আলাপ

চিত্রালী ভট্টাচার্য ও নীতা বিশ্বাস

চিত্রালী ভট্টাচার্য

আলাপ

হঠাৎ গোধূলি লগ্নে এসে দাঁড়ালেন তিনি
মাথায় মুকুট নেই তবু দেখি ত্রিভঙ্গমুরারি
কথায় কথায় আচ্ছন্ন করে, কেড়ে নিলেন
মন্ত্রপূতঃ বাঁশি। বললেন – বাজাই?
সুর ধরলেন সপ্তমে, মিয়াঁ –কি –মল্লার ।
আমি তখন---- আ--- মি তখন দিশেহারা
খড়কুটো আঁকড়ে ধরি বাঁচার চেষ্টায়
বোধবুদ্ধি বানের জলে, পাপপুণ্য সব একাকার।


বিস্তার

স্পর্শ যেন পাগলপারা , কথামালা অনুপ্রাসে ভারী
যতবার চোখাচোখি ততবারই সর্বনাশে পাড়ি
বসন্ত বিলাপে ঠাসা, আকন্ঠ বিষিয়েছে বায়ু
কী বলি তোমায় বন্ধু, পুংলিঙ্গে নিমজ্জিত আয়ু
ক্ষণস্থায়ী তবু সে ভীষণ, ফনাধারী শঙ্খচূড়ামণি
প্রত্যাখ্যান? কারসাধ্য! আমি তো সামান্যই জানি
ফেলছে ভাঙ্গছে সব যত তার প্রাণে ছিল খুশি
আমিও পুতুল যেন, পাঞ্জাবীতে বাধ্য মুখ ঘষি।


সমাপ্তি

যেদিন ভাঙ্গল খেলা সেদিনও পড়ন্ত বিকেল
দূর্বাশার অভিশাপ এবারের মত হল শেষ।
ভঙ্গুর ঘরের পথে যেতে যেতে ফিরে ফিরে চাই
কি যে ছিল, কি যে নেই, আজ আর ঠিক মনে নেই।
ভ্রান্তি ছিল ? প্রেম? নাকি ছিল শুধুই শরীর !
যাই থাক ,ছিল সে প্রবল, দুই হাত কপালে ঠেকাই ।
বেঘোরে যা গেছে যাক, মধুর মরণ বৈ তো নয়
সত্যি মিথ্যে যাই বলো, এ ঘোরের নাম নিতে নেই ।

