দাগ

উপল বড়ুয়া ও বৃতি হক

উপল বড়ুয়া

দাগ

—এই দাগটির নাম কাম। এক পুরুষ সিংহের আঁচড়।
—থাবায় বুঝি বিচূর্ণ করেছিল কাতর মন্দিচূড়া?
—তারচে’ উপভোগ্য ছিল তার গোঙানো।
—সিংহ নাকি কামুক অজগর?
—হুক লাগানোর মিস্ত্রি।
—আর ঐ যে তলপেটের নিচে; ওটা!
—জন্মদাগ। আদম-হাওয়ার যৌন ফসিল। গঙ্গার
দিকে বয়ে গেছে। পূর্ণার্থীদের তীর্থস্থান।
—উহাকেই কি বলে শরীর?
—আদিম পুস্তক। সৃষ্টির গণগণে চুল্লী। বাল্মিকীর ঢিবি।
—ওখানে কারা থাকে?
—হিংসা-লোভ-পুঁচ-বত্রিশ প্রকার অশুচি। যে শরীর
দেখে জানছো সুন্দর তার ভেতরে অনন্ত ময়লার স্তুপ।
—তাই বুঝি ঢেকেছো সুতোয়?
—খুললেই ওড়ে যাবে রহস্যের অক্ষর।
—অক্ষর গেঁথে যদি বাক্যের মালা গলায় পড়ি...
—তবে এসো আমাকে পাঠে প্রবৃত্ত হও। আমিই
তোমার ব্যঞ্জন ও স্বরবর্ণ।
—আমি তোমার যতিচ্ছেদ।


কামদূত

তোমার প্রশ্রয় পেয়ে আমার ঠোঁট হয়ে উঠছে আরও বেশী কামুক। এই এক এমন পুরুষালী রোগ যে পাহাড়ের চূড়ায় চড়ে গেলে আমার জিহ্বায় লকলক করে আগুন। কতো জয় করেছি কতো রহস্য মোড়া পাহাড়; বাকি ছিলে তুমি। পৃথিবীর সমস্ত শোভা নিয়ে অহংকারী চূড়া—আমিই প্রথম শাবল দিয়ে খুঁড়েছি তোমার উরুর সুড়ঙ্গ। আর কঁকাতে কঁকাতে তুমি কোমর পেঁচিয়ে হয়ে গেলে সাপ। আমার নিচে সাগর হয়ে আমাকে শেখালে সাঁতার...

দূর শৈশবের গান

ঐ স্তনপাহাড়ে আজ ঘুরে ঘুরে মারা যাচ্ছে ঘোড়সওয়ার; দস্যু-তাতারের দল
ভোঁতা শরতের দিকে তারা ধেয়ে যাচ্ছে হুল্লোড়ে—থিকথিকে মেঘেদের দেশে
সম্ভাব্য সব ঘটে যাচ্ছে; বধ্যভূমির পাড়ে দাঁড়িয়ে ডাকতে ইচ্ছে হচ্ছে—‘কুহু’
একটা ‘প্রবেশ নিষেধ’ গেইটের সামনে দুইটা কুকুর শুঁকে নিচ্ছে নিজেদের
শেষ রাতের ঘ্রাণ—কড়া নিরাপত্তার ফটক পেরিয়ে ওগো শিউলি তোমাকে
খুব পেতে ইচ্ছে করে আজ কুকুরের মতো-ব্যাঙের মতো কোমরে পা তোলে
ঐ স্তনপাহাড়ের খাদে কাশবনে আমার আধখাওয়া লাশ পাওয়া যাবে কবে?

=====================================================

বৃতি হক

ভবচক্রে রাধা ও কিছু পদ্মস্মৃতি


এইতো, ঘুম ঘুম পাথরচোখে তাকিয়ে আছি। দেখছি, অথবা দেখছি না কিছুই। আমার চারপাশ জুড়ে ঋতুর পালাবদল-- হিম ঝরে, বসন্ত আসে, পত্রপুষ্পে বৃক্ষ শোভিত হয়, আকাশ ফুঁড়ে জল নামে, ভূকম্পনে মাটি সরে যায়। ঝুরঝুরে বালুজীবনে কিছু ছায়া দৌড়ে পেছনে চলে যায়। ফেলে আসা দৃশ্যরা মগ্ন চোখের পাতা আলতো ছুঁয়ে বলে, স্বপ্ন ছিলাম না তো! কোনো এক জীবনে তোমার সাথে দেখা হয়েছিল। মনে করে দ্যাখো! আমি ভাবতে থাকি। শরীর থেকে সাড়া মুছে গেলেও কিছু চিহ্ন তো পড়ে থাকে! রয়ে যায় পদ্মস্মৃতি। শিলালিপি, তোমার ফসিল জীবনের পরতে পরতে লেখা আছে ওষ্ঠের ছন্দ, স্পর্শের পয়ার, তরুণীর গোপন আশ্লেষ আর নিমজ্জনের সুর।

