গরলসুধা

নীতা মণ্ডল

(১)
পশ্চিম জার্মানির স্টলবার্গ শহর । শহরটি বহু প্রাচীন শিল্পনগর হিসেবে গোটা বিশ্বে খ্যাত । ১৯৫৬ সালের ডিসেম্বর মাসের শেষের দিক । কদিন ধরে টানা উৎসব চলছে শহর জুড়ে । সবাই মেতে উঠেছে প্রিয়জন , বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয় স্বজনকে নিয়ে । ডঃ স্টিফান আর তাঁর স্ত্রী ক্যারোলিনও তার ব্যতিক্রম নন । এবারের ক্রিসমাস ওনাদের কাছে আরও একটা কারনেও বিশিষ্ট । ক্যারোলিন আসন্নপ্রসবা । সেই খুশিতে এবারে ডঃ স্টিফান স্টার সিঙ্গারদের অনেক টাকা দান করেছেন । স্টার সিঙ্গিং এখানে এক প্রচলিত প্রথা । জনাচারেক বাচ্চা ছেলেমেয়ে বিচিত্র পোশাকে গান গাইতে গাইতে বাড়ি বাড়ি যায় , তাদের একজনের হাতে লম্বা লাঠির ডগায় একটা বড় তারা চিহ্ন থাকে । গান গেয়ে ওরা যে পয়সা পায় তা গির্জায় দিয়ে দেয় । দুঃস্থ মানুষের মঙ্গলে সেই পয়সা ব্যয় করা হয় ।
উৎসবের সাজে সেজেছে সারা শহর । রাস্তাঘাট , দোকানপাট , অফিস অথবা বাজার আলোয় আলোময়। লাল আর ঘন সবুজ আলোর বন্যা বইছে যেন। লাল আর সবুজ হল ক্রিসমাসের খুশির রং। ক্রিসমাস ইভে ডঃ স্টিফান ও ক্যারোলিন ওনাদের প্রিয় কিছু আত্মীয় ও বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে ডিনার করেছেন । প্রচুর উপহার বিনিময় হয়েছে পরস্পরের মধ্যে । এই গ্র্যান্ড ডিনার , উপহার আদানপ্রদান এমনকি হাত খুলে ডোনেশন দেবার পরও আর কিভাবে এই খুশি ভাগ করে নেবেন কিছুতেই যেন বুঝতে পারছেন না ডঃ স্টিফান । ডঃ স্টিফানের স্থির বিশ্বাস প্রভু যিশু ওনাকে দয়া করেছেন তাই প্রভুর প্রতি ওনার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই । ওনার ঘর আলো করে আসতে চলেছে কোনও দেবশিশু । আর মাত্র কয়েক ঘন্টার অপেক্ষা সেই সুখের খবরটুকু শুনতে । আজ পঁচিশে ডিসেম্বর , যেন স্বয়ং যিশুই আসছেন ওনার কাছে । গত কয়েকমাসের প্রতীক্ষা শেষ হবে আজ । ডঃ স্টিফান থেকে থেকে আকাশের দিকে মুখ তুলে চাইছেন আর প্রভু যিশুকে ধন্যবাদ দিচ্ছেন এই বাবা হবার সুখটুকু উপহার দেবার জন্যে ।
নবজাতক তার জয়যাত্রা ঘোষণা করেছে । ক্যারোলিন একটি কন্যা সন্তানের জন্ম দিয়েছেন ।
ডঃ স্টিফান ক্ষণিকের জন্যে ভাবলেন নিজের সন্তানের মুখের চেয়ে সুন্দর নাকি পৃথিবীতে আর কিছু হয় না । তারপর নিজের সন্তানের দিকে তাকিয়েই চমকে উঠে চোখ বন্ধ করে ফেললেন । এ কি ? প্রভুর এ কি পরিহাস ? ততক্ষণে ডাক্তার , নার্স সবাই স্তম্ভিত । এ কি রকম অদ্ভুত দর্শন শিশু ! দ্বিতীয়বার দৃকপাত করে শিউরে উঠলেন ডঃ স্টিফান । শিশুটির দুটো কান নেই । কানের জায়গা দুটো স্রেফ মসৃণ চামড়ায় ঢাকা । মাথায় চুল নেই । চোখ দুটো ছোট ছোট । হাত ও পায়ের দৈর্ঘ্যও যেন শরীরের অন্য অংশের সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন। সন্তান প্রসবের ধকল সহ্য করার পর বুঝি ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে পড়েছেন ক্যারোলিন । ক্যারোলিনকে দেখে বড় মায়া হল ডঃ স্টিফানের । ক্ষণিকের জন্য মনে পড়ে গেল দুজনে মিলে কত স্বপ্ন দেখেছিলেন সেসব কথা । তবে আবেগের বহিঃপ্রকাশ করা ডঃ স্টিফানের ধাতে নেই । প্রাথমিক আবেগকে জয় করে উনি নিমেষেই যুক্তিবাদী । ডঃ স্টিফান নিজে পরোক্ষভাবে চিকিৎসা বিজ্ঞানের সঙ্গে যুক্ত। কেমি গ্রুনেন্থাল নামক একটি ওষুধের সংস্থায় কাজ করেন উনি । ঠিক গবেষণা করে উদ্ধার করবেন কেন , কেন ওনার সঙ্গেই এমন হল ? কোনও জেনেটিক ডিফেক্ট ? ডঃ স্টিফানের নিজের অথবা স্ত্রী ক্যারোলিনের ? একবার ভাবলেন এ নিতান্ত প্রকৃতির পরিহাস নয় তো! কিছুক্ষণের জন্য বুঝিবা ওনার বিজ্ঞানবোধও নড়বড়ে হয়ে গেল । মনে হল এতদিন যা জেনে এসেছেন তা কণামাত্র , অজানা থেকে গেছে অসীম ।
কয়েক মাস পেরিয়ে গিয়েছে । ক্যারোলিন একদৃষ্টে চেয়ে থাকেন মেয়ের মুখের দিকে । মনে মনে ভাবেন এর চেয়ে সুন্দর কি পৃথিবীতে আর কিছু হয় ! এত সৌন্দর্য সত্ত্বেও শিশুটি যে আর পাঁচটা স্বাভাবিক শিশুর মত নয় তা ক্যারোলিনের অজানা নয় । স্বভাবতই উনি পক্ষিমাতার মত বুকে আগলে রাখেন মেয়েকে । ডঃ স্টিফান বুঝতে পারেন ধীরে ধীরে অবসাদের খাদে তলিয়ে যাচ্ছেন ক্যারোলিন । আচরণ বদলে গিয়েছে আগের থেকে । মেয়েকে দেখে যত না কষ্ট হয় তার চেয়ে বেশি খারাপ লাগে ক্যারোলিনের আচরণে । কয়েকমাসের মধ্যেই দাম্পত্য জীবনটা ধীরে ধীরে পাল্টে গেল ডঃ স্টিফানের । পাল্টে গেল পারিবারিক জীবনও । জীবনের কেন্দ্রবিন্দু কোথা থেকে কোথায় বিচ্যুত হয়ে গেল ডঃ স্টিফান তার তল পেলেন না । যেন পূর্বাভাস ছাড়াই এক অজানা ঝড় এসে ওনার সংসারটা তছনছ করে দিয়ে চলে গেল । বাকি জীবনটা ওনাকে সেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ভগ্নাবশেষ জোড়া দিয়েই কাটাতে হবে । এক নতুন সংগ্রাম নিত্য জীবনের অঙ্গ হয়ে গেল ডঃ স্টিফানের ।
(২)
কেমি গ্রুনেন্থাল ( Chemie Grünenthal ) নামক ওষুধের সংস্থাটির উত্তরোত্তর শ্রীবৃদ্ধি হচ্ছে । গত এক বছর ধরে থ্যালিডোমাইড নামে একটি নতুন ওষুধ তরতর করে এগিয়ে নিয়ে চলেছে এই সংস্থাটিকে । ওষুধটির বাজারে প্রচলিত নাম কন্টারগান ( Contergan )। ১৯৫৬ সালের মাঝামাঝি ওষুধটি পশ্চিম জার্মানির প্রায় চল্লিশ শতাংশ বাজার ধরে ফেলেছে। ওষুধটি ব্যবহৃত হয় অনিদ্রা , উদ্বেগ ও দুশ্চিন্তা জনিত