দশমিক শ্যাওলা সবুজ তল

হাসান রোবায়েত ও অভিষেক ঝা


হাসান রোবায়েত

হলুদ পাখির ডাক

মানুষের মুখের দিকে তাকালে তোমারও মনে হয়
আত্মহত্যার পাশে
ছাতিমের নিজস্ব কোনো বন নেই—
গাছের নিবেদন-কালে
কে আর ছায়াকে ভেবে নেয় সন্তান!
হিংসার মর্ম ঘেঁষে প্রতিদিন কিছু পাতা ঝরে যায়


হিংসা
*
এ মাটি আমির ও শালফুল— একই বৃন্তে ঘোরে মৃতবাক
এইসব চারুমেকানিক্স শেষে হে ঘাম
হংস ও হাসির পাশে ফুটে আছে রেণুমূদ্রার ধ্বনি
একই পার্শ্ব ঘোরে পদ্মবিভায়—
নিজস্ব হিংসার পাশে দাঁড়ালে সঙ্গত মনে হয়
মেহেদি ফুলের বন
না-খোলা স্যান্ডেলের দিনে কেন চিত্রলুব্ধক
নিরূপ পথের ধারে
হয়তো ভুলেছ সেই ধনুক-মুগ্ধ বায়ু
যে ত্রিভুজ ফেটে গেছে ফুলের অংশ ধরে—


নদীমাতৃক পুল

*
টমেটোকে ছায়া দিচ্ছে প্রেম—
একটা ট্রেন পার হচ্ছে ধীর কোনো
নদীমাতৃক পুল—
যখন মাস-টানা ক্রেন
লোহার হিংসা পেরিয়ে হেসে ওঠে দূর
দরগার মৌসুমে
ধোঁয়াকে ঈর্ষা করে চাঁদ
কোনো পাখিই আর বসছে না ক্যালেন্ডারে
*
একটা চলন্ত ট্রেন পুরাই থেমে আছে হিংসার ভেতর


শাহানা আপা


সন্ধার দু তিন বিঘৎ পরেই শাহানা আপার চোখ
সেখানে লণ্ঠনঝড়ে
অজস্র উড়ছে পারাবত—
বিশ্রুত হিংসার পাশে সেটুকুই পরিত্রাণ


আশ্রিত ছলনা

আশ্রিত ছলনার নিচে ক্ষয়ে গেল বর্মের ছাঁচ, নিহত রৌদ্রের দিন পড়ে আছে রণদূরখাদে—আকাশব্যাপী ঐ ঝাঁক ঝাঁক রুহ—যেন কাক—শস্ত্রব্যগ্রতায় নেমে আসছে তীরে
এখানে সমস্ত হাওয়ায় যে তির রাত্রির বিভা, উরু-ভঙ্গুর শ্লেষ—একি! একটা শব্দ! স্তন-জর্জর ঢেউ!
শুনুন, শুনুন আপনারা—এ প্রাণ অতিক্ষীণ গুল্মেরপ্রায়—সে নদীর পারাপার হিংসা ও ঘামের ওপার