================================================

নীতা বিশ্বাস

মোহঃ জীবনের তছনছি এ্যানেকডোট

কসমিক বিশ্বে পৃথিবী ছাড়া আর কোনও গ্রহকেই তেমনভাবে জানা গেল না। কোনো অনুসন্ধানই জানাতে পারলো না পৃথিবী ছাড়া অন্য কোনো গ্রহে মানুষের সন্ধান পাওয়ার বহুআকাঙ্খিত কাব্যকথা। আমি তাই বলি মহাজাগতিক সংসারে পৃথিবী বাদে অন্য কোনো গ্রহে কেউ প্রসুতিঘর দেখেছে, এরকম চমকপ্রদ বিবরণ জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞান এখনও আমাদের হলফ করে বলতে পারেনি। কোনো রাডার পারেনি প্রাণতরঙ্গের সাংকেতিক সঙ্গীত শোনাতে। বায়োকেমিস্ট্রিও এই অনুসন্ধানে এখনও শূন্যহাত। গর্ভে প্রাণ ধারণ ও বহন করার অহঙ্কার একমাত্র পৃথিবীই দেখাতে পারে।
ওল্ড টেস্টামেন্ট বলছে আদি মানুষ, ইভ ও আদম। পূরাণ বলছে পৃথিবীর প্রথম মানুষ সংজ্ঞা আর সুর্যর মিলিত ফসল, যম ও যমী। সে যাই হোক। শাস্ত্র বলছে, একটি মানুষ তার রক্তে মাংসে শরীরে মজ্জায় অন্য সব প্রয়োজনীয় উপাদানের সমান্তরালে আরও কিছু রসায়ন বহন করে যেগুলোর নাম দেওয়া হয়েছে ‘রিপু’। জ্ঞানীজন এই রিপু ছয়টির নামকরণ করেছেন---কাম ক্রোধ লোভ মোহ মদ মাৎসর্য। তাঁরা আরও বলেছেন এগুলো মানুষের দুস্প্রবৃত্তি।
যদি বলি এই রিপু বা প্রবৃত্তি মনে জন্ম নিয়ে শরীরে সঞ্চারিত হয়! বলাই যায়! ক্রোধ হচ্ছে রাগ। এই রাগ যে রাগিণী শোনায় তা ভীষণ কুতসিৎ এক মনোবিকার। কারো ওপর ক্রোধে অন্ধ হয় মানুষ—সেটা তার মানসিক প্রক্রিয়া বা প্রবৃত্তি। ক্রোধান্ধ হয়ে সে যখন তার ক্ষতি করে তখন সে ক্ষতিটি মন উপছে শরীরেও তার ক্ষতচিহ্ন রেখে যায়।
#
এই যে ছয় রিপু, এরা সবাই পাশাপাশি হাত ধরাধরি করে দাঁড়িয়ে আছে। কেউ কারো চেয়ে কম যায়না। সব গুলোকে একত্রে নাম দিতে পারি ‘অন্ধতা’। এই অন্ধতা এমন ভীষণ এক অন্ধকার যা জন্মান্ধ ব্যাক্তিদেরও অবাক করে দিতে পারে। মানুষ কামান্ধ হয়, ক্রোধে অন্ধ হয়, লোভে অন্ধ হয়, মোহে অন্ধ হয়, মাৎসর্য অর্থাৎ পরশ্রীকাতরতায় অন্ধ হয়ে ওঠে। এভাবেই ধর্মান্ধতাও আসে। সেও এক মোহ নামক রিপু। কবির আর্ষদৃষ্টিতে কবেই ধরা পড়ে গেছে দু পংক্তির মধ্যে গুঢ় এই সত্য—‘ধর্মের বেশে মোহ এসে যারে ধরে/ অন্ধ সে জন মারে আর শুধু মরে।’ আজ বিশ্বজুড়ে ধর্মান্ধরা ধর্মের নামে যে খুন-খারাবী সন্ত্রাস চালাচ্ছে, প্রতিশোধের হিংসায় তারা নিজেরাও মরছে। যেমন ভাবে মারছে অপরকে, তেমন ভাবেই নিজেরাও মরছে।