সমস্যায় । এটিই বিশ্বের প্রথম নন - নারকোটিক * সিডেটিভ । ওষুধটির বিশেষত্ব হল এটি নারকোটিকের মত নেশার সৃষ্টি করে না। অথবা কোনও নির্ভরতা (ড্রুাগ ডিপেন্ডেন্স) তৈরি করে না। অর্থাৎ পরবর্তী কালে ঘুমের ওষুধ ছাড়া আর ঘুম আসবে না এ সম্ভবনাও কম । কেমি গ্রুনেন্থাল ওষুধটিকে নিরাপদ ঘোষণা করে বাজারে ছেড়েছে । এক বছরের মধ্যে ওষুধটি জনপ্রিয়তায় প্রায় অ্যাসপিরিনের সমান জায়গায় পৌঁছে গিয়েছে । অতি দ্রুত ওষুধটি আরও একটা কারনে জনপ্রিয়তা অর্জন করল। দেখা গেল যে অন্তঃস্বত্বা মহিলাদের ক্ষেত্রে মর্নিং সিকনেসে * ওষুধটি চমৎকার কাজ দেয় । অতএব ওষুধটি জার্মানি ছাড়াও আয়ারল্যান্ড , ইতালি , সুইডেন , অস্ট্রেলিয়া , নেদারল্যান্ডস , জাপান সহ আরও বিভিন্ন দেশে প্রবেশাধিকার পেল ও ব্যবহার শুরু হল ।
থ্যালিডোমাইড বাজারে আসার পর প্রায় চার বছর অতিক্রান্ত । অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে ক্রাউন স্ট্রিট উইমেন্স হসপিটালে ডাক্তার ম্যাক ব্রাইড নামক এক চিকিৎসক একটি অদ্ভুত ঘটনা লক্ষ করলেন । পর পর তিনটি প্রায় এক ধরনের বিকলাঙ্গ শিশু ওনার দৃষ্টি আকর্ষণ করল । তিনজনের ক্ষেত্রেই একটা ব্যাপারে উনি মিল পেয়েছেন। তিনজনেরই মা গর্ভাবস্থায় থ্যালিডোমাইড নিয়েছিলেন মর্নিং সিকনেসের প্রতিষেধক হিসেবে । ‘ এই ওষুধটিই শিশুগুলির অঙ্গ বিকৃতির কারন নয় তো ! ’ ম্যাক ব্রাইডের মনে খটকা জাগল। ১৯৬১ সালে নভেম্বর মাসের শেষের দিকে ম্যাক ব্রাইড এই সম্ভবনার কথা একটি নিউজ লেটারে প্রকাশ করলেন । ঠিক একই সময়ে জার্মানির হ্যামবার্গের এক শিশু বিশেষজ্ঞ , ডাক্তার ডব্লিউ লেঞ্জ একটি কনফারেন্সে পেশ করলেন যে উনি সম্প্রতি কম করে ৪৫ জন মাকে লক্ষ করেছেন যাদের শিশুরা ফোকোমেলিক * অর্থাৎ বিকৃত অঙ্গ । প্রত্যেকের একটাই মিল যে ওনারা সবাই গর্ভধারণের একদম গোড়ার দিকে থ্যালিডোমাইড গ্রহণ করেছিলেন । দুই দেশ থেকে দুটি একই ধরনের রিপোর্ট যা দাবি করল তার মর্মার্থ , এই বিশেষ ধরনের বিকলাঙ্গ শিশু জন্মানোর পিছনে থ্যালিডোমাইড যে কালপ্রিট হতে পারে সে সম্ভবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না । এই চাঞ্চল্যকর তথ্যটি আরও অনেকবেশি ডাক্তারকে উদ্বুদ্ধ করল ব্যাপারটা খতিয়ে দেখতে , এ ধরনের শিশুগুলিকে চিহ্নিত করতে এবং তার সঠিক কারন বিশ্লেষণ করতে। সংবাদ মাধ্যমগুলিও সক্রিয় হল ।
