নগ্নতাপুরাণ

কাজল সেন ও অমর্ত্য মুখোপাধ্যায়

কাজল সেন

নগ্ন হও নারী

নারী তুমি নগ্ন হও
নগ্ন হও নারী
আমার নগ্ন দেহে সযত্নে রাখো
তোমার দেহবল্লরী

দারুণ নিদাঘ জুড়ে আসুক না বৈশাখীঝড়
অবহেলে উড়ে যাক যাবতীয় লজ্জাবহর
যোনিতে যোজন কর লিঙ্গের দার্ঢ্য কথন
নিভৃতে সৃজিত হোক আশাবরি সৌম্যসৃজন


নগ্নতার স্বপক্ষে

নগ্নতার আলোচনায় খুব স্বাভাবিক ভাবেই উঠে আসে
মা কালীর নগ্নতার কথা
কেন তিনি নগ্ন কতটা জরুরী এই নগ্নতা
নগ্নতার স্বপক্ষে আমি অবশ্য ভাবি
আমার মায়ের নগ্নতার কথাও
এ এক আশ্চর্য খেলা মাগো আমার
তুমি নগ্ন হয়েই গর্ভে ধারণ করেছ আমায়
প্রসব করেছ আমায় নগ্ন হয়েই
আমাকে এই পৃথিবীর হাতে সমর্পণ করেছ নগ্ন করেই
এখন বলো কার সাধ্য সেই নগ্নতাকে আবৃত করে তুচ্ছ আচ্ছাদনে

আমিও তো তাই নগ্ন প্রকৃতির আকাশে বাতাসে
মেলেছি আমার নগ্ন উল্লাস
কাম্য নারীর নগ্ন যোনিতে করেছি বীর্য নিকেশ
নগ্ন নারীকে উত্তোরিত করেছি নগ্ন মাতৃত্বে

আমি নগ্নতার স্বপক্ষে
মাতৃযোনি থেকে জন্ম আমার
আর তাই জন্মসূত্রে পেয়েছি মাতৃযোনির দর্শনাধিকার


নগ্নতাপুরাণ

মাতৃযোনি দর্শনে হয়েছে আমার পুণ্যলাভ
তার গভীরে অন্বেষণ করেছি আমি
আদিমতম প্রাণের জন্মলগ্ন ও ইতিহাস

অনেক সহস্রাব্দ পেরিয়ে আমি দেখেছি প্রথম পরাগসংযোগ
শুনেছি প্রথম অঙ্কুরিত ভ্রূণের চিৎকৃত উল্লাসধ্বনি
গর্ভের গহ্বরে পড়েছি সংরক্ষিত অন্ধকারের গূঢ় পান্ডুলিপি

আমাকে বোলো না কেউ কামরাগে সংযত হতে
যেখানে রয়েছে আজও যতটুকু কামনার উৎসমুখ
খুলে দিতে চাই আমি আমার অদম্য যৌনসংরাবে

আমি পুরুষ আমার লিঙ্গ থেকে উৎসারিত অমৃতসর
তুমি নারী তোমার যোনির গভীরে তার নিভৃত আসর


=================================================

অমর্ত্য মুখোপাধ্যায়

কামে নাই কাম অথবা কাজে নয় কাম

(১)

