমার খ্যাপা ভালো। বদরাগী। কিন্তু আমাকে নিয়েই আছে। অনেক বাউল আছে, এ লাইনে আসেই ‘ওই’ কারণে৷ সাধনাটা ছুতো মাত্র। নিত্যনতুন সঙ্গী চাই তাদের। তারা কলঙ্ক৷
-তাই নাকি?
-হ্যাঁ গো।

-আচ্ছা,যদি ধরো তোমার মাসিক বন্ধ হয়ে যায়? যখন যাবে? সাধনা যদি তখনও না ফুরোয়? ওই দিনগুলোতেই তো নাকি মোক্ষলাভ হয়?

- তাহলে অন্য কাউকে আনতি হবে হয়ত। তাকে হয়ত আমিই শিকিয়ে পড়িয়ে নেব। আমি আখড়ায় থাকব। গোঁসাই ভালো লোক৷ তাড়ায়ে দেবে না।

এই বলে সারদা উঠে যায়। যে খাটিয়ায় বসে আছে রিমা পা গুটিয়ে, তার তলা থেকে প্রদীপ, সলতে, কাঁসার থালা বের করে। ফস করে দেশলাই জ্বলে ওঠে। প্রদীপ জ্বালিয়ে মনমোহনের সামনে তিনবার ঘোরায় সারদা। গলায় আঁচল দিয়ে সাষ্টাঙে প্রণাম করে মনমোহনকে৷ অতঃপর জিভ দিয়ে তার দু’পায়ের বুড়ো আঙুলের ডগা স্পর্শ করে সে। আরতি সম্পন্ন হয়৷ মনমোহন আশীর্বাদের ভঙ্গি করেন।


রাত

আসর জমে উঠেছে। তিথি আর রিমা গিয়ে বসেছে বাউলানিদের মাঝে। এরা অলৌকিক গল্পকথায় ব্যস্ত। কোনো সাধু নাকি একটানা আটঘণ্টা বিন্দু ঊর্ধ্বগতি করে রতিক্রিয়া করেছেন! সকলে শ্রদ্ধায় বিস্ময়ে বিমোহিত। এঁদের ঘিরে ভিড় নেই। হুড়োহুড়ি কম।
কিছু সাধক নিজেদের মতো জটলা করে বসেছেন আরেক কোণে। চোখের জলে ভাসছেন। ওদের ঘিরেও ফাংশানওয়ালাদের ভিড় নেই। এদের হট্টগোল, মেলা,ফাংশান ধরার প্রতিযোগিতা, বিদেশের ডাক খুব স্পর্শ করে বলে মনে হয় না।

মনমোহন গাইতে উঠেছেন৷ ‘সময় গেলে সাধন হবে না/দিনের থাকিতে তিনের করণ…’

সারদা কী ভাবছে? সময় চলে যাচ্ছে কি? সত্যি কি অন্য কাউকে শিখিয়ে পড়িয়ে নিতে হবে? যেমন করে শিখিয়ে পড়িয়ে নেওয়া হয়েছিল তাকে? সারদার ঈর্ষা জাগে অদেখা সেই প্রতিদ্বন্দ্বীর প্রতি। গোঁসাই বলেছে, আটচল্লিশ বছর সাধনায় সিদ্ধি হয়। সবে বত্তিরিশ হল। আরও ষোলো বছর শরীরে জোয়ার ভাটা চলবে? গোঁসাই-এর থেকে সে বয়সে অনেক ছোট। কিন্তু ওরা দমের কাজ পারে। ওরা পারে পৌরুষ ধরে রাখতে। সে মেয়েমানুষ মাত্র। ছারাব বন্ধ হওয়া ঠেকানোর কোনো ব্যায়াম তার জানা নেই। তেমন কিছু শেখানো হয়নি৷ রেচক, পূরক শিখতে হয় খানিক-পুরুষেরই স্খলন আটকাতে। তার বেশি কী বা জানে সে? ছোটবেলায় বাবামা মারা গেল। পিসি তাকে দিল গোঁসাই-এর হাতে। ভাইটা এদিক ওদিক ঘুরে ঘুরে লাথি-ঝাঁটা খেয়ে বড় হয়ে গেল। একরকম অভ্যাসের বশেই সারদা রাঁধে বাড়ে, সেবা করে, সাধনা করে। আখড়ায় এখন তার মা-গোঁসাই বলে মান্যিগণ্যি। শিষ্যরা ভক্তি করে। হঠাৎ মাথাটা হালকা লাগে তার । ছোটবেলার নিরাপত্তাহীনতা ফিরে আসে অনেকদিন পর।

বাইরে হট্টগোল শোনা গেল৷ সারদা ভ্রু কুঁচকায়। বেরিয়ে আসে। তাকে অনুসরণ করে রিমা, তিথি, আফ্রোজা, শ্যামাদাসী, আরো কেউ কেউ। শ্যামাদাসী বলে, সদানন্দ মেয়েটাকে আবার ধরেচে ! আচ্ছা ঠ্যাঁটা মেয়েমানুষ!

