গন্তব্য

মুজিব মেহদী ও ইমরান নিলয়





মুজিব মেহদী

গন্তব্য

মায়ের গোপন থেকে কবরখানা পর্যন্ত যাব
মাঝে টুকটাক কিছু কাজ
নাকানিচুবানি

পথে দেখা হলো সুরভিত যৌনপুতুলের সাথে
মোহরূপ কামনা ও কামরূপ বাসনার সাথে

শেষে খ্যাতিরূপ হাওয়াই মিঠাই খেতে
দিক ভুলে ম্যালাদূর হাঁটাহাঁটি হলো

অল্প কিছু দেরি হয়ে গেল এইভাবে
ঘোরে ও বিভ্রমে
তবু দেখো
গন্তব্যে পৌঁছাব আমি ঠিক সময়মতোই

চূড়াসম্পর্কিত

খাদের মনের দিকে পলকে তাকিয়ে আজ চূড়ার কম্পন বুঝি, চূড়ার নিতম্ব ছুঁয়ে জেনে যাই ঢালের ধারণা

নিবৃষ্টি পাহাড়ে আজ খরা বলে গাছের সিনান নেই, অতলে কামজর্জর ময়লা পানির স্রোত পার হয়ে ম্যালাদূর যেতে হবে আমাকে তোমার

তুরার চূড়ায় আমি কিছুদিন ঘুমিয়ে কাটাব, সাথে রবে লম্বা দিয়ে পড়ে থাকা ওসে ভেজা রগরগে ব্রিজ, মেঘালয়জোড়া

পুরুষ

বহন অযোগ্য এক ভার এই পৈতৃক ‘পুরুষ’ পরিচয়, একে নিয়ে চলে ফিরে খেতে হবে আরো কিছুকাল, এই গ্লানি মনের গভীর থেকে ক্রমশ নিস্তেজ করে দেয়

চারিদিকে রমরমা যৌনহিংস্রতা দেখে কেঁপে উঠি, খ্যাপে উঠি, পুরুষ আমাকে আজ ঘৃণা করি, থুথু দেই

আজ আমি কামনারহিত হয়ে খেলা করি বেণী নিয়ে মেয়েপুতুলের

দরকারি সাহিত্যিক

আপনার লেখা পড়লে আমার তীব্র কামভাব হয়
কাজেই আপনি দরকারি সাহিত্যিক

শনৈঃশনৈঃ উন্নতি দেখছি আপনার
এই লেখনজগতে

================================================

ইমরান নিলয়

উত্তরাধুনিক

ইদানিং মনে হয় ধীরে ধীরে বোধহয় অস্পষ্ট হয়ে যাচ্ছি। কেউ যেন ভুল করে এঁকে ফেলার পর রাবার ঘষে ঘষে মুছে দিচ্ছে খাতা থেকে।

তহুরাকে বলেছিলাম যাওয়ার সময় আমার ঘরের দরজাটা যেন চাপিয়ে দিতে যায়। না শুনেই না শোনার ভান করে চলে গেছে মেয়েটা। আমিও আর বলতে যাইনি। বললেই কাটা কাটা গলায় তাকাবে। জানা কথা। এখন আর কাউকে বিরক্ত করতে ইচ্ছে হয় না।

আজকাল নিজের গলার স্বর নিজেই শুনতে পাই না। মানুষের দোষ দিয়ে কী লাভ। অবশ্য এটা দীর্ঘদিন বিছানায় শুয়ে থাকার কারণে ভোকাল কর্ডের কোনো সমস্যাও হতে পারে। হয়ত এটাা একটা রোগ। ইংরেজীতে যার কোনো দাঁতভাঙ্গা নাম আছে। কানিজকে বলতে হবে। এটা নিয়ে যেন ডাক্তারের সাথে কথা বলে। অবশ্য ও শুনতে পাবে কীনা বলা যাচ্ছে না। ইদানিং কানিজও আমার কথা ঠিকঠাক শুনতে পায় না। গত পরশু নাস্তা দেয়ার সময় ওকে বলেছিলাম, আজ সারাদিন তুমি আমার পাশে থাকবে। কিন্তু আমার একটুও মন খারাপ হয়নি। জানতাম সে শুনতে পাবে না।

