আরোহণ

জুয়েল মাজহার ও পুণ্যেশ পুণ্য


জুয়েল মাজহার
-----------------------


আরোহণ

রাত্রিকাল। পাহাড়ে উঠছি একা
কাছেপিঠে আর কেউ নেই;

এখানে পাথরগুলো কী নরম স্পঞ্জে বানানো!
সেদ্ধ ডিমের মতো, ডাঁসা ও বর্তুল;
তাতে আমি টের পাই আঁচ। টের পাই
অপার্থিব দোলা ও স্পন্দন।

এদেরই দুটোকে আমি আঁকড়ে ধরে পর্বতের গাত্র বেয়ে উঠি;
এছাড়া আমার যেন কাজ নেই তীর্থ নেই মোক্ষ নেই কোনো।

পার্বত্য এলাকা বড়ো বিপদসঙ্কুল। তবু,
আরোহীমাত্রই জানে ভয় পেলে চলবে না।
ঝড়-ঝঞ্ঝা, হাওয়ার চাবুক সয়ে তাকে তার মোক্ষে যেতে হবে।
অনেক-অনেক চূড়া জয় করে যেতে হবে কাঞ্চনজঙ্ঘায়।

আরোহণ শেষ হলে তৃপ্ত সুখী জয়ী সে-আরোহী
সাবধানে নেমে আসবে নিচে। তারপর
কামিনীফুলের ঘ্রাণ বুকে নিয়ে ভেসে যাবে প্রস্রবণে

---আরো দূরে তপ্ত, গাঢ় লবণ-সাগরে।


----------------------------------------------------------- ---






একশো করোটি আর মদ

দাও, একশো করোটি আর গোপন যতো মদ
রাতের নীল কথায় বাঁকা ঘুমের তরবারি

বিজন ঘরে পারদঘন বুকের মঞ্জরি

আচম্বিতে হরণ করা এখনো সম্ভব
কামশীতল সোনার ঘুঘু, মোমের অপ্সরী

যদি না দাও পালকঢাকা গোপন কুঁচফল
চালাবো তবে হঠাৎ এসে গলায় খঞ্জর

জ্বলবে আগুন, রক্তধারা ফিনকি দিয়ে মদ
গোপন ঘরে পারদঘন গহন মঞ্জরি




-----------------------------------------------------------



পাহাড়ে বেড়াতে যাবার পর

১.
পাহাড়ে বেড়াতে যাবার পর ক্রমশ তরঙ্গবহুল হয়ে উঠল তোমার গ্রীবা।রজস্বলাদের গুরু নিতম্বের ক্রম শিহরণ প্রাগৈতিহাসিক গাছেদের গায়ে এসে লাগে। আর আমি ঝুলন্ত ডেউয়াফলের মতো তোমার গরিমাময় কুচযুগের দিকে তাকাই নতুন করে।

আমার লোভের চাহনি গ্রীষ্মদিনে, তপ্ত স্বেদবিন্দুর মতো, ক্ষীণধারায় গড়িয়ে শুধু নামে।

উপত্যকায় হাজার রাত্রিশেষের রাত্রি আর হাজার দিনশেষের দিনে লোহু-রঙিন জবাফুলের মতো উপহার তুমি।

কালচে-সবুজ পাতার আড়ালে বসে তোমাকে জারিত করি ক্রমাগত চোখের লবণে। তুমি শাদা-শাদা অপার্থিব কাচের মিনার থেকে উঁকি দাও।
লহমায় লহমায় তোমার মুখ জ্বলে উঠতে দেখি এই অরণ্য-প্রদোষে।

যখন পাহাড়ে যায় লোক, ভালুকদের কাছ থেকে তাদের ভারী চলনগতি আর যূথবদ্ধতার মন্ত্র শিখে নেওয়া ভালো। এসবের কিছু নমুনা নিয়ে এসেছি।

বরফে, বক্ষবন্ধনীর ভেতরে সেসব তুমি বহুদিন যত্নে রেখে দিও।

আর চলো চিরখল, চিরলোভাতুর, চিরকুটিল আর চিরবদমায়েশ শহরে ফিরে না যাই আবার। চলো শীতরাতে গোপনে ডিঙি নিয়ে বেরিয়ে পড়ি সরল অসভ্যতার দিকে। চলো ঘুমের ভেতরে! চলো পরস্পরকে কাঁধে নিয়ে ছুটি আবছা ভোরের কুয়াশায়।