বাড়ির পাশের অথবা পাশের বাড়ির মিস্টি ছোট্ট মেয়েটির (এখন বিদেশপ্রবাসিনী) বাংলাদেশের সঙ্গে পারিবারিক যোগ ছিল। কেউ রাস্তায় যেতে দেখে বাড়িতে ডাকলেই বলতো, ‘কাম আসে(আছে)’। তাতে অনেকেই অন্যায়ভাবে হাসতেন। অনেক দিন পর্যন্ত এর কারণ বুঝতে পারেনি মেয়েটি। আসলে এঁরা হাসতেন কেন? কাম শব্দটিই অনেকের মনে যে এই সঙ্গমেচ্ছার ছবি তুলে ধরে তার একটা কারণ হলো অনেকেরই কাজকাম নাই! অথচ দর্শন থেকে কাব্যাবধি এই কামাতুরতার বিরুদ্ধে কি কম লেখা হলো। যাঁরা ধর্মদর্শন থেকে ষড়্‌রিপুর একটি হিসেবে কামের পক্ষ বা বিপক্ষ সমর্থন করেন তাঁরা ভাবেন হরিচরণের ভাষায় ‘কামাদি ছয় দৈহিক শত্রু’-র কথা। কাম এক প্রবৃত্তি যার নিবৃত্তি নেই। শাস্ত্রের বচন হলো 'ন যাতু কামঃ কামাণামুপভোগেন শাম্যতি।/ হবিষা কৃষ্ণবর্ত্ম ইব ভূয়া ইবভিবর্ধতে'। অথচ কাম সভ্যতার শত্রু, কেবল আমাদের দেহের নয়। আর সেটা অনেক অর্থে। প্রথমতঃ সৃষ্টির শুরু থেকে মানুষ যে ক্রমাগতঃ ‘সভ্য’ হয়ে উঠেছে, তার একটা অর্থ সে অনেক কম দৈহিক আর অনেক বেশি মাননিক হয়ে উঠছে, ইংরেজিতে এর যে প্রতিশব্দ, ‘psychic’ সেই অর্থে কেবল নয়, ‘ascetic’ অর্থেও। কাজল সেন তাঁর প্রথম ‘নগ্ন হও নারী’ কবিতায় বেশ লিখে দিলেন, ‘যোনিতে যোজন কর লিঙ্গের দার্ঢ্য কথন’, আর তার থেকে ‘আশাবরী সৌম্যসৃজন’-এর আশার কথা। কিন্তু তাতে করে’ মেয়েটির আশা পুরবে? সে তো ভাবতে থাকতেই পারে এই দার্ঢ্য যথেষ্ট কিনা, ভায়াগ্রার নায়াগ্রা স্রোত এর মধ্যে আছে বা থাকবে কিনা। তার অবস্থা তো সেই মেডিক্যাল ছাত্রী নির্মলার মত হতে পারে। ডাক্তার-শিক্ষক তাকে প্রশ্ন করলেন— মানুষের কোন প্রত্যঙ্গ উত্তেজনায় দশগুণ বাড়ে? মুখ লাল করে নির্মলা বললো তাকে যেন এইসব ‘অসভ্য প্রশ্ন না করা হয়’। বিরক্ত অধ্যাপক তাকে বললেন — উত্তরটা চোখের মণি হবে, আর নির্মলা, ভবিষ্যদ্বাণী করছি তুমি বিবাহিত জীবনে অসুখী হবে।

অন্যভাবে বলি! বাথরুম গ্রাফিটির থেকে কিশোরীদের লিঙ্গোৎসুকতারএকইমেজSim one de Beauvoir তাঁর The Second Sex গ্রন্থে তুলে ধরেছিলেন — ‘What is love’s highest aim?/ Four buttocks on a stem’ — অর্থাৎএকটিডান্ডায়গাঁ থাচারপিসপাছা।তাকেStephen Spender তুলে আনলেন Erotic Poetry নামের William Cole কর্তৃক সম্পাদিত সঙ্কলনের ভূমিকায়, বোঝাতে যে সত্যিকার কামকবিতা হলো ‘as rare as truly religious poems’। তার মধ্যে কমিক সম্ভাবনা খুঁজে পাবে না ascetic মানুষ? সেই কতকাল আগে Lord Chesterfield বলে গেলেন, ‘Sex: the pleasure is momentary, the position ridiculous, and the expense damnable’, আর তার বেশ কিছু পরে, প্রভাবিত হয়ে কিনা জানিনা, রমেন্দ্রকুমার আচার্যচৌধুরী লিখে গেলেন-

একরাশ নিজস্বতা ; তাকেও জারিত করে রাত্রির আরক :
বৌ পাশে নিয়ে শুলে বাচস্পতি–সেও বিদূষক। (রাত্রির আরক)

তারও পরে কবিতা পড়বে মানুষ, দর্শন পড়বে, একই সঙ্গে বড় বুটি/ফুটকিওয়ালা রেডগার্ড আর ম্যাগনাম সাইজের হুইস্পারের খাঁজে উঁকি মারবে? তার মনে পড়বে না পরশুরামের ‘নির্মোক নৃত্য’ গল্পের মহর্ষি কুচুকের কথা, যিনি অপ্সরার চামড়া ভেদ করে ভিতরের মাংস, হাড়, শিরা-ধমনী পেরিয়ে আরো কিছু দেখতে চেয়েছিলেন? নারীকে এইভাবে দেখে কামের মাথায় বাড়ি মারতে হবে না?