ইদানিং শুধুমাত্র একজনই আমার সব কথা শোনে। বলতেও হয় না। মনে মনে ভাবলেই হয়।
'তাই না?'
আমি ঘাড় কাত করে উত্তরের আশায় দেয়ালের দিকে তাকাই। ছোট বাচ্চাদের হাতের তালুর সমান ধূসর রঙের একটা মাকড়সা। ভেঙ্গে যাওয়া কাঠির মতো আট পায়ের উপর বসে আছে চুপচাপ। ঠিক সেই জায়গাতেই, যেখানে সে দিনের অধিকাংশ সময় জেগে থাকে।
'এটা তোমার ভুলও হতে পারে। হয়ত পুরোটাই তোমার নিঃসঙ্গ মনের কল্পনা।'
তার এই ব্যাপারটাই আমার সবচেয়ে পছন্দের। কোনোরকম ভনিতা না। যা বলার সোজাসুজি বলবে। সেটা কার পক্ষে গেলো বা বিপক্ষে, সেটা নিয়ে অযথা দুশ্চিন্তা করতে যায় না।

মাঝে মাঝে মনে হয় আমার জীবনে বোধহয় এই মাকড়সাটাই একমাত্র বাস্তব। অন্য যা কিছুর কথা মনে পড়ে- ছেলেবেলা, কলেজ, তারপর বিশ্ববিদ্যালয়, এমনকি অল্প ক'দিনের চাকরি জীবন- সবই যেন অনেক দূরের, ঝাপসা। যেন কেউ ঐসব স্মৃতি তৈরী করে মাথার ভেতর ঢুকিয়ে দিয়েছে, আর সেগুলো যথেষ্ট টেকসই না বলে রঙ উঠে যাচ্ছে। বরং আমার পুরোটা জীবন শুরু হয়েছে অর্ধেক শরীর নিয়ে বিছানায় আশ্রয় নেয়ার পর থেকে। এবং শুরু হয়েই আটকে গেছে দোতলার এই একঘেয়ে ঘরের হলদে দেয়ালে।

অথচ আমাদের গল্পটা ছিলো বৃষ্টিদিনে হুডখোলা রিকশার মতো। দুরন্ত। নতুন স্ত্রী, ভালো একটা চাকরি, ছুটির দিনগুলোতে বাইরে খেতে যাওয়া, মাঝে মাঝে সিনেমা, শপিং, কখনো ট্যুর- সবই চলছিলো ঠিকমতো। যেন স্বপ্নের মতো ছিলো। এজন্যই হয়ত এখন ভাবলে অনেকদিন আগে দেখা কোনো স্বপ্ন মনে পড়ার মতো অনুভূতি হয়।

তারপরই এলো বছর দুয়েক আগের একদিন। আমি হয়ে গেলাম অর্ধমানব। আচমকা এক স্ট্রোকে শরীরের অর্ধেকটা বিকল। গ্রীক মিথের আধা মানুষ, আধা ঘোড়ার মতো- আধা মানুষ, আধা অকেজো। আত্মীয়স্বজনরা দেখতে এসে বলাবলি করতে লাগলো- অল্প বয়সের এমন বিকল মানুষ খুব বেশি দেখা যায় না। শুনে আমি আনন্দ পাওয়ার ভান করি। আর তারা দুঃখী হওয়ার।

তারপর থেকে শুয়ে শুয়ে পাশের জানালায় ঝুলে থাকা একটুকরো মরিচা পড়া আকাশ দেখেই অধিকাংশ সময়টা কাটে আমার। সাথে আছে দেয়ালের আটপেয়ে মাকড়সাটা।

আমার বিছানার প্রথমদিকে কানিজ কবিতা পড়ে শোনাতো, খাইয়ে দিতো। কিংবা মাথায় হালকা হয়ে আসা চুলের মাঝে শীতলপাটির মতো ওর আঙ্গুল হেঁটে বেড়ালে, নিজস্ব দুঃখবোধ সত্ত্বেও খানিকটা হালকা লাগতো আমার। যেন প্রচন্ড গরমে বাইরে থেকে এসে ফ্যান ছেড়ে দিয়ে বসেছি।

'জীবনটা চাইলেই আবার গুছিয়ে নেয়া যাবে। পৈতৃকসূত্রের এই তিনতলা বাড়িটা আর কানিজ- একটা জীবন মোটামুটি চালিয়ে নেয়ার জন্য যথেষ্ট। আর কত পঙ্গু মানুষই তো স্টেশনে ভিক্ষা করে খায়। রাতে চাটাই বিছিয়ে ঘুমায়।'
বরাবরই আমি আশাবাদীদের দলে। তাই মনে মনে নিজেকে বেশ স্বান্তনা দিতাম। তাতে বেশ কাজও হতো। এখন ভাবলে হাসি পায়।

