কাঙ্ক্ষিত আত্মহত্যা এবং ভুলে যাওয়া উজানের নাম

সূর্য্যমুখী ও নির্ঝর নৈঃশব্দ্য




সূর্য্যমুখী


কাঙ্ক্ষিত আত্মহত্যা এবং ভুলে যাওয়া উজানের নাম




কে তুমি বিষণ্ণ পাহাড়
অবাধ লাভার উদ্গিরণে হয়ে ওঠো নিষ্কাম চিৎকার?
সার বেঁধে ডুবে যাওয়া বিমর্ষ কামিজের কিনার অথবা
ঐন্দ্রজালিক নিশ্বাসে পাড়ি জমানো পরিত্যক্ত আপেল বাগান—
ভ্রম? ম্লান নখের মায়া—আকাঙ্ক্ষার বাতাসে লালিত সফেদ অন্ধকার।
ভ্রম? নিহত জলের ঘ্রাণ—অপাপবিদ্ধ মীনবালিকার নির্জন হাহাকার।

একে একে চলে যায় সন্ধ্যার মালতী, অনিচ্ছুক চিবুক
ফেলে আসা পাঁজরের একান্ত উঠান;
তবু থাকে বিনীত অশ্বত্থ—অতৃপ্ত নিশ্বাস,
সন্ধ্যার ভাগীরথী জানে—
তেরশো বকুল কেনো ঝরে পড়ে জলভর্তি ময়ূরের নামে।




কোনো বেদনাহীন গ্রীবায় তুলে রাখা স্রোতের মৃত্যু হলে
মনে রেখো, সুদূর পরিযায়ী ডানার ফিরে আসার কথা
ছায়াহীন জামগাছে তখনো আর্তনাদের জলজ বিভ্রম।
সুযোগে বেরিয়ে পড়ে হারানো আত্মহত্যা—ব্লাউজের মোড়
ফিকে আলোয় ঝলসে ওঠে স্যাঁতস্যাঁতে নটী—দ্রুতশ্বাস গাড়ি
আর মন্থর আঙুলে ফোটে অশ্রান্ত বালিকাবিলাস।

কোঁচকানো উরুর ছায়ায় বেড়ে উঠা উদোম আত্মকথা—
অলৌকিক ঝাড়বাতি—কামোদ্রেক নিবিড়তা
অথবা ভুল প্রেমে ভেসে যাওয়া লালিত কোমল, মনে রেখো—
অশ্রুত শীৎকারে দেখা মেলে জামদানি নখের কিনার।






প্রণয়ের আহ্লাদে—নির্জন করোটি সন্ধ্যায়
জেগে ওঠে যূথচারী বকুল—জেগে উঠে নিশ্চিন্দপুর;
জাগে পুরনো অসুখ। অগণন চোখ মেলে উঠে বসে বিবস্ত্র উনুন।
বিষণ্ণ নির্বাসনের নামে কেনো বেঁধে নাও সময়ের জমাট উল্লাস?
অন্ধ শালিক—দিনব্যাপী কেনো পাড়ি দেয় নাভির গোপন চৌকাঠ?

তবু উৎসব! কেড়ে নেয় জোনাকির আড়াল—নিমগ্ন দেহের উঠান—
সিঁধ কেটে তুলে আনে একান্ত হননের ঘ্রাণ।


============================================





নির্ঝর নৈঃশব্দ্য

কাঁটাসুন্দরী

কাগজ ভেঙে দিলাম—নৌকো হলো। কোন নদীতে ভাসাবো নৌকোখানি? ডোবায় ভরে আছে পৃথিবীর প্রান্তর। একটা নদী বানাই আসো, আমি প্রান্তরের বুক চিরে দিলে আড়াআড়ি—তুমি অশ্রু দিও তাতে। আরো একটা কাগজ শাদা আছে আমার বুকের ভাঁজে; তোমাকে দেবো।

মাথার ভিতর তার কবিতা নিয়ে আমি নৌকো ভাসাই। আমার নৌকো বাতাসে ভর করে ভেসে যায়, ভেসে যায়। জল বুঝতে পারে না নৌকোটা কাগজের।