=====================================================

অভিষেক ঝা
গহীন

একে একে সব খুলে ফেলছিল সে। প্রথমে উল্টো করে চামড়া ছাড়ালো।একটা হাল্কা ছড়িয়ে পড়া গোলাপী আভার বিকেলের মত ঝুলে থাকা বাঁড়াটা মাটিতে পড়ে টিকটিকির লেজের মত খানিক আত্মভোলা আচরণ করল। সেটার দিকে তাকিয়ে সে বোঝার চেষ্টা করছিল অই তিড়বিড়ানিতে তার ইতিহাস লুকায় আছে কিনা। প্রত্যেকটা চিরিকে সে দেখার চেষ্টা করছিল কোনো সেতু দেখা যাচ্ছে কিনা, নিদেন পক্ষে কোন সাঁকো , আবে বাল দু-চারটে কাঠের গুঁড়ি তো কেউ ফেলে যাবি... না এভাবে হবে না, তাকে মনে করতে হবে, না মনে করতে সে পারবে না আর, তাকে আবার এখন গড়তে হবে তার হিংসার শরীর। এ জায়গাটা এমনিতে অনেক দূরে লৌকিকতা থেকে, তবু কেউই যে আসবে না এ কথা কি বলা যায় জোর দিয়ে? কেউ এসে পড়লেই তো সেই গঠন আবার ভেঙে যাবে, আবার অপেক্ষা করতে হবে অলৌকিক এক ঈর্ষণীয় একাকীত্বের। খানিক দূরে বাঁশের ঝাড়ের ভিতর এক ডোবা মতো, পাতা ঝরছে তার উপর। নিজেকে টানতে টানতে সেখানে নিজেকেই নিয়ে যায় সে, নিজের থেকে অনেকটা দূরে, হয়তো নিজের সবচেয়ে কাছাকাছি। অনেক দূরে একটি টমেটো ক্ষেত, খানিক কাঁচা, কিছু পাকা। তারও দূরে সবুজ বাধাকপির ক্ষেত। তার চাইতেও অনেক দূরে এক রেল লাইন যা তার চোখে আসছে না, তাই সিগন্যাল না পেয়ে দাঁড়িয়ে থাকা একটি ট্রেনের অস্তিত্বও সে কোনোদিন জানতে পারে নি আর। ডোবার জলে মেহেদির গন্ধ আসছে কি করে? তবে কি তার কেউ এখানে এসেছিল তার গুপ্ত প্রেমিকের সাথে? সেই শীৎকার কেমন ছিল? নরম মাটিতে তার চোখ খুঁজতে চাইছিল কোনো হাতের ছাপ আছে কিনা। তার শরীর জুড়ে আবার সেই রক্তের স্রোত, একই রকমের সব জিজ্ঞাসা চিহ্ন বুনা মোষের মত আ-র-র রবে দাপাদাপি করতে শুরু করেছে। তাহলে কেন সে কেটে ফেলেছিল তার বাঁড়া ? তবে কি সে নিজেকে মুক্ত করতে গিয়ে নিজের যৌনাঙ্গটিকে মুক্তি দিয়েছে? আর ফিরে যেতে ইচ্ছে করছে না তার, না হলে সে দেখত সমস্ত দাপাদাপির শেষে একটি শুকিয়ে যাওয়া কদমের ডাঁটি হয়ে নির্নিমেষ দুপুর থেকে পৌনে বিকেল হয়ে যাওয়া আকাশটার দিকে তাকিয়ে আছে একদা তার ঈর্ষা জাগানিয়া হিংসা-দন্ড, অথচ তার শরীর জুড়ে এখনও হিংসার তপ্ত লোহার পাতগুলোকে পিটিয়ে চলেছে কেউ, নিঃশ্বাস নিতে গেলে মনে হচ্ছে ঝাঁক ঝাঁক কাক মুখে করে সেই যৌনাঙ্গের তন্তু নিয়ে নেমে আসছে এই অতিলৌকিক ডোবার ধারে, তার শরীরের প্রতিটি তন্তুকে নিজেদের শরীরের রক্ত মাংসে পরিণত করার তীব্র লোভকে নিজেদের ঠোঁট, নখ, ও চোখে নিয়ে...একে অপরের সাথে তীব্র হিংসায় মেতে ওঠায় সে পায় এই সময় যা তার রক্তে এখনও আনমনে প্রবাহমান আদিমতম রিপুকে জাগিয়ে তোলে, তার হাত কেমন করে যেন কলমীলতার ডাল ছিঁড়ে নেয়। অজস্র শ্যাওলার নীহারিকা পেরিয়ে এ ডোবার সেই কোনকালের কাদারা দেখে যৌনাঙ্গহীন এক শরীর উবু হয়ে বসে আছে, হাত দিয়ে নাকে কলমীর ডাল লাগিয়ে।চোখ দুটো বোজা, খুললেই ধোঁয়াটে চাঁদের মত হিংসাকে বড় আপন করে নেওয়ার পথের শেষটা চোখে আসছে। চোখে কি আসছে আরও অনেক চোখ? নাকি অই চোখ থেকেই ভাঙতে ভাঙতে এত সমস্ত চোখ হয়েছে?