২০৬৭ সালের কোন এক মনোমুগ্ধকর বিকেলে রিউল ভ্যালি রিজিয়নের নান্দনিক ক্রি নদীর দিকে দৃষ্টিপাত করা যাক। নদী বললে অবশ্য এর প্রায়-সমুদ্রাকৃতি সম্পর্কে ধারণা করাও দুষ্কর হয়ে যায়। প্রমেথেই টেরা হাইল্যান্ড থেকে হেলাস বেসিনের দিকে বয়ে চলা বিশালকায় এই স্রোতস্বিনীর পশ্চিম পাড়ে দুজন তরুণ তরুণীকে দেখা যাচ্ছে। ছেলেটি ছবি আঁকছে। দীর্ঘকায় অবয়ব, ছ’ফুট চার উচ্চতার অ্যাথলেট গড়ন। বাদামী চুল ও ত্বকে তার স্প্যানিশ পরম্পরা সম্পর্কে অনুমিত হয়, অবশ্য তার মুখশ্রী বেমানানভাবে শিশুসুলভ, লাজুক। কথাপ্রসঙ্গে জানা গেছে, ছেলেটির নাম হোর্হে। তরুণীটি নদীর পারে ঘাসের ওপর উপুড় হয়ে আছে একটা ট্যাবলেট নিয়ে। গভীর মনোযোগে কিছু পড়ছে। তার নামও জেনেছি-- নুয়েরী। মাঝারী গড়ন, শ্যামলবর্ণ, মিষ্টি কমনীয় চেহারা তার। জেনেছি, তার পূর্বপুরুষ বাংলাদেশের নদী বিধৌত ডেল্টা রিজিওনের কোন এক এলাকায় বাস করত। জলের প্রতি নুয়েরীর দুর্নিবার আকর্ষণ অবশ্য কিছুটা অস্বাভাবিকই মনে হয়েছে আমার কাছে।

বেশ কিছুদিন যাবৎ নুয়েরী এবং হোর্হের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করছি আমি। তাদের অজান্তেই। হুটকুলের ভেতর ফুটকুলে হয়ে যখন তখন তাদের ব্যক্তিগত সরঞ্জামাদিতে হানা দিই, নিজস্ব আলাপচারিতায় কান পাতি। অর্ধপ্রতিসম অবয়ববিশিষ্ট এই মনুষ্যকুল নিয়ে আমার আগ্রহের সীমা নেই। সুদূর নীল গ্রহ থেকে আমাদের লাল গ্রহে তাদের আগমন খুব বেশি দিনের নয়। মানবপ্রজাতি সম্পর্কে ইতোমধ্যে বেশ কিছু তথ্য আমার ডাটাবেসে জমেছে। সব বোধগম্য না হলেও এটুকু অন্ততঃ বুঝেছি, পার্থিব পঞ্জিকামতে, একবিংশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে ধর্মীয় মেরুকরণের কারণে সেখানে বিভিন্ন সম্প্রদায় তথা জাতির ভেতর হানাহানি চরম আকার ধারণ করে। ক্রুসেড, জিহাদ বা অন্য যে কোন নামে হোক—ধর্মীয় সংঘাত পৃথিবীর সবপ্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে। শান্তি রক্ষার জন্য গৃহীত বা প্রণীত সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। অবশেষে বিশ্বব্যাপী এক সর্বধর্মীয় মহাসম্মিলনের মাধ্যমে কিছু সর্বগ্রাহ্য চুক্তিস্থাপনের চেষ্টা করা হয়। প্রথম প্রথম অস্বচ্ছ ঠেকলেও ধীরে ধীরে এই ধারণাটির ইতিবাচক দিকগুলো সবার নজরে আসে। ইত্যবসরে অবশ্য শান্তিকামী একদল মানুষ মঙ্গলগ্রহে এসে বসতি স্থাপন করে ফেলেছে। মানুষবান্ধব ডোম তৈরি করে অবশ্য কয়েক দশক ধরেই মঙ্গলের বেশ কিছু এলাকাজুড়ে মানুষ উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টির প্রক্রিয়া চলছিল। এই মার্স-সেটেলারদেরকে অবশ্য বাড়তি কিছু নিয়ম নীতিতে আবদ্ধ হতে হয়েছে। পার্থিব যাবতীয় ধর্মের নিষিদ্ধ কাজগুলোকে সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে মঙ্গলগ্রহে। ক্রিশ্চিয়ান ধর্মের সেভেন ডেডলি সিন থেকে শুরু করে হিন্দুধর্মের ষড়রিপু, ইসলাম ধর্মের গুনাহ অথবা বৌদ্ধধর্মের ত্রিবিষ-- লাল গ্রহে মনুষ্যকুলের নতুন বসতিতে এসব কোন ‘মন্দ’ নেই। মঙ্গলে অরাজকতা নেই, এক অব্যাহত চরমসুখ বিরাজ করছে শুধু। নুয়েরী এবং হোর্হে মার্স-সেটেলারদের প্রথম গ্রুপ “অরিয়ন” এর দুই তরুণ সদস্য।