কিন্তু সন্ধ্যার আকাশের নিয়মই কালচে হওয়া। একসময় আবিষ্কার করলাম- পা টিপে টিপে আমার থেকে দূরে সরে যাচ্ছে কানিজ। আমার ঘরে এসেও যেন আসে না। মাঝে মাঝে নাস্তা দিয়ে যায়। আবার কখনো উঁকি দিয়েই বিদায়। হাসপাতালের নার্সদের রুটিন ভিজিটের মতো ওর আসা-যাওয়া।

'তোমার জ্বর বেড়েছে?'
আমার বলতে ইচ্ছে করে, হাত দিয়ে দেখতে পারো না? কিন্তু অভিমান হয়। কিছু বলি না। শুধু মাথা নাড়াই।

ইদানিং কানিজ চলে গেলেই বরং স্বস্তি লাগে। নইলে ও যতক্ষণ পাশে থাকে, নিজেকে কেমন অপরাধী অপরাধী মনে হয়, নিজের ভেতর গুটিয়ে থাকি। চলে গেলে বরং মাকড়সাটার সাথে কিছুক্ষণ কথাবার্তা বলা যায়।

'কানিজ কিন্তু তোমাকে আজকাল একেবারেই সহ্য করছে না।'
'কে বলেছে?'
'তুমি ওর চেহারা দেখে বোঝো না? কি পরিমাণ বিরক্ত।'
'কিন্তু কেন?'
'জানো না তুমি?'
'আমি জানবো কিভাবে? তুমি যখন জানো, বলো। আমিও শুনি।'

কিন্তু সে আর কিছু বলে না। যেন বেমালুম বোবা হয়ে গেছে। এরপর তাকে যতই জিজ্ঞেস করা হোক, শুধু দেয়াল খামচে ধরে তাকিয়ে থাকে। অপলক। অবশ্য তার চোখ দেখা যায় না। নাকি যায়? জানি না ঠিক। অনুমান করে নিই।

অবশ্য ঘরে পড়ে থাকা পঙ্গু-অর্থব স্বামীকে কেইবা পছন্দ করে। স্বামীসেবা? ওসব আদিযুগের পাঠ। কানিজ এখনো কেন আমাকে ছেড়ে যায়নি মাঝে মাঝে তা ভেবেই অবাক হই। তবে বোধহয় খুব বেশিদিন আর নেই। ইদানিং ওর চলন-বলনে কোথায় যেন একটা সূক্ষ্ণ পরিবর্তন এসেছে।

প্রায়ই ছুটির দিনে কোথাও বাইরে যায় কানিজ। কখনো সন্ধ্যার পরে ফেরে। কখনো রাত হয়। আগে এটা-সেটা বানিয়ে বলতো। কিছু জিজ্ঞেস করলে সঙ্কোচের সাথে তৈরী করা জবাব দিতো। এখন আর সেদিকে যায় না। দায়সারা গোছের কিছু একটা বলে। তহুরাকে জিজ্ঞেস করেও লাভ হয় না। আর দিন দিন আমি আরো মিইয়ে যেতে থাকি বিছানায়। একাকী। নির্জন। সেই একই বিছানায়, যেখানে অনেক রাতের ঝড়ের স্বাক্ষী আমি। অথচ এখন, এটা একটা মৃত মরুভূমি, আর আমি একটা একটা ভেঙ্গে পড়া আমগাছের মতো। শশ্মানে দাঁড়িয়ে চুপচাপ রোদ পাহারা দিই।

কখনো যে সেসব কথাও মনে পড়ে না, তা না। আমি বেশ আগ্রহ নিয়েই মনে করি। আমাদের সেই রাতগুলো ছিলো প্রচণ্ড ও আরণ্যক। নিজের দিনে কানিজ ছিলো একটা লাগামহীন বুনো ঘোড়ার মতো। বিছানায় নিজের সবটুকু আদায় করে নেয়ার ব্যাপারে চমৎকার দখলবাজ। এখনো মাঝে মাঝে কল্পনায় ওর সেই আধোন্ধকার মুখ নজরে আসে। ভয়ানক রিরংসায় ঠোঁট কামড়ে ধরা, কী এক গভীর রোষে চোখ বুজে আসছে। আর চাঁদের চকচকে তরল আলো ওর রূপালী শরীর বেয়ে গড়িয়ে নামছে আমার গায়ে।