ধনুকের ছিলা মুক্তির মত একটি উতরোল ছড়িয়ে পড়ছিল জল জুড়ে। মাগুরদের ঘুম ভাঙছিল । জেগে উঠছিল ছোটো ছোটো ইরুকি মাছের দল। এত সুপ্রাচীন বোয়াল আর আড়ও থাকে এ ডোবার গায়ের পাঁকের আলো না ঢোকা কাদার গুহাগুলোয়! মাগুরগুলো প্রথমেই খুঁজেছিল নরম মাংসের স্তরদের। একে অপরের মুখে লেগে থাকা তুলতুলে নরম মাংসদের দিকে তাকিয়ে তাদের চোখ মেতে উঠছিল তীব্র হিংসায়। খানিক বাদে মাংস ছেড়ে পরস্পর নিয়ে মেতে উঠল তারা। এই সুযোগ বরাবর কাজে লাগায় ইরুকি মাছের দল। ঢুঁ মেরে মেরে অনেক চেষ্টায় আলগা করে আঙুলের করের মাংস ও রক্ত। তার ভিতরে থাকা ইতিহাসগুলো মিশছিল এই দুপুরের তলদেশের ডোবায়। রক্তে হিংসার ঘ্রাণ ছাতিম ফুলের গন্ধেরই মত --- প্রেম-অপ্রেমের বাইরের এক গন্ধ। সেই গন্ধে পাঁক লাগা গুহাগুলো থেকে বেরিয়ে আসে দুখান বোয়াল ও তিনটে আড়ের এক জ্যামিতি। তারা নিজেদের পুষ্ট করার কাজে লেগে পড়ার আগে রোদের তির্যকতা মেপে নেয়। এই সময়টুকুর ভিতর সে আরেকবার চোখ খোলে। ...একটি দুপুর...দুপুরের ভিতর একটি বিকেল...বিকেলের ভিতর একটি ভোর...ভোরের ভিতর একটি সন্ধ্যা...সন্ধ্যার ভিতর একটি সকাল... সকালের ভিতর একটি দুপুর... দুপুরের ভিতর একটি রাত... রাতের ভিতর একটি দুপুর... সে ,সে, সে, সে... রক্তের ভিতর বয়ে চলা হিংসাদের থামাবার জন্য সন্ধানে সে গড়ে নেয় তার জমি, তার ক্ষেত, তার মেয়েমানুষ, তার গবাদি , এবং সে দেখে তার মত অনেক সে এই দখলদারি শেষে এক বুক হিংসা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে একে অপরের প্রতি সুতীব্র আকর্ষণে। এই সময়টুকু যথেষ্ট তার শরীরের প্রতিটি অংশের বোয়ালশরীর, আড়শরীর হওয়ার জন্য। এবং হয়েও যায় । আড়েরা সুড়ঙ্গ বেয়ে সবুজ কালো নদীতে চলে যায় গতকালের মতো, গতজন্মের মতো। ইরুকি মাছেরা কাদার তলে ঢুকে পড়ে। মাগুরের দল ঘাই মারে না আর। তারা সবাই কী মনে করে যে উরুটা ছেড়ে দেয়, কে জানে।
সবুজ টমেটো আর লাল মরিচ দিয়ে আড় মাছের ঝাল খেয়ে দুপুরের আকাশে ওড়া পায়রাগুলোর দিকে তাকিয়েছিল সে। দরগার দিক থেকে ঘন এক ছাতিমের গন্ধ ভেসে আসছে। এখন সে ব্যাসের দ্বৈপায়ণ হ্রদের বর্ণনা পড়তে মগ্ন। অনেক দূরের রেললাইনে একটা ট্রেন থেমে আছে। তারপর বাঁধাকপি ক্ষেত, তারও পরে টমেটোর বাগিচা। তারও পরে ঝাপসামতো এক দুনিয়া ।অই দুনিয়ার লোকদের সে সুতীব্র হিংসা করে। তার খাতা জুড়ে খসখস শব্দ। আমরা দেখতে পেলাম একটা চলন্ত ট্রেন পুরাই থেমে আছে হিংসার ভেতর......