দ্রুত প্রকাশ পেল যে গত চারবছরে বিভিন্ন দেশে বহু শিশু জন্মেছে যারা এই অদ্ভুত অঙ্গবিকৃতির শিকার। ওদের দেখলে মনে হয় যেন মাতৃজঠরেই শিশুটিকে কেউ নিষ্ঠুর হাতে দুমড়ে মুচড়ে দিয়ে চলে গিয়েছে । এই শিশুগুলির মধ্যে কারোর কান নেই , কারোর চোখ নেই , অথবা থাকলেও তারা দৃষ্টিশক্তি বা শ্রবণশক্তিহীন । কারোর দুটো হাত নেই অথবা হাত পা থাকলে তা দৈর্ঘ্যে স্বাভাবিকের চেয়ে ছোটছোট । এছাড়াও অনেক বাচ্চা জন্মেছে তাদের শরীরে বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ বিকৃতি নিয়ে । খবরে আরও প্রকাশিত হল যে প্রায় এক লক্ষ শিশু ভ্রূণ অবস্থায় মারা গিয়েছে। প্রায় দশ হাজার শিশু জন্ম গ্রহণ করেছে এই বিকৃত শরীর নিয়ে । তাদের অর্ধেক পৃথিবীর জলবায়ু এক বছরের বেশি ভোগ করবার সুযোগ পায় নি । পুঙ্খানুপুঙ্খ্য বিশ্লেষণে এও প্রমাণিত হল যেসব ক্ষেত্রে এরকম অঙ্গবিকৃতি দেখা গেছে সব ক্ষেত্রেই গর্ভবতী মায়েরা ওষুধটি গর্ভধারণ করার ৩৫ থেকে ৪৯ দিনের মধ্যে গ্রহণ করেছেন । ৩৫ থেকে ৩৭ দিনের মধ্যে যারা ওষুধটি নিয়েছেন তাঁদের সন্তানরা কান ও শ্রবণশক্তিহীন । যারা ৩৯ থেকে ৪১ দিনের মধ্যে নিয়েছেন তাদের সন্তানদের শরীরে দুটো হাত নেই । যারা ৪৩ থেকে ৪৪ দিনের মধ্যে নিয়েছেন তাদের সন্তানদের হাতে তিনটে করে আঙ্গুল ও যারা ৪৬ থেকে ৪৮ দিনের মধ্যে নিয়েছেন তাদের সন্তানের হাতের বুড়ো আঙ্গুলগুলো তিনটে ভাঁজে বিভক্ত । আর যারা এই ৩৫ থেকে ৪৯ দিন এই পুরো স্পর্শকাতর সময় জুড়ে ওষুধটি গ্রহণ করেছেন তাদের সন্তানদের ক্ষেত্রে ফল অনেক বেশি ভয়াবহ হয়েছে । গোটা বিশ্ব যখন এরকম একটা বিপর্যয়ের ঘটনায় উত্তাল তখন একটা ইন্টারেস্টিং তথ্য নজরে এল । দেখা গেল যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে একজনও এরকম বিকলাঙ্গ
শিশু জন্মায় নি।
(৩)
১৯৬০ সালে ডঃ ফ্রান্সিস ও কেলসি নাম্নি এক তরুণী ফার্মাকোলজিস্ট ইউএসএফডিএ * তে সবে কাজে ঢুকেছেন । গ্রুনেন্থাল তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে থ্যালিডোমাইড বিক্রি করার অনুমতির জন্যে অপেক্ষা করছে । ডঃ কেলসি দাবি করলেন গ্রুনেন্থাল থ্যালিডোমাইড ওষুধটি নিয়ে যথাযথ পরীক্ষা নিরীক্ষা করে নি , যা থেকে ওষুধটিকে নিরাপদ বলে ঘোষণা করা যেতে পারে । ওষুধটি বাজারে আসার আগে যে সব পরীক্ষা নিরীক্ষা করা হয়েছিল সে সম্পর্কে আরও পুঙ্খানুপুঙ্খ্য তথ্য চেয়ে পাঠালেন ডঃ কেলসি । তথ্যগুলি যাচাই করে উনি গ্রুনেন্থালকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ওষুধটি নিয়ে ব্যবসা করার অনুমতি দিতে অস্বীকার করলেন । ফলত ওষুধটির মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশাধিকার পাবার সম্ভবনা ক্রমশ বিলম্বিত হতে থাকল । এর মাঝে দুটো দেশ থেকে একই সন্দেহ প্রকাশ ও তার সঙ্গে ডঃ কেলসির সন্দেহ এবং সংবাদ মাধ্যমের সক্রিয়তার ফলে ওষুধটিকে ১৯৬২ সাল নাগাদ সারা