নুয়েরীর সামনের হলোগ্রাফিক ট্যাবলেটে বেশ কয়েকটি ট্যাব খোলা। ওর যাবতীয় গেজেটে আমার অবাধ স্বচ্ছন্দ যাতায়াত। অনায়াসে ট্যাবলেটেও প্রবেশ করা গেলো। বিভিন্ন ট্যাবের ভেতর একটিতে যথারীতি গান চলছে ক্রমাগত। আরেকটাতে মধ্যযুগীয় মিথিলার রাজকবি বিদ্যাপতির একটি কবিতা দেখা যাচ্ছে-- কবিতাটির অর্থ হৃদয়ঙ্গম করার চেষ্টা করছে সে।
এ সখি, হামারি দুখের নাহি ওর।
এ ভরা বাদর মাহ ভাদর
শূন্য মন্দির মোর।
ঝম্পি ঘন গরজন্তি সন্ততি
ভূবন ভরি বরি খন্তিয়া
কান্ত পাহুন কাম দারুন
সঘন খরশর হন্তিয়া
কুলিশ শতশত পাত মোদিত
ময়ূর নাচত মাতিয়া
মত্ত দাদুরি, ডাকে ডাহুকী
ফাটি যাওত ছাতিয়া
তিমির দিগভরি ঘোর যামিনী
অথির বিজুরিক পাঁতিয়া
বিদ্যাপতি কহ কৈছে গোঙায়বি
হরি বিনে দিন রাতিয়া।


মেয়েটি অনুসন্ধিৎসু, অবিসংবাদিতভাবে রাধা-কৃষ্ণ সম্পর্কে আরও জানতে আগ্রহী হল সে। আমার ডিস্কে নুয়েরী সম্পর্কে আরও কিছু আপাত ধারণা যুক্ত হল। মেয়েটি প্রকৃতি প্রেমিক। গান শুনতে, বই পড়তে ভালবাসে। সাহিত্যের প্রতি অনুরাগী। ধারণার অনুকূলে তথ্যঃ অলিম্পাস ডোমের সাহিত্য বিষয়ক সম্পাদক সে। ধর্মশাস্ত্রেও আগ্রহ আছে তার।


এক ন্যানো সেকেন্ডে আমিও যা জানলাম-- রাধা কৃষ্ণের প্রেম আখ্যান “শ্রীকৃষ্ণকীর্তন” নামক এক প্রাচীন পুঁথিতে প্রথম পাওয়া যায়। অত্যাচারী কংস রাজাকে নিধন করার উদ্দেশ্যে বাসুদেব ও দেবকীর ঘরে জন্ম কৃষ্ণের। সন্তানের জীবন রক্ষার্থে জন্মের পরপরই কৃষ্ণকে বাসুদেব গোপনে বৃন্দাবনে জনৈক নন্দ গোপের ঘরে রেখে আসে। সেখানে আরেক গোপ পরিবার সাগর গোয়ালার ঘরে রাধা বড় হচ্ছিল। বালিকা বয়সে আয়ান গোপের সাথে রাধার বিয়ে হয়। কিশোর কৃষ্ণ বয়সে বড় বিবাহিতা রাধার প্রেমে পড়ে অযাচিতভাবে।