সারদা বলে, দ্যাখো কাণ্ড! জোর খাটিয়ে সাধনায় কি আর মুক্তি আছে!

তিথির হাত সেই সময়ে খামচে ধরে রিমা। রিমার চোখে আর শূন্যদৃষ্টি নেই। সেখানে মূক পশুর যন্ত্রণা আর ভয় একসঙ্গে দেখতে পায় তিথি। রিমা কেঁদে ওঠে। যে কান্নার অপেক্ষায় তিথি ছিল অনেকদিন ধরে।
-শৌনক আমার হাত মুচড়ে দিয়েছিল। টাকা দিতে চাইনি সেদিন।

তিথি রিমার কাঁধ জড়িয়ে ধরে। পুরুষকণ্ঠে গালিগালাজ শোনা যায় অদূরে । সেই টিনের বেড়ার ঘর, তার পাশে অশ্বত্থ গাছ। দুই ছায়ামূর্তি দেখা যায় সেখানে। পুরুষটিকে চিনতে পারে তিথি। সদানন্দ একটু আগেই গুবগুবি বাজিয়ে গান শুনিয়েছে মঞ্চে। এখন বাঘের মতো গর্জন করছে এক মেয়ের সামনে।

-গান গাইবে না, খাবে না, সাধনা করবে না! করবেটা কী!

জানা গেল, এ মেয়ে সদানন্দের আশ্রমে নতুন আমদানি৷ তাকে গড়েপিটে নিতে ভারি বেগ পেতে হচ্ছে গোঁসাইকে। মেয়ে পাষাণসমা। নিস্তব্ধতাই একমাত্র ভাষা হলে বাচিক তড়পানি নিষ্ফল আক্রোশে মাথা ঠোকে। কাম, ক্রোধ মিলেমিশে সাধক এখন মানুষের সমতলে নেমেছেন। পাষাণের বদলে সাধনার অহঙ্কার টুকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে।

সারদা এগিয়ে গিয়ে মেয়েটার মাথায় হাত বুলোয়। প্রবোধ দেয়। যেভাবে তাকে প্রবোধ দিয়েছিল কেউ। নিজের ঋতু বন্ধ হলে, যেভাবে সে প্রবোধ দেবে হয়ত আবার কাউকে। সারদা মেয়েটিকে টিনের বেড়ার ঘরে নিয়ে যায়৷

রাত এখন গভীর৷ মনমোহন শেষ গান ধরেছেন।

‘দিল দরিয়ার মাঝে দেখলাম আজব কারখানা,
দেহের মাঝে বাড়ি আছে
সেই বাড়িতে চোর ঢুকেছে
ছয় জনাতে সিঁদ কাটিছে,
চুরি করে একজনা।’

তিথির ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ফুটেছে, রিমা লাইটারের আলোয় দ্যাখে। আর তিথি দ্যাখে, কুড়ি-তিরিশ বছরের সাধনার পরও ফাংশানের কাড়াকাড়ি৷ অসহিষ্ণুতা। ক্রোধ। কাম। তাঁবুতে গিজগিজ করছে ‘বোম্বেটে'।

তাঁবুর বাইরে রিমা আর তিথি গাছের তলায় বসেছে পাশাপাশি৷ পা দোলাচ্ছে রিমা। শেষ ওকে এভাবে পা দোলাতে দেখেছে তিথি, একদম প্রথম আলাপের দিন। লেকের ধারে বসে পা দোলাচ্ছিল শৌনকের হাত জড়িয়ে। তারপর ও শিফট করে শৌনকের সাথে। হাত মুচড়ে দেওয়া হলে বুকও মুচড়ে ওঠে। বা স্বরনালী। কথা বন্ধ হয়ে যেতে পারে কখনো কখনো সাময়িক ভাবে বা চিরকালের জন্য৷