বিশ্ব জুড়ে নিষিদ্ধ বলে ঘোষণা করা হল । ঘটনাটি ইউএসএফডিএ তে এক নতুন যুগের সূচনা করল । প্রায় প্রত্যেক দেশেই ওষুধের ব্যবসার জন্যে আইন কানুন আরও কড়া করা হল । স্থির হল এইসব নিয়ম অক্ষরে অক্ষরে মানতে বাধ্য থাকবে ওষুধ তৈরির সংস্থাগুলি। কোনও নতুন ওষুধের ব্যবসা করতে হলে তাদের উপযুক্ত অথরিটির কাছে অনুমতি নিতে হবে । অনুমতির জন্যে দরখাস্ত করার সময় পূর্ববর্তী পরীক্ষায় প্রাপ্ত প্রয়োজনীয় সকল তথ্যপ্রমান দিতে হবে ।
থ্যালিডোমাইডের ব্যাপারটি জার্মানিতে আদালতে গিয়েছিল ১৯৬১ সাল নাগাদ । আদালতে যাবার পরও গবেষণা থামে নি । একদল বিজ্ঞানী ওষুধটি বাঁদর ও খরগোশের উপর প্রয়োগ করে প্রমাণ করলেন যে গর্ভাবস্থায় ওষুধটি দেবার ফলে এইসব জীবের ক্ষেত্রেও সদ্য জন্ম নেওয়া পশুগুলির শরীরে একই রকম অঙ্গবিকৃতি লক্ষ করা গিয়েছে । ক্ষতিগ্রস্থ মানুষদের স্পষ্ট দাবি ওষুধটির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সম্পর্কে যথেষ্ট পরীক্ষা ছাড়াই ওষুধটি বাজারে বিক্রি করা হয়েছিল অথবা গ্রুনেন্থাল ওষুধটির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া লুকিয়েই ওষুধটি নিয়ে ব্যবসা করেছে । আদালতের নির্দেশে ১৯৬৮ সাল নাগাদ বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ দিয়ে অসংখ্য শিশুর শারীরিক অন্তর্গঠন বিশ্লেষণ করা হল । ১৯৭০ সালে আদালত ঘোষণা করল যে নিঃসন্দেহে ওষুধটির টেরাটোজেনিক * সাইড ইফেক্ট আছে। গর্ভবতী মায়ের শরীর থেকে ওষুধটি সোজা ভ্রুণের শরীরে প্রবেশ করে। শিশুগুলিকে ‘থ্যালিডোমাইড শিশু’ নামে চিহ্নিত করা হল। প্রথমদিকে ক্রমাগত দায় অস্বীকার করলেও গ্রুনেনথাল শেষ পর্যন্ত ১০০ মিলিয়ন জার্মান মার্ক ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য হল । যার বর্তমান মুল্য ভারতীয় মুদ্রায় চারশ দশ কোটি টাকারও বেশি । এছাড়াও ১৯৭১ সালে জার্মানির ফেডেরাল মিনিস্ট্রি অফ হেলথ একটি সংস্থা গঠন করল যার নাম
‘ ইন্সটিটিউশন টু হেল্প হ্যান্ডিক্যাপড চিলড্রেন ’ । যা সম্পূর্ণ আইনি ভিত্তিতে প্রতিটা থ্যালিডোমাইড শিশুকে ক্ষতিপূরণ দেবার দায় নিজেদের হাতে তুলে নিল । ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত জার্মানিতে ২৮৬৬ জন থ্যালিডোমাইড শিশুকে চিহ্নিত করা হল। তাদের মধ্যে কেউ কেউ চলতে সক্ষম, কেউ হুইল চেয়ার ব্যাবহার করে , কেউ কেউ সারাদিন অন্য লোকের উপর নির্ভর করে বেঁচে আছে । শারীরিক অক্ষমতার উপর নির্ভর করে তাদের প্রত্যেককে প্রতি মাসে ১০০ থেকে ৪৫০ জার্মান মার্ক দেওয়া হবে ঠিক হল । ওই মাসিক ভাতার মূল্য বর্তমান ভারতীয় মুদ্রায় প্রতিমাসে ৪১০০ টাকা থেকে ১৮৪৫২ টাকা । ক্রমে কানাডা , ইটালি , জাপান , সুইডেন , ইউ কে সহ অন্যান্য দেশগুলিতে আলাদাভাবে থ্যালিডোমাইড শিশুদের চিহ্নিত করা হল ও তাদের ক্ষতিপূরনের ব্যাবস্থা করা হল ।
