ওথেলো সিনড্রোম

অশোক কর ও মোস্তফা অভি

অশোক কর

ওথেলো সিনড্রোম: ১

আলোয় নিজেকে খুঁজে নেব তাই
চন্দ্রমুগ্ধ জলজ্যোৎস্নায় আমাদের প্রতিকৃতিগুলো
প্রাচীন নিস্পৃহতা নিয়ে পাথরপ্রতিম!
জলে কম্পমান প্রতিচ্ছবির আড়ালে অনুকম্পানুব্জ
আমরা লুকাতে চাইছি বর্বর ছায়াকে, আদিম হিংস্রতা-,
যদি পাই জল-প্রতিবিম্বে
হারিয়ে যাওয়া সরল মানবিক প্রতিকৃতি!

ওথেলো সিনড্রোম: ২

পোড়া মেঘেরা দেখ পালাচ্ছে আকাশজুড়ে
ডানা পোড়া পাখিরা কেমন ঝরে পড়ছে
পোড়া পাতাদের মত
ঘাসেদের পুড়ে যাওয়া আরো কষ্টের
ভিতরটাও পুড়ে যায় অবলীলায়
কি সে অদ্ভুত আগুন
গ্রাস করে ভিতর, গ্রাস করে বাহির!

কি সে অদ্ভুত আগুন পোড়াচ্ছে সব কিছু
যে আগুনে পুড়বার দুরন্ত সাধ!
নিজেকে পোড়াবার আগে একবার
দেখে নাও কি অদ্ভুত আগুন
পোড়াবে তোমাকে-,
আমাকেও!

ওথেলো সিনড্রোম: ৩

ভেজা বালিতে পা ফেলে নেমে যাও লোভের গভীরে
আমার ঈর্ষান্ধ জলছাপ জমে থাকে সেই পদচিহ্নে!

ঘুমের ভিতরেও উগড়ে দিই ঘৃণা
কি অনায়াশে তা গলাধঃকরণ করে নাও
নিপুন দক্ষ তুমি প্রতারণা খেলায়-

ঘৃণা ছুঁড়ে অপেক্ষায় থাকি
এবার ঘুম নামবে চোখজুড়ে...

ততক্ষণে কালো মাকড়সা লম্বা পা’য়ে পা’য়ে নেমে
লালসা জড়ানো তোমার মুখ আর চোখের কোনে কোনে
জমানো বিষ ঢেলে রেখে আসে

মৈথুনশয্যায় প্রেমিক
তোমার হিমায়িত নীলমুখ দেখে শিউরে ওঠে
আর আমার হিংসার চাবুক
ওর দিকেও আছড়ে পড়ে ক্রমাগত
কালো মাকড়সা লম্বা পা’য়ে পা’য়ে নেমে আসে!

ওথেলো সিনড্রোম: ৪

পোড়া ছাড়খাড় স্বপ্নসাধ খুঁজে তুলে নিলাম
আমার ফিনিক্স: আধপোড়া সেই আদীম রিপু-;
হিংস্রতা মিশিয়ে ঘষেমেজ তীক্ষ্ণধার স্টিলেটো
সযত্নে ভরে রেখেছি ছুরির খাপে!

এখন প্রতিদিনের নির্জনতায় সযত্নে
তীক্ষ্ণ ধারালো স্টিলেটো নেড়েচেড়ে দেখি-
কিভাবে ও ঝলকে উঠবে আমার প্রতিহিংসা আগুনে।

তোমাদের ছুঁড়ে দেয়া অবজ্ঞা, কুৎসা, সর্বগ্রাসী লোভ,
কুৎসিত রিপুতাড়না, সবকিছু-; সবকিছুর বিনিময়ে
ঝলসে উঠুক প্রতিহিংসা, আমার ফিনিক্স,
ধারালো আমার স্টিলেটো!

ওথেলো সিনড্রোম: ৫

বাতাসে অদ্ভুত গন্ধ মিশে আছে-;
জীবন ছিঁড়েখুঁড়ে একাকার, আর্তচিৎকার
আর কর্পোরেট লাবণ্যপ্রভা
প্রচ্ছন্ন একাকার বাতাসে, জীবনের গন্ধ এভাবেই
অর্ন্তগত কুয়াশায়-, সর্পিল গন্তব্যপথ আর
নিয়তি পরম্পরায়
প্রস্তরিভূত থাকে বানিজ্যনীতির ভাজেভাজে!
সেই রহস্যভেদের দুঃসাহস নিয়ে তুমি-, আমি আর
আত্মপরিজন-, বধ্যভুমিতে ফেলে এসেছি নিজেদের পরিচয়

এভাবেই নামপরিচয়হীন মানুষ সংখ্যায় বাড়ে
আর হারায় সবকিছু-;
ক্ষমতা আর বৈভবের কাছে
সম্মান, স্বাতন্ত্র, মৌলিক অধিকার;
বাঁচি শুধু সার্বভৌম নৈরাজ্য সাথে করে!

