মোহসূত্র

প্রশান্ত সরকার ও দেবাদৃতা বসু

প্রশান্ত সরকার

মোহসূত্র ১

অথচ ক্ষণিকের কাছে বাঁধা পড়ে আছে আয়ু। আর মুহূর্তরা শুধু বুনে যাচ্ছে মুহূর্তের খেদ, এক্ষেত্রে রোদ যতটা প্রাসঙ্গিক ততটাই... এ সময়ে দীর্ঘ হয়ে আসে আলাপচারিতা। এ সময়ে বড়ো বেশী কোলাহল টানে। আর নেহাত গাছেরা ক্লান্ত হয় না, নাহলে কবেই বন্ধ হয়ে যেত পাখিদের ক্লাস... মায়াবী উঠোন দিয়ে আড়াআড়ি হেঁটে যেত কেউ।

টান না থাকলে ঢেউয়েরা ঢেউয়ের কাছে ফেরেনা কখনো। জলের ভাস্কর্য ছিঁড়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে না কেউ গূঢ় অনুনয়ে । মোহ হলে একদিন নিশ্চিত কেটে যেত ঠিক এইসব চিরায়ত... এরপরও চিঠি না এলে মনে হয় কারা যেন ভুল পথে নিয়ে গেছে তাকে... যতই নরম হোক, মানুষ এখনও তো সেই মানুষের কাছেই ফেরে।

আর প্রতিটা ইশারা এতটাই সাবলীল হবে যদি তবে আর মিছিমিছি কেন এত দ্বিধা! সমস্ত গলিপথই তবে একদিন প্রমাণ করে দেবে অন্ধের নিজস্ব স্বভাব।



মোহসূত্র ২


নেহাতই বনপর্ব সেরে এখন ফিরে আসছে দেখার তাগিদ। দুচোখ দেখেনি যা যা, সেইসব... ধুন্ধুমার, যত প্রহসন আর অরন্য অনুকূল পথ। নিজেকে আড়াল করে যে পাখি আকাশ দেখেছে... উদারতা নয়, আসলে সে দেখে গেছে আকাশের যথাসাধ্য রঙ... বাকিটা তো অনুমান তার।

কুয়াশা চেনেনি তাই এত বিভ্রম, আর তাই এ জন্মে সেভাবে ফিরে যাওয়া হলনা কারোরই। নিছক ঘাসের পিঠে ঘাস হয়ে সেঁটে থাকা, অথবা বলতে পারো আলোর দূরবর্তী আলো... এটুকুই এযাবৎ স্থির। আসলে তো মোহই বাঁচিয়ে রাখে আমাদের এই স্নায়বিক ঘর, গেরস্থালী, এইসব তুমুল - অপত্যের ছায়া ও নিবৃত্তি... মোহই সরিয়ে রাখে বিচ্ছেদের সব অজুহাত...

তাছাড়া পর্যাপ্ত ব্যবধান না-ই থাকে যদি তবে কী করে বুঝবে বলো কতটা সংযত ছিল হননের চোখ আর কতটা কাল্পনিক...


মোহসূত্র ৩

আর আনত শব্দের আগে ছুটে যাবে প্রায়ান্ধ হরিণ, চোখের সামনে তখন শুধু আদিগন্ত প্রাণের আরাম, বিজনবীথিকা। নিজের নামের আগে কোনোদিন পাতাদের ছায়া মেলে দেখো... ঢের তো হল, নাহয় আর একবার সঠিক দূরত্বে যাও। দেখে নাও কে বেশী কাছের, প্রত্যাশা নাকি আলোদের অভিঘাত!!

মুখের গড়ন দেখলে এখন দিব্যি বলে দেওয়া যায় জন্মপরিচয়। ছাঁচ ভেঙে মূর্তি উঠে আসে আরব্ধ উঠোনে। তুমি তাকে ফুলমালা দিও। তবেই তো সাড়া পাবে নির্লিপ্ত, আলিঙ্গন পাবে, পাবে অন্নজল। চৌকাঠ একদিন ভারমুক্ত হলে বুঝে যাবে, তোমার চাওয়ার ভেতরেই আসলে একটা আকাশ ছিল, তার নীচে চারটে দেওয়াল... শুধু একটাও জানলা ছিল না কোথাও।

এখন বাসনার কাছে বসো... বসে দেখো আমাদের প্রতিটা কথোপকথনে বস্তুত কোনো ছায়া নেই, নীরবতার বদলে আসলে কত দীর্ঘশ্বাস জমে আছে।

