ব্যক্তিগত হ্রদে স্নান

দেবজিৎ অর্ঘ্য মুখোপাধ্যায় ও সংহিতা সান্যাল

দেবজিৎ অর্ঘ্য মুখোপাধ্যায়

ব্যক্তিগত হ্রদে স্নান
১।
'উদাহরণ ১: আমি একটা রচনার একটি অ-সরল অংশের স্মৃতিকথা ভাবছিলাম।

প্রতীক: আমি দেখলাম- আমি একটা অ-সরল কাঠের টুকরোকে সরল করছি।'



তলাতে তলাতে সূর্যাস্তের ঠোঁটে কালো ব্লাউজের কথা লিখে বোঝাতে চেয়েছিলাম কতটা নির্লিপ্তি আসলে চাই।যে মুক্তি চেয়েছি, ইন্দ্রিয়জগৎ থেকে। লেবু পাতার মত চিবিয়ে ফেলেছি নিজেকে। আগুন তরলে মিশেছে রক্ত। কিংবা দাগী জ্যোৎস্না। কিংবা ছটফটে বজ্র-বিদ্যুৎ। স্নায়ুস্বাদ বদলে গেছে ঘনঘন। ঋতু বদলে গেছে সময়ের আগেই। এমনকি পৃথিবীর সব ঘড়ি যেন তখন উপবাসে মত্ত। আমি নিজেকে খুঁড়ছিলাম কথামতো।

তোমাকে অধিকারবোধে দেওয়ালে চেপে ধরিনি কোনওদিন
বরং আমারই পিঠ ঠেকে গেছে বারংবার
এভাবে আমি ছোটবেলার রংপেন্সিলের মত হারিয়ে যেতে চেয়েছিলাম দেওয়ালেই

জীবন ঠিক রাস্তা চিনে ফিরে এসেছে বাড়ি
মুখোশ আর অ্যালকোলাহল ছাড়িয়ে। ঘরে ঢুকে,বাইরের ধুলো খুলেছে এসে স্নানঘরে।টানটান শুয়ে পড়েছে তিনদিনের বাসি বিছানায়। তার অনায়াস চলন ছিল পাড়ার গলিতে। মুখের গন্ধে চরিত্র ভুরভুর করে (তুমি জুঁই ভেবে দু'চারবার ঠকেছো)

অদূরে প্যাঁচ কষেছি, কতটা নিরপেক্ষভাবে নিজেকে ঠকানো যায়। আসলে যে বিছানা ভেঙে কোথাও ঢুকে যাচ্ছে না আমি-সমেত,আমার একমাত্র অর্জন যে ছাদ - সেই ছাদ নেমে আসছে না বুকে - এমনটা আমি ক্রমাগত বুঝিয়ে গেছি নিজেকে।

প্রেম বোঝাতে ক্ষয় আর নতুন ছিঁড়ে ফেলার খড়খড়ে শব্দ- নিষিদ্ধ তখনও ছিল মজার।
সাক্ষাতের আপেল আর ফাঁকে গলে যাওয়া ওষুধ।
পরাজিত এই টান আর কাঁচা সংসার
এসব উপেক্ষার কথা ছিল
নির্লিপ্তে সেবাদাস - পাকদণ্ডী ছাড়িয়ে ফেলবো শক্ত হাতে। কুণ্ডলিনীর কুশল জানতে চেপেছে জীবন মাফিয়া।

ভেবেছিলাম, এসবের মুখে লাথি মেরে কাটিয়ে দেওয়া যাবে
এই অসম লড়াই - ইন্দ্রিয় বিক্রেতাদের সঙ্গে।

তিনিও বিক্রেতাদের ইন্দ্রিয়ে ইন্দ্রিয়ে ঘাপটি মেরে থাকেন
ঈশ্বরের মত


২।

"উদাহরণ ৫: আমি যে- সব অধিবিদ্যা সম্বন্ধে পড়াশুনা করেছিলাম সে-সবের উদ্দেশ্য সম্পর্কে আমি ভাবছিলাম। আমি ভাবছিলাম যে এ-গুলোর উদ্দেশ্য হ'ল নিজে নিজেকে ক্রমান্বয়ে উন্নততর চেতনার জগতে অথবা অস্তিত্বে পৌঁছে দেয়া এবং এরই মধ্যে খুঁজে বের করতে হবে অস্তিত্বের মূল সূত্রটি।

প্রতীক: আমি লম্বা ছুরি নিয়ে একটা পিঠে কাটছিলাম যেন আমি মাঝখান থেকে একটুকরো তুলে নেব এই ভেবে।"