(৪)
এখানেই বোধ হয় একটি ভ্রান্তিকর ওষুধের কাহিনী শেষ হয়ে যাবার কথা ছিল , কিন্তু হল না । প্রকৃতির খেয়াল বড়ই বিচিত্র । প্রকৃতি না নিয়তি ? যিনি মাঝেমাঝেই এসে বুঝিয়ে দিয়ে যান যে মানুষ তার খেয়ালের কাছে খেলার পুতুল। প্রমানিত হয় মানুষের ক্ষমতা কত সীমিত । কোথাও নেপথ্যে কেউ প্রতিনিয়ত এক সূক্ষ্ম তুলাযন্ত্রে ভাল আর খারাপের ভারসাম্য বজায় রাখতে সদা তৎপর । হয়ত সেজন্যই সমুদ্র মন্থন কালে অমৃত কলশের সঙ্গে উঠে আসে তীব্র হলাহল । ওই অমৃতটুকু গ্রহণ করতে হলাহলটুকুও কাউকে না কাউকে ধারণ করতে হয়। কেউ কেউ এই বিষ গ্রহণ করে নীলকণ্ঠ হয়ে টিকেও যায় ।
কিছু থ্যালিডোমাইড শিশু তাদের প্রবল জীবনীশক্তিতে ত্রিশ বছর পার করে দিয়েছিল । তারা সুস্থ জীবন যাপন করার সুযোগ পেয়েছিল , তারা কর্মক্ষম , তারা সংসারী এবং তারা একাধিক সুস্থ সন্তানের মাতাপিতা । তবে তারা সংখ্যায় নগণ্য । মুষ্টিমেয় কয়েকজন বাদে অসংখ্য মানুষের সংসার তলিয়ে গিয়েছিল এই বিপর্যয়ে , অনেকটা ডঃ স্টিফানের মতই । তাঁরা জীবনের মূল কেন্দ্র থেকে বিচ্যুত হয়ে গিয়েছিলেন অন্য কারোর ভুলে ।
থ্যালিডোমাইড বিপর্যয় থেমে যাবার অর্থাৎ ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ঘটনার পর কুড়ি বছর অতিক্রান্ত । এমন সময় নব্বইয়ের দশকের গোড়ার দিকে বোস্টন চিলড্রেনস হসপিটালে প্রোফেসর রবার্ট ডি আমাতো আবিষ্কার করলেন ওষুধটি ক্যানসার প্রতিরোধে বিশেষ ভূমিকার কথা দাবি করে । ক্যানসারে ক্ষতিকর কোষগুলির বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে কোষের চারিপাশে অস্বাভাবিক রক্তজালিকা সৃষ্টি হয় , যা মূলত ওই বেয়ারা কোষগুলোকে বাঁচিয়ে রাখার জন্যে রক্তের মাধ্যমে খাদ্যরস সঞ্চালন করে। থ্যালিডোমাইড এই রক্তজালিকা গঠন প্রক্রিয়া প্রতিরোধে সক্ষম । এই তথ্য গবেষণাপত্রে প্রকাশিত হবার সঙ্গে সঙ্গে আবারও বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ক্যানসার গবেষকরা নড়েচড়ে বসলেন । তাঁরা ক্যানসার গবেষণার এক নতুন দিগন্তের সন্ধান পেলেন । যাচাই করা হল থ্যালিডোমাইডের ক্ষমতা । প্রায় ছবছর ধরে গবেষণা চলার পর বিশ্ব জুড়ে বিজ্ঞানীরা প্রমান করলেন এটি নিঃসন্দেহে অ্যাঞ্জিওজেনেসিস * প্রতিরোধে ও মাল্টিপল মায়োলেমা * চিকিৎসায় ব্যবহারযোগ্য ।