সে আসে। সেও ভাসায়। আর অদ্ভুত চোখে তাকায় জলে, সে নিজেও জল হয়ে যায়, জল হতে গিয়ে হয়ে যায় জলের আগুন। তার নৌকোটি উলটে যায়। একটা মাটির ঢেলা সে ছুড়ে মারে জলে, একটা গর্তের আকার নিয়ে মাটির ঢেলা ডুবে যায়। তরঙ্গ তুলে জল পুনর্বার স্বরূপে ফিরে আসে। সে আমার গা ঘেঁষে বসে। আর বলে, ‘আপনি সাঁতার পারেন?’
‘না।’
‘আমি পারি।’ এই কথাটা বলেই সে আরক্ত হয়—যেনো আরক্ত আগুন।
‘আর আমি সাঁতার পারি না বলেই সব থেকে ভালোবাসি জল।’
মনে মনে বলি, ডুবে যেতে চাই, ডুবে যেতে চাই, ডুবে যেতে চাই...। কিন্তু আমি ডুবতে পারি না, ডুবে যায় তার কাগজের নৌকো।

আমি আর নৌকো বানাই না। এইসব অরিগামি অরিগামি খেলা আমার আর ভালো লাগে না। কাগজে আমি কালি মাখি। কাগজে রেখা আঁকি। সে চলে যায় আমার অগোচরে। জল শুয়ে আছে স্তব্ধ ছলনা নিয়ে, জল ভাসে, জল ভেসে যায়।

হঠাৎ দেখি তার ডুবে যাওয়া নৌকোটা ভেসে উঠেছে, ভেসে উঠতে উঠতে তার ভাঁজ খুলে গেছে। আর অনেকটা রুমালের মতো জলের ওপর শুয়ে আছে। আমি কী মনে করে সেটা তুলে এনে ঘাসের ওপর বিছিয়ে দিলাম। দেখলাম তাতে কী যেনো লেখা। পড়লাম। তিনটা কবিতা, তার লেখা। পড়তে পড়তে আমি কেঁপে কেঁপে গেলাম। আমার রক্তের ভিতর যেনো বা এসিড বৃষ্টির মতো বিদ্ধ হচ্ছিলো তার কবিতার শব্দগুলি। তার মুখটি আমার মনে পড়লো। তার মুখের কোথাও একটা তিল আছে মনে করতে পারলাম না। ইদানীং ভুলে যাওয়ার রোগ হয়েছে। আমার ডিমনেশিয়ার পাশে চুপিচাপ বেড়ে ওঠে একটি দীর্ঘশ্বাসের গাছ।

তারপরও আমার আবার ডুবে যেতে ইচ্ছে করে। ভয়ানক ডুবে যেতে ইচ্ছে করে।



একটা ছায়াসবুজ গিরগিটি কচুপাতার ঝোপের আড়াল থেকে আমার দিকে হাঁ করে তাকিয়ে ছিলো। মনে হলো, মনে মনে ওটা আমার রক্ত চুষে খাচ্ছে। আর অদূরে ছাতের ওপর দাঁড়িয়ে হাত নাড়ছিলো সে। চারতলার ছাত। এই বিল্ডিংটার চারতলার ছাতে কখনো-সখনো কেউ ওঠে। আমি তাকিয়ে ছিলাম। আমি তাকিয়েই ছিলাম। সে আর হাত নাড়ছিলো না; সেও তাকিয়ে ছিলো। মাঝখানে উচ্চতা, একফালি ছাত ক্যাফেটেরিয়ার, ডোবা, ঘেসো পথ, দেয়ালের বিগ্রহ, গাছবন, ঝুপড়ি, চায়ের কাপ, টিনের চালা এইসব। আর ছিলো রোদে পোড়া বাতাস—আমার দৃষ্টিপথে সনাতন শব্দের কাদা। আমি হাত নাড়িনি।

‘আপনিই ছিলেন ওই সময়?’
‘হ্যাঁ। আমি হাত নাড়ছিলাম...’
‘আমি দেখেছি।’
‘কী লিখলেন?’
‘তাও দেখেছেন? তাহলে...’
‘আমি চাইনি—আমি যা দেখি তা অন্যকেউ দেখুক। যদি দেখে তা নিজের মতো করে দেখবে—আমি দেখবো না।’

আকাশে মেঘ ভেসে যায়—আমি দেখি কার্পাসের বনে বাতাসের উথল শৃঙ্গার। এমন যাতায়ত দৃশ্যলোক আমি দেখে ফেলেছি আমার মনের ভিতরে মনে মনে, মনে মনে...। সব শেষে সব পারাপারই চরাচর। এইসব ভাবতে ভাবতে সহসা কচুপাতার ঝোপে আমার চোখ পড়তেই দেখি গিরগিটিটা রং পালটালো।



