নিরীহ সময়খণ্ড বনাম রিপু ভ্রমের বেভুল ভুলাইয়া

তমাল রায়



ভুলের মত একটা মস্ত আকাশ মুখ কালো করে ঝুলে রয়েছে কালো পিচ রাস্তার বুকে। আনোয়ারজান তার তিন সন্তানকে নিয়ে পথে, রাস্তা পেরোবেন। মালতীবালাও তিন সন্তান নিয়ে বড় রাস্তায়। ডোরিনা ক্রসিং এ দেখা হয়ে গেল ছয় সন্তানের মুখোমুখি। দু'পাশের ফুটপাথে দাঁড়িয়ে মায়েরা সাবধান করছেন তাদের...রাস্তা তো রাস্তাই। সন্তানরাও সন্তান। ভুল, ঠিক উপেক্ষা করেই তারা চললো নিজেদের মত। পথ চলতি তাদের দেখা হবে কিছু তীর্থযাত্রীর সাথে। জীবন তো সুষমামণ্ডিত তীর্থ, আর বাঁচাটা খারাপ ভালোর ব্লেণ্ডেড আলপনা! আনোয়ারজান ফিরে গেছেন এখন সেই শতাব্দী প্রাচীন কোঠায়। সকালের মিহি আলোয় তান ধরেছেন রাগ ভৈরব। মালতীলতাও ইষ্টদেবতার সামনে বসে ধরেছেন কীর্তন...মেটিয়াবুরুজ থেকে বি কে পাল, ঈশ্বর অথবা শয়তান এবার মেলা সাজাচ্ছেন, পসরা, বিকিকিনি, জীবন যেভাবে কখনো গ্রেনারিজ হয়ে ওঠে, আর দুয়ারে দাঁড়িয়ে কেউ,চেয়ে বসে স্বর্ণ শস্য।
'ধরা যাক এ সবই ভুল'। ওই যে কে যেন বলে উঠলো কানের আশপাশেই, তারপর যা হয় রেললাইন হতে গেছিল যারা, বেলাইন হয়ে, আপাতত নদী... ভাসছে এগোচ্ছে ভাসছে, ভাসাচ্ছে। আর ভোর হবার আগে ছোট তারাটি বুড়ো তারাটির দিকে মাথা উঁচু করে বিড়বিড় করছে- আকাশটাই মস্ত ভুল, তবু ভুলের গায়েও কি করে যেন পুটুশ ফুলের নকশি কাঁথা। তারা, জ্বলে, নেভে, জ্বলে...আলোকেও ভুলক্রমেই ভাবা, নইলে এত দূর জার্নি, অথচ শেষ নেই তো!

'মহাকাশে পুব আর পশ্চিমের কোনো ফারাক নেই, মানুষই বৈষম্যের সৃষ্টিকর্তা। স্বরোচিত বিভাজন, আর তাকেই সত্য বলে এগিয়ে চলা, এই না হলে মানুষ!'
ফড়িং আর প্রজাপতির মধ্যে দিয়ে সোজা যে পথ চলে গেছে তালুকদার পুকুর পর্যন্ত, তাকেই কাম বলে চিনেছিল মানদা মাসী। মানদাকে নারী বলতে দ্বিধা করত অনেকেই। নাকের নীচে গোঁফের রেখা, থুতনিতে কয়েকটা চুল, লোক দাড়ি বলে। লোক না পোক, বলে মানদা স্নান করতে যেত তালুকদারের পুকুরে। শাড়িটা ফুলে থাকত জলের মধ্যে এমন, যে দূর থেকে শালুক ফুল ঠাহরাতো যে কেউ, মানদা স্নান করেই যেত। থামে আর কই! পুকুরটি ছিল, মানদার কাম নিবৃত্তির জায়গা, মানে লোক তাই বলে, তখন তৃতীয় লিঙ্গের অধিকার তো দূর, বিকৃতি বলেই ভেবে,লোকে দূর দূর করত। মানদা অবিশ্যি সে সব নিয়ে মাথা ঘামানোর লোক ছিল না। কারণ তার ছিল ওই যে ফড়িং আর প্রজাপতির মাঝের ছায়া ছায়া রাস্তা, আর শেষে হিম শীতল জল, আহ কি তৃপ্তি! মানদা মাথা ডোবাচ্ছে, মানদা মাথা তুলছে, মাথার ওপর চন্দ্র সুর্য, তারার কেবল স্থান পরিবর্তন হচ্ছে, যেমন হয় আর কি!