#
‘মোহ’ও মানুষের মধ্যেকার এমনই এক রিপু যা তাকে মূহুর্তে চৈতন্যহীন করে তোলে। চেতনাহীন মানুষ স্বভাবতই নিজের আচরণ সম্মন্ধে হুঁশে থাকেনা। বিদ্বান মানুষও তখন মূর্খ হয়ে যায়। মূর্খতা অক্ষরপরিচয়হীনতা নয়, মূর্খতা হচ্ছে অবুদ্ধি। অবুদ্ধি আনে অজ্ঞতা। বিবেকহীনতা। বিবেকহীন মানুষ একটা ঘোরের মধ্যে থাকে। এই ঘোর ই মোহঘোর। কবি চিত্রালী ভট্টাচার্যর কবিতায় এই মোহ নামের জীবন-তছনছি রিপুর পদচারণা। কেমন তাকে গ্রাস করেছে তার অজান্তেই...। স্বপ্নপুরুষকে দেখে--
“আমি তখন ...আ...মি...তখন দিশেহারা
খড়কুটো আঁকড়ে ধরি বাঁচার চেষ্টায়
বোধবুদ্ধি বানের জলে, পাপপূণ্য সব একাকার”
(মোহ ১/ আলাপ। চিত্রালি ভট্টাচার্য)।
মানুষ মোহে পড়ে জীবনের সবচেয়ে বড় ভুলটা করে বসে। মোহ ক্ষণিকের অতিথি। মোহজাল কেটে যায় অল্প সময়েই। কিন্তু মোহময় ভ্রমের ফলটি তাকে চিরদিনের জন্য দাগিয়ে দিয়ে যায়। চিহ্নিত হয়ে পড়ে সে মানুষের কাছে, সময়ের কাছে , দুনিয়ার কাছে।
মোহ নামক ক্ষণিকের মায়াজাল সবসময় এড়াতে পারেনা নারী পুরুষ উভয়েই। এ বড় কঠিন। যাকে মোহপাশ জড়ায়, নিজের বৃত্ত থেকে তার আর বাইরে বের হবার ক্ষমতা থাকেনা। মোহ তার বিবেককে গ্রাস করে। শুধু নারীশরীরের ওপর পুরুষের মোহ ও ভাইসি-ভার্সা বললে সবটা বলা হয়না। সম্পদমোহ, নেতাগিরির মোহ, যৌনমোহ, ধর্মমোহ, এমনকি কৃচ্ছসাধনের মোহে বুদ্ধিহারা মানুষ কি অন্যায় অবিবেচনার কাজ করে বসে তা আমাদের দৈনন্দিন জীবনই তো নিত্য দেখায় আমাদের। উদাহরণ দেবার দরকার নেই। কামান্ধ রাজা দুষ্মন্ত ক্ষণিকের মোহে শকুন্তলার দেহে যে চিহ্ন রাখে, মোহজাল কেটে গেলেই তা বিষ্মরণের অন্ধকারে তলিয়ে যায়। স্নেহ প্রেম আত্মীয়তা যেখানে চিরস্থায়ী অনুভূতি, মোহ-মাদক সেখানে ক্ষণ টুকু স্পর্শ করেই স্ফুলিঙ্গের মত উড়ে গিয়ে ফুরিয়ে যায়। নষ্ট হয়ে যায়। ভ্রষ্ট করে দেয় কত মাসুম জীবনের যাত্রাপথ!
মোহশূন্য জীবন এক বিস্বাদ যাপনের ইতিকথা। ‘যাবৎ জীবেৎ সুখং জীবেৎ’ এবং ঋণ করিয়াও ঘি অবশ্যই খাইবেক, চার্বাকের এই দর্শণ থেকে মুখ ফিরিয়ে কতজন থাকে! হাতে গোনা ক’জন সত্যিকারের সাধু-সন্ত ছাড়া! আজকাল তো সন্ত-গুরু বলে প্রচারিত একের পর এক মানুষের সম্পত্তি ও যৌনমোহের সরস কাহিনী আদালতের দরজা-দালান পর্যন্ত উপছে পড়েছে! হাজার হাজার ভক্তিমান ভক্তিমতী পরিবেষ্টিত সংযত-ইন্দ্রিয় গুরু নামক institution টি যদি নিত্য নুতন যৌনমোহগ্রস্ত জীবনে অভ্যস্থ, সেখানে সাধারণ মানুষ কেন মোহগ্রস্ত হবেনা! এইটুকুই তো কথা। এইটুকু কথার মধ্যে লুকিয়ে বসে থাকে শতেক জীবনতছনছকারি ভ্রম, যার নাম মোহ। যার মধ্যে গুপ্ত কামবাসনাও বসৎ করে নির্বিচারে। মোহ এই বিচারক্ষমতা হারিয়ে ফেলা এক আচ্ছন্নতার নাম।