=====================================================

মোস্তফা অভি

মাটির ফুল

আজ তিনটে বছর জেলখানার অন্ধকার কোটরে জীবন মৃত্যুর অনিশ্চয়তার দোলাচলে বেঁচে আছি কিন্তু জেসিকে এক মুহূর্তের জন্য ভুলিনি। সে আমার আঁধার ঘরের আলো, আমার জীবনের অনুপ্রেরণা। জেলখানার বদ্ধ ঘরে সবকিছু সহ্য করে একটা আশায় বেঁচে আছি জেসি একদিন এসে সত্যিটা বলবে। দিন ফুরায়ে যায়, বছর ঘুরে আবার নতুন বছর আসে কিন্তু আমার জীবন মরণের সিদ্ধান্তের কোনো সুরহা হয় না। তিন তিনটে বছরে সে একবারও আমাকে দেখতে আসেনি। আমি বুকে পাথর চাপা দিয়ে রেখেছি, আমি অপেক্ষা করেছি। মোটেও রাগ করিনি তার ওপর। আমি বিশ্বাস করি যেদিন ফাঁসির মঞ্চে আমাকে নিয়ে যাওয়া হবে সে মুহূর্তে জেসি এসে বলবে, আমরা সে রাতে একসেঙ্গে ছিলাম, বৃদ্ধ কৃষককে ও খুন করেনি।
আমি জেসমিনের কথা বলছি। জেসির পুরো নাম জেসমিন। এই গাঁয়ের তালুকদার পরিবারের আদরের ছোট মেয়েটি শহরে পড়তে গিয়ে একদিন জেসি হয়ে গেল। আমার জানা নেই এই নাম তাকে কে দিয়েছিল কিংবা কে প্রথম ডেকেছিল তাকে এই নামে।তবে, পৃথিবীর সমস্ত আদর সঞ্চয় করে জেসমিনকে আমিও জেসি বলেই ডাকতাম। তাকে আমার মত করে আর কে ভালো ডাকতে পারে!
জনশ্রুতি আছে, প্রেম নাকি অন্ধ। জেসি আমাকে ছেড়ে চলে গেছে সেই কবে, তবুও তাকে ভালোবাসি। দিনে মেঘহীন স্বচ্ছ আর উজ্জ্বল আকাশের দিকে এই ভেবে এখনো চেয়ে থাকি, ওই আকাশ জেসির মৃদুহাসি দেখতে পায়।হয়ত আর দেখা হবে না তার সাথে, হয়ত আবার হবে! একথা সত্য যে তার জন্য আমার অপেক্ষা জীবনের চরম দুরাশা। তবু আমার ভালোবাসা বেঁচে থাকবে কাল নিরবধি।
জেসির সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিল এক স্নিগ্ধ সকালে। সূর্যের আলোয় ঝিকমিক করা ভোরের শিশিরমাখা ফুলের মতোই তাকে প্রথম দেখেছিলাম।তার কোমল বাহু, সুডৌল কুমারী বুক ছিল অদ্ভুত সুন্দর! সেই শৈশব থেকে গ্রাম থেকে শহরের কত মেয়েমানুষ দেখেছি কিন্তু এমন অদ্ভূত জাদুমাখা রূপের মেয়ে দ্বিতীয়টি আর চোখে পড়েনি। সে অনেকদিন পর গ্রামে এসেছিল, আবার চলেও গিয়েছে একদিন। কিন্তু আমি চারপাশে তাকিয়ে দেখতাম তার আলোয় জ্যোতিময় হয়ে উঠেছে আমাদের গ্রামের পথ-ঘাট।আকাশ, বৃক্ষ-তরুলতা শুধু হাসছিল তার হাসির সাথে তাল মিলিয়ে।আমি শুধুই ভাবতাম, প্রকৃতি তার অদৃশ্য শক্তি মানুষকে দেখানোর জন্য হয়ত জেসিকে সৃষ্টি করেছে।সেই সৃষ্টির সমস্ত রহস্য ছিন্ন করা আমার পক্ষে ছিল দুঃসাধ্য।