'কিরে কি খবর?'
পরিচিত গলা শুনে মাকড়সাটার ওপর থেকে চোখ সরিয়ে দরজার দিকে তাকাই। তবে এটা শুধু তাকানোর জন্যই। না তাকিয়েও বুঝতে পারি কে। পুরনো বন্ধুদের মধ্যে একমাত্র রাশেদই এখনো আমার সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রেখেছে। প্রায়ই আসে। তবে এসে বেশিক্ষণ থাকে না। আমার কাছে। উঠে যায়। কানিজ তখন তহুরাকে চপ-পুরি আনতে মোড়ের দোকানে পাঠায়। আমি এখান থেকে নিঃশব্দে দরজা বন্ধ করার শব্দ পাই। মাকড়সাটা দেয়াল বেয়ে ধীরে ধীরে বিছানার দিকে এগিয়ে আসে। আমি কানিজের চাপা গলার হাসির শব্দ শুনি।

'শুনতে পাচ্ছো?'
মাকড়সাটা বলে। খেয়াল করি এটার আকার আগে এতো বড় ছিলো না। নাকি দূরে থাকায় বোঝা যেতো না?
'কি শুনবো?'
সে জবাব দেয় না। খিক খিক শব্দে হাসে। আমি চোখ বন্ধ করে বিড়বিড় করি।
'দুঃস্বপ্ন। দুঃস্বপ্ন।'
লাভ হয় না। স্বপ্ন ভাঙে না। চোখ খুলে দেখি মাকড়সাটা চলে যাচ্ছে। আগের জায়গায়। হাসতে হাসতে। এটার সবকিছুই ভালো। হাসিটা ছাড়া। যদিও শব্দটা হয় মাথার ভেতর, তবু কানে লাগে।

এমনিতে কানিজ ইদানিং আমার সামনে সবসময় গম্ভীর হয়ে থাকে। বিরক্ত মুখে। কিছু বললে সহজে উত্তর করে না। কিন্তু যেদিন যেদিন রাশেদ আমাকে দেখতে আসে কিংবা কানিজ বাইরে কোথাও গিয়ে অনেকক্ষণ পর ফেরে, সেই দিনগুলোতে একটা চাপা আনন্দ ওর শাড়ির আঁচল ধরে সারাঘর ঘুরে বেড়ায়। ও সেটা হাজার গোপন করার চেষ্টা করলেও লাভ হয় না বিশেষ। আমি না তাকিয়েও আটপেয়েটার হাসির শব্দ পাই।

একবার কানিজ আমার মাথাটা কোলে টেনে নিয়ে অনেকদিন পর হাত বুলিয়ে দিলো। আমার ভালো লাগছিলো ভীষণ। তারপর দেয়ালের দিকে তাকিয়ে 'তোমার ঘরে এতো বড় মাকড়সা' বলে চিৎকার করে মাকড়সাটাকে মেরে ফেললো। আমি বলতে চেয়েছিলাম। ওটা আমার বন্ধু। কিন্তু তার আগেই যা হবার ঘটে গেলো। এবং এতো দীর্ঘদিনের একজন চমৎকার সঙ্গীকে হারিয়েও আমার তেমন কোনো দুঃখবোধ হলো না।

পরেরদিন কানিজকে দেখতে আকর্ষণীয় লাগছিলো। বেশ যত্ন করে সেজেছে বোঝা যায়। ইদানিং ও কাছে এলে আমি পরপুরুষের মতো ওর শরীরের দিকে তাকাই। ওর কোমল দেহটাতে যেন সবসময় বসন্ত। ঠোঁটে একটা লাবণ্য। স্তনগুলো যেন আগের চেয়ে আরো বেশি পেলব, আরো পুষ্ট হয়ে ফুটে আছে। কানিজ বালিশ ঠিক করার সময় ঝুঁকে এলে আমি ওর শরীরের গন্ধ পাই। খুব করে ছুঁয়ে দেখতে ইচ্ছে করে। নিতম্ব, কোমর বেয়ে আমার দৃষ্টি ওর চোখে এসে স্থির হয়। হ্যাঁ, শুধু ওর চাহনিটাই আগের মতো আছে। ক্ষুধার্ত। হরিণীর মতো। অথচ আমি ঠিকই জানি এর নিচে একটা আস্ত বাঘিনী ঘুমিয়ে আছে। এবং ঠিকমতো নাড়াতে পারলেই সে জেগে উঠবে।