চলে নীল শাড়ী নিঙাড়ি নিঙাড়ি
পরাণ সহিত মোর।
সেই হৈতে মোর হিয়া নহে থির
মনোরথ জ্বরে ভোর।


রাধা সাধারণ গোয়ালা ঘরের বৌ, দুধ-দই-ননী বিক্রির জন্য তাকে মথুরাতে যেতে হয়। পথিমধ্যে কানাই তাকে বারবার প্রেম নিবেদন করে। রাধা সাড়া দেয় না, তবে কানাই নাছোড়বান্দা। তার বাউন্ডুলে বাঁশি অবশেষে একসময় রাধার অস্ত্বিত্বে নেশা ধরিয়ে দেয়।
সই, কেবা শুনাইল শ্যামনাম।
কানের ভিতর দিয়া সরসে পশিন গো
আকুল করিল মোর প্রাণ।


অতঃপর কানুর জন্য রাধিকার প্রতীক্ষার শেষ নেই, তার কাছে দিনকে রাত আর রাতকে দিন বোধ হতে থাকে-

কী মোহিনী জান বঁধু কী মোহিনী জান।
অবলার প্রাণ নিতে যাই তোমা হেন।
ঘর কৈনু বাহির, বাহির কৈনু ঘর।
পর কৈনু আপন, আপন কৈনু পর।
রাতি কৈনু দিবস, দিবস কৈনু রাতি।
বুঝিতে নারিনু বঁধু তোমার পিরীতি।


রাধা চাঁপা মালতী ফুল দিয়ে কুঞ্জকুটিরকে সাজায়, নিজেকেও অপরুপ সাজিয়ে তোলে। কৃষ্ণ ছাড়া রাধার জীবন মাটি-‘কাহ্ন বিনী হৈবে নিফল জীবন।’

রূপ লাগি আঁখি ঝুরে গুণে মন ভোর।
প্রতি অঙ্গ লাগি কান্দে প্রতি অঙ্গ মোর।


অবিরাম বর্ষণের রাত। শয্যা পেতে রাধা অপেক্ষায় থাকে আর ভাবে, নিশ্চয়ই অন্য কোনো নারী নিয়ে রঙ্গরসে মত্ত কানু। অভিমান হয় তার। বাদল রাতে পথের দিকে তাকিয়ে থাকে, এই বুঝি কানু আসে--

এ ঘোর রজনী মেঘ গরজনি
কেমনে আওব পিয়া।
শেজ বিছাইয়া রহিলু বসিয়া
পথ পানে নিরখিয়া।


কার্তিকের এক অয়োময় সন্ধ্যা। অবশেষে ঘন অন্ধকার কাটিয়ে আকাশ ছেদ করে বেরিয়ে এলো দিব্যকান্ত সুগোল চন্দ্র, মিলনের ছন্দ ছড়িয়ে দিলো ধরায়। বেজে উঠল কৃষ্ণের বাঁশি। ঘর ছেড়ে বৃন্দাবনে ছুটলো গোপীরা। রাধা তথা গোপীদের সাথে কৃষ্ণের এই মিলনের উৎসব রাসলীলা। রস থেকে রাস। রস বলতে বোঝায় সার, নির্যাস, আনন্দ, হ্লাদ, অমৃত, ব্রহ্ম। তৈত্তিরীয় উপনিষদে (২/৭) রস সম্পর্কে বলা হয়েছে, রসো বৈ সঃ। ব্রহ্ম রস বিনে অন্য কিছু নন। শ্রীকৃষ্ণ এই রসের আধার। মহারাস, বসন্তরাস, কুঞ্জরাস, দিব্যরাস, নিত্য রাস- প্রেম রসের এই পঞ্চলীলায় মহারাসে রয়েছে কৃষ্ণের সাথে রাধার অভিসার।

সমাজের চোখে রাধা কৃষ্ণের প্রেম পরকীয়া বলে বিবেচিত হলেও তাত্ত্বিকেরা বললেন অন্যকথা। আয়ান রাধার স্বামীত্বের অধিকার পেয়েছিল বটে, কিন্তু রাধার নারীত্বের সপ্তসুর সে ছুঁতে পারেনি। বিষ্ণুর অষ্টম অবতার কৃষ্ণ। কৃষ্ণ পরমাত্মা, বা ঈশ্বর। রাধা হল জীবাত্মা। শ্রীকৃষ্ণ সৎ-চিৎ-আনন্দের মূর্তিমান বিগ্রহ। রাধা সেই আনন্দের প্রকাশাত্মিকা শক্তি। শ্রীকৃষ্ণের হ্লাদিনী বা “নাদ” অংশ-সঞ্জাত রাধা এসেছে তার লীলা-সুখানুভবের জন্য।