২.
শাদা ফসিলের মতো বৃষ্টিতে বনপথে ট্যাক্সিরা গর্জন করে ওঠে--শুনি।আর দেখি, হাতের তালুর মতো ঢালু উপত্যকায় ভোর-সন্ধ্যার আভারূপে ক্ষণে-ক্ষণে হেসে ওঠো তুমি; আর, কেঁদে ওঠো ভালুকশিশুর মতো। কেঁদে ওঠো অতিদূর সাইবেরিয়ায়।

সেসব কান্নাকে এখন জড়ো করছি; আর ভাবছি, এঞ্জিন-রব আর খুরধ্বনি থেকে দূরেই রয়েছে তোমার অভিজ্ঞান।

তুমি এক লম্বা দৌড়;
তুমি পত্রালির ভেতরে সাঁতার---বায়ুবাহিত বেলুনে বেলুনে।



৩.
পাহাড় গোপন জলধারা নামায় আর ডাকে তোমায়। আর তাতে শব্দ করে ওঠে রাত্রি;---যেন একাকী তক্ষক। যেন ছল। এটুকু ছলই একদিন আমাদের জোড়া ঠোঁটের কাছে প্রেম হয়ে আসবে কামের পেয়ালায়। সেখানে রঙিন পাথর থেকে পাথরে, চূড়া থেকে চূড়ায় লালাভ সূর্য আর মেদুর রাত্রির চুপ-সিরাপ ছল্‌কে পড়বে তোমার গুরু নিতম্বে; আর তোমার তরঙ্গবহুল গ্রীবায়,ডেউয়া ফলের মতো ঈষৎ-ঝুলেপড়া তোমার স্তনে আর গ্রানিট পাথরে গড়া নাভিনিম্নদেশে।

==============================================
পুণ্যেশ পুণ্য

সমুদ্র ফেরেস্তা

সাগরে পাহাড় থাকে আর সেই পাথরের অতি ত্রিভুজ লুকানো সমুদ্র-অন্তরালে লাটাই ধরে বসেছিল এক অপ্সরী ৷ মাথার ওপর ফেনা ভাসিয়ে এক বুক জাহাজ- আমি লক্ষ্য রেখেছি অজস্র ঘুড়ির পতন, আকাশ ছেয়ে নেমে আসা পিকাসোর গাভীর মতন মেঘ ৷ সেই মসৃণ অবতল লেন্স চোখে আমি ছদ্ম নাবিক ধরে রাখি পারাপার করা চোরা গতায়তের উল্কাপিন্ড, আসলে উল্কারা বায়ুভোগী সধবাপ্রেয়সী অনেকটা ছাই হয়ে থাকা বাতাসরক্ষিতা ৷ কারুকাজে ছড়িয়ে যায় বহুমাত্রিক স্তবের আড়ালে পৃথিবীর আজন্মলালিত প্রাগ-যৌবন সেনেসেক্সের ওঠাপড়ায়; হঠাৎই এসব আমার মেমব্রেন কোড ভেঙে বুঝে ফেলে সাগর, বোঝে না শুধু জলকন্যা যার ওপরের অর্ধেক মানবীর নিম্নাংশ শিকড় আশ্রিত অন্তঃসলিলা ফল্গুর— এসব কথা শুনে অর্থাৎ কেন তার অংশতনু মৎস্য ললিত নয় ইচ্ছা করে না জানতে হে নাবিকের কোডেক্স গিগাস কেন তাকে জলপরী ডাকি ?

শোনো তবে শয়তানের বাইবেল জলকন্যা জলের মত রূপ... পাত্র বিশেষে আকার নেওয়া কুলক্ষণা ৷ স্তন তার যেন সপ্তসাগরের নুন মেখে রাখা তুষার ধবল গিরি, নাভমন্ডল প্রকান্ড দহঘূর্ণি ৷ সব আছে যার তার কি শেষ থাকতে নেই ! আচম্বিতে লোভ হয় নাবিক আমি ঝাঁপাই জাহাজ ছেড়ে ফেনায়, ডুবে যাই ডুবে যেতে যেতে সাগরের আলোকবর্ষ গভীরতা পার করে নিথর পৌঁছে নাগাল নিই জলপরীর ৷ কায়া মাখানো আদরে পরী চেনাক তার স্তন কটি যোনি পয়োধর ৷ চিকন উড়ুক্কু মাছ সে সময় ঘুরে বেড়াচ্ছিল চার ধার ৷ পিকাসোর ষাঁড় আর গাভীর আকাশদলে কাঠ আর পাতার রূপান্তর.... দেহ বিষিয়ে ওঠে, দেহ প্রতঙ্গয় বাষ্প জমতে জমতে নিজেকে ভারী মাস্তুল মনে হয় ৷ ঘুড়িময় আবহাওয়া ক্রমশ স্থির হতে থাকা ফোটোক্রোমেটিক স্থবিরে পর্যবসিত হয় ....খসে পড়ে গোটা কতক পতং ৷ উল্টোমুখো হয়ে থার্মোমিটিরের মতন সোজা নেমে আসে জলের ওপর চৌকোনো খোপ ৷ অবাক বিস্ময়ে আমি দেখতে থাকি এই মহাসমুদ্র প্রকান্ড কামরূপী ফাটলে নামতে থাকা উদ্বাহু পুরুষালী শিস্ ৷