'বাহিরে কোনো শত্রু নেই। শত্রু মানুষের অন্তরে বাস করে, তাকে জয় করতে পারলেই অসীম ও অনন্ত সুখ রাশি।'
হারাণ ঠাকুর বলেছিলেন শিষ্যদের - লোভ, বড় লোভময় এ দুনিয়া, এত অনাচার ধ্বংস ছাড়া উপায় কি! তখনও সোভিয়েত রাশিয়া অখণ্ড। মার্কিন মুলুক এমন একচ্ছত্র রাজা হয়ে ওঠেনি। বাণীপুরের, হিজলপটাশ গ্রামে আলো পৌঁছয়নি ভালো করে...সন্ধ্যে নামলে ঝিঁঝি পোকার ডাক, আর শেয়াল ডাকে এদিক ওদিক। হারাণ ঠাকুরের তৃতীয় পক্ষের যুবতী বউ ধরা পড়ল কাঠ মিস্ত্রী হামিরুদ্দির সাথে এক বিছানায়। তাকে নেড়া করে পল্লীসমাজ বের করে দেওয়ার আগে জানতে পেরেছিলো যুবতী বউ এর খুব লোভ ছিল একটা দক্ষিণ খোলা জানলার। সে কথা না'কি বলেওছিল বহুবার হারাণকে। হারাণ তো আপামর গেরামবাসীর ভবিষ্যৎ জীবনের পথদ্রষ্টা, তার এসবে সময় কই?
বউ আত্মঘাতী হলে, হারান আশমানের দিকে আঙুল দেখিয়ে বলেছিল, লোভের মেঘ জমেছে আকাশে, এবার বিপর্যয়! তার দু'দিন পরই না'কি স্কাইল্যাব খসে পড়েছিল পৃথিবীর বুকে!

'ভয়হীন হও, উদ্বিগ্ন হওয়া অনুচিত। ক্ষতি সাধন অসম্ভব উপক্রমণিকা, কারণ আত্মা অবিনশ্বর।'
তখন নীল শাদা নয় এ শহর অন্ধকারের। বিহারের জেলা নওয়াদার ছেদিলাল। খাটো ধুতির মদ বিলাসী অন্ধকারের প্রেমিক ছেদিলাল, আঁধার ঘনালেই তুলসীদাসী রামায়ণের সুর ভাঁজে, আর ছেদিলাল তখন অমোঘ গোঁফ জোড়ায় তা দিচ্ছে পায়ের ওপর পা তুলে। রিক্সা আপাতত গ্যারেজ। কর্পোরেশনের হলুদ কম পাওয়ারের আলোয় তাকে যেন মনে হচ্ছে সম্রাট শাহজাহান! হঠাৎ লোডশেডিং! ধর কোনো এক নক্ষত্রমালার দেখা হয়ে গেল ছেদিলাল রিক্সাওয়ালার। ধর, পথে নওল বাতাস। রিক্সা হাতে নিয়ে ঠুন ঠুন করতে করতে সে চললো এক ৩০০ বছরের শহর শাসনে। সে চলছে আর আর তার সাথে চলছে ক্ষণজন্মা ঈশ্বর। ডি লা মেয়ারের কবিতার মত পরিব্যাপ্ত নির্জনতা। ঈশ্বর খানিক নীচু হয়ে জিজ্ঞেস করল, ইজ দেয়ার এনিবাডি দেয়ার??? মদ রিপুতে অভিষিক্ত ছেদিলাল উত্তর করল: ম্যাঁয় হু না। তারপর? সে রাতে ছেদিলাল চাপা পড়েছিল বেপরোয়া বাসের নীচে, তাতে অবশ্য শহর থেমে থাকেনি। কেবল মদ রসে একটি কবিতা আখর কেটে পড়েছিল কালো পিচ রাস্তায়। খুব ভোরে যখন ধুয়ে দেওয়া হল সে সব পুতি গন্ধ অথবা কবিতা, ঈশ্বর কোথাও হাসছেন একাকী। কর্কট রাশির জাতকের যেমন ভবিতব্য!