ভালোবাসায় তবে কী সুখ নেই? পরিশেষে সে কী কেবলই বিরহ এবং কষ্টের ক্লিশে গল্প? শুধু কাম-ই কী সত্য? নুয়েরী জানতে চায়। কানাই একদিন মথুরায় চলে যায়, অত্যাচারী কংসকে নিধন করে রাজ্যপাট গোছায়। শত প্রেমিকার ভিড়ে রাধাকে স্মরণ করার সময় কই কৃষ্ণদেবের! রাধাকে কী তার মনে পড়ে? লোকে রাধাকে নিয়ে কানাঘুষো করে। কাব্যে রাধার বিরহ ক্রমাগত উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর হয়ে উঠতে থাকে। বিরহী রাধার কথকতা “শ্রীকৃষ্ণকীর্তন” ছাড়িয়ে বাংলা সাহিত্য ও গানের সর্বত্র।
ভ্রমর কইও গিয়া
শ্রীকৃষ্ণ বিচ্ছেদের অনলে
অঙ্গ যায় জ্বলিয়ারে
ভ্রমর কইও গিয়া
ভ্রমর রে …
কইও কইও কইওরে ভ্রমর
কৃষ্ণরে বুঝাইয়া
মুই রাধা মইরা যাইমু
কৃষ্ণহারা হইয়া রে
ভ্রমর কইও গিয়া …

অবশেষে কী হল রাধার? নুয়েরী আর্তস্বরে প্রশ্ন করে। নিঃশব্দে সে প্রশ্ন অবশ্য এখন আমারও।
দুঃখের কথা হল, এই পুঁথির প্রথম দুই পাতা এবং শেষ এক পাতা পাওয়া যায়নি, তাই কাহিনীর শেষটুকুও জানা যায় না। বিভিন্ন যুগে বিভিন্নজন ভিন্নভাবে এর উপসংহার টানতে চেয়েছেন। “শ্রীকৃষ্ণকীর্তন” কাব্যের নাম ও কবির পরিচয় জানাও সম্ভব হয়নি। কাব্যে চন্ডীদাসের তিন ভণিতা পাওয়া যায় বলে ধারণা করা হয়, কাব্যের রচয়িতার নাম চন্ডীদাস এবং বড়ু তাঁর কৌলিক উপাধি, যা বাড়ুজ্জ্যে বা বন্দোপাধ্যায়ের অপভ্রংশ। চণ্ডীদাস সম্পর্কে যা জানা গেলো, বাশুলী মন্দিরের পুরোহিত থাকাকালীন এই বৈষ্ণব কবি রামী নামক এক রজকিনীর প্রেমে পড়েন। তাদের প্রণয়কে অবৈধ ঘোষণা করে চণ্ডীদাসকে সমাজচ্যুত এবং মন্দির থেকে বিতাড়িত করা হয়। চণ্ডীদাস প্রথম মানবতাবাদী বাংলা কবি—যিনি জাতপাতবিহীন সমাজের কথা নির্ভয়ে উচ্চারণ করেছেন। চণ্ডীদাস। আহা!
আর রাধা! প্রাচীন সেই প্রেমপ্রতিমার দুঃখে নুয়েরীর গাঢ় মায়াবী চোখে জল। সময় কত বদলে গেলো! মানুষও। ভাষাও বদলালো। বদলালো না শুধু একান্ত অনুভূতিগুলো। কদম গাছ গুচ্ছ গুচ্ছ কদম ফুল ফুটিয়ে যাচ্ছে এখনও। অন্য এক কৃষ্ণ অন্য এক বাঁশি বাজিয়ে যাচ্ছে। দু’হাজার ষোলো’র জনৈকা শিউলি যেভাবে তার নিভৃত ডায়েরিতে লিখেছিল কিছু কথা ...
“দ্যাখো, কেমন অসহ্য সুন্দর হয়ে উঠছি আমি দিনদিন। কোকুন খুলে সদ্য বেরিয়ে আসা প্রজাপতির মত। উদ্ভাসিত। সবুজের নিগুঢ় বন্ধন ছিঁড়ে বেরিয়ে এলাম, তথাপি বিশাল পৃথিবীতে নিঃসঙ্গ নিজেকে আবিষ্কার করে বিষণ্ণ থেকে বিষন্নতর। শেষ প্রহরে যেভাবে ঝরে পড়ে কুয়াশা। দীর্ঘ কিছু শ্বাস যেভাবে আটকে থাকে বাতাসে, দীঘল আয়নায় অতঃপর আনমনে এঁকে ফেলে একটি দরজা একটি জানালা। জানালার চাতালে নিমগ্নমুখ তোমাকে ভাবতেই দরজা উন্মুক্ত করে দেয় উদাস বিবশ পথ। চারপাশের দেয়াল উড়ে যেতে থাকে। ইট খোলার প্রান্তরে নির্জন ধোঁয়ার মত উড়ে যায় ক্লান্তি। উড়ে যায় পাখি। ওড়ে যমুনার জল। মুঠো থেকে ছুঁড়ে ফেলি দ্বিধা, সংশয়। আমি তানহা গো, তৃষ্ণা! আমি জেনে শুনে বিষ পান করি, সোনালি পায়ে জড়িয়ে নিই নূপুর। দু’হাত মেলে আমি নাচছি, বানভাসী ছন্দে আনন্দে গুঁড়িয়ে দিচ্ছি অতলে জমে থাকা পাথর। আমাকে মাতাল করো প্রমত্ত দখিন হাওয়া। আমাকে বিত্রস্ত করো কালবোশেখির ঝড়। উত্তুংগ পাহাড়ে বাঁধি তোমার আমার ঘর। আমাকে পুড়িয়ে ফেলো সোহাগী দাবানল।“
কিংবা,
“আমি কবিতা গো। এই ছেলে, আমার কাছে জাদু আছে। নিবি?”