এক সাধারণ মধ্যবিত্ত ঘরের বিবাহিতা মেয়ের কথা বলি। মেয়েটি্ (বধুটি) চোখ-মুখের ভাষায় সুন্দরী। শরীরের গড়নে আকর্ষনীয়া। অন্য কোনো পুরুষকে দেখে চকিতে তাকে নিজের স্বপ্নের পুরুষ (“বধু কোন আলো লাগলো চোখে”)বলে মনে হলো তার।
“বসন্তবিলাপে ঠাসা, আকন্ঠ বিষিয়েছে বায়ু
কী বলি তোমায় বন্ধু, পুংলিঙ্গে নিমজ্জিত আয়ু”—(মোহ ২ বিস্তার।/ চিত্রালী ভট্টাচার্য)।
এই শাক-ভাতের জীবন তখন আর তাকে ধরে রাখতে পারছে না। উক্ত পুরুষটিও সেই নারীর চোখের ভাষা পড়ে নিয়েছে। বুঝে ফেলেছে যা কিছু বোঝার। মোহগ্রস্ত দুই নারী-পুরুষ তাদের ভরা সংসার ফেলে তছনছের জীবনে ঝাঁপ দিল, যেমন প্রদীপ শিখায় পতঙ্গ তার মরণ ডেকে আনে! মোহ তো ক্ষণিকের অতিথি! মোহাঞ্জন মুছে গেলে পুরূষটি তাকে ফেলে চলে আসতে দ্বিধা করেনা। দ্বিধাটি পড়ে থাকে নারীটির জন্য। সে তখন ‘না ঘরকা, না ঘাটকা।’
“ক্ষণস্থায়ী তবু সে ভীষণ ফনাধারী শঙ্খচুড়ামণি
প্রত্যখ্যাণ? কার সাধ্য! আমি তো সামান্যই জানি” (মোহ২ বিস্তার।/চিত্রালী...)
#
এক সুদর্শণ যুবকের সঙ্গে ফেসবুকে (ফেকবুকে!) আলাপ এক যুবতীর। তার চ্যাটিং এর বর্ণচ্ছটায় যুবতী দিন দিন মোহিত। যুবতীটির ছিমছাম চাকরির লোভনীয় স্যালারি তাকে সবদিক থেকে স্বনির্ভর রেখেছে। যুবকটি এক গ্ল্যামারাস পাইলট বলে পরিচয় দেয় নিজের। পার্স উপছে পড়া স্যালারি, অত্যাধুনিক লাইফস্টাইল। জেনে যুবতী মোহগ্রস্ত। নিজের চাকরি তার কাছে নগন্য মনে হয়। এবার ধাপে ধাপে যুবকটি এগোতে থাকে শ্বাপদের নৈঃশব্দ মেখে। নিজের একটি বড় সংস্থায় তাকে চাকরির অফার দেয়। শিহরিত মেয়েটিকে আরও শিহরিত করে যুবকটি তাকে বিয়ের প্রস্তাব দেয়। কর্পোরেট লাইফের মোহে বিবাহপ্রস্তাব লুফে নিয়ে যুবতী নিজের পাকা চাকরিতে রিজাইন দিয়ে কল্পনার পাখায় উড়তে থাকে দিবারাত্রি। হিপনোটাইজড যুবতী যুবকের সব কথা, সকল অনুরোধ, সমস্ত পরামর্শ বেদবাক্যের মতো মেনে নিয়ে চাকরির প্রসেসিং ফি বাবাদ খেপে খেপে বেশ কয়েক লাখ টাকা পাঠিয়ে দেয় তার ব্যাঙ্ক এ্যাকাউন্টে। মোহগ্রস্ত সে তখন যুবকের উদারতায় সংশয়হীন। যুবক, বুক করা ম্যারেজহলের ছবি ও রসিদ পাঠিয়ে তার জন্য কেনা এনগেজমেন্ট আংটিটা তার ঠিকানায় পাঠাতে বললেও সে বিনা দ্বিধায় পাঠিয়ে দেয়।
কবি চিত্রালী ভট্টাচার্য লিখছেন নিজের জবানীতে,
...“কথামালা অনুপ্রাসে ভারী
যতবার চোখাচোখি ততবারই সর্বনাশে পড়ি”