উপেক্ষাই উদ্দেশ্য ছিল যদিও - জুড়ে দিয়েছি বেঁচে থাকার প্রসঙ্গে একটা নির্লিপ্তি কতটা জরুরি
( বিভাজনে আমাকে রাখি)
আমি নিজেকে আবিষ্কার করি শূন্যে
যেখানে সমস্ত সময়কে আদরে দাঁতে চেপে থামিয়ে দিয়েছ
তখনও আমার গলা অব্ধি ছিল মদ
তোমাকে অন্যদিনের তূলনায় অনেক বেশি সমবয়সি লাগছিল।

সেবকের ষড়যন্ত্র - মাথার মধ্যে চাপ চাপ শূন্য
ব্যক্তিগত কোনও দিনে
আমারও ছাড়ার কথা ছিল -সাফসুতরো
আর লাল চোখে তোমার সামনে দাঁড়াব না
তুমিও আর কখনও চুমুর অছিলায় শুঁকে নেবে না
আমার মৃতের কবরের মত হাঁ গাল

অস্তি-স্বস্তি ছাই
আঁচে পাক খায় ঘোর
তোমাকে দেদার মিথ্যে বলেছি


মদ খেলে তোমাকে এতটা শান্ত আর অনেক বেশি কাছে পেতে ইচ্ছা করে - এসবের জন্যই আমার নেশাটার উদ্দেশ্য
মিথ্যে হয়ে গেলো

৩।
"সুতরাং দেখা যাচ্ছে যে স্বপ্ন ভিন্নও আমরা প্রতীকের ব্যবহার দেখে থাকি। 'সোলমনের গানে' এমন অনেক প্রতীকের উল্লেখ দেখা যায়। সোলমনের গানে খুঁটিকে পা, তোরণকে শরীরের ছিদ্রপথ, ইত্যাদি ভাবে বর্ণনা করা হয়েছে।"


ঈশ্বরকে ডোরাকাটা ডেকেছিল বুকের পাশে
একবুক জল আর বন ভয়েজ
ঈশ্বর সেই ডাকে সাড়া দিয়েছিলেন কিনা জানা নেই
তবে তোমার বুকের পাশে আমার বসতে
খাঁটি ভাল লাগে

স্নায়ুরা ফিরে এসেছে খালি হাতে
যেভাবে আমি ফিরে যাব আরেকটু বাদে
এই এখান থেকে, মুখে মদের গন্ধ নিয়ে
তোমার কাছে ঠোঁট চাইতে ইচ্ছা করছে খুব।
তুমি আমাকে নেশা আর পালানোর মত এত জোরে আঁকড়ে ধরো
যাতে দম বন্ধ হয়ে আসে
তোমার বুকের কাছে কথা দিতে ইচ্ছা করে -
আর কোনদিন মদ ছোঁব না
ছুঁলে আমার জিভ ছিঁড়ে নিও - জবা ফুলের মত

ভাঙা বোতলের টুকরোগুলো আলাদা আলাদাভাবে হিংস্র
(তোমার নখে আদরের কুচি লেগে থাকে। কাজলকণারা রাতের মত শান্ত-বক্তা।)
তাদের সামগ্রিক হিংস্রতাকে ভয় পাচ্ছি আমরা
ঠোঁট খুলে আসে হাসিতে
আমাদের যাওয়ার ছিল কোথাও
বরং উলটে চেটেছি দোরগোড়া
তোমার ঠোঁট, জিভ, বুক
পায়ের আঙুল
এসব নিছকই মাতলামি

'লম্বা ধরনের কোন জিনিস,যেমন ছুরি,গাছের গুঁড়ি,ছাতা ইত্যাদি পুং জননেন্দ্রিয়ের প্রতীক।আবার বাক্স, কাপবোর্ড, চললি ইত্যদি জরায়ুর প্রতীক।'

এসব ছিল হিসাবের বাইরে।আমিও চেয়েছিলাম, উত্তরের বাইরে কিছু একটা হতে। অথচ আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে গেছি বোধের পূর্ণমানে।

