রাগিতে রাগিও না

সোহম কর ও সরোজ দরবার



সোহম কর, সরোজ দরবার

রাগিতে রাগিও না




একটা এক কামরার ঘরে
আমরা তিন জন থাকি।
রাত হলে,
একই বিছানায় তিনজন শুতে যাই।

ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই
বিছানা একে একে খালি হতে থাকে।

দিদা চলে যায়
কাপড় কাচতে, ঘর মুছতে, রান্না করতে –
আরও কত কাজ।

বোন উঠে মশারী খোলে,
কলেজে যাওয়ার প্রস্তুতি
নিতে থাকে।

আমারও ঘুম ভেঙে যায়,
এত আওয়াজ, তোড়জোড়
কিছুই ভালো লাগে না।

আমার ভিতরের চাপা রাগ
আমায় শান্তভাবে শুইয়ে রাখে।

রাগ থেকে সারা শরীরে ঘাম হয়।
রাগ থেকে নিভৃতে নির্লিপ্ততার রাস্তায় শুয়ে থাকি।
রাগ নিয়ে কিছুতেই জেগে উঠতে পারি না।


এরকম দিনে আসলে খুব মেঘ করে। এক রাগী রাগী যুবকের প্রেম উড়ে যায় বাষ্প হয়ে। প্রচণ্ড তাপে তখন আবেগের জমি ফুটিফাটা। অথচ এ যুবক তো সংসার ভালবাসে। ভালবাসে তার ওই এক কামরার ঘর। ঠাসাঠাসি তিনজনের বিছানা। জেগে থাকা রাতের চোখ-জ্বালা আর সকালের বিরক্তি। সুগন্ধী পারফিউমের জীবন কি তাকে হাতছানি দেয়নি, নাকি সে চায়নি শপিংমলের ঠান্ডায় দু-দন্ড জিরিয়ে নিতে! অথচ এই এক কামররা ঘরই তার নিদারুণ ঘড়ি, যা সে মণিবন্ধে বেঁধে রাখে। খটকা লাগে, ওই সুন্দর বাসের জীবন কি সে সত্যিই চায়! নাকি এই সকালের খুটখুট, বিরক্তি আর ঘামের গন্ধই তার অভিজ্ঞান, যা থাকে মনে করিয়ে দেয় তার রক্তে বইছে কৃষি। রাসায়নিকের গন্ধ তার হজম হওয়ার নয়। অথচ সেই বাসে ম ম করছে চতুর্দিক। এই ঘর্ষণেই তাপের জন্ম, ভাপে উবে যায় প্রেম। আর এইসব দিনে খুব মেঘ করে ওঠে। রাগী রাগী ছেলেটা শুতে চলে যায় রাস্তায়। আর অনেকক্ষণ পরে নির্লিপ্তি ঘনিয়ে এলে তার উপর এক-ফোঁটা দু-ফোঁটা ঝরে পড়ে বৃষ্টি।

রাগ গলে জল!