শারদীয় পূর্ণিমা রাতে শিউলি লিখেছিল তার একান্ত চন্দ্রকথা-

“মাঝরাতে জানালা ভেঙে সুপ্রাচীন সে আছড়ে পড়ল ঘরে। আমি চন্দ্রাহত। চাঁদ বেপরোয়া, নির্লজ্জভাবে ভর করল আমার উন্মুক্ত বুকে। কোমল উষ্ণ ঠোঁট থেকে চেটেপুটে খেল আমার সলজ্জ বাঁধ। আমার বাম স্তনে অমৃত। ডান স্তনে দুঃখের নহর। চন্দ্র সওদাগর, অমৃত সবটুকু নিলি, দুঃখটুকু কেন ছুঁয়েও দেখলি না! দস্যু তাতার আমার, ঘোড়া ছুটিয়ে দখল নিলি উত্তর থেকে দক্ষিণ, পূর্ব থেকে পশ্চিমের সবটুকু ভূমি। চুমুতে চুমুতে নিমিষে ফুটিয়ে দিলি হাজারো তারার ফুল।“

কিংবা,

“তোমাকে পেলে আমার শ্লোকের আকাশে একটি দু'টি করে চাঁদ ফোটে। একটি দু'টি করে শোক।“

নুয়েরী চুপচাপ দীর্ঘশ্বাস ফেলে। কান পেতে রাধারমণের গান শোনে, “কারে দেখাবো মনের দুঃখ গো আমি বুক চিরিয়া/ অন্তরে তুষেরই অনল জ্বলে গইয়া গইয়া”। নুয়েরীর ব্রেনওয়েভ স্ক্যান করি দ্রুত। পৃথিবীর নীল শেকড় উপড়ে ফেলতে পারছে না মেয়েটা। নুয়েরীর সাথে অন্য ট্যাবে চলে যাই ভিন্ন কিছু উত্তরলাভের আশায়--