জীবনের মুখে ঝুঁকে পড়ে
অজস্র অভ্যেসে চুমু খেয়েছি সকালে বিকেলে। তার থেকে খুলে নিয়েছি চামড়া, মাংস, রক্ত। বোধ বলে কোনও অঙ্গ খুঁজে পাওয়া যায়নি - পৃথিবীর নির্জনতম ডাইসেকশন টেবিলেও। অথচ আমি থেকে বোধ কেটে বাদ দিতে চেয়েছিলাম।
যেখানে তোমার সাহায্যের পরিমাণ ঋণাত্মক।
(তার পাকস্থলীতে মদ পাওয়া গেছিলো। তার জিভে, মদ সম্পর্কে কোন ঋণাত্মক বাক্য খুঁজে পাওয়া যায়নি। এমনকি মগজ ছেঁচেও তেমন কিছু পাওয়া যায় নি। তার হাসি খুলে রেখেছে ডোম - অন্য মড়াদের দেখাবে বলে - একটা খুশি মৃতদেহের উদাহরণ হিসাবে।

পোস্টমর্টেম রিপোর্ট কেটে ফেলেছে চক্রান্তকারী ইঁদুরের দল।)

এখনও অনেক মিথ্যে তোমার জানা বাকি


================================================

সংহিতা সান্যাল

ধুম লেগেছে হৃৎকমলে


তার চলাফেরা সাপের বিষ অঙ্গে নিয়ে। সামনে কাচের বোতল উল্টে পড়ে আছে এখন। ওতে নেশা খুঁজেছিল। তীব্র সুরায় ঝাঁজ থাকে। কিন্তু নেশা কই? মদ শরীরে ঢুকে আলতো চুম্বনে জাগিয়ে তোলে স্নায়ু। ঝড় শেষ হলে নিয়ে যায় ঘুমের অতলে। তার কী হবে এমন সামান্য খেলায়, যার মাথার ভেতর সাপের ডেরা? লোভ বার করে চেরা জিভ, হিসহিসিয়ে ওঠে মাৎসর্য, ল্যাজ আছড়ায় ক্রোধ, মোহ বারবার খোলস বদলায়। কালো হিরের মতো প্রায়ান্ধ চোখ নিয়ে শঙ্খ লাগার ঘোরে শীতঘুম ভাঙে কাম। তবে তাকে যুগ যুগ ধরে নাচিয়ে তুলছে যে, তারও নাম মদ। সে সাপের বিষ শিরায় আগুন ধরিয়ে দেয়, ফণা উঁচু হয়ে উঠতে চায় সকলকে ছাপিয়ে। ফণায় বুঝি রামধনু ঠিকরোয় মণি থেকে, চোখ বুজিয়ে দেয়। কানের কাছে মন্তর পড়ে – ‘কেউ নয়... আমি... আমি... আমি’। বড় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে সে, আমাদের মানুষটি, যার পায়ে বহুকাল ধরে পথ লেগে। তাকে আমরা ‘আদম’ বলে ডাকি? যে আদমের কানে সাপের ভাষা বীণ হয়ে বেজেছে সেই প্রথম ঊষায়! শান্তি পায় না সে। ঘাসে শুতে চায়, মদ তাকে ঘিরে গড়ে তোলে দুর্গ, সিংহাসন, মুকুট । ছুঁয়ে দেখতে চায় প্রিয় মুখ, বিষ কথা বলে ওঠে – ‘আমি... শুধু আমি...।’ এক-একদিন হাঁটার পর দেখতে পায় হাতেপায়ে লেগে আছে কত ম্লান মুখ। নিজের অজান্তেই পিষে ফেলেছে সর্পমণি দেখাতে গিয়ে। মণির নাম অহং, তার দ্যুতি দু’চোখে ধরা যায় না। যে যত নিঃস্ব, তার শূন্যতা তত বেশি শুষে নেয়, তত বেশি ঝলসে ওঠে। এতই আলো যে কেউ দেখতে পায় না, আদৌ কিছু আছে কি না। সে আলো মাথার ভেতর চমকে উঠলে আদম দেখতে পায় না কোথায় বোধিবৃক্ষ, কোথায় তপোবন, কোথায় রূপকথা লিখছে গোলাপের দেশের লোক। দেখতে পায় না প্রেম, নরম হতে পারে না তার চোখ, তার বলিষ্ঠ দুই হাত শুধু উঠতে থাকে আকাশের দিকে। প্রতিটি কোষ তার কানে মোহময় জয়গাথা শোনায়, প্রতিটি হাড় ঠোকাঠুকি করে বলে সে কত বেশি সক্ষম, রক্তে ঘূর্ণি লাগে আর পেশি ফুলে ওঠে। সে কোলাহলে মত্ত হয়ে দু’হাতে আদম থেঁতলে দেয় গলা যা অন্য সুরে বাঁধা, বুঝতে পারে না ঐকতানের পদ্মকাঁটা সুখ। দু’পায়ে দলে যায় নিবেদিত রক্তিম হৃদয়। নিজের হৃৎপিণ্ড তাকে প্রশস্তি শোনায়। কঙ্কালময় এঁকেবেঁকে ঘুরতে থাকে মদ।