দীন দরিদ্র পিতার ঘরে জন্ম আমার। গ্রামের নিস্ফলা জমিতে ফসল ফলিয়ে আমাদের জীবন পার। দিনের অর্ধেকটা সময় কেটে যায় কাজের আয়োজন করতে। আধুনিক যন্ত্রপাতি নেই, কয়েকটা হালের বলদ আর কয়েক টুকরা জমি আমাদের মহামূল্যবান সম্পদ। জীবনের সাথে সংগ্রাম করে বাঁচা আমাদের নিত্য অভ্যাস। অল্পতেই তুষ্ট হই আমরা, খুব বেশি চাওয়া থাকেনা। খাওয়া-দাওয়ার আয়েশ নেই তবু আমরা শান্তিতে ঘুমিয়ে রাত পার করি। কিন্তু এই দীন দরিদ্র পাড়ায় জেসি এসেছিল সুখের জোয়ার নিয়ে। সে গ্রামের সবাইকে বানিয়েছিল পরমাআত্মীয়।মিষ্টি করে হেসে কথা বলত সবার সঙ্গে। গাঁয়ের কিশোরী মেয়েটির বিয়েতে বাঁধা দিয়ে পরিবারকে বুঝিয়ে বলেছিল ভবিষ্যতের কথা।পুরো গ্রাম যখন তার রূপের সাথে গুনের প্রশংসায় পঞ্চমুখ তখন এক সকালে, যখন গাছ-পালার আড়ালে র্সূয উঠেছিল তখন তার সঙ্গে আমার প্রথম সাক্ষাত হয়েছিল।
আমাদের বাড়ি থেকে তালুকদার বাড়ি খুব বেশি দূরে নয়। ফাল্গুন চৈত্র মাসে একটা বিল পেরিয়ে সে বাড়ির মাটির সীমানা বেড়ি। দুচার গাঁয়ের মোড়ল তারা।তাদের পূর্বপুরুষ ছিল জমিদার। দুপুরের পর দেখা যেত শহর থেকে আনা দামীদামী কাপড় সেই সীমানা বেড়ির ওপর দড়ির সাথে ঝুলছে। বাতাসে ফরফর করে উড়ছে বাহারি রঙিন শাড়ি। শাড়িগুলো সুশ্রী ফরসা রমণীরা নিয়ে যেত গোধূলি বেলায়। যেন ওটা স্বর্গগ্রাম। মাঝেমাঝে শেষ বিকেলে বেড়ির ওপর গাছের নিবিড় ছায়ায় দাঁড়াত তালুকদার বাড়ির সদ্য কিশোরী কিংবা যুবতীরা। দীর্ঘ বিলের দিকে তাকিয়ে তারা খিলখিলিয়ে হাসত আর সেই হাসির লহরী বাতাসের সাথে দোল খেয়ে খেয়ে আসত আমাদের কানে। বিলের মাঝে হঠাৎ খেলা থামিয়ে আমারা মুক হয়ে সেদিকে চেয়ে থাকতাম।
দুকিলোমিটার দূরের সাধারণ বাড়ির মানুষজন তো দূরে থাক তাদের পোষা গাইয়ের রং আমাদের অজনা নয় কিন্তু তালুকদার বাড়ি ছিল আমাদের জন্য রহস্য। সে বাড়ির মেয়ে শহরে গিয়ে যেমন নামটা পরিবর্তন করে এসেছে তেমনি বদলেছে বাড়ির সাধারণ নিয়ম কানুন। জেসি পাড়ার প্রতিটি বাড়ি গিয়ে নিজের পরিচয় দিয়ে সবার সঙ্গে হেসে হেসে কথা বলে। ষাটোর্ধ জয়গুন বিবির সাথে আলাপ জমায় আর বিকেলে নদীর ধারে দাঁড়িয়ে কাঁপাকাঁপা র্সূ্য দেখে।
কখনো ভোলা যায় সেই ঘটনা! জেসি একদিন সকালে রাস্তায় আমাকে থামিয়ে বলল, খুব একটা উপকার করতে হয় যে।
কি? আমি প্রশ্ন করলাম।
কতগুলি কাগজ হাতে দিয়ে বলল, শহরে গিয়ে ইন্টারনেটের দোকান থেকে এগুলি ডাউনলোড করে প্রিন্ট আনতে হবে। জেসি বসন্তের প্রাণবায়ু। তার হাসি প্রকৃতিকে জীবন দেয় অথচ আমি হিম হয়ে তার সামনে দাঁড়িয়ে রইলাম। বলে রাখা ভালো, জেসি ঢাকার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইঞ্জিনিয়রিংয়ে পড়ত।সেই থেকে আমাদের কথা বলা শুরু। সপ্তাহে দুএকবার জেসির জন্য যেতে হত গ্রাম থেকে তিন কিলোমিটার দূরে। জেলা শহর পটুয়াখালী। অবশ্য সেখানকার কলেজেই আমি অনার্স পড়তাম। এরমধ্যে তারসাথে আমার ফোনে টুকটাক কথা হতে লাগল।