কেউ এই শুনে বলবেন যৌনতা যদি লিঙ্গযোনি থেকে মাথায় উঠে যায় তবে বিপদ আরো বেশি; আওড়াবেন D. H. Lawrence-এর Ben Hecht-এর FantaziusMallare: A Mysterious Oath বইয়ের ভূমিকায় বলা ওই সাংঘাতিক কথা যে ‘The tragedy is when you have got sex into the head instead of down where it belongs’, অথবা Apropos of Lady Chatterley’s Lover গ্রন্থে তাঁর কথা যে ‘Fucking has got into our heads’। কিন্তু মাথা থেকেই তো তাড়াতে হবে কামকে। বাংলা প্রবাদ বলে ‘শিরে হইলে সর্পাঘাত তাগা বাঁধব কোথা’। তাগা বাঁধতে হবে নাগা সন্ন্যাসীদের মতো নয়!

(২)

আগেই বলেছি কাম সভ্যতার শত্রু, কেবল আমাদের বা আমাদের দেহের নয়। কেন সেটা একটু বোঝানো যাক। কাজল সেন তাঁর দ্বিতীয় কবিতা নগ্নতাপুরাণ-এ লিখলেন —

মাতৃযোনি দর্শনে হয়েছে আমার পুণ্যলাভ
তার গভীরে অন্বেষণ করেছি আমি
আদিমতম প্রাণের জন্মলগ্ন ও ইতিহাস

কিন্তু ‘আদিমতম প্রাণের জন্মলগ্ন ও ইতিহাস’ যাই হোক না কেন, তার ভবিষ্যৎপাল্টে গেছে। ইতিমধ্যেই জনভারে, প্রাণভারে কাতর বসুন্ধরা একা পাঁচ ধরণীর ভার বইছে। আগে কামবিরোধী শাস্ত্রের যে বিধান ছিল, ‘পুত্রার্থে ক্রিয়তে ভার্যা’, তারও দরকার নেই! তার কারণ কেবল জনভার নয়। আসলে জন্মের জন্যে সঙ্গমেরই আর দরকার নেই। নলজাতকের এক পদ্ধতি ‘in vitro fertilization’ ইতিমধ্যেই পাল্টাচ্ছে, ডাক্তার সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের বদৌলতে। কিন্তু সেদিন আসছে যখন সন্তানের ‘পিতামাতা’ তাঁদের বাচ্চা যাতে মারাত্মক জেনেটিক রোগের খপ্পরে না পড়ে তা নিশ্চিত করতে in vitro fertilization-এর মাধ্যমে প্রাণবানায়িত ডিমটির (fertilized egg) DNA পরীক্ষা করে নেবেন, আর কেবল একটি ডিমের স্থলে পাঁচটি ডিম তা দিইয়ে নেবেন, চারপাচঁটি গোলমেলে ডিমের মধ্যে একটি ঠিক আছে কিনা দেখে নিতে। এই in vitro নির্বাচন পদ্ধতি স্বীকৃত হয়ে গেলে গোলমেলে ডিমের mutation-এর বিপদ এড়াতে সমস্যাকীর্ণ (problematic) জিনটিকে, অর্থাৎ‘defective mitochondrial DNA’-টিকে বাদ দিয়ে দেবেন। এর জন্যে পিতামাতার বাইরেও যাওয়া যাবে। গোলমেলে mitochondrial DNA যখন মারাত্মক জিনসম্ভূত রোগের বিপদ তৈরি করবে তখন তাকে অতিক্রম করা যায় ত্রিজনক শিশুর (three parent baby) সমাধানের মাধ্যমে। সেখানে বাচ্চার nuclear DNA তার বাবামার কাছ থেকে আসে/আসবে। কিন্তু mitochondrial DNA আসবে অন্য কারুর থেকে। আরে হবে না মশাই, হয়ে গেছে! আমেরিকার পশ্চিম ব্লুমফিল্ডের মিচিগানে Sharon Saarinen ২০০০ সালে Alana নামের যে শিশুর জন্ম দিয়েছেন তার nuclear DNA এসেছে মা শ্যারন আর বাবা পলের কাছ থেকে, কিন্তু mitochondrial DNA এসেছে অনামা অন্য কারুর কাছ থেকে। আর পরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই পরীক্ষা নিষিদ্ধ করে দিলেও ২০১৫ সালে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট এর অনুমতি দিয়েছে। কিন্তু এবার যদি এই in vitro নির্বাচন পদ্ধতি কেবল চারপাঁচটি ডিম ফাটানোর কাজে না লাগিয়ে লাখলাখ কোটিকোটি ডিম ফাটানোর কাজে লাগানো হয়, আর যদি এই ডিমের DNA-র শুদ্ধিকরণের যে গবেষণা চলছে সেটা ফলবতী হয়? তাহলে কোনো ফরেন DNA, মানে আমিআরসখা-র মধ্যে এক তৃতীয় পক্ষ সে-কে আনার দরকার কী? কেবল জেনেটিক কোডটিকে পুনর্লিখন করে মারাত্মক রকমের জিনগুলিকে তাদের সদাশয় (benign) চেহারায় নিয়ে গেলেই চলবে। কোটিঅরবখরবনীলপদ্মশঙ্ খগুলশান শিশু আনা যাবে। এর পরে কামের দরকার আছে? কল্পকথা নয়! Yuval Noah Harari-র Homo Deus: A Brief History of Tomorrow (London: Vintage, 2016), পৃঃ ৬০-৬৩ আর তার তথ্যসূত্র দেখুন!