আদম এখন স্থির বসেছে। সে চিনতে পারে কোন পথে সাপের চলন। কালো মানুষের রক্ত বড় তীব্র লাল, দেখেছে। দেখেছে ব্যাঙের ছাতার মতো ধোঁয়ামেঘ, ছাইয়ের শহর। জানলার কাচে শেষ হাতের ছাপ দেখেছে দমবন্ধ হয়ে মরা লক্ষ লক্ষ মানুষের। স্থান-কাল-পাত্র ভুলে যায় সে, শুধু টের পায় কে কবে পাগল হল আলোর নেশায়। কে কবে আউড়ে চলল নিজের স্তব আর ধুলো করে দিল এ পৃথিবী, যা বেঁচে থাকে পারস্পরিক ঘাম-ওম-ঘ্রাণের উত্তাপে। বিকল্প নেশার খোঁজে সে আপন করতে চেয়েছে অন্য বাস্তব, কিন্তু সেই মেদুর পথ তাকে ফিরিয়ে দিয়েছে নিজেরই গহিন আঁধারে। সেখানে স্যাঁতসেঁতে ঠাণ্ডায় খসখস শব্দ শুনে আর্ত হয়ে, ভয় পেয়ে ফিরতে চেয়েছে, চোখ মেলতে চেয়েছে অন্য কোথাও, অন্য কোনওখানে। আর সেভাবেই একদিন হঠাৎ চোখ পড়ে গেছে আরেকজোড়া চোখে। সে মুখ কার, সে চোখ কার, সে অদ্ভুত আনন্দ কার, সে জানে না। শুধু জানে, তার চোখে তাকাতে হলে আগে মাথা নামাতে হয়। ফণা নামাতে হয়।
সে আজ বসেছে এক অদ্ভুত হল্লীশকের কেন্দ্রে। এ শব্দটা খুঁজে এনেছে অনেক পুরনো দিন থেকে, যখন টানা কালো মেঘ উঠত যমুনার ওপর। যখন শিখিপুচ্ছধারী এক বাঁশিওয়ালা শিখিয়েছিল কীভাবে দেওয়াল ভাঙতে হয়। প্রত্যেক পায়ের ছাপে এক-এক করে খসে যেত অলংকার, অহংকার – রিক্ত হয়ে তার প্রেমিকা জ্বলে উঠত আগুনের শিখার মতো। একজন দাহ্য, অন্যজন স্বয়ং দহন – তাদের ঘিরে মেতে উঠত হাওয়া। আজ সেই ঘূর্ণিনাচের হাওয়া নিতে বসেছে সে। চোখ বন্ধ করে দেখছে কবেকার দাউদাউ পুড়ে যাওয়া – যেখানে ‘আমি’র রক্তমাংস গলে গলে পড়ছে অবিরত – সে দেখছে আগুনের শিখার ভেতর থেকে উঠে আসছেন গৌরকান্তি দিব্যদেহী... তাঁর অন্তরে বাঁশির সুর তো বহিরঙ্গে আর্তি... তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে বৃদ্ধ কবি জোড়হাতে পাঠ করে চলেছেন ‘রাধিকার ভাবকান্তি করি অঙ্গীকার।/ নিজরস আস্বাদিতে করিয়াছ অবতার।।’ এই অগ্নিময় বৃত্তের মাথার ওপর গাঢ়কৃষ্ণ আকাশ... অজস্র উল্কায় পা ফেলে ফেলে চিরপিপাসু জীবাত্মা ছুটে চলেছে পরমাত্মার বিরাট ব্যপ্তিতে নিজেকে লীন করে দেবে বলে। পায়ের নিচে ঢেউ তুলেছে পঞ্চরসের নদী... শান্ত-দাস্য-সখ্য-বাৎসল ্য পরস্পরের সঙ্গমে কী বিস্তীর্ণ করে তুলেছে মধুর রসের মোহনা! হাওয়ার ঝাপটায় উড়ে গেল একরাশ ধুলো। সে বন্ধ চোখের দেওয়ালে দেখতে পাচ্ছে টিমটিমে প্রদীপ জ্বলছে। পাহাড়ের প্রাচীন গুহায় গুরু বোঝাচ্ছেন উজানবাহনের মুদ্রা। ধমন-চমন বশে এনে নৈরাত্মার