অনার্সে আমার বিষয় ইতিহাস। চাকুরির বাজারে ইতিহাস পড়ে আদৌ কিছু হবে কি না জানিনা। তবে ইতিহাস পড়ে আমার ভেতর তৈরি হয়েছে আরেকজন আমি। সাধারণ মফস্বলের ছেলে হয়ে প্রাচ্য-পাশ্চাত্যের ইতিহাস পড়া আমার জন্য মন্দ নয়। সাথে যুগযুগ আগের ঘটনা আমার ভেতর তৈরি করেছে নতুন বোধ । ভেতরের আমি বাইরের আমির সাথে গল্প করি, তর্ক করি, আবার কতশত জ্ঞানগর্বের কথা বলি। ভেতরের আমিকে জেসির কাছে তুলে ধরলাম। সে আমি যথেষ্ট বাকপটু, বিশ্বব্রমাণ্ডের কতকিছুই তো সে জানে। শেষের কবিতা উপন্যাসে ইংরেজ কবি ডান এর লেখা দুছত্র, Please hold your tongue and late me love বলে বিশ্ব সাহিত্যের দুচরণ।আবার লাইনদুটির রবীন্দ্রনাথের করা অনুবাদ ঠিকঠাক সময়মত ছুড়ে দিতে জানে। দোহাই তোদের একটুকু চুপ কর, ভালোবাসিবারে দে আমায় অবসর। নজরুল জয়ন্তীতে পত্রিকার সাহিত্য পাতার আগাগোড়া পড়ে যে অভিজ্ঞতাটুকু হয়েছে, আমার ভেতরের মানুষটি তারসাথে রংচং মিশিয়ে কাল্পনিক গল্প ফেঁদে রসিয়ে ভালোই বলতে পারে।জীবনানন্দের শুধুমাত্র একটি কবিতা হাজার বছর ধরে-ই তার সম্বল। সেই সাথে আরব্য, পারস্যের সূচনালগ্নের ইতিহাস, ভারতেবর্ষে মুসলমানের আগমন এবং ইতিহাসের মহান মহান বীরদের কয়েকজনের নাম সময় বুঝে মেরে দিলে জেসি আর যায় কোথায়। জেসির ধারণা, আমার জ্ঞানের কাছে তার ইঞ্জিনিয়রিংয়ের জ্ঞান শুধুমাত্র সীমাবদ্ধই নয়, একেবারে নস্যি। এসব নতুন নতুন কথা শুনতেই জেসি একরাতে ফোন করেছিল।
সে রাতে ফোনে কথা বলতে বিছানা ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে এলাম। উন্মুক্ত আকাশে অসংখ্য তারার ঝিকিমিকি। যেন শান্তির ঐকতান চরাচরে। মনে হল, নিস্তব্ধ প্রকৃতিতে জেগে থাকা আমাদের দুজনকে তারা আহ্বান জানাচ্ছে। সমস্ত বিদ্বেষ, ক্রোধ, ঘৃণা দূর করে আমরা আকাশের মত বিশাল মন নিয়ে সে মুহূর্তে মানুষের কাতারে দাঁড়িয়েছিলাম। মনে হল, এই সুন্দর প্রকৃতির নির্জন পথে দাঁড়িয়ে যদি পাশাপাশি দুজন কথা বলতে পারতাম! কিন্তু প্রকৃতি সবকিছু অত সহজ করে হাতের নাগালে দিয়ে দেয় না।
আমার জীবনের সমস্ত পথ রুদ্ধ হয়ে একটি পথের বাঁকে এসে আটকে গেল। আমার বিশ্রাম, আমার কল্পনা, আমার পৃথিবী জেসি দখল করল। তবে, আমি পাথরের সাথে হৃদয় বেঁধেছিলাম। রাতের আকাশে তাকিয়ে দেখতাম অদ্ভুত পাথুরে চাঁদ, দিনের আকাশে রৌদ্রের তেজ দেখে হোহো করে হাসতাম। ভেতরের আমিকে বলতাম রহো বৎস। কিন্তু একদিন জেসি আমার সবকিছু ওলট পালট করে দিল।