'কি ব্যাপার। আজ হঠাৎ এতো সাজগোজ?'
'মামার বাসায় যাবো।'
'দাওয়াত?'
'দাওয়াতই বলা যায়। রাতে ওখানে থাকবো। তুমি একা একা থাকতে পারবে তো?'
চমকে উঠলাম। এর আগে আর কখনো কানিজ আমাকে রেখে বাইরে থাকেনি। মনে মনে ভীষন মন খারাপ হলো। কিন্তু কিছু বললাম না। মৃদু হাসলাম। সব প্রশ্ন উত্তরের জন্য করা হয় না।
'আর বাসায় তহুরা তো আছেই। কিছু লাগলে ওকে বোলো। বা কোনো সমস্যা হলে আমাকেও ফোন করতে পারো।'
মাথা নাড়লাম। সমস্যা নেই।
কানিজ একটা মেঘ মেঘ হাসি দিয়ে বেরিয়ে যায়।

কিন্তু কিছুক্ষণের মাঝেই ছুটতে ছুটতে ফিরে এলো।
'কি ব্যাপার? চলে এলে যে।'
'আর কি- ফোনটা রেখে গেছি।'
'কোথায়?'
'এই যে তোমার টেবিলে।'
পড়ার সুবিধার জন্য টেবিলটা আমার বিছানার সাথেই লাগানো। উপরে বইয়ের স্তুপ। যেন হাত বাড়ালেই নেয়া যায়।

আমার একবার বলতে ইচ্ছে হলো, এতো ভুলোমন হলে চলে? তাছাড়া ফোন লক করে রাখবা না? কিন্তু বলতে পারলাম না। আজকাল কিছুই বলতে পারি না। কানিজ ফোনটা তুলে ব্যাগে ঢুকিয়ে আবার বেরিয়ে পড়লো। আমি এমন একটা ভাব ধরলাম যেন কিছুই হয়নি।

তহুরা দুপুরে খাবার দিয়ে গেলো। খেতে ইচ্ছে করলো না। অনেকটা বিকেল আকাশ দেখলাম। তারপর কতক্ষণ কেটেছে জানি না, হঠাৎ চোখের কোণ দিয়ে দেয়ালের দিকে চোখ পড়তেই চমকে গেলাম। তাকিয়ে দেখি মাকড়সাটা। ঠিক আগের জায়গায়। ওটা তাহলে মরেনি? ফিরে এসেছে। নাকি এটা আরেকটা? সেটা নিয়ে বেশিক্ষণ ভাবতে পারলাম না।

ফিক করে হেসে দিয়ে ওটা মাথার ভেতর কথা বলে উঠলো।
'এতোক্ষণে হয়ত খেলা শুরু হয়ে গেছে।'
'কিসের খেলা?'
'বুঝতে পারছো না?'
'না।'
'সাবের, একেবারেই অবুঝ তুমি। দুধের বাচ্চা। হাহাহা।'
তার হাসির শব্দে আমার গা ঘিন ঘিন করতে লাগলো। সেই সাথে নিশ্চিত হলাম। মাকড়সাটা মরেনি তাহলে। আমার কিছু বলতে ইচ্ছে করলো না।

'রাশেদ নিশ্চয়ই খুব ফূর্তি করছে। একেবারে খাসা হয়ে আছে তোমার মেয়েলোকটা।'
'কি বলছো আবোল-তাবোল?'
'আবোল-তাবোল? রাশেদ কেন এতো ঘন ঘন আসে? কানিজ ছুটির দিনে কোথায় যায়- জানো না তুমি?'
'চুপ, চুপ।' আমি কান চেপে ধরি। তাতে লাভ হয় না কোনো।
'একদিনের জন্য লঞ্চে করে মানুষ কোথায় যায় জানো না তুমি? নিরিবিলি কেবিনের চেয়ে নিরাপদ জায়গা আর কিইবা হতে পারে। কী চমৎকার একটা ভ্রমণ। নদীতে ভাসতে ভাসতে...'
'দয়া করে চুপ করো।'
'আচ্ছা আমি চুপ করলাম। কিন্তু ঐ যে দেখো রাশেদ তোমার মেয়েলোকটার ব্লাউজের বোতাম খুলছে। দেখো দেখো।'