সাহায্যে কেমনভাবে জাগিয়ে তুলতে হয় মহাসুখ। বন্ধ হয়ে যাচ্ছে এক-এক করে কপাট... কুলকুণ্ডলিনী কেঁপে উঠছে প্রাণের স্পন্দনে... মূলাধারপদ্ম সহসা মেলে দিল সহস্র পাপড়ি! এক লহমায় শূন্যে ভেসে উঠল সে – যেখানে ‘আমি’ বলে কেউ নেই, কিছু নেই! সে কী মধুর যন্ত্রণা, সে কী অসহ্য সুখ! বুঝি আবার সে ফিরে পাবে সেই দুই চোখ যা তাকে এমন বিস্রস্ত করেছে! তক্ষুনি তাকে ভাসিয়ে নিয়ে গেল আর-এক প্রবল তরঙ্গ – ‘না’! মর্মভেদী আর্তনাদে খানখান হতে গিয়ে দেখে... তার বিচ্ছেদবেদনা দিওয়ানা হয়ে গাইছে, ‘ছাপ-তিলক সব ছিনি রে মোসে নয়না মিলাইকে’... অনন্তব্যপী মাশুকের দিকে তার রুহ সমস্ত পৃথিবীর রুহ হয়ে হাত বাড়িয়েছে... সে আশিক, সে সুফি সরমস্তা... তার পথ কেউ চেনে না...! তার পায়ে পায়ে ধুলোর ঝড়, পতপত উড়ছে তার আলখাল্লার প্রান্ত, সেই প্রলয় অবাক চোখে দেখছে সদ্য বসন্ত থেকে সেরে ওঠা এক কিশোর! সে আত্মবিস্মৃত, সে নিজেকে খুঁজে মরছে জলে-ভেসে-যাওয়া গল্পে। আদম গান থামিয়ে দেখছে, তারই বিচ্ছেদ কেমন কেঁদে ফিরছে অন্যের গানে – ‘আমি একদিনও না দেখলাম তারে/ আমার বাড়ির পাশে আরশিনগর, সেথা এক পড়শি বসত করে!’ যে ছুঁয়ে দিলে যমযাতনা দূরে যায়, যে রূপ দর্পণে দেখলে চরণদাসী হতে সাধ যায় - সেই তাকে খুঁজেই কলম তুলে নিলেন আরেক দর্শক। যেন সময়ের সিম্ফনি থেকে তুলে আনলেন চিরন্তন নোট... খসখস করে লেখা হতে লাগল – ‘সকল অহংকার হে আমার ডুবাও চোখের জলে’! বৃষ্টি এল তারপর। শত শত প্রলয়ের বৃষ্টি। শত অভিসারের বৃষ্টি। আত্ম থেকে আত্মার অন্বেষণে নৌকো বাওয়ার নদী ভরে উঠল প্রেমিকের অশ্রুতে। নিভে গেল সর্পমণির আলো। নিস্তেজ মদ নামিয়ে নিল ফণা। আদম অবাক হয়ে দেখল, কিছু নেই। কিচ্ছু নেই। শুধু যমুনার তীর, পথের ধুলো, বাউলের মুঠো, সব ভরে উঠেছে পদ্মরেণুতে। সহস্রদল পদ্ম সূর্যের মতো জ্বলছে। আর... দেদীপ্যমান পদ্মরাগ রোদের নিচে দাঁড়িয়ে সেই মনের মানুষ, সেই পরম ‘পিয়া’, সেই জীবনদেবতা... যার নেত্রসম্পাতে শাক্যসিংহ বুদ্ধ হয়ে উঠেছিলেন! সে শরীরের সব শক্তি একত্র করে দৌড়ল... ধূমকেতুর মতো... খসে পড়তে থাকল তার সমস্ত অতীত-বর্তমান-সম্ভাবনা. .. তার পরিচয়, তার আমিত্ব... একটি অকম্প নক্ষত্রের আলোর মতো তার সত্ত্বা মিশে যেতে চাইছে... কিন্তু কীসের পিছুটান? কেন তার পা আটকে যাচ্ছে? বারবার? ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল – নিষ্প্রাণ রিপু ফের মাথা তুলেছে! তার ঠাণ্ডা, শীতল, অমসৃণ দেহ ক্রমশ পেঁচিয়ে ধরছে তার পা, শরীর... রোদ গ্রাস করে ঘিরে ধরছে অন্ধকার... দেখা হবে না তাকে? ফিরে যেতে হবে? পৃথিবীর সমস্ত আত্মার কান্না একসঙ্গে আদমের গলা চিরে বেরিয়ে এল... ‘না’!
২.৭.২০১৮, আর্থ। দুপুর তিনটে উনিশ মিনিটে একটি শিশুর জন্ম হল।