বলছেন “আমিও পুতুল যেন, পাঞ্জাবিতে বাধ্য মুখ ঘসি।”
আত্মনির্ভর স্বাধীন যুবতী তখন সর্বনাশে পড়েছে। বাধ্য মুখ ঘসছে। খেলার পুতুল হয়ে পড়েছে সে। এই ‘সর্বনাশ’ ‘বাধ্য মুখ’—এইই তো মোহপাশ! আচ্ছন্ন কুমারীর সুস্থ-সম্পন্ন বোধকে ছিনিয়ে নিয়ে তাকে অন্তরে বাহিরে ভিখারি বানিয়ে দেয়।
#
মোহে পড়ে, মোবাইল ফোনে আসা অজ্ঞাত পরিচয়ের মেসেজে চার কোটি ডলার লটারি জেতার খবর পেয়ে আমি, একজন ধুরন্ধর প্রোমোটার, পালটি খেয়ে যাই। সব ভুলে উৎফুল্ল আনন্দে নেচে উঠি। বিদেশ থেকে সে ‘ধন’ নিয়ে আসার প্রসেসিং মাণি বাবদ তাদের পাঠানো ব্যাঙ্ক-একাউন্টে টাকা পাঠিয়ে দিই। আমার গুপ্ত তথ্য তাকে জানাতে দ্বিধা করিনা। এবার বিদেশ থেকে সেই টাকা আসার খবর দিয়ে সে আমাকে মোহিত করে বিভিন্ন অজানা খাতের খরচ দেখিয়ে আমাকে আরো টাকা পাঠানোর নির্দেশ দেয়। আমার প্রোমোটারি ব্যাবসার জন্য নেওয়া লোন আমি নির্দিষ্ট ঠিকানায় পাঠাতে থাকি আচ্ছন্নের মত। কেননা আমি বিশ্বাস করে বসে আছি চার কোটি ডলার আমি পাবোই। আমার ভাঁড়ার শূন্য হয়ে গেলে আমি বুঝতে পারি মিথ্যে চার কোটির স্বপ্নমোহে ফাঁদে পড়ে আমি কপর্দকশূন্য হয়েছি। কারণ মেসেজ পাঠানো মানুষটির একাউন্ট অকস্মাৎ হারিয়ে যায়। সেই জেতা টাকা আর কোনোদিন এসে পৌঁছায়না আমার কাছে। ধনে মানে বিশ্বাসে আশায় আশ্রয়ে মোহ রিপুটি আমায় সর্বসান্ত করে নিজে ধরা ছোঁয়ার বাইরে দাঁড়িয়ে মজা দেখে। আমি ঘোর ভেঙে দেখি তার সর্বগ্রাসী সর্বনাশী হাঁ-মুখ!
#
কবি চৈতালী শেষবিকেলের খেলা ভাঙার (মোহ ভাঙার) কষ্টের কথা লিখেছেন--- “ভঙ্গুর ঘরের পথে যেতে যেতে ফিরে ফিরে চাই
কি যে ছিল, কি যে নেই আজ আর ঠিক মনে নেই।”(মোহ ৩।সমাপ্তি/ চিত্রালী)
‘ভঙ্গুর ঘর’! সেখান থেকে তখন ঝরে পড়ছে আশ্রয়, বিশ্বাস, আত্মমগ্ন, আত্মসম্মানের ভাঙা দেওয়াল ছাদ কড়িকাঠ। মোহের শুরু ও শেষ—সমস্তটাই এক বিশাল শূন্যতার গাথা।
‘মোহ’ সর্বৈব অপরিনামদর্শিতা আর অন্ধত্বের নাম।