একদিন পড়ন্ত বিকেলে সে আমার মুখোমুখি দাঁড়াল। কি এক উৎসাহে জ্বলজ্বল করে ওঠল তার দুটি চোখ। চোখদুটিতে রাজ্যের হাসি। আমাকে বলল, তোমাকে ছাড়া আমি থাকতে পারি না।সেটা কি তুমি জানো গর্দভ ছেলে?
আমি বললাম, না।
তার অভিমানি মুখের ওপর চিকচিক করে উঠল শেষ বিকেলের নরম আলো। কি অদ্ভুত মায়া সে মুখে! একবার তাকালেই প্রেমে পড়তে ইচ্ছে করে। আমার পাথর মনে কে যেন জল ঢেলে দিল। বিষাদের রেখা দেখা দিল পশ্চিমের লালচে আকাশে। আমি কয়েকবার পলক ফেললাম, নড়েচড়ে দাঁড়ালাম। সত্যটা উপলব্ধি করলাম মুহূর্তেই। জেসির প্রেমে পড়া শুধু মুর্খতা-ই নয় আমার মত রায়তের ছেলের জন্য বাহূল্য বটে। জেসির গালদুটো টকটকে লাল হয়ে উঠল। আমার দিকে স্বপ্নালু দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, আমাকে নিয়ে ভেবেছ কিছু? তখন আমি নির্বিকার। মনের ভেতর আকাশ পাতাল ভাবছি।নিজেকে সংযত করার চেষ্টা করে বললাম, নিজেকেই ভেবে কুল কিণারা করতে পারিনা। আবার তোমাকে! জেসির লজ্জাবনত মুখটা কেমন বেজার হয়ে গেল, মাথাটা নিচু করে হনহন করে চলে গেল সেদিন। সে রাতে পাথরের চাঁদ গলে সহস্র আলো নেমেছিল নিস্তব্ধ চরাচরে। সে আলোয় ডুবে গেল ঘুমন্ত পৃথিবী। জেগে থাকা আমি একটি মানুষ, সে আলোয় গা ডুবিয়ে স্নান করেছিলাম।
তারপর অনেকদিন পার হয়ে গেল জেসির সঙ্গে আমার দেখা নেই। ফোন করলেও সে তোলে না। কি এক অজানা আশংকা আমার ওপর ভর করল। আমি ভাবছি জেসির কোনো বিপদ হল কি না। তালুকদার বাড়ি আমাদের কাছে আজন্মের রহস্য। সেই কবেকার আমালে দেশ ভাগের আগে থেকে তারা জমিদার। আমাদের পূর্বপুরুষ তাদের রায়ত এবং প্রজা। আমাদের বাপ দাদারা তাদের থেকে জমি নিয়ে চাষাবাদ করত এবং বছর শেষে খাজনা দিত কাছারিতে। যেতে আসতে বুড়ো জমিদারকে দিতে হত মস্ত সেলাম। আমি শুনেছি, আমার পূর্বপুরুষের জমানো টাকা দিয়ে স্থায়ী জমি নেওয়ার সামর্থ ছিল না। একটাকা সেলামির বিনিময়ে দেশ ভাগের পরে জমিদার আমাদের কবুলিয়াত দিয়েছিলেন এক বিঘা জমি। সেই থেকে আমরা, আমাদের পূর্বপুরুষ স্বীকার করেছিলাম তালুকদারদের রায়তি। তাদের ঐতিহ্য এখনও সেই আগের মতই। গাঁয়ের সমস্ত মানুষকে তারা মনে করে সাধারণ প্রজা। কারো সাথে তাদের সহবাস্থান নেই। শহরে বাসাবাড়ি করে বসবাস করে, ছেলেমেয়েদের পড়তে পাঠায় ঢাকা এবং পশ্চিমের দেশে। কোনো বিচার সালিশের প্রয়োজন না পড়লে গাঁয়ের মানুষ তালুকদার বাড়ি সাধারণত যাতায়াত করে না। যদিও বা কেউ যায় কিন্তু প্রতিবেশির মত আচরণ পায় না।