একদিন ট্রামের জানলার ধারে বসেছিলাম। আর সে বসেছিলো আমার বামপাশে। ঝুমবৃষ্টিটা নামলে আমি শাটার নামাইনি। বৃষ্টির ছাটে আমি ভিজে একসা। সেও ভিজে গেলো একপাশে। সে বললো, ‘আপনি তো আমাকে ভিজিয়ে দিলেন?’
‘তাতে কী! আমি তো কেবল আপনার ডানপাশটাই ভেজাতে পেরেছি।’
‘হুঁ।’



একটা অচেনা ফুল মেঝেতে পড়ে আছে, একা একা, একা একা। হয়তো কারো খোঁপা থেকে খসে পড়েছে আনমনে। হয়তো কেউ ছুড়ে ফেলে দিয়েছে সরোষে। এই ফুলের নাম জানি না, এই ফুল দেখার আগে জানতাম না যে ফুল এমন সুন্দর হতে পারে। আমি ফুলটির দিকে তাকিয়ে ছিলাম, কোথাও কেউ বেহালা বাজাচ্ছিলো। সে কখন এসে আমার পাশে বসেছে টের পেলাম তার সহসা প্রশ্নে, ‘আপনি কতোটা ভালো ছবি আঁকেন?’
‘সবাই বলে আমি চারুকলার একটা সিট নষ্ট করেছি। আর সেই কথাটা আমিও স্বীকার করি। আমি আসলেই...’
‘কেনো?’
‘আমি ছবি আঁকি না।’
‘কেনো?’
‘একফোঁটা বৃষ্টি যদি লিখে দিই এই বনবাসে—নির্বাসন কাঁদে না আর বনে বনে... ’
‘মানে?’
‘মানে নাই।’
‘আচ্ছা।’
‘আমি অনেকদিন আগে অনেক আগেকার একটি গল্প শুনেছিলাম। কার কাছে শুনেছিলাম ভুলে গেছি ।’
‘কী গল্প?’
‘গল্পটা অদ্ভুত এক মেয়ের।’
‘বলেন, শুনি।’
‘আচ্ছা, বলি তবে। অনেক অনেক দিন আগে কোথাও বৃক্ষহীন বনের ধারে একটি মেয়ে মাটিতে একটি অচেনা-বীজ বপণ করে অপেক্ষা করতে থাকে।
‘তারপর?
‘তারপর যখন আকাশ থেকে বৃষ্টি নেমে এলো—বৃষ্টির শীতল কণাগুলি তার ত্বকে কাঁটার মতো বিঁধছিলো, তাকে সন্ত্রস্ত করছিলো। সে ভয় পেলো কিন্তু চলে গেলো না, অপেক্ষা করতে থাকলো।’
‘আচ্ছা।’
‘আর আমি তার দিকে তাকিয়ে থাকলাম তার অগোচরে।’
‘আপনি তাকিয়ে থাকলেন মানে? ওটা তো বললেন কারো কাছে শুনেছিলেন!’
‘হুঁ, কিন্তু ওই গল্পের ভিতর আমি ছিলাম।’
‘কেমন করে?’
‘কেমন করে জানি না। তবে ছিলাম। তারপর শোনেন, একসময় বৃষ্টি থেমে গেলো, রোদের তাপে শুকোলো মাটি, ফুরোলো তার হাড়ের ভিতর লুকোনো শীত। কিন্তু সে অপেক্ষা করতে থাকলো। তার মাথার ওপর দিয়ে দ্রুত সরে যাচ্ছিলো মেঘেরা। চাঁদ উঠলো, তারারা ফুটলো। এবং তারপর আবার সূর্য উঠলো। সে অবশ্য কেবল অপেক্ষাই করলো না—সে প্রার্থনা করলো সে গান করলো, সে আবৃত্তি করলো গল্পগাথা, পুরাণ এবং লোককথাগুলি।’
‘তারপর?’
‘সপ্তমদিনে সে মেঘমুক্ত আকাশের নিচে তন্দ্রাচ্ছন্ন হলো। মাঝখানে খানিক তন্দ্রা ছুটে গেলো—যখন একটি ফড়িং উড়ে যাওয়ার সময় আলতো করে তার চিবুক ছুঁয়ে গেলো। সে দেখলো এর সূর্যমন্দিরের জানলার মতন পাখনা—রোদের আলোয় ছড়াচ্ছে রকমারি রং দিগ্বিদিক। এবং যখন ফড়িংটি উড়ে গেলো সে আবারো তন্দ্রামগ্ন হলো। আর আমি তখনো তার দিকে তাকিয়ে আছি। বৃষ্টি ছাট, রোদের তাপ, চাঁদের প্রলোভন, তারাদের ভ্রুকুটি—সে সমস্ত সহ্য করলো। চারাগাছটি বিস্তৃত সবুজ ডালপালা নিয়ে মাটি ভেদ করে দাঁড়ালো, একটি প্রশ্নবোধক চিহ্নের মতো যেনো সারা পৃথিবীকে খুঁজে বেড়ালো। সে চারাগাছটির ওপর উঠে বসলো এবং অপেক্ষা করলো, করতেই থাকলো—দিন গেলো, মাস গেলো, গেলো কতো বছর! আমি এগিয়ে গেলাম তার কাছে এবং তাকে জিজ্ঞেস করলাম কেনো সে গাছটির মাথায় ছোটো ছোটো কচি পাতার ওপর চড়ে বসেছে।’
‘সে কী উত্তর দিলো?
‘সে কোনো উত্তর দিলো না, কেবল হাসলো। আর আমি বিভ্রান্ত হয়ে গেলাম।’
‘মানে?’
‘সেই প্রশ্নটা যদি আমি আপনাকে করি?’