“দুঃখ কী? এর থেকে পরিত্রাণের উপায় কী?” ধর্ম ও নীতিকথা বিষয়ক সেমিনারে গেরুয়া পরিহিত শ্রমণ বলছিলেন সিদ্ধার্থের কথা। ঊনত্রিশ বছর বয়সে এক ভর পূণির্মার রাতে ঘুমন্ত বৌ বাচ্চাকে নিঃশব্দ বিদায় জানালেন সিদ্ধার্থ, তারপর ঘর ছাড়েন বোধিলাভের আশায়। আলারা বা উদ্দক- দুই সন্ন্যাসীর কেউ-ই তাঁর বিবিধ প্রশ্নের সদুত্তর দিতে পারেনি। অবশেষে মগধের উরুবিল্ব নামক স্থানে কঠোর তপস্যায় নিমগ্ন থেকে সিদ্ধার্থ অর্জন করেন চতুরার্য, যা আমাদেরকে বলে সেই চারটি পরম সত্যের কথা।
জীব ইন্দ্রিয় সুখের জন্য ছুটে মরে। কিন্তু এই সুখ ক্ষণস্থায়ী। তা অর্জন করতে দুঃখ পেতে হয়, তা রক্ষা করতেও। আবার সুখের নাশে দুঃখ হয়, নাশের কল্পনাতেও দুঃখ। জন্ম, জরা, শোক, মৃত্যু, ক্লেশ, উদ্বেগ, প্রিয় বিয়োগ, অপ্রিয় সংযোগ, আকাঙ্খা, কামনা-- সব কিছুতেই দুঃখ নিহিত। নিরবচ্ছিন্ন দুঃখ একটি বাস্তব ঘটনা এবং এটি বুদ্ধের প্রথম আর্যসত্য।
দুঃখ বাস্তব সত্য হলে কারণও নিশ্চয়ই আছে। দ্বিতীয় আর্যসত্যে আছে দুঃখের কারণ বা দুঃখ সমুদয়। বুদ্ধ বলেন, জীবনে দুঃখের কারণ হল তৃষ্ণা। তৃষ্ণা তিন প্রকারের- কামতৃষ্ণা, ভবতৃষ্ণা এবং বিভব তৃষ্ণা। কামনাকে আশ্রয় করে তৃষ্ণার জন্ম। তৃষ্ণার কারণে জীবের পূনর্জন্মের কারণ তৈরি হয়।
ব্যাধি, জরা, মরণ, শোক ইত্যাদির কারণে দুঃখ কেন হয়? বুদ্ধ বলেন, যেখানে জন্ম, সেখানে জরা ও মৃত্যু। জন্মেছি বলেই আমরা দুঃখকষ্ট ভোগ করি। আবার জন্মের কারণ হল ভব, পুনরায় জন্মগ্রহণের ব্যাকুলতা। এই ভবের কারণ হল উপাদান-- জাগতিক বস্তু বা বিষয়ের প্রতি আসক্তি। উপাদানেরও কারণ আছে এবং তা হল তৃষ্ণা। বুদ্ধমতে, তৃষ্ণা মানুষকে বারবার জন্ম গ্রহণ করার প্ররোচনা দেয়। আমরা জন্ম গ্রহণ করেছি, কেননা আমাদের মধ্যে জন্ম গ্রহণ করার আকাঙ্খা ছিল। আমরা দুঃখভোগ করি, তারও কারণ সুখের প্রতি আমাদের তৃষ্ণা। দুঃখ থেকে শুরু করে অবিদ্যা পর্যন্ত কার্যকারণ শৃঙ্খলে মোট বারোটি নিদান আছে, সম্মিলিতভাবে যাদেরকে ভবচক্র বলা হয়। এই দ্বাদশ নিদানের ক্রিয়ার জন্য মানুষ ভব সংসারে চক্রবৎ যাতায়াত করছে, অর্থাৎ তার জন্ম হচ্ছে, দুঃখ ভোগ হচ্ছে, এবং মৃত্যুমুখে পতিত হচ্ছে, তৃষ্ণার কারণে পুনরায় জন্ম গ্রহণ করছে।
দুঃখের উৎপত্তি রোধ ও দুঃখের বিনাশ সাধনই দুঃখ নিরোধ-- এই হল তৃতীয় আর্য সত্য। দুঃখের যে সব কারণ রয়েছে, সে গুলোকে রোধ করতে পারলেই দুঃখ নিরোধ সম্ভব। তৃষ্ণা, অবিদ্যা ইত্যাদি কারণগুলোকে নিঃশেষে বর্জন করে দুঃখের মুলোৎপাটন করাই দুঃখ নিরোধ এবং একেই বলে নির্বাণ। ভোগ স্পৃহা দূর হলে যখন আর বিষয়ের প্রতি আসক্তি থাকে না, তখন মানুষের পুনর্জন্ম গ্রহণের সম্ভাবনা থাকে না। প্রদীপ যেমন উপাদানের অভাবে নিভে যায়, ঠিক তেমনি নির্বাণে তৃষ্ণার রোধ হয়। তৃষ্ণার নাশ হলে উপাদানের নাশ হয় এবং উপাদানের নাশ হলে মানুষকে আর দুঃখের কবলে পড়তে হয় না।
কি উপায়ে আমরা দুঃখ নিরোধ করতে পারি, তা চতুর্থ সত্যে বলা হয়েছে। অবশ্য দুঃখ নিরোধ সহজসাধ্য নয়। এর জন্য অক্লান্ত প্রয়াস ও সাধনার প্রয়োজন। দুঃখ নিরোধের উপায় হিসেবে বুদ্ধ আটটি নিয়ম বা অষ্টাঙ্গিক মার্গের উল্লেখ করেছেন। মূলতঃ চতুর্থ আর্যসত্যই বৌদ্ধ নীতি শাস্ত্রের ভিত্তি।