#
ফুলের পবিত্রতা নিয়ে যে শিশুটি পৃথিবীতে জন্মায়, শরীরের সব অঙ্গের মতো এই ছয়টি রিপুও অনিবার্য ভাবেই তার মধ্যে লুকিয়ে থাকে। সে বড় হতে থাকে, সাথে সাথে ষড়রিপুর একটি রিপু তার মধ্যে বড় হতে থাকে। যে রিপুটি প্রবল হয়ে ওঠে, সেই অনুসারে আমরা তার নামকরণ করি ‘রাগী ছেলে’ ‘লোভী মেয়ে’ ‘কামুক কিশোর’ ‘পরশ্রীকাতর (মাৎসর্য) লোক।’ এগুলো জেনেটিক ব্যপার-স্যাপার। মা-বাবা বা পূর্বপুরুষের জিন শিশুটির মধ্যে সঞ্চারিত হয়ে যায় তার ভ্রুণ অবস্থাতেই। রিপুশূন্য মানুষ বাস্তবে হয়না। মানুষ যা করতে পারে, তা হচ্ছে রিপুর দমনপ্রক্রিয়া। এগুলো স্বভাবিক ভাবে বাড়তে না দেওয়ার অভ্যাস রপ্ত করা। রিপুর বশ না হয়ে রিপুকে আপন বশে নিয়ে আসা। সমস্ত রিপুই মারাত্মক একেকটি মিশাইল বা ধ্বংসবীজ। কোনো একটি প্রবল হলেই ধ্বংস ডেকে আনে। পৃথিবী আজ যে ধ্বংসলীলায় মেতেছে তা মানুষের এই রিপুতাড়নার প্রাবল্যের ফসল। হিংসায় ক্রোধে লোভে মোহে আমার রিপু আমারই ওপর সন্ত্রাস চালায়।
#
তবু, আমি তো মানুষ! পৃথিবীর সমস্তরকম প্রজাতির মধ্যে শ্রেষ্ঠ জীব আমি। আমি স্বপ্ন দেখি এই মারাত্মক ও ধ্বংসাত্মক রিপু কোনো সুশীল যাদুকাঠির ছোঁয়ায় নির্বাসিত হয়েছে। বিশ্বে মানুষই যে সর্ব শ্রেষ্ঠ জীব এই সত্যটি প্রকৃত সত্য হয়ে উঠেছে। প্রার্থনা করি স্ত্রীলিঙ্গের x ও পুরুষের y ক্রোমোজমে রিপু নামের ধ্বংসবীজ যেন আর সৃষ্টিই না হয়! প্রার্থনা করি ক্রমবিবর্তনের মধ্য দিয়ে ক্রমাগত পরিবর্তন ছুঁয়ে ‘ইভ’ (নারী) তার সঙ্গী ‘আদম’(পুরুষ) এর সঙ্গে ভাল জিন বিনিময় করে জন্ম দিক রিপুনির্বাসিত এক সর্বোত্তম প্রজাতির ‘মানব’। রিপু বলে যদি কিছু থাকে তবে তা হোক মঙ্গলময় উদারতাময় ভালোবাসা। মেডিক্যাল সাইন্সের সর্বশ্রেষ্ঠ আবিষ্কার হোক সর্বরিপুনিবর্তক যুগান্তকারী ওষুধ আবিষ্কার। প্রতিটি মায়ের গর্ভকালে সেই অমৃতঔষধী গ্রহণ আবশ্যিক করা হোক যাতে দুষ্ট রিপুর কর্কট আগামিশিশুর ভ্রুণে কিছুতেই স্থান না পায়!

কাম ক্রোধ লোভ মোহ মদ মাৎসর্যময় অন্ধকারাচ্ছন্ন ষড়রিপুনির্বাসিত সর্বার্থে সুন্দর পৃথিবীকে দেখতে হাজার বছর বেঁচে থাকতে সাধ যায়।