সসাগরা পৃথিবীর স্ব-রত্নাকর ফুঁসে উঠছে ৷ ঢেউ যেন কৃশকায়ার চর্বির কম্পন ৷ আমার জাহাজ সেই থাক থাক চর্বির তালে পিঁপড়ের মত লাফিয়ে বেরাচ্ছে ৷ নীচে বহু নীচে ডাক পড়েছে নাবিক পুরুষের, ডালা প্রস্তুত করে বসে আসে স্বয়ং জলপরী, উপর ভাগ এক তরুণীর মায়া যার নিম্নে নেমে গেছে ঘূর্ণির স্রোত ৷ বিস্তীর্ণ পারাবার সলিলতলে যেই গিরিরাজ অগ্ন্যুদস্ফুরণে ব্যস্ত তা আঁকড়ে জলপরী কাতরায় ৷ সব আছে তার, পুরুষ আকর্ষণ নিমিত্তে যত নোনা লাগে সব আছে শুধু— মাতৃত্ব যাপনের পথে নেমে গেছে বিকট সর্পিল ঘূর্ণিপাক ৷

জাহাজ ধ্বংস হয়েছে অনেকক্ষণ ৷ জল সরে গেছে পশ্চিমে, জেগে উঠেছে বিশালবোধের পাপ- সমুদ্রপর্বত ৷ আমি নির্ভয়ে বারিধ শূন্য খাত ছুঁয়ে হাঁটতে থাকি ৷ কোথায় জলপরী কোথায় তার দুর্বার সরীসৃপ বনজ তনু ৷ সন্ধিস্থলে প্রবল এক চাপ— ছিঁড়েখুঁড়ে দেব শালা যদি ওই মেয়েকে পাই ৷ আকাশ ভর্তি ধবল সজল তুলো ৷ ভাসছে দুলছে আঁকিয়ের খামার ক্যানভাস ৷

বিশাল পাথরের এক ফাঁকে হঠাৎই কাকে যেন দেখি ৷ জলপরী না ! পর্বতগাত্র বেয়ে খানিক ওঠার পর অাবিষ্কার করি তাকে ৷ এক পেলব নারী ৷ দুগ্ধঅনল গা', বুকের ওপর জড়ানো কবেকার শ্যামলা চুল.... আকস্মিকভাবে চুপ হয়ে যাই যা দেখে কোমরের তলার সেই প্রবল স্রোতকরালীর অনুপস্থিতি ৷ আমি দেখতে পাই কোমর থেকে দেহ কাটা এক নারী পড়ে আছে পাথরের চাঁই পাশে ৷ যত দর্প তেজ সব স্তিমিত আলোর নক্ষত্রের আলোয় ফিরিয়ে চেয়ে আছে যেন অসহায় ....

অনেকক্ষণ পর যখন দেবীতনু বয়ে নিয়ে শিখরে উঠি ততক্ষণে পশ্চিমের জল ধীরে ধীরে কলকল রবে ফিরতে শুরু করেছে ৷ চারপাশ আর ভীষণ লাগছে না ৷ পরীর দিকে তাকাই ৷ " আমার বাকীটা এঁকে দাও "— পরী বলে ৷ আমরা হাওয়ার সাথে শুন্যে জাগতে শুরু করি ৷ উঠে যাই সোজা ফেরেস্তার ন্যায় ওকে পাঁজাকোলে করে মেঘলা নীলের পানে ৷

পিকাসো ততক্ষণে নিশ্চয়ই অদ্ভুত সুন্দর রঙে কন্দর আঁকতে শুরু করেছেন !