আসলে রাগ বলে কোথাও কিছু নেই। এক অবিরাম ঘর্ষণে স্ফুলিঙ্গ ঠিকরে ঠিকরে বেরোয় মাত্র। সভ্যতার চাকা ঘুরছে তো ঘুরছেই। মানুষে-মানুষে, মতে-মতে, রাষ্ট্রে আর রাষ্ট্রের ধারণায় ক্রমাগত ঠোকাঠুকি লাগছে, আর ঘর্ষণে জন্ম নিচ্ছে আগুন। আগুনই সভ্যতার পাওয়ারহাউস। আবার অগ্নিতেই খান্ডবদহন। আগুনেই ক্ষুণ্ণিবৃত্তি, আবার আগুনেই লকলক ধ্বংস। আগুনেই ঘন উষ্ণতা, সেই আগুনেই আবার পতঙ্গের মরণ। এই বিপরীতের চাকা ঘুরছে। এ দ্বন্দ্বকে সুরাসুরের যুদ্ধ বলা যেতে পারে, তবু সুর-এর উলটো অসুর তো নয়। অথচ এই কৃত্রিম বিভাজন দাগিয়ে দেওয়ার সরল ছলনাটুকুতেই চোখ টেপে রচয়িতার হাতের ইতিহাস। একদিন তার কুটিরে পৌঁছালে দেখা যায়, প্রক্ষিপ্তে দেওয়াল ভরতি। তখন রাগ হয়। তবে সন্দেহ হয়, সে আসলে অভিমান নয় তো! শ্রীকৃষ্ণ তো বললেই পারতেন, তিনি চন্দ্রাবলীর কুঞ্জে নিশিযাপন করেছেন। অথচ নখরাঘাতে ক্ষত বক্ষসি নিয়েও রাধার সামনে এসে তিনি কেন ছলনার আশ্রয় নিলেন! কেন সত্যিটাকে লুকোতে গেলেন! সুতরাং রাধার স্নায়ু যে জ্বলে উঠল এই বিরোধাভাসে, তা মান নাকি রাগ। দেখি আমাদের এই রাগী রাগী যুবকও এই সময়ে দাঁড়িয়ে বলে,

তুমি আমায় বললে,
তোমার জীবনে অনেক স্তর আছে।
তার মধ্যে সবচেয়ে ভালো স্তরের নাম হল,
জেনুইন ইম্পর্টেন্ট পার্সন।

ঠিক সেইখানে নাকি তুমি,
সবচেয়ে ভালো একখানা চেয়ারে
আমায় বসতে দিয়েছ।

বলে দিয়েছ—
অন্য কোথাও না তাকাতে।

তুমি প্রত্যেক দিন,
তিনবেলা এসে আমায় আদর করো।
রেঁধে-বেড়ে খাইয়ে যাও।

বোঝাতে থাকো—
তুমি আমায় অসম্ভব ভালোবাসো।

তার পর কোথায় একটা চলে যাও।
কে যেন তোমায় ডাকতে আসে।
আমি কিছুই জানতে পারি না, বলতে পারি না—
এই ভালো চেয়ারের লোভে।

আহ! ভালো চেয়ারের সেই ক্রনিক অসুখ! রাধা নিশ্চিত সেদিন বুঝেছিলেন, এই ভালো চেয়ার বলে আদপে কিছু নেই। আর কৃষ্ণ বোধহয় তা জানতেনই। জটিল তত্ত্বের নিরিখে এ সবই অতিসরলীকরণ হয়ে উঠতে পারে, ভর্ৎসনা করতে পারে পদাবলী, কিন্তু এ তো সত্যি যে, সেদিন মানকেই সবথেকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন রাধা। বসিয়েছিলেন ‘ভালো চেয়ারে’। সে কি রাগ থেকে নয়! ফল? কৃষ্ণ হারানো। এখন তা যদি সইতেই পারতেন তবে তো রাগের কিংবা মানের মহিমার কীর্তন হত। হয়নি। হয়েছে উলটোটা। ফলত একযোগে স্বীকৃতি পেয়ে গেল চন্দ্রাবলী কুঞ্জে নিশিযাপন, ছলনা, রাগ থেকে মান, মানকে উচ্চ স্থান দেওয়া এবং তা সেই সিংহাসনের ক্ষয়রোগ। এই পুরো পর্বে সবথেকে বিষাদবালক ওই রাগ বা মান। যে পালা জমিয়ে দিয়েও অস্বীকৃত থেকে যায় শেষমেশ। যেন সেটাই তার স্বীকৃতি। ফলত এই রাগের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। গনগনে রাগ ক্ষমতার পাছায় লাথি মারতে যায়, আরও গনগনে রাগ ক্ষমতার প্রতিস্পর্ধী হয়ে উঠতে চায়, অথচ স্বীকৃতিহীনতাই যার ললাটলিখন, সে আর কী করে মূল অধ্যায়ে সংযোজিত হতে পারে!