*********************


দেবাদৃতা বসু

টান

১।
আমরা একটা জাহাজ খুঁজছিলাম যে যার নিজের মত। আমি, অমিয় আর নবকুমার। বহু দিনের অক্লান্ত পরিশ্রমের পর একদিন ময়দানের ঘাসে সেই জাহাজ তৈরি শেষ হল। সন্ধে নামছিল। আমরা গা এলিয়ে দিলাম একে অপরের গায়ে। আমরা নাম দিয়েছিলাম ‘লা আমিস্তাদ’। অদূরে ভিক্টরিয়ায় পরীর গায়ে আলো, আর নবকুমারের হাতে মাঝে মাঝে টেনে ওঠা কলকের আলো মিলে মিশে যাচ্ছিল। ও বিশেষ কথা বলছিল না। আমি আর অমিয় বলছিলাম
- যত্ন করে রাখিস
- আমি একা?
- নবার কথা তো জানিস। বাদ দে। আমি দূর থেকে যতটা পারব আগলে রাখব।
- এতদিনের এত পরিশ্রম। তারপর যদি হারিয়ে ফেলি?
- ভয় পাস না। আর তো কিছু দিন। তারপর সেই লোকটার মত একটা লুপের ভেতর আমরা বেঁচে থাকব।
২।
সে অনেক আগের কথা এসব। আমাদের অত সাধের জাহাজটা যেদিন হারিয়ে গেলো আমি নবকুমারকে ফোন করলাম। নবকুমার আশ্বাস দিল, ‘খুঁজে বার করবোই দেবা। নাহলে তো মধ্যবিত্ত হয়ে যেতে হবে’। আমরা যে যার মত করে খুঁজেছি। এবং অদ্ভুত ব্যপার, একই সময় তিনজনেই সে জাহাজ খুঁজে পেলাম। এক রাতে আমি কলকাতার রাস্তায় হেঁটে যাচ্ছি। বেশ রাত। কোথাও কেউ নেই। মাঝে মাঝে এক একটা বাঁক পেরলেই পথ ঘাত হঠাৎ করে অচেনা ঠেকছে। আমার সামনে বহু পুরনো একটা বাড়ি। নেশাগ্রস্থের মত ঢুকে পরলাম। কোথাও কেউ নেই। শুধু গোটা বাড়ির দেওয়াল থেকে সিনেমার রিল ঝুলছে। মাথার পোকাটা নড়ে উঠল আমার। যেমন মাঝে মধ্যেই ওঠে আর কি। শুরু করে দিলাম ঘাঁটতে- ‘মাদার ইন্ডিয়া’, ‘সপ্তপদী’, ‘কায়ামাত সে কায়ামাত তক’, ‘দিওয়ানা’, ‘ঝিন্দের বন্দি’, ‘টাইটানিক’, ‘পাইরেটস অফ দি...’, হুড়রে!!! এই তো, এই তো আমাদের হারিয়ে যাওয়া জাহাজ।
ক্রিং ক্রিং
নবার ফোন বাজছে।
- হেলো।
- কি করছিস? জানিস আমি না...
- আমি তোকে ফোন করতেই যাচ্ছিলাম। তোকে বলেছিলাম না আমাদের অফিসের ওই লোকটার কথা যে ৫০০ টাকার নোটের সাথে সেক্স করে। তার বাড়িতে আজ নিমন্ত্রণ ছিল ওনার কাছে প্রচুর কালেকশান বুঝলি। বিভিন্ন দেশের কারেন্সি। গোটা একটা ঘর ভর্তি। আমি দেখছি ঘেঁটে ঘেঁটে। হঠাৎ সিঙ্গাপুরের দু ডলারের নোটের মধ্যে কি খুঁজে পেলাম জানিস?
- কি রে?
- গেস।
- আই কান্ট। তুই বল।
- আরে আমাদের সেই হারিয়ে যাওয়া জাহাজ রে বোকাচোদা।
৩।
ভোর বেলা ঘুম ভেঙ্গে গেলো। এক কাপ চা নিয়ে মেইলবক্স-টা খুলতেই অমিয়র মেইল।
“এত কাজের মধ্যে নিশ্বাস ফেলতে পারি না। জানিসই তো। আমি অপেক্ষা করছিলাম আবার কবে আমাদের গোল টেবিল বসবে। এভাবে নয়। ত্বকের আধারে। গতকাল সন্ধেবেলা বাড়ি ফিরতে ইচ্ছা হচ্ছিল না। সবাই ফিরে গেছে। সবাই ফিরে যায়। আমি ভুতের মত একা একা ঘুরে বেড়াচ্ছি লাইব্রেরিতে। একটা বই চোখে পরতেই নিয়ে বসে গেলাম। জেমস ক্লাভেলের উপন্যাস। ‘শোগুন’ । পড়তে পড়তে কি হল ভাবতেই পারবি না। ‘আমিস্তাদ’ কে খুঁজে পেয়েছি রে দেবা। বাদ বাকি প্ল্যান তুই কর। কাজের মধ্যে ভালো থাক। ভালোবাসা নিস।“

৪।
আমরা বসে আছি জাহাজের ডেকে। আমি, অমিয় আর নবকুমার। ঝড় উঠেছে খুব। আমরা তার মধ্যেই চেয়ার টেবিল পেতে ওল্ড মঙ্ক খাচ্ছি। এ আমাদের কতদিনের স্বপ্ন।
ঝড় বাড়ছে। জাহাজ বেসামাল দুলছে। আমরা তিন জন রাম খাচ্ছি। আমরা জানি এরপর একটা বরফের চাইয়ের সাথে ধাক্কা লেগে আমাদের জাহাজটা ডুবে যাবে। আর আমরা?

শেষ ফোঁটা অবধি শেষ করতে থাকব তিনজনে মিলে।