'তোমারই চিন্তার ফসল তুমি। প্রকৃত সত্যের পথে সৎ মনের অভিযাত্রীর জীবন হয় আনন্দোজ্জ্বল, দুঃখ কেবল ছায়ারাতের বাসিন্দা।'
প্রেম আর অনন্ত। অণু আর পরমাণুর মধ্যে কোথাও মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে গাছ। শেকড় ফাটিয়ে দিয়েছে দেওয়াল। রস শুষছে যে, সে নাগর অথবা হেলঞ্চলতা। এরপর সে দুলবে কাপড় শুকুত দেওয়ার তারে। পিঠোপিঠি মুখোমুখি কথা হবে কথাদের। যা হবার কথা নয়, তা হবে বলেই তুবড়ি জ্বলবে। অনেকটা উঁচুতে আগুন। আর কালীপূজো। খোঁড়া আর কানা দুই প্রেমিকের দেখা হয় রেল স্টেশনের আশপাশে। ভিখিরি নিত্য যাত্রীর মাঝেই অচেনা পকেটমারের মতই দুজনে চিনে নেয় পরস্পরকে। ওরা রেবার প্রেমিক। গিরিশ পার্ক থেকে উল্টোডাঙা হয়ে ট্রেন ইছাপুর থামলে, দু'জনেই অপেক্ষা করে। রেবা ডিউটি সেরে ফিরছে। ওরা দুজনেই রেবার প্রেমিক। বিদ্যুৎ চমকের মত পরস্পরের দিকে একবার তাকিয়ে নেওয়ায় যা হয় তা ঈর্ষার বিনিময়! রেবা এখানে অতিভুজ ধরে সোজা এগিয়ে যায় বাসার দিকে। বাসা মানে আট দশ চৌখুপী। কিছুটা জিরিয়ে নেওয়া। কানা ফুল নিয়ে আসলে, খোঁড়া আনে জিলিপি। রথের মেলা বসেছিল। রেল লাইনের ধারে। রেবা এদের কাউকেই দেখে হাসে না। মুখ গম্ভীর করে পাশ ফিরে শোয়। দরজার বাইরে পাহারা দেয় ঈর্ষারা। এদের অতিক্রম করেই রেবা ফের কাল দুপুর হলে চলে যাবে সোনাগাছি। রেবা জ্ঞান হারায়। ঈর্ষারা তাকে নিয়ে রওনা দেয় গোকুল ডাক্তারের বাড়ি। গোকুল ডাক্তারও ঘটনা চক্রে রেবার খদ্দের।

'এমন কি সেই আঁধার উপত্যকাতেও তিনি আছেন, ভয় কে জয় কর। দৃষ্টি থাকুক সোজা,তিনি আছেন। সাহসী আর উপকারী তার ছায়াতেই লালিত।'
মিত্তিরবাবু সে ভরসাতেই এয়ারগান নিয়ে বেরোতেন। ছায়ারা কাঁপলেও তার হাত কাঁপত না কখনও। চুনোট করা ধুতি, বার্নিশ করা জুতো মসমস করে তিনি এগিয়ে যেতেন বনের পথে। অকুতোভয়, অতিমানব!
এয়ারগান পিস্তল হলে, চাঁদমারি করেছিলেন সুপুরি গাছে বসা শ্রীকৃষ্ণকে। তারপরের গল্প সবারই জানা। তবু তিনি বলবেনই। সে যাই হোক বন্দুকের মুখ থেকে যে ধোঁয়া নির্গত হয়, তা থেকেই না'কি পুঞ্জিভূত মেঘের জন্ম। নইলে এত রাগ নিয়েও সামলেই তো চলেন। মিত্তিরবাবু বাঘ শিকারে বেরিয়েছেন। চাদ্দিকে ঘন অরণ্য। মিত্তিরের অবিশ্যি দোলাচল নেই। গুলি করলেন। বনের বাঘ মরলো কি'না জানা যায় না। মনের বাঘের খবরটাই ছড়িয়ে পড়েছিল লোকের মুখে মুখে মুখে। রক্ত। লোনা স্বাদ। আর লোকজন! লোকজনের মুখে মুখে ঘোরে সে গল্প। তেমন কিছুই না। মাথায় আগুন জ্বললে কি করে দেখা হয়ে যায় ভাত কাপড় আর আনাড়ি লাজুক জলের। তো এ হেন মিত্তিরবাবু ক্রোধোন্মত্ত হয়ে ছুঁড়ে দিয়েছিলেন বারুদ, আকাশের দিকে। আর মেঘ ফাটা সকরুণ বৃষ্টি। ধানক্ষেতে পড়েছিল ছেলে! ছেলের বউ,শহীদের বউ হয়েই কাটিয়ে দিয়েছিল বাকি জীবন। তারপর যা হয়, চারদিকে রক্তের অদৃশ্য ছাপ। আর মিত্তিরের পাগল হওয়া। বউমা না'কি ভোট প্রার্থী। যেমন হয়। যেভাবে জলেরও থাকে দাগ। আর ক্রোধের করুণা! আকাশ পাখিহীন। মিত্তির পরিজন হীন। বাতাসে দীর্ঘশ্বাস আসলে জেলার লোকজন নাম দিয়েছিলো মিত্তির বাতাস, ওই ফুটিফাটা চত্তির মাস আসলে যেমন হাত ধরে আসে সব্বোনাশ! অনুপম প্রাসাদে তখন আকাশ প্রদীপ জ্বলছে। ঘোর আস্তিক মিত্তির না'কি সেই তখনও বলে চলেছেন...এ কথা জানিতে তুমি, ভারত ঈশ্বর শাহজাহান!!!