রাগ তাই কোনোদিন ভালো চেয়ার পায় না।





এবার ঠিক করলাম
কিছুই না হলে—
খাওয়া দাওয়া বন্ধ করে দেব।

ছোটবেলায় এক বেলা খাইনি বলে,
বাবা সাইকেল কিনে দিয়েছিল।

আমি বাবাদের স্লোগান
মনে মনে বলেছিলাম—
‘অধিকার না পাওয়া গেলে, কেড়ে নিতে হয়’।

এবারও সব ভেবে চিন্তে
খাওয়া দাওয়া বন্ধ করলাম।

আমি আবার বাবাদের স্লোগান
মনে মনে বলেছিলাম—
‘লড়াই লড়াই লড়াই চাই, লড়াই করে বাঁচতে চাই’।

বিছানায় শুয়ে শুয়ে দেখলাম
দিন বিকেলের দিকে এগোচ্ছে।
আর তুমি কার হাত ছুঁয়ে আছো
আমি জানতেও পারছি না।

ঘড়ির কাঁটাও আমায় ফেলে এগোচ্ছে,
আমি বুঝতে পারলাম—
ছেলে নই আর, কবে থেকে যেন প্রেমিক হয়ে গেছি।


আসলে রাগ গলে যেদিন জল হয়েছিল, সেদিন ছিল অভিসার। সেদিন বিজনে নিজের সঙ্গে দেখা। সচরাচর যা হয় না। যখন হয়, তখন আয়নার পিছনে ইতিহাসের পারা। ভেসে ওঠে আমার অতীত, আমার পূর্বপুরুষের কৃতকর্ম। তাদের সাফল্য-ব্যর্থতার বলিরেখা কী করে যেন আমার মুখেও বসে যায়। বুঝতে পারি বয়স হচ্ছে। আমার সময় আমার হাত ছাড়িয়ে ছুঁয়ে ফেলতে চাইছে অনাগত আঙুলদের কোমলতাকে। সে আঙুলের বন্ধনে লুকিয়ে আছে মধুর রস। সে বাঁধনে মিশে আছে কীর্তন এবং মহিমা। তাহলে আমার ভূমিকা ঠিক কী? অবস্থানই বা কোথায়? এই যে একমাথা গনগনে রাগ আমাকে খ্যাপা জন্তুর মতো তাড়িয়ে বেড়ায় মাঝেমধ্যে, তাকে আমি রাখব কোথায়! ছুঁড়ে মারব অতীতে? মারলাম যদি, তবে ভাঙল দর্পণ। নিজেকেই আর নিজে দেখতে পাই না যখন, তখন বৃষ্টি থেমে গেছে। দেখি, সেই রাস্তার উপর শুয়ে আছি এখনও, আর কখন যেন রাত নেমেছে। সেখানে মেঘ নেই, বরং তারারা ফুটেছে একটা-দুটো করে। প্রতি তারায় দেখতে পাচ্ছি আমার মুখ, চিহ্নিত হয়ে যাচ্ছে আমার অবস্থান। এই স্থানাঙ্ক চিহ্নিত মানচিত্রে তবে আর কতক্ষণ এই নির্লিপ্তিতেত শুয়ে থাকব আমি? সম্ভব নয়। কানে ভেসে আসছে আমার সেই এক কামরা ঘরের ডাক। শশব্যস্ত হয়ে আমি উঠে পড়ি। ফিরতে হবে বলে। সে মুহূর্তে আর রাগ নেই। মনে হয়, রাগ বলে কোথাও কিছু ছিলও না। যেমন মেঘ করলে গুমোট হয়, আবার কেটেও যায়। তবু একটা আস্ত দিনই সত্যি, একটা ঋতুর চরিত্রই বাস্তব, গুমোটের বেখেয়ালিপনা নয়।

একটা গোটা জীবন তাই আবার রাগ করে কাটে নাকি! তাহলে হিসেব মেলানো যে ভার! পকেট হাতড়ে আমি তাই খুঁজে বের করি শেষ সম্বল, পড়ে পাওয়া চোদ্দআনা, অনুরাগের খুচরোগুলো।