বুদ্ধ বলেছিলেন অজ্ঞতাই আমাদের জন্মমৃত্যুবন্ধনদাসত্ বের কারণ। অজ্ঞতার উৎসজন্মবা‘জাতি’ থেকে, জাতি ‘ভাব’ বা হওয়ার ইচ্ছা থেকে, সেখান থেকে ভাবচক্রের আর দ্বাদশ নিধানের বাকি দশ। কামের মাধ্যমে আমরা আর কেন এই জনভারপীড়িত ধরণীতে মানুষের ভাবের আশ্রয় হবো? বুদ্ধ অবিদ্যা থেকে আসা পুনর্জন্মের দ্বার বন্ধ করতে চেয়েছিলেন। সেই দ্বার যোনিদ্বারে শিশ্নগমন, যার মূলে কাম!

(৩)

এর খেই ধরেই চলে আসি মাতৃযোনি প্রসঙ্গে শিবারুঢ় কালীয় নগ্নতার কথা। এই নগ্নতা কামঞ্জয়। ভারতীয় সেনার সামনে আফস্পার বিরুদ্ধে সংগ্রামরত মিজো মহিলাদের উদ্ঘাটিত জননেন্দ্রিয়ের নগ্নতার মতো। সবাই জানি তন্ত্রসাহিত্য আর বৌদ্ধধর্মের পরস্পর সংযোগের কথা। প্রথম যৌবনে বৃহৎকৈলাসতন্ত্র নামে একটি বই পড়েছিলাম। তাতে একটি শ্লোকে বলা ছিল—

মাতৃযোনৌ ক্ষিপেল্লিঙ্গং ভগিন্যাঃ স্তনমর্দ্দনঃ।
গুরুমূর্ধ্ণি পদং দত্বা পুনর্জন্মঃ ন বিদ্যতে।

এই শ্লোকের বাহ্যিক কামোদ্দীপক অর্থ বাদ দিয়ে যেটা বুঝতে হবে তা হোলো মাতৃযোনি অর্থাৎগৌরীপট্টেশিবলি ঙ্গস্থাপনকরে’ ভগিনী অর্থাৎ ভগ-রগুণবিশিষ্টবিল্বপ ্রমর্দনকরে’ সিদ্ধাসনে আসীন হয়ে নিজের লিঙ্গ পা দিয়ে চেপে কুহুনাড়ী আকর্ষণ করে' প্রস্টেটগ্রন্থিকে নিয়ন্ত্রণ করো! কাম ত্যাগ করো।