আজ এত বছর পরে তালুকদারদের বোধে নতুন করে কী বাসা বাঁধল কে জানে! ঢাকা থেকে বরিশাল হয়ে যে মস্ত সড়কটা চলে গেছে সমুদ্রসৈকত কুয়াকাটায়, সেই রাস্তার দুধারের সমস্ত ফসলি জমি তারা ফেরত চায়। ডালবুগঞ্জ হয়েছে দেশের তৃতীয় বৃহত সমুদ্রবন্দর। তীরের ফলার মতন সোজা হয়ে ঢাকা থেকে দক্ষিণে আসছে রেল লাইন। দেশ বিদেশের সাথে ব্যবসা বাণিজ্যের সমুহ সম্ভাবনা দেখে রাস্তার দুধারে তালুকদাররা মিল কারখানা গড়তে চায়। গ্রামে কেমন অস্থির ভাব, চারপাশে সাধারণ কৃষকদের হাহুতাশ। আব্বা একদিন প্রতিবেশি সবাইকে জড়ো করে বললেন, যদি তোমরা সহজে নেতিয়ে পড় তাহলে তালুকদাররা তোমাদের থেকে জমি কেড়ে নেবে। বিনিময়ে কি দেবে আমার জানা নেই। ছোটখাট বৃদ্ধ হাড় জিরজিরে কৃষকের সাথে সবাই মাথা ঝাকাল। কিছুক্ষণ থেমে আব্বা আবার বলতে লাগলেন, জমিদারগণ সাধারণ প্রজাদের চিরকাল কর খাজনার বোঝা চাপিয়েছে কিন্তু প্রজাদের কখনো কিছু দেয়নি। কিন্তু আমাদের এই মাটিতেই জন্ম, এখানেই যে আমাদের পিতামাতা, পূর্বপুরুষ নিঃশ্বাস ফেলেছেন তাতে তাদের কিছু যায় আসে না। তোমরা তাদের দুরভিসন্ধিগুলো জানো না! তারা নিজেদের চাহিদামাফিক জিনিষটা ইংরেজদের থেকেও শক্ত করে কামড়ে ধরে। একবার, শুধু একবার যদি এরা আমাদের পেয়ে বসে, আমাদের প্রিয় ফসলি জমি, যা আমাদের এতকাল খাইয়ে পরিয়ে বাঁচিয়ে রেখেছে তা চিরকালের জন্য হারাবে। আমরা স্ত্রী পরিজন নিয়ে রাস্তায় দাঁড়াব, আমরা পথের ভিখারী হব। তালুকদাররা আমাদের আজন্ম শোষণ করেছে, তারা আবার আমাদের শরীরে হিংস্র নঁখের থাবা বসাতে চায়। আমাদের মিলেমিশে তাদের রুখতে হবে।
এক রবিবার চুপিচুপি গেলাম তালুকদার বাড়ি । বাড়িটা অন্যবাড়ির তুলনায় একটু উঁচু, ঘনো পত্রপল্লবে মর্মরিত উঁচু উঁচু গাছপালায় ঘেরা। বাড়ির সামনে ফুলের বাগান। ঝলাসানো রোদে খা-খা করছে উঠোনবাড়ি। কিন্তু যার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছি আমার ভাবনাগুলো তাকে ছেড়ে চলে গেছে অনেক দূরে। নওশাদ তালুকদার দেখলে কতকিছু প্রশ্ন করে বসবে সেসব ভাবছি তখন। আমার ভাবনা অবান্তর নয়, তালুকদার কোন ফাঁকে, কখন আমাকে দেখেছে জানিনা। শুধু পেছন থেকে ভারী কণ্ঠের আওয়াজ শুনলাম, এই কেরে...? চোরের মত জড়োসড়ো হয়ে মাথাটা ঘুরালাম। দেখলাম, উঠানের এক কোণে দাঁড়িয়ে আছে জেসি। পরনে সুতির শাড়ী। তার নমনীয় তন্বী দেহে ওই শাড়ী এত সুন্দর দেখাচ্ছিল চোখ ফেরাতে পারছিনা। পিঠ থেকে চুলগুলো গুছিয়ে একপাশের বুকে ছেড়ে দিয়ে ভেতরে যেতে অনুরোধ করল। কিন্তু নওশাদ তালুকদারের চোখে হিংসার ক্রোধ, যেন আমার স্পর্শে অশুচি হয়েছে তার পুরো উঠোন। জেসি অনেক বারণ করল কিন্তু নওশাদ তালুকদার আমার বাবার সেইদিনের কৃষকদের সাথে পরামর্শের কথা তুলল। আমাকে, আমার পরিবার তুলে অনেক গালাগাল দিল। জেসির দিকে বিস্ফোরিত চোখে তাকিয়ে বলল, জানিস, ওর বাবা গ্রামের কৃষকদের নিয়ে আমাকে খুন করার পরিকল্পনা করে। তারা মিটিং করে যখন রাত আঁধার হয় আবার দিনে দল মিলিয়ে শহরে ছোটে। বিকেল হলে উকিল পাড়ায় মামলার ফন্দি করে।