আমার প্রশ্ন শুনে সে কিংকর্তব্যবিমূঢ়। আমার দিকে অদ্ভুত চোখে তাকালো। আর কিছু না বলে চলে গেলো। আমি তার প্রস্থান দেখে মেঝেতে পড়ে থাকা একলা অচেনা ফুলটিকে পা দিয়ে পিষে ফেললাম। শাদাটে রক্ত তার—সে এক অদ্ভুত গন্ধ।



তার কাছে দুইটি অচেনা ফল ছিলো, রক্তাভ তার রং। একটি আমাকে ডান হাত দিয়ে দিলো। অন্যটি বাম হাতে আড়াল করলো। তারপর বললো, ‘ধুয়ে খাবেন।’
আমি ফলটা হাতে নিতে তাকে বললাম, ‘এটা কী? এমন ফলতো কোনোদিন দেখিনি!’
সে কিছু বললো না। কেবল মৃদু হাসলো। হাসিটা তার চোখে ছড়িয়ে পড়তে পড়তে সে ক্ষেতের মধ্যে কোথাও হারিয়ে গেলো। যেনো বা নিমিষে কোথাও মিলিয়ে গেলো।

আকাশে একটি তারা কাঁপছিলো তার চোখের মতন। তারাটির তলা দিয়ে উড়ে যাচ্ছিলো একঝাঁক সন্ধ্যার বাদুড়। আমি ক্ষেতের আলে বসে ফলটাতে কামড় দিতে গিয়ে থমকে গেলাম। দেখলাম আমার হাতের ওপর রক্তাভ ফলটি কাঁপছে। আমি ফলটির বোঁটায় একটি আঙুল রেখে কামড় দিলাম। আমার মুখ ভরে গেলো সুতীব্র মিষ্টি রসে। সেই রসের ভিতর একটি বীজের অস্তিত্ব টের পেলাম। আমি বাম হাতের তালুতে মুখ থেকে বীজটা নিয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলাম। তারপর তাতে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করলাম মনে মনে। আর আমার পাশের ক্ষেতের আলের মাটিতে নখ দিয়ে গর্ত করে বীজটি বপন করলাম। বাকি ফলটি চিপে রস বের করে সেই রসে বপনের জায়গাটি ভিজিয়ে দিলাম। আমি তারাটির দিকে তাকিয়ে একটি দীর্ঘশ্বাসে যতটা সময় লাগে ততক্ষণ অপেক্ষা করলাম। দীর্ঘশ্বাস শেষ করে মাটিতে তাকালাম। দেখলাম আমার বীজ থেকে মাটি ভেদ করে উদ্গত হচ্ছে একটি উদ্ভিদ, তিনটি পাতা তার। দেখতে দেখতে মুহূর্তে উদ্ভিদটি একটি আকাশছোঁয়া গাছে পরিণত হলো। ডালে পাতায় ফুলে আর ফলে ভরে ওঠলো গাছটি। গাছটির পল্লবিত দুটি ডাল এসে আমাকে জড়িয়ে নিলো নিজের সঙ্গে। আর আমি বুঝতে পারলাম গাছটির শরীরজুড়ে কাঁটা আর কাঁটা। আরো গভীর আবেষ্টনে যখন গাছটা জড়ালো আমাকে তখন আমার পাঁচ ফুট পাঁচ ইঞ্চি যৌবন আনন্দে কেঁপে কেঁপে গেলো। আমার শরীরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রতিটি রোমকূপ বিদ্ধ করলো তার কাঁটা। আমি ব্যথা পেলাম না। আমার প্রবল আনন্দ হলো। এমন অভাবনীয় আনন্দ নিয়ে আমি অবাক বিস্ময়ে দেখলাম এ আসলে গাছ নয়, এ আমার সে, যে খানিক আগে হারিয়ে গিয়েছিলো। আমি গাছের দীর্ঘ পত্রপল্লবে খুঁজে পেলাম তার চুলের বাচালতা। ফুলের মধ্যে খুঁজে পেলাম তার চোখের উদাসীনতা ও আঁখিঠার, ফলসমগ্র তার স্তনের রূপ পরিগ্রহ করলো থরে থরে, আমি ঘ্রাণ পেলাম। এইভাবে গাছের ভাঁজে ভাঁজে বিন্যস্ত হয়ে হলো তার ললিত নিতম্ব, মুদ্রিত জঙ্ঘা, উরুর ভাঁজে হারিয়ে আসা জন্মের কান্না। নীল নাভীমূল, কটিদেশে হাওয়ার চপলতা, চিবুকের নিচে কাটা দাগ, গ্রীবার নীলাভ দীঘলতা, নখের আয়নায় তেপান্তরের রূপকথা আরো আরো যা ছিলো অজানিত, বিপন্ন আনন্দের ভাই। সে বললো, ‘ডুবে যেতে চেয়েছিলে মনে মনে একদিন, মনে পড়ে তোমার?’