'ভয়, বিপদ আর রিপুর অযুত বাঁধায় পরীক্ষিত হবে, জয়ী সেই হবে, যে স্থৈর্যে বিশ্বাসী, বিশ্বাসী সর্বশক্তিমানে।'
লাইব্রেরি ঘিরে অন্ধকারের ইতিহাস স্তুপ হবার আগে, সারিগান আর পাখির ডাক। আঁধার চিরে যেভাবে ভোর আসে। ইতিহাসের পাতা থেকে উঠে এসেছিলো মহম্মদ ঘোরি আর নাদির শাহ। কেবল এক ব্রাহ্মণী পাহারা দিচ্ছিল তার যখের ধন রোগাতুর সন্তানকে। বাকিটা, সবার জানা। ছেলেটার নাম ভরত। আর্ত কিন্তু সম্মানবোধ বিশিষ্ট। তাকেই ছেনাতে এলো দস্যুরা। আর ঘুম থেকে উঠে যেই না দেখলো তার সন্তান কাছে নেই, অভিশাপ বর্ষণ করলো ভিনদেশি শত্রুর উদ্দেশ্যে। ছেলে তখন শত্রুপুরীতে আনন্দে মশগুল কোনো এক কুমুদিনীর সাথে। বাতাস এসে খবর দিয়েছিল। আর সেই ভোর রাতে, ব্রাহ্মণী একা পাড়ি দিলো অদৃষ্টের সাথে লড়তে। এর নামই পাণিপথের যুদ্ধু। বাতায়ন পথে ভোর এলে দেখা গেল, একটি পাখির ঠোঁটে ধরা অলিভপাতা। দুঃখ না'কি মোহ বর্জনের ইতিহাসে সেই প্রথম অশ্রু বিসর্জন, আকাশ মেঘলা।
'যদি তোমার উদ্বেগকে প্রার্থনায় রূপান্তর কর,দেখ তোমার সমস্ত যুদ্ধই কখন তার আশীর্বাদ ধন্য।'
সঠিকের আকাশে আপাতত বেহুদা ভুলের ছিটমহল মেঘ! আজও দু 'একটি তারা। অনুজ্জ্বল। তবু জ্বলছে। আর রেল লাইন বেলাইন হতে হতে নদী বা নারী অথবা পুরুষ! ভূপালী আর কীর্তনে মিশে গেছে কখন। সাত রঙা বেলজিয়াম ঝাড় লন্ঠনের মত রঙ ছড়াচ্ছে, কোথাও বা অন্ধকার...আনোয়ারজান এক 'আমি'র বিশেষ্যপদ, যেমন মালতীবালাও। আমি আর ছয় সন্তান মিলে মিশে সাত সুর। ভুল আর ঠিকের লড়াই এর উপসর্গ মেনে ষড়ঋতু বা ষড়রিপু আপাতত সঙ্গীত। ছড়ের টানে মধ্যরাতের গীর্জায় বসা অন্ধ বেহালাবাদক আপাতত মূর্ছনা ছড়িয়ে দিচ্ছেন...পক্ষ বল বা বিপক্ষ, সবই আদ্যন্ত এক পক্ষ হয়ে ঐহিকের এই সংখ্যা আপাতত এক ট্রাভেলগ। আসুন পাঠক নির্বাসনোত্তর আসন্নতার পাঠে মনোনিবেশ করি। 'যদি নির্বাসন দাও'