জেসি আমার দিকে কেমন দৃষ্টিতে যেন তাকাল, আমার কথা মোটেও শুনল না। আমার সবচেয়ে কষ্ট লাগল এই ভেবে যে জেসিও হয়ত আমাদের ভুল বুঝে আছে। আমার বুকের জমিন কেঁপে উঠল, আমি কেমন করে অত্যাচারির হৃদয়ে সাড়া জাগাব যদি জেসমিন, আমার জেসি আমার হৃদয়ের কথা না শোনে, যদি না বোঝে আমার ছলছলে চোখের ভাষা।
আমি নীরবে তালুকদার বাড়ি থেকে চলে এলাম।এত ঘৃণা, এত অপমানে মোটেও রাগ হলনা আমার। শুধু ভাবলাম, কি করে উঁচু নীচু তফাত ঘোচানো যায়। আমি হাঁটছি আর টপটপ করে গড়িয়ে পড়ছে ফোটা ফোটা চোখের জল। গ্রামবাসীদের আবার জড়ো করলাম। আব্বার সেদিনের কথায় তারা সবাই উত্তেজিত। কৃষকদের কথাবার্তায় ধ্বনিত হচ্ছে অসীম ঘৃণা। সেই ঘৃণায় তাদের চোখমুখে আগুন জ্বলছে। আমি সবাইকে ঘৃণা, ক্রোধ জলে ভাসিয়ে শান্তির আহ্বান জানালাম। আমি বললাম,- প্রিয় মুরুব্বিসকল, আমি আপনাদের চোখে দেখতে পাচ্ছি ক্রোধ এবং হিংসার আগুন । আমাদের হিংসার পথ ছাড়তে হবে। আপনারা যাকে শত্রু মনে করেন তার কথাও র্ধৈয সহকারে শোনা উচিৎ। ঘৃণা, রাগ আর বিদ্বেষের পথ আমাদের মত মাটির মানুষের জন্য নয়। আমাদের পূর্বপুরুষেরা আমাদের মানুষের সঙ্গে মানুষের ভালোবাসা শিখিয়েছেন। মানুষ হয়ে মানুষের রক্ত নিয়ে খেলা, স্বজাতির রক্তপাত ঘটানো আমাদের ধর্মের বিরোধী। আমরা মানুষ, আমাদের র্ধৈয ধরতে শিখতে হবে। আমাদের ক্রোধ সংবরণ করতে হবে। র্ধৈয, মানবতা, প্রেম ইত্যাদি দিয়ে সমাজে আমরা শান্তি প্রতিষ্ঠা করব।
দুঃসহ নিস্তব্ধতায়, বিস্ময়ভরা দৃষ্টিতে তারা আমার দিকে তাকিয়ে রইল। আমি তাদের যেতে বললাম, নীরবে পেছন ফিরে আমার দিকে তাকাতে তাকাতে সবাই চলে গেল। আমি একা নির্জন পৃথিবীর এককোণে ওই বিশাল আকাশের দিকে তাকিয়ে রইলাম।
সেদিনের রাত নেমেছিল সুখদুঃখের মিশ্রণে এক কঠিন সত্য নিয়ে। যা আমার ভাবনায় অবান্তর ছিল। কৃষ্ণপক্ষের চতুর্থী তিথি। সন্ধ্যায় চাঁদ ছিলনা আকাশে। অথচ, জেসি ফোন করে জানাল, আজ রাতে সে দেখা করবে আমার সঙ্গে। কিছুতেই বারণ শুনল না আমার। সে বুঝাতে চাইল, আমার অপমান তার খুব লেগেছে। একেতো গ্রামের শান্তিপূর্ণ জীবন নষ্ট হয়ে গেছে। সর্বত্রই যেন একটা আলোড়ন। সন্ধ্যার আঁধারে কৃষকরা দলবেঁধে রাস্তায়, বিলের মাঝে গোল হয়ে বসে। আলোচনা আরম্ভ হয় নওশাদ তালুকদারের সম্পর্কে, রেল লাইনের ভালোমন্দ এবং কোথায় কোথায় গড়ে উঠবে কলকারখানা সেসব কথা। এ অবস্থায় কোথাও জেসির সঙ্গে দেখা করা নিরাপদ নয় কিন্তু কিছুতেই সে আমার মানা শুনল না।