আমি তখন ঘোরের ভিতর, সমস্ত কণ্টকিত, আমি তখন আকাশে জ্বেলে দিয়ে তারাসমগ্র নিরন্তর ডুবে গেলাম তার ভিতর, ডুবে গেলাম হাজার বার, যেনো বা হাজার বছর।



বৃষ্টির দিনরাত চলে গেছে আরো দিন সতেরো আগে। কদমের বনে কিছু ফুল তবু সূর্যের প্রতিকৃতি হয়ে আছে সকালবেলা। সকালের অদ্ভুত চরিত্র। সকাল কিছুই দেখায় না—শুধু সীমাহীন শূন্যদুপুরের কাছে নিয়ে যায়। আর দুপুর হাঁটায় মাইল মাইল রোদের সড়ক, বসতে দেয় ইট কাঠ ধূলি পাথর গাছের শিকড়ে পাতায়, ঘাসে ঘাসে। শেষবার কিনা জানি না—দেখা হলো না। রোদে রোদে—কেউ জানে না আমি রোদের কারবার করি। গতরাতেও পুড়ে গেছি জোছনার মদে। কেউ জানে না আমি জোছনা পাহারা দিই। সে জোছনা আর রোদের মধ্যবর্তী রূপ চুরি করে সাজালো নিজেকে। তারপর আরক্ত সমস্ত দাঁড়ালো আমার মুখোমুখি। তখন কী বিভাজন আমার ভিতরে—তা দুর্বোধ্য।
‘অনেকদিন দেখি নাই। অসুখ ছিলো?’
‘হয়।’
‘কী হয়?’
‘হাসপাতালে ছিলাম সতেরো দিন।’
কী হয়েছিলো?
‘ডুবে গিয়েছিলাম।’
‘জলে?’
‘না তো!’
‘তাহলে?’
‘কাঁটার সমুদ্রে...।’
আমার কথা শুনে অদ্ভুতভাবে হাসলো সে। তারপর বললো, ‘কাল ফিরছি।’
‘আমিও যাচ্ছি।’
‘অদ্ভুত!’
‘কী অদ্ভুত?’
‘কী অদ্ভুত মিল আমাদের দুজনের মধ্যে।’
‘আরো একটা বিষয়ে মিল আছে।’
‘কী সেটা?’
‘আপনিও আমার মতো শূন্যতার পরিমাপ করে বেড়ান...’
তারপর সে আরক্ত বুকের ভাঁজ থেকে বের করে আনলো একফালি ফুল—স্বেদসিক্ত, লাল। সেদিনের সেই ফুলটির মতোই একটি অচেনা ফুল। মনে হয় সেই ফুলটির সহোদর কিংবা আত্মজা। বললো, ‘এই নেন, আমার কাছে ছিলো।’
আমি সূর্যমুখী হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম রাস্তায়। ফুলটির ছায়া পড়লো আমার বুকে। বললাম, ‘না, নেবো না। ওটা রাখার জায়গা আমার কাছে নেই।’