তিথিকে কাউন্টার দিয়ে রিমা জিজ্ঞেস করে,

-মাসখানেক তোর বাড়িতে গিয়ে ওঠা যায় ? সুহৃদ কিছু মনে করবে?
-হ্যাঁ,ওঠা যায়৷ ওটা আমাদের দুজনের বাড়ি।
-আমি একমাসে ভাড়াবাড়ি জুটিয়ে নেব। শৌনকের ওই বাড়ির ভাড়া আমিই দিতাম।
-বেশ।
তারপর ফিল্টার পায়ে চেপে উঠে পড়ে ওরা৷

===========================================




কৌশিক দত্ত
(শতাব্দী দাশের গল্পের অনুসারী কবিতা)

(১)
পূর্ণমাসী চান্দ্রভাষী অষ্টকোঠা নওদুয়ারী কায়া
ছয় কুমীরে দশ মোড়লে জলগেরামে জাল ফেলেছে মায়া।
ভিজতে এসে ডুবেই গেল সূর্য স্বয়ং, এমনি সাগর খেলা
ডুব সাঁতারে মুক্তো পাবি
তুই ডুবুরি?
সমর্থ দম?
চিনিস বায়ু? চক্রপাকে
দোদুল নাগর বিভ্রমে শ্রম উথালপাতাল ঘূর্ণি নাগরদোলা?
কালনাগিনী ঘুমায় যেমন আড়াই প্যাঁচে বৃক্ষমূলে
আগুন দিলে শীত সরে যায়,
বসন্ত তার বিষছোবলে শীর্ষে ওঠে শিরশিরিয়ে
হুহু বাতাস ওড়ায় বসন
পাক খুলে যায়! উন্মাদিনী!
চিতায় নাচে অনন্ত রাত। একতারা নয় দোতারাতে
কে ছুঁবি তার বৃন্তযুগল?
কে ছোঁয় বৃতি, মুক্ত দল আর গর্ভকেশর? কে দেয় মধু
পুষ্পরাগে? সুর যোগিয়া, পদ্মফুলে
তাথৈ নাচে। ঘোর ত্রিযামা।
ভোরাই দেখে কুসুম আলোয়
যুগল মূরত বিলীয়মান।

পাগলী নদী। অতন্দ্র রাত। সঙ্গমে তার সাগর খুঁজে পাওয়া।


(২)
জনম জাঙ্গল পথে জঙ্গম জঘন-যানে জপমাল্য সুপ্তি-সুতো ছিঁড়ে
গুপ্তিপাড়ার গলি সকর্মক চিনে নেয়। শান্তিপুর কয় ক্রোশ দূর?
শরীর শরীরে যায়, ললনা লালনে পায় লালসার অন্ত, মোহলীনা
আগুনে শরীর দিল, যেন সে বারুদ জীব, অলাতচক্র কামনার।
কে বিষ? কে ঔষধি? যে বিষ, সে ঔষধই, গুহ্যমন্ত্রে গূঢ়তত্ত্ব এই।
মাত্রাভেদে জন্মমৃত্যু, গুপীযন্ত্রে চুপিসারে গুপ্ত বীজ উপ্ত হয়, আর
রমণী সুবর্ণরেখা, ভ্রূমধ্যে ত্রাটক টিপ...
... যোনিমুদ্রা অন্তরীক্ষচারী।

(৩)
রমলা আগুন ছুঁড়ে দেয়। নিবু নিবু অগ্নিকণা পিষে মারে পায়ের তলায়।
কী যেন বিষের খোঁজে শরীরে থরথর নিয়ে ঘর থুয়ে এতটা এসেছে,
সামান্য সিগারেটে ওইটুকু নিকোটিন!
আগুন, সে এত ক্ষীণ, দাবানলে ছড়িয়ে পড়ে না।
কোথাও খাণ্ডবপ্রস্থে দুর্দান্ত লেলিহান! জ্বালাময়ী সে খবর পেয়ে
রোমকূপ সিক্ত হয়, শিরায় চিৎকার জাগে, কাওয়ালির মতো আর্তনাদে...
রমলা পায়ের চাপে থেঁৎলে দেয় ব্যর্থতার শেষ প্রাণ আবর্জনাটুকু।

পৃথুল বান্ধবদেহ মনে পড়ে। উদ্গার। দ্বিতীয় সিগার, সেও ম্লান
কোথাও প্রস্তর নেই। তাম্রযুগের পরে আছে শুধু মুদ্রা আর ধূম।
মেয়েটি গহীনে যায়। তরলে গরল খোঁজে।
নদী দেয় কৃষ্ণসার দেহ, যুবকের। খাণ্ডবের।
দুচোখে গাণ্ডীব জ্বেলে মেয়েটি অরণ্যচারী। কোনো পাখি পালাতে না পারে!
......................................................