রাতের আধাঁর গাঢ় হয়ে নেমে এল পৃথিবীর বুকে। অন্ধকারে নুয়ে নুয়ে পা চালাচ্ছি বিলের ভেতর। দোল খাওয়া দখিনা বাতাস ফুরফুরিয়ে লাগছে শরীরে। লোকালয় থেকে অনেক দূরে, ঠিক বড় বিলের মাঝখানটায় গিয়ে দাঁড়ালাম। শুকনো খটখটে একটা সরু খাল, পাড়ের আলের ওপর দাঁড়িয়ে তাকিয়ে আছি সেই দিকে যেদিক থেকে জেসির পায়ের আওয়াজ পাওয়া যাবে। এখানেই তার আসার কথা। তখন সারা গ্রামটা আরো বেশি গভীর নিস্তব্ধতায় ডুবে গেছে। উৎকণ্ঠায় গলা শুকিয়ে যেতে লাগল আমার। মাথার উপর অসীম আকাশ, বিস্তৃত বিল, গড়িয়ে গড়িয়ে ছুটে চলা হিমেল হাওয়া। এমন পরিবেশে অন্ধকারে জ্বলে জ্বলে উঠল জেসির পুতির ওড়না। সে আমার মুখোমুখী হল, আরো কাছাকাছি এল এবং দিনের ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করল। জেসির চুলের মিষ্টি ঘ্রাণ আমাকে বিভোর করে তুলল, প্রিয় কেশ এত সুঘ্র হয় কে জানত আগে! প্রতিটি নিশ্বাসে মিষ্টি গন্ধ বুকের গভীরে সেঁধে যায়। মাঝে মাঝে বাতাসের ঝাপটায় চারপাশ সুবাসিত হয়ে ওঠে। জেসি অনেক বোঝাল আমায়, কৃষকদের বিদ্রোহের পথ থেকে সরে আসতে বলল আমাকে। এই প্রথম আমার হতখানা তার উষ্ণ, নরম দুটি হাতে চেপে ধরল। আমার বুকের সঙ্গে মাথাটা মিশিয়ে কোমল কণ্ঠে বলল, ভালোবাসিরে খুব। এই আকাশ, এই আঁধার সাক্ষী হয়ে রইল, যেখানেই যাই তোমাকে সঙ্গে করে নিয়ে যাব। তখন কাস্তের মত বাঁকা চাঁদ উঠেছে আকাশে। ক্ষীণ চাঁদোয়ায় আমার চারপাশের আঁধার কেটে গেছে। কোমল-করুণ একটা অনুভূতিতে ভরে উঠল মন। অনেক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুধু জেসির দিকে তাকিয়ে রইলাম।
তখন দূরে দুএকজন কৃষকের গলার আওয়াজ শোনা গেল। তারপর চেঁচামেচি, কয়েকটি অস্পষ্ট শব্দ। কে যেন চিৎকার করে উঠল গগণ বিদীর্ণ করে। তারপর সব চুপচাপ। জেসি ধীরে ধীরে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। আমি তার চলে যাওয়ার পথের দিকে নীরব চেয়ে রইলাম। তখন চারপাশ থেকে পঙ্গপালের মত একদল লোক আমাকে ঘিরে দাঁড়াল। চিনতে অসুবিধা হয় না এরা জমিদারের পোষা কুকুর। আমাকে এমনভাবে জাপটে ধরল, মোটেও শ্বাস ফেলতে পারছিলাম না। পাঁজা করে আমাকে নিয়ে গেল লোকালয়ের কাছে। পরের প্রভাত থেকে আজ অবধি অন্ধকার জেলখানায় শুধু অপেক্ষা করছি জেসির জন্য। আমি জানি সে আসবে। আমি মোটেও রাগ করিনি তার ওপর। বিশ্বাস আমাকে সহযোগিতা করেছে। একদিন আদালতে দাঁড়িয়ে সে বলবে, যে বৃদ্ধকৃষকের হত্যার দায় আমার ওপর চাপানো হয়েছে সেটা মিথ্যা। সেদিন রাতে আমি তার সঙ্গে ছিলাম।