থ্যালিডোমাইডের কালো ইতিহাস এত সহজে ভোলার নয় । মানুষ ভোলেও নি সেই কথা । কাজেই ওষুধটি দ্বিতীয়বারের জন্য ছাড়পত্র পেতে আরও ছবছর অপেক্ষা করতে হল । অবশেষে ২০০৬ এ ইউএস এফডিএ ওষুধটিকে মাল্টিপল মায়োলেমার চিকিৎসার উপযুক্ত বলে ছাড়পত্র দিল । ওষুধটির প্রস্তুতকর্তারা বিশেষ সতর্কবার্তা দিতে আর ভুল করেন না ; ‘ ওষুধটি গর্ভবতী মায়েদের জন্য ভয়ানক বিপজ্জনক । ’
মানুষের ক্ষমতা সীমিত একথা যেমন সত্যি , তেমনই সত্যি চূড়ান্ত ভুল বা চূড়ান্ত ঠিক বলে কিছু হয় না । এই কথাটাই বুঝি প্রকৃতি অথবা নিয়তি আর একবার বুঝিয়ে দিলেন , যিনি কিনা প্রতি মুহূর্তে সকলের অলক্ষ্যে তাঁর সূক্ষ্ম তুলাযন্ত্রে ভালমন্দ বা ভুলঠিক এর সাম্য রক্ষা করে চলেছেন । কোন কিছু ভুল কি ঠিক তা অনেকাংশে নির্ভর করছে বস্তুটির প্রয়োগের উপর অথবা প্রয়োগের প্রেক্ষিতের উপর । প্রয়োগের ভুলে যা একদিন বিষ হয়ে হাজার হাজার মানুষের ক্ষতি সাধন করেছিল পরবর্তীদিনে প্রয়োগগুণে তাই অন্য একটি মারন রোগের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে সক্ষম হল । যে কোন আবিষ্কার , তা সে কোনও নীতিই হোক বা বস্তু , হয় আসলে মানবকল্যাণের স্বার্থেই । তাই প্রয়োগের ক্ষমতা যাঁদের হাতে তাঁরা তাঁদের দায়িত্ব সম্পর্কে যথেষ্ট যত্নবান হলে অনেক ভুলই এড়িয়ে যাওয়া যায় । আবার দায়িত্বশীল সঠিক প্রয়োগই পৃথিবীটাকে সকলের জন্য বাসযোগ্য করে তোলে ।

কৈফিয়তঃ
কেমি গ্রুনেন্থাল কোম্পানির এক কর্মীর কন্যাটি ছিল সম্ভবত বিশ্বের প্রথম থ্যালিডোমাইড চাইল্ড । ওই কর্মী বা তাঁর স্ত্রীর নাম জানা যায় নি । এক্ষেত্রে নাম দুটি কাল্পনিক । কর্মীটি ঠিক কি ধরনের কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন লেখক সে বিষয়েও অজ্ঞ হওয়ায় কল্পনার আশ্রয় নিয়েছেন ।
লেখাটি প্রস্তুত করার সময় সাহায্য ও সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেবার জন্য লেখক সুস্মিতা মৈত্র ও মদনমোহন কামিলার কাছে বিশেষভাবে ঋণী ।
টীকাঃ
নন-নারকোটিকঃ যা মাদক দ্রব্যের মত আসক্তি তৈরি করে না । কিছু মরফিন জাতীয় ঘুমের ওষুধ নেশা ধরায় ও মাদকের মত ব্যবহৃত হয় ।
মর্নিং সিকনেসঃ গর্ভাবস্থার শুরুর দিকে বমি বমি ভাব ।
ফোকোমেলিকঃ অগঠিত অঙ্গ অথবা হাত পা এর অস্বাভাবিক গঠন যা মূলত গর্ভাবস্থায় কোনও বিষাক্ত পদার্থের প্রভাবে হতে পারে।
টেরাটোজেনিকঃ যা ভ্রূণের গঠন ও বৃদ্ধিতে ক্ষতিসাধন করতে সক্ষম ।
অ্যাঞ্জিওজেনেসিসঃ অস্বাভাবিক ক্যানসার কোষের বৃদ্ধির সময় কোষের চারিপাশে অস্বাভাবিক রক্তজালিকা সৃষ্টি প্রক্রিয়া ।
মাল্টিপল মায়োলেমাঃ এক ধরনের ব্লাড ক্যানসার ।
ইউএসএফডিএঃ ইউনাইটেড স্টেটস অফ অ্যামেরিকা ফুড অ্যান্ড ড্রাগ এডমিনিস্ট্রেশন ।