ট্যাবলেটের ক্যালেন্ডারে নোটিফিকেশন এলো। আজ বাংলা কার্তিক মাসের পূর্ণিমা। সুদূর পৃথিবীর ছোট্ট সবুজ এক সীমানায় রাসলীলার আনন্দউৎসব হচ্ছে নিশ্চয়ই! নুয়েরী খোলা আকাশের দিকে তাকায়। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমেছে, ডিমোস পূর্বাকাশে উত্থিত হয়ে অতি ধীরে ধীরে পশ্চিমে চলছে। আর পশ্চিম থেকে পূর্বাকাশে ফোবোস তার তড়িঘড়ি যাত্রা শুরু করেছে। মঙ্গলের এই চন্দ্রযুগলের দিকে তাকিয়ে নুয়েরী থমকে যায়। কার্তিক পূর্ণিমায় যমুনার থৈ থৈ কালো জল ভেদ করে বিশাল সোনার থালার মত উত্থিত চাঁদকে মনে পড়ে। পৃথিবীর একটিমাত্র চাঁদ। অথচ কী প্রচন্ড শক্তি তার! ভাবতে গিয়ে রাধা অথবা শিউলি অথবা রীরী-- এরকম আরও শত শত পূর্বজন্মের সৌগন্ধ এক প্রবল জোয়ারের টানে হু হু করে ভেসে আসতে থাকে, নুয়েরীকে কেন্দ্র করে ঘূর্ণিপাক খেতে থাকে। প্রমত্ত ঢেউয়ের তোড় এক অদৃশ্য বাঁধকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়! চক্ষে আমার তৃষ্ণা, ওগো তৃষ্ণা আমার বক্ষজুড়ে! নুয়েরীর হৃদস্পন্দন দ্রুততর হয়। হোর্হের দিকে ফেরে সে, ছেলেটি গাঢ় চোখে তার দিকে তাকিয়ে। সে কি তার আর-জন্মের কৃষ্ণ অথবা উপল, অথবা রণের কথা ভাবছে? দু’জোড়া উষ্ণ ঠোঁট অজান্তেই সঘন হয়ে আসে। আমার ভেতর সতর্কীকরণ অ্যালার্ম বিপ বিপ আওয়াজ তুলল। ক্রি নদীর পাড়ে জন্মান্তরের পুরনো আখ্যান নতুন করে মঞ্চস্থ হবে আবার। এক গ্রীক দেবতা হাঁটু মুড়ে বসেছে এক বঙ্গদেবীর সামনে। প্রণয়প্রার্থনা করছে। “ভবচক্র!” নুয়েরী হোর্হের দু’হাত নিজের বুকে চেপে ধরে ফিসফিস করে।

ভবচক্র! হতাশ প্রতিধ্বনি করি আমিও। হায় মনুষ্যকুল! দেশালাই কাঠি! অন্যের হাতে দ্যাখো, কেমন আগুন জ্বলে উঠছে! এই তৃষ্ণা মিটতে আরও কয়েক জন্ম অপেক্ষা করতে হবে তাদেরকে! মরণ! ডাটাবেসে ঝটপট নতুন তথ্য যোগ করে শাটার চেপে দৃষ্টি বন্ধ করার আগে অজান্তেই হোর্হের ৫ডি’তে আঁকা ছবিটা নজরে আসে আমার। সুন্দর পরিচ্ছন্ন এক তপোবন। অনেক বৃক্ষের মাঝে একটি বোধিবৃক্ষ। একটি কালো সাপ তাকে পেঁচিয়ে আছে।