আমি সত্যি সত্যিই দেখতে পাই- শুধু দেখতে না, শব্দও শুনতে পাই। কানিজ মদির কণ্ঠে অপেক্ষা করছে। আর রাশেদের সিগারেট খাওয়া কালো ঠোঁট ঘোরাফেরা করছে ওর শরীরের নানান ভাঁজে। কুত্তার বাচ্চা। কানিজের চোখ বন্ধ। ওর ভেতরের বাঘিনীটা জেগে উঠতে শুরু করেছে ধীরে ধীরে।
'দেখো দেখো, রাশেদ ছোকরাটা কিরকম ফ্রি ফ্রি ফার্স্টক্লাস মজা নিচ্ছে। একেই বলে কপাল। অন্যের বৌ চোষার মজাই অন্যরকম।

অসহ্য রাগে আমার শরীরের যেই অর্ধেক সচল তা কাঁপতে থাকে। বড় বড় নিঃশ্বাস পড়ে। মনে মনে ভাবি আজকে বাড়িতে ফিরলেই মাগীটাকে লাথি মেরে বিদায় করে দেবো। মাকড়সাটা আবার হাসে। খিক খিক।
'কানিজও এটাই চায়। সমাজের চাপে এখনো তোমাকে ছেড়ে যেতে পারছে না। তুমি ডিভোর্স দিলে ওর চেয়ে আর বেশি খুশি কেউ হবে না। সে প্রতিরাতে আরেকজনের সঙ্গে শুতে পারবে।'

আমি শুয়ে শুয়েই হাঁপাতে থাকি। দাঁতে দাঁত ঘষি। সবকিছু ভেঙ্গে ফেলতে ইচ্ছে করে। আমি বুঝি আমার আসলে একটা কিছু দরকার। যেটা দিয়ে একটা সুনিপুণ আঘাত করা যাবে। কিন্তু কি সেই অস্ত্র? কারো সাহায্য ছাড়া আমি তো বিছানা থেকেও নামতে পারি না। হ্যাঁ, ফার্মাসিস্ট ছিলাম বলে কিছু ওষুধ সরিয়ে রেখেছিলাম গোপনে। ভেবেছিলাম কখনো কাজে আসবে। যার কয়েকটা ওভারডোজে মানুষকে মেরেও ফেলা যায়। কিন্তু...

আমি কাঁপতে কাঁপতে অপেক্ষা করি একটা নির্ভুল নিশানার।
'ভাবো। ভাবো। সেটা তোমার কাছেই আছে। খুব কাছে। এমন অস্ত্র আর কোথাও পাবে না।'
আর মাকড়সাটা ধীরে ধীরে সরে যেতে থাকে।



*
'আবারো পরকীয়া। এইটার যন্ত্রণায় খবরের কাগজ পড়াটাই আজকাল মুশকিল হয়ে গেছে।'
'আবার কি হলো।'
'তুমি দেখো নাই? সব কাগজেই তো আসছে।'
'ঐ যে স্বামীর বন্ধুর সাথে প্রেম করে পঙ্গু স্বামীটাকে বিষ খাইয়ে মেরেছে মহিলা- ঐ খবরটা?'
'আর কোনটা?'
'আমার সবচেয়ে মায়া লেগেছে লোকটার জন্য। বৌ ও তার প্রেমিক খুন করতে পারে বুঝেও কাউকে কিছু বলতে পারেনি বেচারা। আজকালকার যুগে মানুষ কতোটা অসহায়।'
'তবে মরার আগে এইটা একটা ভালো কাজ করছে। দুই পাতার চিঠি লিখে বইয়ের ফাঁকে রেখে গেছে। নইলে কি আর এতো সহজে ধরা পড়তো?'
'তবু ভাগ্য ভালো যে বাচ্চাকাচ্চা ছিলো না, তাই না? নইলে খুব দুর্ভাগ্য হতো।'

সকালের কথায় ব্যস্ত ছিলো বলে তাদের দু'জনের কেউই খেয়াল করলো না যে খুব ধীরে ধীরে দেয়ালের গায়ে হেঁটে এসেছে ছোট বাচ্চাদের হাতের তালুর সমান ধূসর রঙের একটা মাকড়সা। ভেঙ্গে যাওয়া কাঠির মতো আট পায়ের উপর বসে আছে চুপচাপ।